‘বিসর্গতে দুঃখ’ বাংলা সাহিত্যের উত্তর আধুনিক ধারার এক বই। জিজ্ঞাসু, বিহ্বল, অন্যমনষ্ক এক তরুণের ব্যক্তিগত বর্ণমালা পাঠ করতে গিয়ে আমরা মুখোমুখি হব আমাদের এই আশ্চর্য, স্ববিরোধী সময়ের সঙ্গে। ‘বিসর্গতে দুঃখ’ প্রচলিত অর্থে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ বা কবিতা নয়। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা বরং তাদের পারস্পরিক দেয়াল ভেঙে মিলিত হয়েছে এখানে।
Shahaduz Zaman (Bangla: শাহাদুজ্জামান) is a Medical Anthropologist, currently working with Newcastle University, UK. He writes short stories, novels, and non-fiction. He has published 25 books, and his debut collection ‘Koyekti Bihbol Galpa’ won the Mowla Brothers Literary Award in 1996. He also won Bangla Academy Literary Award in 2016.
লেখার স্টাইলের জন্য ৫/৫ কিন্তু গল্পের জন্য ৩.৫/৫ গড় = ৪.২৫
শাহাদুজ্জামানের লেখা প্রথম পড়া বই ক্রাচের কর্নেল। বইয়ে লেখার স্টাইলের জন্য যতটা মুগ্ধ হয়েছিলাম গল্পের জন্য ঠিক ততটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম। ইতিহাস নিয়ে আমার জ্ঞান কম, এই বইয়ের ইতিহাসের নির্ভরশীলতা নিয়ে অনেকের সন্দেহ থাকতেই পারে কিন্তু বইটা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। সে অনুসারে বিসর্গতে দুঃখ ততটা মুগ্ধ করতে পারে নাই। তবে বইটার লেখার স্টাইল সত্যি মুগ্ধকর।
বইয়ে উঠে এসেছে একজন ছন্নছাড়া বেকার যুবকের কথা, যে মেসে থাকে এবং অনেকটা একা একাই থাকে। নিজের সাথে নিজের একটা আলাদা সখ্যতা চলে আসলে মানুষ নিজের সুখ দুঃখ-গুলোকে নিজের মতো সাজায়। গল্পের নায়ক শফিকও নিজের সুখ দুঃখগুলোকে অ থেক বিসর্গ পর্যন্ত সাজিয়েছে। একেকটা বর্ণ জীবনের একেকটা অধ্যায়কে উৎসর্গ করেছে শফিক। সেই অধ্যায়গুলোর মাঝে কিছু অধ্যায় মন ছুঁয়ে গেছে। মনে হয়েছে এরেকটু বেশি কেন লিখলেন না লেখক! কিছু অধ্যায় মনে হয়েছে খুবই অযত্নে লেখা, হয়তো আরো ভালো লেখা যেতো। শফিকের জীবনের এইযে ছোট ছোট সুখ দুঃখের বুনন এই বইয়ে উঠে এসেছে, এর কিছু কিছু আমার আপনার জীবনেও আছে। আছে বলেই গল্প পড়ে একা একা হাসতে হবে, নিজের কাছে নিজের লজ্জা যেন কিছু সময়ের জন্য ধরা দিবে নতুন করে, নিজের হারিয়ে যাওয়া কিছু সুখ আর দুঃখ যেন জেগে উঠবে করুন সুরে।
বাঙলা ভাষায় লেখা খুবই ব্যতিক্রমি এবং অভিনব লেখনীধারার বই বিসর্গতে দুঃখ। সে হিসেবে অবশ্যই রেকমেন্ডেড একটা বই। না পড়ে থাকলে পড়তে পারেন। হতাস হবেন না।
"বিসর্গতে দুঃখ কেন, আর কি কোন শব্দ নেই? দুঃখ ছাড়া ছন্দ কীসে, বিসর্গতে দুঃখই সই..." মধ্যবিত্ত, বেকার এক যুবক, শফিকের জীবনের নানা ঘটনা যেনো ক্যালিডোস্কোপে সাজিয়েছেন লেখক শাহাদুজ্জামান - অ থেকে বিসর্গ পর্যন্ত প্রতিটি বর্ণ এক একটি গল্প, এক একটি দর্শন।গল্পগুলো যেন সুতো দিয়ে মালা গাথার মতো, কেমন যেন এক রেশ রেখে যায়। জীবনের বাইরে থেকে জীবনকে দেখার যে দার্শনিক প্রবৃত্তি, তা ধারন করেছে বইটির প্রতিটি অক্ষর। সাথে তো আছেই শাহাদ্দুজামানিয় লেখার যাদু। প্রতিটি বর্ণ হল আমাদের জীবনের কিছু উপাদান,যেগুলো নিয়ে আমরা কখনো ভাবি না, সত্যি বলতে ভাবতে চাই না, কারণ ভাবলেই আমাদের ক্ষুদ্রতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।জীবনকে নতুন করে দেখা, সহজাত প্রবৃত্তির বাইরে চিন্তা করতে শেখা- এতেই তো জীবনের সার্থকতা! এখানেই গল্পের শফিক হয়ে উঠি আমরা, নাগরিক জীবনের নাগপাশে ছিন্ন কিছু সাধারণ মানুষ । এখানেই অসাধারণ হয়ে উঠে বিসর্গতে দুঃখ - গল্প, উপন্যাস, না কবিতাধর্মী গাথা, নাকি লেখকের ভাষায় মেটাফিকশনটি!!!
