এটা একটা ব্যতিক্রমধর্মী উপন্যাস। শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয়। বিশ্বসাহিত্যেও এই উপন্যাসখানি আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়েই সৃষ্ট। সকল সাহিত্যে চোর-ডাকাতের বর্ণনা দেখা যায়, তবে মনোজ বসুর 'নিশিকুটুম্ব' স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে রচিত। এটা লেখকের অন্যান্য গ্রন্থের ন্যায় বাস্তব চরিত্রের প্রতিবিম্ব মাত্র। এই উপন্যাসে ঔপন্যাসিক সমাজের নিন্দনীয় শ্রেণিপেশার মানুষের বাস্তব রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এই উপন্যাসের কুশিলবরা সিঁধেল চোর, পতিতা, পকেটমার, থলিলদার এরা সবাই সমাজের চোখে নিন্দিত ও ঘৃনিত। শিক্ষার সংজ্ঞা কারকরা সকলেই সুশিক্ষাকে 'শিক্ষা' বলেছেন। এই উপন্যাসে মনোজ বসু চৌর্যবৃত্তি শিক্ষাকে 'শিক্ষা' হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। আদিকাল থেকে আমাদের সমাজে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে, "চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা, যদি না পড়ো ধরা"। সেই চুরিবিদ্যার নিশিকুটুম্ব উপন্যাসের নায়ক গনেশ ওরফে সাহেব। সাহেবের প্রশিক্ষিত হাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক বলেছেন, 'গায়ের উপর মৃদু স্পর্শ। বাহুর উপর, বাহু থেকে গলায়, তারপর কোমরের দিকটায়, ...চঞ্চল আঙুলগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে সরীসৃপের মতন। ঘুমন্ত যুবতী, নববধু আশালতার শরীর থেকে সুকৌশলে গহনা খুলে নিচ্ছে সাহেব চোর। গুরুর শিক্ষা কাজের সময় (চুরির সময়) যত সুন্দরী হোক না কেন, তার স্লীলতাহানি করা যাবে না। গুরুর শিক্ষা এই ধর্মকে সাহেব বরাবর মেনে চলেছে। পঞ্চানন বাইটা (পচা বাইটা) সাহেবের চুরি বিদ্যার শ্রেষ্ঠ গুরু। তার আদেশ-নিষেধ সাহেবের কাছে অলঙ্ঘীয়। গুরুর প্রতি অসীম শ্রদ্ধা তার। গুরু নিন্দা তার কাছে অসহনীয়। তাই গুরুপুত্র মুকুন্দ যখন পিতার সম্পর্কে খারাপ কথা বলেছে, সাহেব তার প্রতিবাদ করেছে। সাহেবের প্রথম গুরু স্ব-ঘোষিত পালক পিতা নফর কেষ্টা। কিন্তু চুরিবিদ্যা শিক্ষায় তার শ্রেষ্ঠ গুরু পঞ্চানন বাইটা (পচা বাইটা)।
নিশি রাতের কুটুমকে বলা হয় নিশিকুটুম্ব । গভীর রাতে মানুষের বাড়িতে অতিথি হয়ে কে আসে ? না না ভূত পেত্নী গোছের কিছু না । আমি বলতেছিলাম চোরের কথা । সিঁধ কাটা চোর । কালীঘাটে বেশ সুশ্রীচেহারার একটি শিশু কুড়িয়ে পেয়েছিলো সুধামুখী নামের নিকটস্থ ফনী আড্ডির বস্তির গণিকালয়ের একজন দেহপণ্যা । হয়তো নদীতে যিনি তার পাপ বিসর্জন দিতে এসেছিলেন, তিনি মানবিক ঈশ্বরের সাথে বোঝাপড়াটা ঠিকমতো সম্পূর্ণ করতে পারেন নাই ; ঘাটে রাখা পাপ সেই অসম্পূর্ণ আলোচনার ই উচ্ছিষ্ট হয়ে আছে । সুধামুখী অবশ্য এই পাপের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোন সৃষ্টিকর্তার অনুমতি না নিয়েই শিশুটিকে নিজের ঘরে এনে তুলেছিলো । গায়ের রঙ সাহেবদের মতো গোরা বলে তাকে সবাই ‘’সাহেব’’ বলে ডাকতে শুরু করে । দিনে কোন অসুবিধা না হলেও রাতে যখন সুধামুখীর ঘরে বিনোদনপ্রার্থীরা তাদের পদধূলি ছড়াইতে আসতেন তখন সুধামুখীর ভয় হতো সাহেব কেঁদে না উঠে… এতোটুকু শিশু প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কেঁদে তো উঠতোই । কখনো সুধামুখী ছুটে যেতো আবার কখনো যেতে পারতো না । রান্নাঘরের দাওয়ায় নিতান্ত অবহেলায় সাহেব কেঁদে কেঁদে একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তো কিংবা বিধাতা কোন অদৃশ্য খেলনা সাহেবের সামনে ধরে চুপ করিয়ে দিতেন । আস্তে আস্তে সাহেব একটু বড় হলে সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ি থেকে চলে যেতো । নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে নদীর ঘাটে গিয়ে শুয়ে থাকতো , আবার সকালে ফিরে আসতো । এভাবেই সাহেবের মধ্যে বাহিরের সাথে সখ্য আর অন্দরের সাথে একটা বিদ্বেষ তৈরি হতে থাকে । সুধামুখীর দুয়ারের একজন অনিয়মিত বিনোদনপ্রার্থী এবং তার প্রেমিক ও বটে নফরকেষ্টর পেশা চুরি । এই নফরকেষ্টর নেক দৃষ্টি পড়ে সাহেবের উপর । ব্যস । শুরু হলো চুরির প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান । সাহেব যখন আরো একটু বড় হয়েছে তখন সে বুঝলো যে মন্দের দুনিয়ায় এইটুকু মন্দ হয়ে হবে না ; তাকে আরো বড় ধরনের মন্দ হতে হবে , আর বড় ধরনের মন্দ হতে হলে লাগে বড় ধরনের মন্দ শিক্ষক । নানা জায়গায় ঘুরে ফিরে সাহেব এসে পড়লো পচা বাইটার হাতে । সে সময় পচা বাইটাকে এক নামে সবাই চিনতো । তার মতো মাল্টিট্যালেন্টেড চোর দেশে হাতে গুনা কয়েকজন ছিলো । তা ভালোই হলো , বয়স তো কম হলো না পচার । এখন যাই তখন যাই অবস্থা । যাওয়ার আগে বিদ্যেটা নাহয় যোগ্য কাউকে দিয়ে যাওয়া যাক । সাহেবকে সে শেখায় কিভাবে গেরস্থের বাড়ির সামনে গিয়ে শুধুমাত্র নিঃশ্বাস এর শব্দ শুনে বুঝবে ঘরে কজন আছে , গভীর ঘুমে আছে নাকি হালকা ঘুমে আছে । তারপর অন্ধকারে বাক্স পেটরা তে শুধু টোকা দিয়ে কিভাবে বুঝতে হয় ভেতরে দামী জিনিস আছে নাকি অপ্রয়োজনীয় জিনিস আছে , যেই বাড়িতে কুকুর আছে সেই বাড়িতে চুরি করার উপায় , সিঁধ কাটার পর সিঁধের ভেতরে মাথা আগে ঢুকাবে নাকি পা আগে ঢুকাবে ইত্যাদি সিত্যাদি …… এভাবে একজন আদর্শ চোরের সকল গুণাবলী শিখিয়ে পড়িয়ে সাহেব কে উচ্চপর্যায়ের চোর বানানোর প্রক্রিয়া চলতে থাকলো … একদিন সাহেবের যখন শিক্ষা নেওয়া শেষ হলো তখন পচা বাইটা সাহেবের কাছে গুরুদক্ষিণা চাইলেন । পচা বাইটার দুই ছেলে ছিলো । কুখ্যাত চোর থাকার কারণে দুই ছেলে এবং তাদের বউ কেউ ই পচাকে দেখতে পারতো না । বিশেষ করে ছোট ছেলে আর তার বউটা । সাহেবকে সেই ছোট বউ এর গায়ের অলংকার চুরি করে এনে দিতে হবে……………… বইটি নিয়ে বেশ কিছু মন্তব্য পাঠক সমাজে চালু আছে । তবে আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য এই বইটি কেন পড়বেন - - এই বইটি পড়লে আপনি রাত বিরেতে কাউকে ঘুম থেকে না জাগিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে নিঃশব্দে চা বানাতে পারবেন এমনকি বিস্কুটের টিন থেকে বিস্কুট বের করার সময়ও কোন শব্দ হবে না ইনশাল্লাহ । আমি উপকৃত হয়েছি । এর আগে বেশ কবার রাতে চা-টা বানাইতে গিয়া ধরা খেয়েছি এবং ফলস্বরূপ বাড়ির সদস্যদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করার দরুণ তাদের হাতেই প্রাণ টা খোয়াতে গিয়েছিলেম …তা যাক সেসব কথা । মোদ্দা কথা এই যে - এই বইটি পড়ার পর থেকে এখন আর এই সমস্যা হচ্ছে না । রাতে চা-টা বানায়ে বিজয়ীর বেশেই রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে আসতে পারছি এবং অনেক চেষ্টা করে বিনাশব্দে চামচ দিয়া চায়ের পেয়ালা ঘুটার টেকনিক ও রপ্ত করেছি । এই বইটি কেন পড়বেন না - - এই বইটি এই জন্য পড়বেন না কারন এতে চুরি করার সুন্দর সুন্দর নিয়ম এবং পন্থা এমনভাবে বিস্তারিত দেওয়া আছে যে আপনি নিজের এইম ইন লাইফ পাল্টানোর চিন্তা করতে বাধ্য হবেন । পড়ার পর থেকে রাত গভীর হলেই গায়ে সরিষার তেল মাখিয়ে বের হয়ে যেতে ইচ্ছা করে । আমি তো সেদিন রাতে শাবল নিয়ে বের হয়ে গেছিলাম ও … পরে অনেক খুঁজাখুঁজি করেও কোন মাটির ঘর পাইলাম না তাই আবার বাসায় ফিরে এসেছি ! Great failure .
অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল, একটা বই পড়ব একদম কিচ্ছু না জেনে, কোন রিভিউ না দেখে। জন্মদিনের গিফট পেয়ে সেই কাজটা সহজ হয়ে গেল। কথা ছিল বই যদি ভালো না লাগে গিফট দাতা দের বাঁশ দিব। তা খারাপ লাগেনি। এযাত্রায় বেঁচে গেল।
সাহেব চোর। মস্ত চোর। চোরদের রাজা, চোর-চক্রবর্তী। আশেপাশে সব গায়ে ভীষণ নামডাক। এমন যে চোর সে কিনা মন্ত্রের মত জপে “হে মা-কালি আমায় মন্দ করে দাও”। এই সাহবেকে নিয়েই উপন্যাস। দিনের বেলা দেখা যায় না, রাতের বেলা বাড়ি বাড়ি ধরনা দেয়। নাম তাই নিশিকুটুম্ব। চুরিবিদ্যা যে এত কঠিন তাই বা কে জানত! এতে যে এত জটিল আর্টের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায় এই বই না পড়লে জানতাম না। সত্যি এরচেয়ে লেখাপড়া শিখে গতানুগতিক চাকরি করা সোজা।
বড়সড় উপন্যাস, দুই খণ্ডে ভাগ। প্রথম খণ্ডে সাহেবের চোর হয়ে ওঠার ব্যাকগ্রাউন্ড আর পরের খণ্ডে সাহেব পুরাদস্তুর চোর। এভাবেই হয়ত ভাগটা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখানেই আমার কিছু অভিযোগ আছে। প্রথম খন্ডে সাহেবের থেকে সুধাময়ী, নফরকেষ্ট, বলাধিকারী এদের জীবনটাই বেশি মুখ্য। এরা উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেও সাহেবকে ঢেকে দেয়। বলাধিকারীর গল্প পড়তে পড়তে অনায়াসে ভুলে যাওয়া যায় উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র কে। তারপরও প্রথম খণ্ড পড়তে বেশ লেগেছে। এরপর বলা নেই কওয়া নেই প্রথম খণ্ড হঠাত সমাপ্ত। দ্বিতীয় খণ্ডে আশা ছিল, সাহেব চরিত্রটা আরও ফুটে উঠবে। তার ক্রিয়াকলাপের আরও কিছু বর্ণনা পাওয়া যাবে। তাও আশানুরূপ হয়নি।
সবমিলিয়ে পড়তে ভালো লেগেছে। গল্প খারাপ না। তাই ৩ তারা।
সাহেব সারাটাজীবন কেবল একটা প্রার্থনাই করে গেল.. হে ভগবান আমাকে মন্দ করে দাও। কিন্তু আদৌ সে কতোটুকু মন্দ হতে পারল সেটা কেবল জানে ভগবান নিজে আর পাঠকেরা, যারা সাহেবের আখ্যান পড়েছেন।
সাহেব আট দশটা রক্তে মাংসে গড়া মানুষ হলেও তফাত অন্যখানে। সে একজন পেশাদার চোর। চোরকে তো আমরা এমনিতেই খারাপ জানি.. তো কী এমন হয়ে গেল যার জন্য রীতিমতো সাহেবের প্রার্থনা করা লাগে? লেখক মহাশয় বড়ই নিষ্ঠুর। অতি উত্তম আর ইউনিক উপন্যাস লেখার লোভে সাহেবের জীবন নিয়ে কেবল খেলাই করে গেছেন। অবশ্য উপন্যাসখানা হয়েছেও তাই। বড্ড খাসা... এক দমে পড়ে ফেলার মতো না.. অনেকটা সময় নিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার মতো। সাহেবের মা কে তা সে জানে না। গঙ্গার জলে ভেসে ভেসে এসেছিল। চিরটাকাল সংসার খুঁজে বেড়ানো এক বেশ্যা ���মণী গঙ্গা থেকে পরম মমতায় তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়েছিল। সেই থেকে সুধামুখী তার মা। মায়ের সুবিধার্থে সেই যে বাইরে বাইরে সময় কাটানো ���ুরু করল, তারপর থেকে বাহিরই তার ঘর। বাচ্চা থেকে বুড়োকাল পর্যন্ত ঘর আর মায়ের সন্ধানেই সাহেব ঘুরে মরল।
নিশিকুটুম্ব সাহেব চোরের গল্প। সেই সাথে ওর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষজনেরও। দুই খন্ডের প্রথম খণ্ডটা যতোটা না চমৎকার দ্বিতীয় ভাগটা ততোটাই যেন হেলাফেলা করে লেখা। আরেকটু সময় নিয়ে লিখলে কী হইতো, এই একটা বিশাল আফসোস থেকে যাবে। মনোজ বসুর এই বিশাল বইটি তারপরেও রেকমেন্ডেড।
“হে মা-কালি আমায় মন্দ করে দাও” এটা কোন মন্দলোকের উক্তি হতেই পারে না। যে মন্দ সে কেন মন্দ হতে চাইবে। অবস্থা ফেরে কোন ভাল লোকই হয়তো মন্দ হতে চাইছে। এই মন্দ হওয়ার কামনা সাহেব চোরের। সেকি! আপনি নাম শুনেন নি তার। তাহলে আপনি নিশ্চয়ই ভাটি এলাকার কেউ নন সেখানে এক নামে সবাই পচা বাইটার যোগ্য শিষ্য ওস্তাদ কারিগর সাহেবকে চেনে।
নাম ছিল গনেশ চেহারা-ছবি ফর্সা টুকটুকে হওয়ায় সবাই ডাকতে শুরু করে সাহেব। ভাবছেন ওর মা গনিকা পাড়ার সুধামুখী তো মোটেই ফর্সা নয় তবে তার ছেলে কি করে সুন্দর হয়! সাহেবের মা হয়তো ভদ্রবাড়ির মেয়েই ছিল, হয়তো পাপ লোকানোর জন্যে জন্মের পরই সাহেবকে গঙ্গায় বিসর্জন দেয়। বর মরে যাওয়ার পর সুধামুখীও জন্ম দিয়েছিল এমন এক পাপের মেয়ে, জন্মের পরই কে যেন তাকে মেরে ফেলে।সুধামুখীর জীবনের চাকা তাকে নিয়ে আসে আদিগঙ্গার ধারের গনিকা পল্লীতে। আবার এখানেই এনে ফেলে শিশু সাহেবকে, যার বেঁচে থাকার জন্য দরকার একজন মায়ের। ব্যাস মা-গঙ্গাই হারানো মেয়ের বদলে সাহেবকে তুলে দিলেন সুধামুখীর কোলে। আর সুধামুখীর ভাবের লোক নফরকেষ্ট হয়ে দাঁড়াল সাহেবের বাবা।
মায়ের সংসারের ভাতের অভাব দূর করতেই সাহেব প্রথম চুরি করে। আর অন্যদিকে একজনের কাছে ভগবান সাজতে গিয়েও চুরি করতে হয় নিত্য নিত্য। এগুলো সবই একক প্রচেষ্টা, প্রফেসনালি চুরি শুরু হয় নফরকেষ্টর সহকারী হয়ে। এভাবেই ঘুড়তে ঘুড়তে শহর ছেড়ে চলে আসে গাঁয়ে, পরিচয় হয় এক সময়কার জাদরেল পুলিশ অফিসার বর্তমানে চোরদের মহাজন বলাধিকারীর সঙ্গে। সেখানেই সাহেব জানতে পারে চোর দুনিয়ার বিস্ময় পচা বাইটার কথা যাকে গুরু পেলে বর্তে পাবে যেকেউ।তবে বাইটা মশায় কাউকেই শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন না। সেখানেও সাহেব তার যোগ্যতার প্রমান দিয়ে শিষ্য হয়ে যায়। বাইটা মশায়ও এতদিনে যোগ্য শিষ্য পেয়ে নিজেকে উজার করে দেন।
সব তো হল কিন্তু সাহেবের মন্দ হওয়ার কি হবে! সে তো মন্দ হতে চায় তবে সবাই কেন তাকে ভগবান বানায়।তার সেই ছোট্ট প্রাণের কামনা “হে মা-কালি আমায় মন্দ করে দাও” সত্যি কি হতে পারবে সে মন্দ!
