আসর জমিয়ে গল্প কথনে তাঁর নেশা। কেবলমাত্র নেশা নয়, ব্যাপারটিকে তিনি আর্টের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন।
মধ্যরাতের অশ্বারোহীতে লেখক আমাদের কালের ইতিহাস বলেছেন (অবশ্যই নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে) এবং তিনি গল্প বলেছেন। শিল্প রচনার ক্ষেত্রে এই দু'টো ব্যাপারকে মেলানো ভারী শক্ত। ফয়েজ আহ্মদ সেকাজটি করেছেন।
মনে হয়েছে- এটা কি ছবির এ্যলবাম? এ গ্রন্থে অনেক ছবি। সংক্ষিপ্ত রেখায় আঁকা মানুষের ছবি। ফয়েজ আহ্মদ চিত্রশিল্পী নন, কিন্তু ছবিও যে লেখা যায় চক্ষুষ্মান পাঠক এ গ্রন্থে তা দর্শন করে আস্বাদিত হবেন।
ফয়েজ আহ্মদ (English : Faiz Ahmed) বাংলাদেশের প্রথম সারির সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ব্রিটিশ ভারতে ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার বাসাইলভোগ গ্রামে এক সামন্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন(গ্রামটি বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তর্ভূত)। তাঁর পিতা গোলাম মোস্তফা চৌধুরী এবং মাতা আরজুদা বানু। ১৯৪৮ সাল থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। তিনি ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদ ও পরবর্তী সময়ে পূ্র্বদেশ এ চিফ রিপোর্টার ছিলেন। সাপ্তাহিক ইনসাফ ও ইনসান পত্রিকায় রিপোর্টিং করেছেন। তিনি ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত মুক্ত চিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল লেখকদের সংগঠন পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের প্রথম সম্পাদক ছিলেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনে এবং ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি পিকিং রেডিওতে বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান প্রবর্তক ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান সম্পাদক। তিনি প্রধানত শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর বইয়ের সংখ্যা প্রায় একশ। ফয়েজ আহমদের বইগুলোর মধ্যে 'মধ্যরাতের অশ্বারোহী' সবচেয়ে বিখ্যাত। ছড়ার বইয়ের মধ্যে-'হে কিশোর', 'কামরুল হাসানের চিত্রশালায়', 'গুচ্ছ ছড়া', 'রিমঝিম', 'বোঁ বোঁ কাট্টা', 'পুতলি' 'টুং', 'জোনাকী', 'জুড়ি নেই', 'ত্রিয়ং', 'তুলির সাথে লড়াই', 'টিউটিউ', 'একালের ছড়া' উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও তিনি চীনসহ বিভিন্ন দেশের পাঁচটি বই অনুবাদ করেছেন। এর মধ্যে হোচিমিনের জেলের কবিতা উল্লেখযোগ্য। তিনি ঢাকার প্রাচীন ও সুবৃহৎ আর্ট গ্যালারী 'শিল্পাঙ্গণ' ও প্রগতিশীল পাঠাগার 'সমাজতান্ত্রিক আর্কাইভ' এর প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার,শিশু একাডেমী পুরস্কার,সাব্বির সাহিত্য পুরস্কার,একুশে পদক,নুরুল কাদের শিশু সাহিত্য পুরস্কার,মোদাব্বের হোসেন আরা শিশু সাহিত্য পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। তিনি ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
হিউমার শব্দটা নিয়ে আমার এট্টু বাড়াবাড়ি পক্ষপাতিত্ব আছে। এ ট্রিলজিতে আরো আছে সারকাজম এবং উইট। হুদাই মশকরা না করলে যাদের পেটের ভাত হজম হয় না, আনফরচুনেটলি সে রসিক আকা 'বলদ'দলে পড়ি, এবং সে নিয়ে হরহামেশা বিপদেও পড়ি। বঙ্গদেশবাসীর রসিকতা করার অভ্যাস আছে খাসা, কিন্তু গড়পড়তায় সেটা ফেসবুক ট্রল ক্যাটেগরির, অভব্য অরুচিকর লেভেলে গিয়ে পৌঁছায় বেশিরভাগ সময়েই। খুব বেশি আগের সময়কার নন, এমন বাঙালি উইটি রাইটারের নাম চাইলে তিনজনের নাম ঝটপট নিয়ে নেওয়া যায়। সৈয়দ মুজতবা আলী, তপন রায়চৌধুরী এবং ফয়েজ আহমেদ।
বাংলাদেশের প্রথম সারির সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের মধ্যে একজন ছিলেন ফয়েজ আহমেদ, জড়িত ছিলেন বামপন্থী রাজনীতিতে। ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে লিখেছেন শতাধিক বই। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জীবদ্দশাতেই পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমী পুরষ্কার, শিশু একাডেমী পুরষ্কার সহ আরো অনেক পুরষ্কার। প্রতিষ্ঠা করেছেন ধানমন্ডির শিল্পাঙ্গন গ্যালারি এবং প্রগতিশীল পাঠাগার 'সমাজতান্ত্রিক আর্কাইভ'। প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধে, কঠিন ভূমিকা রেখেছেন স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার পক্ষেও। সব মিলিয়ে অকৃতদার এই ভদ্রলোকটি ছিলেন একজন সত্যিকারের সাদা মানুষ। ফয়েজ আহমেদের জন্ম ১৯২৮ সালের ২রা মে, ঢাকার বিক্রমপুরে। মৃত্যু ২০১২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি,৮৪বছর বয়সে। মরণোত্তর শরীর দান করে গেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে, শিক্ষার্থীদের কাজে লাগবে বলে। সন্ধানীর আন্তর্জাতিক চক্ষু ব্যাংকে দান করা তাঁর কর্নিয়া দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছে দুই অন্ধ যুবকেরও।
পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে ফয়েজ আহ্মদের সাংবাদিক জীবনের শুরু, ঠিকঠাক বলতে গেলে নিতে হয় ১৯৪৮ সালের নাম । ঢাকা তখনো হয়ে ওঠেনি মেগাসিটি, ঝাঁ চকচকে রাজধানী তো দূর, নিতান্তই মফস্বলী খোসা ছাড়াতে ব্যস্ত এক শহর,মাঝেমাঝেই ঘটে যায় ছোটখাটো ঘটনার,পটে পরিবর্তন আসে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক, ঢেউ ওঠে নিস্তরঙ্গ জীবনে। সেই সময়ের এক তরুণ সাংবাদিক, যিনি কাজ করেছেন যথাক্রমে ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদে। প্রথাগত সাংবাদিকতা পেশার বাইরে যাঁর বিশেষ দক্ষতা সহজিয়া গল্পে, সরস মন্তব্যে। সেই ধারাবাহিকতায় গল্পে এসেছেন শেখ মুজিব, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, মাওলানা ভাসানী, ইন্দিরা গান্ধী। পত্রিকাজগতের সদা উত্তেজনাময় জীবনের গল্প, দেশভাগ পরবর্তী পূর্ব বাংলার ঢাকাইয়া জীবনের নানা বাস্তব অভিজ্ঞতা, সাংবাদিক-সুলভ নৈর্ব্যক্তিকতায় তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণের ঝাঁপি, ব্যক্তিগত নিবিড় উপলব্ধির অসংখ্য ঘটনার টুকরো টুকরো কথা বৈঠকী মেজাজে, সরস গদ্যে লেখা ট্রিলজি সত্যবাবু মারা গেছেন, নন্দনে নন্দিনী এবং এবং তারপর সিরিজের প্রথম বই, মধ্যরাতের অশ্বারোহী।