Shamsur Rahman (Bengali: শামসুর রাহমান) was a Bangladeshi poet, columnist and journalist. Rahman, who emerged in the latter half of the 20th century, wrote more than sixty books of poetry and is considered a key figure in Bengali literature. He was regarded the unofficial poet laureate of Bangladesh. Major themes in his poetry and writings include liberal humanism, human relations, romanticised rebellion of youth, the emergence of and consequent events in Bangladesh, and opposition to religious fundamentalism.
চার শতকের পুরনো শহর ঢাকায় বেড়ে উঠেছেন শামসুর রাহমান।চল্লিশের দশক থেকে দীর্ঘকাল কাটিয়েছেন একদা তিলোত্তমা এ নগরীতে। মূলত শামসুর রাহমানের কৈশরে দেখা চল্লিশ আর পঞ্চাশের দশকের ঢাকার স্মৃতিময় ঘটনাই এ গ্রন্থের মূল আকর্ষণ। শামসুর রাহমানের শৈশবের ঢাকা কতই না চমৎকার ছিলো। চারপাশে নানা নতুনত্বের ছড়াছড়ি! পিঠে বুড়ি আর তার গল্প, ভিস্তিওয়ালা জীবনে প্রথম স্কুলে যাওয়া। স্কুলে বন্ধুদের সাথে মজা করা, শিক্ষকদের শাসন -স্নেহের বাঁধন আর সেই সাথে ঢাকার (তখন ঢাকা বলতে পুরান ঢাকাকেই বোঝাতো) নবাববাড়ি, মহরমের অনুষ্ঠান, চকবাজার,হোসনীদালান, লালবাগ কেল্লা আর আন্টাঘর (ভিক্টোরিয়া পার্ক) কে ঘিরে কতোশতো ঘটনা আর ইতিহাসের ঘনঘটা। নিঃসন্দেহে ৫ তারকা।
"পাড়ায় পাড়ায় ঘাস-বিচালির গন্ধ ছড়ানো আস্তাবল ছিল, আর ছিল ঘোড়ার গাড়ি। গাড়োয়ানের চাবুক ঝিকিয়ে উঠত হাওয়ায়, রোদ্দুরে। কাছে-দূরে মজাদার শব্দ ক'রে ঘোড়া ছুটত দিগ্বিদিক-খট্ খট্ খট্ গাড়োয়ান লাগাম নেড়ে বলত- হট হট হট্।"
"বেড়ালের মতো পা ফেলে আসত সন্ধেগুলো। ফুলো ফুলো তুলোর মতো নরম পা, তাই শব্দ হ'তো না একটুকুও। কে যেন মস্ত চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলত চারদিকের সোনালি জলের মতো রোদ্দুর। রোদ্দুর হারিয়ে গেলেই অন্ধকার। পথঘাট আবছা। বাড়িগুলোর গা-জুড়ে কালির পোঁচ। অলিগলি কালো, রাস্তা কালো, আরমানিটোলার গির্জে কালো, সদরঘাটের কামান কালো, বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়ানো আহসান মঞ্জিলের গম্বুজ কালো। একটু পরেই ফুটকির মতো আলো ফুটে উঠে নানান জায়গায়। ঘরে আলো, দোকানপাটে আলো, রাস্তাঘাটে আলো, মসজিদে আলো, মন্দিরে আলো, গির্জায় আলো। বস্তিতে আলো, আহসান মঞ্জিলে আলো। আদম শফি ওস্তাগারের খোলার ঘরে আলো, লাটসাহেবের ইমারতে আলো,-এমনি অনেক জায়গায় আলোর ঝিকিমিকি। কোথাও হারিকেন, কুপি, কোথাওবা বিজলিবাতি। সন্ধে হলেই রোজ একটা আওয়াজ ভেসে আসতো - কখনো দূর থেকে, কখনো-বা অনেক কাছ থেকে। ঘণ্টার শব্দ। ঢং ঢং ঢং। বেজে চলতো একটানা। মনে হ'তো এই সন্ধ্যা দোলানো আওয়াজ থামবে না কোনোদিন।"
শামসুর রাহমানের কলমে এগুলো গত শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের ঢাকার বর্ণনা।ভাবা যায়! কী ঘুমঘুম ঘোরলাগা সৌন্দর্য ছিলো তখন ঢাকার! একদিন সবকিছু আসলেই গল্প হয়ে যায়।
এই বছর পড়া সবচেয়ে সুন্দর বইয়ের একটি। খুবই সাধারণ অথচ সাধারণত্বের মাঝেই না কত সৌন্দর্য! জানি না, শামসুর রাহমানের মত আমিও পুরান ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেছি, বেড়ে উঠেছি আর ঢাকাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি বলেই কি না, বইটার উপর এক অদ্ভুত মায়া পড়ে গেছে, মাঝে মাঝে এমনিতেই পাতা উল্টাতে, একই লাইন বারবার পড়তে খুব ভালো লাগছিলো। আমি এই তেইশ বছরের জীবনে এসেই যতখানি নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হই প্রায় সময়ই, এই বই যেন বেদনাবোধটা আরো কয়েকগুণে বাড়িয়ে দিলো। এ এক অদ্ভুত বেদনা, ঢাকার সেই ভেঙে ফেলা পুরানো বাড়িগুলার মত এক বেদনা, তাদের গায়ে লেপ্টে থাকা শ্যাওলার বেদনার মত।