বইটাতে শুধু সাহেবের গল্প নয় আছে ভদ্রঘরের মেয়ে সুধামুখীর গনিকা হওয়ার গল্প, নফরকেষ্টর ভদ্রলোক হওয়ার গল্প, সৎ পুলিশ অফিসার বলাধিকারীর চোরের মহাজন হওয়ার গল্প, কাজলবালার সরলতার গল্প, চোরকে স্বামী মনে করে জড়িয়ে ধরে আশালতার গয়না হারানোর গল্প, মধুসূদনের আজীবন চোরকে ফাসি দেয়ার ইচ্ছা থাকার পরও নিজে চোর হওয়ার গল্প, ক্ষুদিরাম ভট্টচার্যের পাহারাদার থেকে চোর হওয়ার গল্প, ছেলেকে ডাকাতের হাতে ফেলে মা মন্দাকিনীর গয়নার বাক্স ধরে রাখার গল্প, সুভদ্রা-বউয়ের একা থাকার গল্প, আছে চোরশাস্ত্রের গল্প…..আমি আর কত বলব আপনি নিজেই পড়ে দেখুন।
রাতে যে কুটুম বাড়িতে আসে তাদের নিশিকুটুম্ব বলে। বইয়ের নামও "নিশিকুটুম্ব"। এখানে ঠিক চিরাচরিত কুটুমের অর্থে নামটি দেয়া হয়নি। চোর যারা, তাদের আনাগোনা মূলত রাতের বেলাতেই তাই তাদের সজ্ঞায়িত করতে এই নামের ব্যবহার।
মনোজ বসুর বই আগে ছোটখাটো কয়েকটা পড়েছি হয়তো। যা নিয়ে এখন আর তেমন কিছু মনে নেই। উনার আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বই " নিশিকুটুম্ব" নিয়ে মনে রাখার মতো অনেককিছুই আছে। আমার মতে বাংলা সাহিত্যে এমন অভিনব বিষয় নিয়ে বই হয়তো হাতেগোনা আবার এমনও হতে পারে এটাই প্রথম। চোর সমাজের অন্ধিসন্ধি নিয়ে বিসৃত এই উপন্যাসের রস পাঠককে এমন আচ্ছন্ন করে রাখে। যা পাঠকের মনে এই উপন্যাস চিরস্থায়ী জায়গা করে নিতে সক্ষম।
সুধামুখী নামে কালিঘাটের পাশে এক পতিতাপল্লীর যৌবনের ক্রান্তিলগ্নে এসে ঠেকে যাওয়া এক পতিতার ঘর থেকে শুরু কাহিনীর। পতিতাদের সামাজিক অবস্থান থেকে শুরু করে পল্লীর ভেতর বাইরের জীবনমানের যে বিস্তর পার্থক্য তা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাঠক বইয়ের শুরুতে পাবে।
উপন্যাসের মূল চরিত্র সাহেব। এটা তাঁর পোষাকি নাম। রূপে রাজপুত্র হওয়ার কারনে সকলের কাছে সে ছোটবেলা থেকে সাহেব নামেই পরিচিত। অন্যদিকে রূপ থাকলে কী হবে সে আদতে সুধামুখীর কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে। তাই মানুষের চোখে সাহেব রাজপুত্র হলেও সমাজে তার স্থান নেই বললেই চলে। আর এই সামাজিক অগ্রহণযোগ্যতা থেকে সাহেবের চোর হতে যাওয়া। তা ও যে সে চোর না। একেবারে নামডাক ওয়ালা চোর।
সাহেব কালিঘাটের কাছাকাছি থাকার কারনে সবসময় মা কালীর কাছে একটাই চাওয়ার ছিল। "হে-মা কালি আমায় মন্দ করে দাও"। আর সারাজীবন সেই চাওয়ার পেছনেই ঘুরতে হলো। মন্দ হতে গিয়ে, মন্দ করতে গিয়ে কতদিকে কতজনের ভালো করে ফিরে আসা তার কি ইয়াত্তা আছে? কিন্তু সাহেব তো বুঝে না, বিধাতা যাকে ভালোর জন্য পাঠিয়েছে তার দ্বারা মন্দ হবে কিসে? এই মন্দ হওয়ার পেছনে ছুটতে গিয়ে শহর কলকাতা থেকে শুরু করে ভাটি অঞ্চলের প্রবাদে পরিনত হওয়া সাহেব চোর হওয়ার দীর্ঘ এক পথ চলার উপাখ্যান " নিশিকুটুম্ব"
চুরি বিদ্যা যে চৌষট্টি কলার একটা সেটা হয়তো কিছু মানুষ জেনে থাকবেন। তবে এই চুরি বিদ্যার কলাকৌশল আসলে কি এবং কোথায়? ঠিক এই প্রশ্নেরই যেন উত্তর খুঁজে ফিরেছেন লেখক। এমন অসাধারণ অনবদ্য লেখনী আর কাহিনী দিয়ে লেখক রাতের কুটুমদের যে গোপন জীবনের একটি চিত্র এঁকেছন তা যে আদৌ সম্ভব সেটা কেউ কেউ হয়তো ভাবনাতেই স্থান দিবেন না। চোর সমাজ বা চোরের দলের মধ্যে যে কত শ্রেণী কত নিয়মকানুন তা পড়তে গিয়ে পদে পদে অবাক হতে হয়েছে। পুরান থেকে শুরু করে শত শত বছরের চুরি বিদ্যার ইতিহাস। যা এই বইটাকে একজন চোরের বা গোটা চোর সমাজের উৎকৃষ্ট আখ্যান হিসেবে ধরে নেয়া যায়।
Anyone who knows me as a friend knows that I hate being lied to. But honesty is a difficult virtue to practice in India. I had to bribe my way to a driving licence. I had to bribe to set up my company. I have to keep bribing to ensure that GST or tax officials don’t randomly harass us with fictitious errors. Supporters of a ‘clean’ government have no idea really that governance itself is a sham. So inbuilt is this culture that sometimes I wonder if I am bribing my way in my relationships too.
In that context, Manoje Basu’s little-known treasure ‘I Come As A Thief,’ is a fantastic satire on Indian society. Telling the tale of a motley gang of thieves, Basu’s unstinting vision draws light on the darkest underbellies, laying bare truths that we can only squirm at. A rare find in a second-hand bookshop, I hope that someone comes out with a better translation of this.