শাহাদুজ্জামান উপন্যাসটি লিখেছিলেন ২০০৩ সালে এবং এই ভিন্নধাঁচের উপন্যাসটি নিয়ে আরও সুন্দর একটি লেখা লিখেছিলেন শহীদুল জহির। যেখানে তিনি একে 'মেটা ফিকশন ' বলে উল্লেখ করেন। যা উত্তরআধুনিকতার এক নবতম সংযোজন। বুঝতেই পারছেন শহীদুল জহিরের মতো মানুষের প্রশংসা "বিসর্গতে দুঃখ" কে আলাদা নান্দনিকতা দান করেছে।
অভিধানে যেমন অ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত শব্দের মানে থাকে। তেমনি শাহাদুজ্জামানের উপন্যাসের শিক্ষিত বেকার যুবক শফিকেরও একান্তই আপনার এক অভিধানের সন্ধান দেন ঔপন্যাসিক।
উপন্যাসের মূল চরিত্র টিউশনি করে জীবিকার্জন করে কায়ক্লেশে বেঁচে আছে। থাকে মেসে। তারই নিজের এক শব্দকোষ আছে। যেখানে অ থেকে বিসর্গ পর্যন্ত প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে আকড়ে ধরে আছে বেকার হাউস টিউটর ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো শফিকের পুরো জীবনকে।
শফিকের অভিধান শুধু এক বেকার ছেলের নিত্যদিনকার গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এই অভিধানের প্রতিটি শব্দ একএকটি করে কাহিনি। সে কাহিনি যেমন আলোকের, তেমনি তমিস্রার। তা কল্পনার ডানায় উঠে বেড়ায়, আবার চট করে নামিয়ে দেয় ধূলা ধূসরিত বাস্তবতায়।
মনোমুগ্ধকর ভাষা গাঁথুনি এবং সাহিত্যে শাহাদুজ্জামানের দখল অবাক করে দেওয়ার মতন। সেই দখলিসত্ত্বকে দেখানোর গরজ নেই ঔপন্যাসিকের। অথচ পাঠক এই একটি বইয়ের কল্যাণে বাংলা এবং বিশ্বসাহিত্যের রথী-মহারথীদের রত্নভান্ডারকে উন্মুক্ত করে দিতে চেয়েছেন।
নিঃসন্দেহে এই উপন্যাসে গল্প বলার স্টাইল নজর কাড়বার মতো এবং একে " মেটা ফিকশন" বা যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন তা সাহিত্যপাঠকে আরওবেশি রসময় ও সমৃদ্ধ করে তুলবে বলেই মনে হয়েছে।
এ যাবৎ আমার পড়া শাহাদুজ্জামানের সেরা লেখা! এই লোকের লেখা যত পড়ছি ততই অবাক আর মুগ্ধ হচ্ছি। আর জানি, এই মুগ্ধতার রেশ কখনো শেষ হবে না। 'বিসর্গতে দুঃখ'র মতো এত ব্যতিক্রমধর্মী লেখা সম্ভবত এর আগে পড়িনি। এটা গল্প, উপন্যাস না প্রবন্ধ এমন প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তবে বইয়ের ভূমিকা পড়ে মনে হলো বইটিকে কোনো তকমা পড়ানোর ব্যাপারে লেখকের কোনো আগ্রহ নেই।
কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির এই বইটিকে 'মেটাফিকশন' বলে চিহ্নিত করেছেন। অন্যতম প্রিয় এই কথাসাহিত্যিক তাঁর লেখক জীবনে এই একটিমাত্র গ্রন্থসমালোচনাই করেছিলেন; তাঁর গ্রন্থসমালোচনাটিও বইয়ের শেষে জুড়ে দেয়া হয়েছে, যেটা পাঠক হিসেবে অবশ্যই বাড়তি পাওয়া আমার কাছে।
