ভবিষ্যৎ বর্তমান হয়, বর্তমান অতীত- এ যেমন সত্য, তেমনি এও সত্য যে, অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে যেতে হয়। মানুষের জীবনে এই দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটিই অধিকতর ক্রিয়াশীল। এরই নাম ইতিহাস, ক্রমবিকাশও একেই বলে । সমাজ, রাজনীতি ও জীবনধারায় ভাংচুর ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জীবন এই প্রক্রিয়াতেই অগ্রসর হয় এবং এই ধারাতেই ব্যক্তি, সমাজ ও জাতি নিজেকে আবিষ্কার করে। এই উপন্যাস এ চারটি প্রজন্মের চিন্তাভাবনা ও জীবন যাপনের ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে আত্ম আবিষ্কারের কাহিনি গভীর বিশ্বস্ততার সঙ্গে নির্মিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে ওয়ারিশ অবশ্যই বিশিষ্ট সংযোজন বলে বিবেচিত হবে।
Shawkat Ali (Bangla: শওকত আলী) is a major contemporary writer of Bangladesh, and has been contributing to Bangla fiction for the last four decades. Both in novels and short stories he has established his place with much glory. His fiction touches every sphere of life of mass people of Bangladesh. He prefers to deal with history, specially the liberation war in 1971. He was honored with Bangla Academy Award in 1968 and Ekushey Padak in 1990.
এই বই গুলো এভাবে চাপা থাকা উচিৎ নয়। সবাই পড়ুন আর অপরকে পড়তে বলুন। ২০৭ পেজ এর বই। খেলাফত আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন, বেয়াল্লিশের দাঙ্গা, ৪৭ এর দেশভাগ পর্যন্ত উঠে এসেছে। দেশভাগের পর নিজ জন্মভূমিতে থাকতে চেয়েও থাকতে পারেন নি মুরশেদ আলী প্রধাণ। কিভাবে তাকে বাধ্য হয়ে জন্মভূমি ছেরে চলে আসতে হয় পড়ে দেখুন। একটি পরিবারের প্রাচীন ঐতিহ্য সম্মান সংস্কৃতির এতো সুন্দর বর্ণনা যে মুগ্ধ হয়ে পড়ে গেছি পুরো বই। একটি মুহূর্তের জন্যও বিরক্ত হতে হয়নি কোথাও। সবচেয়ে বিস্ময়কর চরিত্র সালমা খাতুন। আসলে এই বই এর প্রতিটি চরিত্র সমান ভাবে শক্তিশালী। বইটা সামান্য একটু অগোছালো মনে হয়েছে। সাহিত্যিক বিচারে হয়তো কিছু ত্রুটি থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু কে বসেছে বই এর আঙ্গিক বিচারে। লেখক তখন ই সফল যখন পাঠক তার লেখা পড়ে আনন্দ পায়।
(আমি কি লিখেছি নিজেই হয়তো কিছুদিন পর পড়লে হাসি পাবে। কিন্তু এমন একটি বই অবশ্যই পড়া উচিৎ এই আমার কথা গুলোর উদ্দেশ্য ছিল।)
"যে স্বাধীনতা আমার পরিবারের কাজে লাগবে না, সমাজের কাজে লাগবে না, জাত ভাইয়ের কাজে লাগবে না সে স্বাধীনতায় আমার কোনো আগ্রহ নেই।"
