"লেখা শেখার বই এটি কোনো অর্থেই নয়। বরং একে লেখার কলাকৌশলের দিকে আমাদের চোখ ফেরাবার বই বলা যেতে পারে। আমি কিছু সংকেত ও ভাবনা উপস্থিত করতে চেয়েছি। আশা এই, এ থেকে একজন নবীন লেখক উদ্বুদ্ধ হবেন আরো অনেক গভীরে ভাবতে এবং নিজের কলমের দিকে নতুন করে তাকাতে।"
Syed Shamsul Haque (Bangla: সৈয়দ শামসুল হক) was a Bangladeshi poet and writer. Haq lived alternately in Dhaka and London. He wrote poetry, fiction, plays - mostly in verse and essays. He, the youngest writer to be honored with Bangla Academy Award, achieved it at the age of 29. He was honored with Ekushey Podok in 1984.
(সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে জন্মেছিলেন। বর্ণাঢ্য লেখকজীবনের অধিকারী সৈয়দ হক। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, কাব্যনাট্য, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, চলচ্চিত্রের গান – যা লিখেছেন সবকিছুতেই পেয়েছেন জনপ্রিয়তা, সাফল্য।
মাত্র ২৯ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান সৈয়দ হক। এখন পর্যন্ত বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ লেখক তিনি।
সৈয়দ হকের লেখালেখির শুরু তাঁর শৈশবেই। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে লিখে ফেলেন দুই শতাধিক কবিতা। ১৯৫১ সালে ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ পত্রিকায় ‘উদয়াস্ত’ নামে তাঁর একটি গল্প ছাপা হয়। সেটাই তার প্রথম ছাপা হওয়া লেখা।
সেই বছরই বাড়ি থেকে পালিয়ে বোম্বে (বর্তমানে মুম্বাই) চলে গিয়েছিলেন তিনি। কাজ করেন পরিচালকের সহকারী হিসেবে। কয়েক বছর পর দেশে ফিরে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও লেখাপড়া শেষ করেননি। পুরোপুরি মনোযোগ দেন লেখালেখিতে।
১৯৫০-এর দশকেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’। এ সময় চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন তিনি। তাঁর লেখা চিত্রনাট্যে নির্মিত হয় ‘সুতরাং’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘মাটির পাহাড়’, ‘তোমার আমার’। তাঁর উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’ অবলম্বনে ‘গেরিলা’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়।
সৈয়দ শামসুল হক চিত্রনাট্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের জন্য প্রচুর গান লিখেছেন। তাঁর লেখা বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে’, ‘এই যে আকাশ এই যে বাতাস’।
তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘একদা এক রাজ্যে’, ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’, ‘পরানের গহীন ভিতর’, ‘অপর পুরুষ’, ‘অগ্নি ও জলের কবিতা’।
বিখ্যাত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘নীল দংশন’, ‘বারো দিনের জীবন’, ‘তুমি সেই তরবারী’, ‘কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন’, ‘নির্বাসিতা’।
‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নুরলদীনের সারা জীবন’ তাঁর বিখ্যাত কাব্যনাট্য। এ ছাড়া অসংখ্য অনুবাদ এবং শিশুসাহিত্যে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন সৈয়দ হক।)