বিসর্গতে দুঃখ কি ধরণের বই এ নিয়ে অনেক তর্ক হয়েছে। মোটাদাগে বইটাকে উপন্যাস বলা যেতে পারে। উপন্যাসে লেখক গল্প বলেন। এই বই এক বেকার যুবকের গল্প। আবার সন্দেহ হয় আদৌ কি গল্প আছে। আমরা পড়ার সময় জানতে পারি সেই যুবকের বুকের ভিতরের কিছু অনুভূতি। যার শেষ কথা দুঃখ। আবার রবি ঠাকুর, কাজী নজরুল থেকে শুরু করে দস্তয়েভস্কি, তলস্তয় আর হেগেল, ফয়েরবাখ, মার্ক্স পর্যন্ত সবার নাম পড়তে পড়তে মনে হয় লেখক বিষন্ন বেকার যুবক সেজে আড্ডায় মজেছেন।
মাঝে মাঝে মনে হয়, একটা অ্যান্ড্রয়েড শরীর নিয়ে যদি জন্ম নিতাম, এবং বুকে অপ্রয়োজনীয় ফুসফুস বা হৃৎপিণ্ড... এসবের বদলে কারখানা থেকে একটি লোহার বাক্স বানিয়ে দেয়া হতো যদি আমাকে। তবে ওই বাক্সে আমি রেখে দিতাম জীবনানন্দ দিয়ে বানানো একটি হাতপাখা অথবা রুমাল, ইমতিয়ার শামীমের লেখা প্রতিটি শব্দ, এলোমেলো দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মার্কেস, অসুখী দিন, তোত্তোচান। রাখতাম 'জুবোফস্কি বুলোভার'এর সবটুকু... আরও এটা-সেটা। এবং রেখে দিতাম 'বিসর্গতে দুঃখ'।
অ থেকে বিসর্গ পর্যন্ত প্রতিটি বর্ণ যেন একেকটা জীবনদর্শন। যা একজন আমার মতো ছেলেকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। শফিকের জায়গায় নিজেকে দেখতে মন্দ লাগেনি। অবশ্যপাঠ্য।
এক্সপেরিমেন্টের নাম শুনলেই আমরা ভুরু কুঁচকে যে বিষয়ের কথা ভাবি তা হচ্ছে কলেজের রসায়ানাগারে লবণ পরীক্ষার কথা। রিয়েজেন্ট এর যোজন বিয়োজনের ফলে বিক্রিয়ারত কেমিক্যালে প্রত্যাশিত রঙ ফুটে এলে দ্বিধান্বিত সবার মুখে যে হাসিটুকু ফুটত ঠিক সেই হাসিটুকুই কি লেখকের মুখে ফুটে যখন শব্দের নড়নচড়নে ন্যারেটিভ নির্ভর একটা এক্সপেরিমেন্টাল মেটাফিকশন তৈয়ার হয়?!
শাহাদুজ্জামানের মুখে ফোটা উচিত অন্তত। যে উদ্দ্যেশ্যে তিনি এই লেখা লিখবার প্রয়াস করেছেন তা অনেকাংশেই সফল। চেক সাহিত্যিক মিলান কুন্ডেরার ব্যক্তিগত ডায়েরীর আদলে লেখাটা হয়ত অনেক বেশি রিলেটেবল ছিল। শফিকের সাথে আত্মিক সম্বন্ধ অনুভব করেছি পড়তে গিয়ে। আমার আকাশ দেখার ইচ্ছে প্রকট কিন্তু ঢাকা শহরের আকাশ দেখায় দুটো বাঁধা। আকাশচুম্বী অট্টালিকার দরুন দৃষ্টিসীমায় প্রতিবন্ধকতা কিংবা সেই কাঠামোর একেবারে উঁচুতে উঠবার অপারগতা। কাঁচমোড়া সেই অট্টালিকার কোন একটি কিউবিকলে বসে চাকরি করতে পারলে হয়ত মন্দ হতো না কিন্তু জীবনানন্দ বলেই গেছেন, পৃথিবীতে নাই কোন বিশুদ্ধ চাকরি। শফিকের মতন বলতে ইচ্ছে হয়, জুটুক না হয় একটা দূষিত চাকরিই!
শফিকের গ্রামের ওলাউঠা থেকে বঙ্গদেশের কলেরার জীবাণু থেকে ইউরোপের আধুনিক শহরের ইনফ্র্যাস্ট্রাকচার গড়ে উঠার কাহিনী কিংবা শিশিভর্তি জ্বরের আদিম পথ্যস্বরূপ মিক্সচার; সবকিছুর বর্ণনাই মুগ্ধ করেছে, অবাক করেছে বারে বারে। দোটানায়ও ফেলেছে শফিকের জীবন; প্রতিটি অধ্যায় নাকি ছোট ছোট কিছু মুহুর্ত, কোনটি বেশি গুরুত্বের।
শফিকের জীবনজুড়ে এ উপাখ্যান যেন জীবনের চেয়েও বড়। স্লামডগ মিলিওনিয়ারের মতন প্রতিটা চ্যাপ্টারই সিগনেফিক্যান্ট, দাগিয়ে রাখার মতন লাইনে ভর্তি। শাহাদুজ্জামান মানেই মুগ্ধতা, আবারও প্রমাণিত হলো!
