দে'জের এই এক্সারসাইজ কপি সাইজের বইটি বইপাড়ায় বেজায় বিখ্যাত। আমার সেই এইটুকুন বয়স থেকেই বেগুনি-সবুজ কভারে মেজকর্তার ঘোড়েল চেহারাটা দেখে আসছি বিস্তর। ইন্টারনেটে বই পাইরেট করতে বসে এই বইটির (মুস্তাফা সিরাজের 'ভৌতিক গল্পসমগ্র'-এর ঠিক পাশে) দেখা না পাওয়াটা, ছিল, এক কথায় অসম্ভব ব্যাপার। তাই ভাবতেই কৌতুক হচ্ছে যে এ জিনিস পড়ে ওঠা দুরস্ত, স্রেফ সংগ্রহে আনতেই লেগে গেলো এত কটা বছর!
দুশো পাতার বইটি, দুটি ভাগে বিভক্ত। সব মিলিয়ে উনিশটি গল্প। প্রথম ন'টির নায়ক, মেজকর্তা। আমাদের আজব গোস্ট হান্টার! ভূত শিকারের নেশায় মত্ত হয়ে, একের পর এক আজগুবি অভিজ্ঞতা, একটি প্রামাণ্য খেরোর খাতায় নথিবদ্ধ করে রাখেন তিনি। সেই খাতাটি বেওয়ারিশ অবস্থায় কথকের হাতে এসে পৌঁছলে, সেখান থেকে টুকরো ঘটনা জোড়াতালি দিয়ে পাঠকের দরবারে তুলে দেন লেখক।
একেবারেই হালকা ধাঁচের হলেও লেখাগুলো খুব একটা মনে ধরেনি আমার। ভিত্তিস্থাপন আশাপ্রদ, তবুও কাহিনীগুলো ঠিক জমেও জমে না যেন। হরর কমেডি নিয়ে কোনো আপত্তি না থাকলেও, গল্পগুলোর আপেক্ষিক লঘুতা ও গা-ছাড়া ন্যারেটিভ আমায় সন্তুষ্ট করতে পারল না এবারে। অ্যাদ্দিনের কাঙ্খিত বই। একটু মনোক্ষুণ্ন হলাম, আরকি। আরো কটা গল্পে মেজকর্তার ব্যাকস্টোরি কি নিদেনপক্ষে ইতিহাসটুকু খতিয়ে দেখলে, মন্দ হতো না।
সে যাই হোক। কি আর করণীয়। প্রেমেন মিত্তিরের এই অদ্ভুত ভূতশিকারিটিকে আপাতত 'মিসড অপারচুনিটি' (এর বাংলা প্রতিশব্দ কি হয়, কেউ জানেন?) নামক তোরঙ্গে তুলে রেখে এগিয়ে যাই। কারণ বইটি হাতে তুলে নেওয়ার আসল কারণ বইয়ের ওই দ্বিতীয় ভাগেই বিদ্যমান! এই অংশটি, যাকে বলে, চাঁদের হাট। একের পর এক বিখ্যাত ভৌতিক গল্পের সম্ভার। 'কলকাতার গলিতে', 'হাতির দাঁতের কাজ', 'মাহুরি কুঠিতে এক রাত', 'জঙ্গল-বাড়ির বউ-রানি', 'করাল কর্কট', ইত্যাদি গল্পগুলো নতুন করে ঝালিয়ে নিতে বসে, মেজকর্তার হতাশা কাটিয়ে ওঠা যায় সহজেই।
ঠিক পুঁথিগত গ্রাম্য ভয় দেখানোয় বিশ্বাসী ছিলেন না লেখক। নিজ রচিত 'কলকাতার গলিতে' সম্পর্কে বলেছেন, "আঁদাড়ে পাঁদাড়ে শকুন-কাঁদা-শ্মশানে-মশানে-ভাগাড়ে নয়, না এই মানুষ গিজ গিজ কলকাতা শহরেই বুকের ভেতরটা হিম-করে-দেওয়া হাওয়ার ঝাপটা হঠাৎ লাগান যায় কি না তাই দেখাই ছিল আমার চেষ্টা।" স্রেফ এই চেষ্টার খাতিরেই, লেখকের জন্য ফুল-মার্কস।
তবে, মাথায় রাখা উচিত যে বইটির সব গল্পই কিশোরপাঠ্য। টেকনিক্যালি, ভৌতিক গল্পের 'সমগ্র' এই জিনিস নয়। বইটি সরাসরি সেই দাবি না জানালেও, অনেকেই বিভ্রান্ত হয় সেটা জানি। এই উনিশটি লেখার বাইরেও প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রাপ্তবয়স্ক ভয়ের কাহিনী লিখেছিলেন। মাথায় আসে, আমার ভীষণ প্রিয় একটি গল্প, 'নিশাচর'-এর নাম। এমন গল্প যে আরও কয়েকটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে নেই, সেই কথা হলফ করে বলছে কে?
তাই আশা করি এহেন গুণী মানুষটির সমস্ত অলৌকিক লেখনী সুষ্ঠু পন্থায় একত্রিত হয়ে পরিবেশিত হবে ভবিষ্যতে। তবে, ততদিন, মাত্র আড়াইশো টাকায় এমন সুমুদ্রিত ও সুসম্পাদিত বইটি লোকাল দোকানে পড়ে থাকতে দেখলে, হাতছাড়া করবেন না আবার। আর যাই হোক, বৃষ্টির বিকেলে কি গরমের ছুটিতে এসব স্মার্ট বুদ্ধিদীপ্ত চিরায়ত ক্লাসিকের জুড়ি মেলা ভার।
(৩/৫ || জুন, ২০২৪)