"আমি রাজপুত্তুর নই, তাই আমার ডানা-অলা পক্ষীরাজ নেই। পক্ষীরাজ নেই, কিন্তু আছে ঘুরে বেড়ানোর শখ। ধুলোওড়া পথ, ছায়ামাখা পথ, লোক গিজগিজ পথ, সুনসান পথ- সব রকম পথে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে আমার। ভালো লাগে পথে যেতে যেতে চেয়ে চেয়ে দেখতে জিনিস, খুঁটিনাটি অনেক কিছু। এই ধরো, গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালি, নোড়ানুড়ি, কাঠটুকরো, কত্ত কিছু দেখি চোখ মেলে।"
কিংবা
"শহরের নাম ঢাকা। এ শহরের একটা সরু গলিতে যখন আমি প্রথম চোখ খুলেছিলাম তখন ঢাকা ছিল কেমন ফাঁকা ফাঁকা। এত দর দালান ছিল না, বাস ছিল না, মোটর ছিল না, এমন কি রিক্সাও ছিল না, রাস্তায় ছিল না সারি সারি পিঁপড়ের মত মানুষের ভীড়।"
স্মৃতির শহরের শুরুটা এভাবেই করেছেন তিনি। সেই চল্লিশের দশকের আগের ঢাকা যে আদতে একটি গ্রাম ছিল তার সুনিপুন কাব্যিক বর্ণনায় ঠাসা এই বই। বইটি পড়ার সময় মনে হচ্ছিল, হুমায়ুন আজাদের "ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা" বইটির কথা। কৈশোর মনের দৃষ্টিতে হুমায়ূন আজাদ যেভাবে গ্রামের রঙিন বর্ণনা এঁকেছেন তাঁর বইটিতে, শামসুর রাহমানও যেন ছাপার অক্ষরে ফুটে তুলেছেন অদেখা এক ঢাকা শহরকে।
ব্যাঙ্গমা- ব্যাঙ্গমী থেকে শুরু করে, ঢাকার পুরানো বাড়ি, পুরাকীর্তি, ঐতিহাসিক স্থাপনা, হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষ, শিল্প- সাহিত্য সবই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে ছোট্ট এই বইটিতে। স্থান পেয়েছে ৪৩ এর দুর্ভিক্ষ, ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনের মত ঐতিহাসিক ঘটনাও।
শৈশব থেকেই ঢাকার অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে স্মৃতির মানসপটে আঁকা চিত্রই জীবন্ত হয়ে উঠেছে স্মৃতির শহর বইটিতে। সেই সাথে স্থান পেয়েছে রফিকুন নবীর সাবলীল সব চিত্রকর্ম।
বইয়ের ভূমিকাতেই বলা আছে, শামসুর রাহমানের মন ও মানস গঠিত হয়েছে ঢাকা শহরে, যে শহর দীপ্তি হারিয়েছে বহু আগেই। সেই দীপ্তিকে ধরে রেখেছেন তিনি অনেক কবিতায়, এবং স্মৃতির শহরের অনুপম গদ্যে।
ঢাকা নিয়ে আমার আগ্রহ অনেকদিনের। সেই সুবাদেই অনেকদিন থেকেই কবি শামসুর রাহমানের স্মৃতির শহর বইটি খুঁজছিলাম। বইটির কোন প্রিন্ট পাইনি সবশেষ সত্ত্বাধিকারী প্রথমার কাছে। পুরানো বইয়ের দোকান, লাইব্রেরী কোথাও যেন খুঁজে পাচ্ছিলাম না শামসুর রাহমানের স্মৃতির শহরকে। কিন্তু আজ আচমকা যেন অনেকটাই উড়ে এল আমার হাতে। হাতে পেয়েই গপাগপ পড়ে ফেলা। এই ধরণের বই পড়লে আমার টাইম মেশিনে করে খুব খুব খুব বেশি ফিরে যেতে ইচ্ছে করে কত শত বছরের পুরানো সেই স্মৃতির শহরে।
বন্ধুটি ঢাকার বাইরে থেকে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে এসেছে। এই যানজট, ধুলো আর ব্যস্ত শহরে বাইরে থেকে এসেও কেউ যদি ঢাকাকে অপছন্দ না করে সেটাও কম নয়। বন্ধুটিকে ধন্যবাদ। কারণ ঢাকার স্থানীয় অনেকের মুখেও অনেক নিন্দা শুনেছি।
এখন আপনাদের প্রশ্ন করি, ঢাকাকে ভালবাসতে চান? আরেকটু জানতে চান ঢাকার পুরাতন হৃদপিণ্ডটার কথা?
