মজার গল্প লেখা চাট্টিখানি কথা নয়, বিশেষত পাঠক যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়| কিন্তু বাংলায় শিশু-কিশোর সাহিত্য নিয়ে চর্চা করে আসা দিকপাল ও সুপ্রতিষ্ঠিত লেখকেরা এই চ্যালেঞ্জটির মোকাবিলা করতে পিছপা হননি, তাই বাংলা ভাষায় ছোটোদের জন্যে মজার গল্প লেখা হয়েছে প্রচুর| তারই মধ্য থেকে নির্বাচিত এক ঝাঁক গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে এই মোটাসোটা, সুমুদ্রিত বইটি, যার জনপ্রিয়তা এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট যে ২০০০-এর জানুয়ারিতে প্রথম প্রকাশের পর থেকে এর মধ্যেই বইটি ষষ্ঠ মুদ্রণে পৌঁছে গেছে!
বইটির গোড়ায় প্রকাশক দেবজ্যোতি দত্তের 'প্রকাশকের নিবেদন' আর তারাপদ রায়ের 'ভূমিকা', আর শেষে 'লেখক পরিচিতি' ছাড়া যেসব গল্প আছে সেগুলো হল:
(১) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর "পাঠশালার পণ্ডিতমশাই"
(২) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর "ইঁদুরের ভোজ"
(৩) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী-র "পাকা ফলার"
(৪) যোগীন্দ্রনাথ সরকার-এর "ফাঁকি দিয়ে স্বর্গলাভ"
(৫) লালবিহারী দে-র "ভীতু ভূত"
(৬) প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়-এর "মাস্টার মহাশয়"
(৭) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর "লালু"
(৮) পরশুরাম-এর "তিন বিধাতা"
(৯) সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়-এর "চালিয়াত চন্দর"
(১০) সুখলতা রাও-এর "সোনার হাঁস"
(১১) সুকুমার রায়-এর "দাশুর কীর্তি"
(১২) মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়-এর "পারম্পর্য"
(১৩) বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়-এর "হারুণ অল রশিদের বিপদ"
(১৪) তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়-এর "ডগি অ্যালসেশিয়ান নয়"
(১৫) শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়-এর "জেনারেল ন্যাপলা"
(১৬) পরিমল গোস্বামী-র "সিংহের খাঁচা"
(১৭) বনফুল-এর "যুগলযাত্রী"
(১৮) শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়-এর "তিনমূর্তি"
(১৯) প্রমথনাথ বিশী-র "সিন্দুক"
(২০) মনোজ বসু-র "গানের বস্তা"
(২১) সুনির্মল বসু-র "কাব্যরোগের টোটকা"
(২২) শিবরাম চক্রবর্তী-র "গন্ধচুরির মামলা"
(২৩) স্বপনবুড়ো-র "মনের মতো ভাড়াটে"
(২৪) অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত-র "ওভারকোট"
(২৫) মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য-র "লঙ্কাকাণ্ড"
(২৬) সৈয়দ মুজতবা আলী-র "সিনিয়র এ্যাপ্রেন্টিস"
(২৭) প্রেমেন্দ্র মিত্র-র "অপরূপ কথা"
(২৮) বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র-র "দশচক্রে ভগবান ভূত"
(২৯) প্রবোধকুমার সান্যাল-এর "পূজা কনসেশন"
(৩০) লীলা মজুমদার-এর "নতুন ছেলে নটবর"
(৩১) বুদ্ধদেব বসু-র "জ্ঞান থেকে অজ্ঞান"
(৩২) আশাপূর্ণা দেবী-র "ডবল ডোজের ফলাফল"
(৩৩) মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়-এর "কর্তার বাড়ি যাত্রা"
(৩৪) হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়-এর "দি গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস"
(৩৫) কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়-এর "বিল্লুর জ্যাঠামণি"
(৩৬) নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়-এর "অন্যমনস্ক চোর"
(৩৭) বিমল কর-এর "যশিডির বড়োমামা"
(৩৮) সত্যজিৎ রায়-এর "মাণপত্র"
(৩৯) মহাশ্বেতা দেবী-র "দাদুতাড়ুয়া"
(৪০) হিমানীশ গোস্বামী-র "গোবিন্দ কবিরাজ"
(৪১) অরবিন্দগুহ-র "মিলিটারি"
(৪২) বরেন গঙ্গোপাধ্যায়-এর "ভুঁড়ির মহিমা"
(৪৩) সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ-এর "ভোলাবাবা পার করেগা"
(৪৪) শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়-এর "সাধু কালাচাঁদের পালাকীর্তন"
(৪৫) মতি নন্দী-র "এম্পিয়ারিং"
(৪৬) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর "ঝুনুমাসির বেড়াল"
(৪৭) সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়-এর "ঘুষ"
(৪৮) শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়-এর "নয়নচাঁদ"
(৪৯) অজেয় রায়-এর "রায়বাড়ির ঘড়ি"
(৫০) তারাপদ রায়-এর "হন্তদন্ত"
(৫১) বুদ্ধদেব গুহ-র "টেনাগড়ে টেনশন"
(৫২) নবনীতা দেবসেন-এর "শঙ্খচূর্ণিকা ঠাকরুন"
গল্পের আর লেখকের কথা মাথায় রাখলে এই বইকে পাঁচ তারার কম দেওয়ার কথা ভাবাই যায় না, কিন্তু তবু আমি তিনটি তারা দিয়েই থামতে বাধ্য হলাম কয়েকটি কারণে:
১. এই বইয়ের বেশ কিছু গল্প ধারে নয়, বরং লেখকের নামের ভারে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে, যেগুলো পড়তে শুরু করেই বাড়ির ছোটোটি (যে আমাদের তুলনায় অনেক বেশি স্মার্ট) বিরক্ত হবে|
২. বইটিতে একটিও অলংকরণ নেই, অথচ আনন্দমেলা এবং দেব সাহিত্য কুটিরের বিভিন্ন পূজাবার্ষিকী-তে এর মধ্যে বেশ কিছু গল্পের প্রকাশের সময় সেই ছবিগুলো গল্পপাঠের আনন্দ অনেক বাড়িয়ে দিত|
৩. গল্পগুলো পড়ে এটাই মনে হয় যে বইটির মূল পাঠক আজকের ছোটোরা নয়, বরং সেইসব বড়োরা যাঁরা এখনও লুকিয়ে বা প্রকাশ্যে আনন্দমেলা আর শুকতারা কিনে চলেছেন, আর বাড়ির ছোটোরা যাঁর এই পাঠাভ্যাসকে কৌতুক-মিশ্রিত করুণার চোখে দেখছে| আজকের ছোটোরা কী পড়ে আনন্দ পায় সে সম্বন্ধে, খুব দুঃখের সঙ্গে বলতেই হচ্ছে, সম্পাদক বা তাঁর ব-কলমাধারী গুণীজনদের কোন ধারণাই ছিল না|