Jump to ratings and reviews
Rate this book

বাঙালীর জাতীয়তাবাদ

Rate this book
জাতীয়তাবাদের পক্ষে যেমন বিপক্ষেও তেমনি অনেক কিছু বলার আছে, এবং থাকবে। জাতীয়তাবাদ আর দেশপ্রেম এক বস্তু নয়; জাতীয়তাবাদ আরো বেশি রাজনৈতিক। বাঙালীর জাতীয়তাবাদ ভাষাভিত্তিক, এবং আত্মরক্ষামূলক। কথা ছিল জাতীয়তাবাদ বাঙালীকে ঐক্যবদ্ধ করবে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা ঘটেনি। না ঘটার কারণ হচ্ছে বৈষম্য। বৈষম্যের মুখ্য প্রকাশগুলোর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রদায়িকতা ও শ্রেণীবিভাজন। সাম্প্রদায়িক কারণে বাংলা বিভক্ত হয়েছে, পরে প্রতিষ্ঠা ঘটেছে বাংলাদেশের, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশেও সব বাঙালী যে ঐক্যবদ্ধ তা নয়, এখানে ঐক্যের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে রয়েছে শ্রেণী- দূরত্ব। ঐক্যের অন্তরায়গুলোকে চিহ্নিত করাই এই বইয়ের প্রধান উদ্দেশ্য। অনৈক্য সৃষ্টিতে রাষ্ট্র ও রাজনীতির ভুমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; তদুপরি জাতীয়তাবাদ নিজেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত; সে কারণে রাজনীতির আলোচনা নিয়েই বইএর দীর্ঘতম পরিচ্ছেদ। বৈষম্য রয়েছে অর্থনীতিতে, শিক্ষায়, নারীর অবস্থানে। ভাষার দায় ও দায়িত্ব ছিল ঐক্য গরায় সাহায্য করা; কিন্তু ভাষা সে কাজ করতে পারেনি। প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠায় বাঙালী মধ্যবিত্তের অপারগতাও অনৈক্য সৃষ্টির কারণ বটে। আমলাতন্ত্র বৈষম্যকে পুষ্ট করেছে, এবং দায়িত্ব নিয়েছে তার সংরক্ষণের। বাংলা ও বাঙালীর জীবনে আঞ্চলিক পার্থক্যও অসত্য ছিলনা। এই বিষয়গুলোর প্রত্যেকটির ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে। বাঙালীর ঐক্য-অনৈক্য সৃষ্টির ইতিহাসে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ধারার তিন প্রতিনিধি- মেকওলে, বিদ্যাসাগর ও বিবেকানন্দকে নিয়ে আলোচনা রয়েছে একটি স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদে। সর্বনাম কিভাবে বাঙালীর সঙ্গে বাঙালীর দূরত্বের স্বারকচিহ্ন হিসাবে কাজ করেছে সেটি দেখানো হয়েছে আরেকটি পরিচ্ছেদে। অবতরণিকা থেকে শুরু করে উপসংহার পর্যন্ত আসলে একটিই পর্যালোচনা, যেটিকে ভিন্ন ভিন্ন পরিচ্ছেদে ভাগ করা হয়েছে। জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ইংরেজ আগমনের পর থেকে; বইয়ের কাহিনীর সূত্রপাতও সেখান থেকেই; শেষ হয়েছে সাম্প্রতিক কালে এসে। যে বক্তব্যটি প্রচ্ছন্নভাবে অধিকাংশ সময়ে এবং কখনও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে তা হল ঐক্যের সকল আয়োজনের আড়ালে জাতিগঠনের পরিবর্তে শ্রেণীগঠনের কাজটাই ঘটেছে।

472 pages, Hardcover

First published January 1, 2000

7 people are currently reading
143 people want to read

About the author

Serajul Islam Choudhury

135 books63 followers
Serajul Islam Choudhury (In Bengali সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী) is an eminent Littérateur, professor emeritus of University of Dhaka.

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
11 (36%)
4 stars
15 (50%)
3 stars
4 (13%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 6 of 6 reviews
Profile Image for পীয়্যান নবী.
52 reviews87 followers
April 6, 2017
কমবেশি আমরা সবাই "জাতি" কিংবা "জাতীয়তাবাদ" এসবের মানে একরকম করে বুঝি। বাঙালী জাতি নিয়েও আমাদের কোন একরকমের চলনসই ধারণা আছে। সাদা চোখে, বাংলা ভাষায় কথা বলা পৃথিবীর সকল মানুষ বাঙালী আর তাদের সবচাইতে বড় অংশটা থাকে বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গে। এই দুটো অঞ্চল একসময় একসাথেই ছিল, পরে ৪৭ এর দেশভাগের বেলায় আলাদা হয়ে যায়। আর পূর্বের বাঙালীদের মধ্যে মুসলমান আর পশ্চিমে হিন্দু ধর্মের বাঙালীর সংখ্যা বেশি। এইসবের সাথে বঙ্গভঙ্গ, ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্র কিংবা ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠনের সমালোচনা... এইরকম কিছু ধারণা নিয়ে আমাদের বাঙালী জাতীয়তাবাদের ধারণা, জানাশোনা!

