সে অনেককাল আগের কথা। তখন আমার চার বছর বয়েস। আজ আমি বুড়ো হতে চলেছি, এককুড়ি বছর বয়েস হল। মানুষদের এককুড়ি বছর বয়েস কিছই না। কিন্তু আমাদের জাতে-মানে ঘোড়াদের এককুড়ি অনেক বয়েস। (সূত্র: বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা হতে। )
Hasan Azizul Huq (Bengali: হাসান আজিজুল হক) is a Bangladeshi writer, reputed for his short stories. He was born on 2 February, 1939 in Jabgraam in Burdwan district of West Bengal, India. However, later his parents moved to Fultala, near the city of Khulna, Bangladesh. He was a professor in the department of philosophy in Rajshahi University.
Huq is well known for his experiments with the language and introducing modern idioms in his writings. His use of language and symbolism has earned him critical acclaim. His stories explore the psychological depths of human beings as well as portray the lives of the peasants of Bangladesh.
He has received most of the major literary awards of Bangladesh including the Bangla Academy Award in 1970.
অধিকাংশ "বড়দের লেখক"ই ছোটদের জন্য লেখার সময় তাদের স্বভাবসুলভ গদ্যশৈলী পরিত্যাগ করে সহজ ভাষায় বা নরম সুরে লেখার চেষ্টা করেন। এ বইতে হাসান আজিজুল হক সেরকম কোনো চেষ্টাই করেননি। "লাল ঘোড়া আমি" ছোটদের জন্য লেখা হলেও বড়দের হাসান আজিজুল হক- ই উপস্থিত। ঠিক একইরকম তীক্ষ্ণ, ঠিক একইরকম নির্দয়, ঠিক একইরকম ঋজু। লাল ঘোড়া যা দেখছে যা বুঝছে ঠিক তা-ই সে বর্ণনা করছে। লাল ঘোড়ার বয়ানে বিধৃত হয়েছে মানুষের দয়া, নিষ্ঠুরতা, হানাহানি আর ক্ষমতার দম্ভের এক ছোট্ট অথচ গা শিউরে ওঠার মতো কাহিনি। অন্য প্রাণীরা মানুষদের কোন চোখে দ্যাখে আমরা জানি না। তবে দেখলে হয়তো ঘোড়ার চোখেই দেখতো। ঘোড়া এখানে দর্পণমাত্র, গল্পটা তো মানুষের। শুধু শিশুসাহিত্য হিসেবে নয়, লেখকের বর্ণাঢ্য সব লেখার পাশেও " লাল ঘোড়া আমি" নিজ গুনে ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য।
আমার মনে হয় বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে শিশু সাহিত্য জনরা আছে একেবারে তলানিতে। এই জনরাটা যা একটু টিকে আছে তা হল আবেগের ভেলায় চড়ে, কিছু কিছু লেখকের প্রতি আমাদের অন্ধ অনুরাগের কারণে। এই অন্ধ অনুরাগে লেখকেরা প্রশ্রয় পেয়েছে শুধু আর ফ্যাক্টরির যন্ত্রের মতো বছরের বছরের বছর একই কল কব্জার বই বের করে গেছে। একটা একচেটিয়া জনরা তৈরি