যদি আপনার উত্তর হ্যা হয় তবে আপনি কবি শামসুর রহমানের লেখা "স্মৃতির শহর" লেখাটি পড়ুন। কি যে মিষ্টি করি কবি এখানে তার ছেলেবেলার কথা বলেছেন বোঝাতে পারব না।
কবি যেন আপনার ধরে বলেছেন, এই যে ঢাকেশ্বরী মন্দির দেখছো, অনেকে বলে ঢাকার ঈশ্বরী মানে ঢাকার রক্ষাকর্তা নাম অনুসারের এই শহরের নাম ঢাকা হয়েছে। আবার বলেছেন, রমনা কালী মন্দিরের কথা, যার আগে নাম ছিল কৃপাসিদ্ধ আখড়া। লালবাগের কেল্লা যেয়ে মন খারাপ করেছেন। এখানে নাকি শায়েস্তা খান জোরেশোরে লালবাগের কেল্লা নির্মাণ শুরু করেন কিন্তু কন্য বিবি পরি মৃত্যুর পর বন্ধ করে দেন কাজ। ভিক্টোরিয়া পার্কের আগের নাম ছিল আন্টাগড়। এখানে ২৪ জন সিপাহীকে কামানের মুখে উড়িয়ে দিয়েছিল ইংরেজরা। তাদের অপরাধ ছিল দেশী সৈন্য হওয়া সত্ত্বেও গোরা সৈন্যদের মত বেতন দাবী করা।
এমন আর কত জায়গার কথা, ইতিহাসের টুকরো আলাপ সাথে ওনার জীবনের বেড়ে ওঠার গল্প। এইটুকু একটা বই অথচ বইটা ডুবিয়ে দেয় যেন অনেক গভীরে। কি তীব্রভাবে কবি এখানে বেঁচে ছিলেন আর কি গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন এই শহরকে সেই অনুভূতি সারে সারে বাঁধা এই বইটিতে।
ঢাকাকে আজকের এই অবস্থায় আসার পিছনে এখানে বসবাসরত প্রতিটি মানুষের অবদান রয়েছে। ঢাকার হৃদপিন্ড আর যে ধুলোয় পড়ে গেছে তার দায় শুধু অন্যকে দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া যায় কি? সেই দায়বদ্ধতা থেকে ঢাকাকে না হয় একটু ভালোবাসুন, পড়ুন বইটি।
ঢাকায় বসবাসরত যদি কেউ আমাকে বলে সারা বছরে মাত্র একটি বই পড়ার সময় আছে এইবছর। আমি দ্বিধাহীনভাবে এই বইটি পড়তে বলব।
তুলনামূলক নবীন শহর কলকাতা নিয়ে আজ অবধি যত গবেষণা ও স্মৃতিকথা লেখা হয়েছে, চার শতাধিক বয়সী ঢাকাকে নিয়ে লেখা তার দশমাংশও নেই; গবেষণা তো শতাংশও হবে না। ঢাকা নিয়ে লেখালেখি বলতেই মুনতাসীর মামুন, গবেষক হিসেবে। এছাড়া স্মৃতিকথার মাঝে মীজানুর রহমানের 'ঢাকা পুরাণ', পরিতোষ সেনের 'জিন্দাবাহার', রাবেয়া খাতুনের 'স্বপ্নের শহর ঢাকা', সরদার ফজলুল করিমের দু'-একটা লেখা। এ মুহূর্তে আর কিছু মনে পড়ছে না। এসব লেখালেখির মাঝে শামসুর রাহমানের "স্মৃতির শহর" একটা জায়গা দখল করে রাখবেই। যদিও বইটার আকার বেশ ছোট, মাত্র ৭৮ পৃষ্ঠা, এবং বইটার উদ্দিষ্ট পাঠককুল শিশু-কিশোররা, কিন্তু পুরানো ঢাকার মাঝে আমরা যা খুঁজি তার সবকিছুই পাওয়া যাবে এতে। এক জোড়া ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর সাথে লেখকের কথোপকথনে