তবে এতটা সাদা চোখে দেখলে বোধয় বাঙালী জাতীয়তাবাদের স্বরূপটা ঠিক ধরতে পারা যায় না। দেখতে হয় আরও খানিকটা অনুসন্ধিৎসু চোখে, আরও অনেক দূর!

এই বাংলার ভূখণ্ড দীর্ঘদিন ধরে শাসিত হয়েছে এমনসব মানুষদের হাতে যাদের মুখের ভাষাটা এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ভাষা না। ধর্মটাও পুরোপুরি তাদের ধর্ম না। হাজার হাজার বছর ধরে বাইরের প্রভাবশালী, ক্ষমতাশালীরা এসে এই অঞ্চলে শাসন করেছে, ধর্মটা বদলে দিয়েছে, ভাষাটা প্রভাবিত করেছে। বাধ্য করেছে সম্পূর্ণ নতুন এবং অনেক দূরের (মানসিক এবং আক্ষরিক) কোন একটা ভাষাকে শিখবার। কিন্তু ঐ অত হাজার বছরে বাংলা কখনোই এক ছাতার নিচে ছিল না। এই বাংলাতেই ভাষার বিভিন্ন রূপ ছিল, ধর্মে ছিল বৈচিত্র, সংস্কৃতিতেও ছিল। যোগাযোগের অভাবেই হোক কিংবা ভিন্ন ভিন্ন শাসকের অধীনে থাকার কারণেই, বাংলার এই ভূখণ্ডের সব মানুষ কখনোই নিজেদের ঐক্য বোধ করবার তেমন কোন তাড়না অনুভব করেনি। রাজা এসেছে, গিয়েছে... প্রান্তিক মানুষের জীবনে খুব একটা বদল আসেনি। তারা তাদের মতনই থেকে গেছে। কুমিল্লার কৃষক নদীয়ার জেলের সাথে নিজেকে ঐক্যবদ্ধ করার কোন প্রয়োজন বোধ করেনি কিংবা জানতেও পারেনি অতদূরেও কেউ থাকে, যে কি না তার মতনই প্রায় একই ভাষায় কথা বলে। রাজা বদলে, যা খানিকটা বদল এসেছিল তা শহরে বাস করা মধ্যবিত্তের।

দীর্ঘদিন মৌর্য, গুপ্ত, পাল সেন শাসনের পর বাংলা চলে যায় সুলতানদের হাতে। যারা ধর্মে মুসলমান। এরপরে আসে মুঘলরা! দীর্ঘদিন সংস্কৃত থাকবার পর প্রধান ভাষা হয়ে দাঁড়ায় ফারসি। এরপরে ব্রিটিশরা আসবার পর এই ভাষা বদলে যায় ইংরেজীতে। এই বদলে অশিক্ষিত কৃষকের কোন চিন্তা হয়নি। চিন্তা করেছে মধ্যবিত্ত। তারা প্রতিনিয়ত তাল মিলিয়ে চলেছে শাসকের, উন্নতিও করেছে বটে।

এই ইংরেজীর আমলেই সর্বপ্রথম বাংলা এক ছাতার নিচে চলে আসে, যদিও প্রশাসনিকভাবে। কিন্তু বাংলার পশ্চিমপ্রান্ত অপেক্ষাকৃত উন্নত হবার কারণে এবং শহর কলকাতা পুরো ভারতবর্ষের রাজধানী হয়ে যাওয়াতে সেই ইংরেজ প্রভাব সবচাইতে বেশি পড়েছিল কলকাতার মধ্যবিত্তের জীবনেই। আর এই মধ্যবিত্তের প্রায় সবাইই হিন্দু। আর যারা ছিল মুসলমান, তারা নিজেদের খুব একটা বাঙালী ভাবতেই চায় না। ক্রমান্বয়ে এই হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী উন্নতি করতে লাগল!

