এই গল্পগুলোর বেশিরভাগ আমি শৈশবে পড়েছিলাম।
জীবনে কোনোদিন এমন স্টেশনে যাইনি যেখানে স্টেশনমাস্টার ছাড়া আর কেউ নেই। কোনোদিন কলকাতা শহরে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে পড়তে হয়নি (আমি যখন গিয়েছিলাম তখন ভীষণ রোদ ছিলো)। কোনোদিন আলু-ভাতে বা সর্ষে-ইলিশ আমার খাওয়া হয়নি (আলু-ভাতে খাইনি সুযোগের অভাবে, ইলিশ খাইনি মাছ পছন্দ না বলে)। যদিও এই কাজগুলো কখনও করিনি, তাও শরদিন্দুর গল্প পড়তে পড়তে চলে গিয়েছিলাম সেই স্টেশনে, চামড়ায় অনুভব করেছি বৃষ্টির স্পর্শ, চেখে দেখেছি সর্ষের ঝাঁঝালো স্বাদ।
কিন্তু নস্টালজিয়ার রঙিন চশমা খুললে, শরদিন্দু লেখক হিসেবে কেমন?
এখানে প্রেতযোনি বা বরদাকে নিয়ে যে গল্পগুলো, সেগুলোর ওপর মূলতঃ ফোকাস করবো। এই ফোকাসের কারণ দুটো: আমি হরর গল্প লিখতে আর পড়তে ভালোবাসি, এবং এই গল্পগুলো ছোটবেলায় আমি বেশ পছন্দ করতাম।
যা ভালো লেগেছে:
গল্পগুলো খুবই পরিচ্ছন্ন। প্রতিটা গল্প লেখা হয়েছে একটা নির্দিষ্ট আইডিয়াকে ঘিরে। তা হয় কোনো ভৌতিক সত্তা বা কোনো অতিপ্রাকৃত বস্তু। সেই আইডিয়া যৌক্তিকভাবে, গল্পের গ্রামার মেনে আগায়। ভৌতিক অস্তিত্বের বা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য জানানো হয়। সেই বৈশিষ্ট্যগুলো অনুযায়ী গল্প ডানে বা বাঁয়ে যায়। সবগুলো গল্পের শেষেই কোনো বাঁক বা চমক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, যেটা পুরনো জনরা গল্পের ক্ষেত্রে প্রায় বাধ্যতামূলক ছিলো।
লেখার ভঙ্গি যথেষ্টই মজার। হরর গল্পে সাধারণত একের পর এক অসম্ভব সিচুয়েশন উপস্থাপন করা হয়। তাই এ ধরনের গল্পের চরিত্রদের যদি অবাক হওয়ার ক্ষমতা বা হাস্যরস কম থাকে তাহলে পাঠকের ক্লান্তি আসার ঝুঁকি থাকে। শরদিন্দু এই ফাঁদে পা দেননি। তার চরিত্ররা অতিরিক্ত গম্ভীর নয়, আবার এতোটাও হালকা নয় যে ভূতের বিপদটা খেলো লাগবে।
গল্পের দৈর্ঘ্য একদম ঠিকঠাক। যেহেতু গ্রামার মেনে লেখা, তাই কোনোটাই অতিরিক্ত লম্বা বা সংক্ষিপ্ত মনে হয়নি। ঠিক যতোটুকুতে মজাটা ধরে রাখা সম্ভব, ততোটুকু ঘটে তারপর শেষ হয়ে গিয়েছে।
যা ভালো লাগেনি:
জনরা গল্পের বিষয়ে একদম জন্ম থেকেই আমরা পশ্চিমের কাছে দায়বদ্ধ। আমি নিজেও এই দোষমুক্ত নই। ওপরে যে কয়েকবার গ্রামারের কথা বললাম-শরদিন্দুর গল্পের এই গ্রামার পুরোটাই পাশ্চাত্যের হরর সাহিত্য থেকে ধার করা। টমাস কারনাকি সিরিজ থেকে থেকে নেওয়া হয়েছে বরদার গল্প সিরিজের ফরম্যাট। আইডিয়াগুলো ভিক্টোরিয়ান বা ফোক হরর থেকে নেওয়া। ভূত দেখতে সক্ষম চশমা বা ভৌতিক ঘটনাকে অতীতের প্রতিধ্বনি মনে করা, এগুলো সে আমলেও তেমন নতুন কিছু ছিলো না। বাংলায় এখনও হরর, থ্রিলার, কল্পবিজ্ঞানের নিজস্ব ব্যাকরণ, সম্পূর্ণ আলাদা ধরন তৈরি হয়নি। যারা এই জনরাগুলোকে আমাদের ভাষায় জনপ্রিয় করেছেন, তারা পো, ডয়েল, আজিমভকে অনেকটাই সরাসরি অনুসরণ করেছেন। আমরা অনেকেই এখনও কিং, ব্রাউন, উইয়ার বা ক্লার্ককে জনরার ঈশ্বর মনে করি, পাঠক এবং সাহিত্যিক দুই ক্যাম্পেই। তাদের স্টাইলের বাইরে লেখা বইকে ঠিক জনরা বই মনে হয় না। আশা করি ভবিষ্যতে এই ধারা বদলাবে। জাপান এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে নতুন ধারার জনরা লেখার স্টাইল যেমন উল্লেখযোগ্য।
গল্পগুলো ভূতের, তবে ভয়ের নয়। বড়জোর থ্রিলার হিসেবে ধরা যেতে পারে। এর একটা বড় কারণ এই যে শরদিন্দু খুব সম্ভবত কিশোর-কিশোরীদের মাথায় রেখে গল্পগুলো লিখেছিলেন। আবহের বর্ণনা সুন্দর, মাঝে মাঝে গা-ছমছমে। কিন্তু বিপদটা কখনোই খুব ভয়ংকর বা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হয় না।
বরদা বাদে অন্য চরিত্রদের ব্যাপারে আসলে মনে রাখার মতো কিছু নেই। সবাই কমবেশি স্টক ক্যারেক্টার, এবং এই সিরিজে অনেকগুলো গল্প থাকলেও তাদের বিষয়ে খুব বেশি আমাদের জানা হয় না।
তবে সব মিলিয়ে গল্পগুলো অবশ্যই উপভোগ্য ছিলো। যে এই গল্পগুলো ছোটবেলায় পড়েনি, কিন্তু বড় হওয়ার পর পড়েছে, এমন কোনো পাঠক বা পাঠিকার মত জানতে আমি বেশ আগ্রহী।
রেটিং আসলে হবে সাড়ে তিন তারা।