সৈয়দ হক লিখছেন লিখতে হয় কীভাবে তা নিয়ে। না, সরাসরি এমন দাবি সারা বইতেও পাবেন না। অথচ অনবদ্য গদ্যের বারোভাজা, কাব্যের চচ্চড়ি রাঁধলেন তিনি। ব্যবচ্ছেদ করলেন বিখ্যাত কিছু গল্পের। কিন্তু কেন? উদ্দেশ্যটি অতিসরল। বাক্যের বাঁধুনি, শব্দের গাঁথুনিকে সচেতন পাঠকের কাছে পৌছে দিতেই এই প্রয়াস। তাতে অন্তত দু'টো লাভ দেখি আমি। প্রথমটি, লিখতে বসলে লেখাটা আগানোর একটি পথ খুঁজে পাবেন আপনি। দ্বিতীয়টি, পড়তে হয় কীভাবে তা আমার মতো শিশুতোষ পাঠকের জানার গন্ডির বাইরে। দেখে দেখে রিডিং পড়ে যাওয়াই পড়া নয়। আদর্শ পড়ুয়াও পড়েন। তবে তিনি দেখেন, শোনেন আর ভাবেন তারচে' বহুমাত্রায় বেশি। সেই পড়বার ধরনধারন পাল্টে দেওয়ার কাজটিই অত্যন্ত সচেতন চিত্তে করেছেন সৈয়দ শামসুল হক।
বাংলায় লেখালেখির ওপর একাডেমিক কিংবা উচ্চমার্গীয় আলাপ বাদে বই কম। মধ্যমার্গ আর নিম্নমার্গের পাঠকদের দিকনির্দেশনা পাওয়ার পুস্তক কমই চোখে পড়েছে। এক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসু'র "কালের পুতুল"-এর নাম না বললে অকৃতজ্ঞতা হবে। বসু'র মতো ততোটা সহজভাবে লিখতে পারেন নি সৈয়দ হক। তবুও তাঁর প্রয়াস প্রশংসাযোগ্য।
আমি বইটি পড়ে পুরোপুরি রিলেট করতে পারিনি।শুরুতে লেখালেখি বিষয়ে লেখক বিভিন্ন আলোচনা করেছেন।লেখক মনে করেন লেখালেখি শেখার বিষয়।হুট করে বসলাম আর লিখে ফেললাম এমন হয় না।যদিও তিনি নিজে এ বিষয়ে সচেতন না থেকেই প্রায় দুই দশক লেখালেখি করেছেন।যেকোনো একটি লেখা লেখার আগে তা সম্পূর্ণ একটি রুপে লেখককে কল্পনা করে নিতে হয়,পরিকল্পনা করতে হয়,চিন্তাভাবনা করতে হয়।যখন সে তার বলার কথা সম্পূর্ণ রুপে গুছিয়ে নিতে পারে তার মস্তিষ্কে তখন ই লেখার কাজ শুরু।এরপর খসরা লেখা,পরিবর্তন পরিবর্ধন পরিমার্জন বা পরিস্থিতি সাপেক্ষে সম্পূর্ণ নতুন করে লিখতে হয়। লেখকের মতে মনের ভাব প্রকাশে অক্ষমতা বলে কিছু নেই।কারো যদি ক্ষুধা লাগে সে খুব সহজেই তার মনের ভাব প্রকাশ করে, এরকম একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন।যদিও এই ব্যাপারে আমি লেখকের সাথে একমত হতে পারিনি।কারণ আমি নিজেই অনুভব করি, এমন অনেক কথা আছে যা আমি অনুভব করি কিন্তু ভাষায় তা নিজের অনুভূতির মতো করে প্রকাশ করতে পারি না। লেখালেখির জন্য বিভিন্ন পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কে আমরা অনেক সময় অনেক কথা শুনে থাকি।প্রকৃতির সংস্পর্শে যাওয়া বা নির্জনতা এরকম অনেক প্রভাবকের উল্লেখ করে লেখক বলেন তার কাছে লেখালেখির জন্য এগুলো কখনোই মুখ্য নয়।মানুষের জীবনই তার জন্য লেখালেখির সবচেয়ে বড় আধার।সেটা হতে পারে যেকোনো পরিবেশে। লেখালেখির বয়স বলে কিছু নেই।কিন্তু অধিকাংশ লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে তার কৈশর থেকে তরুণ বয়েসের মধ্যেই।
দ্বিতীয় অংশে কিছু ছোটগল্প নিয়ে পোস্টমর্টেম করেছেন।গল্প শুরুর বাক্য থেকে গল্পে লেখকের অবস্থান অব্দি চুলচেরা গবেষণা করা হয়েছে।ক্রিয়াপদের ব্যবহারের ওপর ভাষার কি পরিমাণ প্রভাব তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন সৈয়দ হক।
শেষ অংশে আলোচনা করা হয়েছে কবিতা সম্পর্কে।যে বিষয়ে আমি একদম ই অজ্ঞ।ভেবেছিলাম এই বইটি পড়ে কবিতা পাঠ এ সাহায্য হবে।কিন্তু আগেই বলেছি আমি লেখকের সাথে সেভাবে রিলেট করতে পারিনি।কবিতা পাঠে অক্ষমতা আমার জীবনের অন্যতম বড় একটি আফসোস।একটি কবিতার বই হাতে নিলে অনুভব করি এক অসীম শক্তির উৎস আমার হাতে কিন্তু আমি তা ব্যবহার করতে পারছি না।আশা করি একদিন আমিও কবিতা পড়তে পারবো।এখনো নিরাশ হইনি। আর একটি বিষয় বই এ বিশেষ ভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।গল্প,উপন্যাস,কবিতা এগুলো যদিও আমরা মনে মনে পড়ি মূলত এগুলো উচ্চারণ করে শুনলে তার আবেদন অন্য রকম হয় আর তখন এর প্রকৃত বিষয় উপলব্ধি করা সহজ হয়-লেখক এমন মনে করেন।যদিও আওয়াজ করে বই পড়ার কথা আমি কল্পনা করতে পারছি না।