শওকত আলী ক্রমাগত এক বিস্ময় হয়ে ধরা দিচ্ছেন আমার কাছে। "ওয়ারিশ" এ আছে চার প্রজন্মের গল্প। এর মধ্যে প্রথম প্রজন্ম প্রবলভাবে বৈষয়িক, দ্বিতীয় প্রজন্ম আদর্শবাদী ও ভাবুক, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্ম নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় শ্রান্ত। গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে এক ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সময়ে, পশ্চিমবঙ্গের পটভূমিকায়, হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক, নারী শিক্ষা,দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদের জাগরণ লেখক বয়ান করেছেন মূলত মুর্শেদ আলী ও সালমা বেগমের সংসারকে কেন্দ্র কোরে। উপন্যাসের সবচেয়ে সুলিখিত ও উত্তেজনাপূর্ণ অংশে আছে বিরুদ্ধ পরিবেশে সালমা বেগমের পড়ালেখা শেখা, এ কারণে চরিত্রহীনার অপবাদ শোনা, মুর্শেদ আলী ও সালমা বেগমের দ্বন্দ্ব, মুর্শেদ আলীর কংগ্রেসনির্ভর ও সালমা বেগমের মুসলিম লীগকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং সবশেষে স্বপ্নভঙ্গ। চতুর্থ প্রজন্মের গল্পে শুরুতে সম্ভাবনা থাকলেও পরে পরিণত হয় ছেলেমানুষি প্রেমকাহিনিতে, বইটি শেষও হয়েছে এই বিন্দুতে এসে, যা যারপরনাই হতাশাজনক। তারপরও ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণকে নিপুণতার সাথে তুলে ধরার জন্য "ওয়ারিশ" আমাদের মনোযোগের দাবিদার।
পড়ছি। ঠিক ডুবে যেতে পারছি, বলবো না। মূল চরিত্র রায়হান স্পষ্টতই লেখকের ছায়া। দেশভাগ এবং দেশান্তরের কয়েক দশক পরে ঢাকার এক মাঝবয়েসী সাংবাদিক এপার থেকে ওপারে গেছেন, ছোটবেলায় চলে আসার পর প্রথমবারের মত, সঙ্গে বগলদাবা করে নিয়ে গেছেন মেডিকালে পড়া বড় ছেলেকে। উদ্দেশ্য - সম্পত্তির হিসাব, সম্ভব হলে বহু বছরের পাওনা টাকা আদায়। পরিবারের বিস্তর জমি-জিরাত ছিল, তবে তার সবই গেছে অনেক আগে জলের দামে - দামটাও মেটানো হয়নি ঠিক মত। তাই আশির দশকে এসে বয়স্ক রায়হান পেপারের চাকরি থেকে লম্বা ছুটি নিয়ে উত্তরবঙ্গের মোহনগঞ্জে হাজির, ফের বছর ত্রিশ পরে। অত:পর নস্টালজিয়া, আবছা স্মৃতি, নিরন্তর ফ্ল্যাশব্যাক।
কয়েকটা জিনিস চোখে লাগছে। লেখকের চাপা রোষটা ঢাকা আছে ভালো মত, কিন্তু মাঝে মাঝে সেটা ফিক করে বেরিয়ে আসে। সেই resentment এর কারনটা কি পুরোপুরি বৈষয়িক না কিঞ্চিত হলেও সাম্প্রদায়িক, সেটা একটা প্রশ্ন থেকে যায়। হারানো সম্পত্তির হিসাব-কিতাব, কার কাছে কত হাজার পাওনা ছিল - এইসবের দীর্ঘায়িত ফিরিস্তি - টের পাওয়া যায় যে পুরনো বেইনসাফিগুলো ভুলতে পারেননি রায়হান (বা লেখক?) পুরনো ঘা খুটে খুটে দেখা যায় সব কাঁচাই রয়ে গেছে এত বছর পরেও।