হয়েছে। প্রকাশকেরা কামড়ে ধরেছেন লেখকদের। লেখকরাও ফায়দা নিয়েছে। আমরা অন্ধ অনুরাগীরাই জনরাটাকে ধ্বংস করেছি। গত দশ বিশ বছরে ক্ল্যাসিক তকমা পাওয়ার মতো হাতে গোনা দুয়েকটা কিশোর উপন্যাসও বের হয়েছে কি না সন্দেহ। একটু ভালো মতো লক্ষ করলে বুঝবেন, এই জনরাটা কতটা ক্লিশেড। যেদিকে দেখবেন শুধু অ্যাডভেঞ্চার, অ্যাডভেঞ্চার আর অ্যাডভেঞ্চার। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নায়কোচিত ভঙ্গিতে ডাকাত কিডন্যাপারদের কুপোকাত করে দিচ্ছে। এই একটা লাইনই গত বিশ বছরের বাংলাদেশি কিশোর উপন্যাসগুলোর সারাংশ। অনেক গড়পড়তা ক্লিশেড কিশোর উপন্যাস তাই আমাদের নস্টালজিয়ার অংশ হয়ে গেছে। গড়পড়তা জিনিসগুলো নস্টালজিয়ার দোহাই দিয়ে নরমালাইজ করা ওভারঅল সাহিত্যের জন্য কল্যাণকর নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পড়ার মতো কিছুই থাকবে না এভাবে চলতে থাকলে। কিছু কিছু ভালো বই আছে। যেমন “লাল ঘোড়া আমি”। আমরা মাঝে মাঝে সাহিত্যের সংজ্ঞাখানা ভুলে যাই। সাহিত্য হচ্ছে দর্পণ। সাহিত্যের অন্যতম কাজ হল প্রতিফলন। লেখকের ক্ষমতা থাকে যে কোনো বিষয়ের প্রতি প্রতিফলন করে সেটা পাঠকের চোখে ফুটিয়ে তোলা। পাঠকের কাজ হল দেখা। কিন্তু শিশু সাহিত্যে এর ব্যত্যয় কেন? বাংলাদেশের কিশোর উপন্যাসগুলো কেমন ভিডিও গেমসের মতো, শিশুদের একটি নায়কের চেয়ারে বসিয়ে কাল্পনিক রোমাঞ্চের দুনিয়ায় ঠেলে দেওয়া। কাজ শেষ। এখানে শিশুদের দেখার কিছু নেই, দেখে গ্রহণ করার কিছু নেই। হ্যাঁ, কল্পনা জিনিসটা জরুরি। রহস্য, রোমাঞ্চ, ফ্যান্টাসি সবই শিশু সাহিত্যের অংশ। কিন্তু আমাদের দেশের শিশু সাহিত্যে এর সুষম বণ্টনটা নেই। সবকিছু আসলে লেখকের হাতে। লেখক সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে চান কিনা সেটা লেখকের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করছে। পারগতা অপরাগতা পরের কথা। শিশুদের মধ্যে খুঁতখুঁতেপনাটা থাকে না, আমাদের দেশের লেখকেরা এই সুযোগটা নেন, তাই এরকম বাজে অবস্থা। আসল কথায় আসি। প্রবীণ সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের লেখা একমাত্র কিশোর উপন্যাসিকা হল ‘‘লাল ঘোড়া আমি”। একটি ঘোড়ার আত্মজৈবনিক। লেখা যে অতোটা মুখরোচক তা বলব না। কিন্তু বইটাতে দেখার বিষয়বস্তু আছে। বইটা অন্য রকম, কোথাও কোথাও হিউমারাস, কোথাও কোথাও ব্রুটাল। সবচেয়ে বড় কথা বইটা খুবই সত্য । এরকম অন্য রকম কিছু বই আরও দরকার। একটা বই লিখেও স্মরণীয় হওয়া যায় এরকম মাইন্ডসেট নিয়ে যদি কিছু লেখক শিশু সাহিত্য লেখায় মনোনিবেশ করতেন তাহলে এই জনরাটার খুবই উপকার হত।
