আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার। তিনি মাত্র দুটি উপন্যাস রচনা করলেও সমালোচকরা তাঁকে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি ঔপন্যাসিক হিসেবেই বিবেচনা করেন। এই দুটি উপন্যাসের বাইরে ইলিয়াস মাত্র তেইশটি ছোটগল্প এবং বাইশটি প্রবন্ধ লিখেছেন। ইলিয়াস সমাজ, রাষ্ট্র এবং জনগণের একজন একাগ্র পর্যবেক্ষক ছিলেন। তিনি তাঁর লেখার চরিত্রগুলোকে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি এবং অবস্থানের প্রতীক হিসেবে সুদক্ষভাবে রূপায়ন করতেন। লেখার সময় তিনি চেষ্টা করতেন ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল থাকতে, ফলে তিনি পাঠকের স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে লেখার অন্তর্নিহিত গুরুত্বকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন সবসময়। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যুর ফলে তাঁর সৃজনশীল জীবন খুব দীর্ঘায়িত হতে পারেনি, কিন্তু তাঁর লেখাগুলো বাংলা সাহিত্যে ধ্রুপদী সৃষ্টি হিসেবে স্থান পেয়েছে।
Akhteruzzaman Elias was a Bangladeshi novelist and short story writer. Despite the fact that he only wrote two novels, critics consider him to be one of the finest Bengali novelists. Besides these two books, Elias wrote only 23 short stories and 22 essays. Elias was a good observer of society, state, and people as he created his characters symbolising social classes and positions. He always strived to be historically accurate when writing, even if it meant pushing readers out of their comfort zones. His creative life was cut short by a premature death from cancer, but his writings are regarded as Bangla literature classics.
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছয়টি ছোট গল্পের সংকলন অন্য ঘরে অন্য স্বর। নিঃসন্দেহে বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে অনেক বড় নাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। মাত্র দুটো মহাকাব্যিক উপন্যাস আর গোটা বিশেক ছোটগল্প লিখেই ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। অন্য ঘরে অন্য স্বর বইয়ের গল্পগুলো পড়ে যা বুঝলাম, ছোটগল্প নিঃসন্দেহে উনার কমফোর্ট জোন। প্রত্যেকটা গল্প-ই স্বতন্ত্র, গল্পগুলোর আকার ছোট হলেও যে স্বাদটা পাওয়া যায় সেটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের থেকে কোনো অংশে কম নয়। বর্তমানে সাররিয়েলিজম, ম্যাজিক রিয়েলিজম, একসিস্টেনশিয়ালিজম খুব জনপ্রিয় ধারা। বাইরের দেশের অনেক জনপ্রিয় লেখকের লেখায় এসব দেখা যায়। কিন্তু আমাদের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায় সেই ষাটের দশকের এসবের আমেজ পাওয়া গেছে। এই বইয়েই যেমন নিরুদ্দেশ গল্পে উঠে এসেছে একজন যুবকের নিঃসঙ্গতার গল্প, খুঁজে ফেরে নিজের মধ্যে থেকে হারিয়ে যাওয়া অজানা কিছুর।
আবার উৎসব গল্পে হাস্যরসের মাধ্যমে দেখিয়েছেন অভিজাত ও ছা পোষা মানুষদের উৎসব পালনের মধ্যকার সূক্ষ্ম লাইন।
প্রতিশোধ গল্পে অস্তিত্বহীনতায় ভোগা একজনের প্রতিশোধের পরিকল্পনা উঠে এসেছে।
