কমবেশি আমরা সবাই "জাতি" কিংবা "জাতীয়তাবাদ" এসবের মানে একরকম করে বুঝি। বাঙালী জাতি নিয়েও আমাদের কোন একরকমের চলনসই ধারণা আছে। সাদা চোখে, বাংলা ভাষায় কথা বলা পৃথিবীর সকল মানুষ বাঙালী আর তাদের সবচাইতে বড় অংশটা থাকে বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গে। এই দুটো অঞ্চল একসময় একসাথেই ছিল, পরে ৪৭ এর দেশভাগের বেলায় আলাদা হয়ে যায়। আর পূর্বের বাঙালীদের মধ্যে মুসলমান আর পশ্চিমে হিন্দু ধর্মের বাঙালীর সংখ্যা বেশি। এইসবের সাথে বঙ্গভঙ্গ, ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্র কিংবা ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠনের সমালোচনা... এইরকম কিছু ধারণা নিয়ে আমাদের বাঙালী জাতীয়তাবাদের ধারণা, জানাশোনা!
তবে এতটা সাদা চোখে দেখলে বোধয় বাঙালী জাতীয়তাবাদের স্বরূপটা ঠিক ধরতে পারা যায় না। দেখতে হয় আরও খানিকটা অনুসন্ধিৎসু চোখে, আরও অনেক দূর!
এই বাংলার ভূখণ্ড দীর্ঘদিন ধরে শাসিত হয়েছে এমনসব মানুষদের হাতে যাদের মুখের ভাষাটা এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ভাষা না। ধর্মটাও পুরোপুরি তাদের ধর্ম না। হাজার হাজার বছর ধরে বাইরের প্রভাবশালী, ক্ষমতাশালীরা এসে এই অঞ্চলে শাসন করেছে, ধর্মটা বদলে দিয়েছে, ভাষাটা প্রভাবিত করেছে। বাধ্য করেছে সম্পূর্ণ নতুন এবং অনেক দূরের (মানসিক এবং আক্ষরিক) কোন একটা ভাষাকে শিখবার। কিন্তু ঐ অত হাজার বছরে বাংলা কখনোই এক ছাতার নিচে ছিল না। এই বাংলাতেই ভাষার বিভিন্ন রূপ ছিল, ধর্মে ছিল বৈচিত্র, সংস্কৃতিতেও ছিল। যোগাযোগের অভাবেই হোক কিংবা ভিন্ন ভিন্ন শাসকের অধীনে থাকার কারণেই, বাংলার এই ভূখণ্ডের সব মানুষ কখনোই নিজেদের ঐক্য বোধ করবার তেমন কোন তাড়না অনুভব করেনি। রাজা এসেছে, গিয়েছে... প্রান্তিক মানুষের জীবনে খুব একটা বদল আসেনি। তারা তাদের মতনই থেকে গেছে। কুমিল্লার কৃষক নদীয়ার জেলের সাথে নিজেকে ঐক্যবদ্ধ করার কোন প্রয়োজন বোধ করেনি কিংবা জানতেও পারেনি অতদূরেও কেউ থাকে, যে কি না তার মতনই প্রায় একই ভাষায় কথা বলে। রাজা বদলে, যা খানিকটা বদল এসেছিল তা শহরে বাস করা মধ্যবিত্তের।
দীর্ঘদিন মৌর্য, গুপ্ত, পাল সেন শাসনের পর বাংলা চলে যায় সুলতানদের হাতে। যারা ধর্মে মুসলমান। এরপরে আসে মুঘলরা! দীর্ঘদিন সংস্কৃত থাকবার পর প্রধান ভাষা হয়ে দাঁড়ায় ফারসি। এরপরে ব্রিটিশরা আসবার পর এই ভাষা বদলে যায় ইংরেজীতে। এই বদলে অশিক্ষিত কৃষকের কোন চিন্তা হয়নি। চিন্তা করেছে মধ্যবিত্ত। তারা প্রতিনিয়ত তাল মিলিয়ে চলেছে শাসকের, উন্নতিও করেছে বটে।
এই ইংরেজীর আমলেই সর্বপ্রথম বাংলা এক ছাতার নিচে চলে আসে, যদিও প্রশাসনিকভাবে। কিন্তু বাংলার পশ্চিমপ্রান্ত অপেক্ষাকৃত উন্নত হবার কারণে এবং শহর কলকাতা পুরো ভারতবর্ষের রাজধানী হয়ে যাওয়াতে সেই ইংরেজ প্রভাব সবচাইতে বেশি পড়েছিল কলকাতার মধ্যবিত্তের জীবনেই। আর এই মধ্যবিত্তের প্রায় সবাইই হিন্দু। আর যারা ছিল মুসলমান, তারা নিজেদের খুব একটা বাঙালী ভাবতেই চায় না। ক্রমান্বয়ে এই হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী উন্নতি করতে লাগল!