তবে পুরোটাই নেগেটিভ নয়। এইসব বাদেও উত্তরবঙ্গের মিশেল syncretic সংস্কৃতি - লোকজ আচার ধম্মোকম্ম, আঞ্চলিক উপাখ্যান আর রূপকথা, নানান সংস্কার কুসংস্কার - ইত্যাদির একটা চমতকার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে এখন পর্যন্ত। রায়হানের বাপ মুর্শেদেকে ঘিরেও একটা সমান্তরাল স্টোরিলাইন আছে, সেই গল্প চলছে প্যারালেল ফ্ল্যাশব্যাকে - গান্ধীজি, সত্যাগ্রহ, স্বরাজ। লেখকের বাবা বুদ্ধিজীবী ডাঃ খোরশেদ আলী সরকার সম্ভবত মুর্শেদের মডেল। দেখা যাক গল্প কোথায় নিয়ে যায় এদের শেষ পর্যন্ত।
*
(এক সপ্তাহ পর)
বেশ বেগ পেতে হলো বইটা শেষ করতে। মাত্র ২০০ পাতার বই তবু শেষ হতে চায় না। পাঠক হিসেবে কিছু মন্তব্য -
# প্রদোষে প্রাকৃতজন-এ বাংলা ভাষা নিয়ে যেমন দুর্ধর্ষ সাহসী ও সফল এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন শওকত আলী, এই বইয়ে তা অনুপস্থিত। হ্যাঁ, প্রদোষে-র সেই এক্সপেরিমেন্টের পেছনে গল্পের সময়কাল ও ঐতিহাসিক পটভূমি একটা বড় নির্ণায়ক, সেটা ওয়ারিশে প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। কিন্তু তবুও, এই বইয়ের ভাষা বেশ সাদামাটা, একই লেখক যে একটি যুগান্তকারী টাইপের উপন্যাস লিখে ফেলেছিলেন বোঝা মুশকিল।
# ভাষা তো সাদামাটা আছেই, বেশ প্যাঁচালোও বটে। এমনিতেই ফ্ল্যাশব্যাক স্মৃতি-নির্ভর উপন্যাস, বারবার সামনে পেছনে করতে করতে এক পর্যায়ে ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। এজন্যে দ্রুত প্রোগ্রেস করতে কষ্ট হয়েছে। বুঝতে পারি যে শওকত আলী তার পূর্বপুরুষদের স্মৃতির প্রতি, ফেলে আসা দেশ আর জীবনযাত্রার প্রতি পরম দায়বদ্ধতা থেকে এই উপন্যাসটি লিখেছেন। ভীষণ খুঁটি-নাটি ডিটেইলে উঠে এসেছে বিশের দশক থেকে চল্লিশের দশক পর্যন্ত তার পরিবারের ইতিহাস, বিশেষ করে তার বাবা-মায়ের মন-মানসিকতা, রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিবর্তন, পারস্পরিক সম্পর্ক। সততা ও মমত্বের সাথে ধরে রাখতে চেয়েছেন সেই স্মৃতি। তার অভিপ্রায়ে সফলও বলা চলে। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের একদা প্রতাপশালী মুসলমান জমিদার প্রধান-বাড়ির ভাঙ্গনের বাস্তব গল্প যদি কেউ কোন কারনে জানতে চায়, ওয়ারিশ পড়ে নিলেই চলবে।
# কিন্তু তারপরেও কথা থেকে যায়। লেখকের বইতুতো ছেলে রঞ্জুর ভাষায় - "এমনকি আমার দাদা সম্পর্কে যা শুনছি, তাতেও আমার আহামরি এমন কিছু মনে হচ্ছে না। ছোট সাইজের ধনী ব্যক্তির এক খেয়ালী ছেলে কিছু ভাবনা-চিন্তা করতো - এই তো। আর কিছু নয়।" রঞ্জুর এই মূল্যায়ন আমার কাছে খুব স্বার্থক ঠেকেছে। এই কাহিনী ফাঁদার জন্যে ২০০ পাতা জুড়ে ইনিয়ে বিনিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এত আয়োজন? পাঠকের জন্যে যত না, আমার মনে হয়েছে শওকত আলীর এই প্রয়াস ঢের বেশী তার নিজের জন্যে। সেটাও দোষের কিছু না - লেখকের মোটিভেশন তেমনটা হতেই পারে। কিন্তু অগোছালো অবিন্যস্ত এই উপন্যাস পড়তে পড়তে নিস্পৃহ পাঠকের মনে যদি প্রশ্ন জাগে - So what? - তাহলে খুব বেশি দোষ দেয়া যায় না।
