গয়নার ফ্যাশন ফোটোশুটের সময় খুন হলেন বিখ্যাত অভিনেত্রী বিনোদিনী দেবী। সর্বভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'এজেন্সি'র কর্ণধার সুনীল সেনের হয়ে তদন্তে নামে ভাগনি তিতির, আর সহকারী রাজা চৌধুরী। রুবিক্স কিউব সমাধানের কায়দায় তদন্তের পরতে পরতে ঝলসে ওঠে ছ’টি অপরিচিত সারফেস। বিনোদিনী হত্যা রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে বহুমাত্রিক ফ্যাশন জগতের এক ঝলক দেখে ফেলেন পাঠকও।
ইন্দ্রনীল সান্যালের জন্ম হাওড়ার বালিতে, ১৯৬৬ সালে। নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ থেকে এম বি বি এস। প্যাথলজিতে এম ডি, পিজি হাসপাতাল থেকে।সরকারি চাকরির সূত্রে কাজ করেছেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মহাকরণের ডিসপেনসারিতে, লালবাজার সেন্ট্রাল লকআপ থেকে গঙ্গাসাগর মেলার হেল্থ ক্যাম্পে।বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত।প্রথম প্রকাশিত গল্প ২০০৪ সালে ‘উনিশকুড়ি’ পত্রিকায়।শখ: বই পড়া, ফেসবুকে ফার্মভিল এবং হ্যাপি অ্যাকোয়ারিয়াম খেলা, সুদোকু সমাধান।
বাংলাদেশ ও কলকাতার থ্রিলারের মধ্যে গঠনগত একটা বৈচিত্র্য আছে। এই বৈচিত্র্যটুকু আমার কাছে উপভোগ্য। কথাটা বললাম কারণ সেদিন একটা বইয়ের গ্রুপে কে যেন বলছিল আমাদের এখানকার লেখকেরা নিখাদ গোয়েন্দা গল্প লেখেন না। আমার মনে হয় ঢাকার পরিবেশ গোয়েন্দা গল্প বান্ধব নয় (এখানে আমি প্রাইভেট ডিটেক্টিভ বোঝাচ্ছি, পুলিশ প্রোসিডিউরাল নয়), যেটা কলকাতায় বেশ ভালোভাবেই সম্ভব। লাইফ সায়েন্সের ছাত্র বলেই কিনা আমার কাছে সান্যাল সাহেবের এই বইখানাও দুর্দান্ত লেগেছে। নিখুঁত পেসিং এর একটা মার্ডার মিস্ট্রি। এইখানে সেইখানে ভাষার অলংকরণ, কিছু ডাক্তারি টার্ম- স্বাদ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। আমসূত্র শেষ পর্যন্ত আর আম নিয়ে কারবারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, কিছুক্ষণ পরপর দিক বদলে রূপ নিয়েছে.... কিসের? পড়ে ফেলুন, বুঝতে পারবেন।
অনেকদিন পরে একটা ভাল গোয়েন্দাগল্প পড়লাম। ভাল মানে এজন্য না যে, গোয়েন্দা একজন ফেলুদা বা শার্লক হোমসের মত দুর্দান্ত চরিত্র--ইন ফ্যাক্ট--সুনীল সেন মনে তেমন একটা ছাপ রাখতে পারেনি, তার সহকারীদেরও আলাদা বৈশিষ্ট্য নেই। রহস্যও যে খুব জটিল তা নয়। কিন্তু গোয়েন্দা বা তার সহকারীদের অহেতুক বাগাড়ম্বর বা নাটকীয়তা নেই, মেলোড্রামা নেই, অবিশ্বাস্য অ্যাকশন নেই। হালকা একটু লেকচার আছে তবে সেটা সহনীয়। সবচেয়ে বড় কথা, সমকালীন রহস্য উপন্যাসগুলোর গল্পের গরু গাছে ওঠার মত এলোমেলো ভাব আর গোঁজামিল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে নিরেট ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ সহ একটা গোয়েন্দা গল্প লেখার জন্য লেখক সাড়ে তিন পাবেনই।
