Collection of 10 ghost stories involving or narrated by ghost-hunter Priyanath Joardar.
প্রচ্ছদ – সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় অলঙ্করণ – সমীর সরকার
BHUTNATHER DIARY A collection of ghost stories by Anish Deb
সূচি –
অন্ধকারে, হাতে হাত রেখে নন্দিনীর রাতের স্বপ্ন অলক্ষণের গণ্ডি ভয় পাওয়া মানুষ মনের মতো বউ আঁধারে মায়ার খেলা সামান্য কুয়াশা ছিল নগ্ন নির্জন রাত কনে-দেখা আলোয় ছায়াবন্দি খেলা
Anish Deb (22 October 1951 – 28 April 2021) was an Indian Bengali writer and academic. He was noted for his writings in the science fiction and thriller genre. He received several literary awards including Vidyasagar Award in 2019.
Anish Deb was born in 1951 in Kolkata. He completed his B.Tech. (1974), M.Tech. (1976) and Ph.D. (Tech.) with 1 silver and 2 university gold medals in Applied Physics from the Rajabazar Science College campus of University of Calcutta.
Anish Deb started his writing career in 1968. He also edited a number of collections of popular fictions, novels and detective stories. Some of his notable writings are: Ghaser Sheesh Nei, Saper Chokh, Teerbiddho, Teish Ghanta Shat Minute, Hate Kalome Computer, Bignyaner Dashdiganto, Jibon Jokhon Phuriye Jay.
১৯৯৯ থেকে ২০০০ সালের মাঝে মোট দশটি গল্পে আবির্ভূত হন প্রিয়নাথ জোয়ারদার ওরফে 'ভূতনাথ'। দেব সাহিত্য কুটিরের কর্ণধার, অরুণ মজুমদারের বিশেষ আবেদনে, মাসিক নবকল্লোলের পাতায় একটি একটি করে প্রকাশ পায়, অনীশ দেব সৃষ্ট এই প্রাপ্তবয়ষ্ক ভয়ের গল্পগুলো। সিরিজ জাতীয় লেখার প্রতি লেখক বরাবরই উদাসীন। একটি থিতু চরিত্রকে নিয়ে অনেক বছর ধরে খান-চল্লিশেক গপ্পো লেখার মনোযোগ বা উদ্যোগ দুটোর কোনোটাই ওনার কাছে ছিল না, এ কথা অনীশ দেব নিজেই স্বীকার করেছেন এক সময়। ভূতনাথ তাই কিছুটা হলেও ব্যতিক্রমী, এবং তার গল্পগুলোর আবেদন এখানেই।
কে এই ভূতনাথ? তিনি আদতে একজন ভীতু মানুষ। ভূতের ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় আজীবন। সেই ভয় কাটাতে, এক তিব্বতী সন্ন্যাসীর নির্দেশে, তিনি 'বিষে বিষে বিষক্ষয়' নীতিতে উপনীত হন। ভূত, প্রেত, পিশাচ, অলৌকিক, অতিলৌকিক - এমন সকল বিষয়ে বহুল চর্চা করে, হয়ে ওঠেন এই ফিল্ডের একজন গণ্যমান্য বিশারদ। লোকেমুখে, প্রিয়নাথ হয়ে ওঠেন অকাল্ট গোয়েন্দা ভূতনাথ! এবং পাঠকের কাছে পৌঁছে যায় কিছু গল্পরুপি ঘটনা, যা বিশ্বাস করা বা না করা, খোদ পাঠকের মর্জি!