# আর আছে মুদ্রণ-প্রমাদ। বাপ রে বাপ! এমনিতেই বাংলা বইয়ের বানান ভূলের মড়ক প্রবাদপ্রতিম। তবুও আমার কেন যেন একটা ধারণা হয়েছিল যে পুরনো বইয়ে এই উপদ্রব একটু কম হবে। আমার হাতের কপিটা উপন্যাসের দ্বিতীয় সংস্করণ - ১৯৯১ সালে ছাপা। কিন্তু কিসের কি! চক্ষু দিয়া রক্ত বাইর হইলো - এত অযত্ন, এত অমনোযোগ, ন্যূনতম মান বজায়ে লেখক সম্পাদক প্রকাশকের এত অনীহা যে পড়তে পড়তে নিজের কাছেই বিতৃষ্ণা লাগা শুরু করলো। কম্পিউটার কম্পোজের দায়িত্বে ছিলেন যিনি, অথবা প্রেসের কম্পোজিটর - বইয়ের শেষে এসে সবাই মনে হয় একযোগে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন - কোনমতে শেষ করতে পারলেই যেন বাঁচেন! ১৬৩ পৃষ্ঠা থেকে দু-দুটো উদাহরণ। রায়হানের মা সালমা "একদিন পুরনো আলমারি ঝাড়াঝুড়ি করতে গিয়ে এক কপি 'চোখের বালি' আবিষ্কার করে।" খুব ভাল কথা। কিন্তু এরপরের দুই পাতায় 'চোখের বালি' বেমালুম গায়েব - শুধু 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসের কথা !
একই পাতা থেকে এই ক্লাসিক উদাহরণটা না দিলেই না -
"তবে সেদিন যেদিন মালেকা বিবি টাকা চেয়েছিলেন আফাজ মোহাম্মদের কাছে, সেদিন সে মুর্শেদ আলীর অন্ত:পুরচারিনী স্ত্রী সালমা খাতুনের অহংকারে যে সামান্যতম চিংড়িও ধরাতে পারেনি - এই ব্যর্থতার কথা তার বহুকাল মনে ছিল।"
খারাপগুলো বলে গেলাম - টাইম পেলে বইয়ের কি কি ভাল লেগেছিল লিখে রাখার আশা রাখি।
*
(যা কিছু ভালো)
আসলে এই বইয়ের হিরোইন হলো রায়হানের মা সালমা। যেই দৃশ্যে তিনি উঠোনে দাঁড়িয়ে জমশেদের বেয়ারা কুকুরকে গুলি করলেন, সেই মুহূর্ত থেকে আমি তার বেজায় ফ্যান হয়ে গেছি। প্রথমভাগে তিনি অত উজ্জ্বল না ফুটলেও বইয়ের দ্বিতীয় ভাগ মোটামুটি তারই একচ্ছত্র দখলে। এমন বুদ্ধিদীপ্ত, দৃঢ়চেতা নায়িকা ফিকশনে সচরাচর দেখা যায় না - আর এটা তো ফিকশনও নয় ঠিক, লেখকের আপন মায়ের প্রতিবিম্ব। প্রচন্ড ধীশক্তি আর একগুঁয়ে জেদ না থাকলে কি চল্লিশের সমাজে জায়গা করে নেয়া যেতো, তাও রক্ষণশীল মুসলমান গোত্রপিতাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, মফস্বলের চরম বৈরী পরিবেশে? সালমাকে নিয়ে আরো অনেক পড়তে পারতাম। তার চারিত্রিক বিকাশ, তার বিবর্তন বোঝানোর জন্যে ইন্টেরিয়র মনোলোগ-গুলো এই বইয়ের অন্যতম হাইলাইট।
