Chandril Bhattacharya is a popular Bengali columnist, lyricist, poet, singer and director from Kolkata, West Bengal, India. He is the grandson of Bani Kumar (Baidyanath Bhattacharya).
Bhattacharya is one of the main lyricists of the Bengali band Chandrabindoo and also occasionally sings for them. His idiomatic lyrics are laced with satire and critique of modern society. Chandril, together with Anindya Chatterjee won the 2010 National Film Award for Best Lyrics for the song "Pherari Mon" in the film Antaheen (2009).
বইয়ের প্রথম প্রবন্ধ "ব্যাপার,সহজপ্রাচ্য নয়" সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে লেখা। ভাবলাম, দু'এক পাতা পড়ে দেখি। আশ্চর্য! পড়তে পড়তে দেখি পুরো প্রবন্ধই পড়ে ফেলেছি। এতো ক্ষুরধার লেখা! একে একে অন্য প্রবন্ধগুলোও পড়ে ফেললাম।প্রথমেই যেটা নজর কাড়লো সেটা হচ্ছে, চন্দ্রিলের বক্তব্যের স্বচ্ছতা ও নিজের বিশ্বাসের প্রতি প্রবল জোর (কখনো ভালো কখনো খারাপ হয়েছে সেটা।) বইতে বিচিত্র সব বিষয়ে লেখা রয়েছে। ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাওয়ায় সন্ধ্যার পর পাড়ায় কে কী করতো তা নিয়ে এতো মুগ্ধকর স্মৃতিকথা লেখা যায় কে জানতো! গ্রন্থিত সবকটা প্রবন্ধই কোনো না কোনো কারণে উল্লেখযোগ্য। আমি সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি "বোলো, ক্ষুধা তাকে ভোলেনি" পড়ে। ইন্টারনেটযুগ শুরু হওয়ার আগে,যখন কোনো শিশু কৈশোরে পদার্পণ করতো, শরীরে হরমোনের যাতনা অসহনীয় হয়ে উঠতো, চারপাশের সবকিছুতে কেবল যৌনতা আর যৌনতাই আবিষ্কার করে ফিরতো, শরীরে ও মনে দুঃসহ যাতনা ও অপরাধবোধ নিয়ে ব্লু ফিল্ম আর চটি বই খুঁজে ফিরতো (আর কী রোমাঞ্চকর, কী বিব্রতকর,কী অব্যাখ্যাত সব অনুভূতি খেলা করতো এসব খোঁজাখুঁজির বেলায়!) সেই একটা সময়ের নিখুঁত বয়ান চন্দ্রিল লিখেছেন নিজেকে কেন্দ্র করে। নিজের কিশোর বয়সের সব অনুভূতি অকপটে ব্যক্ত করেছেন তিনি। তার এই সততার জন্য পাঠক হিসেবে আমার কাছ থেকে সাধুবাদ পাবেন। অন্য কোনো বাঙালি লেখকের কাছ থেকে বেড়ে ওঠার এমন জান্তব বর্ণনা আর পাইনি।
মাঝেমধ্যেই চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের উদ্দেশ্যে 'বিবাহ্' সিনেমার অমৃতা রাও মাফিক বলে উঠতে ইচ্ছে হয়, "জল লিজিয়ে, থক গয়ে হোঙ্গে বকবক করতে করতে।" আশ্চর্য বাকপটু, অত্যন্ত সুবক্তা ও নিদারুন বাচাল এই মানুষটির পরিচয় বুঝি আলাদা করে বলে দিতে হয় না। তার জন্য ফেসবুক বা ইউটিউব খোলাই যথেষ্ট। কালেভদ্রে টিভির পর্দা। তাতেও চিড়ে না ভিজলে, চন্দ্রবিন্দুর পুরোনো কটা গান চালিয়ে নিলেই হলো। সবেতেই বাবা চন্দ্রিল মিটমিটিয়ে বিদ্যমান। অন্যমনস্ক হয়েছেন কি গেছেন, এই বুঝি এক্ষুনি অ্যাটেনশন স্প্যান নিয়ে ঘণ্টা দেড়েকের একটা ছোটখাট লেকচার দিয়ে বসবেন!