বইটি পড়ে হয়তো বা আপনি শিউরে উঠবেন না। হয়তো রাতের অন্ধকারে একা একা বাথরুমে যেতেও ভয় করবে না আপনার। তবুও বইটি একজন প্রকৃত হরর পাঠকের কাছে অবশ্যপাঠ্য। কারণ একটি শক্তিশালী অতিপ্রাকৃত সংকলন হিসেবে, বইটির আবেদন নিমজ্জিত তার বিষয়বস্তুর ব্যাপ্তিতে। কিছু গল্পের শুরু প্রথাগত বৃষ্টিস্নাত বৈঠকি চালে, যেখানে ফিরে ফিরে আসে কিছু চেনা আড্ডার মুখ। আবার কোনো গল্পে ঠিক যেন মিসির আলীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন প্রিয়নাথ, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন কোনো ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি।
প্ল্যানচেট, প্রেতচক্র, লাইকানথ্রোপি, পরাবাস্তবতা থেকে টাইম জাম্প, অভিশাপ, যৌনতা, পজেশন এবং আরো কত কিছু নিয়ে যেন স্রেফ 'খেলেছেন' লেখক। একজন হরর বিশারদকে প্রকৃত স্বাধীনতা দিলে, তিনি অন্ধকারের যেই রোমাঞ্চকর খেলায় মত্ত হতে পারেন, লেখক অনেকটা যত্ন সহকারে ঠিক সেখানেই অবস্থান করেছেন। কিছুটা এক্সপেরিমেন্টাল, কিছুটা চিরাচরিত চেনা অনীশ দেব। কৃষ্ণকায়, মনস্তাত্বিক এবং কোথাও গিয়ে যেন ভীষণ কাব্যিক! সাথে পাবেন সমীর সরকারের করা সেই সময়কার অপরিবর্তিত অলংকরণগুলো, যা এক লহমায় পাঠকদের স্থানান্তরিত করে এই শতাব্দীর শুরুর দিকে।
গল্পগুলো হয়তো বা আপনি আজীবন মনে রাখবেন না, কিন্তু তাই বলে চিন্তার খোরাক যে একেবারেই মিলবে না, সে দাবিও করছি না। কিছু গল্পের ব্যাখ্যাহীন উপসংহারের মনঃপূত উত্তরের খোঁজ, পাঠক মনকে প্রিয়নাথের সাহচর্যে ভাবতে বাধ্য করে। খুলতে বাধ্য করবে মনের এমন কোনো দরজা, যার আদিম গহীন অন্ধকারে সাধারণ মানুষের চোখ সইতে, অনেকটা সময় লেগে যায়!
গতানুগতিক ধারার ভূতের গল্পের মতো নয়, অভিনবত্বের ছোয়া রয়েছে নিঃসন্দেহে। কয়েকটা গল্প সত্যিকার অর্থেই ভয়ের আবহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। বিশেষ ভালো লেগেছেঃ -নন্দিনীর রাতের স্বপ্ন -মনের মতো বউ -আঁধারে মায়ার খেলা -সামান্য কুয়াশা ছিল -ছায়াবন্দি খেলা
বাংলায় ভূতের বা ভয়ের গল্পের কোন অভাব না থাকলেও সেই জঁর-টা কোন কারণে ‘ছোটোদের বিভাগ’ বলে নির্দিষ্ট হয়ে গেছে| এর ফলে প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রাপ্তমনস্ক ভয়ের গল্প পড়তে চাইলে বিশুদ্ধ বঙ্গভাষী পাঠককে প্রায়ই নিরাশ হতে হয়| এমতাবস্থায় বাংলায় রহস্য-রোমাঞ্চ-ভৌতিক ঘরানায় প্রায় ভগীরথ-সুলভ নিষ্ঠায় লেখালেখি করে চলা অনীশ দেব-এর এই সংকলনটির সঙ্গে আপনাদের পুনঃপরিচয় করিয়ে দেওয়ার সাধ হল| সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়-এর প্রচ্ছদ, সমীর সরকারের অলঙ্করণ, এবং সর্বোপরি অবিশ্বাস্য কম দাম (২০০১-এ প্রথম প্রকাশের সময়ে ৬০/-)-সম্পন্ন এই বইটি নিয়ে বলার কথা অনেক, কিন্তু আমি দুটি কথা বলেই থামব: (১) শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় তাঁর ‘ভূতান্বেষী বরদা’ চরিত্রের মাধ্যমে বেশ কিছু