সালমা যতই শ্রদ্ধা জাগায়, ওদিকে তার স্বামী মুর্শেদ ততটাই বিরক্তি ধরায়। গান্ধীবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে কংগ্রেস করলো ঠিকই, অথচ পায়ের তলায় মাটি কবে সরে গেছে, ধরতেও পারে নাই। ঘুম যখন ভাঙ্গলো তখন বড্ড দেরী - মুর্শেদের নির্বুদ্ধিতা আর অমনোযোগের ফলে বাপ-দাদার জমিদারী হাতছাড়া হয়েছে অনেক আগেই, শেষে রাতের আঁধারে মোটামুটি পৈত্রিক প্রাণটা নিয়ে পাকিস্তান পালাতে হয়েছিল। অবশ্য খোদ ব্রিটিশ আমলে দেড়শ বছর ধরে এত্ত বড় জমিদারী কিভাবে হাতে থাকে, সেটা বুঝতে যেমন বেগ পেতে হয় না, সেটা ভেঙ্গে খানখান হবার বেদনাদায়ক বয়ান (অন্তত লেখকের জন্যে) - সেটা পড়েও আমি আসলে তেমন আন্দোলিত হতে পারিনি।
বহু বছর পর গল্পের রায়হানের একই অভিজ্ঞতা হয় পুনরায় - জমিজমার হিসাব-কিতাব করতে গিয়ে ওর বিরুদ্ধেও নাকি পুলিশ লেলিয়ে দেবে এলাকার লোক, এমনকি নিজের আত্মীয়ও। ফলে আবার পলায়ন। পরে আবার ফিরে আসে ঠিকই - তবে দেশভাগের রাজনীতির অপরিসীম কম্প্লেক্সিটি এবং কনফিউশন কাটিয়ে একটা মোটামুটি সংকল্পে বোধ হয় পৌঁছে যান লেখক, যার রূপরেখা আমরা দেখতে পাই একদম শেষ দৃশ্যে। রঞ্জু আর খুকুর মধ্যে কিছু একটা ঘটে যাবার জোর পায়তারা চলছে, পাঠকের মনে আশা ঝিলিক দিয়ে ওঠে - আহারে এই বুঝি দেশভাগের ক্ষতের জ্বালা মেটানোর জন্যে একটা সুন্দর মেটাফোর উপহার দিবেন আমাদেরকে লেখক।
কিন্তু কিসের কি! শেষ মুহুর্তে আশার গুড়ে বালি, পাঠকের গালে একটা সজোর থাপ্পড়। রঞ্জুর মাধ্যমে লেখক বুঝিয়ে দিলেন যে ওরা ওরাই, আমরা আমরাই। কয়েক লক্ষ রায়হানের আহাজারি ইতিহাসের ট্রাকের তলায়ই চাপা পড়ে থাকুক। শেষ মানুষটি মরে গেলে কি আর মনে থাকবে কারো? আর নিজের দেশ হয়ে বাংলাদেশীদের ঠিক কি কি লাভ হয়েছে - তার বিস্তারিত ক্ষতিয়ানও দিয়েছেন রায়হানের মুখ:নিসৃত এক মিনি-বক্তৃতায়। "কাঙ্গালদেশ" গালিটা প্রায়ই নানান ভারতীয় ফোরামে গেলে চোখে পড়ে। সেটার সত্যি মিথ্যা কি, ২০১৬ সালের বাংলাদেশী মাত্রই জানে।
*
বটম লাইন - দীর্ঘ এবং দুরূহ বই, একবার না বরং একাধিকবার পড়েই যার রস আস্বাদন সম্ভব বলে মনে হয়। কয়েকটা দৃশ্য মনে গেঁথে থাকবে অনেকদিন - বন্দুকের নল দিয়ে ধোঁয়া উঠছে, শাড়ি-পড়া বড় বউয়ের ট্রিগারে আঙ্গুল... ধুতি ছাড়িয়ে তিনটি মুসলমান ছেলেকে পাজামা-আচকান আর উদ্ভট ফেজ টুপি পড়িয়ে দিচ্ছে তাদের মা... টিনের চালে বৃষ্টির মত শব্দ হচ্ছে, ইটের বৃষ্টি, ছুড়ে মারছে দেশছাড়া রিফুজিরা... সন্ধ্যাবেলা ধানক্ষেতের আলের ধারে কিশোরী মেয়ে চেরাগ জ্বালানো কুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভুলাভুল্কির আলো দেখাচ্ছে... বিহারের কোন এক অজগ্রামে গাছের নীচে শরীর এলিয়ে দিচ্ছে একটি বাড়ি-পালানো ছেলে, অভুক্ত তৃষ্ণার্ত কপর্দকহীন...
