কাইলা জোহানসেন। উইচ মাদারকে পৃথিবীতে আনার জন্য এমন কোন কাজ নেই যা সে করতে পারে না। রিক ওয়েনডেল। রেড ইন্ডিয়ান রক্ত বইছে তার শরীরে। মৃত্যুর ওপার থেকে তার আত্মা ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে কাক! এগহিল চার্চের ভেতরে যে খুনগুলো করা হয়েছিল, ধারণা করা হয় সেই খুনগুলোর পেছনে হাত ছিল শয়তানের। যিনি হত্যাগুলো করেছিলেন শেষপর্যন্ত বেল টাওয়ারে তিনিও ঝুলে পড়েছিলেন। না, গল্প সেই লোকের নয়। এই গল্প একজন পিতার মৃত্যুকে জয় করে ফিরে আসার, শুধুমাত্র আত্মজাকে বাঁচানোর জন্য।
❝কৃষ্ণবায়স❞ কী? রেড ইন্ডিয়ানদের একটা বিশ্বাস তো আবার মিথলজিও বলা যায়। মৃত্যুর পর আত্মাকে অন্যজগতে নিয়ে যাওয়া হয়, অন্যজগৎ থেকে আবার পার্থিব জগতেও আসতে পারে কখনও। আর এই আনা-নেওয়ার কাজটা করে ❝দ্য ক্রো❞/ ❝কৃষ্ণবায়স❞।
একমাত্র নাতনী এমিলিয়াকে নিয়ে কার্ল জোহানসেন চলে আসেন ওশান ভিউয়ে। মেয়ে ও জামাইয়ের মৃত্যুতে তারা দু'জনই এখন একজন আরেকজনের পরিবার। জীবনের শেষ কটাদিন শান্তিতে থাকতে চান কার্ল। কিন্তু কালোছায়া যে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে! এমিলিয়াকে চায় তাদের। কিন্তু কেন? মৃত্যুকে জয় করে ফিরে এসেছে ❝দ্য ক্রো❞! আলো-অন্ধকারের যুদ্ধে জয় কার হবে?
গতানুগতিক ধারার হরর না এটাই বইটার বিশেষত্ব। লেখক যে অনেক খোঁজখবর নিয়ে লিখতে বসেছেন পড়লেই বুঝা যায়। কিন্তু কাহিনীর মধ্যে থিওরি না আলোচনা করে, শুরুতে বা শেষে করলে ভালো হতো। বারবার কাহিনী আর থিওরির মিশেলে পড়ার ফ্লো হারিয়ে ফেলছিলাম। আরও গোছানো হলে সুন্দর হতে পারতো।
লোভ যদি হয় অন্ধকার তো ভালোবাসা হলো আলো। সবসময়ই যেমন লোভ জিততে পারে না তেমনি ভালোবাসাও বারবার জিতে না। কিন্তু বইয়ে জিতবে কে? জবাব পাওয়া যাবে একদম শেষে। বইটা নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। এখন সেগুলোই তুলে ধরবো। লেখনশৈলী ঝরঝরে এবং বর্ণনাতে বাহুল্যতা নেই। তবে কিছু জায়গায় মনে হয়েছে ডিটেলিং আরও কিছুটা দরকার ছিল। ভয়ের থেকে ঘৃণা জাগায় এমন আলোচনা তুলনামূলক বেশি। ডাকিনীবিদ্যাই মূলত বইয়ের প্লট। বিভিন্ন রিচুয়াল, মিথলজি, বিশ্বাস- অবিশ্বাসের বিষয় আছে সাথে এগহিল চার্চের লিজেন্ডারি মার্ডার মিস্ট্রি। ফিকশন, নন-ফিকশন পাঠককে ঘোরের মধ্যে নিয়ে যাবে। খুব বেশি টুইস্ট না থাকলেও মোটামুটি ভালোই লেগেছে। পড়ার সময় মনে হচ্ছিল ওয়েস্টার্ন কোনো হরর মুভি শব্দের জালে বাঁধা পড়েছে।
বইয়ে অল্পকিছু ইলাস্ট্রেশন আছে। দ্য ক্রো, ঘাসফড়িং/ ইদুরে বিভিন্ন আকৃতি ফুটে ওঠা, ফাইটিং সিনগুলো নিয়ে কিছু ইলাস্ট্রেশন থাকলে ভালো হতো। বইয়ের বাঁধাই, কাগজের মান ভালোই হয়েছে। তবে লেখার চারিদিকে জায়গা ছাড়ার পরিমাণটা একটু বেশি। খামখা পৃষ্ঠা সংখ্যা বেড়েছে এজন্য। প্রচ্ছদটা মোটামুটি। বানান ভুল তেমন একটা চোখে পড়েনি বলা যায়।