প্রাপ্তবয়স্ক এবং হাড়-হিম-করা গল্প উপহার দেওয়ার পর এই সংকলনে আমরা আবার পেয়েছি এক অকাল্ট ডিটেকটিভ প্রিয়নাথ জোয়ারদার-কে, যাঁর ভূত-প্রেত-পিশাচ ইত্যাদি নিয়ে চর্চার ফলে লোকের মুখে নামই হয়ে গেছে ‘ভূতনাথ’| তাঁরই ১০টি উপাখ্যান এই বইয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে পেশ করেছেন লেখক| (২) শুধু ভূতের বা ভয়ের নয়, ইংরেজিতে আমরা যাকে ‘হন্টিং’ বলি তেমনই দশটি অসামান্য গল্প রয়েছে এই বইতে, কিন্তু এই ধারার অন্য কোন গল্পে কি কখনও পেয়েছি এমন কাব্যময়তা, এমন শৈল্পিক বর্ণনা, এমন মায়া? আমার অপটু হাতে ব্যাপারটা ফুটবে না, তাই আমি গল্পগুলোর নামোল্লেখ করলাম, যাতে কিছুটা হলেও বোঝানো যায় যে শুধু ভয় পাওয়া আর পাওয়ানোর থেকে কত আলোকবর্ষ দূরের জিনিস এই লেখাগুলো: ১. অন্ধকারে, হাতে হাত রেখে ২. নন্দিনীর রাতের স্বপ্ন ৩. অলক্ষণের গণ্ডি ৪. ভয় পাওয়া মানুষ ৫. মনের মতো বউ ৬. আঁধারে মায়ার খেলা ৭. সামান্য কুয়াশা ছিল ৮. নগ্ন-নির্জন রাত ৯. কনে-দেখা আলোয় ১০. ছায়াবন্দি খেলা
‘ভাষা ও সাহিত্য’ কলেজ স্ট্রিটের সম্ভ্রান্ত প্রকাশকদের মধ্যে অন্যতম, তাই তার রিটেইল আউটলেট বা স্টল খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না| বইটির ই-সংস্করণ নেই, এমনকি এখন বইটি ছাপা আছে কি না: তাও জানা নেই| কিন্তু যদি বইটা যোগাড় করতে পারেন, তবে সত্যিই সেটা একটা বড়ো ‘পাওয়া’ হবে: এটুকু গ্যারান্টি দিচ্ছি|
ওপার বাংলার জনপ্রিয় লেখক অনীশ দেবের দশটা ভৌতিক ও অতিপ্রাকৃত গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে 'ভূতনাথের ডায়েরি' বইটা। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিখ্যাত 'নবকল্লোল' পত্রিকায় লেখকের এই দশটা গল্প প্রথম ছাপা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ওই দশ গল্পকে মলাটবন্দি করে অনীশ দেব পাঠকদের সামনে হাজির করেছেন 'ভূতনাথের ডায়েরি' নামে।
মূল চরিত্র প্রিয়নাথ জোয়ারদার ভূত-প্রেত বা অতিপ্রাকৃত বিষয়াবলী নিয়ে গবেষণা করেন। আর এটা করতে করতেই তাঁর নাম প্রিয়নাথ থেকে হয়ে যায় ভূতনাথ। তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে যে গল্পগুলো বেরিয়েছে সেগুলোর কয়েকটা সম্পর্কে একটু ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি আমার এই রিভিউয়ে। সেই সাথে কাহিনি সংক্ষেপের সাথে জানাবো আমার পাঠ প্রতিক্রিয়াও।
নন্দিনীর রাতের স্বপ্নঃ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. মল্লিকের কাছে এসেছে নন্দিনী নামের এক তরুণী। সমস্যাটা ভয়াবহ। প্রায় প্রতি রাতেই ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে মেয়েটা। আর সেই স্বপ্নের মাঝেই পৈশাচিক এক অতিপ্রাকৃত প্রাণীতে পরিণত হয়ে যায় সে। আর এসবের সাথে জটিয়ে আছে প্রাচীন এক কাঠের পেঁচা, যার চোখ দুটো মাঝরাতে সবুজাভ আভায় জ্বলে ওঠে। ড. মল্লিক কি এই অতিপ্রাকৃত সমস্যার সমাধান দিতে পেরেছিলেন?