আমাদের শিক্ষাগ্রহণের প্রথম পাঠেই থাকে বর্ণমালা শিক্ষা৷ স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ মিলিয়ে ৫০ টা বর্ণ শিখেছিল শফিকও। শিখেছিল এই বর্ণগুলো দিয়ে তৈরি ভিন্ন ভিন্ন শব্দও। বেড়ে ওঠার সাথে সাথে পরিবর্তন আসতে থাকে শফিকের বর্ণমালায়, যোগ-বিয়োগ করে গড়ে ওঠে তার নিজস্ব এক বর্ণমালা। 'স্বরে অ' থেকে 'বিসর্গ' পর্যন্ত শফিকের এই নিজস্ব বর্ণমালা। যেখানে ফুটে ওঠে এক চাকরিপ্রত্যাশী বেকার যুবকের জীবনবোধ, নস্টালজিয়া, দুঃখ, হতাশা, সব মিলিয়ে আটপৌরে এক সাধারণ জীবনের গল্প। 'ৎ' তে সৎ হওয়াকে যার কাছে একটা দুর্দশার পাহাড় মনে হয়, তবুও সেই পাহাড়কে পাশ কাটিয়ে যেতে চায় না সে।
শাহাদুজ্জামানের 'বিসর্গতে দুঃখ' বাংলা সাহিত্যে একটি অনন্য সংযুক্তি। এই বইটি গল্প, উপন্যাস, বা প্রবন্ধ- এর কোনো একটিতে আবদ্ধ নয়। সাহিত্যিক বিচার-বিশ্লেষণ ধরলে হয়তো বইটিকে মেটাফিকশন বলা যায়। এখানে কাহিনী নিজেই নিজের উপর মন্তব্য করছে, পাঠককে কাহিনীর গঠন এবং অর্থ সম্পর্কে সচেতন করে তুলছে।
অন্যদিকে লেখক আবার এটিকে তার একটি ব্যক্তিগত বর্ণমালা বই বলে উল্লেখ করেছেন। মিলান কুন্ডেরার 'ব্যক্তিগত ডিকশনারি' ধারণাটার সাথে যার মিল পাওয়া যায়। এর বাইরেও এই বইয়ে অস্তিত্ববাদকেও সামান্য প্রশ্ন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে শাহাদুজ্জামানের আরও একটা চমৎকার বই। বইটা শেষ হওয়ার পর আরেকবার মনে হলো এতো চমৎকার কীভাবে লেখেন এই ভদ্রলোক! পড়ার সময় বারবার নিজেকে শফিকের জায়গায় বসিয়ে ভাবছিলাম, শফিক তো আমরাই। অল্পবিস্তর বদলে নিলে আমাদের গল্পই তো সবটা।
চন্দ্রবিন্দু তো অক্ষরের অলঙ্কার মাত্র। তাছাড়া চন্দ্রবিন্দু ব্যবহৃত হয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বেলায়। শফিকের কোনো বিশিষ্টতা নেই। শফিক চন্দ্রবিন্দুহীন মানুষ। অতএব শফিকের বর্ণমালা শেষ হবে ঃ তে। আর শৈশবের সেই প্রথম বর্ণমালা বইয়ে ঃ- তে ছিল দুঃখ। দুঃখই সই। দুঃখকে ডাকেনি শফিক, তবু দল বেঁধে দুঃখ আসে তার কাছে, যেমন আসে মেঘ।
ছোটবেলায় বর্ণমালার বইয়ে প্রথম অক্ষরের বুননে মামুলি শব্দেরা আটক হওয়া শুরু করেছে কুমলা (কাঁচা) মস্তিষ্কে। যত সময় পেরিয়েছে সেই মামুলি শব্দেরা ম্লান হয়ে জটিল শব্দেরা ভীড় জমিয়েছে। অ তে 'অজগর' থেকে অ তে অন্যমনষ্কতা, অসাড়, অম্লান-এর মতো ভারী ভারী শব্দ করোটির মধ্যে ধারণ হয়েছে। কিন্তু শৈশবের সেই প্রথম বর্ণমালার বইয়ে বিসর্গতে ছিলো দুঃখ। এই শব্দটার সঙ্গে এখনো নিবিড় এক বোঝাপড়ার সম্পর্ক অটুট রয়ে গেছে। বিসর্গতে তাই দুঃখই সই।
স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক শহিদুল জহির এরকম প্রশ্ন তুলে ধরছেন, “বিসর্গতে দুঃখ কেন? কারণ কি এই যে বিসর্গ দেখতেই চোখের পানির মতো? গুঁড়ো গুঁড়ো অশ্রুর মতো? কারণ কি এই যে জীবনের নদীতে সুখ ভেলা মাত্র, বাকিটুকু দুঃখ?” বিসর্গতে দুঃখ-কে জহির সাহেব মেটাফিকশন বলে উল্লেখ করছেন। বইয়ের লেখক জনাব শাহাদুজ্জামান আবার তাঁর বইকে বলছেন নিজের ব্যক্তিগত বর্ণমালার বই। এ নিয়ে আমি কোনো বিতর্কে যাবো না। তাঁদের দুজনের কথাই সই। একে আবার বড়দের বর্ণমালার বইও বলা যেতে পারে। এই কথাটায় একটু মনোযোগ দিতে হবে। বড়দের জন্য বর্ণমালা একই থাকলেও সেগুলোর বিন্যাসে গঠিত শব্দের ওজনে তারতম্য রয়েছে। একেকটা শব্দ তখন একেকজনের জন্য একেকরকম অর্থ কিংবা মানে বহন করে। শাহাদুজ্জামান স্যার সেসব শব্দকে পুঁজি করেই বইটি লিখেছেন। তাতে শব্দচয়ন ও বাক্য বিন্যাসে রেখেছেন নিপুণতার ছাপ। তিনি লিখেছেন, “অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসছে। শফিকের বুকের ভেতর গাঢ় হয়ে জমছে দুঃখ। কে যেন দুঃখের একটা মোমবাতি ধরে রেখেছে শফিকের হৃৎপিণ্ডের নিচে। হৃৎপিণ্ড পুড়ছে। রাতের বাতাসে হৃৎপিণ্ড পোড়ার গন্ধ। দুঃখের গন্ধ। বিসর্গতে দুঃখই সই।