আলোচ্য বইটিতে অবশ্য বক্তা চন্দ্রিল ব্যাকসিটে। তার বদলে ওনাকে পাবেন লেখক... থুরি 'কলম-বাস' রূপে। সাত সাতটি নিবন্ধের ঠিক মধ্যিখানে। সবগুলোই বেশ পুরোনো। 'সংবাদ প্রতিদিন'-এ লেখা। প্রায় এক দশকের ওপর বয়স। তবুও, লেখাগুলোর অন্তর্নিহিত ঝাঁঝ আজও পাঠকদেরকে নাকের জলে চোখের জলে করবার ক্ষমতা রাখে। মাত্র দুশো টাকায় বইটি কিনে খুব একটা ঠকতে হয় না, এটা বলা যায়।
তবুও, সাবধান। একখান লাল ঝান্ডা ঝুলিয়ে না রাখলেই নয়। কারণ, আর যাই হোক, বইটির পাঠ-অভিজ্ঞতা একেবারে মসৃণ নয়। উপরন্তু লেখকের তুবড়িবাতি ন্যায় স্প্যাঘেটি শব্দচয়ন। যা নিয়ে অল্প ফাঁপরে পড়লেও পড়তে পারেন। আমি অবশ্য, ব্যক্তিগত পক্কতায় বইয়ের লেখাগুলোকে তিনটে ভাগে ভাগ করেছি। যথা...
১) ইনফোবন্ধ ২) লা-জবাব ৩) ভাই চুপ কর।
শুরুতেই 'ইনফোবন্ধ'-এ পেয়ে যাবেন, সত্যজিৎ ও তার ছবি নিয়ে একটা চমৎকার আলোচনা, 'ব্যাপার সহজপ্রাচ্য নয়'। যেখানে স্রেফ সিনেমার ভাষায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমাজ সমাচার নিয়ে একটি ভীষণ ক্যাচি ও দ্রুতগামী লেখা উপহার দিয়েছেন চন্দ্রিল। অবশ্য, সত্যজিতের যাবতীয় ফিল্মোগ্রাফি নিয়ে একটু ওয়াকিবহাল না থাকলে, লেখাটি গলায় মাছের কাটার মত আটকে যেতে পারে। এছাড়াও, আছে বইয়ের শেষ লেখা 'রবীন্দ্রপ্রোজেক্ট'। যার বিষয়বস্তু... রবীন্দ্র জাদেজা নয়, বলাই বাহুল্য। এবং এখানেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনধারণ ও ব্যক্তিস্বত্বার সাথে কঠোর শ্রম ও অধ্যবসায়ের একখানি চমৎকার চালচিত্র এঁকেছেন লেখক।
দুটোই মাস্ট-রিড।
এবারে আসে, 'লা-জবাব'। বিষয়বস্তুর নিরিখে বইয়ের এই লেখাগুলোই সবচেয়ে ম্যাচিওর। তবুও, লেখনীর ধরনে ফাজলামির একশেষ। খুঁজে পাই পুরোনো চন্দ্রবিন্দুর চন্দ্রিল ভট্টাচার্যকে। সাথে ক্লান্ত, জ্ঞানপাপী, সামাজিক আমিকেও। 'বাঘ, ঘোগ, চোখভোগ'-এ অসম্ভব স্কিলফুলি পুরুষমনের উগ্র যৌন-ক্ষিদের ওপর চালিয়েছেন কমিক স্ক্যালপেল। নিত্য-নৈমিত্তিক পিতৃতন্ত্রর প্রতি জানিয়েছেন ভুকভুকে ধিক্কার। নিজেকেও নগ্ন করেছেন একইসাথে। এবং এখানেই, লেখাটি আজকের দিনে অ্যাত্ত প্রাসঙ্গিক।
