কি ঘটতো যদি ভ্যান গগ আর পল গগ্যা অবিভক্ত বাংলায় জন্মাতেন? যদি গগ হতেন সম্ভ্রান্ত এক হিন্দু জমিদার পরিবারের সন্তান আর গগ্যা হতেন ঢাকার এক মনিহারী দোকানের মালিক? আর ওদের নাম হত চন্দ্রভান গর্গ ও গগনচন্দ্র পাল?
অনেক ভেবেও এর আগে নারায়ণ সান্যালের কোন পূর্নাঙ্গ উপন্যাস পড়েছি কিনা মনে করতে পারছি না। কিন্তু, কোন গল্প সংকলনে তাঁর লেখা গল্প অবশ্যই পড়েছি, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। তাঁর লেখায় এমন এক ‘নো-ননসেন্স’ টোন আছে যে সেটাকে বাংলায় কোন শব্দ দিয়ে এর চেয়ে ভাল করে প্রকাশ করা যাবে, আমি ঠিক জানি না। নারায়ণ সান্যাল গোটা উপন্যাসের একটা শব্দেও চিত্রকলা আস্বাদনের কোন উপায় নিয়ে ক্লাস নিতে চান নি। ভীষন নির্মোহভাবে তিনি শুধু দুই কিংবদন্তী শিল্পীর জীবন পুনরায় এই গ্রাম বাংলায় এনে কল্পনায় বুনে গেছেন। বইয়ের শেষে তাঁদের জীবনীর একটি তারিখ সংবলিত ছোট সংস্করণ যেন এটাই মনে করিয়ে দেয় যে লেখক কোনভাবেই বিদ্বান হিসেবে নিজেকে জাহির করতে বাহাত্তরে রচিত এ উপন্যাসের জন্য কলম ধরেন নি। আর ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস তথ্যে ভরাক্রান্ত করার এই লোভে আটকে না গেলেই উপন্যাস হয়ে ওঠে।
টানটান উপন্যাসটি শুরু হলে আমরা কিছুদূর গিয়ে জানতে পারি, বটুকেশ্বর, দ্বৈপায়ন, গগন পাল ও চন্দ্রভান গর্গ ছিল হরিহর আত্মা। প্রথমবার বাংলা ভাগের একটা চেষ্টা হয়েছিল যখন, সে সময় থেকে চারবন্ধুকে নিয়ে ‘আবার যদি ইচ্ছা কর’ এর গল্প শুরু হয়। গল্প এগোলে আমরা দেখি এই কাছের বন্ধুদের মধ্যে নানা কারনে সেই মাখো মাখো সম্পর্ক থাকে না। দু’বাংলায় ছড়িয়ে যায় নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া চারজন। দ্বৈপায়ন ডাক্তার হিসেবে মুসলমান অধ্যুষিত ঢাকায় প্র্যাকটিস করতে করতে যখন দাঙ্গার ভয়ে নিজের দেশে ফিরে যাবার কথা ভাবছে, তখন তার দেখা হয় পুরনো বন্ধু গগন পালের স্ত্রী শান্তির সাথে। ওদিকে চন্দ্রভানের জীবনে দুর্দশা এমন ভাবে নেমে আসে যে সে বাধ্য হয় ঈশ্বর সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করতে। চন্দ্রভান থেকে সে হয় খ্রীষ্টান ভিনসেন্ট এবং চলে যায় গভীর এক কয়লাখনির আশেপাশের মানুষের মাঝে যীশুর বার্তা পৌঁছে দিতে। কিন্তু, তা কি তাকে স্রষ্টার কাছে নিতে পেরেছিল? কখন শুরু হল এসবের মাঝে তার আস্তে আস্তে ভিনসেন্ট ভ্যান গগ হয়ে ওঠা?