গল��পটা বেশ তাড়াহুড়া করে শেষ করা হয়েছে বলে আমার ধারণা। তেমন একটা ভালো লাগেনি আমার কাছে।
মনের মতো বউঃ বিধানপতিবাবু বেশ সুপুরুষ ও সফল এক��ন মানুষ। তাঁর স্ত্রী শ্রীরাধা। কোন ছেলেমেয়ে হয়নি তাঁদের। সমস্যাটা অবশ্য বিধানপতিবাবুরই। এই মানুষটার একটা গুরুতর সমস্যা আছে। নিজের স্ত্রী শ্রীরাধার প্রতি উঠতে-বসতে তাঁর অভিযোগের কোন শেষ নেই। নানা ব্যাপারে অভিযোগ। একদম পান থেকে চুন খসতে যা দেরি, অভিযোগের তুবড়ি শুরু। শ্রীরাধাও স্বামীর এহেন আচরণে প্রায় মানসিক রোগীতে পরিণত হয়ে গেছেন। একদিন অফিস থেকে ফিরে বিধানপতিবাবু বাড়িতে একজন না, একই সময়ে একাধিক শ্রীরাধাকে দেখতে পেলেন। আর ব্যাখ্যাতীত এই ব্যাপারটাই একটা সময় তাঁকে ভয়ঙ্কর এক পরিস্থিতির মুখোমুখি করলো।
রীতিমতো গা শিউরানো এন্ডিং এই গল্পটার। ভূতনাথ জোয়ারদারের জবানীতে সুপ্রকাশ পালিতের বৈঠকখানায় বাকি সদস্যদের সামনে বলা তাঁর এই ভৌতিক গল্পটা আমার বেশ ভালো লেগেছে।
আঁধারে মায়ার খেলাঃ মাধুরী ও প্রমথেশ নাহা দম্পতি ভয়ঙ্কর এক বিপদে পড়ে সাহায্যের জন্য এসেছেন প্রিয়নাথ জোয়ারদারের কাছে। সমস্যাটা উনাদের এক বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে প্রথমাকে নিয়ে। মাত্র এক বছর বয়সেই মেয়েটা একদম পূর্ণবয়স্ক মানুষদের মতো কথা বলছে! মূল সমস্যাটা এর চেয়েও ভয়াবহ। বাচ্চা এই মেয়েটা কয়েকমাস আগে মারা যাওয়া তার ঠাকুরমার প্রেতাত্মা দ্বারা পজেসড। অশুভ এই আত্মার সাথেই প্রথমা কথাবার্তা বলে বা হাসিঠাট্টা করে। একমাত্র মেয়ের এমন তিলতিল করে শেষ হয়ে যাওয়াটা দেখতে পারছেননা নাহা দম্পতি। তাই ভূতনাথবাবুও উনাদেরকে সাহায্য করতে রাজি হলেন। প্রমথেশ নাহার বাড়িয়ে আয়োজন করা হলো প্রেতচক্রের। আর ঘটে যেতে লাগলো ভয়ঙ্কর কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনা।
পজেশন বেজড এই হরর গল্পটা মোটামুটি ভালোই লেগেছে আমার কাছে। মায়া যে কতো শক্তিশালী একটা আবেগ, তা বেশ বোঝা গেছে গল্পটা পড়ে।
নগ্ন নির্জন রাতঃ রূপশ্রী ওরফে রিমকি ভূত-প্রেতে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করেনা। এসব গল্প ওর কথায় 'ট্রু বোগাস স্টোরি'। বহুদিন পর নিজের পিসির বাড়িতে বেড়াতে গেলো মেয়েটা। বাড়িটা অনেক পুরোনো। পাশ দিয়েই চলে গেছে রেললাইন। সেই বাড়িরই একতলার এক বহুদিনের বন্ধ পড়ে থাকা ঘরে রাত কাটাতে হলো রিমকিকে। আর ওই ঘরেই মাঝরাতে প্রবেশ করলো এক অপার্থিব অবয়ব, যার ভালোবাসার আকাঙ্খা মরেনি আজও! ভয়ঙ্কর এক অভিজ্ঞতা রিমকির এতোদিনের অবিশ্বাসের ভিত্তিটাকে যেন টলিয়ে দিলো মাত্র এক রাতের ব্যবধানে।
সম্পর্কে ভাতিজির বান্ধবী রিমকির কাছ থেকে তার এই ভৌতিক অভিজ্ঞতা শুনে পাঠককে শুনিয়েছেন ভূতনাথবাবু। একটু অদ্ভুত টাইপের 'ভালোবাসার পাগল' ভূতের এই গল্পটা মোটামুটি ভালোই লেগেছে আমার।