কিন্তু একটা সময় পূর্ব বাংলাতেও মধ্যবিত্ত শ্রেণী (যাদের অধিকাংশই মুসলমান, এবং যারা ব্রিটিশদের শত্রু ভাবত শুধুমাত্র উপনিবেশ সৃষ্টির জন্যে না। মুসলমান শাসককে সরিয়ে ক্ষমতা দখলের জন্যেও) তাদের পুরনো ক্ষত ভুলে যেয়ে উন্নতি করতে লাগল। আর উন্নতি বলতে দুই সম্প্রদায়ের কাছেই ছিল চাকরি, এবং তার আগে শিক্ষা... যেটা এই চাকরি পাবারই একটা মাধ্যম। তখনই প্রথমবারের মতন বাংলায় নতুন একটা সংকট দেখা দিল। একই ভাষাভাষীর হয়েও ধর্মভিত্তিক দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান এবং প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছিল। আর তেমনই একটা সময়ে ব্রিটিশ সরকার ভারত শাসনে তাদের সবচাইতে "উল্লেখযোগ্য" পদক্ষেপ নিয়েছিল, বঙ্গভঙ্গ। সেই সময়েই বলতে গেলে বাঙালী হিন্দু আর মুসলমান এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল!

এই বঙ্গভঙ্গ হওয়া এবং রদ হওয়া নিয়ে আন্দোলন পাল্টা আন্দোলন নিয়ে ধর্মভিত্তিক দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সেই বিভেদটা পাকাপোক্ত হয়। এরপরের চার দশক সেই বিভেদে বিভিন্নভাবে ব্রিটিশরা ঘি ঢেলেছে, ঘি ঢেলেছে দুই সম্প্রদায়। কতকটা অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখবার জন্যে। কতকটা অবচেতনভাবে... ঘি ঢেলেছে কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত দুই রাজনৈতিক দল, যে দুই দলও কিনা বেশ রকমেরই সাম্প্রদায়িক। এইসবে বিভেদের আগুন বেড়েছেই ক্রমশ। যা আর কখনোই নিভতে পারে নি। কিংবা বলা যায় নেভানো হয়নি... ফলাফল বাঙালীর ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা... ৪৭ এর দেশভাগ।

এই দেশভাগের পরেও পূর্ব বাংলার বাঙালীরা খুব একটা স্থির জীবন যাপন করতে পারেনি। কারণ দেশটা গঠিত হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। ধর্মের "ঐক্য" থাকলেও ঐক্য ছিল না ভাষা কিংবা অর্থনীতির ব্যাপারে। তারা একটু একটু করে বুঝতে পেরে অবশেষে ঘটায় বাঙালী জাতির ইতিহাসে আরেকটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ৫২র ভাষা আন্দোলন। এরপরে বিভিন্ন আন্দোলন করে, শেষে এসে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা... ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম। আর এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতন বাঙালী নিজের জন্যে একটি দেশ পায়, অবশ্য এই বাঙালীদের অধিকাংশই আবার মুসলমান।

খুব খুব ছোট করে বলতে গেলে এইই ছিল বইয়ে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই বই "বাঙালীর জাতীয়তাবাদ" এ। কিন্তু শুধুই কি এইটুকুই ছিল! মোটেই না! সাড়ে চারশ পৃষ্ঠার একটা বই নিশ্চয়ই এমনি এমনি লিখে ফেলা যায় না... লেখক মোট ১১টা পরচ্ছেদে ভাগ করে, বাঙালী জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠে আজকের এই অবস্থানে আসবার পেছনে, ১১টি ভিন্ন প্রভাবকের প্রভাব বর্ণনা করেছেন। ছিল ভাষার প্রভাব। বাংলার এই অঞ্চলে ভিন্ন ভাষাভাষী শাসকদের আগমন, তাদের চাপিয়ে দেয়া ভাষা এবং এই অঞ্চলের মানুষদের মধ্যেই যে নিজেদের মুখের ভাষার মধ্যকার দূরত্ব, সেইসবের। বলেছেন শিক্ষার কথা... শিক্ষার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা মধ্যবিত্ত বাঙালীসমাজ, যারা প্রায় সবসময়ই সাহায্য করেছেন উপনিবেশ টিকিয়ে রাখতে। শিক্ষার প্রভাবের সাথে বলেছেন মেকওলে, বিদ্যাসাগর আর বিবেকানন্দের কথা... এসেছে রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম এবং অনেকের কথা। তারা শিক্ষা কিংবা সাহিত্যে প্রভাব ফেলে কীভাবে মধ্যবিত্তকে প্রভাবিত করেছিলেন। বলেছেন রাজনীতির প্রভাব। কী করে প্রথমে হিন্দু মধ্যবিত্ত এবং পরে একটা সময় মুসলমান মধ্যবিত্ত নিজেদের রাজনীতিতে জড়িয়েছে। এক রকম ব্রিটিশদের ইচ্ছাতেই... একসময়ে নিজ স্বার্থেই আলাদা হতে চাওয়া এবং নিজ নিজ দেশ দাবি করা। লেখক দেখিয়েছেন, এই স্বাধীনতা সত্যিতে কীভাবে ঐ মধ্যবিত্ত শ্রেণীকেই ফসল দিয়ে গেছে। বলেছেন নারীর অবস্থানের কথা। বলেছেন আমলাতন্ত্র এবং অর্থনীতির প্রভাবের কথা। সত্যি বলতে তিনি পুরো বইজুড়ে অসংখ্যবার দেখিয়েছেন অর্থনীতিই কীভাবে আলাদা করেছে এই দুই বাংলাকে। আবার এরই মাঝে অর্থনীতির ভেতরেই কীভাবে দুই বাংলার শাসক কিংবা মধ্যবিত্তের স্বার্থগত কী মিল আছে... বলেছেন ধর্মনিরপেক্ষতার কথা। হিন্দু কিংবা মুসলমান উভয় ক্ষেত্রেই এই ধর্মনিরপেক্ষতার অভাব একটা সময় শেষ পর্যন্ত বাংলার বিভক্তিকে বাধ্য করায়।