লাল ঘোড়া আমি,হাসান আজিজুল হকের একটি আত্মজীবনী মূলক কিশোর উপন্যাস। একটি ঘোড়ার আত্মজীবনী। এই উপন্যাস লাল ঘোড়ার চোখ দিয়ে তিনি পৃথিবী কে দেখেছেন। তুলে ধরেছেন মানুষের অমানুষিক কাজ কারবার। এক জায়গায় ঘোড়া বলছে " দোপায়ীদের মধ্যে সুন্দর পাখি। মানুষ আবার কবে সুন্দর ছিল"।
হাসান আজিজুল হক, আমার খুব প্রিয় লেখক। উনার সব লেখায় আমার অসাধারণ লাগে। এই উপন্যাস ও তার ব্যতিক্রম নয়।
" দুই পা-ওয়ালাদের মধ্যে একমাত্র পাখিই দেখতে সুন্দর। মানুষ আবার দেখতে সুন্দর হলো কবে? "
মানুষের বায়োগ্রাফি লেখা হয় সেটা জানা কথা কিন্তু তাই বলে ঘোড়ারও বায়োগ্রাফি! সে যে যেভাবেই নিক ব্যাপারটা তবে আমার কাছে এটা একটা ঘোড়ার বায়োগ্রাফি। যে বায়োগ্রাফির দ্বারা স্থান, কাল, মানুষ ভেদে দেখানো হয়েছে মানবসভ্যতার আসল রূপ। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, মানুষের প্রতি মানুষের নির্দয়তা, পশুর প্রতি মানুষের ভালোবাসা, পশুর প্রতি মানুষের নির্দায়তা, সমাজ, সংস্কৃতি, চরিত্র, বিচার ব্যাবস্থা সব কিছুকেই দেখানো হয়েছে একটা ঘোড়ার জীবনচক্রের মাধ্যমে।
বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব সিরিয়াস সাহিত্যিকই কমবেশি শিশু-কিশোর সাহিত্য রচনা করেছেন। হয়তো একটা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে তাঁদেরকে এই কাজটা করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে সকলে যে শতভাগ সফল হয়েছেন সে কথা বলা মুশকিল । শিশু-কিশোরদের মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের উপযোগী সাহিত্য রচনা করা চারটে খানি কাজ না। তবে যেহেতু প্রত্যেক মানুষের ভেতরে, সে যত কঠিনই হোক না কেন, একটি করে শিশু বাস করে, বাস করে বিরাট একটা শৈশব, তাকে জাগিয়ে তুলতে পারলে কাজটা বোধহয় আর ততটা কঠিন থাকে না।
বিভিন্ন পরিবেশে থাকার, বিভিন্ন পরিবেশের মানুষের সাথে মেশার সুযোগ কেবল মাত্র হয় এক সরকারী চাকুরীজীবিদের আর আরেক হয় গৃহপালিত পশু পাখিদের। এখানের লাল ঘোড়াটিরও হয়েছিলো সে সৌভাগ্য। গরীবের কুঁড়েঘর থেকে জমিদারবাড়ি পর্যন্তু পৌঁছানোর সৌভাগ্য সে অর্জন করেছিলো। আর তার মাধ্যমে যারা বইটা পড়বে তাদেরও হয়তো কিছুটা হলেও আন্দাজ হবে সামাজিক স্তরবিন্যাস সমন্ধে। এক জমিদারবাড়িতেই দেখা যায় একসাথে দুইটা চিত্র একইস্থানেই চিত্রিত করেছেন লেখক। এখানে সেই অসহায় বিদ্রোহীর কথা বলায় যায়ঃ "নরকের দখল তুমি একবার পেলে আর কি সেখানে কেউ ঢুকতে পারবে গো জমিদারবাবু?"