শাহাদুজ্জামান লিখেন মনযোগী পাঠকের জন্য। যে মানুষগুলো ভাবনায় ডুবে গিয়ে গতানুগতিকের বাইরের কিছু খোঁজ করে,শাহাদুজ্জামান লিখেন তাদের জন্য।
লেখকের অনেক গুলো বই পড়ার সুযোগ আমার হয়েছে। প্রায় কটাই ভালো লেগেছে। শেষবার পড়লাম "বিগর্গতে দুঃখ",এটা শেষ করে সত্য ই বুঝলাম, এই বিশাল পাঠক গোষ্ঠীর জন্য শাহাদুজ্জামান লিখেন না। তিনি চিন্তাশীল মানুষদের ���িন্তা'র খোরাক যোগাতে ভালোবাসেন,তা না হলে " বিসর্গতে দুঃখ" এর মত চমৎকার একটা লেখা র কথা ভাবতেন না,আর ভাবলেও, সেটা ভাবনাতে ই থাকতো,প্রকাশ করতেন না।
" বিসর্গতে দুঃখ " পড়ে, আমি সিরিয়াসলি অবাক হয়ে গেছি। দুঃখ,বিষন্নতা, মানবের আশা ভঙ্গের ছবি কী দারুণ আঁকলেন ভদ্রলোক। আহ্! আর আমি খেয়াল করেছি,জীবনানন্দের মত "বিষন্নতা " শাহাদুজ্জামানের লেখায় বার বার ঘুরে ফিরে নানান ভাবে আসে। তবে এই বিষন্নতা চোখের জল দাবি করে না,এটা নতুন কোন চিন্তার উদ্রেক করে,নতুন কোন ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। বিসর্গতে দুঃখই সই। দুঃখই তো জীবন। সুখ তো দুঃখের নদীতে ভেলা মাত্র।
হারুন ভাই, আপনার কাছে কৃতজ্ঞ,আপনি না দিলে,এই অসাধারণ বইটা পড়তে আরো অনেক দেরি হয়ে যেতো আমার।
'বিসর্গতে দুঃখ', শহীদুল জহিরের ভাষায় যা একটা 'মেটাফিকশন'। আমার কাছেও মনে হয়েছে তাই। বরাবরের মতো শাহাদুজ্জামান আরেকবার সুখী করেছেন। আহ! ৯১ পৃষ্ঠার বই, যেন প্রতিটি বাক্যই দিয়েছে অন্যরকম স্বাদ।
শাহাদুজ্জামানের বইটি রচিত হয়ে একটু ভিন্ন ধাঁচে। শফিক নামে মধ্যবয়সী এক যুবকের জীবন ভ্রমণ, আবেগ এবং যাবতীয় আনন্দ-বেদনা রেলগাড়ির মত ছুটে বেড়িয়েছে। আর এসব কিছু লেখক চিত্রায়িত করেছেন 'অ' থেকে 'ঃ' পর্যন্ত ৪৮ টি বর্ণের রেলগাড়ি উপর ভর করে।
লেখক প্রতি শব্দ দিয়ে তৈরি করেছেন একটা শব্দ। এই যেমন, "অ-তে 'অন্যমনস্কতা'। শফিকের জন্য যুৎসই একটা শব্দ। যারা অভ্রান্ত, যারা সত্য কথাটা পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাদের মন সবমসময় হাতের কাছে থাকে।"
যদিও আমাদের শফিক ঠিক ওদের মত না। গল্পের শফিক উচ্চশিক্ষিত হতাশার চাদরে লুকিয়ে রাখা এক যুবক। যে জন্মের পর থেকেই জীবনের মানে খুঁজতে খুঁজতে আজ ক্লান্ত। ঠিক তখনি শফিকের মেসের সহঅধিবাসী বলেন, "চলিন শফিক সাহেব জুম্মাটা পইড়া আসি। চাকরি বাকরির যা মন্দা বাজার, মাঝে মইধ্যে আল্লা-খোদার নাম নেন। কাজে লাগবে।" কিন্তু ঈ-তে ঈশ্বর হলেও, শফিক তার ব্যাপারে অনেকটাই শীতল দোদুল্যমানতায় ভোগে।
ভ- তে ভালোবাসা। শফিক যার স্বাদ পায়নি কখনওই। শেষবার শফিকের শরীর জুড়ে শিহরণ জেগেছিল রুবিনার জন্য। শফিক যখন তার জন্য অপেক্ষা করত তখন বিষণ্ণ এই শহরকে তার মনে হতো কল্পলোক। "এক বিকেলে ঘাসের উপর রুবিনার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলো শফিক। যেন এক ছোট্ট ঘুঘুর ছানা, উড়তে জানে না, পথের ঠিকানা জানা নেই। ঐ ঘুঘুর ছানার ঘুমই কি ভালোবাসা?"
দিনশেষে শফিকের প্রিজন শব্দ, এ- তে 'একাকীত্ব'। শফিকই জানে, "এই একাকীত্ব জন্ম দিতে পারে বিকৃতির, অবৈধ প্রবৃত্তির, অযৌক্তিকতার। আবার জন্ম দিতে পারে মৌলিকতার, অজ্ঞাত সৌন্দর্য চেতনারও। একাকীত্ব তাই সৃজনশীল মানুষের মূল্যবান পুঁজি। একাকী মুহূর্তে কখনও কখনও শফিকের মনে হয় যাই, নষ্ট হয়ে যাই। কিন্তু সে সাহস কোথায়?"