কনে-দেখা আলোয়ঃ সুপ্রকাশ পালিতের বাড়িতে বরাবরের মতোই আসর বসেছে। আড্ডার মধ্যমণি প্রিয়নাথ জোয়ারদার ছাড়াও উপস্থিত আছেন বরেন মল্লিক, জগৎ শ্রীমানী ও বিজন সরকার৷ আজকের এই আড্ডাটা কন্যাসুন্দর আলো (শেষ বিকেল ও সন্ধ্যার আগের আলোয় যেকোন কুৎসিত মেয়েকেও সুন্দর দেখায়। আর সেই আলোই কন্যাসুন্দর আলো।) কেন্দ্রিক। ভূতনাথবাবু এই অবসরে সুজন নামের এক যুবকের গল্প বললেন। সুজন ভালোবাসতো চন্দ্রা নামের এক মেয়েকে। দুই পরিবারের সন্মতিতে বিয়ের দিনক্ষণও ঠিক হয়ে গেছিলো। ঠিক তার কিছুদিন পরেই পরিবার সমেত যেন একেবারে হাওয়ায় মিলিয়ে যায় চন্দ্রারা। পাগলের মতো ওদেরকে খুঁজতে থাকে সুজন। তারপর যখন চন্দ্রার দেখা ও পায়, এমন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় যার সাথে সম্পর্ক আছে শুধু একটামাত্র শব্দের - অন্ধকার!
গল্পটা আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। বিশেষ করে এর এন্ডিংটা। অন্য এক অন্ধকার পৃথিবীর আবহ বেশ ভালোভাবেই সৃষ্টি করেছেন এখানে অনীশ দেব।
এগুলো ছাড়াও 'ভূতনাথের ডায়েরি'-তে আছে অন্ধকারে হাতে হাত রেখে, অলক্ষণের গণ্ডি, ভয় পাওয়া মানুষ, সামান্য কুয়াশা ছিলো ও ছায়া বন্দি খেলা গল্পগুলো। সবগুলোই পড়েছি। সময় কাটানোর জন্য এই বইয়ের গল্পগুলো আমাকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে এই মুহূর্তে যখন আমি বাইক অ্যাক্সিডেন্টে আহত অবস্থায় শয্যাশায়ী।
প্রত্যেকটা গল্পই অলঙ্কৃত ছিলো প্রয়াত শিল্পী সমীর সরকারের আঁকা ছবিগুলো দ্বারা। সেগুলো মোটামুটি ভালো লেগেছে। রঞ্জন দত্ত'র করা প্রচ্ছদটাও চমৎকার লেগেছে। হরর আর অতিপ্রাকৃত কাহিনি পড়তে যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁরা চাইলে ট্রাই করে দেখতে পারেন 'ভূতনাথের ডায়েরি'।
কোন গল্পগ্রন্থের রেটিং দেয়াটা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে বেশি বেশ দুরূহ মনে হয়। তবুও সামগ্রিকভাবে একটা রেটিং দেয়ার চেষ্টা করছি।
প্রচ্ছদ দেখে প্রথমেই মনে হয়েছিলো বইয়ের নামে 'ভূত' থাকলেও ভেতরে তেমন 'ভয়' হয়তো নেই। সত্যিই তাই। মোট দশটা গল্প আছে যার সবই ভৌতিক গল্প হিসেবে খুবই নিম্ন মানের। না পড়াই ভাল
1. অন্ধকারে, হাতে হাত রেখে : একটি ট্রাক দুর্ঘটনায় জুমেলিয়া কে সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলে বাপ্পাদিত্য। কিন্তু তার একটাই ইচ্ছা...জুমেলিয়া কে অন্তত আর একটি বার দেখার। তখন তার বাকি চার বন্ধু... রঙ্গন, ঐন্দিলা, তিওয়ারি আর শৌনক ঠিক করে প্ল্যানচেটের মাধ্যমে জুমেলিয়ার আত্মা কে ডাকা হবে। আর তাদের এই কাজে যোগ দেন ঐন্দিলার মা ও তার বাবার বন্ধু প্রিয়নাথ তথা ভূতনাথ। তারপর....