কৃষ্ণবায়স। কালো কাক। দ্য ক্রো। বই পড়ুয়ারা তৃতীয় নামটা শুনার পর নিশ্চয়ই জেমস উবারের কথা ভাবছেন। দ্য ক্রো নিয়ে রেড ইন্ডিয়ান আরবান লিজেন্ড তথ্যসমূহ বাদে পলাশ পুরকায়স্থ মূলত লিখেছেন একটি মৌলিক গল্প।
কার্ল জোহানসেন তার এতিম নাতনী এমিলিয়া ওয়েনডেলকে নিয়ে পেনসিলভেনিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। রহস্যময় এক দূর্ঘটনায় মারা যান এমিলিয়ার মা-বাবা কাইলা ও রিক। কার্লের নাতনীকেও ঘিরে আছে অনেক রহস্য।
এ গল্পে রেড ইন্ডিয়ান মিথলজি থেকে উইচক্রাফ্ট জায়গা করে নিয়েছে প্রয়োজন অনুসারে। বেশ খানিকটা ওয়েস্টার্ন হরর জনরার বই হিসেবে পাঠক ধরে নিতে পারেন 'কৃষ্ণবায়স' কে।
অনেকগুলো নির্মম হত্যাকান্ডের ইতিহাস সেই এগহিল চার্চ, তৎকালীন নরপশু মিনিস্টারের হারানো স্ক্রলের অপরিসীম গুরুত্ব এবং আলো ও অন্ধকারের লড়াইটা আছে স্টোরিতে।
হরর গল্পে যেমন অনেক সময় বিশেষ উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে একধরণের মাহেন্দ্রক্ষণ থাকে ঠিক তেমনি উইচক্রাফ্টের মাদারকে ফিরিয়ে আনা এবং বিপরীতে কালো কাকের রেড ইন্ডিয়ান মিথের সবকিছু ভন্ডুল করার প্রচেষ্টার দিকেই এগিয়েছে গল্পটি।
এসব কিছুর মূল ক্যাটালিস্ট এমিলিয়া। তাকে রক্ষা করতে হবে পিতা কার্লকে। রিডারদের কাছে পেনসিলভেনিয়া এমনিতেই অশুভ শক্তি-দৈত্য-দানব-ভূত-প্রেতের অভয়ারণ্য। সেই জায়গায় ঘটতে থাকে বিভৎস সব ঘটনা।
পলাশ পুরকায়স্থ রেড ইন্ডিয়ান আরবান লিজেন্ড দ্য ক্রো ছাড়াও আরো বিভিন্ন অতিপ্রাকৃতিক বিষয়াবলীর সাথে পাঠকের দেখা করিয়ে দিয়েছেন এ বইয়ে। তাছাড়াও উইচক্রাফ্ট নিয়েও গল্পে বেশ কিছু তথ্যের অবতারনা করেছেন।
নন-ফিকশন থেকে ফিকশন মানুষকে বেশি তাড়িত করে। ফিকশনের মোড়কে লেখক স্বল্প পরিসরে সুখপাঠ্য ভাষায় এ হরর-থ্রিলারটি রচনা করেছেন। যেখানে হরর আরবান লিজেন্ডে আগ্রহীরা হয়তো অনেক কিছুই পাবেন।
পলাশ পুরকায়স্থ বেশ খাটাখাটনি করা একজন লেখক। লিখছেন বহু বছর ধরেই তবে প্রায় মধ্যবয়সে অভিষেক করেছেন একজন পরিচিত রাইটার হিসেবে আজ থেকে প্রায় ৭-৮ বছর আগে।
অবশ্য বইটির অপেক্ষাকৃত কম ভালো লাগা এবং ভালো না লাগা অংশও আছে, আমার মতে। ডিটেইলিং এর কাজ ভালো করেন এমন একজন লেখক যখন গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় ডিটেইলিং এর জায়গায় একটু রাশড লিখা লিখেন তখন বেশ খানিকটা মিসড অপরচুনিটি সৃষ্টি হয়ে যায়।
আমি সবসময় কন্টেন্টে আগ্রহী। প্রোডাকশন কোয়ালিটির দিকে নজর কম দেই। তবে মাতব্বর কমিক্স এন্ড পাবলিকেশনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো প্রোডাকশন কোয়ালিটির গ্রন্থ এটি। প্রুফ এবং সম্পাদনার কাজ ভালো হয়েছে।