একটু পরেই (নাকি অনেক আগে?) এই গাছের নীচে চোখ খুলবে শ্যামাঙ্গ।
চারটা প্রজন্ম ও দেশভাগ সারাটা উপন্যাস জুড়ে আছে। উপন্যাসের মূল বক্তা, তৃতীয় প্রজন্মের রায়হান, তার সাথে যেন লেখক শওকত আলী মিলে মিশে গেছেন। উপন্যাসের টাইমলাইনে সমস্যা আছে, কিছু এডিটিং ক'রলে ভালো হয়। তবে আশির দশকের শেষে এসে লেখা এই বইতে শওকত আলী দেশভাগের হিসেব-নিকেশ, কী পেলেন, কী পাননি, দ্বিতীয় প্রজন্মের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও দেশভাগের আগে ও পরে বিভিন্ন বৈষয়িক, সাম্প্রদায়িক, ভৌগলিক সমস্যা, তৃতীয় অর্থাৎ নিজের প্রজন্মের অনিশ্চিত ভবিষ্যত ও চতুর্থ প্রজন্মের মনে পুরোনো ইতিহাসের উপাখ্যানের প্রতি সন্দেহ সব তুলে এনেছেন। তবে উপন্যাসের রচনাকালে লেখকের বাংলাদেশ প্রায় দেড় দশক স্বৈরশাসনে আটকে আছে, তার বামপন্থী সহযাত্রী অনেকেই ঐ সময়ের স্বৈরশাসকদের হাত শক্ত করেছে, এ থেকে তাঁর মনে গজিয়ে ওঠা disillusionment বেশ স্পষ্ট।
উপন্যাসের সবচেয়ে বড় চমক, এর প্রধান নারী চরিত্র, সালমা বেগম। শওকত আলীকে আগের কয়েক উপন্যাসে নারীর প্রতি সুবিচার করেননি ব'লে ম'নে হ'লেও 'ওয়ারিশ'-এ সালমা চরিত্রের মাধ্যমে তিনি অত্যন্ত বিদূষী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্না এক নারীকে উপস্থাপন ক'রেছেন।
উপন্যাসটা সরলরৈখিক ধারায় চলেনি, ক্রমাগত অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত এক ধারায় চলেছে। তাতে পাঠকের অসুবিধা হ'তে পারে কিন্তু শওকত আলী তার মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। দেশভাগের উপখ্যানে অনেকে তাঁর মাঝে সাম্প্রদায়িকতা খুঁজে পেলে পেতেও পারেন কিন্তু সত্য অনেক সময়েই বড় নিষ্ঠুর।
দেশভাগ নিয়ে লেখা ট্রিওলজির প্রথমটা। বইটা সম্পর্কে যে পরিমাণ উচ্চাশা ছিল সেটা অনেকাংশেই পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন লেখক। যে প্লট ধরে লিখেছেন সেটা খুব যুতসই করে লিখতে পারেননি কেন যেন। ক্ষণে ক্ষণে বর্তমান থেকে অতীতে চলে গিয়ে সেখান থেকেই গল্প চালিয়ে যেয়ে আবার বর্তমানে ফিরে না আসায় গোলমাল লাগছিল বেশ। সেজন্য অর্ধেক পড়ে অনেকদিন ফেলে রাখা হয়েছিল। আবার একটু রোমান্টিকতা আনতে গিয়ে কেমন লেজে-গোবরে লেগে গিয়েছে। ট্রিওলজির পরের বইটার নাম ‘দলিল’। সেটা শুরু করবো কীনা বুঝতে পারছিনা।
গল্পের শুরু মোহনগঞ্জ থেকে, যেখানে বহুদিন বাদে ফিরে যায় রায়হান। সাথে তার বড় ছেলে রঞ্জু, মেডিকেল কলেজের ছাত্র। মোহনগঞ্জ কোথায়? সময়টাই বা কখন?