উঠে এসেছে পুরান ঢাকার অলিগলি, গাছপালা, তাজিয়া মিছিল, নবাববাড়ি, ছোট কাটরা, বড় কাটরা, লালবাগ কেল্লা, পরীবিবির মাজার। সাথে আছে ভিস্তিওয়ালা আর বাতিওয়ালা, খেলনা আর রুটির কারিগর, ছবি আঁকিয়ে। আছে বাকরখানি আর পনির পরোটাও। গোটা লেখাটাই বাকরখানির মতই সুবাস ছড়ায়; কারণ শামসুর রাহমান কবি, তাই তাঁর গদ্যভাষাও কাব্যময়। স্মৃতি যেমন সিনেমা হয়েও পর্দার উপর একটা সূক্ষ্ম মসলিনের আঁচল টানা থাকে, শামসুর রাহমানের চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকের ঢাকার স্মৃতিও তেমনই। ধরা যায়, আবার যায় না। আমরা যারা আশি বা নব্বইয়ের দশকে জন্মেছি, তারাও কিন্তু এই লেখায় হারিয়ে যাওয়া ঢাকাকে খুঁজে পাবো। না, বর্ণনায় নয়, বরং স্মৃতিকাতরতায়। কংক্রিটের যে দানব শহরকে আজ আমরা দেখি, সে যে এককালে মসলিন পরা শাহজাদীর মতই নরম আর স্পর্শকাতর ছিল, সে তো এই ২৫ বছর আগেই আমরাই ছেলেবেলায় দেখেছি ধানমন্ডির শান্ত রাস্তায় কিংবা ওয়ারির বাসাবাড়িগুলোতে কিংবা বেইলি রোডের নাটকপাড়ার আড্ডায় অথবা কমলাপুরের খেলার মাঠে। আভিজাত্য যদিও কিছু হারিয়েছিল, কিন্তু সেটা ঢাকা ছিল। এখন? সম্ভবত ঢাকার জোম্বি। তাই 'স্মৃতির শহর' অবশ্যপাঠ্য, এই নস্টালজিয়াটুকুও হারিয়ে যাওয়ার আগেই।
এই শহর, যাদুর শহর প্রাণের শহর ঢাকারে এই শহর, যাদুর শহর প্রাণের শহর আহারে।
ইট কাঠের প্রাণহীন, অথচ ভীষণ প্রাণোচ্ছল শহর ঢাকাকে বড্ড আপন আপন লাগে। ঘড়ির কাটায় আটকে থাকা যানযট কিংবা দূষিত বায়ুর স্তরও সেই ভাল লাগায় চির ধরাতে পারেনি। বরং সেসব পুষিয়ে দিয়েছে চারুকলা-শিল্পকলার নিত্যনতুন প্রদর্শনী, নানা রঙের ঋতু বরণ উৎসব, পুরো মাস ধরে চলতে থাকা একুশে বইমেলা, ফুটফাটের এধার-ওধারে ছড়ানো ছিটানো টং চায়ের দোকান কিংবা ঝালমুড়ি, নিউ মার্কেটের ফুসকা, টিএসসি মোড়ের পানিপুরি, বেলী রোডের নাট্যশালা আর চেনা অচেনা মানু্ষের হাস্যোজ্জ্বল মুখ। ঢাকা শহরটা এভাবেই মায়ায় বেধে রেখেছে এতোদিন। Tasnim Hossain এর স্মৃতিচারণ মূলক গ্রন্থ স্মৃতির শহর-এ চেনা ঢাকাকেই খুঁজে পেয়েছি। পুরোটা মিলেনা যদিও। তবু অনেকটা সময় জুড়ে নস্টালজিয়ায় ভুগেছি।
Shamsur Rahman এর স্মৃতির শহর যেন অন্য এক মায়াজগত। চেনা ঢাকার সাথে মিল নেই কোনো। তার লেখায় বরং সতেরশ-আঠারশ শতকের ঢাকা উঠে এসেছে ঘুরফিরে। সম্ভবত এই কারণেই এই বইটি পড়ে খুব একটা তৃপ্তি পাইনি।
দুঃখিত কবি, আশাহত করার জন্য তিনতারার বেশি দেয়া যাচ্ছেনা।