কেমন হতো যদি আসলেই পশুপাখি কথা বলতে পারতো? তাহলে নিশ্চয় হোমিও ডাক্তারের আষাঢ়ে গল্প ফাঁস হয়ে যেত আর সাথে মানুষের সকল কুকর্ম আর গোপন থাকতোনা। যদিও তখন মানুষ পশুপাখির সামনে কিছু বলার সাহসও রাখতোনা 😐।
হাসান আজিজুল হকের শিশু-কিশোর উপযোগী সাহিত্যের বহর খুব সীমিত। এ পর্যন্ত এ বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে যে দুটো বই আমরা পেয়েছি, তা হলো—‘লাল ঘোড়া আমি’ ও ‘ফুটবল থেকে সাবধান’। ‘লাল ঘোড়া আমি’ একটি উপন্যাসিকা বা বড়ো গল্প। অন্যটি একটি গল্পগ্রন্থ, সাতটি ক্ষীণকায় গল্প আছে এখানে। হাসানের অন্য কোনো লেখায় যে শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি ঘটেনি তা কিন্তু নয়। "লাল ঘোড়া আমি" বইটা ছোটদের জন্য যেমন পারফেক্ট তেমনি বড়দের জন্যও। কিশোর উপন্যাস হলেও ভাবার মতো অনেক উপকরণ আছে এই উপন্যাসে। যত বয়সী হোন না কেন উপভোগ করবেন এইটা নিশ্চিত।
বইঃ লাল ঘোড়া আমি লেখকঃ হাসান আজিজুল হক রেটিংঃ ★★★★★
এই উপন্যাসটি প্রথমে প্রকাশিত হয় মাসিক 'শিশু' পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যায়, ঈদ নাকি বিজয় দিবস ঠিক মনে নেই, ১৯৮৩/১৯৮৪ সালের দিকে। তখনই পড়েছিলাম। এর মনোগ্রাহী অলঙ্করণের কথা মনে আছে - সম্ভবত হাশেম খানের করা, পরে বই আকারে বের করার সময় ধ্রুব এষকে দিয়ে যে বীভৎস অলঙ্করণ করা হয়েছে সেটা নয়। এমনকি গল্পের খুঁটিনাটিও মনে আছে। এই গল্পে পড়া ভূতের চিকিৎসায় ব্যবহৃত 'কার্বো ভেজ থার্টি'র কথা বলে বায়োলজি কোচিং-এ শিক্ষককে (উনি আবার শখের হোমিও চিকিৎসক) চমকে দেবার কথা মনেও আছে।
একটা গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি অবলা প্রাণী, আর তার ভাষ্যে লেখা গোটা উপন্যাস - এটা ছিল আমার অভিজ্ঞতায় প্রথম। ঘোড়ার দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখলে মনুষ্যসমাজের স্বাভাবিক রীতি, ঘটনাগুলো কীভাবে পালটে যায় সেটা দেখে অবাক হয়েছিলাম। গৃহপালিত প্রাণীদের ক্ষেত্রে ইউটিলিটির বিচারে মানুষ তাদের সাথে যে বৈষম্যমূলক আচরণ করে সেটা একটা ছোট মজার ও করুণ ঘটনা দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। মানুষের সমাজে সামন্তবাদী শোষণ আর অত্যাচার, ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদের ফুটানি, গণবিপ্লবের সূচনা, বিপ্লবের নৃশংসতা, নিম্নবর্গের মানুষের দুর্দশা, সাহসী মানুষের এগিয়ে আসা, গ্রামীণ গুলগল্পের আসর, আকাঙ্খিত মৃত্যু - কী নেই এতে! একজন কিশোরের কাছে তো বটেই, অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা করতে অনাগ্রহী একজন বয়ষ্ক মানুষের কাছেও এই বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে যাবে।