শাহাদুজ্জামান তুলে এনেছেন মানুষের দুঃখকে, সুখকে। দেখাতে চেয়েছেন জীবন কত বর্ণের হয়; একটা শব্দের পর আরেকটা শব্দ, বইটি যেন অনেকটা পিরামিডের মত। অনেক জটিল। শফিকের শব্দ নিয়ে এই খেলা যেন, এই নষ্টনীড়ের হাজারো কন্ঠের প্রতিধ্বনি।
বিসর্গতে দুঃখ স্বর বর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে একটা শব্দ তৈরি করে তা নিয়ে জীবন ও বাস্তব ঘটনা নিয়ে দারুণ কিছু উপলব্ধি গল্প বলার মত করে বলে গেলেও মূলত তা আমাদের জীবনের ই গল্প।
লেখক শাহাদুজ্জামানের এ পর্যন্ত আমার যা কিছু পড়া সবই ভালো লাগে। "বিসর্গতে দুঃখ" চমৎকার।
" - জানো কি, একেলা কাহারে বলে? - জানি, যবে বসে আছি ভরা মনে, দিতে চাই নিতে নাই কেহ"
লেখক তার চিন্তাচেতনার সম্পূর্ণটুকু যেন শফিকের চোখ দিয়ে দেখেছেন। শফিকের মস্তিষ্কপ্রসূত ভাবনায় একবার আমরা আশেপাশের স্বার্থপরসূচক কাজ নিয়ে বিচলিত বোধ করি, রুবিনার সাথে শেষ চায়ের কাপে নিজের অযোগ্যতায় প্রেমিকার চলে যাওয়ায় প্রবঞ্চিত অনুভব করি আবার সতত জীবিকাচিন্তায় নিমগ্ন থাকা মানুষ হিসেবে একরকমের চাকরসুলভ ঔদাসিন্য আমাদের গ্রাস করে।
শব্দ ধরে ধরে এরকম মেটাফিকশন নির্মাণে শাহাদুজ্জামানের দক্ষতা পাঠক হিসেবে আমাদের অবাক করে। সাথে বিষয়ভিত্তিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মতামত আর এক লহমায় পুরো চারপাশকে বেধে ফেলার প্রবণতা তার প্রজ্ঞারই পরিচয়বাহী।
খুব সুন্দর রিভিউ দিয়েছেন শহীদুল জহির (সম্ভবত তার একমাত্র গ্রন্থসমালোচনা)। এর পরে আর বলার থাকে না। শুধু একটা জিনিসই মনে হয়, এরকম জিনিস পড়ে ফেলার আর লিখতে চাওয়ার মৌতাত তৈরি হওয়াটাই মনে হয় বইটার অনেক বড় সাফল্য।
কিছু প্রিয় লাইন: "যা কিছু হয়েছে অই অন্যমনষ্কতাটুকুর জন্যেই"- রবিঠাকুর মৈত্রেয়ী দেবীকে
" শফিকের মনে হয় এ শহরে দশদিক বলে কিছু নেই। আছে একটামাত্র দিক। সেটা হচ্ছে উপর। মানুষের চোখ কেবলই উপরের দিকে। ডানে নয়, বামে নয়, সামনে নয়, পেছনেও নয়, শুধুমাত্র উপরে। কে কতটা উপরে? তোমার সাদাকালো টিভি? আমার রঙিন, অতএব আমি উপরে। তোমার মারুতি? আমার পাজেরো, অতএব আমি উপরে। চারিদিকে সাপলুডুর মই খেলা। কে মইয়ের কোন ধাপে? কে উঠছে, কে নামছে? এ মই যেন এভারেস্ট ছাড়িয়ে, আকাশ ফুটো করে অনন্তের দিকে উঠেছে।"
"যে সর্বাঙ্গসুন্দর, ত্রুটিহীন তাকে কেমন শ্বাসরুদ্ধকর মনে হয় শফিকের। খানিকটা অসম্পূর্ণতার ফাক থাকলে বরং স্বস্তিবোধ করে। মনে হয় নিজের মত করে ঐ ফাক ভরে তুলবার একটা সুযোগ রইলো। সবচেয়ে ভালোর জন্য অপেক্ষা করে না শফিক, সে গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে টুকরো টুকরো অনেক সাদামাটা ভালোকে।"
"For sleeping is good, but death is better still. The best is never to be born at all"
" এক লোক বালতিতে বড়শি ফেলে বসে আছে। আরেকজনের জিজ্ঞাসা, মাছ পেলেন? লোকটির রেগেমেগে উত্তর, বালতিতে কখনো মাছ থাকে? আতিক বলতো, জীবনও এরকমই। আমরা সবাই জানি বালতিতে মাছ নেই, তবু বড়শি ফেলে বসে আছি। সে বলত, জীবনের মূল সত্যকে জানার চেষ্টা করে যাব, কিন্তু কখনোই জীবনের মূল সত্য কথা জানতে পারবো না, এটাই হলো জীবনের মূল সত্য"
"জীবন একটা বুঝিবার বিষয়, কিন্তু বুঝিল সে কে?"
"শফিক যেদিন প্রথম জিজ্ঞেস করে, " কী নাম আপনার?" রুবিনা কপট হেসে উত্তর দেয়, " আমার নাম মেয়ে"। মানবতার ওই তো প্রধান দুটি নাম, মেয়ে আর ছেলে। নারী আর পুরুষ। তাদের দেহগঠন, স্বপ্ন, স্বার্থ, জীবনযাপন একের চেয়ে অন্যের কতটা ভিন্ন। এই ভিন্নতা বৈচিত্র্য হিসেবে উদযাপিত হতে পারত, কিন্তু ভিন্নতা জন্ম দিয়েছে বৈষম্যের, বৈরিতার। নারীর কাছে পুরুষ হয়ে উঠেছে এক দূরবর্তী, দুরন্ত, ভীতিকর প্রাণী। কিন্তু পুরুষ, নারীর এক আশ্চর্য শ্রেণিশত্রু। কোন এক শ্রেণীর উৎখাতের মধ্য দিয়ে অভিনব এই শত্রুর মধ্যে দ্বন্দ্বের নিষ্পত্তি সম্ভব নয়, সম্ভব পরস্পরের মিলনের মাধুর্যতায়। কথা ছিল থাকবে দুধরনের মানবতা, ভিন্ন কিন্তু সমান। কিন্তু কে কথা রাখে?"
" তোমরা এমন এক পৃথিবী গড়ে তোল যা একাধারে তৈরি হবে যুক্তি আর মায়া দিয়ে। যুক্তি দিয়ে তোমরা রাষ্ট্র গড়, অর্থনীতি চালাও আর মায়া দিয়ে সাজাও মানুষের পরস্পরের সম্পর্ককে" - গ্রীক দার্শনিক।
"লিখি কারণ না লিখলে হাত ব্যথা করে- আদ্রে জিদ"
"এদেশের তরুণেরা সব গোখরা সাপ হয়ে জন্মে আর ঢোঁড়া সাপ হয়ে মারা যায়- রামকৃষ্ণ "
সেই পুরনো কথাটা আবারও মনে পড়ে গেল—আমরা সবাই জীবনানন্দের ভাঙতি।
বইটা তো ঠিক ফিকশন না, আবার ননফিকশনও না। শহীদুল জহির এটাকে ডেকেছেন মেটাফিকশন নামে। আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, ফিকশনের আগে মেটা ব্যাটা কীভাবে এসে বসে, জানি না। আমি এটাকে দেখছি প্রিয় লেখকের খসড়া চিন্তা হিসেবে। সেই চিন্তাজুড়ে বুদ্ধ থেকে বুদ্ধদেব বসু পর্যন্ত অনেকেই উড়ে বেড়াচ্ছেন। আর সবার ওপরে যেন জীবনানন্দের চশমাটা বসানো—সেই চশমা একবার সবকিছু ফিল্টার করে নিচ্ছে। কাজেই গল্পের…থুড়ি, মেটাগল্পের নায়কের ঘরজুড়ে জোছনার আলো-আঁধারিতে মায়াবী অলীক জীবের মত উড়ে বেড়াচ্ছে ইঁদুর। সে চারিদিকে তাকাচ্ছে প্যাঁচার মত চোখ করে, চারপাশে শুনছে খরগোশের মত কান করে।
কে জানে, হয়তো শহীদুলের সংস্পর্শে এসেই শাহাদুজ্জামান সাহিত্যিক হিসেবে এতটা দুঃসাহসী হয়ে উঠেছেন!
একটা গল্পের স্বাদ একবার নিতেই ভালো লাগে। তবে কিছু কিছু গল্প থাকে যা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় আবার প্রথম থেকে শুনি। শাহাদুজ্জামানের বলা শফিকের গল্পটাও সিলন গোল্ডের কড়া এক কাপ চায়ের মতো। গল্প শেষ কিন্তু রেশ রয়ে গেল।
এই ধরনের বলার স্টাইলের সাথে পূর্বপরিচিত নই আমি। বই শেষে দেখলাম অন্য এক স্বনামধন্য লেখক এই ধরনকে ``মেটাফিকশন" নাম দিয়েছে। এই ধরনের লেখা কেন কম হয় তার কারণ বোধহয় এই ধরনের লেখা লিখতে গেলে লেখকের প্রচুর জানতে হয়। সমস্ত বই জুড়ে এতো এতো বিষয় প্রাসঙ্গিকভাবে চলে এসেছে যে আমার মনে হয়েছে শুধু ঐ বিষয়গুলো নিয়েই আলাদা আলাদা করে বই লেখা যেতো। শফিকের রাজনীতি তে না জড়ানো, মুনিরের নিজের কাছে নিজের বন্দিত্ব, মাহবুব ভাইয়ের হতাশা একটা বই হওয়ার জন্য যথেষ্ট মনে হচ্ছিল।
``বিসর্গতে দুঃখ'' চঞ্চল পড়ুয়াদের থমকে দেবে, ভাবুক পাঠকদের আরও খানিকটা ভাবনার যোগান দিবে বলে বিশ্বাস করি।
বাংলা বর্ণমালার প্রতিটা বর্ণে জীবন রাঙিয়েছেন লেখক। একটি বর্ণ বাদ গিয়েছে কেবল। চন্দ্রবিন্দু। একটি সম্মাননীয় বর্ণ বটে। লেখক গল্পের নায়ককে সর্বনামে চন্দ্রবিন্দু পাওয়ার যোগ্য করে গড়েননি। অর্থাৎ নায়ক নিজেই নিজের ব্যক্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান। বাকি বর্ণগুলো জীবনের প্রতিটি ঘটনাকে একপলকে চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
