ফ্ল্যাপে লেখা কিছু কথা আমার বাবা পুলিশ অফিসার ছিলেন। উনিশ শ’ একাত্তর সনের পাঁচই মে তাঁকে দেশপ্রেমের অপরাধে পাক আর্মি গুলি করে হত্যা করে। সে-সময় আমার ছোট ছোট ভাইবোনদের নিয়ে বরিশালের এক গ্রামে লুকিয়ে আছি। কী দুঃসহ দিনই না গিয়েছে। বুকের ভেতর কিলবিল করছে ঘৃণা, লকলক করছে প্রতিশোধের আগুন। স্বাধীনতা-টাধীনতা কিছু নয়, শুধু ভেবেছি, যদি একবার রাইফেলের কালো নলের সামনে ওদের দাঁড় করাতে পারতাম। ঠিক একই রকম ঘৃণা, প্রতিশোধ গ্রহণের একই রকম তীব্র আকাঙক্ষা সেই অন্ধকার দিনের অসংখ্য ছেলেকে দুঃসাহসী করে তুলেছিল। তাদের যুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, কোনো সহায় সম্বল ছিল না; কিন্তু শ্যামল ছায়ার জন্যে গাঢ় ভালোবাসা ছিল। আমার ‘শ্যামল ছায়া’ সেইসব বন্ধুদের প্রতি শ্রদ্ধা। -হুমায়ূন আহমেদ
Humayun Ahmed (Bengali: হুমায়ূন আহমেদ; 13 November 1948 – 19 July 2012) was a Bangladeshi author, dramatist, screenwriter, playwright and filmmaker. He was the most famous and popular author, dramatist and filmmaker ever to grace the cultural world of Bangladesh since its independence in 1971. Dawn referred to him as the cultural legend of Bangladesh. Humayun started his journey to reach fame with the publication of his novel Nondito Noroke (In Blissful Hell) in 1972, which remains one of his most famous works. He wrote over 250 fiction and non-fiction books, all of which were bestsellers in Bangladesh, most of them were number one bestsellers of their respective years by a wide margin. In recognition to the works of Humayun, Times of India wrote, "Humayun was a custodian of the Bangladeshi literary culture whose contribution single-handedly shifted the capital of Bengali literature from Kolkata to Dhaka without any war or revolution." Ahmed's writing style was characterized as "Magic Realism." Sunil Gangopadhyay described him as the most popular writer in the Bengali language for a century and according to him, Ahmed was even more popular than Sarat Chandra Chattopadhyay. Ahmed's books have been the top sellers at the Ekushey Book Fair during every years of the 1990s and 2000s.
Early life: Humayun Ahmed was born in Mohongonj, Netrokona, but his village home is Kutubpur, Mymensingh, Bangladesh (then East Pakistan). His father, Faizur Rahman Ahmed, a police officer and writer, was killed by Pakistani military during the liberation war of Bangladesh in 1971, and his mother is Ayesha Foyez. Humayun's younger brother, Muhammed Zafar Iqbal, a university professor, is also a very popular author of mostly science fiction genre and Children's Literature. Another brother, Ahsan Habib, the editor of Unmad, a cartoon magazine, and one of the most famous Cartoonist in the country.
Education and Early Career: Ahmed went to schools in Sylhet, Comilla, Chittagong, Dinajpur and Bogra as his father lived in different places upon official assignment. Ahmed passed SSC exam from Bogra Zilla School in 1965. He stood second in the merit list in Rajshahi Education Board. He passed HSC exam from Dhaka College in 1967. He studied Chemistry in Dhaka University and earned BSc (Honors) and MSc with First Class distinction.
Upon graduation Ahmed joined Bangladesh Agricultural University as a lecturer. After six months he joined Dhaka University as a faculty of the Department of Chemistry. Later he attended North Dakota State University for his PhD studies. He grew his interest in Polymer Chemistry and earned his PhD in that subject. He returned to Bangladesh and resumed his teaching career in Dhaka University. In mid 1990s he left the faculty job to devote all his time to writing, playwright and film production.
Marriages and Personal Life: In 1973, Humayun Ahmed married Gultekin. They had three daughters — Nova, Sheela, Bipasha and one son — Nuhash. In 2003 Humayun divorced Gultekin and married Meher Afroj Shaon in 2005. From the second marriage he had two sons — Nishad and Ninit.
Death: In 2011 Ahmed had been diagnosed with colorectal cancer. He died on 19 July 2012 at 11.20 PM BST at Bellevue Hospital in New York City. He was buried in Nuhash Palli, his farm house.
অপূর্ব! অপূর্ব! এই পুঁচকে বইটাকে মুক্তিযুদ্ধের খন্ডচিত্র বলা যায়। ৫ জন মুক্তিযোদ্ধার নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিতে কাহিনী বর্ণিত; যাদের কেউ কেউ একটু ভীত অথচ যুদ্ধ করার সময় সাহসী হয়ে ওঠেন, আবার যুদ্ধযাত্রার মধ্যপথে ভাবেন যুদ্ধের পরের জীবন নিয়ে।মাত্র ৪৮ পৃষ্ঠা, কিন্তু মনে হল নদীপথে মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকায় কত দীর্ঘ সময় চলে গেছে! ওহ! কী শীতল ছায়া, শ্যামল ছায়া!
এমন করে আমাদের দেশে সম্ভবত এই একজন লেখকই লিখতে পারতেন!
