‘‘তিমির লক্ষ করছিল, তরুলতা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। আগের মতো সে আর কথা বলতে আসে না, সিঁড়ির কোনো ধাপে চুপচাপ বসে থাকে বা কুয়োতলায় বালতির পর বালতি জল তোলে আর ফেলে দেয়। দিনের পর দিন তরুলতা স্নান করে না, তার গায়ে ময়লার কালো আস্তরণ, জামা-কাপড় বদলায় না। তিমির একদিন ছাদে গিয়ে দেখল, তরুলতা আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে আছে, দুটি ঘুড়ি উড়ছে আকাশে, একে অপরকে কাটতে চাইছে, আর তরুলতা মাঝে মাঝে হাততালি দিয়ে চিৎকার করে উঠছে, ‘সুতো ছাড়... সুতো ছাড় পেটকাটি... আর একটু টান, টেনে ধর মুখপোড়া...’’’ এই অংশটি ‘তিমিরের হার্লেম’ উপন্যাসের একটি অংশ। রবিশংকর বলের কলমের ম্যাজিক তথাকথিত সাহিত্যের বাঁধাধরা সমস্ত নিয়ম খুব সহজেই ভেঙে চুরমার করে দেয়। এই ভিন্ন ধারার লেখকের উপন্যাস সমগ্র প্রথম খণ্ডে ধরা আছে ছটি উপন্যাস। যথাক্রমে:
রবিশংকর বল পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক। জন্ম ১৯৬২ সালে। বিজ্ঞানে স্নাতক। ২০১১ সালে দোজখনামা উপন্যাসের জন্য বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন।
গল্পগ্রন্থ দারুনিরঞ্জন রবিশঙ্কর বল এর গল্প আর্তোর শেষ অভিনয় জীবন অন্যত্র ওই মণিময় তার কাহিনী সেরা ৫০ টি গল্প
উপন্যাস নীল দরজা লাল ঘর পোখরান ৯৮ স্মৃতি ও স্বপ্নের বন্দর পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন মিস্টার ফ্যান্টম বাসস্টপে একদিন মিলনের শ্বাসরোধী কথা নষ্টভ্রষ্ট এখানে তুষার ঝরে দোজখনামা আয়নাজীবন আঙুরবাগানে খুন জিরো আওয়ার
কবিতা ত্রস্ত নীলিমা ঊনপঞ্চাশ বায়ু
প্রবন্ধ সংলাপের মধ্যবর্তী এই নীরবতা কুষ্ঠরোগীদের গুহায় সংগীত মুখ আর মুখোশ জীবনানন্দ ও অন্যান্য
সম্পাদিত গ্রন্থ সাদাত হোসেইন মন্টো রচনাসংগ্রহ
জাহিদ সোহাগ : মানে আমি বলছি এই কারণে যে, আমাদের বাংলাদেশে রবিশংকর বলকে চেনা হচ্ছে দোজখনামা দিয়ে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখবেন? মানে এখানেও একটা ট্যাগ আছে। রবিশংকর বল : এটা বলা কঠিন, তবু যদি বলো তবে আমি বলব, আমার "মধ্যরাত্রির জীবনী" উপন্যাসটা পড়া উচিত, "বাসস্টপে একদিন" উপন্যাসটা পড়া উচিত, "এখানে তুষার ঝরে" উপন্যাসটা পড়া উচিত। "স্মৃতি ও স্বপ্নের বন্দর", "ছায়াপুতুলের খেলা" অবশ্যই। এই কটা লেখা অন্তত। আর "পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন" এই লেখাটা।
শুরু হচ্ছে এক কুয়াশাময় ধূসর জগতের আখ্যান যার বাসিন্দা আপনি, আমি, সবাই। মহৎ কোনো ঘটনা নয়, রবিশংকর ছুঁতে চাচ্ছেন সবচেয়ে একঘেয়ে, সবচেয়ে সাধারণ সময় ও মানুষদের; যারা স্বপ্নতাড়িত ও নিয়তিতাড়িত, যারা পালাতে চায় কিন্তু পালাবার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিকে দাঁড়াতে হচ্ছে ব্যক্তির বিরুদ্ধে,ব্যক্তিকে দাঁড়াতে হচ্ছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। স্বপ্ন আর বাস্তবতার দেয়াল ভেঙে যাচ্ছে, সত্য ও মিথ্যার প্রভেদরেখা মুছে যাচ্ছে, অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় "মায়া - মতিভ্রম - দিবাস্বপ্ন - নাইটমেয়ার - ডিজায়ার - ডিসটোপিয়া - ইলিউশন" মিলে তৈরি করছে এক বাস্তবাতীত জগতের।
"শিল্প মানে মৃত্যুর সঙ্গে সংলাপ, সব বাস্তবতার মৃত্যু হলে শুরু হয় এই সংলাপ, সেই শ্যামসমান মৃত্যু, যাকে আমি একের পর এক ছবিতে আবিষ্কার করেছি, আর বাস্তবতার মৃত্যু মানেই তো স্বপ্নের শুরু, যে স্বপ্নের ভিতরে আমরা এক অন্য জগতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি,..." এ মৃত্যু ও এ যাত্রার গল্পই আছে "উপন্যাস সমগ্র"র পাতায় পাতায়। নিৎশে বলেছিলেন, " শিল্প আছে যাতে বাস্তবতার আঘাতে আমাদের মৃত্যু না হয়।" লেখকের ব্যক্তিগত এ অভিযাত্রা মৃত্যুর বিরুদ্ধে নিয়ত এক অসম কিন্তু স্পর্ধিত সংগ্রামের গল্প মাত্র।