এ বই লেখকের পাশাপাশি পাঠকের জন্যেও সহায়তামূলক।একজন পাঠককে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন হতে সাহায্য করতে পারে।তবে আনন্দের জন্য যখন বই পড়ি তখন এতো বিশ্লেষণ করে পড়া আমার পক্ষে সম্ভব না।একটি গল্প বা উপন্যাস এ এমন অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে যা পাঠক হিসেবে আমি সচেতন ভাবে চিন্তা না করলেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে উপলব্ধি করেছি।বই পড়ার জন্য এই অনুভবই আমার কাছে জরুরি।
এসএসসি পরীক্ষার নামার আগে বিদায় অনুষ্ঠানের দিন যেমন প্রতিটা পরীক্ষার্থীকে একটি মলিন রজনীগন্ধার ডাঁটি, প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়ানো দুইটি কলম, স্কেল আর গালভরা কিছু কথা উপহার দেন শিক্ষকগণ; তেমনি যারা বাংলা ভাষায় সাহিত্যকর্ম রচনা করবেন বলে মালকোঁচা মেরে তৈয়ার হচ্ছেন আজকাল, উক্ত উৎসাহীদেরও পাঠক সমাজের পক্ষ থেকে প্যাকেজ উপহার কিছু দেওয়া উচিত।
প্যাকেজে থাকবে: ১. বাংলা একাডেমি অভিধান ২. মার্জিনে মন্তব্য ৩. পিঠে বাঁধার জন্য একটি ছালা ৪. লিখে পেট চালাবেন— এই স্বপ্ন ত্যাগের তীব্র অনুরোধ
সৈয়দ শামসুল হক যেমন করে লেখালেখির কলকবজা নিয়ে হাতে-কলমে, পয়েন্টে পয়েন্টে উদাহরণ দিয়ে পুরো আলোচনা সাজিয়েছেন; পর্দা সরিয়ে একেবারে নগ্ন, উন্মুক্ত করে দিয়েছেন পুরো সাহিত্যসৃষ্টির প্রক্রিয়াটাকে— এরকম মাস্টারক্লাস বাংলা ভাষায় অতি বিরল। ইংরেজিতেও স্টিফেন কিংয়ের ‘অন রাইটিং: আ মেমোয়াঁ অফ দা ক্র্যাফট’ বাদে অন্য কিছুর কথা মাথায় আসছে না। পুরো বইটা ছোট ছোট অনুচ্ছেদে লেখা। যাদের মনোযোগের ব্যাপ্তি ক্ষুদ্র, তাদের জন্য সুবিধা। পড়তে গেলে বিন্দুমাত্র বেগ পাবেন না। টেকনিকাল ব্যাপার নিয়ে অনেক আলোচনা আছে, কিন্তু কোথাও কঠিন লাগেনি।
বইটা অনেকদিন ধরে অন্য বইয়ের ফাঁকতালে রসিয়ে রসিয়ে পড়লাম, ঋদ্ধ হলাম। তৃপ্ত হলাম।
হক সাব, ভালো একটা কাজ করে গেছেন নবীন লেখকদের জন্য। আজকে বাঁইচা থাকলে, কোনোভাবে দেখা হইলে অবশ্যই আপনারে চা-বিড়ি খাওয়াইতাম। মরে গেছেন, কি আর করা। ওপারে টং দোকান-টোকান কিছু থাকলে আমার নাম বলে খায়া নিয়েন। আমি গিয়া দাম দিবোনে।
প্রায় আঠারো বছর ধরে একাডেমিকভাবে লেখাপড়া করার পরে যদি নিজেকে প্রশ্ন করেন, কী শিখলেন? আর যদি মাথা চুলকে উত্তর দেন, আমি বুঝতে পারছিনা তবে সেটা প্রশ্নকর্তা ও উত্তরদাতা ভেতরবাড়ি কাঁপিয়ে দিতে পারে।
সাহিত্য এমনই একটা ক্ষেত্র যেখানে আপনি নিজেকে এক্সপেরিমেন্ট করতে পারেন আপন মনে। তবে তার আগে আপনাকে হতে হবে মিস্ত্রী, আপনার লেখনশৈলীতে থাকতে হবে কিমিয়া। জীবনের যে কোন অবস্থায় নিজেকে যদি সাহিত্যের ছাত্র মনে হয় তবে 'মার্জিনে মন্তব্য' হতে পারে টেক্সটবুক আর সৈয়দ হক শিক্ষক। প্রশ হল, একজন শিক্ষক ছাত্রকে কিভাবে বোঝাবেন, ১৮ বছর ধরে নাকি জীবনের গল্পের ছলে ভেতরবাড়ি ঢুকে! হ্যাঁ, সেই অর্থে মার্জনে মন্তব্য যদি ধারণ করে পড়তে পারি তবে শব্দ সাজবে জীবনের স্বরে।
যারা লিখতে চান তাদের জন্য মার্জিনে মন্তব্যের মত এমন হাতে ধরিয়ে শেখানোর বই মেলা ভার :)