মাত্র ৪৫ পৃষ্ঠার একটা ছোট্ট নভেলা কিংবা বড় গল্প। অথচ কত্ত আবেদনময়। হুমায়ূনের সুপার পাওয়ার এটাই,গল্প টা তে অথেনটিক একটা অনুভূতি নিয়ে আসে। হুমায়ূনের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক লেখা পড়েছিলাম,আগুনের পরশমণি। সেটাও ছিল অতি মাত্রার ভালো। তবে শ্যামল ছায়া, আগুনের পরশমনির চেয়ে ভিন্ন বিভিন্ন দিক থেকে। তাও,দুইটা উপন্যাস ই তাদের নিজেদের জায়গা থেকে অসাধারণ।
কিছু কিছু লেখা আছে, পড়বার পর ইচ্ছে করে দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিয়ে লেখককে অভিনন্দন জানাই। 'শ্যামল ছায়া' হল এইরকম একটি লেখা! আমাদের বাংলাদেশীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানেই সীমাহীন এক আবেগ, আর কিছুই যার ধারেকাছেও হতে পারেনা। দিস্তা দিস্তা লেখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেখানে কেউ শুনিয়েছেন অসামান্য সংগ্রাম আর ত্যাগের গল্প, কেউ শুনিয়েছেন সম্মুখ যুদ্ধের রোমহর্ষক বর্ণনা আর কেউ কাঁদিয়েছেন পাঠককে। আবার অনেক লেখাই আছে যা শুধুই মুক্তিযুদ্ধের বিজ্ঞাপন,নেহায়েৎ ১৯৭১ নিয়ে লিখতে হয় বলেই লেখা। মুক্তিযুদ্ধ সেখানে পৌরাণিক কোন এক উপকথার যুদ্ধ(দুঃখজনক হলেও এমন গল্পের সংখ্যাই বেশী) আর এখানেই আর দশটা মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস এর সাথে 'শ্যামল ছায়া'র পার্থক্য।
'শ্যামল ছায়া' মূলত মুক্তিযোদ্ধা একটি দলের সদস্যদের প্রত্যেকের নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। কোন অতিকথন নেই, নেই মুক্তিযোদ্ধাবেশী 'দেবতা'দের বাহুল্যময় অর্চনা। এটা শুধুই অকুতোভয় একদল মানুষের গল্প, সময়ে সময়ে যাঁরা ভীতও হন! পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে আমিও তো নৌকায় ভ্রমণকারী এই দলটার একজন সদস্য, ওঁদেরই একজন সহযোদ্ধা! মাত্র একটি যুদ্ধের গল্প দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ যেন গোটা মুক্তিযুদ্ধকেই এই ৪০ টা পাতায় তুলে আনলেন। উপন্যাসে বর্ণিত মুক্তিযোদ্ধাদের মানবিক দিকগুলোর জন্যই তো আমরা তাঁদের সাথে আমাদের একটা আত্নিক বন্ধন টের পাই। স্টেনগানধারী একজন মুক্তিযোদ্ধা যদি হঠাৎ বজ্র হাতে ইন্দ্রদেব হয়ে উঠতেন, তাঁকে কি আমরা কোনদিন ছুঁয়েও দেখতে পারতাম?
মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক একটা গল্প। মুক্তিবাহিনীর কয়েকজন সদস্যের জবানবন্দি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণিত হয়েছে পুরো কাহিনী। এতে যেমন উঠে এসেছে যুদ্ধের পরিকল্পনা তেমনি যুদ্ধের কারণে তাদের ব্যক্তিগত টানাপোড়নও। হুমায়ূন আহমেদের লেখার ধরনটা একটু ভিন্ন লাগল এই গল্পে। তবে চিরাচরিত আবেগটা ছিল। সবমিলিয়েই গল্পটা ভিন্নধর্মী। এত সংক্ষেপে এত সুন্দরভাবে গল্পটা বলতে পারতেন বলেই হয়ত আমরা হুমায়ূনকে জাদুকর বলে ডাকি।
মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক চমৎকার একটি বড়গল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। বাস্তবসম্মত পরিবেশ সৃষ্টি, জীবন্ত চরিত্রচিত্রণ, মেদবিহীন গদ্য, আকর্ষণীয় সংলাপ, আবেগের যথাযথ প্রয়োগ। কিন্তু, গল্পের অন্তিম পরিণতি বর্ণনা করবার নির্মোহ সাহস দেখাতে পারেননি লেখক। শুধু দুঃখজনক কিংবা নেতিবাচক নয়, কখনও কখনও ইতিবাচক পরিণতি নির্মাণের জন্যেও সাহসের প্রয়োজন হয়।
