বিজ্ঞানের রাণী হিসেবে অভিহিত গণিত এর ভিত্তি হলো জ্যামিতি। কেউ যদি কখনো বিজ্ঞানের রহস্য উন্মোচন করতে চান তাকে অবশ্যই জ্যামিতির সদর দরজা পেরোতে হবে। সহজ করে বললে এ জ্যামিতি ইউক্লিডের জ্যামিতি। ইউক্লিড থেকে জ্যামিতিকে আলাদা করা দুরূহ। দুই হাজার বছর ধরে এটি মানবজাতিকে অনুপ্রাণিত করে আসছে। আইনস্টাইন তার আত্মজীবনী অটোবায়োগ্রাফিক্যাল নোটস এ জ্যামিতির প্রতি তার মুগ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। একই কথা কেপলারও উল্লেখ করেছেন। এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করা বইগুলোর একটি। সভ্যতার ইতিহাসে এলিমেন্টস গ্রন’াবলীর প্রত্যক্ষ, অপ্রত্যক্ষ অবদান অসামান্য। জ্ঞানের ইতিহাসে এই গ্রন্থ নিজের অবস্থা অক্ষুন্ন রেখে কোপার্নিকাস, কেপলার, নিউটন, আইনস্টাইনের মতো অসাধারণ প্রতিভাদের নতুন সৃষ্টির অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। তের খন্ডের এই বইটির প্রথম চার খন্ডের বঙ্গানুবাদ করেছেন বিজ্ঞান বক্তা আসিফ। বইটি মোট তেরটি খন্ড। প্রথম খন্ডে ২৩টি সংগা, ৫টি স্বতঃসিদ্ধ ও ৫টি সাধারণ প্রত্যয়। এরপর এগুলির ওপর ভিত্তি করে ৪৮টি প্রতিজ্ঞা প্রমান করা হয়েছে এবং ২৮ টি প্রতিজ্ঞা প্রমাণের পরই পঞ্চম স্বতঃসিদ্ধের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এ খন্ডে ত্রিভুজ, সমান-রাল সরল রেখা, সর্বসম, সামন-রিক ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় খন্ডে বর্নণা করা হয়েছে জ্যামিতীয় বীজগণিত। খন্ডটি আরম্ভ হয়েছে ২টি সংগা দিয়ে। তৃতীয় খন্ড শুরু হয়েছে ১০টি সংগা দিয়ে। আলোচনা করা হয়েছে বৃত্তের জ্যামিতি ও তার স্পর্শক নিয়ে। চতুর্থ খন্ড শুরু হয়েছে ৭টি সংগা দিয়ে। এই খন্ডের বিষয়বস্তু হলো বহুভুজবিশিষ্ট ক্ষেত্র। পঞ্চম খন্ড শুরু হয়েছে ১৮টি সংগা দিয়ে। এই খন্ডের বিষয়বস্তু হলো পরিমাপ-অপরিমাপযোগ্যতা। ষষ্ঠ খন্ডে সহজ জ্যামিতির ওপর ওই তত্ত্বের প্রয়োগ দেখানো হয়েছে এবং ২টি সংগা দিয়ে শুরু হয়েছে খন্ডটি। সপ্তম খন্ডটির শুরুতে ২২টি সংগার তালিকা দেয়া আছে। এতে আছে: জোড় ও বেজোড় সংখ্যা, বর্গ ও ঘন সংখ্যা, মৌলিক সংখ্যা। সপ্তম থেকে দশম খন্ডে সংখ্যাতত্ত্বের উপর আলোচনা করা হয়েছে। এতে মৌলিক সংখ্যা, লঘিষ্ট সাধারণ গুণিতক, গুণোত্তর শ্রেণী ইত্যাদি ও অমূলক রেখা নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। একাদশ খন্ড শুরু হয়েছে ২৮টি সংগা দিয়ে। দ্বাদশ খন্ডে বৃত্ত, বর্তুল, পিরামিড ইত্যাদি। পরিমাপের উপর নিঃশেষণ পদ্ধতির প্রয়োগ দেখানো হয়েছে। আর ত্রয়োদশ খন্ডে সম ঘন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ইউক্লিড তেরটি খন্ডে সম্পূর্ণ এলিমেন্টস গ্রন্থাবলীতে সর্বমোট ৪৬৫টি প্রতিজ্ঞার প্রমাণ দেখান। সাবলীল ভঙ্গিমায় অনুদিত এই বইটি বিজ্ঞান আগ্রহী সকলের জন্যই অবশ্যপাঠ্য।
