পৃথিবীতে এমন অনেককিছু রয়েছে যার সমাধান বা রহস্য জটিল কিন্তু মানুষ তাকে নিত্যদিন ব্যবহারের ফলে সামান্য একটা জিনিস বলে জ্ঞান করে। যেমন : শূন্য (০)। খালি চোখে এটা শুধুই একটি সংখ্যা। আচ্ছা, শূন্য কি আদৌ কোনো সংখ্যা? এই শূন্যের মধ্যে রয়েছে জটিল রহস্য কিন্তু মানুষ এটা নিয়ে চিন্তা করে না। অল্পকিছু মানুষ যারা চিন্তা করে, তারা এর শেষ পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে না।
গণিতে ফিবোনাক্কি নামে একটা রাশিমালা আছে। এই রাশিমালা নিয়ে এখন বড্ড ভাবেন মনসুর সাহেব। বয়স তার অনেক হয়েছে। এই বছর দুয়েক পর স্কুল থেকে অবসর নিবেন। সেদিন মনসুরের নিজের শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছিল না। সকাল থেকেই চোখ দিয়ে একনাগাড়ে পানি বের হচ্ছে। ক্লাস নাইনের সেকশান বি-তে মনসুরের ক্লাস। ক্লাসে এসে গত বত্রিশ বছরের মধ্যে প্রথমবার রোল কল ছাড়াই তিনি ছাত্রদের পড়ানোতে মনোযোগ দেন। কিন্তু বিধিবাম, সকাল থেকে চোখ থেকে পানি পড়ার ব্যাপারটা এখনো বন্ধ হয়নি। বোর্ডে লিখতে পারছেন না তিনি। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। শরীরটা বেশ খারাপ বোধ হয়। ছাত্রদের দিকে মুখ ফিরে বললেন, ‘আজকে আমি ক্লাস করাব না, শরীরটা একটু খারাপ।’ ছাত্ররা তবু বোর্ডের দিকেই তাকিয়ে আছে। মনসুর ভাবল, ছাত্ররা তাকে এত ভয় পায় কেন? অথচ তিনি কোনোদিন কোনো ছাত্রের গায়ে হাত তোলেননি! ছাত্ররা বিস্মিত দৃষ্টিতে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে।
পরের ক্লাস পিরিয়ডে হেডমাস্টার এসে দেখেন মনসুর সাহেব চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে গিয়েছেন। অসুস্থ অসুস্থ লাগছে। হেডমাস্টার সাহেব মনসুরকে বাড়ি যেতে বললেন। সাথে প্রেশার মাপার কথা বলতেও ভুললেন না। মনসুর চলে যেতে হেডমাস্টার বোর্ডে গিয়ে দেখেন হিজিবিজি কীসব আঁকা। এমন জিনিস তিনি কখনো দেখেননি। ছাত্রদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলে এগুলো মনসুর স্যারের কাজ।
স্কুল থেকে ফেরার পর মনসুর সাহেব বাজারে গেলেন সেদিন। পাঁচ দিস্তা কাগজ নেওয়ার সময় দোকানী বদরুল তার সাথে একটু ভালোই রসিকতা সেরে নিল। ফেরার পথে ডাক্তার বজলুরের চেম্বারে প্রেশার মাপতে গিয়ে দেখেন সেখানে গল্পের আসর বসেছে। তাই ��র ঝামেলা না করে বাড়ির পথ ধরলেন। কিন্তু ফেরার পথে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। একটু দূরে দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আজেবাজে কীসব চিন্তা করছিলেন মনসুর সাহেব। এমন সময় তার ওপর বজ্রপাত হল। কীভাবে তা তিনি জানেন না, কিন্তু মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলেন। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্যই বটে। বজ্রপাতে আহত হয়ে তিনি পড়ে আছেন রাস্তায়। এমন সময় এক যুবকের আবির্ভাব। যুবকটা বেশ রহস্যময়। তার দাবি সে শূন্য থেকে এসেছে। এরপর থেকে সেই যুবক মনসুর সাহেবের আশেপাশে থাকতে লাগে, সবসময়ই। মনসুর তার নাম দিয়েছেন ফিবোনাক্কি। ফিবোনাক্কির দাবি সে শূন্য জগৎ থেকে এসেছে মনসুরকে তার অঙ্ক সমাধানে সাহায্য করতে। আসলেই কি তাই? এই শূন্য জগৎটাই বা কী? কেনই বা সেই যুবক মনসুরকে সাহায্য করতে এল? এসব জানতে হলে যেতে হবে হুমায়ূন আহমেদের “শূন্য”-তে।