আধো আধো বুলি, ন্যাকা ন্যাকা গল্প, ভুয়া অ্যাডভেঞ্চার দিয়ে পাতলা সাইজের অপন্যাস লিখলেই সেটা 'কিশোর উপন্যাস' হয়ে যায় না। হাসান আজিজুল হকের 'লাল ঘোড়া আমি', মাহমুদুল হকে 'কুশল আর চিক্কোর মারণ কাবুক', আল কামাল আবদুল ওহাবের 'গহন বনের পথে', সৈয়দ ইকবালের 'কুশল আর মৃত্যুবুড়ো', আলাউদ্দিন আল আজাদের 'জলহস্তি', সরদার জয়েন উদ্দিনের 'আমরা তোমাদের ভুলবো না', নাজমুল আলমের 'রক্তমণি' - এমনসব উপন্যাসগুলো পড়লে সেটা বেশ বোঝা যায়। সেই সাথে এই আফসোসটাও হয় যে এই সাহিত্যিকগণ কিশোরদের নিয়ে খুব বেশি লেখেননি।
শিশুতোষ বই বলতে একটু বাধো বাধোই লাগছে আমার - শিশুদের জন্য লেখা বই মনে হয় এতো দুঃখের হয় না।। বইটা একটা লাল রঙ্গের ঘোড়ার আত্মজীবনী। সেই সাথে প্রকৃতি আর মানুষেরই গল্প। পশুপাখিরা কী ব্যথা-বেদনা, সমবেদনা আমাদের মতো করেই অনুভব করে? বিজ্ঞানীরা তো বলে থাকেন তেমনটা তাদের হয় না। কিন্তু আমি তো ভাবি ওদের অনুভবও আমাদের মতনই তীব্র। সেটা ভেবেছেন হাসান আজিজুল হকও। ঘোড়াটা দেখতে ভীষণ সুন্দর, লাল তার রঙ, চারটে পা এমন সাদা যে যখন দৌড়ায় মনে হয় শূণ্যে উড়ে চলেছে। চার বছর বয়েসে মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায় এই লাল ঘোড়া, মনিব তাকে বিক্রী করে দেয় ছোট্ট ছেলে হাশেমের বাবার কাছে। হাশেম আর হাশেমের মায়ের আদর - ঠিক চাঁদের মতুন - এরকম আদর আর কখনও পায় না লাল ঘোড়াটা। এরপর পাত পড়ে এক অত্যাচারী জমিদারের বাড়িতে। জমিদারের বাড়িতে খেতে পায় ভালো, দলাইমলাই ও পায় কিন্তু জোটে শুধু চাবুকের বাড়ি, কখনও একটু আদরও করেন না জমিদার। আবার হোমিও ডাক্তারের বাড়িতে - ততদিনে লাল ঘোড়াটা প্রায় অক্ষম হয়ে গেছে, পায়ে বাত, বুড়োও হয়েছে - অনাদর মেলে না বটে কিন্তু এরা জানেই না ঘোড়াকে কী খেতে দিতে হয়! এভাবেই এক কুড়ি জীবনের গল্প বলে গেছে এই লাল ঘোড়াটা তার চিরতরে চোখ বোজার দিনটি পর্যন্ত।
সাহিত্যের জগতে পাঠকদের কিছু প্রিয় "pet" তৈরী হয়ে যায় না চাইতেও। আমার যেমন রয়েছে কাশতানকা, আলিসা, মুমু - এবার থেকে "লাল ঘোড়া"ও আমার প্রিয় হয়ে গেল।
শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় হাসান আজিজুল হক-এর কৃশকায় কিশোর উপন্যাস (নভেলা) ‘লাল ঘোড়া আমি’ (১৯৮৪)। এটি একটি ঘোড়ার আত্মজৈবনিক উপন্যাস। এ ধরনের বইকে ইংরেজিতে fictional pony book বলা হয়। ঘোড়াটি নিজেই বলে চলেছে তার আত্মকথা। হাসান আজিজুল হক এখানে একটি ঘোড়ার মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন, অর্থাৎ তিনি এখানে ঘোড়ার চোখ দিয়ে পৃথিবীর প্রকৃতি ও প্রাণিজগত প্রত্যক্ষ করছেন। আর প্রত্যক্ষ করছেন মানুষ। কখনো কখনো মনে হয়, তিনি ঘোড়ার মুখে ভাষা তুলে দিয়ে খানিকটা দূরে সটকে পড়েছেন, দূর থেকে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার চোখ দিয়ে দেখছেন নিজেকে বা টোটাল মানব সমাজকে। আবার কখনো কখনো মনে হয়, তিনি নিজেই ঘোড়ার দোভাষী হিসেবে কাজ করছেন, সময় ও সুযোগ পেলে টীকা বা টিপ্পনী টুকতে ভুলছেন না। ঘটনা যায় হোক, ঘটানোর কাজটা সহজ না মোটেও। বিশ্ব সাহিত্যে এ ধাঁচের বেশ কিছু রচনার সন্ধান মেলে। কানাডিয়ান