আশির দশকের গল্প। দেশ স্বাধীন হয়েছে এগারো বছর, চলছে দ্বিতীয় সামরিক শাসন। কিন্তু সে আলাপের সাথে এ গল্পের যোগ নেই। গল্প শুরু হয়েছে আরও অনেক আগে থেকে। যেদিন রায়হানের বাবা মুর্শেদ আলী প্রধানের জন্ম হয়, কিংবা তারও অনেক আগে।
মুর্শেদ আলী প্রধান এক অদ্ভুত খ্যাপাটে মানুষ। গত শতাব্দীর প্রথম চতুর্ভাগে, এক সম্পন্ন গৃহস্থের পুত্র সে। একমাত্র পুত্র। তাই তার মুখের কথা মাটিতে পড়ার আগেই তামিল হয়ে যেতো। দিনে দিনে ছেলেটি তাই হয়ে উঠেছিলো দারুন জেদি। পড়াশোনা শেষ না করে নেমেছে রাজনীতিতে। খদ্দর থেকে পার্টিশন, মুর্শেদের কেবল ব্যর্থতা। তারও অনেক পর ইয়াহিয়ার সৈনিকের গুলি তার বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়।
কিন্তু মুর্শেদের গল্প এখানে শেষ হয় না, বরং শুরু হয়। কেননা, তার ছেলে এবং নাতি যখন ভারতের মোহনগঞ্জ গিয়ে মুর্শেদের পরিত্যাক্ত সম্পত্তির সদগতি করতে চায়, তখন একে একে উঠে আসে মুর্শেদের জীবনের কথা। তার পিতার কথা। মনোতোষ ডাক্তারের কথা। সেই সঙ্গে আরও অনেক ইতিহাস, উপকথা।
এ গল্প কেবল মুর্শেদের না। গল্পটা রায়হানেরও। আমরা জানতে পারি আশির দশকে বি গ্রেড পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিকের সংসারের কথা। তার তিন সন্তানের কথা। এরশাদ শাসনামলে পোষা গুন্ডাদের হাতে ছোট বড় সব মানুষের অপমানিত হওয়ার কথা। কিংবা রায়হানের স্ত্রী বীথির একটা বাড়ি করার ইচ্ছা।
বীথি আর রায়হান যখন এক টুকরো জমির জন্য রক্ত জল করতে রাজি, সমান্তরালে আমরা জানতে পারি নিজের খামখেয়ালিতে প্রায় একটা জমিদারী বেচে দিয়েছে মুর্শেদ, একটু একটু করে। তার রাজনীতি, তার খেয়ালি জীবন আর স্ত্রী হিসেবে একটি অসামান্য রমনী সালমা খাতুনের কথা, যাকে মুর্শেদ কখনও বোঝেননি।
গল্পগুলো কখনও বেরিয়ে আসে রায়হানের বন্ধু চিন্ময়ের বাড়ির পুরনো জিনিসপত্রের স্তুপে পাওয়া চিঠি থেকে, কখনও রায়হান বলে রঞ্জুকে। কখনও লেখক নিজেই বলেন। সেই সঙ্গে বলেন স্বদেশী আন্দোলনের কথা, মুর্শেদের হাতে এক কিশোরীর চরকা তুলে দেওয়ার কথা। হিন্দুদের ছোঁয়াছুঁয়ি থেকে গল্প বয়ে যায় তেভাগা আন্দোলন পর্যন্ত।
নিছক কোন গল্প নয়। কেবল দেশভাগ নয়। ফকির বিদ্রোহ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক শাসন পর্যন্ত ঘটনাবলীকে লেখক ধরেছেন মাত্র দুইশ' পাতায়। অদ্ভুত ব্যপার হলো, তাতে কোন ঘটনার প্রতি অবিচার করেননি তিনি। দেশভাগ তো কেবল দেশভাগ নয়। সেই সঙ্গে ছিল সমান্তরালে আরও অনেক ঘটনা। নন ফিকশনেও সেসব তোলা হয় না, যা তুলেছেন শওকত আলী। তৎকালীন ঘটনার সাথে মানুষের বদলে যাওয়া, তাদের যোগসূ্ত্র তুলে ধরেছেন। কখনও তুলনা করেছেন পরবর্তী সময়ের সাথে। কেবল ইতিহাস নয়, ভূমি এবং মানুষের সাথে জুড়ে থাকা উপকথাও বাদ পড়েনি।