শাহাদুজ্জামানের ‘কয়েকটি বিহ্বল গল্প’ পাঠ করে পরিচিত হয়েছিলাম গল্পের এক নতুন জগতের সাথে। সেই সময় বইটির একটি উচ্ছ্বসিত রিভিউও লিখেছিলাম। ২০১৮তে শাহাদুজ্জামানের গল্প পড়ার পর অন্য কোনো গল্পকারের কমপ্লিট কোনো গল্প পড়েছি বলে মনে পড়ে না। শাহাদুজ্জামানেই বুঁদ হয়েছিলাম। কয়েকটি বিহ্বল গল্পের রিভিউ লেখার সময় বলেছিলাম শাহাদুজ্জামান গল্পকে নববধূর অলংকার পরিয়েছেন। এরপর ‘পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ’, ‘কেশের আড়ে পাহাড়’, ‘অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প’ এই তিনটি গল্পগ্রন্থ পাঠ করা হয়েছে। প্রত্যেকটিতেই তিনি নিজের নিরীক্ষামূলক লেখনী দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন। সেগুলোর বিস্তারিত আলাপ না হয় অন্য কোনোদিন করব। গল্পের বাইরে শাহাদুজ্জামানের ‘ক্রাচের কর্নেল’ পড়া হয়েছিল। কিন্তু গল্প এবং উপন্যাসের বাইরে শাহাদুজ্জামান রচিত ভিন্নধারার একটি বই পাঠ করা হলো আজ। সকাল থেকে ইলেক্ট্রিসিটি না থাকায় এই সুযোগ তৈরী হলো। এবারও ঠিক তেমনি অভিভূত হলাম যেমন হয়েছিলাম ‘কয়েকটি বিহ্বল গল্প’ পড়ার পর।
‘বিসর্গতে দুঃখ’ নামক এই বইতে শাহাদুজ্জামান বাংলা ভাষার আটচল্লিশ বর্ণে উপস্থাপন করেছেন শফিক নামক এক যুবকের মনস্তাত্বিক উপাখ্যান। অথবা বলা যায় শফিক চরিত্রটির আড়ালে তিনি নিজেরই মনস্তাত্বিক ভাবনাকে এক অভিনব পন্থায় উপস্থাপন করেছেন। বইটার আঙ্গিক ছিল নির��ক্ষামূলক। বাংলা ভাষার এক একটা বর্ণে আশ্রয় করে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের টুকরো টুকরো ভাবনার কথা। যে টুকরো ভাবনাগুলো ছিল পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। বইটিতে ফুটে উঠেছিল টালমাটাল সামাজিক এবং রাজনৈতিক এক সংবেদনশীল যুবকের জীবনযাপনের কাহিনী। ‘অ’ থেকে শুরু করে বিসর্গ পর্যন্ত (চন্দ্রবিন্দু বাদ দিয়ে) বাংলা বর্ণমালার আটচল্লিশ অক্ষর দিয়ে তিনি তাঁর চিন্তার রেলগাড়িতে একেকটি করে বগি যুক্ত করেছেন এবং এই চিন্তার রেলগাড়ির নাম দিয়েছেন ‘বিসর্গতে দুঃখ’। প্রতিটি অক্ষরেই ফুটে উঠেছে তার গভীর জীবনবোধ এবং ভাবনার প্রসারতা। যা পাঠককে অভিভূত করবে নিঃসন্দেহে।
এই বইটিকে কোন জনরায় ফেলা হবে তা নিয়ে হয়েছে অনেক আলোচনা। দৃশ্যত এটিকে ফিকশনও বলা যায় না, আবার নন ফিকশনও বলা যায় না। প্রয়াত কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির বইটিকে বলেছেন মেটাফিকশন। মেটাফিকশন হচ্ছে পোস্টমডার্ন তথা উত্তর আধুনিক ধারার সাহিত্য। বাংলাতে এর কোনো সংজ্ঞা খুঁজে না পেয়ে দ্বারস্থ হলাম ইংরেজির। সেখান থেকে যা বুঝলাম তা হচ্ছে, মেটাফিকশন হলো ফিকশনের এমন একটি ফর্ম বা ধারা যার গঠনপ্রণালী পাঠককে জোরালোভাবে কন্টিনিউয়াসলি স্মরণ করিয়ে দিতে থাকে যে, সে কোনো ফিকশন তথা সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম পাঠ করছে। শহীদুল জহির বলেছেন, ‘আমার মতো করে আমি বুঝি যে এর প্রকরণ, চেহারা এবং স্বাদ অন্য রকম। এই কথাসাহিত্য আধুনিক মন ও মননের অবশ্যম্ভাবী ফল’। বাংলা সাহিত্যে এ ধরণের মেটাফিকশন ইতিপূর্বে কেউ লিখেছেন কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও শাহাদুজ্জামান যে একে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।