এরপর পাচ্ছেন, 'বোলো ক্ষুদা তাকে ভোলেনি'। বিষয়...ওই একই। যৌনতা (লেখকের ভাষায়, "ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ!")। কিন্তু এবারে আরও বেশি বদখত। স্মৃতিচারণের ছলে বয়ঃসন্ধির যৌন আকাঙ্খা! খেলাচ্ছলেই হোক আর যাই হোক, লেখাটির দ্বারা সেক্স্যুয়াল আওয়াকেনিং-এর ক্ষেত্রে সমাজের ক্যাত্ক্যাতে ট্যাবুর প্রতি খিল্লিটা ভালই করেছেন লেখক। অকপট আনন্দে কাঁচকলা দেগেছেন আঁতেল সেন্সরশিপের প্রতি।
তবে স্মৃতিকথার শেষ এখানেই নয়। এই 'লা-জবাব'-এই বর্তমান বইয়ের সবচেয়ে মায়াটে ও সুন্দর লেখা - 'চাঁদের আলোর সর'। বিষয়বস্তু, পুরোনো বাঙালি জীবনে অনাগত লোডশেডিং। যার পরতে পরতে কুচুটেপনা, নস্টালজিয়ার কাপে চোবানো ভূত, হারিয়ে যাওয়া ছায়াপুতুলের দল ও কবিতা কবিতা পাড়াতুতো প্রেম। একটি চমৎকার স্মৃতিমেদুর আর্টিকেল। চমৎকার পাঠ অভিজ্ঞতা। সাথে খিলখিলিয়ে হাহা-হিহি-র যথার্থ রসদ, যা এই পর্যায়ের তিনটে লেখাতেই সমানতালে মজুদ!
এবারে ফাইনাল কাউন্টডাউন। এক্কেবারে শেষপাতে পড়ে থাকা দুটো চরম-পরম-অনুত্তম আর্টিকেল'দ্বয়। তৃতীয় ও অন্তিম বিভক্তি, 'ভাই চুপ কর'। এই সেগমেন্টের পরিচয় অবশ্য এর নামেই অস্তিমান। তবে চোনদিল'দার কোনো ঝ্যাকান্যাকা ফ্যানের এহেন নামকরণে আপত্তি থাকলে আরেকটু রেসপেক্ক দিয়ে বলা যায়, 'দাদা, প্লীজ আর নয়...'
বইয়ের নাম-নিবন্ধ 'হাহা, হোহো...' ও 'গোলাপি যে নামে ডাকো', দুটোই আমার মতে অতিকথনে দুষ্ট। পড়ে আনন্দ পাওয়া কঠিন। (ঠিক এইখানে আপনি আমার বিরুদ্ধাচারণ করতেই পারেন। তবে, আমিও আপেক্ষিকতার রেনকোট পড়ে পালিয়ে যাবো, বলে রাখলুম!) দুটো লেখাই, বাক-ফুলঝুড়ির ষাঁড়ের গুঁতোয় বারংবার লাইনচ্যুত হয়। সামান্য দিশাহীন ও আত্মতুষ্টিমূলক। দিনশেষে, ক্লান্তিকর। অসামান্য কিছু নয়, এই যা। পানিশমেন্ট হিসেবে কটা পয়েন্ট কসাইয়ের মতন কেটে নিলাম। হেহে!