কোনো কোনো বই পড়লে মনে হয় না, ঘটঘট করে দু'কলম লিখে ফেলি? বইটা পড়ে মনে হলো পাতার পর পাতা লিখতে পারবো। কতদিন একটু শান্তিমত লিখি না! দু'পাতা গল্প পড়ি না। সন্ধ্যাবেলা আঁকতে বসি না। আর যুগ যুগ ধরে চিঠি লিখি না! গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শুধু পরীক্ষার খাতাতেই লিখছি। ইরান-তুরানের বৈদেশিক নীতি টিতি টুকে রাখতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলাম। 'স্মৃতির শহর' পড়তে গিয়ে মস্তিষ্কের এমন সব ফোল্ডারে 'কিলিক' পড়লো, যেখানে মিষ্টি সব স্মৃতি জমা।
প্রথমে পড়তে গিয়ে একটু এলেমেলো ঠেকছিল, এই তো এক আলীজান ব্যাপারীর গল্প থেকে কোথায় বিবি চম্পার কথায় চলে গেল। একটু মন দিতেই লেখকের সাথে সেই আমলের ঢাকা শহরের রাস্তা ঘাট ঘুরে ফেললাম। শাঁখারি বাজার, আহসান মঞ্জিল, লালবাগ ঘুরে-টুরে লাইব্রেরির গল্পে এসে শেষ হলো বইটা। পড়ার পর থেকেই মুগ্ধতা কাজ করছে। কী চমৎকার একটা বই! রনবীর আঁকায় কী জীবন্ত হয়ে উঠেছে একেকটা গল্প!
বুড়ো বয়সে বাচ্চাদের বই পড়লেও ক্ষতি নেই। সুন্দর বই সব বয়সে পড়া যায়।
বইয়ের নাম দেখে কে ভাবতে পারবে এর ভিতরে কী আছে! স্মৃতিচারণ তো অনেকেই করে। কিন্তু কবি শামসুর রহমানের মত এভাবে সম্ভব? ইট-পাথরের এই ঢাকা শহরটাই লেখকের কলমে হয়ে উঠেছে রূপকথা। স্মৃতির সাথে জড়িয়ে থাকা অনুভুতি, ইতিহাস আ��� চরিত্রের মিশেলে সুখপাঠ্য একটা বই।
নাহ। কোনো রাজা রাজড়ার গল্প না, দুয়োরানি, সুয়োরানির গল্প না। গল্পে নেই কোনো হাতিশাল-ঘোড়াশাল, সেপাই-সান্তি, পাইক - বরকন্দাজ। গল্পটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর একটা শহরের। মাঝে মাঝে মনে হতো এই ইট কাঠ বাক্সে বন্দী শহরটা কেমন ছিল? সত্তর আশি বছর আগে এই রাস্তা, সারি সারি গাড়ি, মানুষ এসব কি ছিল? ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই মনের মধ্যে আঁকা হয়ে যায় সেই পুরোনো ঢাকা শহরের আবছা একটা ছবি। বইটা পড়া শুরু করলাম একরাশ উত্তেজনা নিয়ে। যতই পড়ছিলাম আমার কল্পনার ছবিতে একটু একটু করে মিশে যাচ্ছিলো হরেক রকম রং। শেষ করে মনে হলো - কী সুন্দর! একটা শহরের গল্প এতো সুন্দর হয় নাকি! চল্লিশ আর পঞ্চাশের দশকের ঢাকা নিয়ে লিখেছেন শামসুর রাহমান। খুব সহজ ভাষায় কী অসাধারণ ভাবেই না তিনি লিখেছেন তার শৈশব কৈশোরের ঢাকাকে নিয়ে।
পোগজ স্কুলের ভিতর দিয়ে কতো হাজার বার জজকোর্টের দিকে গিয়েছি চা খেতে। আবার কখনো গেলে আলাদা করে মনে পড়বে শামসুর রহমানের কথা। এই মাঠেই কতো হেঁটেছেন কবি!!!