কারও কারও কাছে উপন্যাসটা খাপছাড়া লাগতে পারে। মনে হবে, লেখক নিজের পুরো ক্ষমতাকে ব্যবহার করেননি। কিন্তু মূলত শওকত আলীর অন্যান্য অনেক উপন্যাসের চেয়ে 'ওয়ারিশ' অনেক ভারী উপন্যাস। ওয়ারিশে তিনি দশ লাইনকে প্রকাশ করেছেন এক লাইনে। এ বইয়ের বিশ্লেষণে আরও চার পাঁচটি বই দাঁড়িয়ে যাবে। এ পর্যন্ত পড়া শওকত আলীর বইয়ের মাঝে এটা অন্যতম সেরা।
নামকরণ প্রসঙ্গে কিছু কথা না বলে পারছি না। রঞ্জু-রায়হান-মুর্শেদের এই পুরুষানুক্রমের জন্য এ বইয়ের এমন নামকরণ বলে আমার মনে হয় না। বরং, এ বইয়ের পাঠকরাও এই ভূখন্ডের ইতিহাস, উপকথার ওয়ারিশ।
*রায়হানকে প্রধান চরিত্র ধরে একই চরিত্রদের নিয়ে লেখকের আরেকটি উপন্যাস 'দলিল', যা এরশাদের শাসনামল নিয়ে লেখা। তবে, 'দলিল' ঠিক 'ওয়ারিশ'-এর সিক্যুয়েল না।
দেশভাগ আমার প্রচণ্ড আগ্রহের একটা বিষয়। দেশভাগের আগে ও তার ঠিক পরে কেমন ছিল দুই বাংলার পরিস্থিতি? দেশভাগের আগে কেমন ছিল দুই বাংলার মানুষের জীবনধারা? দেশভাগের পরেই বা সেটা কেমন হয়েছে? কেমন ছিল গ্রাম বাংলা?- এমন হাজারও প্রশ্ন আমার মনে প্রায় সময়ই ডালপালা মেলে উঁকি দেয়। তখন নিজের মনেই কিছু কিছু উত্তর সাজিয়ে নেই কল্পনার চোখে। নিজের কল্পনাতে সেই দৃশ্যগুলো দেখতে ভালো লাগে আমার।
দেশভাগের আগে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী কিছু সময়কাল পর্যন্ত তিন প্রজন্ম নিয়ে বিস্তৃত এই উপন্যাস। দেশভাগের আগের, মধ্যকার এবং পরের সময়ের পারিপার্শ্বিক অবস্থার কিছু আঁচ পাওয়া গেছে বইটাতে। শওকত আলীর লেখনীর শক্তি সেই ঘটনাগুলোকে ভালোই উপভোগ্য করেছে; যদিও লেখকের কলমের পূর্ণশক্তি এ বইয়ে ব্যবহৃত হয়নি বলেই আমার মনে হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে বইটি পড়ে আমি তৃপ্ত।
দেশ, মানুষ, স্থান-কাল, সম্পদ আর রাজনীতির সরল উপাখ্যান ওয়ারিশ। দেশভাগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই উপন্যাস ঠিক যেন জমে ওঠে না। তিন পুরুষের গল্প ঠিক যেন মিলমিশ খায় না। জায়গায় জায়গায় সুতো কেটে যায়। তবু লেখকের সাবলীল লেখনির জোড়ে বই শেষ করতে কষ্ট হয় না। শওকত আলীর লেখায় সামাজিক আর রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের প্রভাব পরিবারের ভেতর দিয়ে যেন উঠে আসে।