তবে শেষ পরিচ্ছেদটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত এবং চমকপ্রদ। "সর্বনাম কী বলে" পরিচ্ছেদে সর্বনামের ব্যাবহার দিয়েই যে বাংলার বিভক্তি কিংবা সঙ্কট বুঝানো যায়, তা দেখিয়েছেন।

এই একটা বই লিখতে লেখক আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় তিন শতাধিক বই কিংবা প্রবন্ধের। খুবই সুখপাঠ্য একটা প্রবন্ধের বই। তবে বারবার কিছু বিষয়ের পুনরাবৃত্তি বিরক্তির সৃষ্টি করছ���ল। সাথে বারবার সমাজতন্ত্রেই মুক্তি, এমন ধারণার উপস্থাপন। এটাও খানিকটা বিরক্তির। তবে সব মিলিয়ে অসাধারণ... বাঙালীর জাতীয়তা নিয়ে আগ্রহ থাকলে অবশ্যপাঠ্য বই নিঃসন্দেহে... সাড়ে চারশ পৃষ্ঠার চমৎকার একটা ভ্রমণ!
ঐ দুইটা বিরক্তির কারণে একটা তারা কমিয়ে দিলাম! মনে মনে পাঁচটা তারাই দিয়েছি!

আর প্রিতম! তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ... সাজেস্ট করবার জন্যে!
Profile Image for Shadin Pranto.
1,483 reviews564 followers
November 23, 2019
জাতীয়তাবাদ একটি বৃহৎ ধারণা।উপমহাদেশ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রাধান্য ছিল ১৯৭১ সালের আগপর্যন্ত। কিন্তু ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ নামক একটি নতুন রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রটির ভিত্তি বাংলাভাষা কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ, যদি আরো সুস্পষ্টভাবে বলি তবে একে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলতে পারি। উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে এই জাতীয়তাবাদের আনুষ্ঠানিক উদ্ভব এক অভূতপূর্ব ঘটনা।

সিরাজু্ল ইসলাম চৌধুরী সরাসরি বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণা নিয়ে প্রথমেই আলোচনায় যান নি।বইটি লিখতে গিয়ে তাকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়েছে, যার ছাপ লেখনীতে চোখে পড়েছে। লেখক বামধারার মতাদর্শে বিশ্বাস করেন। তাই পুরো আলোচনার এঙ্গেল ছিল বামপন্থি মতাদর্শের।

১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পর বাংলার রাজনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। মোঘল সাম্রাজ্য আরো শতবর্ষ স্থায়ী থাকলেও তা ছিল নামমাত্রে। মূল ক্ষমতার উৎস তখন ইংরেজ বেনিয়ারা। পলাশির যুদ্ধের পরাজয়ের দগদগে ঘা সেই সময়ের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে শাসকগোষ্ঠী ইংরেজদের থেকে দূরে নিয়ে গিয়েছিল।আর সেই সুযোগে লেখকের মতে মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে যারা শুরু থেকেই ইংরেজদের সাহায্য করতো এবং বিনিময়ে তারা শাসকগোষ্ঠীর আনুকূল্য লাভে সক্ষম হয়। তখন পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানদের কোনো আগ্রহ নেই ইংরেজ আনুকূল্য লাভের। তারা জলে থেকে কুমিরের সাথে লড়াইয়ের এক অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। সৈয়দ আমীর আলী কিংবা নওয়াব লতিফদের আবির্ভাবের আগপর্যন্ত বাঙালি মুসলমান পুরো নির্লিপ্ত ইংরেজ বর্ণিত শিক্ষায়,বাণিজ্য।তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়েছে বাঙালি মুসলমানদের ওপর।কী ধরনের প্রভাব তার বিস্তর আলোচনা করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

