বই: পরমপদকমলে
লেখক: সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
প্রকাশক: উদ্বোধন কার্য্যালয়, কলকাতা
ফরম্যাট: হার্ডকভার
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৫৪৮
ওজন: ৩৫০ গ্রাম
ডাইমেনশন: ২২ x ৮ x ৫ সে মি
মূল্য: ২০০ টাকা
চণ্ডীতে জগন্মাতা শম্ভুকে আত্মপরিচয়ে নিজেকে ব্যক্ত করে বলেছেন- 'একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা। পশ্যৈতা দুষ্ট ময্যেব বিশন্তো মদবিভূতয়।।
-- অর্থাৎ, এই বিশ্বচরাচরে আমি একাই ব্যাপ্ত হয়ে আছি, দ্বিতীয় বলে কিছুই নেই।
সাধক রামপ্রসাদের উপলব্ধিতে দ্বিজ রামপ্রসাদ রটে মা বিরাজেন সর্বঘটে। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, 'মত্ত পরতরং নানাৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়। ময়ি সর্বমিদং প্রোত সূত্রে মণিগণাইব।
হে ধনঞ্জয়। এ জগতে আমি ছাড়া কিছুই নেই। আমি সকল কিছুর মধ্যে ওতপ্রোত হয়ে আছি। অনেকগুলি মণি দিয়ে গাঁথা। মালার সুতোটি যেমন প্রত্যেকটি মণির মধ্যে অনুস্যুত থাকে, তেমনি জগতের সকল বস্তুর। মধ্যে একমাত্র আমিই বিরাজিত আছি।
বিভিন্ন জলাধারে একই সূর্যকে প্রতিবিম্বিত দেখা যায়। তেমনই একই ঈশ্বরকে মানুষ বহুভাবে দেখে।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সমাধি থেকে উঠে বললেন - তিনিই সব হয়েছেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর এক সংকটময় অবস্থা। ঔপনিবেশিক শাসনে অবনত পরাধীন জাতির চেতনা ও মূল্যবোধ। ধর্মে-ধর্মে, গোষ্ঠী সম্প্রদায়ে ভেদাভেদ, হানাহানি। এ যেন এক গৃহযুদ্ধের বধ্যভূমি।
দক্ষিণেশ্বরে আবির্ভূত হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।
ঠাকুর বলেন, ভক্তিই সার — ঈশ্বর তো সর্বভূতে আছেন — তবে ভক্ত কাকে বলি? যার মন সর্বদা ঈশ্বরেতে আছে। ঠাকুর অতি সাধারণ কথায় দুরূহ তত্ত্বের ব্যাখ্যা করেন। খুব সহজভাবে ‘শ্রীম’-কে গড়ের মাঠে উইলসন সার্কাস দেখে ফেরার পথে ঠাকুর বলছেন —দেখলে বিবি কেমন এক পায়ে ঘোড়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আর ঘোড়া বন বন করে দৌড়াচ্ছে। কত কঠিন, অনেকদিন ধরে।
অভ্যাস করেছে, তবে তো হয়েছে। একটু অসাবধান হলেই হাত-পা ভেঙে যাবে, আবার মৃত্যুও হতে পারে। সংসার করা ওইরূপ কঠিন।
শ্রীরামকৃষ্ণ শিখিয়েছেন— জীবের মধ্যেই শিবের বাস। শিব ও জীবন অভিন্ন। ঠাকুর বলেন, জীবের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছেন ঈশ্বর। সকলের হৃদয়েই তাঁর বাস। অন্তর্নিহিত সেই ভগবৎ চেতনার জাগরণ ঘটলে তবেই মানুষ যথার্থভাবে ফিরে পায় আত্মশ্রদ্ধা ও মর্যাদা, জাগরণ ঘটে মানবতার।
শ্রীরামকৃষ্ণ আনন্দস্বরূপ। তিনি অমৃতস্বরূপ। তিনি অনন্ত ভাবময়। তাই তাঁর কথাও অনন্ত।
