এক মুসলমান ভাগচাষির তত্ত্বাবধানে বড় হয়ে উঠছিল একটি হিন্দু পরিবারের শিশু। ধর্মপ্রাণ সেই চাষী নামাজের সময় পাশে বসিয়ে রাখতেন তাকে। শিশুটির মনে প্রশ্ন এসেছিল- কী চায় তার দাদা রোজ রোজ আল্লাহর কাছে! দাদার কাছে জানতে পারে,- পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য চাইতে হয় অন্নবৃষ্টির আশীর্বাদ। চাইতে হয় জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, গাছপালা সকলের শুভ। এমনি করেই দিনে দিনে সেই ধর্মপ্রাণ মানুষটি ছোট মেয়েটির মধ্যে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছিলেন, মানুষ আর প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ককে। স্নেহ, ভালবাসা অনেক সম্পর্কের টানাপোড়েনে ঋদ্ধ সেই শৈশব আর শৈশবের প্রিয়জনদের হারানোর বেদনা আজও বহন করে চলেছেন লেখিকা।
"দাদার যা-যা আমি নিতে পারিনি ও পারব না তার মধ্যে একটা হল তার ধর্মবিশ্বাস। সে ছিল খুব নিষ্ঠাবান মুসলমান। আমি এখনও মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান কিছু হতে পারিনি, সম্ভবত হতে চাইওনি। আমার সাচ্চা মুসলমান দাদা খুব সুন্দর কণ্ঠে আজান দিত, বিচিত্র ভাষায় ফজরের নমাজের সময় পৃথিবীর সব মানুষের জন্য আল্লাহ্র কাছ দোয়া ভিক্ষা করত। জীবজন্তু, গাছপালা, কীটপতঙ্গের জন্যেও দোয়া ভিক্ষা করত। দাদাকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘দাদা, আল্লাহরে কী কইলি?' জবাবে দাদা বলে, 'কইলাম, খোদাতালা, দুনিয়ায় তুমি যাগোরে পাঠাইচ, তাগো জন্য বিষ্টি দিয়ো, অন্ন দিয়ো, তাগো পোনাইপানরে ভালো রাইখো। মানুষ, জন্তুজানোয়ার, গাছপালা, পোকামাকড় সলেরে ভালো রাইখো। যে মাইনষে চুরি করে, খুনখারাবি করে তাগো মাপ কইরো, তাগো সুবুদ্ধি দিয়ো।' আমি জানতে চাই, ‘দাদা, যারা হিন্দু, দুগ্গা কালী লক্ষ্মীপূজা করে, তাগরে আল্লাহ্ কী করব?' জবাবে দাদা বলে, ‘ও মা দয়া, তুই কি পাগুলনি! আল্লাহর সঙ্গে দুগ্গা লক্ষ্মীর কুন কাজিয়া নাই। বেহেশতে সগ্গলের মইধ্যে ভাব-ভালবাসা। কুন কাজিয়ার জায়গা নাই। ও সব মাইনষে করে। আমার বড় আকাঙ্ক্ষা হয় দাদার ওই ভালবাসার ধর্মটি অর্জন করার। কিন্তু সব কি আর অর্জন করা যায়!"
"দয়াময়ীর কথা"র সবচেয়ে বড় শক্তি এর সরলতা।এই স্মৃতিকথায় লেখিকা নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতাটুকুই শুধু তুলে ধরেছেন। দেশভাগ, রিফিউজি, দেশত্যাগ, মানুষের সারল্য, শ্রেণিভেদ, হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা, এক বালিকার বেড়ে ওঠা মায়াময় গদ্য আর তীব্র আবেগ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন সুনন্দা সিকদার। এটা শুধু একটা গ্রামেরই গল্প। আর সেই গ্রাম প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে পুরো উপমহাদেশের। রাজনীতির সামনে মানুষ এতো অসহায়!