বিভিন্ন টকশোর বদৌলতে বক্তা হিসেবে চন্দ্রিল ভট্টাচার্য আমাদের পরিচিত মুখ।আমরা যারা আটপৌরে জীবনযাপন করি তাদের কাছে তার চাঁচাছোলা বক্তব্য বেশ লাগে।সহজ ভাষায় ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তিনি তুলে ধরেন আমাদের মনের ভেতরকার অবস্থাকে।বইয়ের চন্দ্রিলও তার ব্যতিক্রম নয়।এখানেও তার স্বভাবসুলভ ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বাঙালির চরিত্র বিশ্লেষণ রয়েছে।কিন্তু সমস্যাটা হলো গিয়ে যে,টকশো আর ছাপার বই তো এক নয়।বক্তব্য যেটা শুনতে অসাধারণ লাগে ছাপার অক্ষরে সেটাই হয়ে যায় ক্লিশে,কর্কশ।বইয়ের চন্দ্রিল তাই বিলো এভারেজ।
মোট সাতটি প্রবন্ধ আছে বইটিতে।চন্দ্রিল যে বিচিত্র বিষয়ে জ্ঞান রাখেন তার পরিচয় প্রবন্ধগুলোর বিচিত্র বিষয়বস্তু।তিনি যেমন সত্যজিৎ,রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখেছেন তেমনি গণপরিবহনে নারী নির্যাতন,লোডশেডিং,পুরুষদের অবদমিত যৌনতা নিয়েও লিখেছেন।
বিষয়বস্তু বিচিত্র হলেও প্রায়ই মনে হয়েছে তিনি এতো কথার মাঝেও তার আসল বক্তব্য সম্পর্কে ওয��াকিবহাল নন।টানা ব্যঙ্গ করতে করতে কখন যে মূল বিষয় ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন তা টেরই পাননি।যখন পেয়েছেন তখন আর ফিরে আসার সুযোগ নেই কারণ প্রবন্ধের দৈর্ঘ্য বড় হয়ে যাচ্ছে।বই পড়তে গিয়ে অযথা কচকচানি ভালো লাগে না।
প্রবন্ধগুলোর নামও যথেষ্ট আগ্রহোদ্দীপক।যেমন - গণপরিবহনে নারীদের নিয়ে যে প্রবন্ধটি লিখেছেন তার নাম - 'বাঘ,ঘোগ,চোখভোগ',আবার পুরুষদের যৌন ফ্যান্টাসি নিয়ে লেখাটার নাম - 'বোলো,ক্ষুধা তাকে ভুলেনি'!নামগুলো বেশ স্মার্ট এবং একই সাথে প্রশংসা পাবার যোগ্য!
সাতটি প্রবন্ধের মধ্যে যদি মানবিচার করতে যাই তাহলে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব নিয়ে লেখা 'ব্যাপার সহজপাচ্য নয়' এবং রবীন্দ্রনাথের রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠার অধ্যবসায় নিয়ে লেখা 'রবীন্দ্রপ্রোজেক্ট' প্রবন্ধ দুটি নিঃসন্দেহে আমার পড়া অন্যতম সেরা লেখাগুলোর একটি।বিশেষ করে 'রবীন্দ্রপ্রোজেক্ট'!বাকি যা থাকলো তা কেমন আগেই বলেছি - ক্লিশে,কর্কশ লেখনী আরকি!
যদি সময় নষ্ট করতে না চান তবে প্রথম প্রবন্ধটা পড়ে একেবারে শেষ প্রবন্ধটা পড়ে ফেলুন।
চন্দ্রিল ভট্টাচার্য নামের মানুষটাকে চিনি একজন ভালো বক্তা হিসেবে এবং বিতার্কিক হিসেবে। তার আলোচনাগুলো আর সবার মতো আমারও পছন্দের হওয়ার কারণ মানুষটার কথা বলার ধরণ, কেনে একটা বিষয়ের গভীরে গিয়ে তাকে বিশ্লেষণ করার যে ভঙ্গিমা তা অনায়াসে ভালো লাগতে বাধ্য করে। একজন ভালো বক্তা হিসেবে তাঁকে আগে থেকে চিনলেও একজন লেখক হিসাবে চিনলাম এই বইটি দিয়ে।