বিজ্ঞানচর্চা ও তা প্রসারে নিবেদিত আসিফ ডিসকাশন প্রজেক্টের বক্তৃতার মাধ্যমে প্রথম সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কসমিক ক্যালেণ্ডার, সময়ের প্রহেলিকা, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, প্রাণের উৎপত্তি ও বিবর্তন, আন্তঃনাক্ষত্রিক সভ্যতা বিষয়ক জটিল বিষয়ে দর্শনীর বিনিময়ে বক্তৃতার আয়োজনের মধ্যে আছে অভিনবত্ব ও কল্পনার দুঃসাহস। তিনি এরকম ৪৮টি ওপেন ডিসকাশন বা বক্তৃতা অনুষ্ঠানের সফল উদ্যোক্তা। আসিফ এর নিজস্ব গ্রন্থাগারে রয়েছে পাঁচ হাজার বইয়ের এক সংগ্রহ। পাশাপাশি বিজ্ঞান ও সভ্যতা ভিত্তিক প্রচুর ম্যাপ, চার্ট ও ডকুমেন্টারী ফিল্মের ভিডিও ক্যাসেট। শৈশব থেকেই তিনি এ সমাজ ও সভ্যতা নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন ভিন্নভাবে। পদার্থবিজ্ঞান, গণিতশাস্ত্র, জীববিজ্ঞান, দর্শন, সংগীত ও সাহিত্যের উপর পড়াশুনা করেছেন ধারাবাহিকভাবে। এর মধ্যে জ্যামিতি, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও আপেক্ষিকতত্ত্বের আধুনিক সমস্যাগুলো ছাড়াও সভ্যতার গতি-প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা ভাবনা ও গবেষণা তার অন্যতম বিষয়। আসিফ ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বই প্রাকাশিত। তারমধ্যে সাহিত্য প্রকাশ-২০০১ থেকে লেখা কার্ল সাগান: এক মহাজাগতিক পথিক, সময় প্রকাশন-২০০৩ থেকে মহাজাগিতক আলোয় ফিরে দেখা, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে ইউক্লিড ও তার এলিমেন্টস এবং খালেদা ইয়াসমিন ইতির সঙ্গে মহাবিশ্ব ও নক্ষত্রের জন্মমৃত্যু মোট ৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা একাডেমী জর্নালে আড়াই হাজার বছর আগের গ্রন’ ইউক্লিডের অ্যালিমেন্টস এর প্রথম খন্ড এবং তার বিশ্লেষণ বের হয়েছে। তিনি তার শৈশবের দিনগুলো সম্পর্কে বলেন, জীবনের এই স্বপ্নময় সময়ে কখনও অভিভূত হয়েছি রাশিয়ান লেখকদের সংকলন গ্রহান্তরের আগন্তুক, কখনো বাংলার লেখকদের রায়হানের রাজহাস বা নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়, কখনো বা তিতিরমূখী চৈতা পড়ে। আলেক্সান্দার বেলায়েভের উভচর মানুষ অথবা মার্ক টোয়েনের হাকলবেরী ফিন বা টম সয়্যার আমাকে দেখিয়েছে জীবন কত সুন্দর। ভিক্টরহুগোর লা-মিজারেবলের মতো গ্রন্থ দেখিয়েছে জীবনের বাঁক কত আকস্মিকভাবে পরিবর্তীতে হয়ে যেতে পারে। আর পরিকল্পনা করেছি ইভান ইয়েফ্রেমভ আর আর্থার সি ক্লার্কের রচনাকে সামনে রেখে। এগুলো আমাকে গতি দিয়েছে, চলার পথে আনন্দ দিয়েছে জীবনানন্দ ও কার্ল সাগানের ভাষা। তারা আমাকে শিখিয়েছে দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে এই পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলই মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি।