কিন্তু একটা সময় পূর্ব বাংলাতেও মধ্যবিত্ত শ্রেণী (যাদের অধিকাংশই মুসলমান, এবং যারা ব্রিটিশদের শত্রু ভাবত শুধুমাত্র উপনিবেশ সৃষ্টির জন্যে না। মুসলমান শাসককে সরিয়ে ক্ষমতা দখলের জন্যেও) তাদের পুরনো ক্ষত ভুলে যেয়ে উন্নতি করতে লাগল। আর উন্নতি বলতে দুই সম্প্রদায়ের কাছেই ছিল চাকরি, এবং তার আগে শিক্ষা... যেটা এই চাকরি পাবারই একটা মাধ্যম। তখনই প্রথমবারের মতন বাংলায় নতুন একটা সংকট দেখা দিল। একই ভাষাভাষীর হয়েও ধর্মভিত্তিক দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান এবং প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছিল। আর তেমনই একটা সময়ে ব্রিটিশ সরকার ভারত শাসনে তাদের সবচাইতে "উল্লেখযোগ্য" পদক্ষেপ নিয়েছিল, বঙ্গভঙ্গ। সেই সময়েই বলতে গেলে বাঙালী হিন্দু আর মুসলমান এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল!
এই বঙ্গভঙ্গ হওয়া এবং রদ হওয়া নিয়ে আন্দোলন পাল্টা আন্দোলন নিয়ে ধর্মভিত্তিক দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সেই বিভেদটা পাকাপোক্ত হয়। এরপরের চার দশক সেই বিভেদে বিভিন্নভাবে ব্রিটিশরা ঘি ঢেলেছে, ঘি ঢেলেছে দুই সম্প্রদায়। কতকটা অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখবার জন্যে। কতকটা অবচেতনভাবে... ঘি ঢেলেছে কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত দুই রাজনৈতিক দল, যে দুই দলও কিনা বেশ রকমেরই সাম্প্রদায়িক। এইসবে বিভেদের আগুন বেড়েছেই ক্রমশ। যা আর কখনোই নিভতে পারে নি। কিংবা বলা যায় নেভানো হয়নি... ফলাফল বাঙালীর ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা... ৪৭ এর দেশভাগ।
এই দেশভাগের পরেও পূর্ব বাংলার বাঙালীরা খুব একটা স্থির জীবন যাপন করতে পারেনি। কারণ দেশটা গঠিত হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। ধর্মের "ঐক্য" থাকলেও ঐক্য ছিল না ভাষা কিংবা অর্থনীতির ব্যাপারে। তারা একটু একটু করে বুঝতে পেরে অবশেষে ঘটায় বাঙালী জাতির ইতিহাসে আরেকটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ৫২র ভাষা আন্দোলন। এরপরে বিভিন্ন আন্দোলন করে, শেষে এসে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা... ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম। আর এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতন বাঙালী নিজের জন্যে একটি দেশ পায়, অবশ্য এই বাঙালীদের অধিকাংশই আবার মুসলমান।