হুমায়ূন আহমেদের লেখা সায়েন্স ফিকশন আগে পড়েছি কিনা মনে পড়ছে না। তবে পড়ে থাকলেও নিঃসন্দেহে এই বইটা সেগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা একটি উপন্যাসিকা। বইটিতে গণিতের বেশ কিছু ছোটোখাটো বিষয় গল্পচ্ছলে লেখক বলেছেন। যেহেতু বইটা কিশোর উপযোগী করে লেখা তাই অত্যন্ত সাবলীল আর সহজ। এমনিতেও হুমায়ূন আহমেদের লেখা সবসময়ই সাবলীল আর প্রাঞ্জল৷ গণিতের কিছু ইন্টারেস্টিং ব্যাপার আর ফ্যাক্ট লেখক তুলে ধরেছেন। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা তা হলো শূন্য নিয়ে কিংবা গণিতের কিছু বিষয় ভাবার একটা প্রয়াস আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। গণিত যে একটা ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট ভাবনা চিন্তা করার জন্য, তা তুলে ধরেছেন।
সাধারণত এমন ছোট কলেবরের বইয়ে চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তোলা কষ্টসাধ্য হয়। সবগুলো তো নয়ই, মূল চরিত্রগুলোকেই ঠিকঠাক সাজানো যায় না। সেই জায়গায় হুমায়ূন আহমেদ এই গল্পের সবগুলো চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাদের ব্যক্তিত্ব, আবেগ, কর্মকাণ্ড ফুটিয়ে তুলেছেন। এমন না যে প্রত্যেকটা চরিত্র নিয়ে আলাদা কাজ করেছেন তিনি, তবুও গল্পের মধ্যেই অসাধারণভাবে চরিত্রায়নের কাজটা আঞ্জাম দিয়েছেন। উপন্যাসিকাটিতে কিছু জায়গায় হাসির খোরাকও রয়েছে। মনসুরের জায়গা বেজায়গায় প্রাইম নাম্বার, ফিবোনাক্কি নিয়ে চিন্তাভাবনা, বদরুলের ঠাট্টা, রসিকতা, ফিবোনাক্কির অহেতুক কিছু কথাবার্তা, এসবকিছুতে হাসির খোরাক পেয়েছি। সবাই পাবে কিনা জানিনা, তবে আমি পেয়েছি। গণিত নিয়ে এমন সায়েন্স ফিকশন যে আদৌ লেখা সম্ভব তা হয়তো এই বই না পড়লে বুঝতাম না। কত সুন্দর আর সহজে পুরো গল্পটাকে সাজিয়েছেন।
হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য বইগুলোর মতো তার লেখা সাই ফাই বইগুলোও আলোচনা ডিজার্ভ করে। সাধারণত এখনকার নতুন পাঠকরা তাকে সাই-ফাই এর লেখক বলে জানেই না। অথচ হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলী, হিমু, বাঁকের ভাইয়ের বাইরে দারুণ সব সাই ফাইও লিখে গিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে তার লেখা “শূন্য” বইটার মতো মৌলিক সাই-ফাই আর আছে কিনা কে জানে।
পরিশেষে, আমরা এসেছি শূন্য থেকেই। এই শূন্যের মাঝেই আবার আমাদের বিদায় হবে। শূন্য একটা রহস্যময় সংখ্যা। ওহ্ আচ্ছা, শূন্য কি আদৌ কোনো সংখ্যা? কি জানি! আমি আমার গণিতে দূর্বল।
বই : শূন্য || লেখক : হুমায়ূন আহমেদ || পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৬২