2. নন্দিনীর রাতের স্বপ্ন : এখানে প্রিয়নাথ নন্দিনী নামে একটি মেয়ের গল্প শোনায়। সে প্রত্যেক রাতে একই ভয়ের স্বপ্ন দেখে। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে ডক্টর মল্লিকের চেম্বারে যায়। তারপর....
3. অলক্ষণের গণ্ডি : এমন একটি জায়গা.. যা অশুভ.. যা অভিশপ্ত.. যেখান থেকে কেউ কখনও ফিরে আসতে পারে নি। শুধু ভাগ্যের জোরে ফিরতে পেরেছিলেন পহেলা। কিভাবে? সেই কাহিনীই তিনি বলতে শুরু করেন প্রিয়নাথ কে। তারপর....
4. ভয় পাওয়া মানুষ : বিনোদনারায়ণের ছোট ভাই সুনীতনারায়ণের ফটোগ্রাফির খুব শখ। তাই মাঝে মধ্যেই সে ফটো তোলার ঝোঁকে এখানে সেখানে বেড়াতে বেরিয়ে পড়তো। এই শখই তাকে নিয়ে যায়.. সমস্তিপুর নামক একটি জায়গায়। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে এসেই এক অদ্ভুত অসুখে পড়ে সে। অসুখটা হল মাঝে মধ্যেই সে চিৎকার করে ওঠে। যে সে চিৎকার নয়.. মৃত্যু কে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে মানুষ বাঁচবার আশায় যেরকম চিৎকার করে ঠিক সেরকম। কোনরকম আশা না দেখে ডাক্তাররা যখন হাত তুলে দিলেন, তখনই বিনোদনারায়ণ ডেকে আনে প্রিয়নাথ কে। তারপর....
5. মনের মতো বউ : বিধানপতিবাবু ছিলেন খুবই খুঁতখুঁতে মানুষ। তিনি সব কিছু নিখুঁত পছন্দ করতেন। তাই তিনি চাইতেন.. তার বউ ও হবে একেবারে ভুল ত্রুটির উর্ধ্বে। কিন্তু কোনো সাধারণ মানুষই পুরোপুরি নিখুঁত হতে পারে না। আর তাই শত চেষ্টা সত্ত্বেও তার স্ত্রী শ্রীরাধা.. স্বামীর মন মতো হতে পারছিলেন না। তারপর....
6. আঁধারে মায়ার খেলা : এক বছরের ছোট মেয়ে মাম্পি কে.. তার ঠাকুরমা খুবই ভালবাসতেন। আর তাই মৃত্যুর পর ও সেই মায়ার টানে নাতনির থেকে দূরে যেতে পারলেন না তিনি । আর তাতেই শুরু হয় নানান সমস্যা। সেই সমস্যার সমাধানের জন্য মাম্পির মা বাবা ছুটে গেলেন প্রিয়নাথের কাছে। তারপর....