১৮৭২ সালের আদমগণনার পূর্বে এক ইংরেজ আইসিএসের বক্তব্য, "আমি ভেবেছিলাম মুসলিম জনগোষ্ঠী ১% মতো।"। আদমগণনার পর বোঝা গেল বাঙালি বলতে শুধু হিন্দু বাঙালি বোঝায় না, মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক বাঙালি মুসলমান। পরে হিন্দু বাঙালিদের তুলনায় মুসলিম বাঙালিদের সংখ্যা বেশি ছিল (এই বিষয়টি বঙ্গভাগের ক্ষেত্রে জটিলতর প্রভাব ফেলেছে)।

১৮১৮ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা হয় যেখানে শুধু হিন্দুরাই পড়ার সুযোগ পেতো। কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা আরো আগেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হেস্টিংস। মেকলে ১৮৩৪-৩৫ সালের দিকে শিক্ষাবিষয়ক সুপারিশ করেন। এরই প্রেক্ষিতে ১৮৩৭ সালে ফারসি থেকে অফিসিয়াল ভাষা করা হয় ইংরেজি। মেকলে তার সুপারিশপত্রে সরাসরি লিখছিলেন, এমন এক জাতি তারা তৈরি করবে যারা রক্ত-মাংসে হবে বাঙালি আর পুরোটাই হবে ইংরেজপন্থী। কট্টর সাম্রাজ্যবাদী মেকলের স্বপ্ন পুরোটাই পূরণ হয়েছিল। তখন থেকেই বাঙালিদের মাঝে ইংরেজি শেখার নেশা চলে আসে, যা এখনো যায়নি।

১৮৫৮ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে প্রথম ব্যাচের গ্রাজুয়েট হিসেবে বের হন বঙ্কিমচন্দ্র। যিনি সাহিত্য অবদান রাখার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা ছড়াতে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখেন। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র,বিদ্যাসাগর, প্রমথ চৌধুরী,বিবেকানন্দ প্রমুখ ব্যক্তিত্ব বাঙালি ছিলেন পুরোটা। কিন্ত কিছু ক্ষেত্রে নিজ সম্প্রদায়ের বাইরে চিন্তা করতে পারেন নি।

১৮৮৫ সালে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা হলেও দীর্ঘকাল এর কর্তাব্যক্তি ছিলেন ইংরেজ। এবং সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জিরা অনেকটা দলীয় খপ্পরে পড়ে আদর্শচ্যুত হয়েছিলেন বলে সিরাজুল ইসলামের অভিমত। চিত্তরঞ্জন দাশ বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক ধারার ধারক ছিলেন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেসে টিকতে পারেন নি তার বামধারার মতাদর্শের জন্য যার ফলশ্রুতি শুভ হয়নি।্

১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনীতির মোড় ঘুরে যায়। অনেকটা কংগ্রেসের বিমাতাসুলভ আচরণ এরজন্য দায়ী। আবার স্বার্থসিদ্ধও অন্যতম অনুঘটক।তাদের নিজ স্বার্থে ছাড় দিলে মুসলিম লীগ হালে পানি পেত না। তারই ফলাফল আপাদমস্তক বাঙালি শেরে বাংলা কর্তৃক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন এবং শেষমেশ ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ।

বাকী কথা সবাই জানি,পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের প্রতিবাদে মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের, বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্রের উদ্ভব। বাংলাদেশেও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা চলে যায় যারা ইংরেজ আর পাকি আমলে অনেকটা তাদের পদলেহন করতেন (এটাই লেখকের মূলকথা)।


এই বইয়ের সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্ট ছিল সবকিছুতে মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের দোষ ধরা অনেকটা অযৌক্তকতার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন লেখক। এক জায়গায় লিখেছেন শেষ মোগল সম্রাট রামমোহনকে রাজা উপাধি দিয়েছেন (পুরোপুরি ভুল তথ্য)।মুক্তিযুদ্ধে সবার দোষ ধরলেন অথচ তখন চীনপন্থি, রুশপন্থিদের ভূমিকা নিয়ে সত্যকথন এড়িয়ে গেলেন। স্বাধীনতার পরের ভূমিকার জন্য বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করলেন অথচ জাসদসহ অন্যান্য বামদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্লেষণ নাই। ইউপিএলের মতো স্বনামধন্য প্রকাশনীর বইতে বানান ভুল চোখে পড়েছে যা হতাশাজনক।