দেশভাগের ফলাফল, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু যখন দেখলাম এই বইয়ের পটভূমি আমার গ্রামের দুই গ্রাম পরেই, তখন এটা পড়বার লোভ সামলাতে পারলাম না। কি আছে এতে? এক নারীর শৈশবের স্মৃতিচারণ। তবে শুধুই স্মৃতিকথা নয়, এতে লেখিকা খুব সুন্দর করে তৎকালীন সমাজের একটা চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলাদেশের আট দশটা গ্রামের মতোই দিগপাইত গ্রামের হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের সহাবস্থান, ধর্মীয় সংস্কার ও অপ(?)সংস্কারের মিথস্ক্রিয়া, গ্রামের মানুষের চিন্তাধারা, ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিপরীতে বর্ধিষ্ণু রিপুচি (রিফিউজি) মুসলমান সম্প্রদায়ের বেঁচে থাকার দ্বন্দ্ব, জমিদারের দুঃশাসন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুঃখভোগ - এসবই বইতে উপজীব্য। তবে যেমনটা শোনাচ্ছে, অতোটা কাঠখোট্টা তত্ত্ব ও তথ্যে পরিপূর্ণ নয় বইটি, নিখাদ সরলগদ্য। তবে অশিক্ষিত সমাজের সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি, প্রশ্নবিদ্ধ(বর্তমানে) সংস্কারের মাঝেও কিছু কিছু মানুষের জীবন দর্শন, সরল চিন্তা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি আশ্চর্য করেছে, যা এই বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর দিক।
অসাধারণ একটি বই। দেশভাগের সময়ে ধর্ম, দেশ, জাত এবং দেশভাগ সম্বন্ধে তৎকালীন মানুষের মনোভাব অনেকাংশে প্রকাশিত হয়েছে এই বইয়ে। সবচেয়ে অবাক লেগেছে সে সময়ের মানুষ এখনকার তুলনায় অনেক বেশী রক্ষণশীল হওয়া সত্ত্বেও তা তাদের মিলেমিশে থাকার ক্ষেত্রে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। বরং দিনে দিনে উদারনীতি প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে আমরা মিলেমিশে থাকার সক্ষমতা হারাচ্ছি।
যারা দেশগাঁয়ে বড় হয়েছেন তারা জানেন বিকেল বেলায় বাড়ির মুরুব্বিরা পাড়া ঘুরতে বের হোন। এক একদিন এক একবাড়ির উঠানে পিঁড়ি পেতে মুড়া পেতে বা জলচৌকিতে বসে জমে যায় নানান কথার খলবলানী। সেই সময়ে দাদী গোত্রীয় কেউ হয়তো বলতে শুরু করেন তার ছোটবেলার কথা।
এই বই পড়তে গিয়ে আমার সেরকম ফিল হচ্ছিল যেন সন্ধ্যার আগে দিয়ে বাড়ির উঠানে বসে অতি বয়সীবটের মতো কারো ছোট্টবেলার কথা শুনতেছি।
লেখিকা বলতে আমরা যা বুঝি দয়াময়ী আসলে সেরকম নন। তিনি তার জীবনের প্রথম দশ বছরের ঘটনাগুলোই শুনিয়েছেন এই বইতে। একেবারেই সাটামাদা নিজস্ব ভাষায়। তিনি নিজের আনন্দে নিজের গল্প বলে গিয়েছেন পাঠক টানার জন্য চটকদার হওয়ার চেষ্টা করেন নাই। এটা ভাল্লাগছে।
বাংলা ভাগ হওয়ার আগে তার বাবা-মা চাকরীসূত্রে অন্যত্র থাকতো আর তিনি বড় হচ্ছিলেন দীঘপাইত গাঁয়ে তার পিসির কাছে যাকে তিনি মা বলে ডাকতেন। সেই বয়সে দেখা গাঁয়ের মানুষ, তাদের জীবনাচরণ, ধর্ম-কর্ম, চাষ-বাস নানান দিক উঠে আসছে বইতে। দয়াময়ীর বয়স যখন দশ তখন তিনি পিসিমার সাথে দেশ ছেড়ে চলে যান। বহু বহু বছর পরে গিয়ে তিনি সেইসব স্মৃতি কাগজে কলমে ধরে রাখার প্রয়াস করেছেন।
ছোটবেলায় কাধে করে ঘুরানো একহিন্দু মেয়ের প্রতি কতখানি স্নেহ পোষণ করলে তাকে একনজর দেখার জন্য একজন মুসলমান চাষী তার হালের বলদ বিক্রির টাকায় পশ্চিমবাংলায় যাইতে পারে। এই ভালোবাসা কি ধর্ম দিয়া আলাদা করা যায় নাকি করা যায় দেশ ভাগ করে।
