ফয়েজ আহ্মদ (English : Faiz Ahmed) বাংলাদেশের প্রথম সারির সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ব্রিটিশ ভারতে ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার বাসাইলভোগ গ্রামে এক সামন্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন(গ্রামটি বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তর্ভূত)। তাঁর পিতা গোলাম মোস্তফা চৌধুরী এবং মাতা আরজুদা বানু। ১৯৪৮ সাল থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। তিনি ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদ ও পরবর্তী সময়ে পূ্র্বদেশ এ চিফ রিপোর্টার ছিলেন। সাপ্তাহিক ইনসাফ ও ইনসান পত্রিকায় রিপোর্টিং করেছেন। তিনি ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত মুক্ত চিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল লেখকদের সংগঠন পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের প্রথম সম্পাদক ছিলেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনে এবং ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি পিকিং রেডিওতে বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান প্রবর্তক ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান সম্পাদক। তিনি প্রধানত শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর বইয়ের সংখ্যা প্রায় একশ। ফয়েজ আহমদের বইগুলোর মধ্যে 'মধ্যরাতের অশ্বারোহী' সবচেয়ে বিখ্যাত। ছড়ার বইয়ের মধ্যে-'হে কিশোর', 'কামরুল হাসানের চিত্রশালায়', 'গুচ্ছ ছড়া', 'রিমঝিম', 'বোঁ বোঁ কাট্টা', 'পুতলি' 'টুং', 'জোনাকী', 'জুড়ি নেই', 'ত্রিয়ং', 'তুলির সাথে লড়াই', 'টিউটিউ', 'একালের ছড়া' উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও তিনি চীনসহ বিভিন্ন দেশের পাঁচটি বই অনুবাদ করেছেন। এর মধ্যে হোচিমিনের জেলের কবিতা উল্লেখযোগ্য। তিনি ঢাকার প্রাচীন ও সুবৃহৎ আর্ট গ্যালারী 'শিল্পাঙ্গণ' ও প্রগতিশীল পাঠাগার 'সমাজতান্ত্রিক আর্কাইভ' এর প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার,শিশু একাডেমী পুরস্কার,সাব্বির সাহিত্য পুরস্কার,একুশে পদক,নুরুল কাদের শিশু সাহিত্য পুরস্কার,মোদাব্বের হোসেন আরা শিশু সাহিত্য পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। তিনি ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রবীণ সাংবাদিক ফয়েজ আহমদের "মধ্যরাতের অশ্বারোহী" ট্রিলজির প্রথম বই বেশ আগ্রহ জাগানিয়া ছিলো,তারই ধারাবাহিকতায় মনে সুপ্ত ইচ্ছে ছিল অন্যদুটো বই পড়ার। "সত্যবাবু মারা গেছেন (Mr. Truth Is Dead) " এই সিরিজের দ্বিতীয় বই। দীর্ঘ তিনদশকের সাংবাদিক জীবনের কথকথা বৈঠকী ঢঙে লিখেছেন এই অগ্রজ। মূলত ষাটের দশকের থেকেই কাহিনীর সূত্রপাত যার সমাপ্তি মোটামুটি পঁচাত্তরে গিয়ে। একজন মানবিকবোধ সম্পন্ন, সমাজ সচেতন সাংবাদিকের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে ব্যক্তিক ঘটনার সাথে তাল মিলিয়ে। একজন সাংবাদিকের জীবন যে কতটুকু রোমাঞ্চকর তা ফয়েজ সাহেবের লেখা না পড়লে জানতেই পারতাম না।সাংবাদিকরা স্রেফ চাপে পড়ে কতশত সত্য প্রকাশে বাধাপ্রাপ্ত হন আমরা আমজনতা কল্পনাও করতে পারবো না। পাকিস্তানি সেই ডিক্টেটর যুগের রাজনীতির নিষিদ্ধ গলির অনেক অজানা তথ্যকে বেশ ভালো করেই উপস্থাপন করেছেন প্রাবন্ধিক। কীভাবে নানা সেন্সরশীপের মধ্যেও জনগণ কে সত্য জানানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতেন তৎকালীন সংবাদকর্মীরা সেই জগৎ নিয়েও কিছু ধারণা পেয়ে যাবেন। ফয়েজ সাহেব তৎকালীন চাটুকার সাংবাদিকদের কথা ও সেই সাথে সংবাদকর্মীদের দায়িত্ববোধ নিয়ে চমৎকার কিছু ঘটনা গপ্পো আকারে শুনিয়েছেন (লিখেছেন)। মুক্তিযুদ্ধপূর্ব প্রেক্ষাপট আর স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে তার নিজের রয়েছে ভালো বিশ্লেষণ যা চিন্তার খোরাক যোগায়। আর একটা কথা, আত্মকথন টাইপ হলেও বইটা তৎকালীন দেশীয় রাজনীতির সাথে আন্তর্জাতিক রাজনীতির হালচাল নিয়েও পেয়ে যাবেন বেশকিছু ইনফো।
আসেন কিছু সমালোচনা করি,ফয়েজ সাহেব বৈঠকী ঢঙে লিখতে গিয়ে মাঝেমধ্যে খেই হারিয়ে শুধু ব্যক্তিজীবনের কচকচানি বেশী দিয়েছেন। প্রায়শই ধরে রাখতে পারেন নি ঘটনার ধারাবাহিকতা যা কিঞ্চিত দৃষ্টিকটু লেগেছে আমার কাছে। অনেক কথা আবার সম্পূর্ণ করেন নি বা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সবচে' পক্ষপাতপুষ্ট মনে হয়েছে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে ফয়েজ সাহেবের একচোখা বিশ্লেষণ, তিনি যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশে সংগঠিত পরিস্থিতির জন্য একপেশে ভাবে বিশেষ দলকে দায়ী করে নিজের সাংবাদিকতার দায় সেরেছেন যা গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। সার্বিক বিবেচনায় বইটা (বেশ)ভালো লেগেছে। নিঃসন্দেহে চার তারকা দিচ্ছি।