অমৃতসমান তাঁর কথা যত বলা যায়, যত শোনা যায়, যত লেখা যায়, আলোচনা করা যায়, ভাবা যায় — ততই তা আমাদের অমৃতের পথে নিয়ে যায়। তাঁর ভাষাতেই বলি, মিছরির রুটি, আড় করেই খাও আর সিধে করেই খাও, সমান মিষ্টি।'
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় একজন সাধক, একজন প্রেমিক এবং শ্রীরামকৃষ্ণ জগতের কথা শোনানোর জন্য তিনি চাপরাশপ্রাপ্ত। শ্রীরামকৃষ্ণজগতের কথাও তিনি শোনান তাঁর নিজস্ব সরস ভঙ্গিটি বজায় রেখেই।
আর কেনই বা নয়? শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেই তো ছিলেন রসসাগর। সঞ্জীববাবু সেই সাগরে অবগাহন করে আমাদের শোনান তাঁর অপরূপ কথা। শ্রীরামকৃষ্ণকথা লেখা, বলা তাঁর কাছে পূজা।
পড়ুন পাঠক। পড়তে থাকুন এই আলোচনা।
যোগেশ্বরী বললেন, ‘তন্ত্রসাধনা জীবনের সর্বাঙ্গীন সাধনা। চিত্ত থেকে চৈতন্যে উদ্বুদ্ধ হওয়া। শক্তিই তন্ত্রের সর্বস্ব। তন্ত্রে কোথাও কিছু তুচ্ছ নেই। হেয় পরিত্যাজ্য নেই। সব কিছুর থেকেই ঈশ্বরীশক্তিকে আহরণ করা, আকর্ষণ করা। শক্তিকে ছুটিয়ে এনে শিবত্বে পৌঁছে দেওয়া।”
গদাধর বললেন, 'তুমি যদি আমাকে অবতারই বল তাহলে আবার সাধন কেন?'
'পার্বতী ভগবতী হয়েও শিবের জন্যে কঠোর সাধনা করেছিলেন। পঞ্চমুণ্ডীর উপরে বসে পঞ্চতপা। শীতকালে জলে গা ডুবিয়ে থাকা। সূর্যের দিকে অনিমেষ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা। সংস্কারপালনের জন্যে যেমন বিয়ে করেছ তেমনই শাস্ত্রপালনের জন্যে তোমাকে তন্ত্রসাধনা করতে হবে। তন্ত্র সকল শাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ।'
বাগানের উত্তর সীমায় বেলগাছ। তার নিচে বেদী তৈরি হল। সেই বেদীর নিচে তিনটি নরমুণ্ড পুঁতলেন ভৈরবী। বিকল্প আসন হল পঞ্চবটীতে। সে বেদীর নিচে পঞ্চজীবের পঞ্চমুণ্ড। শেয়াল, কুকুর, সাপ, ষাঁড় আর মানুষ। ভৈরবীই সব জোগাড় করেছেন ঘুরে ঘুরে। যেটার জন্যে যে আসন দরকার তাতেই বসে তন্ত্রসাধন শুরু করলেন গদাধর।
অনেকরকম পুজো, অনেকরকম জপ, অনেকরকম হোম-তর্পণ। উগ্র থেকে উগ্রতর তপস্যা। এক-একটা সাধন ধরেন ও দু'তিন দিনেই নিরাপদে পার হয়ে যান। শাস্ত্রে যে ফল নির্দিষ্ট আছে, তা প্রত্যক্ষ করেন। দর্শনের পর দর্শন, অনুভূতির পর অনুভূতি।
এমনি করে গুনে গুনে চৌষট্টিখানা তন্ত্র শেখালেন ভৈরবী।
একদিন রাত্রে ভৈরবী কোথা থেকে এক পূর্ণযৌবনা সুন্দরী স্ত্রীলোককে ধরে আনলেন। তাকে বেদীর উপর বসালেন। গদাধরকে বললেন, 'বাবা, একে দেবীজ্ঞানে পুজো কর। সাক্ষাৎ জগজ্জননী জ্ঞানে এর কোলে বসে তদ্গত উপরে হয়ে জপ কর।
শিউরে উঠলেন গদাধর। রমণী যে দিগম্বরী।
'এ কী আদেশ করছিস মা? তোর দুর্বল সন্তান আমি। আমার কি এ দুঃসাহসের শক্তি আছে?" গদাধর কাঁপতে কাঁপতে বললেন।
'কে বলে তুই আমার দুর্বল সন্তান? তুই আমার সবচেয়ে সবল ছেলে। ওখানে ও বসে কে? ও তো আমি। তুই আমার কোলে বসবি নে?'