০১. সাম্প্রতিক সময়ে যখন 'মাছ, মাংস আর চাউলের স্বাধীনতা'র প্রশ্নে স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়েছে বলে দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ যে বলদামি মার্কা নাটকটা মঞ্চস্থ করেছেন, সেখানকার বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ৭৬ বছর আগের স্বাধীনতার দাবিতে দেশভাগ তৎকালীন মানুষকে কতটুকু স্বাধীনতা দিয়েছিল সে প্রশ্ন তোলাই বাহুল্য। সময়ের এত দীর্ঘ কালস্রোত পেরিয়ে যাবার পর দেশভাগের সুফল-কুফল ধারণাটায় আজ তেমন আর অস্পষ্টতা নেই, দেশভাগের সরাসরি স্মৃতি বহন করা শেষ মানুষটিও হয়ত আর বেঁচে নেই, ইতোমধ্যে তাঁর তিন প্রজন্ম পেরিয়ে যাবার কথা। সময় বা বংশ পরম্পরায় যাদের নিকট সেই স্মৃতিকাতরতার দগ্ধ অংশের পোড়া ছাইটুকুও হয়ত আর অবশিষ্ট নেই। আনাচে-কানাচে, হেথায় সেথায় সেই ছাইটুকু একটু আধটু থাকলেও তাতে হয়ত আজ আর পোড়া গন্ধটুকু নেই, আগুনের হল্কা নেই, বাতাসে হারিয়ে যাবার ভয়টা নেই— সেখানের পোড়া অংশের কালো ছাইয়ের রঙটুকুও হয়ত প্রায় সাদা হয়ে গেছে। অনেকটা যেন সুনীলের 'পূর্ব-পশ্চিম' উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মতো, যেখানে প্রতাপের মা মৃত্যুর আগমুহূর্তে ছেলেকে বলেন, সেই দেশে নিয়ে যেতে। প্রতাপের দেশের প্রতি মায়ের মতো টান না থাকলেও পূর্ববঙ্গের পদ্মার ইলিশের ঘ্রানটুকু স্মৃতি থেকে একেবারে মুছে যায় না, কিন্তু প্রতাপের ছেলে বাবলুর ইলিশের ঘ্রানটুকুর প্রতিও যেন দারুণ অনীহা, প্রচণ্ড বিরক্তি। প্রতাপের ছেলের মতোই একটা প্রজন্ম পেরিয়ে যাবার পর ইলিশের ঘ্রানের মতো যেন ম্লান হয়ে যায় দেশভাগের ইতিহাস, বয়ে চলা স্মৃতির দগ্ধ জ্বালাতন, ঘুমহীন চোখে অহর্নিশ দেশে ফিরে যাবার স্বপ্ন।
একটা সময় মানুষ হারিয়ে ফেলাটাকে স্বীকার করে নেয়, পুরাতন যা কিছু আছে ভুলে গিয়ে অথবা ভুলে থাকার চেষ্টা করে নতুন ভাবে বাঁচতে শিখে; এই বইয়ের লেখিকা সুনন্দা সিকদারও তেমনি একজন। তিনি ভুলে যাননি, ভুলে থাকার চেষ্টা করে ছয়টা দশক পাড় করে ফেলেছেন। শৈশবের দশটি বছর কাটিয়েছেন পূর্ববঙ্গের দিঘাপাইত গ্রামে। ১৯৫১ থেকে ১৯৬১ সাল। তার আগেই অবশ্য দেশভাগ হয়ে গেছে। তবুও দেশভাগের সুদূরপ্রসারী যে প্রভাববলয় তার বাইরে তিনি থাকতে পারেননি। সেই দশটা বছরের স্মৃতির গল্প, সেখানকার সহজ-সরল গ্রামীন মানুষের কথা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা, গাছপালা, পশুপাখি, ফল-পাকুড় আর পুকুরের গল্প— কোনোটাই বাদ পড়েনি সুনন্দা সিকদারের লেখা থেকে। এ যেন এক হৃদয় নিঙড়ানো স্মৃতিকাতরতা নিয়ে পরবর্তীতে বেঁচে থাকার আখ্যান। যেখানে বেঁচে থেকেও যেন সবকিছু হারিয়ে ফেলে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকা শুধু।
০২. মানুষের মধ্যে জটিলতাই মানুষকে টিকিয়ে রাখে, না হলে দিঘাপাইত নামের প্রান্তিক এক গ্রামের মানুষের সরলতা কেন তাদেরকে বেঁধে রাখতে পারে না? দেশভাগের পনেরো বছর পরেও সেখানকার মানুষ কেন দেশ ছেড়ে যায়? স্রেফ ধর্ম বিশ্বাস, রাজনীতি, নাকি মানুষের ওপর মানুষের সরলতা আর আস্থা হারানোই এর নেপথ্যের মূল কারণ? দেশভাগের ৭০ বছর উপলক্ষে তানভীর মোকাম্মেল 'সীমান্তরেখা' নামে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম করেছিলেন, সেখানে মানুষের স্মৃতিচারণ আর পরিস্থিতির বর্ণনা শোনে যেমন আবেগতাড়িত হতে হয়, তেমনি শিউরে উঠতে হয়।
সুনন্দা সিকদার তার স্মৃতিকথায় ওপার থেকে আসা কিছু মানুষের কথাও লিখেছেন, যারা পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু ছিলেন। তাদের গল্প পড়লে মনে হয় নিজ দেশ ছেড়ে এসে তারাও খুব বেশী সুখী ছিলেন না। পূর্ববঙ্গ থেকে যারা উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে গিয়েছিলেন, তাদের দুঃখ, দুর্দশার আর পরিণতির কথা যতটা বিভিন্ন লেখায় পাওয়া যায়, বিশেষ করে দেশভাগের কথা উঠলে মোটাভাবে তাদেরকে যতটা বর্ণনা করা হয়, ততটা ওপার থেকে যারা পূর্ববঙ্গে উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন তাদের চিত্রায়ন চোখে পড়ে না। আর কেন জানি না বাংলাদেশের লেখক, ঔপন্যাসিকদের দেশভাগের উপর তেমন লেখাও নেই, যতটা পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে। এর একটা কারণ হয়ত দেশভাগ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট; যা বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চায় বড় একটা পরিবর্তন নিয়ে আসতে পেরেছে।