7. সামা���্য কুয়াশা ছিল : বাসুদেববাবু ওকালতি তে আসার আগে নানান পেশায় যুক্ত ছিলেন। 'দ্য হোস্ট' হোটেলের ম্যানেজার থাকাকালীন, তার জীবনে অদ্ভূত এক ঘটনা ঘটেছিল। হোটেল টি বেশিরভাগ সময়ই ফাঁকা থাকায়, কোনো বোর্ডার এসে যাতে জানতে না পারে সেখানে সব ঘরই ফাঁকা, সেই জন্য হোটেলের ম্যানেজার হরেকৃষ্ণবাবুর ঠিক করে দেওয়া দুটি কাল্পনিক নাম ও ঠিকানা সবসময় হোটেল রেজিস্টারে লেখা থাকতো। কিন্তু হাড়কাঁপানো এক শীতের রাতে সেই দুটি কাল্পনিক চরিত্রই জীবন্ত হয়ে উঠল বাসুদেববাবুর কাছে। তারপর....
8. নগ্ন নির্জন রাত : প্রিয়নাথের ভৌতিক অভিজ্ঞতার মোড়কে মোরা গল্পগুলো ১২ বছর আগের রূপশ্রীর 'বোগাস' বলে মনে হত। ভূত বলে যে কিছুই নেই সেটাই সে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতো। কিন্তু ১২ বছর পর তার সেই বিশ্বাসই বদলে গেল মর্মান্তিক এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে। "যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে/অথচ যার মুখ আমি কোনদিন দেখি নি"... কবিতার এই লাইন দুটো দিয়ে সে প্রিয়নাথ কে বলতে শুরু করে তার সেই অভিজ্ঞতার কথা, তারপর....
9. কনে দেখা আলোয় : সুজন ও চন্দ্রা... দুজনের দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের কথাবার্তা শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই চন্দ্রারা সপরিবারে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। প্রায় এক বছর ধরে ব্যর্থ খোঁজাখুঁজির পর হঠাৎই চলন্ত ট্রেনের কামরায় চন্দ্রার বাবা অপরেশবাবুর সাথে দেখা হয় সুজনের। তার কাছে চন্দ্রাকে একটিবার দেখবার প্রার্থনা ও তাদের এতদিনের আত্মগোপনের কারণ জানতে চায় সুজন। তারপর....
10. ছায়াবন্দি খেলা : কোনো সাহায্যের জন্য নয়, প্রিয়নাথ কে শুধুমাত্র নিজের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা শোনাতে চেয়েছিলেন অশেষবাবু।তার ধারণা এমন বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা তিনি কখনও শোনেননি। প্রথমে এড়িয়ে গেলে ও শেষপর্যন্ত তা শুনতে রাজি হয় প্রিয়নাথ। তারপর....
তারপরের.... পরে কিছু বলতে গেলেই প্রায় পুরো গল্পগুলোই বলা হয়ে যাবে। তাই সেগুলো জানতে অবশ্যই সবাই কে বইটি পড়তে হবে। তবে বইটি পড়ে কেউ আশাহত হবে না.. এইটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি। গল্পগুলো এক কথায় দুর্দান্ত। গল্প গুলো কে পেশ করার মধ্যে ও একটা বৈঠকি আমেজ আছে। ঠিক যেমন থাকতো শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এর 'বরদা' কে নিয়ে লেখা গল্প গুলোর মধ্যে। আর তাই বইটির কভারে লেখা... "শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরে এত নিষ্ঠাভরে প্রাপ্তমনস্ক ভৌতিক কাহিনী আর কেউ বোধহয় আমাদের উপহার দেননি".. কথাটার প্রতিটি অক্ষর সত্যি। প্রিয়নাথ তার পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছরের নানান অলৌকিক অভিজ্ঞতার কথা ডায়েরির মতন বারোটা মোটা মোটা বাঁধানো খাতায় লিখে রেখেছিলেন। আমার বিশ্বাস.. এই দশটি গল্প ছাড়াও আরো অনেক অনেক গল্প বন্দি রয়েছে সেই খাতাগুলিতে। তাই লেখকের কাছে আমার ছোট্ট অনুরোধ.. বাদবাকি কাহিনী গুলোকে ও ডায়েরির পৃষ্ঠায় বন্দি না রেখে আপনি পাঠকদের সামনে মেলে ধরুন।
.... প্রিয়নাথ যখন সদরিয়ায় পা রাখলেন তখন অন্ধকার এবং শীত জাঁকিয়ে বসে পড়েছে। কুয়াশা ঠেলে একটা চায়ের দোকানে এসে দাঁড়ালেন। দোকানে চার-পাঁচজন মানুষের জটলা। ওরা সব মুড়ি দিয়ে বসে কাঠের আগুন ঘিরে তাপ নিচ্ছে। গায়ে চাদর অথবা কম্বল। মাথায় গলায় মাফলার, নয় গামছা। দোকানে ঢুকে উনুনের কাছাকাছি একটা ভাঙা কাঠের বেঞ্চে বসলেন প্রিয়নাথ। ভাঙা-ভাঙা হিন্দিতে এক গ্লাস চা আর দুটো বিস্কুট দিতে বললেন।
হ্যাঁ.. ঠিক এইরকমই পটভূমিকা অলৌকিক গল্পের জন্য একেবারে যথার্থ । কিন্তু...
