অন্ধকারের উৎস হতে বাঙালির ভুবনের ছয়টি জটিল ওদুর্জ্ঞেয় প্রহেলিকা সম্পর্কে আলোর অন্বেষা। আলোচনা শুরু হয়েছে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে রহস্যময়ী রমনী বনলতা সেনকে নিয়ে। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে বনলতার যে চিত্র ফুটে উঠেছে তার সাথে চিরাচরিত ব্যাখ্যার কোন মিল নেই। দ্বিতীয় নিবন্ধে রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন উপেক্ষিত মাত্রা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা। তৃতীয় নিবন্ধের উপজীব্য হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা যা বাংলাদেশকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। রূপসী বাংলার অনির্বচণীয় নিসর্গের পটভূমি টিপাইমুখ বাঁধ একটি নতুন অশনি সংকেত। এই বাঁধের স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সমূহের বিশ্লেষণ করা হয়েছে একটি নিবন্ধে। “ভিক্ষার ঝুড়ির’” অপবাদ নিয়ে যে রাষ্ট্রের জন্ম আজ সে ঘুরে দাঁড়িয়েছে , বাংলাদেশের অর্থনীতি : আশা নিরাশার দোলাচলে “ শীর্ষক নিবন্ধে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজকের সফলতা ও দুর্বলতা সমূহ তুলে ধরা হয়েছে। সর্বশেষ প্রবন্ধে বাংলাদেশ ও বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষিতে ব্যাংক ব্যবস্থা ও নৈতিকাবোধের সম্পর্কে আলোচিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ক্ষুদ্র ঋণ ও ইসলামী ব্যাক নিয়ে কিছু মূল্যবন তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে কোন কোন প্রবন্ধের বিষয় জটিল মনে হলেও এই বইয়ের প্রতিটি প্রবন্ধ রম্য রচনার আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। বক্তব্যের স্পষ্টতা ও সরলতা পাঠকদের অন্ধকারের উৎস থেকে আলো পথে টেনে নিয়ে যাবে। হাসতে হাসতে পাঠক নিজের অজান্তেই জড়িয়ে যাবেন বাঙালির জগত ও জীবনের অনেক প্রহেলিকা নিয়ে বিতর্কে ।এই বই সাধারণ পাঠকদের জন্য পরার্থপরতার অর্থনীতি গ্রন্থের লেখকের একটি অসাধারণ উপহার।
সূচিপত্রঃ
* সাহিত্য অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো: নতুন আলোকে বনলতা সেন * সমাজ ও রাষ্ট্র বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ : কতিপয় প্রাসঙ্গিক ভাবনা বিসমিল্লায় গলদ : বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত * পরিবেশ পরিবেশ বিনাশী টিপাইমুখ বাঁধ: ঝুঁকির রাজনীতি ও অর্থনীতি * অর্থনীতি বাংলাদেশের অর্থনীতি : আশা নিরাশার দোলাচলে ব্যাংক ব্যবস্থা ও নৈতিকতাবোধ
Akbar Ali Khan (Bengali: আকবর আলি খান) was a Bangladeshi economist and educationist who served as a bureaucrat until 2001. He was the SDO of Habiganj during the Bangladesh Liberation War, when he decided to join the war. Later he served as an official of the Mujibnagar Government. After the independence he joined back the civil serviceand reached to the highest post of Cabinet Secretary and also worked as a university teacher. His book Porarthoporotar Orthoniti (Economics of Other-minding) has been a popular book on economics à la Galbraith.