উনিশশো একাত্তর... চারিদিকে ভয়াবহ যুদ্ধ! লড়াইয়ে যোগ দিচ্ছে দলে দলে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পিছে সকলের কারণ কি একই, স্বাধীনতা? কারো কি প্রতিশোধ বা প্রায়শ্চিত্ত হতে পারে না? পাঁচ জনের একটা দল মেথিকান্দার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। বারবার পরাজিত হয়ে গুজব ছড়িয়ে গেছে মেথিকান্দা মুক্তিবাহিনীর মৃত্যুকূপ। এইবার গুজব মিথ্যে প্রমাণ করে ছাড়বে তারা! যুদ্ধের সময় প্রিয়জনদের স্মৃতি, তাদের কাছে পাওয়ার আকুতি, মৃত্যু ভয়, স্বাধীন দেশের স্বপ্ন, প্রিয়জনদের হারানোর প্রতিশোধ, বিবেকের দংশন, মানসিক টানাপোড়েনে জড়জড়িত বইয়ের এক একটি চরিত্র। প্রত্যেকের আলাদা একটা গল্প আছে। আছে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার নিজস্ব কারণ। পড়তে যেয়ে বারবার মনে হচ্ছিল এইবার পারবে তো জিততে নাকি কোনো অঘটন ঘটবে। ছোট্টো সুন্দর একটা উপন্যাস। হাসান আলির অংশটা বেশি কষ্ট লেগেছে। রাজাকারদের আমরা ঘৃণা করি। তারই যোগ্য তারা। কিন্তু যখন রাজাকারই মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠে? জাফর চরিত্রটাও ভালো লেগেছে।
যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সব পক্ষের মানুষের ভাষ্য উঠে আসে শ্যামল ছায়ার একেকটা বিস্ময়কর প্যারাগ্রাফ বা ছোট্ট কোনো লাইনে।
গল্পটা গভীর অভিঘাত তৈরি করে মনে। যুদ্ধের গল্পে হুমায়ূন কেনো অন্যদের চেয়ে আলাদা, এখানেও তা বেশ পরিষ্কার বোঝা যায়।
ভিউপয়েন্ট চরিত্রের মাধ্যমে তৈরি হওয়া গল্পটা কি আরও বড় হলে ভালো হতো? না মনে হয়, যেখান থেকে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে, তা নিটোল। এমন বিস্ময়কর যুদ্ধের গল্প বিশ্বসাহিত্যেই বিরল।
কী আশ্চর্য , এই কথাতেই নৌকার ভেতর থেকে বহুকন্ঠের কান্না শুরু হয়ে গেলো ! ছোট ছোট ছেলেমেয়ের গলার আওয়াজও আছে । এই বাচ্চাগুলো এতক্ষন কী করে চুপ করে ছিলো তাই ভাবি । নৌকার ভেতর থেকে বাইরে এসে দাঁড়ালাম । মজিদ বললো , ভয় নাই ব্যাপারী , নৌকা কাছে আন ।
এই সব গল্পের রিভিউ লেখা খুব কষ্টের কাজ, চিনচিনে ব্যথা অনুভব হয় পড়ার সময়,পড়ার পর একটা ঘোরের মধ্যে থাকি,ব্যথাটা কমানোর জন্য অনেক ধরনের আবোল তাবোল চেষ্টা করি, পেরে উঠি না সবসময়,চোখের কোণ দিয়ে টুপ করে কখন দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে খেয়ালই করতে পারি না.
❝ শ্যামল ছায়া ❞ মূলত মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত হুমায়ূন আহমেদের একটা উপন্যাস। এটাকে ঠিক উপন্যাস বলা যায় না। মধ্যম আকারের গল্প বললে ভালো হয়। গল্পটির চরিত্র গুলোর নিজেদের মতো করে ভাবা কথা গুলা, স্মৃতিরোমন্থন গুলো, নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি গুলোই আলাদা আলাদা পর্ব আকারে গল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। সম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি তুলে ধরতে না পারলে ও আংশিক যতটুকু তুলে ধরতে পেরেছেন লেখক তাতে করেই মুক্তিযুদ্ধের কিছু ভয়াবহতা সম্পর্কে জানা যায়, পাকিস্তানিদের কিছু বর্বরতা সম্পর্কে জানা যায়।
এই যে স্বাধীনতা, এই যে ত্যাগ-তিতিক্ষা এই সব আসলে কিসের জন্য করেছিল বাঙালি বীর সন্তারেরা আমি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বারের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার আন্দোলনে যোগদান করে বুঝেছি। এতদিন যুদ্ধের বই পড়লেও সত্যিকার মানে বুঝতাম না। কেন মানুষ দেশের জন্য এতটা করল, কেন নিজের জীবন বাজি রাখতে গেলো। কিন্তু জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করার পর থেকে আমি বুঝি। সত্যিই স্বাধীনতা যে কতটা দরকার তা ব্যক্তিজীবনে হোক, সামাজিক জীবনে বা রাষ্ট্রীয় জীবনেই হোক ; সব জীবনে, প্রতিটা পদক্ষেপই স্বাধীনতা দরকার আমি মনে করি। শুধু দরকার না ভীষণভাবে দরকার৷
স্বাধীনতা মানুষের আরাধ্য থাকে সবসময়ই। পরাধীন দেশ, অন্যায়-অবিচার তেমনি নাড়া দিয়েছিলো আপামর বাঙালি জাতিকে। যে জাতি বীরের জাতি, যে জাতি লড়াই করতে ভয় পায় না। মুক্তিযুদ্ধের গৌরব গাঁথায় মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা আমরা জানি। শুনেছি তাঁদের যুদ্ধের গল্প, এখনো রয়ে গেছে সেইসব যুদ্ধের স্থান। এসব আমরা জানি। কিন্তু কখনো কি জানা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা সেইসব মুক্তিযোদ্ধাদের মনের কথাগুলো?