ইন্দ্রনীল সান্যাল এর দুটি মেডিক্যাল থ্রিলার আগে পড়েছি। এই ছোট্ট পকেট সাইজের এই ১৬৫ পাতার বইটিও নিরাশ করেনি। একটি হাই প্রোফাইল murder case এর তদন্ত চলছে। খুনের কেন্দ্রে যদিও একটি মেডিক্যাল mystery তাও এই গল্প Deception আর misinformation এর মধ্যে থেকে প্রকৃত রহস্যভেদ এর গল্প। কোন দৌড়াদৌড়ি নেই, কোন মারামারি নেই আছে শুধু মস্তিষ্ক যুদ্ধ। একদল সাসপেক্ট আর এক গোয়েন্দা এবং তার দলের মগজের লড়াই। কারা জেতে এই নিয়েই বই। খুব ভালো লাগলো পড়ে। এরকম শান্ত নিরুদ্বেগ গল্প ভালো লাগলে পড়তে পারেন। ছোট থ্রিলার হিসেবে বেশ ভালো।
গল্পের একটি দিক খুব ভালো লেগেছে তা হল গল্প বলার ধরন। খুবই সিনেম্যাটিক। এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে transition খুব সুন্দর। আর যেহেতু গল্প একটি হাই প্রোফাইল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকে কেন্দ্র করে তাই দৃশ্য গুলি খুবই জীবন্ত আর রঙিন। পড়তে পড়তে গল্পের well-decorated, fashion-savvy background গুলোতে একদম হেঁটে চলে বেড়াচ্ছেন মনে হবে।
P.S: গল্পের শেষে দুম করে সব তথ্য গুলোকে জুড়ে ফেলে সব সমাধান করাটা কেমন যেন ঠিক গুছানো লাগলো না। কি যেন একটা ইয়ে missing। বাকি সব ভালো লেগেছে।
দারুন একটা মিস্ট্রি থ্রিলার। পড়তে পড়তে বারবার ফ্যাশন আর হিরোইন মুভির কথা মনে আসছিলো। একে তো শোবিজ জগতের অন্ধকার অধ্যায় একটা ইন্টারেস্টিং টপিক, তার উপরে কাহিনীর দুর্দান্ত গতি সবমিলিয়ে এক বসায় পড়ে ফেলার মতো উপন্যাস। এত ভালো একটা বইয়ের আরো মনোযোগ পাওয়া উচিত ছিল।
শুরুটা একটু কেমন কেমন হলেও পরে কাহিনী গতি নেয়, যা উপভোগ্য। তবে মাত্রাতিরিক্ত 'আম' রেফারেন্স ব্যাবহার ভালো লাগেনা। তিতির প্রথম থেকেই রাজাকে প্রায় সব বিভাগেই টক্কর দিচ্ছে সেটাও বেমানান, বরং ওভারস্মার্ট তিতিরের জায়গায় শিক্ষার্থী তিতিরকে পেলে দারুন লাগতো। যাইহোক, পড়তেই পারেন কারণ ইন্দ্রনীল বাবুর লেখা খুব মসৃণ। Happy reading.
A compact, pacy and contemporary Bengali novel, that actually tackled quite a few topics within the frame of a mystery. At times the red-herrings were too many, but eventually everything was tied up. Recommended.