এইবইটি সাতটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের প্রবন্ধের সমন্বয়ে গঠিত। লেখকের স্মৃতিচারণও আছে এর মধ্যে। সাবলীল ভাবে নিজের কিশোর কালের অনুভূতির ব্যাখ্যা, অকপটে নিজের কিংবা সমাজের বিষয়গুলো নিয়ে বলে যাওয়ার মধ্যেই এই বইটির সার্থকতা। ইন্টারনেটের যুগ যখন ছিলো না তখন বিদ্যুৎ চলে গেলে যে অবস্থাটা সৃষ্টি হতো সে লেখা পড়তে পড়তে অতীতে ঘুরে আসাও যায় চোখ বন্ধ করে। স্মৃতি রোমন্থন আরকি! এসব বাদ দিলেও বয়ঃসন্ধিকালের বিষয়গুলোকে কী নিপুণ দক্ষতা আর আত্মবিশ্বাসের সাথে লিখেছেন! এমন সাবলীল আর অকপটে স্বীকার করার ক্ষমতা চন্দ্রিলের আছে, সাথে তার প্রবল আত্মবিশ্বাসের অসাধারণ ঝলক দেখা যায়। বিষয়গুলো সমাজের কিংবা নিজের একান্ত ব্যাক্তিগত, সংলগ্ন আবার অসংলগ্নও বটে। কিন্তু লেখার গাম্ভীর্যের জন্য সেসব বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে বেশ ভাবার্থক ভাবে। "ব্যাপার সহজপাচ্য নয়" প্রবন্ধটির কথা বলা যাক, সত্যজিৎকে নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধ। সত্যজিৎতের ছবির রস আর তার তীক্ষ্ণতা নিয়ে প্রবন্ধটা রচিত হলেও লেখক অন্য একটা দিকেও কথা বলেছেন। বাঙালির কাছে সত্যজিৎ সাহেবের তৈরি ছবি প্রাচ্য ঘেঁষা মনে হয় আর প্রাচ্য দেশের কাছে রায় সাহেবের তৈরি ছবি বড্ড প্রাশ্চত্য। এই যে দুই জনপদের মানুষের মাঝে এমন ভাবনা তার কারণটার উত্তর খুঁজে ফিরেছেন লেখক। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটাও চমৎকার। আর সবচেয়ে বেশি চমৎকার হলো চন্দ্রিল সাহেবের ক্ষুরধার লেখা!
লেখকের প্রথম দেখা পাই জনগণ নিয়ে তার র্যান্ট ভাইরাল হলে। প্রতিটা কথা তার মনে হয়েছিল একদম ঠিকই বলছেন। এমনই তো জনগণ। কিন্তু তার ফ্যান বনে যাই তখন যখন ইউটিউবে ডিস্টোপিয়া নিয়ে তার একটা দীর্ঘ ভিডিও দেখি। কি জ্ঞান, কি বাচন ভঙ্গি। সরলতার সাথে বলে চলেছেন কিন্তু সে কথাগুলো কতটা ডিপ। ক্লাসের ম্যাথ টিচার যখন ব্ল্যাকবোর্ডের হিবিজিবি ম্যাথ বুঝানোর পর মনে হয় ওহ তাই তো! ওনার কথা-বার্তাও তেমনই। জটিল বিষয়কে সহজ করে ফেলেন নিমিষেই।
বইটাও এমনই।
সাতটি প্রবন্ধ রয়েছে বইটিতে।