যোগাযোগ গল্পে এক মায়ের, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সন্তানের জন্য আহাজারি।
ফেরারী গল্পটা সম্পূর্ণ জাদু বাস্তবতায় ঘেরা গল্প। রয়েছে পরবাস্তবতারও ছাপ।
অন্য ঘরে অন্য স্বর গল্পে পুরানো এক বাড়ির একটা ঘরে হটাৎ করেই উদয় হওয়া অলৌকিকতা অথবা কল্পনা নিয়ে লেখা।
যেমনটা বলছিলাম ছোটগল্পের রীতিমত একজন কিংবদন্তি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। যেমন গল্পে রয়েছে হাস্যরস, তেমনি জাদুবাস্তবতা, কয়েক জায়গায় হাহাকার, টানাপোড়ন, সেইসাথে সমকালীন রাজনীতি। নিজের শক্ত লেখনশৈলী দিয়ে আটকে রেখেছেন রীতিমত। তাড়াহুড়ো করলে রস আস্বাদন করা যায় না গল্পগুলোর। রয়ে-সহে করতে হয়।
আমি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্য যেমন অত্যন্ত ভক্তি করি, তেমনি পড়তে প্রচন্ড ভয় পাই! বাংলা সাহিত্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অনেক শক্তিমান একজন লেখক। 'অন্য ঘরে অন্য স্বর' গল্পগ্রন্থ দিয়েই বোধহয় ওনার সাহিত্য জগতে প্রবেশ। এখানে মোট ৬টি গল্প রয়েছে। এই গল্পগুলো ১৯৬৫-১৯৭৫ সালের মাঝে লেখা। নিরুদ্দেশ যাত্রা, উৎসব, প্রতিশোধ, যোগাযোগ, ফেরারী, অন্য ঘরে অন্য স্বর। এই ছ'টি গল্প পাবেন এই বইতে। গল্পগুলোর বিষয়ে দেখা যায়... ভয়াবহ অতল নিঃসঙ্গতা, অভিজাত - সাধারণ মানুষের রুচিগত পার্থক্য, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী মানুষের মন মানসিকতা কিংবা দ্বন্দ, মা-সন্তানের সম্পর্কের গভীর গহিন মায়া, মৃত্যুপথযাত্রীর গল্প, দেশভাগের পর নষ্টালজিয়া ইত্যাদি বিচিত্রসব বিষয়। যার ব্যতিক্রমতা চোখে পড়তে বাধ্য।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বর্ণনা এত বাস্তব, এত রূঢ় সত্য উনি অকপটে তুলে ধরেন রাখঢাক ছাড়া, বিস্মিত না হয়ে উপায় কি? আমি মনে করিনা ওনার সাহিত্য সমালোচনা করবার মতো জ্ঞান গড়িমা আমি অর্জন করতে পেরেছি। তবে আমি একটা ব্যাপার বুঝেছি, আপনি যদি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়তে চান, আপনাকে সময় নিয়ে ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে পড়তে হবে। মাত্র ১০০পৃষ্ঠার বই দেখে আমি ভাবলাম এক বসায় শেষ করা আর এমন কি ব্যাপার! কিন্তু এটাই আমার ভুল ছিলো। প্রথম গল্পটা আমার দুইবার পড়ে বোঝা লেগেছে। আপনার লাগাম টেনে ধরবেই ওনার শব্দগুলো। ভেবে বুঝে আপনার পাঠোদ্ধার করতে হবে। ষাট সত্তরের দশকে এমন লেখা, পড়লে মনে হয় এই যুগের কথাই বলছেন তিনি।
প্রথম দুই একটা গল্প মাথার উপর দিয়ে গেছে। তবে “যোগাযোগ" গল্পে মায়ের চিরায়ত রূপ দেখিয়েছেন। "প্রতিশোধ" গল্পে একেছেন মনস্তাত্ত্বিক এক চরিত্র আর প্রতিশোধপরায়ণতার ছবি। গল্প পড়ত পড়তে একটা জিনিস লক্ষ করেছি, পুরান ঢাকার প্রতি বিশেষ স্মৃতিকাতরতা আর ভালবাসা ঘুরে ফিরে বারবার এসেছে তার লেখায়। হ্যাপি রিডিং 💙
বইয়ের প্রথম গল্পের প্রথম লাইটা এমন– 'এই মনোরম মনোটনাস শহরে অনেকদিন পর আজ বৃষ্টি হলো।' সুন্দর না?
আক্তারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রতি আমার একধরনের কগনিটিভ বায়াস কাজ করে। মানে আমি পড়ার আগেই জানি, ইলিয়াস উচ্চমার্গীয় লেখক; পড়তে ভালো না লাগলে সমস্যা আমার পাঠে বা চিন্তায়। তাঁর লেখা ছোঁয়ার, বোঝার, উপলব্ধি করার সামর্থ্য সবার নাই, গভীরতা থাকতে হবে মননে। নিজেকে পাঠক হিসেবে অগভীর ভাবতে পারি না বলে ইলিয়াসকে বোঝার চেষ্টা করি প্রাণপণ।