প্রিয় বইয়ের তালিকা করতে গেলে আমি হাঁপিয়ে উঠি। কোনটা যে প্রিয় বই আর কোনটা যে ভালো লাগার তাই বুঝতে পারি না। তবে শামসুর রহমান এর এই ``স্মৃতির শহর" নিঃসন্দেহে প্রিয় বইয়ের তালিকার উপরের দিকে থাকবে।
এক কথায় অসাধারণ! বইয়ের পাতায় পাতায় যেন সেই সপ্তদশ শতক থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দী চোখের সামনে ভেসে আসছিল.. সেই পরি বিবি, আন্টাগড় ময়দান, হাওয়াই মিঠাই, ভিস্তিওয়ালা, ঘোড়ার গাড়ি কত কি.. নস্টালজিয়া!
পড়া শুরু করার পর বারবারই মনে হচ্ছিল, বড্ড বড়বেলায় হয়ত পড়তে বসলাম বইটা, শিশুপাঠ্য এ বই, বড়বেলায় হয়ত আর ভালো লাগবে না। কিন্তু ভুল ভেঙেছে কিছুক্ষণ পরেই।
লেখকের শৈশবের স্মৃতিচারণ এ বইয়ে, স্মৃতিচারণ তাঁর প্রিয় শহর ঢাকার। কিন্তু স্মৃতিচারণের গন্ডি থেকে বের হয়ে বারবারই উঁকি দিয়েছে ইতিহাসের কিছু কিছু পর্ব। ইতিহাসে ভালোর সাথে মন্দের ভাগ অনেকটা, তার ব্যতিক্রম নয় লেখকের শৈশব স্মৃতিও। বাতিঅলা, পানিঅলা ভিস্তি, তেলওয়ালি বুড়ির সাথে নিষ্পাপ আনন্দের স্মৃতির সাথেই মিশে তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ভয়ংকর স্মৃতি।
অনেক যুগের অনেক মানুষের স্মৃতির শহর ঢাকা, আজ যেন এত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের বিষেই জর্জর। এর এতকালের জমানো ঝুলির এমন কিছু কিছু গল্প এসে মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেয়, একসময় এই ঢাকাও ছিল এক সুদর্শন অভিজাত তরুণ।
যতটা আশা নিয়ে বইটা পড়া শুরু করেছিলাম, শেষ করার পর কেনো জানি ততটা তৃপ্তি পাই নি। আঠারো-উনিশ শতকের বাংলা আমার গবেষণার বিষয়বস্তু হলেও বইটা প্রথমদিকে পড়তে খুব কষ্ট হয়েছে। শেষের দিকে কিছুটা ভালো লাগলেও খুবই নগন্য সেই ভালো লাগাটা!
"আর এই তো আবার আমি ঢাকা শহরের মুখোমুখি, যে শহর আমার শহর, আমার স্মৃতির শহর।" কদিন আগে শহরের ভাগীদারিত্ব নিয়ে জোর লড়াই করছিলাম। "তোর শহর ঠাকুরগাও, ঢাকা আমার"। "সেটা হলে ভালো হতো, আমি ঢাকায় বড় হয়েছি, ঢাকা আমার"। আজ পড়া শেষ হল "স্মৃতির শহর"। শেষ বাক্যটা পড়ে মনে হল, ঠিক এই বাক্যটা সেদিন আমি বলতে চেয়েছিলাম। এই শহর আমার স্মৃতির শহর। হ্যা, শহর ওই ছোকরার ও। এইতো সেদিন ও কলেজে পড়তাম তখন, চাদনীঘাটে ফুপির বাড়ি গিয়ে রাত জেগেছি সবাই মিলে। মহরমের মিছিল দেখবো বলে। বাবারা নাকি তাদের ছেলেবেলায় এই মিছিলে যেতেন গোলাপি শরবতের লোভে। পানকিচুনকি বলে এক ধরনের ফল ছিল ছোট ছোট পুঁতির মত, তাই দিয়ে মালা গাথা হত। আর সে মালা কিনে খেতাম দুই বোন। ঢাকার প্রেমে পড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে। পুরোনো ঢাকার যে সব অলিগলি দিয়ে হেটেছিলাম, তাদের নতুন করে চিনলাম। কবির লেখা এত চমৎকার যে আমাকে স্মৃতিকাতর করে দিয়েছে। কোথাও এতটুকু বাহুল্য নেই। চমৎকার একটা বই।