বিশেষ করে প্রথমটা পড়ার সময় মনে হয়েছে লেখক আমার সামনে বসে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার উপরে বক্তব্য দিচ্ছেন। বাকি প্রবন্ধও গুলোও ভাল লেগেছে কেননা লেখকের লেখার হাত ভাল। তবে প্রথম আর শেষ প্রবন্ধ বাদে বাকি প্রবন্ধ গুলো তেমন একটা জমে নি। তবে প্রবন্ধের বিষয় বস্তু খারাপ নয়। লোডশেডিং এবং লেখকের শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের উল্লেখিত অনেক ঘটনার সাথে নিজের মিল খুঁজে পেয়ে অবাক না হয়ে পারি নি। অন্য দেশ, অন্য জেনারেশনে বড় হওয়া তবুও কত মিল। বাস, ট্রেনে নারীদের উপর হয়রানি এবং পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনার উপরও একটা প্রবন্ধ আছে। লেখকের চোখের আড়াল হয় না কিছুই।
তবুও লেখকের লেখনিই পড়া চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কেননা প্রবন্ধগুলোর এক পর্যায়ে গিয়ে মনে হয়েছে লেখক হুদাই লেন্দি বানাচ্ছেন, লাগামহীন ঘোড়ার মত চলছে তো চলছেই, থামার নামটি নেই। অবস্থা এমন জায়গায় চলে যায় প্রবন্ধগুলোর যে, লেখকের লেখনি দক্ষতাও আর ভাল লাগাতে পারে না প্রবন্ধটিকে। শেষ হলে মনে হয় যেন বাঁচি। তাই বলেই শেষ করতে সময় লেগেছে।
শুরু করলে ছাড়তে যেমন ইচ্ছা করে না, আবার ছাড়লে ধরতে ইচ্ছা করে নার মত ব্যাপার।
চন্দ্রিলের নামের সাথে সকলেই পরিচয়। হ্যাঁ, ভদ্রলোক এদিক ওদিক লেখেনও বটে। এই বইটির সাতটি নিবন্ধ নেওয়া হয়েছে 'সংবাদ প্রতিদিন' এর রবিবারের ক্রোড়পত্র 'রোববার' থেকে।
বইটির সত্যজিৎ রায় ও রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক নিবন্ধগুলিতে হাসির খোরকের থেকে বিষয়ের গভীরতা অনেক বেশি। এই দুই ' দানবিক প্রতিভা' র সম্যক ধারণা দিয়েছেন তিনি। তিনি জানান রবীন্দ্রনাথ তার ব্যক্তিগত জীবনকে দূরে সরিয়ে রেখে স্রেফ প্রকৃতির টানে নিজের প্রতিভা বিকাশের জন্য পড়ে থেকেছেন নির্জনে একাকী। এমন এক অভেদ্য প্রাচীর গড়ে তুলেছেন নিজের চারিদিকে যে তাকে টপকে পুত্রশোক থেকে শুরু করে স্ত্রীর ভালোবাসা অবধি কিছুই পৌঁছায় নি। তেমনি সত্যজিত তাঁর মার্জিত না-অতিরিক্ত সংলাপে, প্রাচ্য পাশ্চাত্য ভাবনার জগাখিচুড়িতে যে ঝকঝকে চলচ্চিত্র পরিবেশন করেছেন তার কিছু ঝলক দিয়েছেন চন্দ্রিল। সত্যজিৎ হলিউডের টেকনিকে , সাহসিকতায় আর ভারতীয় আত্মার মিশেলে তৈরি করেছেন এমন মারাত্মক ২৮ টি ছবি। যাতে আবেগের চর্বিত-চর্বন নেই, দীর্ঘ সংলাপ নেই অথবা নেই প্রচুর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক - কিন্তু আছে কিছু অসাধারণ অভিব্যক্তি, স্মার্ট ট্রানসিশন আর দর্শককে ভাবিয়ে তোলার ক্ষমতা।
আরেকটি নিবন্ধ সেই পরম আদরের লোডশেডিংকে নিয়ে, যখন সন্ধ্যে হতে না হতেই সেই শাঁখের আওয়াজের সাথে তাল মিলিয়ে আলো নিভিত পাড়ার।