গদাধরের হঠাৎ মনে হল সত্যিই তো, মা-ই তো বসে আছেন। অমনি সমস্ত দেহপ্রাণ, অনন্ত দৈববলে বলীয়ান হয়ে উঠল। রমণীর কোলে বসেই সমাধিস্থ হলেন গদাধর।
ভৈরবী বললেন, 'পরীক্ষায় পাস হয়ে গেছ বাবা।'
আর একদিন শবের খর্পরে (খুলিতে) মাছ চাপালেন ভৈরবী। জগদম্বাকে তর্পন করলেন। তারপর সেই মাছ খেতে বললেন গদাধরকে। নিঘৃণ হয়ে খেলেন গদাধর।
একদিন ভৈরবী কোথা থেকে গলিত নরমাংস জোগাড় করে আনলেন। দেবীতর্পণের পর গদাধরকে বললেন, 'এ মাংস জিভে ঠেকাও।'
'অসম্ভব। এ আমি পারব না।' ঝটকা মারলেন ��দাধর। 'কেন ঘেন্নার কী!! কোনও কিছুতেই ঘেন্না করতে নেই। এই দ্যাখ না। আমি খাচ্ছি।' বলেই এক টুকরো নরমাংস নিজের মুখে ফেলে চিবুতে লাগলেন ভৈরবী।
'এইবার তুমি খাও।'
গদাধরের মুখের সামনে ধরলেন আর এক টুকরো। 'মা-মা' বলতে বলতে ভাবাবিষ্ট হলেন গদাধর। ভৈরবী অমনি তার মুখের মধ্যে মাংসের টুকরো পুরে দিলেন।
শেষ তন্ত্র শিব-শক্তির লীলা বিলাস দর্শন। এটাই বীরাচারের শেষ সাধন।
এক চুল বিচলিত হলেন না গদাধর। নির্বিকল্প সমাধিতে প্রশান্ত রইলেন। মনে মনে ভাবলেন, 'রমণী মাত্রেই মা। মাতৃভাবেই আদ্যাশক্তির অধিষ্ঠান।'
'বাবা, তুমি আনন্দাসনে সিদ্ধ হয়ে দিব্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে।' বললেন ভৈরবী।
সবাই তাঁর কাছে আশ্রয় পেয়েছে। পেয়েছে, ভালবাসার অতলান্ত স্নেহ-সমুদ্র। জাতি-ধর্ম-বর্ণ সবাই তাঁর কাছে এসেছে। গরিব, দীন-দরিদ্র থেকে রাজা-মহারাজা সবাই তাঁর পদতলে প্রশ্রয় পেয়েছে। কী নারী, কী পুরুষ, কী নবীন, কী প্রবীণ—তাঁর সীমাহীন প্রেমস্পর্শ পেয়েছে। তিনি আন্তরিকতায় কাছে টেনে নিতেন। খুব কম সময়ে, আপন করে নিতে জানতেন। তাঁর হৃদয়সাম্রাজ্যে সকলের স্থান ছিল সমান। ভিক্ষুক থেকে জমিদার সবার ছিল অবারিত দ্বার ।
সাধক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় পূজা করেন। আমরা সেই পূজায় অংশ নিয়ে প্রসাদ পাই, পেয়ে পবিত্র হই। আশ্রয় পাই পরমপদকমলে। উদ্বোধন পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর রচনাগুলি নিয়ে সংকলন 'পরমপদকমলে' বাংলা সাহিত্যের সর্বজনপ্রিয় গ্রন্থগুলির একটি।
পড়ুন। সমৃদ্ধ হন।
অলমিতি।