নয়মাস রক্তক্ষয়ী ছিলো যে যাত্রা সে যাত্রায় তাঁদের মনের অবস্থা কেমন ছিলো, তাঁদের মনে জমে থাকতো কত কথা,কত আবেগ! বলার মতো কেউ কি ছিলো সেথায়? যুদ্ধক্ষেত্রে মনে পড়তো প্রিয়জনের মুখ, তাঁদেরকে কাছে পাওয়ার তীব্র আকুলতা কত হৃদয় ভাঙা সেইসব গল্প। মাঝে মাঝে হয়তো তাঁদের মনে হতো আর কি দেখা হবে আর কি ফিরে যেতে পারবে তাঁরা ঘরে?
এরকম হাজার হাজার গল্প যুদ্ধক্ষেত্রে বিলীন হয়ে গেছে। কিছু কিছু হয়তো আমরা জানতে পেরেছি যারা জীবিত ফিরতে পেরেছেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাঁদের কাছ থেকে।
আজ বরং তেমন কিছু অনুভূতির গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের সময় এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যুদ্ধে যাওয়া কিছু মুক্তিযোদ্ধার মনের কথা। কিছু কিছু গল্প আছে যেগুলো তে জোর করে হাততালি দিতে হয়না বরং গল্পই বাধ্য করবে হাততালি দিতে “শ্যামল ছায়ায়” গল্পগুলো সাধারণ মানুষের কিন্তু এরা প্রত্যেকেই অসাধারণ। জীবন বাজি রেখে দেশের টানে ছুটছে এরা। সামনের গন্তব্য অনিশ্চিত কিন্তু মনোবল বেশ কঠিন।
বরাবরই মুক্তিযুদ্ধকে ফুটিয়ে তুলতে নানান সময় নানান কেউ দেখিয়েছেন অসামান্য সংগ্রাম আর ত্যাগের গল্প, কেউ দেখিয়েছেন সম্মুখ যুদ্ধের রোমহর্ষক বর্ণনা আর কেউ কাঁদিয়েছেন পাঠকদের। শ্যামলের ছায়ায় ঘেরা এই মাতৃভূমির টানে ঘরছাড়া কিছু তরুণ, ফেলে আসা দিন, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা। সময়টা বড় কঠিন। এদের জীবনের গল্প আরো অন্যরকম।
~আবু জাফর শামসুদ্দিন~
নৌকা ছাড়তেই রূপ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল।নৌকার ভেতরে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে কত কথাই মনে পড়ে আবু জাফর শামসুদ্দিনের। কুটকুট করে মশার কামড় খাচ্ছে সাথে। এই বিলের মধ্যে আবার মশা কোথা থেকে আসে? ভাবে সে। হাত-পা আর গায়ে কেরোসিন তেল মেখে মশার হাত থেকে বাঁচতে চায় সবাই। সে ভয়ে মাখে না সৌখিন মানুষ। সৌখিন হলেও মিলিটারি মিলিটারি শুনে আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো ভীতু সে নয়। আচমকা শুনলে একটু দিশাহারা হবে হয়তো, এর বেশি না। সোনাতলায় এক বার মিলিটারির সামনে পড়ে গিয়েছিল বন্ধু সতীশকে নিয়ে।
যুদ্ধটুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে সহযোদ্ধা হুমায়ূন ভাই জাফরকে এক দিন বাসায় নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করেছেন। তাঁর বোন জরীকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দেবেন নাকি। জাফর ভালো গান গায় জরীর মতোই।
~হুমায়ূন আহমেদ~
সারাটা দিন মন খারাপ ছিল তাঁর; এখন মধ্যরাত্রি, ছপছপ শব্দে কাদা-ভরা রাস্তায় হাঁটছে সবার সাথে। মনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরও বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। এত দিনেও হাঁটার অভ্যেস হল না। দলের সহযোদ্ধা আনিস এবং মজিদ কত নির্বিকার ভঙ্গিতেই না পা ফেলছে। এতটুকু ক্লান্ত না হয়েও তাঁরা দশ মাইল হেঁটে পার হবে; বিপদ হবে নিজেকে নিয়ে ভাবে হুমায়ূন। আরেক যোদ্ধা জাফরও হাঁটতে পারে না। তবে হুমায়ূনের মতো এত সহজে ক্লান্তও হয় না। সমস্ত দলটির মধ্যে নিজেকে সবচেয়ে দুর্বল ভাবে হুমায়ূন। শরীর এবং মনের দুটোই।
অবশ্য হুমায়ূন ঢাকা থেকে ভাই, বোন, বাবা, মা সবাইকে নিয়ে একনাগাড়ে ত্রিশ মাইল হেঁটে পৌঁছেছিল মির্জাপুর। পথের মধ্যে বোন পরী মারা গেল। হুমায়ূন মনের দিক থেকে দূর্বল মানুষ। মায়া ভর্তি মন।
~হাসান আলী~
"ও মনা দেহের ভিতরে অচিন পাখি অচিন সুরে গায় তার নাগাল পাওয়া দাও"
কেরামত ভাইয়ের কন্ঠে এই গান শুনে উদাস হতো হাসান আলীর মন। প্রথমে যোগ দিয়েছিল রাজাকারদের সাথে। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে হেরে গেছে সে।
এখন কাজ করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য। দলটাকে নৌকায় করে দাঁড় টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিরাপদ জায়গায়।
~ আবদুল মজিদ ~
ভালোয় ভালোয় ফিরে এলে আর যাবে না মজিদ কোথাও। সম্ভব হলে ফিরে যাবে ময়মনসিংহ। কিন্তু গিয়ে করবেটা কী সে? মা কোথায় আছেন কে জানে? বাবা বেচারা মরে বেঁচেছেন। কোনো দায়দায়িত্ব নেই। কিন্তু মজিদই বা কোন দায়িত্ববান সুপুত্রটি? বাবাকে ধরে নিয়ে গেল মিলিটারি, সে নিজে এলো পালিয়ে, অথচ নিশ্চিত জানে মায়ের কোনো সহায়-সম্বল নেই। বোনগুলি বোকার বেহদ। ফিরে ���িয়ে হয়তো দেখবে অল কোয়ায়েট অন দি ওয়েস্টার্ণ ফ্রন্ট। কেউ নেই, সব সাফ হয়ে গেছে। মন্দ হয় না খুব। বাঁধা-বন্ধনহীন বল্লাহারা জীবন। কী আনন্দ! কী অদ্ভুত সব কথা আসে মনে!