❛ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ পাকা জামের শাখায় উঠি রঙিন করি মুখ।❜ লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনের জমকালো দুনিয়ার সুপারস্টার বিনোদিনী ওরফে ❛কুইন বি❜। সত্তরের দশকে মিস ক্যালকাটা, মিস ইন্ডিয়া এবং সবশেষে মিস ইউনিভার্স জয়ী গ্ল্যামার হিরোইন। বিনোদন দুনিয়ার রেট্রো যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত লাখো দর্শকের নয়নের মণি হয়ে থাকাটা চাট্টিখানি কথা নয়। এর পেছনের গল্পটাও সরল বক্র রেখায় মিলিত। কথা হলো এই সুন্দরী, বিখ্যাত বিনোদন কর্মী বিনোদিনী মা রা গেলেন তার ফটোশ্যুট শুটিংয়ের ফ্লোরে। অন্তিম মুহূর্তে বলে উঠলেন, ❛আম... আম.... আমিই দায়ী❜ - কী মানে হতে পারে এর? নদীয়ার পলাশীর ছোট্ট গ্রামে জন্ম নেয়া এক নারীর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সমাপ্তি কেন মাটিতে লুটিয়ে হলো? সাধারণ মৃ ত্যু মানতে নারাজ চিকিৎসক। ❛হাই প্রোফাইল কেস❜ তাই সরকার, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হ্যাপা বেশ। যতো দ্রুত সম্ভব এর সুরাহা করতে হবে। ক্লোজড রুমে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন তাই সে সময় উপস্থিত সকলেই সাসপেক্ট। তদন্ত ঠিকমতো না এগোলে অপ রাধী পালাবে নির্ঘাত। এদিকে সমস্যা ঘটনাস্থলে উপস্থিত সকলেই নামীদামী ব্যক্তি। এদের ইন্টারোগেট করা বিরাট ঝামেলা। দায়িত্ব তাই পড়লো পুলিশের সাথে গোয়েন্দা সংস্থা ❛এজেন্সি❜ এর কর্ণধার সুনীলের কাঁধে। কিন্তু বিধিবাম! ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে পা ভেঙে বসে আছেন তিনি। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অনুরোধ এসেছে। কলকাতা পুলিশের অফিসার তুষারের সাথে সুনীলকেই মূলত এই তদন্ত করতে হবে। যেহেতু তিনি রিটায়ার্ড হার্ট, উপায় তো ভাবতেই হবে। এজন্য পর্দায় আগমন সুনীলের সহকারী রাজা চৌধুরী এবং ভাগ্নে তিতিরের। তিতির, সদ্য স্নাতক শেষ করে এন্টারটেইনমেন্ট ম্যাগাজিনে ফ্রিল্যান্স করছে। এদের দুইজনকে দিয়েই বাইরের কাজ সারবেন সুনীল। আর মগজাস্ত্র চালাবেন ঘরে থেকে। সাসপেক্ট হিসেবে বা ঘটনার সময় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ছিলেন বিশ্বের সেরা দশজন ফটোগ্রাফারের একজন রামকুমার ওরফে আর্কেদে, কোরিওগ্রাফারের বিবি মেহতা, ফ্যাশন ডিজাইনার পাখি, হলিউডের মেকাপ আর্টিস্ট আমিশা, বিখ্যাত নাপতেনি সাক্ষী আগরওয়াল, ম্যানগো-র সিইও ইলা ক্যামেরুন। এদের সাথে তাই কৌশলে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে মূল তথ্য যাচাই করে রহস্য সমা��ান করতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে সহজ হলেও বেশ কঠিন একটা কাজে নামলেন সুনীল ও তার দল। লাভের একটু লাভ মাঝে দুইদিনের বন্ধ ডাকায় ফ্যাশন শো পিছিয়ে গেল এবং সময় পাওয়া গেল। সাক্ষাৎকার (কিংবা তদন্ত!) নিতে গিয়ে দেখা গেল বিনোদন জগতের এই ঝকঝকে আলোর নিচে কেমন অন্ধকার আছে। উঠে এলো অনেক তথ্য। বলা যায় প্রত্যক্ষদর্শী প্রত্যেকেরই হয়তো মোটিভ আছে বিনোদিনীকে খু ন করবার। সবাই মিলেই কি ঘটনাটা ঘটালো? না কি একাধিক ব্যক্তি আছে? তদন্তের বিষয়। মজার ব্যাপার এই পুরো তদন্তে মিডল টার্মের মতো করে একটা জিনিসকেই কমন নেয়া যায়। সেটা হলো ❛আম❜! বিনোদিনীর পলাশী গ্রামের আম, রামকুমারের আমতা, আমন্ড, ম্যানগো কোম্পানি, পাখির ❛আম্রবর্ত❜ জুয়েলারি, আমিশার পেইজলি- সবখানেই আমের ছড়াছড়ি! আমের সাথে তবে বিনোদিনীর সম্পর্ক কোথায়? খুঁজতে হবে, মগজাস্ত্র করতে হবে প্রয়োগ, তবেই হয়তো মিলবে আসল অ প রা ধী। অনেক সূত্র আছে, সাক্ষীদের নিজস্ব মন্তব্য আছে, আছে দোষী হিসেবে আরেকজনকে দাবী করার ব্যাখ্যা তবে এরমধ্যে কি আমসূত্রটা দেখা যাবে ক্লাইম্যাক্সে? একদিন বাদেই পর্দা উঠবে ❛ম্যানগো❜ এর আয়োজিত ফ্যাশন শো এর যেখানে উন্মোচন করা হবে পাখির তৈরি জুয়েলারি যার থিম আম। এরমাঝে রহস্য সমাধান করতে পারবে তো? পাঠ প্রতিক্রিয়া: ফলের রাজা আম। আমকে টক, মিষ্টি ফল হিসেবে গ্রীষ্মকালে মজা করে খেতে খেতেও কখনো ভাবিনি আমেরও ম্যালা ইতিহাস থাকতে পারে। বা, আম নিয়েও আদ্যোপান্ত উপন্যাস হয়ে যায়! ❝আমসূত্র❞ নাম শুনে কিছুটা আন্দাজ করা যায় আম নিয়ে কিছু একটা হবে হয়তো। সেই আন্দাজ থেকেই পড়া শুরু করলাম ইন্দ্রনীল সান্যালের লেখা উপন্যাসটি। গোয়েন্দা উপন্যাস আর থ্রিলারের মিশেলে বইটি মলাটবদ্ধ হয়েছে ১৬৫ পৃষ্ঠায়। আগাগোড়া আমে মাখামাখি। গোয়েন্দা গল্পের ন্যায় রহস্যের পরত ছিল বেশ। তবে মা র মা র কাট কাট অবস্থা ছিল না। পুরোটাই একটা জার্নি এবং বুদ্ধির খেল।। সাড়া জাগানো নায়িকার হ ত্যা রহস্য ভেদ ভেদ করতে করতে বহুমাত্রিক ফ্যাশন দুনিয়ার একটা ট্যুর বলা যায়। আমরা টিভিতে, স্ক্রিনে রঙ চং মাখা যেসব সুন্দরী, হ্যান্ডসাম হিরো-হিরোইনদের দেখি তাদের গ্ল্যামারের পেছনের রহস্য, উপরে ওঠার সিঁড়ির ধাপগুলোর কমনীয়তা কতটুকু সে ব্যাপারে ধারনা তেমন রাখি না। অন্দরের খবর অন্দরের লোকেরা ছাড়া কয়জন-ই বা জানে! আমাদের প্রিয় নায়ক-নায়িকা যাদের আমরা আদর্শ ভাবি, অনুসরণ করি তাদের জীবনটা কতটা স্বচ্ছ, সরল জানি? নাকি পুরোটাই প্রহেলিকা? উপন্যাসে লেখক রহস্যের সাথে বিনোদন দুনিয়ার খুঁটিনাটি না হলেও মূল চিত্র তথা কিছু বিষয় সামনে এনেছেন। এই অংশটুকু পড়তে আমার দারুণ লেগেছে। আম নিয়ে দেয়া বিভিন্ন তথ্য পড়তেও ভালো লেগেছে। বেশ স্মুথলি এগিয়ে যাচ্ছিল গল্প। কোনো বাড়তি বিষয় ছিল না বিধায় পড়তে ম্যা র মে রে লাগেনি। বিশেষ করে শেষের দিকে ফ্যাশন শো এর যে নিখুঁত বর্ণনা দিলেন, সেটা যেন স্বচক্ষে দেখছিলাম। দারুণ ছিল। বারংবার গরম গরম সিঙ্গাড়ার কথা গুলো পড়ে খেতে ইচ্ছে হয়নি এমনটা বলা ঠিক হবে না। তবে শেষের দিকের সমাধান করার অংশে লেখক কেমন যেন তাড়াহুড়ো করলেন। যদিও শেষের সমাধানে পার্ট বাই পার্ট পয়েন্ট ধরে সমাধান ব্যাখ্যা ছিল কিন্তু ব্যাখ্যাগুলো সব মনঃপুত হচ্ছিল না। একটু বেশীই কাকতাল হলো যেন। ব্যাখ্যাতেও যেন কোথাও কোনো সুতা ছিঁড়ে গেলো লাগছিল। বিশেষ করে কাঠের পুতুলের ব্যাপারটা লিংক করতে পারলাম না। এছাড়াও, বিনোদিনীর আইপ্যাডের শেষের ব্যাখ্যাটা খাপছাড়া। যে বিনোদিনী মাসে দুই বার কলকাতা আসে সেটার সাথে মূল রহস্য আর বিনোদিনীর বদ অভ্যেসের ব্যাপারটা ঠিক মিল খেলো না। যাক গে, এসব বাদে ফা ই টিং, গো লা গু লি ছাড়া সুন্দর একটা গোয়েন্দা গল্পের স্বাদ নিতে চাইলে ❛আমসূত্র❜ এর দুনিয়ায় ঢু দেয়া যায়। বিনোদন দুনিয়ায় সত্য মিথ্যার মাঝে আরেকটা সূক্ষ্ম বিষয় থাকে। সেখানে হয়তো গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের মানুষের নিখাদ পরিচয় মেলে। কিন্তু সত্য কথা হলো, ❛সেলিব্রেটিদের জীবন বোধহয় এরকমই। চকচকে। কিন্তু সোনা নয়। রাংতায় মোড়া। স্বপ্ন-ব্যাপারীদের জগৎকে এই জন্যই ❛টিনসেল টাউন❜ বলে।❜
সুপারস্টার বিনোদিনী। সাতের দশক থেকে শুরু করে এখন অবধি লাখো ফ্যানের হৃদয়ে কাঁপন তোলা 'কুইন বি'। কলকাতা, ভারত এবং গোটা ইউনিভার্সের সেরা সুন্দরী মুকুটটা জিতে নেওয়ার পর বলিউডে যখন পা রাখলেন, তখন থেকেই বিনোদন জগত আর বিনোদিনী নাম দুটি যেন সমার্থক। সেই কুইন বি আজ মৃত!
ইন্টারন্যাশনাল জুয়েলারি ব্র্যান্ড 'ম্যানগো' ভারতে, তথা কলকাতায় তাদের লঞ্চিং উপলক্ষে ফ্যাশন শো আয়োজন করেছে। শো'র স্টপার হিসেবে সাইন করেছিলেন বিনোদিনী। অনুষ্ঠানের দুদিন আগে ফটোশুটের স্টেজে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মারা গেলেন তিনি। সারা গায়ে অজস্র র্যাশ, শ্বাসরুদ্ধমৃত্যু দেখে বিষক্রিয়ার সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দিতে পারলো না কলকাতা পুলিশ। ভিসেরার কেমিক্যাল রিপোর্টটা পেতে দু'দিন লাগবে, তবেই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সমস্যা অন্য জায়গায়। বিনোদিনীর মৃত্যুর সময় যারা উপস্থিত ছিলেন, প্রত্যেকেই অত্যন্ত 'হাই-প্রোফাইল।' ভারতে সারা জাগানো ফ্যাশন ডিজাইনার পাখি, বিশ্বের সেরা দশ ফ্যাশন ফটোগ্রাফারের অন্যতম আর্কেদে, হলিউডে কাজ করা মেকআপ আর্টিস্ট আমিশা শেঠ, নামকরা হেয়ার স্টাইলিস্ট সাক্ষী আগারওয়াল, কোরিওগ্রাফার কাম গ্রুমার বিবি মেহতা, ম্যানগোর সিইও ইলা ক্যামেরুন - বিষক্রিয়ার সুযোগ এদেরই ছিল, আর এদের কাউকেই নিশ্চিত তথ্য ছাড়া পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেতে পেতে শো শেষ হয়ে যাবে, সন্দেহভাজনরাও কলকাতা ছেড়ে - ফুরুৎ!