বইটা বেশ বিশ্লেষণধর্মী, আরো ভালো হতে পারতো যদি লেখক বাম মতাদর্শকে কিঞ্চিত উগ্রভাবে চাপিয়ে দিতে না চাইতেন।
Profile Image for Mosharaf Hossain.
128 reviews99 followers
June 10, 2017
৪৭৮ পৃষ্ঠার বিশাল সাইজের একখান বই 'বাঙালীর জাতীয়তাবাদ'। দম খিঁচা, টানটান হয়ে শুয়ে বসে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই বইখানা খতম দি আমি। এত কাঠখোট্টা একখান জিনিস শেষ করতে পেরেই আমি বড্ড বেশি আনন্দিত অনুভব করতে থাকি, কতটুকু জানছি সেটা পরের গল্প।

বাঙালীর জাতীয়তাবাদ বড্ড বেশি জটিল একটা বিষয়। আগে ভাবতাম, আমি বাঙ্গাল, বাঙলায় কথা বলি, সুযোগ বুঝে ভারত আর পাকিস্তান গালি দি, ক্রিকেটে জিতলে 'লাভ ইয়ু সাকিব' লেখে স্ট্যাটাস দি, এটাই আমার জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সিরজাউল ইসলাম আমার ধারণা বেশ জোরেশোরেই থাপ্পড় মেরে বুঝিয়ে দিয়েছে আমি কতউঁচু জাতের গর্দভ।

লেখক দেখিয়েছেন, জাতীয়তাবাদ আর দেশপ্রেম একই পাল্লায় মাপার জিনিষ নয়। ইহা অনেক বেশি রাজনৈতিক, বিশেষ করে বাঙালীর জাতীয়তাবাদ অনেক বেশি ভাষাভিত্তিক। লেখক বলেন, "ভাষা বলছে ঐক্যবদ্ধ হতে, এবং ভাষাই বলে দিচ্ছে কিভাবে তা সম্ভব হবে, শ্রেনী ও সম্প্রদায়ের বিভাজনকে ভেঙে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলে"

ফ্যাক্ট ছাড়া একটা লাইনেও কলম ধরেনি লেখক। প্রতিটা বাক্যে স্পষ্ট ছাপ রয়েছে ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের। লেখক দেখিয়েছেন তখনকার বাঙ্গালী হিন্দু মধ্যবিত্তরা কীভাবে এগিয়ে গিয়েছিল ইংরেজদের পদধুলি লাভ করে। আর বাঙ্গালি মুসলমানরা সৈয়দ আমীর আলী কিংবা নওয়াব লতিফদের আগমনের আগ পর্যন্ত কতটা নির্লিপ্ত ছিল ইংরেজদের আনুকূল্য লাভের ব্যাপারে। যার ফলে তৈরি হয় দুশ্রেনীর মধ্যে বিশাল একটা শূন্যস্থান, সেই বিষয় লেখক আলোচনা করেছেন বিস্তারিত ভাবে।

লেখক বেশ কয়েক জায়গায় তুলে ধরেন শিক্ষার কীভাবে আমাদের মধ্যে শ্রেনী বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে, আরো বেশি করে বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে তিন ধরনের শিক্ষার ব্যবস্থা চালু থাকায় তা দিনদিন আরো প্রবলতর হয়েছে বলে মনে করেন লেখক।

চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা ইত্যাদি ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের জোর করে বাঙ্গালি বানানোর প্রচেষ্টা যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নয়, লেখক সে বিষয়েও তুলে ধরেন। আওয়ামীলীগের দিকে আঙ্গুল তুলে বলেন, স্বাধীনতার পরে বামদেরই এরা তারা প্রধান শত্রু বলে চিহ্নিত করেছিল। অথচ আসল শত্রু যে ঘরের ভেতরেই বড় হচ্ছিল সেটা তারা খেয়াল করেনি। ৭৫ এর যারা নির্মম হত্যাকান্ড চালায় তারাই কেউই কমিউনিষ্ট ছিল না, সবাইই ঘোরতর এন্টি কমিউনিষ্ট ছিল।

লেখক বামপন্থীদের ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষন করতে গিয়ে বলেন, এরা সাধারণ মানুষের সাথে মিলেমিশে একাকার হতে পারেনি কখনওই। "জাতীয়তাবাদীরা যদি মুখাপেক্ষী হন ওয়াশিংটন-লন্ডনের এরা তবে মুখাপেক্ষী হয়েছেন মস্কো কিংবা পিকিংয়ের।" লেখকের মতে এই দেশ বামরা দার্শনিক কিংবা শিক্ষক হয়েছে যতটা, ঠিক ততটাই কম হয়েছেন মানুষের আপনজন।