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন সুলেখক। তিনি তার নির্দিষ্ট একটা ভাবনা ছড়িয়ে দিতেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে। যেমন,'বৌ' নামে তার একটা সংকলন আছে যেটাতে এ বিশ্ব সংসারে যত রকমের বৌ আছে তাদের সবাইকে তিনি তুলে এনেছেন কেরানীর বৌ,কুলির বউ,কুষ্ঠরোগীর বৌ,দোকানীর বৌ,সাহিত্যিকের বউ। অথবা 'ভেজাল' নামে তার যে বইটি সেটি রচিত হয়েছে সংসারের যত রকম ভেজাল আছে তার সব নিয়ে। এভাবেই আসলে সংকলন তৈরি হয়। গল্প সংকলন কোনো ছন্নছাড়া জিনিস না। তার একটা প্যাটার্ন থাকে,মন দিয়ে খুঁজলে পাঠক একটা নির্দিষ্ট সময়ে লেখকের মানসিক অবস্থার আঁচও পেতে পারেন। এছাড়াও মানিক লিখতেন সহজ সাবলীল জীবনের ভাষায়,কাজটা তিনি সচেতনভাবে করতেন। মন দিয়ে পড়লে তার লেখা প্রতিটি লাইনের মাহাত্ম্যে পাঠক কেঁপে উঠতে বাধ্য।
কখনো কি মনে হয়েছে লেখক গল্প উচ্চারণ করতে পারেন? গল্প লেখা না,গল্প শোনানো। অর্থাৎ লেখক আমাদের পড়াচ্ছেন না,উচ্চারণ করাচ্ছেন লাউডলি। রবীন্দ্রনাথ করিয়েছেন। তিনি তার নিজ গল্প থেকে প্রথমেই আপন দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছেন,তৈরি করেছেন একজন অদৃশ্য বক্তা যিনি গল্প উচ্চারণ করছেন,রবীন্দ্রনাথের কথাগুলো যেন রবীন্দ্রনাথের নয় অদৃশ্য সেই বক্তার। পোস্টমাস্টার গল্প পড়ে আপনাদের কখনো মনে হয়েছে এটিতে কোন তৃতীয় ব্যক্তি ছিলো বক্তা ? যে অদৃশ্য? কখনো মনে হয়েছে এটি ওনার অন্যান্য অনেক লেখার মতোই প্রচন্ড শক্তিশালী একটি একতরফা প্রেমের গল্প?
রবীন্দ্রনাথের আগে কেউ গল্পকে চিত্রনাট্য আকারে বলতে পারেনি,তার আগে বাংলায় কেউ 'জীবিত ও মৃত' এর মতো ছোটগল্প লিখতে পারেনি যা নিত্য সংসারের ভেতরে থেকেও অতিপ্রাকৃত। তার আগে কেউ 'নিশীথে'র মতো সময়ের চেয়ে কয়েক দশক এগিয়ে পাপবোধকে ধরতে পারেনি। এমনকি 'নিশীথে' এ কার দিয়ে শেষ হওয়া এই যে নামের ধরন এর উদ্ভাবনও রবীন্দ্রনাথের করা। এই যে হাজার বছর ধরে, নন্দিত নরকে,ছবির দেশে কবিতার দেশে এমন এ কারান্ত নামকরণের শুরুই হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কয়েকযুগ পর। এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথেরও 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসের বাইরে খুব কম গল্প বা উপন্যাসে এই এ কারান্ত নামকরণের ব্যাপারটা দেখা গেছে। নিশীথে প্রথম অতিপ্রাকৃতিক এবং নামকরণের দিক থেকে ভিন্ন একটা ছোটগল্প এবং সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে এর মর্মার্থ।
ক্রিয়াপদের সঠিক ব্যবহার বাংলা ভাষাকে যে বিশ্বসাহিত্যে অনন্য করে তুলতে পারে তা জানতেন? সেটা দেখিয়েছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র তার বিভিন্ন রচনাতে। ইংরেজ লেখকদের হাতে থাকে তিনটি মাত্র অস্ত্র পাস্ট,প্রেজেন্ট,ফিউচার টেন্স। কিন্তু বাংলা সাহিত্যিকের হাতে এরচেয়ে ঢের বেশী থাকে সে অস্ত্র যা দিয়ে তিনি মহাকালের নির্দিষ্ট সময়কে শুধুমাত্র ক্রিয়াপদ দিয়েই ধরতে পারেন এবং শুধুমাত্র ক্রিয়াপদ দিয়েই কালের যেকোনো সময় থেকে পাঠককে ঘুরিয়ে আনতে পারেন। যেটা প্রেমেন্দ্র মিত্র করে দেখিয়েছেন জাদুকরের মতো। এমনকি তিনি তার 'তেলেনাপোতার আবিস্কার' গল্পে ভবিষ্যত ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে পাঠককে ঘুরিয়ে এনেছেন অতীতের চিরাচরিত এক না রাখা প্রতিশ্রুতি থেকে।