এই বইয়ের সবগুলো গল্পই অনন্য, অনবদ্য। জীবনকে নিংড়ে দেখিয়েছেন ইলিয়াস, মানুষের মনস্তত্ত্বের ভেতরে গিয়ে বুঝিয়েছেন- পৃথিবী এমনই; খুব জটিল। প্রতিটা গল্পে একইসাথে জাদুবস্তবতা, পরবাস্তবতা এবং বাস্তবতার অদ্ভুত কম্বিনেশন! আমার প্রিয় দুটো গল্প- নিরুদ্দেশ যাত্রা আর প্রতিশোধ।
এই লোকের উপন্যাস পড়ার সময় একটু আধটু সন্দেহ হয়েছিলো যে ছোট গল্প গুলো না জানি কেমন আধ-পাগলা হবে সুতরাং ঠিক করি দুম করে ছোট গল্প গুলো পড়া যাবে না। অপেক্ষা করতে হবে। বেশ আয়োজন করে জীবনের সবচাইতে বিরক্তিকর সময়টাতে ছোট গল্প গুলা একে একে ধরতে হবে। এক বসায়। একবারে।যাবতীয় শারীরিক ও মানসিক বিরক্তি ভুলে জীবনের কালো, সাদা আর ফ্যাসফ্যাসে দিক গুলোর ড্যাং ড্যাং নৃত্য উপভোগ করার জন্য আখতারুজ্জামানের আড্ডায় বসা খুবই বিচক্ষণ একটা সিদ্ধান্ত। গত কয়েকদিনের আবহাওয়া ও তার উষ্ণতায় বস্ত্রে অঙ্গ রাখা দায়। একটু পর পর মনে হয় আহারে মানুষ হয়ে না জন্মায়ে যদি বাটার জুতা কিংবা আড়ং এর পাঞ্জাবি হয়ে জন্মাইতাম গরমে এত কষ্ট পেতে হতো না। সেদিন আর এই কুসুম কুসুম গরম সহ্য হলো না। ভর দুপুর বেলা চরম বিতৃষ্ণায় ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে চাবাইতে চাবাইতে ছাদে গিয়া সূর্যকে কতক্ষণ গালাগালি করলাম।এরপর একটা ভেজা গামছা শরীরে পেঁচ্যায়া, পানির ট্যাংকিতে হেলান দিয়া ইলিয়াস সাহেবের উপর আমি নির্মম আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ি। নিরুদ্দেশ যাত্রা - একটু ব্যাতিক্রমধর্মী , রঞ্জু নামের ছেলেটা বাসা থেকে এক রাতে বেড়িয়ে পড়লো। তার বাবা মা তাকে বলেছিলো ঘুমাতে কিন্তু ওরকম বাদলা রাতে তার ঘুম আসছিলো না। ঘুম না আসলে শুয়ে থাকে নির্বোধ রা । রঞ্জু নির্বোধ নয়। উৎসব- আমরা ছোট বেলায় নাটক সিনেমা দেখে জীবন কে বড় জাঁকজমকপূর্ণ ভাবতে শুরু করি । বড় হবো, স্মার্ট হবো, গাড়ি হবে ,বাড়ি হবে। এক পর্যায়ে কোন সুন্দরী নারী জীবনের বাগিচায় বুলবুলি হয়ে কিচিরমিচির করতে করতে ঘুরে বেড়াবে। এইসব রয়্যাল এবং কোয়ালিটি সম্পন্ন চিন্তা ভাবনায় থরের হাতুড়ির মতো আঘাত আনে উৎসব গল্পটি। এক অতি নিম্ন মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক একদিন সন্ধ্যাবেলা তার বড়লোক বন্ধুর বাড়িতে জন্মদিনের দাওয়াতে গিয়ে নিজের মনোজগৎ কে অন্যভাবে আবিষ্কার করে।রাতে স্ত্রীর পাশে শুয়ে তার ভয় হয় তার স্ত্রী হয়তো তার সুন্দর সন্ধ্যাটা নষ্ট করে দিবে। একই সাথে আতঙ্কজনক এবং পছন্দজনক একটি গল্প। প্রতিশোধ – ফাদার সিরিয়াস কাম শার্প । পিতার অসুস্থতার কারনে ওসমানের তড়িঘড়ি করে ছুটি নিয়ে বাড়ি আসা। বাবা যদি এইবার মারা না যায় তাহলে তার ছুটি গুলো একদম নষ্ট হবে। বাড়িতে এসে জানতে পারে তার বোনের জামাই আবার বিয়ে করছে । ওসমান কে ছুটি বরবাদের চিন্তা আর ভগ্নিপতির বিয়ের খবর বড় দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয় । যোগাযোগ – এই গল্পটিও সুন্দর । এক নারী তার সন্তান কে বাড়িতে তার বাবার কাছে রেখে কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে যায়। এর মধ্যেই তার শিশুটি একটি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় । যোগাযোগ আসলে একজন অসুস্থ সন্তান আর তার মায়ের অদৃশ্য কথোপকথন এর গল্প। ফেরারী - হানিফ বাসায় এসে দেখে তার বাবা অসুখের ঘোরে প্রলাপ বকছে। তার বড় ভাই হান্নান একজন বড় ডাক্তার ধরে নিয়ে এসেছে যেই ডাক্তার একটু পর পর বলছে ঘরটা অনেক ড্যাম্প।