~আনিস সাবেত~
তাঁর মন বারবার বলছে যুদ্ধে হুমায়ূন মারা যাবে। কেনো এটা মনে হচ্ছে কে জানে! অথচ নিজে অসুস্থ হয়ে গেছে।
তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো একটা বাড়িতে। জ্বরে অচেতন অবস্থা। বাড়ির লোকজন অবশ্য খুব সেবা করছে। সহযোদ্ধারা চিন্তায়। প্রাণে বেঁচে গেলে রক্ষা। আনিস বিছানায় শুয়ে ঘোরের মধ্যে কত কী কল্পনা করছে।
/ পাঠ প্রতিক্রিয়া \
'শ্যামল ছায়া’ মূলত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কিছু মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকায় করে যুদ্ধে বের হবার সময় তাঁদের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো। অতীতের স্মৃতিগুলো কিংবা বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি।
কয়েকজন মানুষের নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ও তাঁদের যাত্রাপথের এক মন জুড়ানো গল্প। এ উপন্যাসে কোন অতিকথন নেই, নেই মুক্তিযোদ্ধাবেশী বীরদের বাহুল্যময় অর্চনার কোনো উত্তেজনাময় সম্মুখ যুদ্ধ। এটা শুধুই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের মনস্তাত্ত্বিক সময় তুলে ধরে। কিছু মানুষের গল্প, সময়ে সময়ে যাঁরা ভীতও হন! উপন্যাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো,এর গতিশীলতা এতোই চমৎকার যে ওই নৌকায় থাকা মানুষগুলোর মানবিক দিকগুলোর জন্যই তাঁদের সাথে একটা আত্নিক বন্ধন টের পাওয়া যায়।
সময়ের সাথে সাথে কারও হয়তো মনে হবে হাসান আলীর মতো সাহস দেখাতে। হুমায়ূনের মতো অন্যায়ের প্রতিবাদ ও ক্ষমার নিদর্শন জানানোর , কিংবা কেউ হতে চাইবে আনিস সাবেতের মতো সরলমনা চঞ্চলতাকে ঘিরে বেঁচে থাকতে। আবার কারও বা মনে দাগ কেটে যাবে শেষের চরিত্রটি যে প্রতিবাদ জানানোর শক্তি পেয়ে বসে।
একই সাথে শ্রদ্ধাবোধ জেগে উঠবে কমান্ডারের প্রতি। মনে দাগ কেটে যাবে সেই মুহূর্ত, যখন ভিন্ন এলাকার ভিন্নমতের মানুষেরা শত বাঁধাকে টপকিয়ে এসব মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে চেষ্টায় লেগে থাকেন। অনভিজ্ঞ হয়েও মুক্তিযোদ্ধাদের নানান তথ্য সরবরাহ করেন।
মূলত, উপন্যাসটিকে অনন্য করে তুলেছে ভিন্নমতের মানুষগুলোর সময়ের প্রয়োজনে এক হওয়ার গল্প দেশের জন্য। এবং গোলাগুলি নয় বরং মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের মনস্তাত্ত্বিক কষ্টগুলোকে এক ফ্রেমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চমৎকারভাবে। বইটি এতো ছোট যে পড়ার পরে জানার একটা তীব্র আগ্ৰহ থেকে যায়। যুদ্ধ আসলে কীভাবে হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের এটাই জাদু। বইটি সম্পর্কে আমি আমার মতামতে বলতে পারি যে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি এতো চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে পাঠককে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
চরিত্র বিশ্লেষণ করে আরো বেশি একে বলতে গেলে হয়তো গোটা বইয়ের পুরোটাই বলতে হবে। তাতে পাঠকের আগ্ৰহ কমে যাবে বলে মনে করি। ব্যক্তিগতভাবে আমার খুবই পছন্দের একটি বই। মুক্তিযুদ্ধের যারা আসল বীর সেনানী সেই মুক্তিযোদ্ধাদের মনের কথাগুলো সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নিজেকে পড়তে পড়তে মনে হবে যেন তাঁদের যাত্রার এক সহযাত্রী। এই পঞ্চপাণ্ডবের যাত্রাপথের সঙ্গী হতে মন চায়, তাঁদের সকলের পরিণতি দেখতে আগ্রহ জাগে তবে অবশ্যই পড়ে নিতে হবে হুমায়ূন আহমেদের এই “শ্যামল ছায়া” উপন্যাসটি।