উপায় একটাই। আন-অফিসিয়ালি তাদের সাথে কথা বলে সূত্র বের করতে হবে, এবং তা ফ্যাশন শো শেষ হবার আগেই। পূর্ব কলকাতার অফিসার তুষার বর্মণ হাজির হলো গোয়েন্দা সুনীল সেনের কাছে। কেসটায় সাহায্য করতে হবে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ। কিন্তু এখানে আরেক ফ্যাকরা! ছিনতাইকারী পা ভেঙ্গে দিয়েছে সুনীলের, ফ্ল্যাট ত্যাগ করা তার পক্ষে অসম্ভব।
সুনীলের ভাগনী তিতির সদ্য গ্রেজুয়েশন করেছে। ফ্যাশন ম্যাগাজিনের পার্টটাইম এসাইনমেন্টের বদৌলতে ম্যানগোর শো'তে আসা এই ছয় তারকার সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ছিল তার। তাকেই কাজে লাগালো সুনীল, সাথে জুড়ে দিল গোয়েন্দা-সহকারী রাজাকে। সুনীল হবে মস্তিষ্ক, তিতির-রাজা তার দু চোখ।
তদন্ত করতে গিয়ে জানলো দু-নেত্র, চারিদিকে যে আমের ছড়াছড়ি! ম্যানগোর লঞ্চ করতে যাওয়া জুয়েলারি লাইনটির নাম 'আমসূত্র', পাখি যার ডিজাইন করেছিল আম বা কলকির আকারে। বিনোদিনীর জন্ম পলাশির আমবাগানে, তার প্রিয় পানীয় আমারেত্তো, আর্কেদের বাড়ি আমতায়। মৃত্যুর সময় শুটিংস্পট থেকে চুরি হয়েছে বহুমূল্যবান 'আম্রাবর্ত' শোপিস। আর মৃত্যুর আগে বিনোদিনীর শেষ বাক্য, 'আম..আম..আমিই দায়ী'! 'আমিই দায়ী' বলেছিলেন, না আম-ই দায়ী? সে-ও এক রহস্য!
একটা রুবিকস কিউব, তার ছটি দিক। ছ’জনের ছুঁড়ে দেওয়া টুকরো টুকরো 'আম-সূত্র'গুলো মিলালেই মিলে যাবে কিউবের সব রঙ, সাথে উন্মুক্ত হয়ে পড়বে সুপারস্টার বিনোদিনীর জীবনের অজানা অধ্যায়।
ফেলুদা তোপসেকে লেখার সময় বলে দিতো, 'চরিত্রগুলো প্রথম পরিচয় করিয়ে দেবার সময় তার চেহারাটার বর্ণনা দিয়ে নিবি, তাতে পাঠকের চিন্তা করতে সুবিধে হয়'। আমসূত্র পড়ার সময় আমার সেই কথাটাই মনে পড়ছিলো। প্রতিটি চরিত্রকে লেখক এমনভাবে পরিচয় করিয়েছেন যে পুরো চিত্রটাই জীবন্ত হয়ে উঠছিল। গল্পটি গতিময়, শুরু করার পর থামতে ইচ্ছে করবে না। শেষ দৃশ্যে সবাইকে এক করে সমাধান জানিয়ে দেওয়ার পুরনো তরিকা বাদে আর কোনো আক্ষেপের সুযোগ নেই। লেখকের লেখনশৈলী উপভোগ্য। কিছু মেডিকেল টার্ম, বিনোদনজগতের আলোর ঝলকানি, আর টানটান রহস্যের ফাঁকে ফাঁকে পরিমিত হাস্যরস - বলা যায় 'ফুল প্যাকেজ'।
চরিত্রগুলো সব চোখের সামনে আছে, সূত্র একের পর এক উন্মোচিত হচ্ছে, পাঠকের কাজ কেবল গোয়েন্দার সাথে মাথা খাটিয়ে যাওয়া - সত্যি বলতে পড়ার ক্ষেত্রে এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় জনরা। কোনো একশনের দৌড়ঝাঁপ নেই, বাড়তি কোনো আদিখ্যেতা নেই, শুধু মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলো খাটিয়ে নিয়ে দারুণ একটা গল্প বলে গেলেন ইন্দ্রনীল সান্যাল। 'আমসূত্র' আমার মতে নিখাঁদ একটি মেদহীন গোয়েন্দা উপন্যাসিকা।
এই উপন্যাস টির খুব প্রশংসা শুনেছিলাম, আজ পড়ে ও ফেললাম, কিন্তু শেষ টা কেনো জানি ঠিক সাঠিস্ফাক্টরি মনে হলো না। কাহিনীর সূত্রপাত ও বিন্যাস বেশ জমজমাট, কিন্তু শেষ টা ঠিক জমলো না।