হানিফের বাবা ড্যাম্প মূলক কথাবার্তা উড়িয়ে নিজের খেয়ালে চিল্লাচিল্লি করে। বাবাকে এরকম অবস্থায় দেখে হানিফ কল্পনা করতে চেষ্টা করে তার বয়সে বাবা আসলে কেমন ছিলো। অন্য ঘরে অন্য স্বর - আর লেখতে চাই নে। ছোট গল্পের রিভিউ লিখে পর্যাপ্ত মজা নাই যেমন উপন্যাসের রিভিউ লিখে পাওয়া যায়। আর গল্প গুলো যাতে একেবারে ভুলে না যাই এ জন্যই মূলত রিভিউ লেখা নাইলে এতো ডিটেইলে জীবনেও লেখতাম না । এটা মনে না থাকলেও চলবে।তেমন কিছু না; যুদ্ধের সময় বাড়িঘর ফেলে ভারতে পালিয়ে যায় সমরজিতের একান্নবর্তী পরিবার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে এসে তার নিজের বাড়িতে উঠার পর দেখা গেল ‘’সদ্য মোচা আসা কিছু পলিটিক্যাল কলাগাছের’’ নজরে তার বাড়িটা পড়ে গেছে। খুব আহামরি কিছু না। তখনকার সময় যারা জীবন বাঁচাতে ইন্ডিয়া গেছিলেন তারা কমবেশি সবাই এই ঝামেলার সম্মুখীন হয়েছেন।সেভেন্টি টুর দিকে ভারত পালানো লোকদের সম্পদ ও সম্পত্তি গনিমতের মাল (কখনো কখনো বাপের প্রপার্টি) মনে করে গিলে ফেলার যে প্রবণতা রাজনৈতিক কলাগাছদের মধ্যে দেখা যেত সেটা অত্যন্ত এডোরেবল এবং কিউট ছিলো। অন্তত এখন তো তাই মনে হয়। ইলিয়াস সাহেব খুবই চামার কিসিমের লেখক।একটা গল্পতেও মায়া মহব্বতের বালাই নাই। তার কাগজ টা যেন সমাজ আর কলম হলো খেজুরের কাঁটা। সমাজের যে জায়গা গুলোতে ঘা থাকে সেই ঘা গুলো খেজুরের কাঁটা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তার উপর সযত্নে বিট লবন আর গুড়া মরিচ ছিটিয়ে সমাজের পরিত্রাহি চিৎকার উপভোগ করেন। আমরা নিচু জাতের পাঠক রা সেটাকে গল্প বলি, উপন্যাস বলি । শেষতক মাথার ঘাম বই এ ফেলে শেষ করলাম। এতক্ষন কিছুই টের পাই নাই। পানির ট্যাংকির ভিতরে রোদের তাপে মনে হয় পানি ফুটতে শুরু করছে। সঙ্গে চা পাতা আর চিনি থাকলে ট্যাংকির ভেতর থেকে পানি নিয়ে চা বানায়া খাওয়া যেত। গামছা শুকায়া কাঠ। গলা শুকায়া মাঠ। ভেতর থেকে বলছে হৃদয়, এবার উঠা যাক। তাছাড়া লেখবো না লেখবো না করেও কতশত লেখে ফেললাম দেখো! সরি। আই রিপিট ছোট গল্পের রিভিউ লিখে মজা নাই। অপ্রাসঙ্গিক দ্রষ্টব্য - অন্য ঘর অন্য স্বর গল্পের যে রিভিউটা লেখা হয়েছে সেটা আসলে ঐ গল্পের না (তো?)। প্রচন্ড গরমে গল্পের বিষয়বস্তু আউলায় ফেলেছি নাকি ইচ্ছা করেই ঘর আর স্বর অন্য দেখে রিভিউ ও অন্য গল্পের দিয়েছি সে প্রশ্নের জবাব অপ্রাসঙ্গিক, তাই আর দিলুম না।
বাংলা সাহিত্য জগতে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একজনই। তাঁর লেখা দিয়ে তিনি স্বমহিমায় উজ্জ্বল। " অন্য ঘরে অন্য স্বর" একটা গল্প গ্রন্থ। এ বইয়ে মোট ৬ টি গল্প রয়েছে। * নিরুদ্দেশ যাত্রা * উৎসব * প্রতিশোধ * যোগাযোগ * ফেরারী * অন্য ঘরে অন্য স্বর
৬ টি গল্প বৈশিষ্ট ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে আলাদা। বিষয় ভিত্তিক কোন লেখা না তবে মানুষের বিচিত্র জীবন, অনুভূতি ও দৈনন্দিন টানাপোড়েন গল্পগুলোর বিষয়বস্তু। তাছাড়া নিঃসঙ্গতা, জীবন বাস্তবতার অতল ভাবনা, সংকীর্ণমানসিকতা, মা -সন্তানের সম্পর্ক, ধনী-দরিদ্র বিভেদ, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের জীবনযাপন ও নষ্টালজিয়া গল্পগুলোর মধ্যে স্পষ্ট হয়ে আছে।
যারা লেখকের লেখা পড়েছেন তারা বুঝবেন গালি লেখকের লেখার অন্য একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে পড়তে গিয়ে খারাপ লাগলেও মনে হয় ঐখানে ঐ গালির ব্যবহার না করলে লেখাটা পুরোপুরি হতো না। বইটা ছোট তবে এক বসায় পড়ে শেষ না করাটাই ভালো। গল্প গুলো সহজ নয়। গল্পের গভীরে প্রবেশ করতে না পারলে বড়ই খটমটে লাগবে। অসাধারণ এক লেখকের অসাধারণ সব বইয়ের মধ্যে এটাও অসাধারণ।
এই বই সম্পর্কে অনেকের অনেক ভালো ভালো লেখা পাবেন আমি আর তেমন কিছু বোলব না।তবে বইটা পড়ে আমি মোটামুটি শিহরিত।ছাপার অক্ষরে যে এইসব লেখা সম্ভব আমার জানা ছিল না। ইলিয়াস সাহেবের পড়া প্রথম বই।উৎসব গল্প টি প্রিয় গল্পের তালিকায় থাকবে।
ছয়টি ছোটো গল্পের সংকলন নিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অন্য ঘরে অন্য স্বর বইটি। বৈচিত্রময় শব্দ গাঁথুনির ভিন্ন স্বাদের গল্পগুলোয় কখনো পাওয়া যায় জীবনের হাহাকার – টানাপোড়েন, কখনো বা জাদুবাস্তবতা, কখনো বা তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক অবস্থার চাপে পিষ্ট অবস্থার আখ্যান। ষাট – সত্তর দশকের দিকে লেখা গল্পগুলোতে লেখক তার নিজস্ব পর্যবেক্ষণের সাথে বাস্তবিক কল্পনার মিশেলে শব্দের মায়া জাল বুনে প্রতিটি গল্পকে নিয়ে গিয়েছেন অন্য অভূতপূর্ব এক পর্যায়ে।
নিরুদ্দেশ যাত্রা গল্পে লেখক বলেছেন এক নিঃসঙ্গ যুবকের কথা যে নিজেকে খুঁজে ফিরতে চায় প্রতি পদক্ষেপে। গল্পের রঞ্জু চরিত্রের মাধ্যমে লেখক বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন মানুষের নিজ সত্তার খোঁজ করতে গিয়ে মন অন্দরের হারিয়ে যাওয়ার হাহাকার কতটা তীব্র হতে পারে।
উৎসব গল্পে হাস্যরসের মাধ্যমে প্যারালাল ভাবে দুই শ্রেণীর মানুষের উৎসব পালনের বিষয়াদি সূক্ষ্ম চিন্তা ধারার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে; দেখানো হয়েছে জীবন বাস্তবতার অতল ভাবনা। এই গল্পের চরিত্রগুলোর চিত্রায়নের রহস্যময়তা জড়িয়ে ধরবে একদম শীতের রোদ ভাঙা লেপের মতো।
মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রতিশোধপরায়ণতা আর হিংসাত্বক কুটিলতায় মেশানো কাহিনীর এক অসাধারণ ব্লেন্ডিং পেয়েছি প্রতিশোধ গল্পে। লেখক চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন জীবনটা এমনই কঠিন এবং জটিল; বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে সমাজের কিছু তথাকথিত মানুষের সংকীর্ণ মানসিকতা।
এদিকে যোগাযোগ গল্পে আমরা দেখি এক মায়ের সন্তানের জন্য আহাজারি-বিলাপ। মাতৃত্বের আদরের আবেশ ছিলো পুরোটা গল্প জুড়ে; ছিলো মাতৃত্বের চিরায়ত রূপ। জমাট বাঁধা অন্তরে হাঁসফাঁস ওঠা অবস্থার সৃষ্টি হয় একদম গল্পের শেষের দিকে এসে। গল্পের পরিমিতি বোধের মাঝেও দার্শনিকতা ছুঁয়ে দিয়ে গল্পকে মাতৃত্বের এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য দিয়েছে।