আমার সামনে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক যেকোন উপন্যাস উপস্থাপন করলে, আমি তা খুব আগ্রহের সাথেই গ্রহণ করি। মুক্তিযুদ্ধে প্রতি আমার ফ্যাসিনেশন সবসময়ই বেশি। একজন বিগিনার লেভেলের পাঠক হিসাবে আমার হাতেখড়ি সেই হুমায়ূন থেকেই। ওনার লেখনী আমার সবসময়ই অনেক ভাল লাগে এবং আমি অতি আগ্রহ সহকারে ওনার সব লেখা পড়ি। এর পূর্বের অনীল বাগচীর একদিন, ১৯৭১, সূর্যের দিন, আগুনের পরশমণি, সৌরভ, দেয়াল ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধ ভিওিক উপন্যাস পড়েছি, আর আজ শেষ করলাম শ্যামল ছায়া। সত্যি বলতে আগের গুলির মতন অতটা গাড় ভাবে এই উপন্যাসটা আমাকে স্পর্শ করতে পারে নাই। আগের উপন্যাস গুলা পড়ার সময় নিজেকে বারবার যুদ্ধের ময়দানে খুঁজে পেতাম, কিন্তু এই উপন্যাসটা শেষ করে তেমনটা লাগছে না। জানিনা এর কারণ কী? যাইহোক, এখনো মুক্তিযুদ্ধের মাস্টারপিস উপন্যাস "জোছনা ও জননীর গল্প" পড়া বাকি রয়েছে, এবং আমি জানি ওই উপন্যাসটা আমাকে আপসেট করবে না ইনশাআল্লাহ।
উপন্যাসে মাত্র একটি অপারেশন দিয়ে পুরো মুক্তিযুদ্ধকে যেন তুলে আনা হয়েছে, নৌকার একদল যাত্রীর প্রত্যেকের নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেদের গল্পটা বলার মাধ্যমে। নৌকার মাঝি হাসান আলির গল্পটা ভাবিয়েছে অনেক। রাজাকার বাহিনীতে যোগ না দিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের 'Opportunity cost' এর হিসাবটা যখন হঠাত করেই মজিদের মতো মুক্তিযোদ্ধার মাথায় আসে, পাঠককে তা বিস্মিত করলেও করতে পারে। কিন্তু আসলেই কি বিস্মিত হবার কিছু আছে ? একজন মুক্তিযোদ্ধা যে সবার আগে একজন রক্ত মাংসের মানুষ । " স্বাধীনতা টাধিনতা পরে, ওদেরকে চরম একটা শিক্ষা দিতে চাই " - উপন্যাসের হুমায়ূন চরিত্রটির মতো অনেকের কাছেই হয়তো বুকের ভেতর লকলক করা প্রতিশোধের আগুনকে নেভানোটা ছিল মুখ্য । সত্যিই, পুরো উপন্যাসটা পড়ার সময় নিজেকে ঐ নৌকার একজন যাত্রী বলে মনে হয়। যেটি সবচেয়ে বেশি প্রশংসনীয় ।
"সবাই অপেক্ষা করছে সেই মুহূর্তটির জন্য, যখন মনে হবে পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। রাইফেলের উপর ঝুঁকে থাকা একেকটি শরীর আবেগে ও উত্তেজনায় কাঁপতে থাকবে থরথর করে। "
এ বছরের পড়া প্রথম বই। যুদ্ধের সময়কার কাহিনী পড়তে বরাবরই ভালো লাগে আমার। খুব ছোট একটা কাহিনী কিন্তু প্রতিটা মুহুর্ত কি অসাধারণ!
হুমায়ূন আহমেদ আসলে কি? এভাবে কেউ বই লিখতে পারে তা না পরলে বিশ্বাস করা যায় না,,, হুমায়ূন কে যতপরি ততই নতুন করে আবিস্কার করছি। শ্যামল ছায়া তে নৌকার মাঝে কয়েকজন মানুষের কথা নিয়ে,,, এরই মাঝে এত আবেগ এত সুন্দর বর্ননা,,, আসলে অনবদ্য।।
মাতৃভূমির ভালোবাসায়, আত্মীয় স্বজন হারানোর বেদনায় জর্জরিত একদল তরুণের অসীম সাহসিকতায় গল্প। যে গল্প মনের মাঝে আলোড়ন তুলে, যে গল্প রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে দেশকে আমার মাতৃভূমিকে ভালোবাসতে শিখায়, যে গল্প সেই সব বীরদের জন্য মন থেকে শ্রদ্ধা জানান দেয়।
এতদিনেও এই বইটি কেন পড়া হয়নি, পড়ার সময় বারবার আমার এটিই মনে হচ্ছিল। গল্প বলার ধরণ এতটাই অসাধারণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হুমায়ূন স্যারের একটা স্যালুট প্রাপ্য।
আমার জন্য মুক্তিযুদ্ধকে অনুভব করা প্রচন্ড কঠিন একটা কাজ। ২৪ ঘন্টা চার দেওয়ালের মধ্যে নির্ঝঞ্ঝাট জীবনে যুদ্ধকে অনুভব করা একরকম অসম্ভবই। তবে আমি খুব করে চাই মুক্তিযুদ্ধকে বুঝতে। তবে এখন এই দেশে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধকে বাজার জাত করা হয়, তাতে আর যা-ই হোক মুক্তিযুদ্ধকে বোঝা সম্ভব না।
যুদ্ধ সাধারণ কোন ঘটনা না। যুদ্ধ যে কারনেই হোক, তা ভয়ংকর। আমরা যুদ্ধের গল্প পড়ে আপ্লুত হই। তবে ব্যক্তিজীবনে যুদ্ধের প্রভাব গল্পের চেয়ে অনেক বেশি।
আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। আমার জন্মের প্রায় তিন যুগ আগের ঘটনা। তবে মুক্তিযুদ্ধ কে জানার ইচ্ছা ছিল প্রচন্ড। আমার নানা যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তার একটা রাইফেল ছিল। কিন্তু আমার জন্মের আগেই নানা মারা যান। বেচে থাকলে হয়ত আমার আগ্রহ মিটত।