আরও তিনটি লেখা চন্দ্রিলোচিত ব্যঙ্গ- বিদ্রূপে ভ���পুর, সেখানে লেখক পুরুষ চরিত্রের খানা-খন্দে টর্চ ফেলে দেখেছেন। ভিড় বাসে লেডিস সিটের সামনে পুরুষাঙ্গের আস্ফালনে যত এক মহিলা শাড়ি দিয়ে ত্বক আচ্ছাদনে চেষ্টা করছেন ততই নানান দিকের নির্লজ্জ্ব দৃষ্টি বিদ্ধ করেছে তাকে। লেখক যতটা কৌতুকের সাথে তুলে ধরেছেন এটিকে, ততটাই বেআব্রু হয়ে পড়েছে আমাদের চিন্তাধারা। না সবাই যে এমনটা তা তিনি বলেনি। পুরুষের দুই প্রজাতির কথা বলেন তিনি , 'এক ভদ্র সেক্স স্টারভড আর এক অভদ্র সেক্স স্টারভড'। এখন এই ভদ্র মানুষেরা চলেন যতটা সম্ভব মহিলাদের ছোঁয়াচ এড়িয়ে, যেন এই প্রজাতির হোম সেপিয়েন্স প্রথমবার দেখছেন। বাসে ভূজঙ্গাসন করে ফেলেন তবু অন্য মহিলাটি গায়ে যাতে গা না ঠেকে যায় সেদিকে খেয়াল রাখেন। তবে মাপ ঝোঁকে কেউই পিছিয়ে নেই, কেউ হাঁ করে একদৃষ্টে, না হয় কেউ আড়চোখে বুঝে নিতে চান সকল মাংসপিণ্ডের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা। তবে, সব মিলিয়ে হাসি- কৌতুকে পরিপূর্ণ আদান্ত্য বইটি আমার বেশ মনে ধরেছে।
আমি চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের চাছাঁছোলা এবং ঝাঁঝালো কথাবার্তার বেশ ভক্ত! তাই বোধহয় একটু 'চড়া' আশা ছিল। চন্দ্রিল-এর গদ্য চমৎকার, স্বতন্ত্র। কিন্তু এই সংগ্রহের প্রবন্ধগুলোতে সংবাদপত্রের কলাম বা ফিচার-সুলভতা বেশ টের পাওয়া যায়(যাওয়ারই কথা বোধহয়, সেগুলো আসলেই হয়তো তাই!)। এই ব্যাপারটা এই সংগ্রহের লেখাগুলোর আপীল খানিকটা কমিয়ে দিয়েছে, বলে আমার অন্তত মনে হয়েছে।
যাঁরা জানেন চন্দ্রিল ভট্টাচার্য কে, তারা এটাও আশা করি জানেন যে তিনি তার স্পষ্ট ও ভয়ডর হীন ঠোঁটকাটা সত্যি বক্তব্যের জন্য যে কোনো বিতর্কসভায়, গানের মঞ্চে ভীষণরকম বিখ্যাত। এছাড়া চন্দ্রবিন্দুর এক সদস্য হিসেবে তো আমরা তাকে চিনিই। ওনার এই সত্যি বলার বৈশিষ্ট্যের জন্যই ওনার লেখা পড়ার আগ্রহ বেড়ে যায় অনেক বেশি। কারণ স্বাভাবিক ভাবেই ওনার লেখায় ন্যাকা ন্যাকা অনুভূতি বা অতি কাল্পনিক প্লটের পরিবর্তে থাকে কিছু কড়া সত্যি কথার কড়াভাবে উপস্থাপনা।
এই বইটিও সেরকমই একটি বই। বইটি মোট সাতটি নিবন্ধ নিয়ে তৈরি। 'সংবাদ প্ৰতিদিন' পত্রিকার রবিবারের ক্রোড়পত্র 'রোববার' এ প্রত্যেকটি নিবন্ধ আলাদা আলাদাভাবে আগে প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলিকেই একত্র করে এই বই। বইটি শুরু হয় সত্যজিত রায় কে দিয়ে, এবং শেষ হয় রবীন্দ্রনাথ কে প্রণাম সেরে। রবীন্দ্রনাথের ঢাল, সত্যজিতের তরোয়াল, লোডশেডিংয়ের হরিণ, গোলাপির গর্জন, জোকারের উলু, প্যাসেঞ্জারের চোখ ভোগ, পর্নোগ্রাফির স্নান এই বইতে আপনি সব পাবেন। পড়তে পড়তে আপনি লজ্জা পাবেন, (কারণ আমরা লুকোতে শিখি, ভয় পেতে শিখি, লেখকের কলম তা শেখেনি), তাই লেখক কিন্তু লজ্জা পাননি এতটুকু, তুলে ধরেছেন মেয়েদের শরীর কিভাবে বাসে উঠলেই সবার হয়ে যায়, তুলে ধরেছেন পর্নোগ্রাফির তাৎপর্য নগ্নভাবেই, তুলে ধরেছেন সমাজের চিরাচরিত রোগ, তুলে ধরেছেন মানুষ আজও কত হিপোক্রিট।