'ক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ফ্রান্সের শক্তিধর বুরবন সম্রাট, রাশিয়ার জার ও মোগল বাদশার সাথে তুলনীয়। প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ওপর কোনো রাস নেই । সাংসদদের দ্বারা তিনি নির্বাচিত হলেও দলীয় প্রধান হিসেবে তিনি সাংসদদের নিয়ন্ত্রণ করেন। মন্ত্রীরা তার সহকর্মী নন, তার অধীনস্থ কর্মকর্তা। সকল সাংবিধানিক পদে নিয়োগ তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। ' - আকবর আলি খান
'অন্ধকারের উৎস হতে' বইটি বেশ কিছুকাল বাজারে পাওয়া যেতো না। সম্প্রতি 'পাঠক সমাবেশ' আবার বইটিকে ছাপায়। এখানে মোট ছয়টি বিভিন্ন ধরনের প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। বনলতা সেন থেকে ব্যাংকিং সেক্টর পর্যন্ত অবলীলায় বিচরণ করেছেন প্রাজ্ঞ প্রাবন্ধিক আকবর আলি খান।
আনুষ্ঠানিকভাবে সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন না আকবর আলি খান। কিন্তু সাহিত্যবোধ ও আন্তরিকতা নিয়ে পাঠ করেছেন বিস্তর সাহিত্য। জীবনানন্দ দাশ তাঁর প্রিয়দের একজন। রূপসী বাংলার এই কবির সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা বোধকরি 'বনলতা সেন'। মার্কিনদেশের এডগার আ্যলান পো সাহেবের 'টু হেলেন' কবিতার মাধ্যমে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ। কিন্তু নিজস্ব রুচিবোধ, সৌন্দর্যের প্রতি গভীর অনুরাগের মিশেলে একান্তই যেন মৌলিক কবিতায় পরিণত হয়েছে 'বনলতা সেন'। সেই 'বনলতা সেন'-এর ছত্রে ছত্রে তিনি কবিকে খুঁজেছেন। বিস্তর পড়াশোনা করে তাফসির করেছেন 'বনলতা সেন' কবিতার। পরিশেষে, বনলতা সেনের একটি তাত্ত্বিক পরিচয় উদঘাটন করার চেষ্টা করেন আকবর আলি খান। যা অনেক জীবনানন্দ-প্রেমীকে বিমোহিত করবে না।
'৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম হওয়া বাংলাদেশ ছিল দুনিয়ার গরিব দেশগুলোর শিরোমণি। এত বেশি প্রতিবন্ধকতাকবলিত রাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বে তখন আর ছিল না। নামজাদা অর্থনীতিবিদ ও পণ্ডিতদের অনেকেই বাংলাদেশকে নিয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। তারা মনে করতেন, এদেশের উন্নয়ন হলে আল্লাহর দুনিয়ার যে-কোনো স্থানে উন্নয়ন সম্ভব। অর্থাৎ, আমরা ছিলাম একটি উন্নয়নের গিনিপিগ! কাঙ্ক্ষিত সুশাসন, গণতন্ত্রের প্রবল ঘাটতি এবং দুর্নীতিসহ নানান অনাচারের বাড়-বাড়ন্ত থাকলেও সকল তত্ত্বকথাকে ভুল প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ। মাত্র তিন দশকের ব্যবধানে মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান। এটি পুরো পৃথিবীকে অবাক করে দিয়েছে। যা পরিচিত 'বাংলাদেশ প্রহেলিকা' নামে। এই প্রহেলিকার প্রতিটি পরত তিনি ব্যাখা করেছেন। এই প্রবন্ধখানা কমসেকম তিনবার পড়ার মতো৷
২০০৮ থেকে ২০১০ সময়কালে এই বইয়ের একাধিক প্রবন্ধ রচিত। তাই তখনকার রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব ব্যাখা-বিশ্লেষণে পাবেন।
রাষ্ট্রের কোনো স্থায়ী দোস্ত হয় না। রাষ্ট্রের চিরস্থায়ী হচ্ছে শুধু স্বার্থ। এই সরলসত্য প্রায় দেড় শ বছর আগে বিলাতের সংসদে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোন বলেছেন। 'টিপাইমুখ বাঁধ' ভারতকে কতটুকু লাভবান করবে তার হিসাব ভারত করুক। তবে আকবর আলি খান সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, লাভের বখরা বাংলাদেশ পাবে না। বরং অনাগতকালে ঝুঁকির ভার পূর্ণমাত্রায় বইতে হবে। তাই প্রতিবেশী দেশের এমন প্রকল্পগুলো সম্পর্কে আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনায় আরও মনোযোগী, হিসেবি ও সর্তক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন 'পরিবেশ-বিনাশী টিপাইমুখ বাঁধ' প্রবন্ধে।
ব্যাংকব্যবস্থার খুঁটি হলো জনগণের বিশ্বাস। নীতি-নৈতিকতাবর্জিত আচরণ ব্যাংকিংখাতের স্বভাবে পরিণত হলে সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী। ফলে জনগণের আস্থায় হারিয়ে ফেলে ব্যাংকিংসেক্টর। তার অশনিপ্রভাব পুরো অর্থনীতিকে রুগ্ন করে তোলে। বাংলাদেশের ব্যাংকখাতে নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে রচিত প্রবন্ধখানা তত খাসা হয়নি। বরং বড্ড বেশি তত্ত্বকথায় ভর্তি। বইয়ের অন্যতম কমজোরি লেখা।
এই বইয়ের ছয়টি প্রবন্ধের মধ্যে পাঁচটি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বই লিখে গেছেন আকবর আলি খান। যেমন: বনলতা সেনকে নিয়ে 'বনলতা সেন: চাবিকাঠির খোঁজে', রাজনীতি নিয়ে 'অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি', ব্যাংকখাত নিয়ে 'বাজেট' ও 'দারিদ্র্যের অর্থনীতি' বইতে নিজের চিন্তাভাবনা বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করেছেন আকবর আলি খান। তাই ইতোমধ্যে উপর্যুক্ত বইগুলো আপনি পড়ে ফেললে এই বইতে জানার মতো নতুন কিছু না-ও পেতে পারেন। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশের পানিসম্পদ নিয়ে একটি বই লিখতে চেয়েছিলেন ড. খান। কিন্তু তার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তাই 'টিপাইমুখ বাঁধ' নিয়ে লেখাটির জন্য প্রায় সাড়ে পাঁচ শ টাকা খরচ করে বইটি কিনবেন কি না, তা একান্তই আপনার মর্জি। যদিও মুর্শিদ মুজতবা আলী কহেন, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।
আকবর আলি খানের লেখা সব সময় সুপাঠ্য। কিন্তু 'পরার্থপরতার অর্থনীতি' লিখে পাঠকের প্রত্যাশাকে তিনি সুউচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তাতে বলব, এই বইয়ের গদ্যগুণ তাঁর নামের শতভাগ সুবিচার করতে কামিয়াব হয়নি।
‘অন্ধকারে উৎস হতে – সাহিত্য, সমাজ, পরিবেশ ও অর্থনীতি সম্পর্কে আলোর সন্ধান’ গ্রন্থটি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক আমলা ডঃ আকবর আলি খানের দীর্ঘ গবেষণার ফসল। যদিও গ্রন্থটি বেশ কিছু জটিল বিষয়ের প্রবন্ধে সমৃদ্ধ, তারপরও গবেষণা গ্রন্থের কঠিন কঠোর ভাব এতে নেই। বরং বলা চলে সাধারণ পাঠকের জন্যই লেখক অনেক যত্নের সঙ্গে প্রবন্ধগুলো রচনা করেছেন। নামকরণ প্রসঙ্গে বইয়ের লেখক ভূমিকায় লিখেছেন, “ অন্ধকারে উৎস হতে বাঙালি জীবনের কিছু জটিল ও দুর্জ্ঞেয় প্রহেলিকা সম্পর্কে আলোর অন্বেষা”। সাহিত্য, সমাজ, পরিবেশ ও অর্থনীতির দুর্গম অঞ্চলে আলো জ্বালিয়ে নতুন কিছু দিক উদ্ভাসিত করার সচেতন প্রয়াস দেখা যায় আলোচ্য গ্রন্থে।
বইটিতে ছয়টি প্রবন্ধ রয়েছে যাদেরকে লেখক চারটি ভাগে ভাগ করেছেন- সাহিত্য, সমাজ ও রাষ্ট্র, পরিবেশ এবং অর্থনীতিতে নামে। যদিও বিষয়বস্তুগুলোর নিজেদের মধ্যে কোনো মিল নেই তারপরও প্রতিটি প্রবন্ধই পাঠকের সমান মনোযোগ আকর্ষণ করে।