তবে আমি মুক্তিযুদ্ধ সর্বপ্রথম অনুভব করেছিলাম জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি পড়ে। যুদ্ধে বিরত্ত্বের গল্পের থেকেও যুদ্ধের সময় মানুষের মনস্তত্ত্ব, ছোট ছোট সাধারণ ঘটনা আমাকে বেশি আকর্ষন করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষ শহিদ হয়েছে। এই তথ্য আমি যখন প্রথম শুনি, হয়ত অবাক হয়েছিলাম। তার বেশি কিছু না। কিন্তু যখন এলাকার এক মুরুব্বি বললেন, "আমার হাসান যুদ্ধে গেছিলো", তখন আমি প্রথম উপলব্ধি করি যুদ্ধ কোন যেনতেন ঘটনা না। ওই মুরুব্বির চোখের কোনের একফোঁটা ঝিলিক আমাদের কারোরই চোখ এড়ায় নি।
'ত্রিশ লাখ মানুষ শহিদ হয়েছে, এক কোটি বাস্তুহারা হয়েছে।'- এসব শুনে কি আসলেই যুদ্ধকে অনুভব করতে পারেন আপনারা। আমি পারি না। অথচ জাহানারা ইমামের, " যুদ্ধ তাহলে শেষ, তাহলে আর কাদের জন্য রসদ জমিয়ে রাখব?" এই অতি সাধারণ কথাতেই আমি প্রচন্ড আবেগাপ্লুত হই।
হুমায়ূন আহমেদ এর শ্যামল ছায়া বইটা এজন্যই মূলত ভালো লেগেছে আমার, যুদ্ধের সেরকম কোন ঘটনা না বলে সেই সময়ের ছোট ছোট ঘটনা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।শুধু রাইফেল দিয়ে শত্রুকে এফোড় ওফোড় করে দেওয়াই যুদ্ধ না, যুদ্ধ আরো অনেক বিস্তৃত।
রাজাকাররা অবশ্যই খারাপ। তবে তাদের সম্পর্কে জানতে ইচ্ছা করে খুব। কেন আসলে কিছু মানুষ নিজের ভাইদেরকে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে মেরেছে, তাদের চিন্তাভাবনা গুলো জানতে ইচ্ছে করে। একজন রাজাকার কে প্রশ্ন করলে সে যে উত্তর দেবে, সেই উত্তর টা জানতে ইচ্ছে করে। তৃতীয় পক্ষের কোন ব্যাখ্যা না। এই বইতে খুব অল্প হলেও সে দিকটা আছে।
একটা যুদ্ধকে কিছু তথ্য, সংখ্যা দিয়ে অনুভব করা যায় না।আমি বরাবরই চাই মুক্তিযুদ্ধকে জানতে, বুঝতে। এসব গল্প পড়েও যে জানা যায়, তাও মনে করি না। তবে অন্য অনেক সম্ভাব্য দিকের মধ্যে এটাই সবচেয়ে ইফেক্টিভ মনে হয় আমার।
সালটা হল ১৯৭১ | দেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে | ঢাকা থেকে শত শত মানুষ গ্রামের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে | এইসব মানুষ গুলোর মধ্যে অনেকে গ্রামে যেতে পারছে,অনেকে আবার পথেই অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে | আর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা তখন গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে, নির্দোষ মানুষদের হত্যা করছে, মুক্তিবাহিনীর কাউকে ধরতে পারলেই নির্যাতন করছে এবং নারীদের ধর্ষণ করছে |
আর ঠিক সেসময়ই নৌকায় করে পাঁচজনের একটি দল মেথিকান্দায় যাচ্ছে পঞ্চমবারের মতো একটি অপারেশনের জন্য| এই পাঁচজন হল - আবু জাফর শামসুদ্দিন, হুমায়ূন আহমেদ, হাসান আলি, আবদুল মজিদ ও আনিস সাবেত | এই দলের মধ্যে জাফর হল সবচেয়ে বিচক্ষণ | তারা এখন যে মিশনে যাচ্ছে সেই মিশনের দলনেতা হল হুমায়ূন আহমেদ | হুমায়ূন আহমেদ আবার একটু দুর্বল প্রকৃতির তাই তাকে যে এই অপারেশনের দলনেতা বানানো হয়েছে এই ব্যাপারটি নিয়ে জাফর আপত্তি করছিল | হাসান আলি দাঁড় বেয়ে নৌকা সামনে নিয়ে যাচ্ছে | হাসান আলির এই এলাকার পথঘাট খুব ভালো করে চেনা আর তার শ্রবণশক্তিও আবার খুব ভালো | দূরে কোনো লঞ্চ বা নৌযান থাকলে সেটির আওয়াজ অন্য কেউ না পেলেও হাসান আলি ঠিকই পেয়ে যায় | তার এই শ্রবণশক্তির জন্যই অনেকে প্রাণে বেঁচে গেছে | কিন্তু তার একটি সমস্যা হল যে, কেউ তাকে কোনো প্রশ্ন করলে কোনো প্রয়োজন না হলে হাসান আলি সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় না | আবদুল মজিদ হল এই দলের সবচেয়ে ভীতু সদস্য কিন্তু অদ্ভুত কথা হল যে কোনো অপারেশনের সময় সে খুব ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করে আর তার হাতের নিশানাও খুব ভালো | আর আনিস সাবেত হল খুব চাপা স্বভাবের | সে সাধারণত সব পরিস্থিতে খুব স্বাভাবিক থাকে | তাদের প্ল্যান হল রাত তিনটায় তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর উপর হামলা করবে | এ পর্যন্ত তারা চারবার এই অপারেশন করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে এবং আবু ভাই আর রমজান সহ আরো অনেককে হারিয়েছে |