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে জিনিসটি এই বইতে মন কেড়েছে তা হল, প্রত্যেকটি বর্ণিত ঘটনা আমাদের সাথে রোজ ঘটে, ঠিক যেভাবে বইটিতে বলা আছে ওইভাবেই ঘটে কিন্তু আমরা কখনও এত তলিয়ে ভেবেই দেখিনা। এই বই কিন্তু ভাবতে শেখাবে। এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যজিৎ রায় কে যে ভাবে লেখক এই বইটায় বর্ণনা করেছেন, বা তুল্যমূল্য বিচার করেছেন, তা শব্দে প্রকাশ করা যায় না। এতটাই অসাধারণ।
আমার মনে হয় সবার একবার অন্তত বইটা পড়া উচিৎ। যেহেতু ছোট, সেহেতু খুব সময় নেবে না শেষ হতে কিন্তু অনেক কিছু ভাবিয়ে যাবে। অনেকটা, "ছোটা প্যাকেট বাড়া ধামাকা" এর মতো।
বইয়ের প্রথম প্রবন্ধটা সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে। তার সিনেমাকে পশ্চিমারা বলত খুব বেশী প্রাচ্যীয়, আর দেশের মানুষ বলত খুব বেশি পশ্চিমা। দেশের মানুষ পশ্চিমা বলত কারণ তার সিনেমায় সাটলটি খুব বেশি। কোনো আবেগ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেননি, কোনো মেসেজ পেরেক ঠোকার মতো করে বারবার বলে দর্শকের মাথায় ঢোকানর চেষ্টা করেননি। এই জনিস যেহেতু চন্দ্রিল সাহেব ধরে ফেলেছেন, অতএব তিনি তো একই ভুল করতে পারেন না। তিনি একই কথা ঘুরেফিরে, বারেবারে, নতুন চেহারায় এনে পেরেক ঠোকার মতো করে ঠুকে দিয়েছেন তার বক্তব্য। "তুই ভুলবি? নে শালা, এমনভাবে ঠুকে দিলাম যে তোর চোদ্দ পুরুষে ভুলবে না।" অ্যান্ড ইট গেটস টায়ারিং আফটার সামটাইম। বইয়ের প্রথম ও শেষ প্রবন্ধ দুটি ছাড়া বাকিগুলি নট ওর্থ রিডিং।
১. ব্যাপারটি সহজপ্রাচ্য নয়। ২. চাঁদের আলোর সর। ৩. বাঘ, ঘোগ, চোখভোগ। ৪. গোলাপি যে নামে ডাকো। ৫. হাহা হিহি হোহো ও অন্যান্য। ৬. বোলো, ক্ষুধা তাকে ভোলেনি। ৭. রবীন্দ্রপ্রজেক্ট।
এই সাতটি প্রবন্ধে তৈরি চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের "হাহা হিহি হোহো ও অন্যান্য"। তুখোড় তার্কিক ও অগাধ পাণ্ডিত্যের এই মানুষটি তাঁর বইয়ে সমাজের গতানুগতিক ভাবনাকে যেভাবে অদ্ভুত রসিকতায় একেকটা তীর মেরেছেন, তা তুলনাহীন। সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে আমবাঙালির ধারণা ও তাঁর ছবিতে পাশ্চাত্য প্রভাব, রবীন্দ্রনাথের আজকের রবীন্দ্রনাথ হবার পেছনে ত্যাগস্বীকারটুকুও জানা যাবে ১৫৭ পৃষ্ঠার বইটিতে।