ছোট্ট একটা বই। কিন্তু অদ্ভূত এক মায়ায় ভরা বইটা। পুরান ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে উঠা লেখকের গত শতকের চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকের স্মৃতি স্থান পেয়েছে এখানে। পিঠে বেচা বুড়ি, পানি সরবরাহ করা ভিস্তিওয়ালা, শৈশবের নায়ক এক চিত্রকর, প্রথম স্কুলে যাওয়া, বন্ধু, পুরান ঢাকার উৎসব-অনুষ্ঠান-স্থাপত্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ ইত্যাদি ঘটনা স্থান পেয়েছে বইটাতে। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীকে শ্রোতা কল্পনা করে লেখক স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিয়েছেন আর তাতে তাঁর শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিগুলো ঢাকার একটা সময়ের দলিল হয়ে উঠেছে। ছোট্ট বইটা শেষ করে একটাই আপসোস, আরেকটু বড় হলো না কেন বইটা?!
সহজ-সরল গদ্যে উঠে এসেছে ঢাকা শহরের ইতিহাস। লেখক খুবই সচেতন ভাবে ইতিহাসের নানান বিষয়ের কথা খুব অল্প কথায় প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন। যেন চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে। ঢাকা শহর গরুরগাড়ি আর ঘোড়ার গাড়ির পিঠে চড়ে মোটরগাড়ির দুনিয়াতে অবতরণ করছে। সোজা কথা। শিশুকিশোরদের জন্য তো এই বইটা দারুণ উপভোগ্য বটেই। তাছাড়া বড়দের জন্যও বইটা অসাধারণ।
শামসুর রাহমান ঢাকা শহরের কবি। সেই ঢাকা শহরের পেছনের যত লক্ষ-কোটি গল্প আছে ; তা থেকেই উঠে এসেছে কবির স্মৃতিকাতর গদ্যের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত পরিসরে। লেখক এইখানে শায়েস্তা খাঁ'র আমলের টাকায় ৮ মণ চালের কথা যেমন বলেছেন, তেমনি বলেছেন নবাব সিরাজুদ্দৌলার খালা ঘষেটি বেগমের অপমৃত্যুর ইতিহাস। বুড়িগঙ্গা, কত কিছুর সাক্ষী হয়ে আছে।
লেখক স্বভাবসুলভ আড্ডার ঢঙে বিভিন্ন ইতিহাসের কথা এখানে উল্লেখ করেছেন। ক্ষুদিরামের ফাঁসির কথা যেমন বলেছেন, আরো বলেছেন মঙ্গল পান্ডে'র বিদ্রোহের কথা। কিংবা ৪৩'র দূর্ভিক্ষ আর ৪৭'র দেশভাগ'র কথা। হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার কথা উল্লেখ করে করেছেন হাহুতাশ। বলেছেন মহরম'র উৎসব কিংবা শাঁখারিবাজারের পূজা উৎসবের ছবিও সুন্দর এঁকে গেছেন বর্ণের খোঁচায়!
এক কথায় বলা যায়, চমৎকার বই। পড়বার পর থেকে ঢাকা শহরকে আবার নতুন করে দেখতে মন চাইছে। আজব শহর।
Isn't it so beautiful and relieving to put on your childhood shoes and walk on the same road which you have left behind a long ago !
শামসুর রহমান তার নিজের শহর ঢাকাকে ভীষণ ভালোবাসতেন ! পুরাণ ঢাকার পুরাণ বাড়িগুলোর মতোই সে ভালোবাসা ; যার গায়ে লেগে থাকে শ্যাওলার ���তো বেদনা !
তখনকার ঢাকা ছিলো ফাঁকা ! এত এত দালানকোঠা, গাড়িঘোড়া, দমবন্ধতা ছিলো না !
ছিলো পাড়ায় পাড়ায় পরিচিত মানুষ, আস্তাবল, ঘোড়ারগাড়ি, ভিস্তিওয়ালা, বাতিওয়ালা, বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ স্রোত, পালা-পার্বণে আনন্দ , নবাববাড়ি, মহরমের অনুষ্ঠান, হোসনীদালান, লালবাগ কেল্লা , আন্টাঘর আরো কত কি !