বিশাল এই বই নিয়ে আলোচনা করতে থাকলে গুডরীডসের জায়গায় কুলাবে না। তবে সমালোচনার খাতিরে যদি বলি, লেখক তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের গন্ডি থেকে বেরিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারেননি যতটা চেয়েছেন ততটা। লেখক তথ্যের পরে তথ্য দিয়ে গিয়েছে কিন্তু মাঝপথে নিজেই খেই হারিয়েছে যখন সময় এসেছিল সেগুলোকে বিশ্লেষণের। ৭১ এর পরে বঙ্গবন্ধুর শাসনমালের সমালোচনা হয়েছে অথচ বামদের কর্মকান্ডকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আর মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের দোষ ধরাকে লেখক শেষ পর্যায় দৃষ্টিকটুর পর্যায় নিয়ে গেছে।

যাইহোক দিনশেষে বইটা মগজে একটু হলেও আঘাত করবে। বইটা পড়তে আমার ৭ দিন সময় লাগে যার ধরুন আমার প্রায় ৩০ টাকা বেশি জরিমানা দিতে হয়েছে লাইব্রেরিতে। তবে পড়া শেষ করে মনে হয়েছে সব সুদে আসলে উশুল হয়েছে।
Profile Image for Shotabdi.
822 reviews200 followers
October 12, 2024
২০১৯ সালে বইটা পড়েছিলাম। তখন রাজনীতি নিয়ে জ্ঞান প্রায় শূন্যের কোঠায় ছিল। তবুও বইয়ের বয়ানে মুগ্ধ হয়েই পাঁচ তারা দিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু সমস্ত কিছু আসলে মস্তিষ্কে সেঁধোয় নি, সেটা স্বীকার করতে বিন্দুমাত্র লজ্জা নেই আমার।
২০২৪ এ এসে আবার যখন পড়লাম বইটা, তখন বুঝলাম, যে এই বইটি আসলে বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি, সর্বোপরি সব ধরনের জাতীয়তাবাদ নিয়ে অত্যন্ত যত্ন এবং বিশ্লেষণসহকারে লেখা একটা আকর গ্রন্থ৷ মন দিয়ে এই বইটি পড়লে অসংখ্য বই পড়ে বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা কম পড়বে। কারণ লেখক নিজেই বিস্তারিতভাবে ১৯৪৭ থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের রাজনীতি এবং মনস্তত্ত্ব আলোচনা করেছেন। অবশ্যই অঙ্গাঙ্গিভাবে আরো পুরনো ইতিহাস, ইংরেজ আমল এর সাথে জড়িয়ে আছে।
১৯৪৭ কেন এল, তার আগে বাঙালিদের মনস্তত্ত্ব কেমন ছিল, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক কীভাবে ধারা পাল্টাতে থাকল একের পর এক, রামমোহন, বিদ্যাসাগর কিংবা বিবেকানন্দ, গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ এঁদের কেমন ভূমিকা ছিল, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মবাদী জাতীয়তাবাদ, বাঙালি মুসলিম মনস্তত্ত্ব সবকিছুই চমৎকার এসেছে ৪৭২ পৃষ্ঠার ঠাসবুনট গ্রন্থটিতে। আমার মতে, এই বইটি খুব যত্ন নিয়ে করা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বইগুলোর একটি।
এই বইটি অনেক কিছুর সারাংশ হিসেবেও কাজ করে। ভালো রাজনৈতিক ধারণা আছে, এমন ব্যক্তিও বইটা পড়বেন, এই কারণে যে বইটি ভাবনাগুলো সুসংহত হতে সাহায্য করে। আর যারা নতুন পাঠক, তাঁরা পড়বেন জানার জন্য, তবে ধীরে ধীরে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। দ্রুত চোখ বুলিয়ে গেলে অনেক রত্নেরই হদিশ পাওয়া যাবে না।
Profile Image for Aminul Islam.
33 reviews1 follower
October 18, 2024
জাতীয়তাবাদী চেতনার ফ্যাসিবাদী চরিত্র ও পুজিবাদের সাথে আঁতাতে জনগণের মুক্তির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবার এর সুদীর্ঘ গল্প। বাংলার বৃটিশ সময় ও তার পরবর্তী স্বাধীন বাংলায় জাতীয়তাবাদী বয়ানের রুপান্তর পরিবর্তন ও তার প্রবক্তাদের তুলনামুলক বিশ্লেষণ।