জীবনে যা কিছু অকস্মাৎ,আকস্মিক,অনিবার্য তা জীবনের নিয়মে নিত্য ঘটছে। কিন্তু লেখকের কলমে সেই একই জিনিস উঠে আসলে পাঠক গ্রহণ করবে না। সরল জীবনে অনেক রহস্যময় ঘটনা ঘটে যায়, লৌকিক জীবনের সেই পরাবাস্তবতাকে লেখকগণ বিপজ্জনক জিনিসের মতো করেই এড়িয়ে যান। একমাত্র ব্যক্তিক্রম দেখা গেছে জগদীশ গুপ্তের লেখায়। তিনি জীবনের এই সাধারন নিশ্চলতার মধ্যেও চমৎকারকে ধরেছেন তার 'দিবসের শেষে' নামক গল্পে। সকালে উঠেই পাঁচু নামের বাচ্চা এক ছেলের মনে হলো আজ তাকে কুমিরে নেবে। দিবসের শেষে সেই আকস্মিক মনে হওয়া অনিবার্য হয়ে উঠলো। কিন্তু পাঠক ভুরু কুঁচকালো না। লেখক সেভাবে বর্ণনা দেননি তার লেখায়। আঁটঘাট বেঁধেও কেউ কেউ প্রচলিত লেখনশৈলী থেকে যা কিছু বিপজ্জনক তার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হতে পারেন সাহসের সাথে।
ওপরের কথাগুলো আমার না। মার্জিনে মন্তব্য বইয়ে সৈয়দ শামসুল হক বিভিন্ন গল্পের এভাবে অ্যানালাইসিস করেছেন। ঘড়ির মতো তাদের খুলে দেখে কলকব্জা সম্পর্কে জেনেছেন। এখনকার বই রিভিউ যারা করেন তারা অবাক হয়ে যাবেন ওনার এই অ্যানালাইসিস পড়লে। আমরা অনেক ভুল জিনিস নিয়ে মাতামাতি করি,রূপক খুঁজি, অনেক লাইনকেই প্রতীকি বলে ভাবি। শামসুল ইসলাম কিন্তু এভাবে দেখেননি এগুলো। তার ব্যাখ্যা সরল। কিন্তু পড়ার পর গল্পটা সম্পর্কে আপনার পারস্পেকটিভ বদলে যেতে বাধ্য।
সৈয়দ শামসুল হকের মতে লেখা একটা শিল্প। যেমন নাচ,যেমন গান,যেমন ছবি আঁকা। কাউকে যদি হঠাৎ করে বলেন,"একটা গান গাও তো।" সে আঁতকে উঠে বলবে,"আমি কি পারি?" নাচ বা ছবি আঁকার বেলাতেও একই বিষয়। কিন্তু কাউকে একটা গল্প লিখতে বলেন,সে একটু মাথা চুলকে গর্বের সাথে বলবে,"তা আমি পারি বৈকি! ছোটবেলায় সবাই বলতো,আমার লেখার হাত আছে।" এখানেই শামসুল হকের আপত্তি। তার মতে,লেখা জিনিসটা এমন হুট করে হয় না,আর হলে সাহিত্যের মান হালকা হতে থাকে। যেমনটা হরদম হচ্ছে আজকাল। এই আশংকা উনি আগেই করেছিলেন।
এমনভাবে প্রসঙ্গক্রমে তিনি তুলে এনেছেন লেখকের লেখার প্যাটার্ন,স্টাইলের প্রকারভেদ। কোন কোন লেখক মাথার ভেতর গল্পটা পুরো সাজিয়ে নিয়ে লিখতে বসেন,তারা লেখেন তরতর করে। কেউ বা লিখতে বসেন খাতা কলম হাতে,তারা অনেক কাটাকুটি করে একটা জিনিস দাঁড় করান। হস্তশিল্পীর মতো খুঁটে খুঁটে দেখেন,পরিবর্তন আনেন, ফেলে দেয়া জিনিসটাকেও যাচাই-বাছাই করেন।
এভাবেই ছোট ছোট অধ্যায়ে তিনি গদ্যের জাদু,লেখকের থেকে লেখার দূরত্ব,লেখার ভেতরে কিভাবে বিস্ফো*রক পুঁতে রাখতে হয় যেমনটা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ করেছিলেন 'লালসালু'র ভেতরে এসব সম্পর্কেও লিখেছেন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে। তিনি নিজে নাকি মাথায় আসা সবটা গল্প একদিনে লিখতেন না। কিছুটা রেখে দিতেন যাতে পরদিন তাকে কলম হাতে বসে থাকতে না হয়।
এমনই লেখা শেখার,বিভিন্ন লেখকের লেখার প্যাটার্ন,কে কোন সময়ে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন,কেউ ত্রিশ দিনে উপন্যাস নামিয়ে ফেলতেন আর কেউ সপ্তাহে লিখতেন মাত্র একটা লাইন। কিভাবে সাহিত্য একটা মিস্তিরির নিপুণতা এবং শিল্পীর প্রতিভার সংমিশ্রণে তৈরি হয়। কিভাবে সেটা একটা চারপেয়ে চেয়ারের মতো দাঁড়ায় একটুও নড়বড় না করে। কিভাবেই বা জয় করে পাঠকের মন,সময়,কাল। লেখক কিভাবে চিত্রশিল্পীর মতো রঙের আঁচড় কাটেন তার সাদা ক্যানভাসে এসব খুঁটিনাটির সংমিশ্রণে চমৎকার সব উপমা দিয়ে যা আমাদের চোখের সামনেই থাকে তা দেখার ব্যবস্থা লেখক করেছেন আঁটঘাট বেঁধে।