সুনন্দা সিকদারের গদ্যভাষা খুব ঝরঝরে, টানা পড়ে ফেলা যায়। ছোট ছোট ঘটনাও কী মায়াময় ভঙ্গিতে ফুটে ওঠেছে প্রতিটি লাইনে। ইয়াদালিকাকা, আছর, মাজম দাদা, মোদি পাগুলনি, সুরেশ, পিসিমা ( যাকে সুনন্দা সিকদার মা বলে ডাকতেন) আরো কত সহজ-সরল মানুষগুলোই না বইয়ের পাতায় পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তাদেরকে ভালো না লেগে পারে না। যদিও এখানে মোটাদাগে দেশভাগের গল্প নেই, দেশভাগ পরবর্তী মানুষের আখ্যানই এখানে মূখ্য হয়ে উঠেছে, তবুও একটা গাঢ় ব্যথায় মনটা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বারবার মনে হয়, আহা! মানুষ হয়ে মানুষের সঙ্গে বিচ্ছেদ কত যন্ত্রণার।
দেশভাগ আমার নিকট এক ক্ষতের মতো, সে সময় আমি ছিলাম না, তার পঞ্চাশ বছর পর আমার জন্ম, দেশভাগের ইতিহাসের উপর খুব বেশি বইও পড়া নেই (ইচ্ছে করেই পড়ি না), তবুও দেশভাগকে আমার কাছে পূর্বজন্মের স্মৃতির মতো মনে হয়। এমন বই পড়লে মনটা বিষাদে ভরে ওঠে, ভিতরটা কেমন খাঁ খাঁ করে। মনে হয়, মানুষ হয়ে জন্মালেও আমরা কি সবাই সবসময় মানুষ হয়েই মরতে পারি?
" ঠাকুর , তুমি গাঁয়ের মানুষ । তুমি যদি বউ ,পোলা , মাইয়া নিয়া না খাইয়া মরো , আল্লা আমাগো বেহেশতের পথের দিকে ঘেঁষবার দিব না । "
বইটি পড়তে গিয়ে বারবার চোখের পাতা ভিজে উঠেছে । সেই বিচ্ছেদের দৃশ্যগুলো যেন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে , যেই বিচ্ছেদের উপরে আমরা যথাসাধ্য বানিয়ে চলেছি আমাদের আনন্দের ঘরবাড়ি । দেশভাগের মর্মপীড়া এই মাটিতে বোনা । এমনই বহু দয়াময়ীর আরও আরও মন ভার করে দেওয়া গল্প আমাদের বহন করে যেতে হবে ।
অসম্ভব মুগ্ধতা ছড়িয়েছিলো বইটা। 'দেশভাগ' একটা শব্দের মধ্যে মিশে থাকা মানুষের মনোজাগতিক, সামাজিক ইত্যাদি খুটিনাটি বিষশ আশায় উঠে এসেছে দয়াময়ীর কথা বইটাতে। সেক্ষেত্রে বলতে গেলে বইটা ভীষণ প্রাগমাটিক।
This is a very simple and yet very profound piece of writing. It could convey such beautiful and intricate ideas with such simplicity, perhaps because the narrator is a child. The book makes you ponder about life in a pre-partition India with its social and economic issues such as caste, religion, and untouchability. There is a constant tussle of dialectic forces at play; where on one hand, it shows that the Hindus and Muslims had obvious differences because of their religion and caste, and on the other about how they were united and accepting of each other despite the existence of these non-ocular sharp differences especially when it came to festival celebrations in the village and each other’s religious texts. The pre-partition space that this book inhabits is very complex. It is very successful in showing that the human emotions lie in a spectrum and one cannot bifurcate them in terms of binaries. Some spaces were inhabited by both Hindus and Muslims; this makes it all the more complicated. But, above all, I loved the book because it speaks to one through its honesty.