শ্রী গণেশচন্দ্র পাল, পিতাঃ শ্রীনফরকৃষ্ণপাল, মা সুধামুখী। গণেশ নামটা সাহেবের স্কুলের নাম, গণেশ নামটা সাহেব নামের পেছনে এমনভাবে ঢাকা পড়ে গেছে যে সাহেব নিজেরই মনে পড়ে না কোন কালে তার নাম গণেশ ছিলো। নফরকৃষ্ণ সাহেবের স্কুলের বাবা। জন্মদাতা বাবা নয়। সুধামুখী সাথে নফরকৃষ্ণের কোন সম্পর্ক নাই। তবে সুধামুখী সাহেবের জন্মদাতা মা নয় পালিত মা। গঙ্গার ঘাটে এক ভোর বেলা গঙ্গাস্নানে গিয়ে সাহেবকে কুড়িয়ে পায় সেই থেকেই সুদামুখী সাহেবের মা। একটু বড় হবার পর সাহেব বুঝতে পারে মা তার অন্ধকার গলির মানুষ। সব বুঝতে পেরে খাবার সময় বাড়ীতে থাকলেও সন্ধ্যার পর সাহেবের ঠাই হয় গঙ্গার ঘাটে। মা হয়েও কিছু করার নাই ���ুধামুখীর, ছোট সাহেব কে রাতে ঘুম পাড়িয়ে টাকা রোজগার করা গেলেও বড় হয়ে সাহেব নিজেই সরে যেতে থাকে।
তবে সুধামুখীর এই বস্তিতে রুপের পসরা সাজিয়ে টাকা রোজগার করাটা প্রেমিকের হাতে প্রতারিত হবার ফল। নফরকৃষ্ট স্বামীও না প্রেমিকও না আবার তার খদ্দেরও না। তবে খোজ খবর নেয়। আর সাহেবের বাবা হবার লোভ। সুধামুখীর ইচ্ছাতেই সাহেব বিদ্যাশিক্ষার জন্য স্কুলে ভর্তি হয়, তবে। নিজেদের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল করার জন্য নফরকৃষ্ণ তাকে চুরি বিদ্যাটা ভালো করে শেখায়। একদিন এক মহিলার ব্যাগ চুরি করে নফরকৃষ্ণ ও সাহেব নিরুদ্দেশ হয়ে যায় তারা কালীঘাট থেকে দক্ষিনে খুলনাতে চলে যায়। সেখানে গিয়ে দেখা পায় জগবন্ধ বলাধীকারীর। যিনি থানার বড়বাবু হয়েও মিথ্যা চুরির দায়ে চাকরি হারান। এই দুঃখে তিনি চোরের দলে যোগ দেন।অন্যদিকে ক্ষুদিরাম ভট্টাচার্য যিনি টোলে পাঠ দিয়ে বিদ্যা অর্জন করেও স্বভাবের দোষে নিজের ঘরের জিনিজ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েন। নতুন বিয়ে করা বউ চুরির কথা শুনে হয়তো গলায় দড়ি দিবে এই দুঃখে ক্ষুদিরাম বাড়ী থেকে পালিয়ে গিয়ে চুরি বিদ্যাটা বহাল রাখেন।
দক্ষিন অঞ্চলের বিখ্যাত চোর পচা বাইটা আসল নাম পঞ্চানন বর্ধন। পচা বাইটা না বললে কেউ চেনে না। বংশী পচা বাইটার নাতি। তবে পচা বাইটা কাউকে তার শিস্য করেন না। এতো বড় মাপের চোর তবু কোন শিস্য রেখে যাবেন না, তার সব বিদ্যা বিফলে যাবে এ দুঃখটা সবারই বাজে। সকলের মুখে পচা বাইটা নাম ও গুনের কথা শুনে সাহেব মনে মনে ঠিক করলো যেমন করে হোক পচা বাইটার শিস্য হবে। গুরু না ধরলে কোন কাজই ঠিকঠাক হয় না। তবে পরিচরহীন সাহেব জীবনে ভালো চোর হবে এবং পচাবাইটার কাছেই তার শিক্ষা নিতে হবে এমনা স্থির করেই সে পালিয়ে পচাবাইটার কাছে যায়।
চুরির কিছু নিয়মাবলীঃ
★ধর্মকর্মে যেমন চৌরকর্মেও তেমনি গুরু বা ওস্তাদ ধরতে হয়। ★ চোর হতে হলে চলনে বিড়াল, ধাবনে মৃগ নেওয়ার ব্যাপারে বাজপাখি। ★চোরকে ফাঁকা জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে: ফাঁকা না ধোঁকা। ★রোগী থাকলে সে বাড়ীতে কদাপি ঢুকবেন না। ★ভ্রষ্টা নারী যে বাড়ী, সেখানেও যাবেন না। ★লম্পট ছেলে ছোকরা যে বাড়ীতে সে বাড়ীতেও নয়। ★ বাচ্চা ছেলে মেয়ে যে বাড়ীতে সে বাড়ীতেও নয়। ★যুবতী ও সদ্য বিবাহিত নারীর ঘরে যাওয়া যাবে না। ★চুরি করতে গিয়ে চুরির জিনিসের উপর নজর থাকবে কখন নারীর দিকে তাকানো যাবে না।
এগুলো গুরুর নিষেধ।
চুরি করতে গেলে সিঁধ কাটতে হয়। দুই হাজার বছর আগেও সাত রকম সিঁধের খবর পাওয়া যায়। এগুলো লেখকের কথা।
চোরকে বলে রাতের কুটুম। ভালো বাংলাতে নিশিকুটুম্ব। বইটাতে চোরের অদ্যপান্ততে ভরা। তবে চুরি করাটাও যে চমৎকার হতে পারে তা লেখকই বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া সমকালীন সমাজব্যবস্থা, দেশের রাজনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে লেখক তাঁর নিজস্ব শিল্পকুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। আত্মস্বার্থহীন মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি এই উপন্যাসে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন আন্তরিকতার সাথে।ব্যতিক্রম একটা কর্মকান্ডকে সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। যার ভালোলাগাটা ছুয়ে থাকবে শেষ মুহূর্তে।
কেউ যদি চুরি বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে চুরিকে পেশা হিসেবে নিবার ইচ্ছা থাকে তবে বইয়ের চুরির কৌশল ও শিক্ষাটা কাজে দিবে, আমার মনে হয়। বইটা পরে চুরিটাকে খারাপ ভাবতে খারাপ লাগছে।
মূলত উপন্যাসটা ৫২৮ পৃষ্ঠার (অখন্ড),কিন্তু গুডরিডসে দেখাচ্ছে ২০০ সামথিঙ!