এই পাঁচজন কী পারবে অপারেশনে সফল হতে ? জানতে চাইলে পড়ে ফেলুন ‘শ্যামল ছায়া’ বইটি |
আর হ্যাঁ আরেকটি কথা বলে রাখি যে, এই বইটির সাথে হুমায়ূন আহমেদের পরিচালিত ‘শ্যামল ছায়া’ সিনেমার কাহিনীর কিন্তু কোন মিল নেই , একদম ভিন্ন |
শ্যামল ছায়া উন্যাসটির প্রথম অন্যপ্রকাশ সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালের মার্চ মাসে। বইটির এই সংস্করণই বর্তমানে ১০০ টাকায় বাজারে পাওয়া যায়, যার প���রচ্ছদ এঁকেছেন একমেবাদ্বিতীয়ম ধ্রুব এষ, আমাদের ধ্রুব দা। হুমায়ূন আহমেদের লেখার গতবাঁধা ধাচ নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলেন তারা তার এই বইটি অবশ্যই পড়ে দেখবেন। তার আমার পড়া সবথেকে ভিন্ন ধরানার লেখা এই উপন্যাসটি। ইংরেজিতে unputdownable book বলতে যা বোঝায়, এই বইটা তারই অন্যতম উদাহরণ। গল্পের পটভূমি মুক্তিযুদ্ধ । হুমায়ূন সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ মানেই সেটা আর গল্প থাকে না। হয়ে ওঠে রীতিমতো আমাদের জীবনের একটি জ্বলজ্যান্ত অভিজ্ঞতা। গল্পের প্রত্যেকটা পৃষ্ঠা পাঠক সচক্ষে দেখতে পাবেন, বলেই আমি ( এবং আমরা) আশা রাখি। মুক্তিবাহিনী, অসম লড়ায়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা বাংলাদেশের সেই বীর তরুণদের, বীরত্বের দিকটা ছাড়াও অন্যান্য মৌলিক মানবীয় স্বভাবপ্রকৃতি অনেকটাই লেখক কল্পনার চোখে তুলে ধরেছেন, এবং অনেকটাই তুলে ধরেছোন তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। যেটা আমার৷ কাছে অন্যতম দিক বলে মনে হয়েছে। আরেকটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সরাসরি রণাঙ্গনে না গিয়েও গোটা উপন্যাসে যুদ্ধের একটা আবহ তৈরি করা। হুমায়ূন সাহিত্য সম্ভাবরে আকারে ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বে পর্বতপ্রমাণ একটা বই এই শ্যামল ছায়া। উপন্যাসটির নামকরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন স্বয়ং শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঠিক একই নামে, ইমপ্রেস টেলিফিল্মসের পরিবেশনায় ১১০ মিনিটের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় ( ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত) যার পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার ছিলেন স্বয়ং লেখক হুমায়ূন আহমেদ। সিনেমার চিত্রগ্রাহক হিসেবে ছিলেন আনোয়ার হোসেন এবং সম্পাদকের ভূমিকায় আতিকুর রহমান মল্লিক। সিনেমাটি ২০০৬ সালে "সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র" বিভাগে একাডেমি পুরস্কার এর জন্যও বাংলাদেশ থেকে নিবেদন করা হয়েছিল।- সপ্তর্ষি (২৩/০৭/২০২২)
রাজাকার নিয়ে আমাদের ম্যাক্সিমাম বাঙালিদোর মধ্যে একটা স্টেরিওটাইপ ভাবনা আছে।দাঁড়ি ওয়ালা, হাজী, মাথায় টুপি আর হিন্দুদের প্রচন্ড ঘৃনা করবে আর কথায় কথায় মালাওন বলে গাল দেবে।এই বিষয়গুলো সস্তা মুক্তিযুদ্ধের বই এবং সিনেমাতে প্রায়শই চোখে পড়ে। হুমায়ুন আহমেদ এদিকে একটু ব্যতিক্রম কাজ করেছেন। রাজাকার কমান্ডার কেরামত মাওলা হিন্দুর ঘর কেন অন্যায় ভাবে পোড়ানো হচ্ছে এটার প্রতিবাদ করায় তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হয় উপন্যাসে। ছোট্ট উপন্যাসের এ দিকটা খুব ভালো লেগেছে।বাদ বাকি চলনসই।