মুক্তির চেতনা বেঁচে থাকুক স্যারের সৃষ্টি কর্মে।
Profile Image for Hibatun Nur.
159 reviews
February 17, 2025
বাঙালি জাতীয়তাবাদ না বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। বইটার নাম "বাঙালীর" জাতীয়তাবাদ। আর এখানেই লুক্কায়িত আছে স্যাটায়ার।

গুরুগম্ভীর এই ননফিকশনে লেখনি আর নৈর্বিত্তিক বাস্তবতার মারপ্যাচে আমি আসলেই স্যাটায়ারের সুস্বাদ পেয়েছি। আর বুঝেছি লেখকের মতে কেন বাঙালির "জাতীয়তাবাদ" বাঙালির প্রকৃত জাতীয়তাবাদে রূপ নিতে পারে নি।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে বাদই দিলাম। অনেকের মতে সেটা জাতীয়তাবাদের মধ্যে পড়ে না। একাধিক জাতির বাস যেখানে সেখানে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ জাতীয়তা আর নাগরিকত্বকে একাকার করে দিয়ে একটা প্যাচানো ইস্যুকে আরও পেঁচিদা করতে উদ্দত, সমস্যার কোন কার্যত সমাধান না দিয়ে।

গেলনার, এন্ডারসন টেনে হয়ত একটা যুক্তি বসিয়ে দেয়া যাবে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাস্তব। তবুও লেখক যে অবকাঠামোতে ফেলতে চাচ্ছেন সেটা বুঝতে চেষ্টা করি। মোটা দাগে বলতে গেলে লেখকের মতে, ৪৭ বা ৭১, এতে ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে মাত্র, রাষ্ট্রের চরিত্রে কোন মৌলিক রূপান্তর আসেনি।

ঔপনেবেশিক পুঁজিবাদী শোষণ চলমান থেকেছে। ব্রিটিশ যাওয়া পর পাকিস্তানিরা করেছে, এরপর করেছে বাংলাদেশেরই পলিটিশান আর আমলারা। কার্যত স্বাধীনতা এসেছে, মুক্তি আসে নি। জাতীয়তাবাদ এবং তার মাধ্যমে জন্ম নেয়া রাষ্ট্র শোষণের টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

যেহেতু জাতীয়তাবাদ শোষণ দূর করে নি, শোষণের টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং জাতীয়তাবাদ গণতান্ত্রিক চেতনাকে ধারণ করেনি, সার্বজনীন হয় নি তাই এ জাতীয়তাবাদ বাঙালির হতে পারে নি। এখানে অর্থনীতি মূল ইস্যু। আর এখানেই মাথায় আসে রবার্ট মিশেলের Iron Law of Oligarchy যেখানে বলা হয় ক্ষমতা হস্তান্তর, রদবদল বা পতন হলেও অর্থনৈতিক শোষণের কাঠামো পুনরায় দাঁদ রোগের মত ফিরে আসতে পারে। দেখা যাচ্ছে এই বঙ্গভূমির ক্ষেত্রে এটা সত্য। এমনকি সাম্প্রতিক ইতিহাসেও এটা বাস্তব।

বইটা পড়তে গিয়ে কার্ল মার্ক্সের একটা উক্তিই বারবার মাথায় আসতেসিল। History Repeats Itself,
First as Tragedy, Second as Farce


কেন আসছিল সেটা বলি।

মধ্যবিত্তের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন যা পরবর্তীতে ভারত পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম দিয়ে ছাড়ল তার প্রাথমিক সূচনা হয়েছিল চাকরীকে কেন্দ্র করেই। ব্রিটিশ সরকারি চাকরী না পাওয়ার হতাশা, পেয়ে হারানোর হতাশা আর সুযোগের অভাব থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত।

মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। এটাই যেন তার ঐতিহাসিক প্রমাণ।

শেষে বলতে হয়, লেখক বাঙালির জাতীয়তাবাদের সাথে জড়িত প্রায় সকল ব্যক্তিত্বকেই বইয়ে নিয়ে এসেছেন। তাদের ভাল, খারাপ আর সীমাবদ্ধতার বিশাল আলাপ দিয়েছেন কিন্তু কেন যেন মনে হয়েছে লেখক ভাসানীকে একটু দয়ার চোখেই দেখেছেন, একটু হলেও ছাড় দিয়েছেন।

তাছাড়া লেখক একটা কথা বলেছেন, “ইতিহাসকে অবিকৃত রাখা মনে হয় সত্যি অসম্ভব”

উক্তিটা কেন যেন তার নিজের এই কাজের বেলাতেও খাটছে বলেই মনে হয়েছে।
Displaying 1 - 6 of 6 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.