তিনতারকার বেশি কোনোভাবেই দিতাম না। কাহিনী প্রচন্ড রকম স্লো।অহেতুক ডিটেইলিং করা হয়েছে।পড়তে পড়তে বিরক্তি চলে এসেছিল, উপন্যাসের একেবারে শেষের দিকের লাইনগুলো মনে স্রেফ গেঁথে আছে। সাহেব চোরের কখনোই বুঝি মন্দ হওয়া হলো না, মন্দ হতে পারলোনা পঁচা বাইটার এই শিষ্য কেননা "অমৃতের বেটা-বেটি সব, ভালো না হয়ে উপায় আছে?মানুষ যতকাল আছে, জাতের স্বধর্ম বয়ে বেড়াতে হবে। "
রাতের বেলায় কে আসে? কে আবার, ভুত বা চোর হবে কেউ! তখন ক্লাশ এইট বা নাইনে পড়তাম। ঘুম আসছিল না। দু’বছর পরেই ম্যাট্রিক পরীক্ষা। কিন্তু তখনই গল্প-উপন্যাস পড়ার নেশা হয়েছে। তেমনি একটির কিছুটা পড়েছি। বইটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ভুতুরে ব্যপার তো! ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নাকি? চোর এসেছিল? বেশ ভয় ঢুকলো মনে। বইটি ছিলই চোরদের নিয়ে। ‘নিশি-কুটুম্ব’। লেখক, খুলনার লোক। বইয়ের কথাগুলো সত্য হলে আমি জেগে থাকলেও বইটি চুরি হয়ে যেতে পারে! ভদ্রঘরের মেয়ে ভাগ্যের ফেরে গণিকা হয়ে গিয়েছিল। কাদায় পরিত্যাক্ত নবজাতক এক শিশুকে মাতৃস্নেহে লালন করে। ধবধবে ফর্সা রঙের জন্য নাম দেয় সাহেব। সেই মায়ের অন্নকষ্ট মেটাতে শিশু বয়সেই সাহেব দোকানের সামনে পড়ে থাকা চাউল কুড়ায় একটি একটি করে। এভাবে চুরিবিদ্যায় হাতেখড়ি হয়। এরপর একে একে পিতৃতুল্য নফরকেস্ট, এক সময়ের জাঁদরেল দারোগা থেকে চোরের মহাজন বনে যাওয়া বলাধিকারী, এবং সবশেষে চোর সাম্রাজ্যের বিস্ময় পচা বাইটার কাছে শিক্ষা পেয়ে ওর পরিচিতি হয় ‘সাহেব চোর’ হিসেবে। থানার দারোগা সম্মান করে ওকে বড়-কারিগর বলে সম্বোধন করে। হাতে পেয়েও গারদে ঢোকায় না। কি সূক্ষ্ণ চোর রে বাবা! নিঝুম রাতে শুধু নিঃশ্বাস এবং এপাশ-ওপাশ করার মনোজ বসু শব্দ শুনে বলে দিতে পারে ঘরের ভেতরে কতজন ঘুমাচ্ছে। পুরুষ না মহিলা? বয়স কত? শিশু, কুমারী, সধবা, না বিধবা? তবেই স্থির করে চুরির পদ্ধতি। সাধারণ চোরেরা কচি-শিশু, রোগি, বৃদ্ধ, লুচ্চাপুরুষ আর নষ্টমেয়ের ঘর এড়িয়ে চলে। কারণ ওরা যে কোন সময় জেগে উঠতে পারে। কিন্তু সাহেব চোরের কথা আলাদ। নিয়ম না মেনেও বড় বড় চুরির কাজ শেষ করে ফেলে নিমেষে, কেউ টের পায় না। সিঁধের কারুকার্য মুগ্ধচোখে দেখে দেখে গৃহস্থ তার সর্বস্ব হারানোর কথা ভুলে যায়। তা না হলে আর চুরির মর্যাদা কোথায়? এ লাইনে দিকপাল হতে হলে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে হয়। সবাই ছাত্র হতে পারে না। হতে পারলেও পরীক্ষায় পাশ করা আরো কঠিন। আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা থেকে ঢের কঠিন! সাহেবের প্রতি আমার আকর্ষণ বেড়ে যায়। মনটি বড় দয়ালু তার। চুরি করা বাড়ির লোকজন যেন অভুক্ত না থাকে সেদিকে কড়া নজর! ধনীর সর্বস্ব চুরি করে দরিদ্রের উপকার করা ওর নেশা। রাতে গৃহস্থের সর্বস্ব চুরি করে সকালে সাধুবেশে আবার সেখানেই হাজির হয়। গৃহস্থ সেই সাধুর কাছেই মন উজার করে দেয়। বইটিতে ছিল বিচিত্র সব চুরির ঘটনা, কত চোরের কাহিনী, আধুনিক ও অতীতের, শহুরে ও গ্রামের। আমার নিশ্চিত ধারণা জন্মেছিল যে মনোজ বসু নিজে একজন চোর ছিলেন। তা না হলে চোরদের অতি নিজস্ব, গুপ্ত সংকেত, গোপনীয় কিন্তু বিস্তারিত কলাকৌশল জানা বা বর্ণনা করা কারো পক্ষে সম্ভব হওয়ার কথা নয়। কী সর্বনাস! এক সর্বজন শ্রদ্ধেয় লেখককে আমি চোর ভাবছি! না, তাতে আমার কোন দোষ নেই। কারণ যে চোরের জীবনী নিয়ে এ বইটি, সেও তো ভাল লোক ছিল। মা-কালীর কাছে কতোবার প্রার্থনা করেছে ওকে মন্দ করে দেয়ার জন্য। কিন্তু দেবী তার কথা শোনেনি। রাতের বেলায় কে আসে? কে আবার, অভিসারী বা প্রণয়িণী হবে কেউ! তখন কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম-দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বেড়ার ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছি। একলা ঘরে বিবাহিতা যুবতী আশালতা ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুদর্শন সাহেব চোর লুকিয়ে তার পেছনে পেছনে হাঁটছে। বিছানায় শোয়ার অনেক্ষণ পর চোরও পাশে শুয়ে পড়লো টুপ করে। আরো কিছুক্ষণ পর সাহেবের ‘দুটো হাতই ব্যস্ত হয়ে পড়লো’। ওর ‘হাতের এমনি ধারা মিহি কাজ’ যে একহাতে আশালতাকে আদর করতে করতে আরেক হাতে ক্ষিপ্র গতিতে একটার পর একটা অলংকার হাতিয়ে নিচ্ছিল। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম! গা খালি হয়ে যায়, যুবতী কিছুই টের পায় না, শুধু আবেশে চোখ বুঁজে আসে। পরদিন বাড়ির সবাই অলঙ্কার হারানোর দুঃখে আহাজারি করছে। কিন্তু আশালতার ‘জীবনে সকলের বড় যে গয়না, অচেনা পুরুষ এসে তার খানিকটা তচনচ করে দিয়ে গেল’! এ কথা মুখফুটে সে কী করে বলে? শেষটা জানার লোভ দেখিয়ে লেখক কী নিপুণতায় আমাকে দিয়ে বিশাল বইটি পড়িয়ে ছেড়েছিলেন! তাতে আরো ছিল পচা বাইটা-র সুন্দরী পুত্রবধু সুভদ্রা। ‘কাঁখের কলসির মত দেহের কাণায় কাণায় ভরা যৌবন’ নিয়ে স্বামী সোহাগ বঞ্চিতা সেই রমণী জ্যোৎস্না রাতে একাকী সাহেবের হাত ধরে টানাটানি করে। লুকিয়ে আমিও হাঁটি ওদের পিছু পিছু। শুধু সুন্দরীই নয়, সুভদ্রা কাগজ, নকশি কাঁথা এবং দেহের অংগেও নক্সা আঁকিয়ে এক জাত-পটুয়া শিল্পী। নিজের বুকের মাঝখানে স্বামীর হাতে আঁকা ভালবাসার উল্কিটিও সাহেবকে দেখানোর লোভ হয়। কারণ একমাত্র সে-ই শিল্পের মর্যাদা বুঝবে। আচ্ছা, আমিও তো শিল্পের মর্যাদা বুঝতে চাই। আমিও দেখতে চাই। এভাবে রাতশেষে গল্পের ক্লাইমেক্সের অপেক্ষা করে করে শুনতে পেলাম সে এক ‘সাধু স্বামীর সতীসাধ্বী বউ’! তখন আমার তপ্তদেহ এক উষ্ণ-কোমল শ্রদ্ধার আঁধারে নিবারিত হয়। কিন্তু তখনো রাতভর সে হেসে হেসে নিজের দুঃখের কথা শুনিয়ে যায়। সে সব শুনে সাহেবের চোখে জল এসে যায়। জল আসে আমার, পাঠকের চোখেও। আহা, কী ভীষণ মমতা! কী দরদ সেই বর্ণনায়। রাতের বেলায় কে আসে? কে আবার? পুরনো দিনের স্মৃতি হবে কিছু! এখন