পরবাস্তবতা আর জাদু বাস্তবতার মিশেলে ফেরারী গল্পখানা। গল্পের শেষটা অসমাপ্ত এবং খাপছাড়া ঠেকলেও এর ম্যাসেজ উপলব্ধি করতে পারলে অন্য রকম এক আত্মলব্ধি জাঁকিয়ে ধরবে পাঠককে। বিবর্তনের ধারার মতো প্রতি পরতে পরতে মায়া বিছিয়ে দিবে।
অন্য ঘরে অন্য স্বর গল্পে পাই শেকড়ের টানের মোহনীয়তা যেখানের প্লটে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের কথা। নস্টালজিয়ার জ্বরে ভোগা এক হিন্দু পরিবারের কথা। পরিবারের চোখ দিয়েই দেখতে পাই পুরো দেশের মাঝে বহমান অশান্তির প্রতিচ্ছবি।
ছয়টি গল্পেরই শক্তিশালী লেখনশৈলী পাঠককে আটকে রাখবেই পাতার পর পাতা জুড়ে। তবে সুন্দর সব গল্পের ভেতরের রস আস্বাদন করতে রয়ে-সয়ে-আস্তে-ধীরে পড়তে হবে গল্পগুলো। গল্পের গভীরতা উপলব্ধি করতে ডুবে যেতে হবে প্রতিটি গল্পের গভীরে। তবেই উপলব্ধি করা যাবে ইলিয়াসের প্রতিটি গল্পই জীবনেরই খণ্ডাংশ; শুধু ভিন্ন ভিন্ন বোতলে ভিন্ন ভিন্ন রূপে হাজির করছেন পাতার পর পাতা জুড়ে।
বইঃ অন্য ঘরে অন্য স্বর লেখকঃ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রকাশনীঃ দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড প্রচ্ছদঃ সমর মজুমদার পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১০৫
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এর কাছে Quality ছিল Quantity এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এইজন্য লিখেছেন কম ও যা লিখেছেন তা কাঁটাছেড়া করেছেন অনেক বেশি। এইজন্য এই লেখাগুলো কাঁচা কাজ মনে হয় না।
শক্তিশালী গদ্য, বৈচিত্র্যময় গল্প, সুন্দর গাঁথুনি এই গল্পসংকলনটিকে সুপাঠ্য করে তুলেছে।
বইটা হাতে নিলেই শিহরিত হয়ে যাই । এই শিহরিত হওয়ার ব্যাপারটা যতটা রোমান্টিক এবং প্রিভিলেজড এই বই এবং লেখক ঠিক তার বিপরীত মার্গের । এই বইয়েই অভিষেক হয়েছিল ইলিয়াসের, বাংলাদেশের-বাংলা সাহিত্যের এক কিংবদন্তির । আপাদমস্তক এমন শ্রেণীসংঘাত সচেতন লেখক আর দুটি চোখে পড়ে না । সমষ্টির মাঝে ইলিয়াস আবিষ্কার করেন ব্যক্তিকে আর এই ব্যক্তির অভিজ্ঞতায় উন্মোচন করেন তার চারপাশের জগত-সমাজ-সমকাল-রাজনীতির এক বহুমাত্রিক বিচিত্র চিত্রায়ন । পদে পদে বোঝা যায় তিনি মধ্যবিত্তকে ঠিক পছন্দ করেন না । আর এই মধ্যবিত্ত যে আসলে এক ধরণের মানসিক অবস্থা তা ইলিয়াসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব গল্পে মিলে মিশে হাহাকার করে আছে । তবে মনে হতে হতে পারে যে ইলিয়াস বুঝি বাইরের জগতকে নিয়ে মেতে আছেন, ব্যক্তির চেতনায় যে জগতের ইমপ্রিন্ট তৈরি হয় তার ব্যপারে আগ্রহ নেই । কথাটা ঘুণাক্ষরেরও সত্যি নয় । ইলিয়াস যতটা বাইরের জগতের ব্যাপারে কৌতূহলী, মানুষের মানসের অন্দরমহল নিয়ে ঠিক ততটাই জটিল এবং প্রহেলিকাময় স্বভাবতই । কারণ মানব মানস আর যাই হোক সহজ কথা নয় । বাইরের বস্তু জগত-সমাজ-রাজনীতি-ঘাত-প্রতিঘাত-ঘটনা-দুর্ঘটনা মানুষের চেতনায় যে কত দুর্বোধ-জটিল এক কষাঘাতে তার ছাপ ফেলে তাই তো হাজির হয়েছে বিচিত্র-জটিল-বদমেজাজি সব গল্পে ।
ইলিয়াস সাহেবের উপন্যাস আগে পড়া হলেও ছোটগল্প পড়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথমবার হলো। ৬টি গল্পের সবকটিই কমবেশি ভালো লেগেছে। এরমধ্যে দু'টি গল্প খুবই প্রিয় হয়ে থাকবে। সবমিলিয়ে অভিজ্ঞতা সুখকর-ই ছিলো বলা যায়।