গগন পাল সব ছেড়েছুড়ে শুধু মাত্র ছবি আঁকবে বলে কলকাতার এক বস্তিতে ঘাঁটি গাড়লে সেখানে তাঁর দেখা হয় পুরানো বন্ধু বটুকেশ্বরের, যে কিনা নিজেই নামকরা এক আঁকিয়ে। গগন পালকে তার গোটা বন্ধুবৃত্তই পল গগ্যা ডাকতো। পল গগ্যা এখানে সেই লোক যে নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পী মনে করে। কিন্তু, গগ্যার নষ্টামি সীমা ছাড়িয়ে গেলেও বটুক তাঁকে সম্মানের আসন থেকে নামাতে পারে না। এমনকি নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কিছু বিসর্জিত হবার পরও না।
উপন্যাস আরো এগোলে মানুষ ভিনসেন্ট ভান গর্গ যতোটা মনে জায়গা করে নিতে থাকে, গগন পালের উপর মন ততোটাই বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে। নিরীহ ও প্রত্যাখ্যাত ভিনসেন্টের জন্য যেমন খারাপ লাগে, গগন পালের বোধশক্তি আছে কিনা তা নিয়েই সন্দেহ হতে শুরু করে। শেষে এসে মনে হয় যে দুইজন সম্পূর্ন ভিন্ন শিল্পসত্তা ধারন করা মানুষকে পৃথিবী ঠিক সময়ে মূল্য দিতে পারে নি। আর উপন্যাসে তাঁরা এসেছেন হারিয়ে যাওয়া মহান শিল্পী হিসেবে যাদেরকে হঠাৎ করে পাশ্চাত্যে আবিষ্কার করেছে নানা সমালোচক। ভিনসেন্ট ও পল পুরোপুরি দুই মেরুর লোক হয়েও রেখে গেছেন অসাধারণ সব সৃষ্টি যার স্পর্শে এসেই লেখক তাঁর এই বই লেখার উৎসাহ পেয়েছেন।
বইটা পড়তে পড়তে টিম ভিনসেন্ট ও টিম পলের মধ্যে যদি মন ভাগ হয়ে যেতে চায়, আমি বলব তা দোষের না। আমি যেমন টিম ভিনসেন্ট! কারন, আমি মনে করি না কোন মানুষ সমানে একে তাকে ব্যবহার করলে ও ক্ষতি করতে থাকলে তা শুধুমাত্র সে মহৎ শিল্পী বলে তার বেলায় জায়েজ হয়ে যায়। একারনে উপন্যাসে পল গগ্যার কোন পাগলামিকে শিল্পীসুলভ আচরণ হিসেবে প্রশ্রয় দেবার কোন কারন লেখকের মতো খুঁজে পাই না। বরং, প্রচন্ড মানবিক ও ভালোবাসার কাঙাল ভ্যান গগের এখানে যেই সত্যঘেষা কল্পিত উপাখ্যান লেখক এনেছেন তা অনুপ্রেরণা যোগায়। গগ্যাকে শেষে যেভাবে দেখানো হয়েছে, তা লেখকের কল্পনাপ্রসূত। যদি এই শিল্পী সত্যি সত্যি এমন কিছুর মুখোমুখি হতো, তাহলে তাঁর প্রতি হয়তো কিছুটা হলেও শ্রদ্ধা আসতো। আসে নি। কারন, বইয়ের শেষে সংক্ষিপ্ত আকারে তাঁর খ্যাতি ও যশের কথা পড়েছি। মনে হয়েছে, গগন পাল সেই তুলনায় ঢের ভালো শিল্পী ও মানুষ! তাঁর জন্য একটু মন কেমন করে উঠলেও পল গগ্যার ভক্ত হতে পারলাম না।
বইটায় লেখক নিজে উপন্যাসের অধ্যায়গুলোর শুরুতে কিছু কিছু ছবি এঁকেছেন । আর ফাঁকে ফাঁকে দুই শিল্পীর নানা সময়ে আঁকা ছবিগুলোর নেপথ্যকাহিনী লেখক যোগ করেছেন কাহিনীর খাতিরেই। সেগুলোর বর্ননা পড়ে দুজনেরই কোন ছবি নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, তা বের করতে পেরেছি যতোবার, ততোবার আনন্দ পেয়েছি। আমার ধারণা এই বই পড়বার সময়ে ইন্টারনেটের যুগে অনেকেই এই কাজ করে কৌতূহল মিটিয়েছে। চমৎকার এক ভাবনা থেকে তৈরি এই উপন্যাস শেষ করে সত্যিই একটু খালি খালি লাগছে।
মানুষ হুড়োহুড়ি করে কেন তাঁর লেখা ‘কাঁটায়- কাঁটায়’ কিনেছেন, তা এখন বুঝতে পারছি।
‘আবার যদি ইচ্ছা কর’ সাজেস্ট করার জন্য নিবেদিতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এই উপন্যাস নি��়ে মুগ্ধতা জ্ঞাপনের ইতি টানলাম। ‘কাঁটায়-কাঁটায়’ সংগ্রহ করে এখন পড়ে ফেলতে হবে যতো জলদি পারা যায়।