ওভারঅল ভালো লেগেছে বইটি। তবে তীব্র ভয়ের অথবা অস্বস্তির এলিমেন্টের চেয়ে গায়ে ঘিন ধরানোর অনুভূতি বেশি কাজ করেছে বইটি পড়ার সময়, অবশ্য উইচক্রাফ্ট জাতীয় গল্পে এ ধরণের উপাদানই বেশি থাকে মনে হয়। ভয়ের গল্পের এসেন্ডিং টোনটা ভালোই আছে এ গ্রন্থে। লেখকের প্রতি শুভকামনা রইলো নতুন ধরণের কিছু লেখার জন্য।
নাম : কৃষ্ণবায়স লেখক : পলাশ পুরকায়স্থ জনরা : ওয়েস্টার্ন হরর প্রচ্ছদ : জাওয়াদ উল আলম সম্পাদনা : ফাহাদ আল আবদুল্লাহ্, উম্মে কুলসুম সাদিয়া প্রকাশক : মাতব্বর কমিক্স এন্ড পাবলিকেশন
ইদানীং রিভিউ লিখা মন্থর হয়ে গিয়েছে একেবারে। অন্যান্য কাজে ব্যাস্ত থাকায় সময় বের করা যাচ্ছে না। বইছবিটা তোলায় এখন কিছু লিখতেই হবে সেজন্য ছোট করে বইটা পড়ে কেমন লেগেছে তা জানালাম। বইটার জনরা বলতে গেলে ওয়েস্টার্ন হরর। বিদেশী প্লটে বইটা লিখতে লেখকের বেশ পরিশ্রম করতে হয়েছে তা বই পড়লেই বুঝা যায়। রেড ইন্ডিয়ান মিথলজি ,উইচক্র্যাফট এর মিশ্রণে সুন্দর একটা প্লট উপস্থাপন করতে পেরেছেন লেখক। সকল হরর বইয়ে যেমন এন্টাগনিস্ট একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তার ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এই বইটাও তেমনই। রেড ইন্ডিয়ান আরবান লেজেন্ড দ্য ক্রোর ব্যাপারটা সুন্দর লেগেছে। তার সাথে যে চরিত্রটা মার্জ করেছে তার বর্ণনাও উপভোগ্য। দুর্ঘটনার পরে রিকের বর্ণনা আর সমাপ্তির লড়াইয়ের জায়গা দারুণ লেগেছে। উইচক্র্যাফট নিয়েও লেখক কিছ��� তথ্য দিয়েছেন। যা পড়তে ভালো লাগলেও গল্প আর তথ্যের মিশেলটা ঠিকমত না হওয়ায় পড়ার গতি মাঝে মাঝে আটকে যাচ্ছিলো। বইয়ে ভয়ের আবহ তৈরী করার চেষ্টা করেছিলেন লেখক কিন্তু তা ফুটে উঠে নি একদম। মনে হচ্ছিলো জোর করে ভয় পাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। এর বদলে শ্ল্যসারের জায়গা টুকুতে দারুণ কাজ দেখিয়েছেন লেখক। গা গুলিয়ে উঠবে অনেকেরই। এক জায়গায় লেখক দম্পতির পরিণতি আর টুইস্ট ছোট করে বর্ণনা দিয়ে আবার ফ্লাশব্যাকে নিয়ে সেই পরিণতি আবার বড় করে বর্ণনা দিয়েছেন। এতে কিছুটা হলেও বিরক্তি ধরেছে। সবশেষে বলব যারা হরর প্রেমী তারা একবার বইটা পড়ে দেখতে পারেন। রিচুয়াল,মিথ, ক্রোধ, প্রতিরোধ,শ্ল্যাসার আর ভালোবাসার একটা মিশ্রণ এই বইটা। বইটার পেজের সেট আপ দেখে ভালোই অবক হয়েছি। চারপাশে ১ ইঞ্চি করে গ্যাপ দেওয়া। এতে করে বইয়ের পৃষ্টা সংখ্যা বেড়েছে এমনিতেই। রেগুলার সেট আপে বইটা ১১২ পেজে হতো। ইলাস্ট্রেশন গুলো ভালো ছিলো। প্রচ্ছদটাও চমৎকার। বইটায় বানান ভুল চোখে পড়েনি।