বাংলা সাহিত্যের অনন্য এক গল্পকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। মোট ছয়টি গল্প নিয়ে অন্য ঘরে অন্য স্বর রচিত। নিরুদ্দেশের যাত্রায় যুবকের জীবনকে ভিন্ন আঙ্গিকে নিয়ে যাবার লক্ষ্য নিজেকে উন্মোচন করতে শেখায়। উৎসব গল্পে আমরা জীবনের অপূর্ণ স্বাদের পাশে অপ্রাপ্তির এক ঘেয়ামির একটি চিত্র দেখতে পাই যেখানে আনোয়ার আলী হীনমন্যতা নিয়েই কাটিয়ে দিচ্ছেন সমগ্র জীবন। যোগাযোগ কিংবা ফেরারী গল্পে গ্রাম্য এবং শহুরে জীবনের গল্প দেখতে পাই। ইলিয়াস যখন ঢাকার ঘুপচি গলির বর্ণনা শুরু করেন তখন সমগ্র পুরনো ঢাকাই চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আর এখানেই ইলিয়াসের দক্ষতা সবচেয়ে বেশি। পুরনো ঢাকার গলিতে কী ঘটছে তা জীবন্ত হয়ে ওঠে চোখের সামনে।
প্রতিশোধ গল্পে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দেশের যুবক এবং বামপন্থী রাজনীতির সাথে প্রতারণা করা লোকের সাথে আমাদের পরিচয় হয়। "আনিস একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। ওকে আবুল হাশেমের ওপর ক্ষেপিয়ে তোলাটা কি উচিত হবে? এর ফলাফল কি খুব মারাত্মক হতে পারে না?" ওসমানের এই উক্তি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের চরিত্র বুঝতে আমাদের সহায়তা করে।
নাম গল্পে আমরা এক হিন্দু পরিবারের আক্ষেপের গল্প দেখতে পাই যেখানে পাকিস্তান কি বাংলাদেশ কোথাও শান্তি মেলেনি সে পরিবারের। সেই সাথে দেশভাবগের আক্ষেপের কিছুটা চোখে পড়ে পিসিমার চরিত্রে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লিখেনী সম্পর্কে সমালোচনা করার সাহস, সামর্থ্য কিছুই নেই। তবুও মাঝে মাঝে মনে হয়, আরেকটু সহজ করে হয়তো লেখা যেত। বাংলার মানুষ এখনও ইলিয়াসকে বুঝার যোগ্য হয়েছে বলে মনে হয় না।
ভদ্রলোকের লিখা পড়ে যারপরনাই হতবাক,বাকরুদ্ধ। প্রতিটি চরিত্র যেন চোখের সম্মুখে দেখতে পাচ্ছি। প্রতিটি গল্পের বর্ণনা শৈলি এত জীবন্ত মনে হয়েছে যেন তাদের চোখের সামনেই ঘুরতে দেখছি। তাছাড়া ভাষায় এমন মুগ্ধ হয়েছি আর বলার নয়। গল্পের রুপ যে জীবনেরই খন্ডাংশ উনার বই না পড়লে পূর্ণ ঠাহর হতো না। এর চেয়ে বেশি বলার কি থাকতে পারে।
The book awfully beautiful. I'm so fascinated.
This entire review has been hidden because of spoilers.
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখার সাথে প্রথম পরিচয়। লেখার সম্পূর্ণ নতুন ভঙ্গিমার জন্য হয়তো সব গল্পগুলোর সাথে অন্তরঙ্গভাবে নিজেকে কানেক্ট করতে পারেনি। ধীরে ধীরে হয়তো অন্য লেখার সাথে মানিয়ে নিতে পারবো।
গল্প পড়তে পড়তে বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো মুচড়ে যায় কাগজের নৌকায়। ভাসতে শুরু করে অক্ষরের নদীতে। সে কি ঢেউ! ঢেউ থেকে কি একটু নোনা ঘ্রাণ আসে? যেমন আসে মায়ের হাতের পিঠার সাথে? কে জানে!
৬টা ছোটগল্প নিয়ে এই বইটা। নিরুদ্দেশ যাত্রা, উৎসব, প্রতিশোধ, যোগাযোগ, ফেরারী আর অন্য ঘরে অন্য স্বর।