খুব খুব ছোট করে বলতে গেলে এইই ছিল বইয়ে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই বই "বাঙালীর জাতীয়তাবাদ" এ। কিন্তু শুধুই কি এইটুকুই ছিল! মোটেই না! সাড়ে চারশ পৃষ্ঠার একটা বই নিশ্চয়ই এমনি এমনি লিখে ফেলা যায় না... লেখক মোট ১১টা পরচ্ছেদে ভাগ করে, বাঙালী জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠে আজকের এই অবস্থানে আসবার পেছনে, ১১টি ভিন্ন প্রভাবকের প্রভাব বর্ণনা করেছেন। ছিল ভাষার প্রভাব। বাংলার এই অঞ্চলে ভিন্ন ভাষাভাষী শাসকদের আগমন, তাদের চাপিয়ে দেয়া ভাষা এবং এই অঞ্চলের মানুষদের মধ্যেই যে নিজেদের মুখের ভাষার মধ্যকার দূরত্ব, সেইসবের। বলেছেন শিক্ষার কথা... শিক্ষার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা মধ্যবিত্ত বাঙালীসমাজ, যারা প্রায় সবসময়ই সাহায্য করেছেন উপনিবেশ টিকিয়ে রাখতে। শিক্ষার প্রভাবের সাথে বলেছেন মেকওলে, বিদ্যাসাগর আর বিবেকানন্দের কথা... এসেছে রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম এবং অনেকের কথা। তারা শিক্ষা কিংবা সাহিত্যে প্রভাব ফেলে কীভাবে মধ্যবিত্তকে প্রভাবিত করেছিলেন। বলেছেন রাজনীতির প্রভাব। কী করে প্রথমে হিন্দু মধ্যবিত্ত এবং পরে একটা সময় মুসলমান মধ্যবিত্ত নিজেদের রাজনীতিতে জড়িয়েছে। এক রকম ব্রিটিশদের ইচ্ছাতেই... একসময়ে নিজ স্বার্থেই আলাদা হতে চাওয়া এবং নিজ নিজ দেশ দাবি করা। লেখক দেখিয়েছেন, এই স্বাধীনতা সত্যিতে কীভাবে ঐ মধ্যবিত্ত শ্রেণীকেই ফসল দিয়ে গেছে। বলেছেন নারীর অবস্থানের কথা। বলেছেন আমলাতন্ত্র এবং অর্থনীতির প্রভাবের কথা। সত্যি বলতে তিনি পুরো বইজুড়ে অসংখ্যবার দেখিয়েছেন অর্থনীতিই কীভাবে আলাদা করেছে এই দুই বাংলাকে। আবার এরই মাঝে অর্থনীতির ভেতরেই কীভাবে দুই বাংলার শাসক কিংবা মধ্যবিত্তের স্বার্থগত কী মিল আছে... বলেছেন ধর্মনিরপেক্ষতার কথা। হিন্দু কিংবা মুসলমান উভয় ক্ষেত্রেই এই ধর্মনিরপেক্ষতার অভাব একটা সময় শেষ পর্যন্ত বাংলার বিভক্তিকে বাধ্য করায়।
তবে শেষ পরিচ্ছেদটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত এবং চমকপ্রদ। "সর্বনাম কী বলে" পরিচ্ছেদে সর্বনামের ব্যাবহার দিয়েই যে বাংলার বিভক্তি কিংবা সঙ্কট বুঝানো যায়, তা দেখিয়েছেন।
এই একটা বই লিখতে লেখক আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় তিন শতাধিক বই কিংবা প্রবন্ধের। খুবই সুখপাঠ্য একটা প্রবন্ধের বই। তবে বারবার কিছু বিষয়ের পুনরাবৃত্তি বিরক্তির সৃষ্টি করছ���ল। সাথে বারবার সমাজতন্ত্রেই মুক্তি, এমন ধারণার উপস্থাপন। এটাও খানিকটা বিরক্তির। তবে সব মিলিয়ে অসাধারণ... বাঙালীর জাতীয়তা নিয়ে আগ্রহ থাকলে অবশ্যপাঠ্য বই নিঃসন্দেহে... সাড়ে চারশ পৃষ্ঠার চমৎকার একটা ভ্রমণ!
ঐ দুইটা বিরক্তির কারণে একটা তারা কমিয়ে দিলাম! মনে মনে পাঁচটা তারাই দিয়েছি!
আর প্রিতম! তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ... সাজেস্ট করবার জন্যে!