শুরুতেই বলতে হয়, অনুবাদ খুবই ভালো হয়েছে। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে শুরুর মুখবন্ধ 'ইউক্লিডীয় উপাখ্যান'। এ প্রবন্ধে লেখক ইউক্লিডের জীবন ও কর্ম, জ্যামিতির ইতিহাস, অইউক্লিডিয় জ্যামিতির আবির্ভাব ইত্যাদি আলোচনা করেছেন। আর তাছাড়া 'ইউক্লিডিয় জ্যামিতির যৌক্তিক ফাঁক' নিবন্ধটুকু বইয়ের একাডেমিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। জ্যামিতি ও গণিতে আগ্রহীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
সতর্কবার্তাঃ তিন বছরের কম বয়সীদের এই লেখা পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এক গোপন মারফতে জানা যায়, ইউক্লিড নাকি উদ্ভাস উন্মেসে দুই বছর কোচিং করেও যখন 'কাংখিত' গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন তখন নাকি তিনি ঘরে বসে ইউটিউবে চমক হাসানের গনিতের রঙ্গে হাসি খুশি গনিতের ভিডিওগুলো দেখে জ্যামিতির প্রেমে পরেন আর তাঁর পর নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেন আর ভর্তি হন প্লেটোর কোচিং সেন্টারে। প্লেটোর কোচিং সেন্টারে নানান রকম দার্শনিকের সাথে পরিচিত হয়ে অনেক কিছু শেখেন আর নীলক্ষেত থেকে সস্তায় তেরো খণ্ডে এলিমেন্টস বের করেন। কিন্তু এতো বড় বই পড়ে তো পরীক্ষায় কমন পাওয়া যাবেনা তাই 'চুঞ্জেরি' প্রকাশনী সিদ্ধান্ত নিলো এই তেরো খণ্ড থেকে পরীক্ষায় কমন পাওয়া যাবে এমন উপপাদ্য তারা প্রিন্ট করে বাচ্চাদের হাতে তুলে দেবে। বাচ্চারা সেই উপপাদ্য গুলো, "উমম...উমম...যেকোনো যেকোনো...ত্রিভুজের বৃহত্তর...উমম...উমম বাহু বাহুর বিপরীত কোন বৃহত্তর..." এভাবে মুখস্ত করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পাশের বাড়ির আন্টির হাত থেকে মায়ের কপালের ঘাম রক্ষা করে চলেছে।
একটি ব্যাপারে সন্দেহ থেকে যায় তা হল, ইউক্লিড নাকি কম্পাসকে জ্যামিতি চর্চার অন্যতম একটা পারফেক্ট হাতিয়ার মনে করতেন। কিন্তু তিনি কি জানতেন না যে, স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে 'পারফেক্ট হাতিয়ার' কে নানান বিকল্প হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার হয়? উদাহরণ স্বরূপঃ আমার মা আম কুচি দিয়েছিলেন টিফিন বাটিতে কিন্তু কাঁটা চামচ দিতে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন, আমি যে ঐশীর ব্যাগ থেকে কম্পাস বের করে সেটাকে আহার্য সম্পাদনে নিখুঁতভাবে ব্যাবহার করলাম, এই যে কম্পাসের মৌলিক ব্যাবহার; সে সম্পর্কে ইউক্লিড কি বলবেন?
তিনি যদি কম্পাসের বিকল্প ব্যাবহার নিয়ে উপপাদ্য দেন তাহলে আমি রেটিং আরেকটা বাড়িয়ে দেবো।