কবির সাথে সাথে ঢাকাও বড় হয় ! তারা শৈশব-কৈশোরের উষ্ণ ভালোবাসা পিছনে ফেলে চলতে থাকে ভবিষ্যতের সন্ধানে .. কিন্তু শেষ বেলায় পিছনে ফিরে তারা যা-ই দেখে তাতেই পায় শৈশবের স্মৃতি-মাখা কেমন বিষাদ বিষাদ গন্ধ !
This book is a smell of a lost childhood in a lost city !
#bookreview `স্মৃতির শহর` লেখকের জন্ম এবং বেড়ে উঠা ঢাকায়৷ বিশেষ করে পুরান ঢাকায়। বইয়ে লেখক পুরান ঢাকাকে কেন্দ্র করে তাঁর শৈশব, কৈশোরের দুরান্তপনা এবং নানান স্মৃতিকে তুলে ধরেছেন। তার সাথে পুরান ঢাকার নানা স্থাপনা এবং স্থানের ইতিহাস গল্পের আকারে উল্লেখ্য করেছেন।
পড়ার সময়ে মনে হচ্ছিল আমিও যেনো পুরান ঢাকার সেই অলিতে-গলিতে ঘুরছি। কিছু ঘটনা যেন আমার শৈশবের গল্প, আমিও সেগুলো করে বেড়িয়েছি।
খুব একটা বড় বই নয়, কিন্তু নস্টালজিয়া আর মায়া দিয়ে এত টইটম্বুর যে মনে হলো কত দীর্ঘ পথ হেঁটে এলাম! অনেক পুরনো দিনের ঢাকা শহরকে নিয়ে এই বই। কবিতার মতো সুন্দর বর্ণনায়, প্রাণবন্ত ভাষায় লেখা এই বই। মনপ্রাণ ভরে পড়ার মতো। মনীন্দ্র গুপ্তের অক্ষয় মালবেরির কথা মনে পড়ে। অনেক অনেক দিন আগের গল্প কী জীবন্ত হয়ে ফিরে এল!
চমৎকার! স্বপ্নেই বিচরণ করে গেছি এতক্ষণ। আরো বুঝলাম, পুবের বাঙালিরা নেসফিল্ডের গ্রামার থেকে চৌধুরী অ্যান্ড হোসেনের গ্রামারে ফিরে গিয়ে নিজেদের কতটা নিচে নামিয়েছে! রাম মোহন রায় লাইব্রেরির সমৃদ্ধি সম্পর্কে জানলাম। আজ এ গ্রন্থাগার জীর্ণ! শীঘ্র হানা দিয়ে বাঁচাবার চেষ্টা করব কিছু বই!
শামসুর রহমানের বিশেষ কোন মাহাত্ম বলতে আমি খুব কিছু বুঝি না। কেবল সেই বহু আগে পড়া তার ‘স্মৃতির শহর’ আজও আমার পছন্দের একটা অংশ জুড়ে আছে। তাকে সব কিছুতে ফেলে দিলেও এই এক রচনায় আমার মনে হয় ভোলা সম্ভব না।
পুরান ঢাকা যেন চোখের সামনে মায়াময় এক গদ্যে ভেসে বেড়ালো!
শেষের দিকে সিপাহী বিদ্রোহ, তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, সাতচল্লিশের দাঙ্গা, বুড়িগঙ্গায় সিরাজউদ্দৌলার স্বজনদের করুণ পরিণতি সবমিলিয়ে একটা বিষন্ন আবহ তৈরি হয়েছিল মনে।
এই বই পড়ে মনে হলো আমার একটা বই লিখা উচিত তার নাম হবে "গজারী বৃক্ষের শহর" যদিও গাজীপুর ঢাকা বিভাগে তারপরও ঢাকার অংশ না আমি যেভাবে এই শহরকে আপন করে নিয়েছি এই শহর কি তা করেছে হয়তো না তাও কেন আকরে ধরে থাকি?
শৈশবের দিনগুলি, ফেলে আসা সময়, স্কুল, পুরোনো বন্ধু! সবকিছু মিলিয়ে স্মৃতিকাতর করে দিলো। সাথে আছে ঢাকা শহরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা৷ সবমিলিয়ে অসাধারণ।