লেখক সাউনডার লিখেছেন ‘সুন্দর জো : একটি কুকুরের আত্মজীবনী’ (১৯৩০)। এই উপন্যাসে একটি কুকুরছানার বেড়ে ওঠার কাহিনী ও মনিবের নিষ্ঠুর আচরনের আদ্যোপ্রান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে গল্প কথকের অবস্থানে অবতীর্ণ হয়েছে জো নামের একটি কুকুর। মিরান্ডা সোয়ান লিখেছেন ‘একটি বিড়ালের আত্মজীবনী’। তবে যে বইটির কথা এখানে বেশ গুরুত্ব সহকারে বলতে হচ্ছে সেটি হলো, আনা সুয়েল-এর লেখা একটি ঘোড়ার আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘কালো সুন্দর’ (Black Beauty, 1877; Anna Sewell, 1820-1878)। বইটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে প্রকাশের কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ কপি বিক্রি হয়ে যায়। উপন্যাসটি হাসান আজিজুল হক যে পড়েছেন সে কথা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ‘কালো সুন্দর’ উপন্যাসটির সাথে তাঁর ‘লাল ঘোড়া আমি’ উপন্যাসটির অনেক কিছুই মিলে যায়। কারণ হয়ত এটাই যে দুজনেই একটি ঘোড়ার আত্মজীবনী লিখছেন। পৃথিবীর যে প্রান্তেরই বাসিন্দা হোক না কেনো, ঘোড়াদের জীবনের যে খুব বেশি হেরফের হয়না তা আমাদের সকলেরই জানা। দুটি উপন্যাসের ঘোড়াই দেখতে বেশ পরিপাটি--একটির গায়ের গড়ন কুচকুচে কালো অন্যটির অসম্ভব লাল; তবে দুজনেরই পা সাদা এবং মাথার মাঝখানে সাদা একটি স্পট আছে। দুটি উপন্যাসই প্রথম পুরুষের বর্ণনায় লেখা অর্থ্যাৎ বর্ণনাকারী হচ্ছে উপন্যাসের প্রটাগনিস্ট ঘোড়া নিজেই। ‘কালো সুন্দর’ উপন্যাসে একটি কালো রঙের ঘোড়া হাত বদলের মাধ্যমে মানব সমাজ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে থাকে। এই জ্ঞান সবসময় সুখকর হয় না। ‘লাল ঘোড়া আমি’ উপন্যাসের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে; শুধু স্থান, কাল, পাত্র ও প্রকাশের পদ্ধতিটা ভিন্ন-- পার্থক্য এই যা। দুটি উপন্যাসের মধ্যে আরও অনেক মিল লক্ষ্য করার মতো। তবে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা শুধু হাসান আজিজুল হকের শিশু-কিশোর উপযোগী রচনাগুলোর মধ্যে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। ‘লাল ঘোড়া আমি’ উপন্যাসটির উপক্রমণিকা ঘটেছে এইভাবে: ‘সে অনেককাল আগের কথা। তখন আমার চার বছর বয়েস।’ অর্থ্যাৎ হাসান আজিজুল হক মধ্যযুগীয় ‘ফোক টেল’ বা ‘ওরাল ট্রাডিশন’কে অনুসরণ করছেন। সাধারণত শিশু কিশোরদের কোনও অবিশ্বাস্য ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য করানোর জন্যে তাকে চিলের মতোন ছোবল মেরে অন্য একটি সময়ে নিক্ষেপ করা হয়। তারপর যা বলা হয়, তা তখন তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে। আলোচ্য গল্পেও তার ব্যতিক্রম ঘটে না। গল্পের কথক একজন ঘোড়া। গল্পের শুরুতেই সে আমাদেরকে তার বাল্যকালে নিক্ষেপ করেছে। সেখান থেকে এখন আর বের হবার জো নেই। বের হতে হলে গল্পের কথকের হাত ধরেই হতে হবে। মানুষ শৈশবে স্বভাবতই খুব গল্প প্রিয় হয়। তারা চায়, নাম্বির মতো কিংবা এ্যানসিয়েন্ট ম্যারিনারের মতো কেউ একজন যাদুর জগত তৈরি করে গল্পের ফুলঝুড়ি ঝরাতে থাকুক আর তারা তা মন্ত্রমুদ্ধ হয়ে শুনতে থাকবে--এর পরে কি ঘটে, তার পরে কি ঘটে! শিশু কিশোরদের এই মনস্তত্ত্বে মনঃসংযোগ ঘটিয়েই হাসান আজিজুল হক তাঁর এই উল্লেখযোগ্য উপন্যাসটি রচনা করেছেনে যেখানে একটি ঘোড়া বলে চলে তার আত্মকথা অর্থ্যাৎ সম্পূর্ণ গল্পটা বিধৃত হয় প্রথম পুরুষের বয়ানে। আমরা জানি, কিশোররা সাধারণত ভূত-পেত্মী, দৈত্য-দানবের গল্প শুনে ভয় পেতে ভালোবাসে, দুঃসাহসিক গল্প শুনে শিউরে উঠতে পছন্দ করে, আর ভালোবাসে গল্পের অণুতে-পরমাণুতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাসির আঁচে ঝলসে যেতে। হাসান আজিজুল হক এর সবটাই জানেন, জানেন বলেই তাঁর এ গল্পে এ সব উপকরণের কম বেশি বন্দবস্তও করেন। তবে এটা আলাদা ভাবে হাসির গল্প না, ভূত-পেত্মীর গল্পও না, আবার, গায়ে কাটা দেবার মতো কোনো এডভেঞ্চার নেই এখানে, নেই কোনো দানব আর দৈত্য পুরীর গল্প। এই গল্পের প্রটাগনিস্ট হল একটা ঘোড়া, ঘোড়ায় এখানে একমাত্র কথক বা বয়ন শিল্পী। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আমরা এই গল্পে যতটা না ঘোড়াদের সম্পর্কে জানতে পারি তার থেকে ঢের বেশি জানতে পারি মানুষ সম্পর্কে। যে কথাগুলো বলা হচ্ছে সেগুলো সরাসরি বললে তো আর শিশু-কিশোররা শুনবে না, তাই হাসান আজিজুল হক একটি ফন্দি এঁটেছেন। গল্প যতো এগিয়ে যায়, বোঝা যায় কিশোররা তাঁর কৌশলে তৈরি করা ফাঁদে ফেঁসে গেছেÑ তিনি তাঁর পাঠকদের হাসাচ্ছেন, হঠাত হঠাত করে একটু ভড়কে দিচ্ছেন ঠিকই কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য অন্য কিছু। পাঠকরা কিশোর বয়সের স্বভাবজাত উচ্ছ্বাস নিয়ে গল্পটি শুরু করছে বটে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আর কিশোর থাকছে না। হাসতে হাসতে, খেলতে খেলতে একটি ঘোড়ার মুখ থেকে জেনে নিচ্ছে এই জগত সংসারের গাঢ় ও গূঢ় রহস্য। ঘোড়ার বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশু কিশোরদের চিন্তা চেতনারও ট্রানসেন্ড ঘটছে। শেষের দিকে এসে পাঠকদের নির্দিষ্ট বয়স বলে আর কিছু থাকছে না। ‘লাল ঘোড়া আমি’ উপন্যাসের ঘোড়াটি দেখতে বেশ আজব। গায়ের রঙ টকটকে লাল, কপাল আর কানদু’টো ধবধবে সাদা, হাঁটুর নিচে থেকে পা দুটোও সাদা। এটা একটা শিশু-কিশোর উপযোগী গল্পের ঘোড়া, তাই আর পাঁচটা ঘোড়া থেকে একটু আলাদা হবে সেটাই স্বাভাবিক। ঘোড়ার ভাষায়: ‘পায়ের রঙ শাদা ছিল বলে যখন দৌঁড়াতাম লোকে ভাবত আমি বুঝি শূন্যে ভেসে যাচ্ছি।’ ঘোড়াটির কথা বলার পাশাপাশি আর যে সব মানবিক গুনাবলী আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হিউমর করবার ক্ষমতা। হাসান আজিজুল হক নিজের আদলেই গড়ে তুলেছেন করেছেন ঘোড়াটিকে। কাজেই, ঘোড়াটিকে কখনও মনে হয় বড্ড রসিক আবার কখনও মনে হয় প্রচণ্ড সিরিয়াস।