এক আত্মকথন। ছেঁড়া-ছেঁড়া ছোট-বড় স্মৃতিতে ভর করে মৃণাল সেন ফিরে দেখছেন যেন নিজের জীবনটাকে। প্রচলিত আত্মজীবনীতে তাঁর আস্থা নেই, আবার চোখ বুজে স্মৃতিকেও বিশ্বাস করেন না তিনি। আবছা আলোর মতো ফেলে আসা দিনগুলো যেমন মনে পড়ে, সেভাবেই লিখেছেন, সময়-এর পিঠে সওয়ার হয়ে। দীর্ঘ জীবনের সূত্রে তাঁর ছবির জগতের হাত ধরে সেই তিরিশ-চল্লিশের দশক থেকে বাকি গত শতক-ই প্রায় ঠাই নিয়েছে এ-বইয়ে। গুজরাতের বালিয়াড়ি বা গ্রামবাংলার দুই অনুভূতিময় নারীর জীবন-সৌন্দর্য নিয়ে তৈরি ভুবন সোম বা আমার ভুবন যদি মৃণাল সেনের ভাবনার দু’টি ভুবন হয়, এ-আত্মকথন তা হলে তাঁর ‘তৃতীয় ভুবন’।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার চা টা আর বৃহস্পতিবার রাতটা সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে আয়েসের। কারণ, একটাই। সপ্তাহে সবেধন নীলমণি ছুটিখানা যখন শুক্রবার, এর আগের দিন আমাদের মতো জরুরি সেবামূলক পেশাজীবীদের কাছে তাই চাঁদরাত। তেমন একটা চাঁদরাতে একটা পাঠ-প্রতিক্রিয়া না ভাগ করে কি থাকা যায়? পড়ে ফেললাম প্রবাদপ্রতিম ভারতীয় চিত্রপরিচালক মৃণাল সেনের আত্মকথা তৃতীয় ভুবন। এর আগে তাঁর চ্যাপলিন বইটি পড়েছিলাম। লেখনশৈলীর সাথে পরিচয় তখনই। জানতাম, আত্মকথাটি সুপাঠ্য হবে, আন্দাজ ভুল নয়৷ চলচ্চিত্র আর সাহিত্য সবসময়ই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সাহিত্যের সেরা কিছু সৃষ্টি যেমন চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে তেমনি চলচ্চিত্র নিয়েও লেখা হয়েছে অসাধারণ সব বই৷ চলচ্চিত্রকার-সুসাহিত্যিক একজন তো সবসময় উদাহরণ দেয়ার জন্য হাতের কাছেই রয়েছেন, সত্যজিৎ। মৃণাল সেনের আত্মকাহিনীটি পড়তে গিয়েই আসলে এসব ভাবনা মাথায় আসল কারণ তিনিও অবসরে প্রচুর বই পড়তেন, প্রচুর গল্পকে সিনেমায় রূপান্তরিত করেছেন আর লিখে গেছেন দারুণ কিছু প্রবন্ধ, আলোচনা ইত্যাদি। তাঁর পারিবারিক জীবনটা ছিল খুব মধুর। স্ত্রী গীতা সেনের সাথে আমৃত্যু অসম্ভব সুন্দর সম্পর্ক বজায় ছিল। ছেলে কুণাল এবং পুত্রবধূ নিশার সাথেও ছিল খুব দারুণ সম্পর্ক। সব মিলিয়ে সুন্দর একটা পারিবারিক জীবন কাটিয়ে গেছেন তিনি। প্রথম চলচ্চিত্র রাতভোর, যেখানে অভিনয় করেছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। যদিও মৃণালের মতে ছবিটি কিছু হয়নি। পরবর্তীতে অনেক চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র, দূরদর্শন চিত্র, নাটক পরিচালনা করেছেন, অসংখ্য মহৎ চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে গেছেন বিশ্বচলচ্চিত্রপ্রেমীদের৷ কান, ভেনিস, বার্লিনসহ বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র উৎসবের অভিজ্ঞতার সাথে রয়েছে গোদার, তারকভস্কি, অ্যান্ডারসন প্রমুখ মহান চলচ্চিত্রকারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার গল্প। আবার সত্যজিৎ, ঋত্বিক এর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন ছিল তাও বলেছেন অকপটে। তাঁর কাছে ঋত্বিকের অযান্ত্রিক ছিল সবচেয়ে প্রিয়, সত্যজিৎ এর সব কাজের চাইতেও! এই কথা পড়ে কঠোর সত্যজিৎপ্রেমী হিসেবে একটু মনঃক্ষুণ্ন যে হইনি, তা না৷ পরবর্তীতে আবারো সত্যজিৎ প্রসঙ্গ যখন এসেছে, লেখক এর মূল্যায়নে ধারণাটা বদলে গিয়েছে৷ আসলে সাহিত্য, চলচ্চিত্র এই দুই জগতে যাঁরা শীর্ষে তাঁদের মহৎ গুণের অভাব থাকে না। আর দুই শিল্পমাধ্যমেই সমান পদচারণা দরকার একজন সঠিক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য। বারবার অনুধাবন করি তা, নানান সুসাহিত্য পাঠের মাধ্যমে, অনবদ্য কিছু চলচ্চিত্র দেখার মাধ্যমে৷ মৃণালের আকালের সন্ধানে আর ইন্টারভিউ ও পড়ে সেই তালিকায়!