ইলিয়াস সাহেবকে আমি ভয় পাই। কারণ মূলত দু'টো। প্রথমটা হচ্ছে, জমাট বাঁধা লেখা। হাঁসফাঁস লাগে পড়তে যেয়ে। দ্বিতীয়টা কারণটা নতুন, এই বই পড়ে সৃষ্টি হলো। ভদ্রলোক যা বুঝাতে চাচ্ছেন, ঠিক বুঝতে পারছি তো? গল্পগুলো রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের সংজ্ঞাকে একটু বেশিই বোধহয় ধারণ করে। শেষ লাইন পড়ে মনে হয়, "লেখক যা কইতে চাইলেন, সব কইলেন তো?" 'অপঘাত' পড়ে লেখকের ডিটেইলিং এর প্রতি যে ধারণা জন্মেছিল সেটা এখনও বিদ্যমান। এক লোক হন্যে হয়ে হাঁটে আর দাঁড়ি-কমাসহ এক হালি দোকানের নাম-ধাম-ঠিকানা পড়ে! "দুই চোখ খুব টান টান করে খুলে সোজা হয়ে বসলে তন্দ্রার সঙ্গে ৩ বছর আগের মৃত মা-ও জানালা দিয়ে বাইরে গড়িয়ে পড়ে।" -এর মতো লাইন লিখতে না পারার আক্ষেপও জন্ম দেয় গল্পগুলো। আর বাংলার সাথে সাধারণ-অসাধারণ ইংরেজি মিশিয়ে এভাবে লেখা যায় তা আবারও চাক্ষুস করলাম। ছয়টা গল্প পড়তে তিন-চার মাস লাগল। আস্তে ধীরে আলাপ বাড়ছে, বাড়ুক। সব ছোটগল্প শেষ করার আগে বোধহয় উপন্যাস দুইটা ধরার সাহস হবে না।
পছন্দানুসারে গল্পক্রম: যোগাযোগ উৎসব নিরুদ্দেশ যাত্রা ফেরারী প্রতিশোধ অন্য ঘরে অন্য স্বর
এই বইয়ের গল্পগুলো নিয়ে একবার লিখেছিলাম। সেই ভালোলাগা এখনও রয়ে গেছে শীতশেষের সন্ধেবেলার আনাচে কানাচে। গল্পগুলোর ন্যারেটিভ কাঠামোর স্পষ্টতা প্রায় নেই বললেই চলে। প্রায় প্রতিটি গল্পের সমাপ্তি খাপছাড়া। আশ্চর্য বিষয় হলো, এই দুটো বিষয়ই এমনিতে আমি অপছন্দ করি। গল্পে একটা স্পষ্ট প্লট এবং বোধগম্য সমাপ্তি না-থাকলে আমার অস্বস্তি হয়। তবু এই গল্পগুলো ভালো লাগলো ক্যানো?
আমি জানিনা ক্যানো। ইলিয়াসের ভবিষ্যৎ গল্পগুলোর উজ্জ্বলতার ইঙ্গিত আমাকে তাড়া করেছিল হয়তো। গদ্যভাষা আবিষ্ট করেছিল হয়তো। কিংবা চরিত্রায়নের রহস্যময়তা? সামাজিক পরিস্থিতির বেআব্রু বিনির্মাণ? ইলিয়াসের বাকি ছোটগল্পগুলো খুব শিগগির পড়তে চলেছি। তাঁর ছোটগল্পের সামগ্রিক বিবর্তনটা ভালো করে বুঝে নিতে চাই। তারপর কোনো একসময় হয়তো আলোকিত হবে এই বইয়ের গল্পগুলো ভালোলাগার কারণটা, বা কারণগুলো। দেখা যাক।
প্রত্যেকটা গল্পই একাধিক বার পড়েও মনে হয় ইলিয়াসের গল্প বা গল্প নিয়ে বলার আগে আরেকটু ভেবে বলতে হবে। পুরো বইটা যেন একটা ভাষার যাদুঘর। যেখানে ঢুকে পড়লে পাঠক দেখতে দেখতে এগিয়ে যায়। চিন্তা, নিজের সাথে কথা বা কোন বাস্তব গল্পের ছায়ায় কাল্পনিক গল্প বানিয়ে নেয়া, উত্তম বা নাম পুরুষ নিয়ে বাহুল্যহীন, সাবলীল ভাষা, প্লটের, দার্শনিক কথনের উপযোগীতা ও পরিমিতিবোধ, অর্থাৎ একটা সম্পূর্ণ গল্পকে উপন্যাসের মত গভীর বা অনুভব করার মত গল্প ও ভাষা ইলিয়াসের মত বিরল । ইলিয়াসের অনন্যতা আজ আলোচিত। আরো বহুল আলোচিত হওয়া উচিৎ। ইলিয়াসের ছোটগল্পকে বাংলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প বলা মোটেও বাড়াবাড়ি হবে না।
সুখ ও উত্তেজনায় আনোয়ার আলির উত্তপ্ত কণ্ঠ থেকে মুখ থেকে আঠালো ধ্বনি চুয়ে পড়ে।
এরকম ছবিগুলোও শব্দে লেখা যায়!!! গল্পগুলো পড়তে হয় না গল্পগুলোর ভেতর নিয়ে হেঁটে চলে যেতে হয়। রাস্তা চলতেই থাকে, একটার পর একটা ঘিঞ্জী গলি, বস্তির ন্যাংটো বাচ্চাগুলো ডাস্টবিনের পাশে বসে সীসার চামচ দিয়ে আটাগোলা তুলে তুলে খাচ্ছে, কোন এককোণে দুটো কুকুর নির্লজ্জভাবে সঙ্গম করছে, গলির মুখে হিন্দি গান চলে, জলভরা তালশাঁসে জল ফুরিয়ে আসে। শরীর নেতিয়ে পরে থাকে।
ইলিয়াস অন্য ঘরে দাঁড়িয়ে নানা স্বরে হাতছানি দিয়ে ডাকে, ডাকতেই থাকে, ডাকতেই থাকে... অনন্তকাল ধরে।