▪️গল্পের মূল কথক প্রিয়নাথ জোয়ারদার, তিন দশক ধরে ভূত-চর্চা করতে করতে তার আসল নাম পরিবর্তন হয়ে ‘ভূতনাথ’ হয়েছে, তার জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলি লিখে রাখতেন তার ডায়েরিতে । আর সেই ডায়েরির এইরকমই দশটি ঘটনা নিয়ে এই সংকলন ।
▪️গল্পগুলির মধ্যে বেশ একটা ‘বৈঠকি’ আমেজ রয়েছে, যে আমেজ আমরা শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের ‘বরদা’র গল্পগুলির মধ্যে পেয়েছিলাম । তবে সত্যিই কি গল্পগুলি প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম? ব্যক্তিগত ভাবে আমার একদমই তা মনে হয়নি । কয়েকটি গল্প সুন্দরভাবে শুরু হয়েছে, কিন্তু শেষে গিয়ে একেবারেই...... গল্পগুলির প্লট প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, সুতরাং ছোটরা গল্পগুলো উপভোগ করবে এইরকম ব্যাপারও নেই ।
আমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে সাজেস্ট করবো না এই বই কিনতে, কারণ এই মূল্যে এর থেকে অনেক বেশি ভালো বই পাওয়া যেতে পারে ।
ভূতনাথ একজন ভুত বিশারদ. তার অভিজ্ঞতা ও শোনা গল্প মিলিয়ে মোট ১০টা গল্প আছে. গল্প গুলো সাধারণ গল্পের মতো না. কয়েকটা সত্যি ভয়ের. পড়ার মনে হবে কোথাও এক যাওয়া চলবে না. গল্পের শেষ গুলো অনেকটা ছোট গল্পের মতো. পাঠককে কিছু জিনিসের ব্যাখ্যা নিজের মতো ভেবে নিতে হবে. এই শেষের শর্তটা মানতে পারলে গল্প ভালো লাগবে নতুবা লাগবে না. দারুন বই. পড়তে বেশি সময় লাগবে না.
লেখনীতে, তথাকথিত ভুত ছাড়াও অন্যরকমের অলৌকিক, অজানা ভয় উদ্রেককর এলিমেন্ট সংযোজন করার চেষ্টা করেছেন লেখক। গল্পগুলোতে ইউনিকনেস রয়েছে তবু পুরনো বাংলা ভূতের গল্পের সঙ্গে মিলও রয়েছে। তবে কোথাও যেন কিছু একটা অভাব মনে হলো!
কিছু কিছু গল্প কেমন যেন অসম্পূর্ণ ই রয়ে গেলো! প্রিয়নাথ কিন্তু সব ভুতুড়ে সমস্যার সমাধান করতে পারেন নি। হয়ত এখানেই এই চরিত্রের, গল্পগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট যা প্রিয়নাথ জোয়ারদারকে কোনো অতিলৌকিক ক্ষমতাশালী হিরোর পরিবর্তে আর পাঁচটা সাধারণ ভুতুড়ে অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি আগ্রহী মানুষদের একজন রূপে তুলে ধরে যাতে পাঠক তার সাথে নিজেদের একাত্ম করতে পারেন।