বৃদ্ধ না হলেও আমার বয়স হয়েছে! চোরের গুরুরা সাবধান করে দিয়েছেন বৃদ্ধের ঘর যেন এড়িয়ে চলা হয়। দয়াপরবশে নয়, বৃদ্ধদের ঘুম খুব পাতলা হয় তাই। এখন পুরনো দিনের কথাই বেশি মনে পড়ে, শুয়ে শুয়ে বই পড়ি। ছয় বছর আগে ভারতীয় এক বন্ধুর হাত দিয়ে সেই নিশিকুটুম্ব বইটি কিনিয়ে এনেছিলাম কলকাতা থেকে। কী কাব্যিক একটি নাম! রাতের অতিথিও হতে পারতো, কিন্তু ততো জুৎসই হতো না কিছুতেই। প্রথম প্রকাশ ১৯৬৩। দুই খণ্ডের, ৭ বা ৮ ফন্ট সাইজের ৪৮০ পৃষ্ঠার বইটির প্রকাশক বেঙ্গল পাবলিশার্স। আজকাল আমরা ১২ বা ১৪ ফন্টের অক্ষরে যেসব বই লিখি সেরকম হলে পৃষ্ঠাসংখ্যা ৮০০র কাছাকাছি হয়ে যেতো! প্রাচীন শাস্ত্রমতে মহাদেব-পুত্র স্কন্দ বা কার্তিকেয় চৌর্য পদ্ধতির প্রবর্তক ছিলেন। চোরদের শায়েস্তা করতে দারোগা থাকা অবস্থায়ই বলাধিকারী মশাই ‘চৌর্যচর্যা’, ‘ষম্মুখকল্প’, ইত্যাদি প্রাচীন চৌর্যশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন। এখন চোরের মহাজন হয়ে সেসব বিদ্যা কাজে লাগছে। তিনি সাহেবকে সেকালের চুরি ও চোরদের নীতিবাক্য শোনান ‘চোর চক্রবর্তী’র পুঁথিপাঠ করে করে। কীর্তিমান চোর সার্বিলক ছিলেন ‘চলনে বিড়াল, ধাবনে মৃগ, ছিনিয়ে নেয়ার ব্যপারে বাজপাখি’। দুই হাজার বছর আগেই প্রচলিত হয়েছিল ‘পদ্মব্যাকোষ (পদ্মফুল), ভাষ্কর (সূর্য), বালচন্দ্র (কাস্তের আকারের চাঁদ), বাপী (পুকুর), বিস্তীর্ণ, স্বস্তিক, এবং পূর্ণকুম্ভ’ আকৃতির সিঁধের। চোরদের মহাগুরু পচা হাতেকলমে চুরির অসামান্য কৌশল ও শিক্ষা নিয়ে বাইটা উপাধি পেয়েছিলেন। সেই প্রশিক্ষণ ও উপাধি আধুনিক বিএ এমএ বা পিএইচডি থেকে কোন অংশে বেশি বই কম নয়! সাহেব তাঁর চেয়েও এক কাঠি ওপরে। চুরির অভিনব কৌশল ওকে কিংবদন্তীর খ্যাতি এনে দেয় বাংলার ভাটি অঞ্চলে, গৃহস্থের ঘরে ঘরে। কিন্তু দিনের বেলায় ওকে সবাই বিশ্বাস করে, ভালবাসে। ওর দ্বারা কোন খারাপ কাজ হতে পারে না। বৃদ্ধা-যুবতী-কিশোরী-শিশুর স্নেহ-ভালবাসা-ভক্তি পায় অযাচিত ভাবে। সাহেব চোরের গল্প শুনিয়ে মায়েরা শিশুদের ঘুম পাড়ায়। কিন্তু সাহেব চোর আর ভাল হতে চায় না। বৃদ্ধ হয়েছে। দুবেলার আহার জোগাড় এবং প্রায়শ্চিত্তের চেষ্টায় জেল-এও ঠাই হয় না। আবার প্রার্থনা করে ‘হে মা-কালী আমায় মন্দ করে দাও’। শেষ পর্যন্ত উপন্যাসের প্রথম দিককার চরিত্রগুলো আবার ফিরে আসে। যে আশালতার দেহ থেকে একটি একটি করে গহনা খুলে নিয়েছিল, তার মাতৃহীন কন্যার দেখা পায়। নিস্পাপ সেই কিশোরীর নীতিবান অভিভাবক অভাবের তাড়নায় চুরি করে বসে এবং ধরাও পড়ে। এই সুজোগকে সাহেব আর অবহেলা করে না। নিজে চোর সেজে আসল চোরের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করে, আশালতার কন্যার প্রতি অসীম স্নেহ-ভালবাসায়। চোর জেনেও বাড়ির মহিলা ওকে অভুক্ত অবস্থায় জেলে যেতে দেয় না। নতুন দারোগাকে অনুনয় করে একটু অপেক্ষা করতে। আর ঠিক তক্ষুনি সাহেব উপলব্ধি করে ‘অমৃতের বেটা-বেটি সব ভাল না হয়ে উপায় আছে? মানুষ যতকাল আছে জাতের স্বধর্ম বয়ে বেড়াতে হবে’। এই ভালবাসার উপলব্ধি দিয়েই মোড়ানো বইটির অসংখ্য চরিত্র। ওরা এবং ঘটনাগুলো ‘ধরিত্রির শিরা উপশিরার মত গাঙ-খাল’ হয়ে একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে। খুলনা ভাটি অঞ্চলের সামাজিক, কলকাতা কালীঘাটের ‘অসামাজিক’, এবং নস্টালজিক ভৌগলিক চিত্র পাঠকের চোখে হাজির হয়েছে এক স্বচ্ছ আবরণ ভেদ করে। সার্থক লেখকের কলমের ডগায়। জ্ঞানী বলাধিকারী মহাশয়ের ভাষায় ‘একটা চোরের কথা কেউ যদি ভাল করে লেখে, সমাজের সকল মানুষের জীবনী লেখা হয়ে যায়’। ‘সেকালে যা পাপ ছিল আজ তা পুণ্য’, ‘সাধু মানেই ভণ্ড’! দারোগারা ‘চোরের অনটন পড়লে ভাল গৃহস্থকে চোর বানিয়ে দেয়’! লিখেছেন প্রায়ই সূক্ষ্ণ বিদ্রুপাত্মক, কখনো রম্য রচনার এক মোহনীয় ধাঁচে। ভোর রাতে চোখে ঘুম আসার আগে আমার পূর্ব সিদ্ধান্ত সংশোধন করলাম। মনোজ বসু নিজে চোর ছিলেন না। বিস্তর পড়াশোনা করেছিলেন ও ভেবেছিলেন চোরদের নিয়ে। হয়তো তেমন কোন চোরের লম্বা সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন। ফলে অসামান্য এই উপন্যাসটি লিখতে পেরেছিলেন। তাই প্রকাশিত হবার তিন বছরের মাঝেই ‘সাহিত্য একাডেমি’র পুরস্কার পেয়েছিলেন, যা বছরে শুধু একটি উপন্যাসকেই দেয়া হয়। তাঁর ছোটগল্প ‘একশত বছরের সেরা ছোটগল্প’ বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তারাশঙ্করের নিতাই বলেছিল, "জীবন এতো ছোট কেনে?" আর এই উপন্যাসে সাহেব বলে, "হে মা কালী, আমায় মন্দ করে দাও"
সাহেব, চোর। এরা অবশ্য চোর বলে না, বলে কারিগর। চুরি কেবল একটা অবৈধ বৃত্তি নয়, শিল্পকর্ম। কোন জুটির 'পাপের ফল' শিশুকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেয় বাবা মা। পতিতা সুধামুখী যাকে বড় করে তোলে, সে আমাদের নায়ক, সাহেব।
একেকটা মানুষ কেবল টাকা বয়ে বেড়ানোর থলে, আর আমরা প্রত্যেকে চোর। কিন্তু আমাদের মন্দ হওয়া হয় না, কোথাও না কোথাও, আমরা ভালোই থেকে যাই।
"নিশিকুটুম্ব" কারা? নিশির কুটুম যারা! বুঝলেন না তো! নিশিকুটুম্ব মানে ওই যারা রাতের বেলা আপনার বাড়ি অনিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে ঢোকে আর কী! সোজা বাংলায়, 'চোর'... এই 'চোর' আর 'চুরি' নিয়েই এই পুরো উপন্যাসের আবর্তন। কী অসম্ভব শোনায় আমাদের কাছে এই 'চোর' শব্দটা! চুরি করাও যে একটা শিল্প, চোর হওয়া যে পড়াশোনা করে চাকুরী করার মতো অত সোজাসাপ্টা নয়, সেটা এই বই না পড়লে আর জানতে পারতাম কী করে? আমার-আপনার চোখে যা কেবল চুরি, সেটাই অন্য জনের কাছে সারা জীবনের সাধনা, গুরুর কাছ থেকে তিলে তিলে অর্জন করা এক 'পরম বিদ্যা'। এই বিদ্যায় চোর নামক মানুষটা কী আর মানুষ থাকে? সে তো হয়ে যায় অন্ধকারে দেখতে পাওয়া, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শব্দ শুনতে পাওয়া, আর চোখের নিমেষে কার্য সিদ্ধি করা এক 'অতি মানব'...
যাকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসের সব চরিত্রের উত্থান পতন, সে হল 'সাহেব চোর', যার নামকরণ হয়েছে সাহেবদের মতো রূপের সাথে মিলিয়ে। সাহেব���র জন্ম কোথায়– সেটা স্পষ্টভাবে জানা যায় নি। তাকে কালীঘাট মন্দিরের সামনে গঙ্গা ঘাটে কুড়িয়ে পায় পতিতালয়ের 'সুধামুখী'... নিজের জীবনের গ্লানি,পরাজয়, আতংক, সমস্ত ভুলে সে বড় করতে থাকে সাহেবকে। কিন্তু ছেলে ছোটবেলা থেকেই ঘর-বিমুখ। এই বিমুখতাই তাকে টেনে নিয়ে যায় সুধামুখী, পারুল, রাণীর থেকে বহু বহু দূরে, এক অদ্ভুত নিষিদ্ধ জগতে।
এরপরের অংশে আমরা দেখি এক প্রচণ্ড সৎ,দাপুটে দারোগা জগ��ন্ধুকে, যে তার অঞ্চলের চোর নির্মূলে ভীষণ তৎপর। কিন্তু এর পর কাহিনি যতই আগায়, আমরা ততই দেখি এক পরাজিত সৈনিকের হতাশামাখা মুখ। আস্তে আস্তে উপন্যসসে আবির্ভাব ঘটে চোরদের সর্দার, 'বলাধিকারী'র। কে তিনি? উপন্যাস পড়ে মিলিয়ে নেবেন না হয়? লেখার প্রথমেই চৌর্যবৃত্তিকে শিল্পে রূপান্তরের কথা বলেছিলাম। সে কাজে পুরো অঞ্চলে যার কোনো জুড়ি নেই, তিনি 'পচা বাইটা'... আমাদের 'চোর-নায়ক' সাহেব যার একমাত্র সফল,বরং বাইটামশাই থেকেও এগিয়ে যাওয়া শিষ্য। এই অংশ উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানেই আমরা দেখতে পাই কী করে চুরির হাতেখড়ি হয়, কীভাবে একটা মানুষ পঞ্চ-ইন্দিয় আর হাত সাফাই দিয়ে মানুষ থেকে হয়ে যায় হরিণ,সাপ কিংবা বেড়াল!
উপন্যাসের শুরুতেই সাহেবের দুর্দান্ত এক অপারেশনের গল্প। সদ্য বিবাহিতা আশালতা। বাপের বাড়ি বেড়াতে এসেছে। শ্বশুর বাড়ির মর্যাদা বোঝাতে গা-ভর্তি তার গয়না। রাতের অন্ধকারে এই গয়নাই তার গা থেকে কৌশলে একটা একটা করে খুলে নিচ্ছে সাহেব— অবলীলায়,সন্তর্পণে। এই দুঃসাহসিক কাজের শুরু দিয়ে উপন্যাসের শুরু। তবে এই চুরির শেষটা কিন্তু এখানে নয়। লেখক থামিয়ে দিয়েছেন কাহিনি, টেনে এনেছেন সাহেবের ইতিবৃত্ত, তার সাথে নানান শাখা-প্রশাখা। ঘুরে ফিরে একটু পরপর এসেছে আশালতার প্রসঙ্গ, খুব প্রাসংগিক ভাবে।
কিন্তু এত দক্ষতায় পূর্ণ, এত চুরিবিদ্যার পারদর্শী যে সাহেব, সে আসলে কেমনধারার মানুষ? ''হে মা কালী, আমায় মন্দ কর,মন্দ কর।", সারা উপন্যাসজুড়ে সাহেবের কন্ঠে এই এক হাহাকার। কোনো কিছুই সাহেবের মনকে কেন যেন শক্ত করতে পারে না। অতি অল্প ঘটনাতেই সাহেবের চোখে জল আসে,মন হয়ে ওঠে আদ্র। তাই তো রাতের বেলা সিধ কেটে যার বাড়ি থেকে গয়না আনে, দিনমানে তার কাছেই ফিরিয়ে দিয়ে যায় যা কিছু নিয়েছিল রাত্রিবেলা! কী অদ্ভূত এক মিশেল, কী মায়াময় এক চরিত্র! এক নিতান্তই 'গ্রাম্য' চোরের প্রতি এত প্রগাড় মমতা অনুভব করবো, বুঝি নি একবারও!
মনোজ বসু'র সঙ্গে এই আমার প্রথম পরিচয়। উপন্যাসের শুরু থেকে মাঝ অব্দি লেখক আরেকটু লাগাম টানতে পারতেন বোধহয়। কিছু অংশকে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। তবে মাঝ থেকে শেষ পর্যন্ত টুকুকে আমি বলবো দুর্দান্ত, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ক্লাসিক! আমি রিভিউতে যতটুকু বলতে চেয়েছি,মূল উপন্যাস তার বহু বহু উর্ধ্বে, অনেক অনেক বিস্তৃত... যারা একবার হাতের কাছে এই বই পেয়েছেন, না পড়ার ভুল ভুলেও করবেন না যেন!
This entire review has been hidden because of spoilers.
এই জিনিস অকাদেমী (!) পুরস্কারপ্রাপ্ত? বাংলা একাডেমির চেয়ে অবস্থা খারাপ এই অকাদেমীর, কিংবা বাংলাদেশের চেয়ে বেশি সংকট সেখানে লেখকের। মনুজ বসু পড়েছেন প্রচুর। না পড়লে ছোট গল্প জুড়ে জুড়ে এত বিশাল বই লেখা যায় না। তবে তিনি গল্প বলতে পারেন না; অন্তত এই বইয়ে পারেননি। পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে সন্দেহ জাগে, এই লোকই তো গল্প বলছিলেন এতক্ষণ? আমাকেই তো বলছিলেন? নাকি অন্য কেউ, অন্য কাউকে বলছিলেন? কিছু মানুষ থাকে না যারা কৌতুক বলে আবার সেটাকে ব্যাখ্যা করতে বসেন? ব্রাকেটের ভাব সাব দেখে আমার সেই সব লোকের কথা মনে হচ্ছিল। আমি এখন পর্যন্ত অন্য কোন উপন্যাস পড়িনি যেটাতে গল্প বলিয়েকে ব্রাকেটে গল্পের ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। কিছু কিছু চরিত্র আরো বেশি ব্যঞ্জনাময় হতে পারতো- রানী, নমিতা, আশালতা। কিছু চরিত্রের সমাপ্তি আমাদের জানাতে পারতেন- বলাধিকারী, ভট্টাচার্য। এবং অবশ্যই সাহেবের শেষ পরিণতি আর একটু বিস্তারিত করে বলা যেত। শেষের দিকে লেখক তাড়াহুড়া করেছেন খুব। একটা জিনিস স্বীকার করতেই হয়, এরকম বিরক্তিকর জিনিস ১০-২০ পৃষ্ঠার বেশি পড়া লাগে না আমার, পড়িও না। কিন্তু আমি পড়ে গেছি। বিরক্তি বেড়েছে, কিন্তু ফেলে উঠিনি। মনোজ বসুকে এইটুকু কৃতিত্ব দিতেই হয়।
শেষ পর্যন্ত পড়েই ফেললাম নিশিকুটুম্ব। পড়তে ভাল লেগেছে। যেখানে চোরকে আমরা নিন্দা করি এই উপন্যাসে তারাই প্রটাগনিস্ট। সাহেব/গনেশ ছিল কারো অবৈধ সন্তান। জন্মের পরপরই তাকে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। সুধামুখী বারাঙ্গনা তাকে লালনপালন করেছেন, সুধা তাকে পুত্রের মতই পালন করেছে। চেয়েছিল সাহেবকে লেখাপড়া শেখাবে কিন্তু দারিদ্র্য এবং সুধার দালাল নফরকেষ্টর প্ররোচনায় শেষ পর্যন্ত সাহেবকে চোর হতেই হয়। এইভাবে ট্রেনে চুরি করতে গিয়ে অন্য এক চোর গুরুর সাথে আলাপ হয়, পরে সেখান থেকে পচা বাইটার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে একজন নিপুণ চোর হয়। সুধার প্রতিবেশী পারুলের মেয়ে রাণী ছিল তার বাল্যকালের সাথী। প্রথম চুরি করে রাণীর ইমিটেশন অর্নামেন্ট। পরে বুঝতে পেরে রাণীকে আবার ফিরিয়ে দেয় গহনা তবে সরাসরি নয়। রাণীকে বলে কালী মায়ের কাছে প্রার্থনা করতে আর সাহেব তখন সেখানে সেটা রেখে যায়। রাণী ভাবল কালীমা করেছেন। তাই রানী কোনদিন ফিতা কোনদিন জুতা চেয়ে বসে। আর এদিকে কালী মা অর্থাৎ সাহেবকে এইগুলো চুরি করে রাণীর অলক্ষ্যে ঘরে রেখে যেতে হয়। কিন্তু সাহেব ও রাণীর প্রেম পূর্ণতা পায় না। এটাই দুঃখজনক!
শেষের দিকে একটু একঘেয়ে লাগছিল। কিন্তু একেবারে শেষ এসে উপন্যাসটিকে লেখক একদম অন্যমাত্রাতে নিয়ে গেলেন! সাহেবের সারা জীবনের প্রার্থনা ছিল - হে ঠাকুর, আমাকে মন্দ করে দাও! সেই সাহেব অবশেষে উপন্যাসের শেষে এসে মন্দ হতে পারল। নাকি আসলে ভালো হতে পারল? কী জানি!