আমার কাছে একটুও কঠিন লাগেনি বুঝতে। এবং এটা পড়ার পর লেখা জিনিসটাকে আমি অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে শুরু করেছি, সাহিত্যের এক বদ্ধ দ্বার আমার সামনে লেখক খুলে দিয়েছেন।
তবে না,সেই অর্থে এটি লেখা শেখার বই নয়। অন্তত লেখক সৈয়দ শামসুল হক তাই বলেছেন। এটা লেখক পাঠক দুজনের জন্যই। আমরা নিত্যদিন কতশত উপন্যাস পড়ে যাই যার অন্তর্নিহিত অর্থ যেটা লেখক বুঝিয়েছেন তা ধরতে পারি না। পাঠক এগুলো পড়লে লেখকদেরও শুধরে দিয়ে লেখার মান উন্নয়নে সাহায্য করতে পারবে,পাঠকই যদি মানহীন লেখা খায় তবে লেখকের একা এই ব্যাপারগুলো বুঝে কোনো লাভ হবে না বলে আমি মনে করি।
'মার্জিনে মন্তব্য' বইটা আমার কাছে খুবই হেল্পফুল লেগেছে,লেখা ���েখা ও শুধু চোখ বুলিয়ে যাবার বদলে সত্যিকার পড়তে শেখার ব্যাপারেও।
বিঃদ্রঃ কবিতার কিমিয়া নামে একটা অধ্যায় আছে যেটা আমি পড়িনি। কারণ একেতো আমি কবি না দ্বিতীয়ত,কবিতা পড়াও হয় না। তবে কবিতা পড়তে শুরু করলে অবশ্যই এই অধ্যায়টা পড়ে শুরু করবো এবং আমার মনে হয় কবিদের এবং কবিতার পাঠকদের জন্যও এটা খুবই হেল্পফুল হবে।
বিঃদ্রঃ(২) এই বইটা অবশ্যই সবার জন্য,কিন্তু একবারে নতুন পাঠকদের এটা হয়তো ভালো নাও লাগতে পারে। এখানে লেখক সহজ সাধারণ শব্দের সমার্থক শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন মস্তিষ্ককে তিনি সবসময় লিখেছেন করোটি। "করোটির অভ্যন্তরে লেখা তৈরি","করোটির অভ্যন্তরে লেখা রেখে দেয়া।" এইসব শব্দের সাধারণ অর্থগুলো পুরাতন পাঠকের ধরতে কোনোই সমস্যা হয় না। আসলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা ব্যাকরন পড়লেও এগুলো আমরা ওভাবে মনে রাখি না। কিন্তু আউটবুক পড়তে পড়তে এই ভাষাগুলো আয়ত্তে এসেই যায়। ভাষার জন্য একজন আমাকে বলেছিলো,এই বইটা তার কঠিন লেগেছে। আমার কাছে অবশ্য তা লাগেনি মোটেও।প্রতিটা লাইন,প্রতিটা ব্যাখ্যা লেখালেখির ওপর এবং প্রতিটা কলকব্জা বিখ্যাতদের গল্পের যে লেখক দিয়েছেন তা আমার কাছে অর্থপূর্ণ লেগেছে। যদি মন দিয়ে পড়েন তিনশ পাতার এই বইয়ে এক লাইনও মনে হবে না বাড়তি মেদ আছে।
শুধু উঠতি লেখক নয়, রুচিশীল পাঠকদের জন্যও বইটি পড়া আবশ্যক। তবে বইটির মূল বিষয়, উদ্দেশ্য দুর্দান্ত হলেও বিভিন্ন লেখকের গল্প হুবহু তুলে দিয়ে পৃষ্ঠা বাড়িয়ে বিরক্তির উদ্রেক করেছে। একই বিষয় বুঝতে ৪টি গল্পের উদাহরণ টানার কোনো প্রয়োজন ছিল না। অহেতুক পৃষ্ঠার অপচয়। . আর লেখকের কিছু পর্যবেক্ষণ খুবই আরোপিত মনে হয়েছে। বিশেষ করে কবিতার অংশে। উনি যেভাবে নামী লেখকদের কবিতার উদাহরণ টেনে সেটাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়ে সেটার কারিগরি দিক, সৌন্দর্য, কারুকাজ ইত্যাদি দেখানোর চেষ্টা করেছেন সেভাবে স্বয়ং কবিও ভেবেছেন কিনা সন্দেহ! অনেকটা এরকম: নামী লেখকের কবিতা, যেভাবেই হোক সুনাম তো করতেই হবে। . বইটির গদ্য সংক্রান্ত অংশটি এক কথায় দুর্দান্ত! অবশ্যই পড়া উচিত।