মৃণাল, পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা এবং পৃথিবীর সিনেমা সম্পর্কে জানতে চমৎকার একটা বই। আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা যারা পছন্দ করে তাদের বাদ দিলেও সিনেমা যারা পছন্দ করে তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
*বইটা গুডিতে কে অ্যাড করছে জানি না। নামটা বাংলায় লেখা উচিৎ ছিল।
মৃণাল সেন ও তার বন্ধুরা একটা ক্যাফেতে বসে আড্ডা দিতেন। বন্ধুরা হলেন হৃষীকেশ মুখার্জি, ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরী, ... । এরা সবাই প্রায় গণনাট্য সংঘের কোল থেকে বের হয়ে আসা। মৃণাল সেন বলছেন, গণনাট্য সংঘ না টেকার মূল কারণ কি ছিল। তবে সেটি এই বইয়ের মূল বিষয় না। মৃণাল সেনের সিনেমায় ফরিদপুর তথা তার মাতৃভূমি অপেক্ষা বেশি আছে চারণভূমি কোলকাতা, তার ভাষায় এল দোরেদো। এই যে কোলকাতাকে তিনি দেখেছেন, বিশ্বযুদ্ধ-মন্বন্তর-দেশভাগ, এবং তার পরের ষাটের দশকের অগ্নিস্ফুলিঙ্গময় দিনগুলির মধ্যে বা সত্তরের পরে ইমার্জেন্সির মধ্যে সেগুলি তার কাজের মধ্যে বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে। খুব ছোটবেলায় ফরিদপুরের বাড়ির উঠানে যে উড়োজাহাজ দেখেছিলেন, সেই দৃশ্য ব্যবহার করেছেন "আকালের সন্ধানে"র মধ্যে। আকালের সন্ধানে নিজেই একটা মেটাসিনেমা, সিনেমার মধ্যে সিনেমা। বাইশে শ্রাবণ থেকে মৃণাল সেনের শুরু, কোন বাইশে শ্রাবণ? যে কোন তারিখ হতে পারে। কিন্তু তারিখ এটি ই। উনিশে এপ্রিল যেমন একটা তারিখ, বা ১৫ই আগস্ট। একদিন প্রতিদিন, খারিজ ও খন্ডহার নিয়ে অনেক কথা আছে। গল্পগুলি সিনেমাগুলি নিয়ে আগ্রহ তৈরি করে। লেখাগুলো খাপছাড়া ধরনের আছে, তবে কেন্দ্রে আছে কোলকাতা ও মৃণাল সেনের সিনেমা। যদিও উনি ছবি করেছেন গ্রামীণ জীবন নিয়ে, উনাকে আপাত ভাবে খুবই নাগরিক মনে হয়। সত্যজিৎ রায়ের সমসাময়িক বিধায় একে অপরের সমালোচনা করেছেন, তর্ক বিতর্কে মেতেছেন, সেগুলির বিক্ষিপ্ত অংশ আছে। সত্যজিতের সবচেয়ে প্রিয় ছিল, "অপরাজিত"। স্মিতা পাতিল কে খুব পছন্দ ছিল তার, স্ত্রীর চোখের সাথে স্মিতার চোখের মিল এর কথা উল্লেখ করেছেন। স্ত্রী ছিলেন অভিনেত্রী। বইটায় একটা দারুণ চিঠি আছে গীতা সেন (তার স্ত্রী)কে লেখা, আকালের দিনের কিছু সিকোয়েন্স কীভাবে তৈরি হয়েছিল সেগুলি নিয়ে, পুরো বইটার শ্রেষ্ঠ অংশ সেটুকু। গঙ্গার ব্রিজের উপরে স্ত্রীকে চুমু খেতে গিয়ে যে বইটা হাত থেকে পরে গিয়েছিল তা হলো, দ্য কেস ফর কমিউনিজম...। এত কথা না লিখি, আনন্দ পাবলিশার্সের গোটা গোটা ফন্টে বই পড়তে আনন্দ আছে।
এই ছবিগুলির মধ্যে ভুবন সোম আমার ভালো মতন দেখা আছে। আর অপরিণত বয়সে দেখেছি কোলকাতা ট্রিলজির ৩টা, ডিডি - ৭ থেকে অল্প অল্প মনে পড়ে। সামনে সুযোগ পেলে ট্রিলজিসহ বাকিগুলি দেখা যায়।