Too many works pending to digest this beautiful piece in a peaceful pace. I am hell proud that I can read or I would never know these versions of the world 💜
বছরের ৩২ নম্বর বই, মনোজ বসুর লেখা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত উপন্যাস "নিশিকুটুম্ব" অনেকদিন ধরেই পড়বো পড়বো করছিলাম সময় হয়ে উঠছিল না প্রায় ৫৭০ পাতার উপন্যাস, সময়ও লাগলো বেশ কিছুটা শেষ করতে। আমার কাছে যে বইটি আছে সেটি ১৯৮৫ সালের অখন্ড সংস্করণ। বইটি এখন বানিশিল্প প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়। বইটির প্রচ্ছদটি খুব সুন্দর বেশ আলাদা।। এর আগে মনোজ বসু এর লেখা পড��া হয়ে ওঠেনি।। উপন্যাসটিতে প্রোটাগনিষ্ট হিসেবে এক চোর এর জীবন যাত্রা দেখানো হয়েছে।। গণেশচন্দ্র পাল, গায়ের রং এবং সুশ্রী চেহারার অধিকারী ছেলেটাকে সবাই সাহেব নামেই ডাকে।। এই সাহেব এর ভাটি অঞ্চলের প্রবাদে পরিনত হওয়া সাহেব চোর হওয়ার দীর্ঘ এক পথ চলার উপাখ্যান " নিশিকুটুম্ব" লিখেছেন মনোজ বসু।।
✴️ পটভূমি -
সুধামুখী নামে কালিঘাটের পাশে এক পতিতাপল্লীর যৌবনের ক্রান্তিলগ্নে এসে ঠেকে যাওয়া এক পতিতার ঘর থেকে শুরু কাহিনীর। পতিতাদের সামাজিক অবস্থান থেকে শুরু করে পল্লীর ভেতর বাইরের জীবনমানের যে বিস্তর পার্থক্য তা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাঠক বইয়ের শুরুতে পাবে। উপন্যাসের মূল চরিত্র সাহেব। এটা তাঁর পোষাকি নাম। রূপে রাজপুত্র হওয়ার কারনে সকলের কাছে সে ছোটবেলা থেকে সাহেব নামেই পরিচিত। অন্যদিকে রূপ থাকলে কী হবে সে আদতে সুধামুখীর কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে। তাই মানুষের চোখে সাহেব রাজপুত্র হলেও সমাজে তার স্থান নেই বললেই চলে। আর এই সামাজিক অগ্রহণযোগ্যতা থেকে সাহেবের চোর হতে যাওয়া। তা ও যে সে চোর না। একেবারে নামডাক ওয়ালা চোর। সাহেব কালিঘাটের কাছাকাছি থাকার কারনে সবসময় মা কালীর কাছে একটাই চাওয়ার ছিল। "হে-মা কালি আমায় মন্দ করে দাও"। আর সারাজীবন সেই চাওয়ার পেছনেই ঘুরতে হলো। মন্দ হতে গিয়ে, মন্দ করতে গিয়ে কতদিকে কতজনের ভালো করে ফিরে আসা তার কি ইয়াত্তা আছে? কিন্তু সাহেব তো বুঝে না, বিধাতা যাকে ভালোর জন্য পাঠিয়েছে তার দ্বারা মন্দ হবে কেমন করে? এই মন্দ হওয়ার পেছনে ছুটতে গিয়ে শহর কলকাতা থেকে শুরু করে ভাটি অঞ্চলের প্রবাদে পরিনত হওয়া সাহেব চোর হওয়ার দীর্ঘ এক পথ চলার উপাখ্যান " নিশিকুটুম্ব" এই উপন্যাস শুধু সাহেবের গল্প আছে তা শুধু নয়, ভদ্রঘরের মেয়ে সুধামুখীর গণিকা হওয়ার গল্প, নফরকেষ্ট এর ভদ্র হওয়ার গল্প, সৎ পুলিশ অফিসার বলাধিকারীর চোরের মহাজন হওয়ার গল্প, কাজলীবালার সরলতার গল্প, চোরকে স্বামী মনে করে আশালতার গয়না হারানোর গল্প, মধুসূদনের আজীবন চোরকে ফাঁসি দেওয়ার ইচ্ছা থাকার পরেও নিজে চোর হওয়ার গল্প, ক্ষুদিরাম ভট্টাচার্যের পাহারাদার থেকে চোর হওয়ার গল্প, ছেলেকে ডাকাতের হাতে ফেলে রেখে গয়নার বাক্স ধরে রাখার গল্প, সুভদ্রা বউয়ের এক থাকার গল্প।
✴️ পাঠ প্রতিক্রিয়া -
রাতে যে কুটুম বাড়িতে আসে তাদের নিশিকুটুম্ব বলে। বইয়ের নামও "নিশিকুটুম্ব"। এখানে ঠিক চিরাচরিত কুটুমের অর্থে নামটি দেয়া হয়নি। চোর যারা, তাদের আনাগোনা মূলত রাতের বেলাতেই তাই তাদের সজ্ঞায়িত করতে এই নামের ব্যবহার। আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বই " নিশিকুটুম্ব" নিয়ে মনে রাখার মতো অনেককিছুই আছে। আমার মতে বাংলা সাহিত্যে এমন অভিনব বিষয় নিয়ে বই হয়তো হাতেগোনা আবার এমনও হতে পারে এটাই প্রথম। চোর সমাজের অন্ধিসন্ধি নিয়ে বিসৃত এই উপন্যাসের রস পাঠককে এমন আচ্ছন্ন করে রাখে। যা পাঠকের মনে এই উপন্যাস চিরস্থায়ী জায়গা করে নিতে সক্ষম। ঠিক এই প্রশ্নেরই যেন উত্তর খুঁজে ফিরেছেন লেখক। এমন অসাধারণ অনবদ্য লেখনী আর কাহিনী দিয়ে লেখক রাতের কুটুমদের যে গোপন জীবনের একটি চিত্র এঁকেছন তা যে আদৌ সম্ভব সেটা কেউ কেউ হয়তো ভাবনাতেই স্থান দিবেন না। চোর সমাজ বা চোরের দলের মধ্যে যে কত শ্রেণী কত নিয়মকানুন তা পড়তে গিয়ে পদে পদে অবাক হতে হয়েছে। পুরান থেকে শুরু করে শত শত বছরের চুরি বিদ্যার ইতিহাস। যা এই বইটাকে একজন চোরের বা গোটা চোর সমাজের উৎকৃষ্ট আখ্যান হিসেবে ধরে নেয়া যায়। বাংলা সাহিত্যে এই ধরনের বইগুলি সম্পর্কে খুব একটা আলোচনা বা রিভিউ দেখা বা শোনা যায় না।। এই বইগুলি একেকটা ক্লাসিক যদি না পড়ে থাকেন অবশ্যই পড়বেন, মিস করবেন না।।
বছরের শুরুটা হলো অতিমাত্রার এক ওভাররেটেড বই দিয়ে। প্রথম খণ্ডের শুরুটা বেশ ইন্টারেস্টিং ছিল। কিছুদূর গিয়েই ঝুলে গেল উপন্যাসটা। ঠেলেঠুলে প্রথম খণ্ড শেষ করলেও, দ্বিতীয় খণ্ডের ত্রিশ পৃষ্ঠার মতো পড়ে আর না এগোনোর সিদ্ধান্ত নিলাম।
কোন বই বোরিং লাগলেও, ইতিপূর্বে শুধুমাত্র এন্ডিং জানার জন্য পুরোটা পড়তাম। বিশেষ করে ফিকশনের ক্ষেত্রে। কিন্তু ঢাউশ ঢাউশ বইগুলোর ক্ষেত্রে এমনটা করা এখন সময়ক্ষেপণ বলেই মনে হয়।
চৌর্যবৃত্তির আদি ঐতিহ্য, গৌরব, বিচিত্র ক্রিয়াকৌশল ---সেসব নিয়ে মজাদার ঘটনা, হিউমার, চুরিবিদ্যার দেবতাদের পাঁচালি, ব্রতকথা-- উপন্যাসটা তারপরেও কেমন জমে উঠলো না । লাইনে লাইনে সেই এক একঘেয়ে বর্ণনা।
অনেকেরই প্রিয় বই এটি। আমার হলো না। মেনে নিয়ে পিডিএফ ফাইল দুটি ডিলিট দিলাম।
The story is based in the era of 1950's. It depicts typical Bengali lifestyle. Read half, but then got tired due to its descriptiveness and small fonts.