১০ দিনে লেখালেখি শিখুন বা হাতেকলমে শিখে নিন কবিতা লেখাটাইপ বই নয়, সৈয়দ শামসুল হকের বছরের পর বছরের পর্যবেক্ষন আর অভিজ্ঞতার যেন একটা প্রতিচ্ছবি পাই বইটিতে। মার্জিনে মন্তব্য ও গল্পের কলকব্জা অধ্যায়দুটি পড়ে জানলাম কিভাবে একজন সচেতন পাঠক গল্পের কাহিনীর জন্যই নয় বরং ভাষাগত ও চারিত্রিক বিশ্লেষণের উপর গুরুত্ব দেন। কবিতার কিমিয়া অধ্যায়টি পড়েছি একটু অগোছালোভাবেই , কেননা আমার মতে কবিতার স্বাদগ্রহণ ব্যাক্তিভেদে ভিন্ন, অভিজ্ঞতাভেদে ভিন্ন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, "কবিতা সৃষ্টি করে একটি রহস্য, সেই রহস্যটি ভেদ করতে হয়।একেকজন একেকভাবে সেই রহস্য ভেদ করে।"
'সব্যসাচী লেখক' - এই অভিধাটি শুধুমাত্র এবং একমাত্র শ্রদ্ধেয় সৈয়দ শামসুল হকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ও যথাযথ। তরুণ প্রজন্মের নবাগত অথবা প্রতিষ্ঠিত লেখক কিংবা কবিদের অনেক কিছুই জানার এবং শেখার আছে এই কিংবদন্তির রচনা থেকে। সেক্ষেত্রে তাঁর মহামূল্যবান বই "মার্জিনে মন্তব্য" নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে; পথ দেখাবে। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলা সাহিত্যে এটি এক অমূল্য সংযোজন। সবাইকে পড়বার আমন্ত্রণ।
বইয়ের নামঃ মার্জিনে মন্তব্য লেখকঃ সৈয়দ শামসুল হক বইয়ের ধরণঃ গবেষণাধর্মী প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশনাঃ অন্যপ্রকাশ প্রচ্ছদঃ কাইয়ুম চৌধুরী প্রথম প্রকাশঃ অমর একুশে বইমেলা, ২০০৫ পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৩১১ মুদ্রিত মূল্যঃ ৪৫০ টাকা
বিশ্বের প্রতিটি কর্ম-ই সুনির্দিষ্ট কিছু আইন-কানুন মেনে সম্পাদিত হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে, একটি কর্ম হিসেবে সাহিত্য-চর্চা বা লেখালেখি এই সাধারণ আইনের ঊর্ধ্বে নয় কোনোভাবেই। এ ক্ষেত্রেও কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে নজরদারি করতে হয়, মাথায় রাখতে হয়। নইলে সাহিত্য মানের দিকটি ঠিক রক্ষা করা হয়ে ওঠে না।
এই বিষয়গুলো সংক্রান্ত আলোচনা নিয়ে পাঠক মহলে হাজির হয়েছেন বাংলা সাহিত্যের সব্যসাচী কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করা কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক। সাহিত্যের নানা তাত্ত্বিক দিক উঠে এসেছে তার এই আলোচনায়। সাহিত্যের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ দিক— গদ্য ও পদ্যের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। এসব আলোচনা তিনি ক্রমাগত চালিয়ে গেছেন নিজস্ব ঢঙে, নিজস্ব ভঙ্গিমায়। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমানের মত বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা সাহিত্যিক থেকে শুরু করে ভিনদেশী সাহিত্যিকদের মধ্যে শেক্সপিয়ার, টি.এস. ইলিয়ট, হোমার, ডব্লিউ. বি. ইয়েটস, নেরুদা— কার কথা বাদ পড়েছে তার এই আলোচনায়? এদের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি গদ্য ও পদ্য রচনার সময় বিবেচনার যোগ্য নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।
বিভিন্ন প্রবন্ধের মাধ্যমে সাজানো এই বইটিতে শুরুতেই গদ্যের নানা কারসাজি সংক্রান্ত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। যে দুইটি প্রধান ভাগে পুরো বইটিকে ভাগ করা হয়েছে, তার মধ্যে এটা অন্যতম। গদ্য রচনার ব্যাপারে নানা তাত্ত্বিক আলোচনা এর মধ্যে উঠে এসেছে। তবে মূল আলোচনা কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সে সীমা ছাড়িয়ে হাতে-কলমে গল্পের নানা দিক অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর পাশাপাশি কোন কোন ক্ষেত্রে এ দেশীয় সাহিত্যিকেরা সচরাচর ভুল করে থাকেন, তার উপর বিস্তর আলোচনা করেছেন। এ দিক থেকে বইটিকে বেশ স্বতন্ত্র মনে হয়েছে আমার।