দেশভাগকে কেন্দ্র করে লেখা হলেও প্রাধান্য পেয়েছে ধর্মীয় গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িক টানাপোড়েন, সংস্কৃতি ও দেশপ্রেমের গভীর মানবিক সংকট। অতি সহজ, স্বচ্ছ ও হৃদয় নিংড়ানো ভাষায় লেখিকা তুলে ধরেছেন এক হিন্দু কন্যার(নিজ) স্মৃতিচারণ—যিনি মুসলিম সান্নিধ্যে থাকা হিন্দু পালিত মায়ের কাছে বড় হয়েছেন এবং অচিরেই দেশ ছেড়ে “ওপারে” পাড়ি দেবেন, এমন এক ভিন মাটিতে যেখানে নিজের অধিকারের প্রশ্ন জ্বলন্ত। গ্রামের মুসলমানদের ভালোবাসা ও সামাজিক সীমারেখার সহাবস্থান—“মা-ঠাকরণ” বলে ডাকলেও দাওয়ায় উঠতে না পারা, এই ছোট ছোট দৃশ্যের মধ্য দিয়ে তৎকালীন ধর্মীয় গোঁড়ামির সূক্ষ্ম বাস্তবতা উন্মোচিত হয়। দেশভাগের রাজনৈতিক সংকট ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছেদ মিশে গিয়ে বইটি হয়ে ওঠে এক সংক্ষিপ্ত, সহজ ভাষার, অথচ গভীরভাবে মানবিক আত্মকথন—যেখানে স্মৃতি, বেদনা আর দেশপ্রেম একাকার।
বড় সুন্দর করে প্রাণের কথা লিখেছেন দয়াময়ী। আমি তখন স্কুলে পড়ি, দয়াময়ীর কথা প্রকাশিত হল। আনন্দবাজার পত্রিকায় এই বইটিকে নিয়ে বিবিধ আলোচনা দেখলাম। নানা পত্রপত্রিকায় পাতার পর পাতা খরচ হয়েছে এই বইয়ের প্রশংসায়। বিষয়টিও সেই চিরন্তন গল্প, যা ছোটবেলা থেকে ঠাকুমা-বড়মার মুখে শুনে আসছি। নাড়ীর বাঁধন ছিঁড়ে যাওয়ার মর্মন্তুদ বেদনার গল্প- ''কি যে পাকিস্তান হল! সোনার সংসার আমার, সব হারিয়ে চলে এলাম''। অথচ, সেই বেদনার মধ্যেও রয়েছে একটা সুন্দর নস্টালজিয়া, সোনালী দিনের ঔজ্জ্বল্য, সমৃদ্ধির সাতকাহন- 'আমাদের জমিতে কত রকম���র ধান হত। একেকটা ধানের একেকটা নাম, একেক রকম দেখতে আর একেক রকম কাজ'। সেই একই গল্প- 'গ্রামের মুসলমানরা আমাদের খুব ভালবাসত, মা-ঠাকরণ বলে ডাকত, কিন্তু দাওয়ায় উঠতে পারত না, উঠোনে বসে কথা বলত'। সেই হারানো দিনের, যুক্ত বাংলার দিনের, ধুলো হয়ে যাওয়া সোনার গল্প, বাঙালির সেই আবহমানের রূপকথা, আমার আশৈশবের অবাক করা কাহিনী, আম্মা-বড়মার স্নেহসিক্ত সেই রতন, দয়াময়ী লিখেছেন সুন্দর ভাষায়। কাহিনীকে দিয়েছেন সাহিত্যের আবরণ। আমাদের প্রজন্মের কাছে যা ঠাকুমা-দিদিমার প্রাণের কথা, এই বই তারই সাহিত্যিক রূপ। বড় চেনা, বড় প্রিয়।