এবার আসি দ্বিতীয় ভাগের কথায়। বইটির দ্বিতীয় ভাগে কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। কবিতার নানা খুঁটিনাটি বিষয় উঠে এসেছে তার এই প্রাঞ্জল আলোচনায়। প্রথম ভাগের ন্যায় এ ভাগেও তিনি কিছু বিখ্যাত কবিতার আদ্যোপান্ত শবচ্ছেদ করবার কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পূর্ণ করেছেন তিনি। এ দিক থেকে চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না তার। এছাড়া এখানেও তিনি কিছু common mistakes নিয়ে ব্যবহারিক আলোচনা করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি কিছু বিখ্যাত কবিতার সাহায্য নিয়ে তুলনামূলক আলোচনার দিকে বেশি ঝুঁকেছেন। এ বিষয়টা তার এ বইটাকে আলাদা এক মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।
এবার আসি এর ভাষাশৈলী সংক্রান্ত আলোচনায়। উল্লেখ্য যে, এ বইটি আর দশটি সাধারণ গল্প/উপন্যাসের মত ���য় বলে এতে বিশিষ্ট কোনো চরিত্র নেই। তাই এ সংক্রান্ত আলাদা কোনো আলোচনা যে থাকবে না, সেটাই তো স্বাভাবিক। যাক সেসব কথা। আবার কাজের কথায় ফিরে আসি৷ বলছিলাম ভাষাশৈলীর কথা। অত্যন্ত সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় এই বিষয়গুলোর আলোচনা করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন তাত্ত্বিক আলোচনা বেশ জটিল ও দুর্বোধ্য লেগেছে আমার কাছে। একই লাইন বারবার পড়ে অর্থ বুঝবার চেষ্টা করতে হয়েছে। কতটুকু বুঝতে পেরেছি, সে ব্যাপারে মাঝে মাঝে নিজেও সন্দিহান ছিলাম৷ যারা তাত্ত্বিক আলোচনা পড়তে কম অভ্যস্ত, তাদের কাছে বিষয়টা আরো দুর্বোধ্যতার জন্ম যে দিবে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। যারা বইটি এখনো পড়েননি, তারা এ বিষয়টা মাথায় রেখে পড়লে উপকৃত হবেন বলে আমার বিশ্বাস।
সর্বোপরি, বেশ সুখপাঠ্য একটা বই মনে হয়েছে এটিকে আমার। এ কথা অনস্বীকার্য যে, কিছু জটিলতা ছিল। পাশাপাশি এ কথাও সত্য যে, বইটি অনেক বেশি তথ্যবহুল ছিল। সাহিত্য অনুরাগী সকল পাঠকের জন্য, বিশেষত যাদের লেখালেখির প্রতি ঝোঁক রয়েছে, তাদের জন্য এটা অবশ্যপাঠ্য একটা বই বলে আমি মনে করি। লেখক, পাঠক নির্বিশেষে সকলে এটা পড়লে উপকৃত হবেন বলে আমার বিশ্বাস।
বাংলাদেশে ছোটগল্প নিয়ে খুব বেশি বই নেই। আমি পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প বইটি নিয়ে কাজ করার সময় ছোটগল্প নিয়ে যত ভালো বই লেখা হয়েছে বাংলা ভাষায় সংগ্রহ করেছি। তার মধ্যে এই বইটি বিশেষ। আমাদের ছোটগল্প চর্চায় সৈয়দ হকের অসাধারণ অবদান এই বই। সৈয়দ শামসুল হকের ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ আমার প্রিয় বইয়ের একটি। কিন্তু হকের যে বইটি বারবার পড়েছি এবং ভবিষ্যতেও পড়ব সেটি হলো ‘মার্জিনে মন্তব্য’। ছোটগল্প নিয়ে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাহিত্যে ছোটগল্প’ ও বীরেন্দ্র দত্তের ‘বাংলা ছোটগল্প: প্রসঙ্গ ও প্রকরণ’ উল্লেখযোগ্য হলেও বারবার পড়ার মতো বই একটিই—‘মার্জিনে মন্তব্য’।
যে কয়টি গল্পের ব্যবচ্ছেদ সব্যসাচী এই বইয়ে করেছেন তার সবকটি গল্পই পড়া ছিল এমনকি জগদীশ গুপ্তের গল্পটাও। কিন্তু এখানে সৈয়দ হক যেভাবে গল্পের কলকব্জা খুলে দেখালেন তাতে মনে হল ওই গল্পগুলো আমাকে আবারো পড়তে হবে। পড়া তো শুধু পড়া নয়, ভাবাও। তাই পুনঃ পাঠ প্রয়োজন।