নিজের ছবি আঁকা কিংবা মূর্তি গড়া পছন্দ করতেন না বুদ্ধদেব। বলতেন, যে-দেহ নশ্বর, যা দু’দিন পরে ধুলায় মিশে যাবে, তাকে ধরে রেখে কী হবে।
এই উপদেশ মনে রেখে শিষ্যরা কেউ তাঁর মূর্তি গড়েনি, ছবিও আঁকেনি। এইভাবে কেটে গেছে দীর্ঘকাল। তারপর, যখন হাজার-হাজার মানুষ বুদ্ধের শরণ নিয়ে দীক্ষিত হলেন বৌদ্ধধর্মে, একদিন নতুন তাগিদে শুরু হল বুদ্ধদেবের মূর্তি গড়া ও ছবি আঁকার কাজ। রাজারা দিলেন অর্থ, প্রজারা অর্ঘ্য।
দেশ-বিদেশ থেকে এলেন নামী-নামী শিল্পী আর ভাস্কর। কিন্তু কীভাবে জানা গেল, কেমন দেখতে ছিলেন বুদ্ধদেব? কীভাবে তৈরি হল মূর্তি আর ছবি?
সেই উত্তরেরই সযত্ন অনুসন্ধান এই গ্রন্থ। হাজার বছর ধরে ভাঙাগড়ার এক অজ্ঞাত ইতিহাস গল্পের মতো সরস ভঙ্গিতে শুনিয়েছেন চিত্রা দেব। সেইসঙ্গে রয়েছে বুদ্ধদেবের জীবনকথা ও বৌদ্ধধর্ম প্রচারের কাহিনি, ভারতের প্রধান-প্রধান বৌদ্ধতীর্থগুলির নাম ও বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য ছবি। প্রকাশিত হল চিত্রা দেব-এর ‘বুদ্ধদেব কেমন দেখতে ছিলেন’ গ্রন্থটির পরিবর্ধিত, পরিমার্জিত সংস্করণ।
বাংলাভাষা ও সাহিত্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর উপাধি লাভ করে চিত্রা দেব মধ্যযুগের এক অনাবিষ্কৃত মহাভারতের ওপরে গবেষণা করে ডক্টরেট পেয়েছেন। কবিচন্দ্রের মহাভারত, বিষ্ণুপুরী রামায়ণ, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গল ও ময়ূরভট্টের ধর্মমঙ্গল সম্পাদনা করেছেন একক ও যৌথভাবে। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর নিরন্তর গবেষণার উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি রয়েছে বিদগ্ধ মহলে। মধ্যযুগীয় সাধারণ মানুষ ও পুঁথিপত্র সম্পর্কে লিখেছেন একটি প্রবন্ধ সংকলন ‘পুঁথিপত্রের আঙিনায় সমাজের আলপনা। বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ঠাকুরবাড়ির মহিলাদের ভূমিকা নিয়ে লেখা তাঁর অপর উল্লেখযোগ্য গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’। অনুবাদ করেছেন প্রেমচন্দের হিন্দী উপন্যাস ‘গোদান’ ও ‘নির্মলা’। বাংলার নারী জাগরণের বিভিন্ন তথ্য সংকলনে ও বৃহত্তর গবেষণা করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার গ্রন্থাগার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রয়াণ : ১ অক্টোবর, ২০১৭।
স্বধর্মের বাইরে পরধর্ম নিয়ে লিখতে গেলেই আমাদের এই অঞ্চলে ব্যক্তির প্রকৃত স্বরূপ বের হয়ে আসে। চিত্রা দেবের ক্ষেত্রও একই কথা প্রযোজ্য। তিনি আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক এবং গুণী লেখক। যিশুখ্রিস্টের চাইতে প্রায় পাঁচশ বছরের বয়োজ্যেষ্ঠ বুদ্ধদেব এবং তাঁর প্রবর্তিত ধর্মমত নিয়ে অসম্ভব সুন্দর বইটি চিত্রাদেব লিখেছেন।
গৌতমীপুত্র গৌতম দেখতে আদতেই কেমন ছিলেন তা জানার সুযোগ আমাদের নেই। কেননা বুদ্ধদেবের যে মূর্তি আমরা দেখতে পাই তা ওনার মৃত্যুর কমপক্ষে পাঁচশ বছর পর গড়া হয়েছিল। কিন্তু কীভাবে গড়ে উঠল বুদ্ধদেবের মূর্তি গড়ার প্রথা আর রক্তমাংসের গৌতম কেমনই বা ছিলেন?
বুদ্ধদেবকে নিয়ে বাংলায় এত ভালো বই সত্যিই কম লেখা হয়েছে। পড়ুন, ঠকবেন না।
বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৭-৬৬ অব্দে। তার অর্থ, বয়সে তিনি যিশুখ্রিস্টের চেয়ে ৬০০ বছরের বড় ছিলেন। নিজের ছবি আঁকা কিংবা মূর্তি গড়া পছন্দ করতেন না বুদ্ধদেব। বলতেন, যে-দেহ নশ্বর, যা দু'দিন পরে ধুলায় মিশে যাবে, তাকে ধরে রেখে কী হবে। এই নশ্বর দেহের ছবি এঁকে, মূর্তি গড়ে তাকে স্থায়ী রূপ দেবে কী করে? যা ধুলোয় মিশে যাবে তাকে ধুলো হয়ে যেতে দাও। আমায় প্রণাম না করে তোমরা যদি সদ্ধর্ম পালন করে নিজেদের উন্নতি করো তা হলেই আমি খুশী হব। এই উপদেশ মনে রেখে শিষ্যরা কেউ তাঁর মূর্তি গড়েনি, ছবিও আঁকেনি। এইভাবে কেটে গেছে দীর্ঘকাল। তারপর, যখন হাজার হাজার মানুষ বুদ্ধের শরণ নিয়ে দীক্ষিত হলেন বৌদ্ধধর্মে, একদিন নতুন তাগিদে শুরু হল বুদ্ধদেবের মূর্তি গড়া ও ছবি আঁকার কাজ। রাজারা দিলেন অর্থ, প্রজারা অর্ঘ্য। দেশ-বিদেশ থেকে এলেন নামী নামী শিল্পী আর ভাস্কর। কিন্তু কীভাবে জানা গেল, কেমন দেখতে ছিলেন বুদ্ধদেব? কীভাবে তৈরি হল মূর্তি আর ছবি? এই উত্তরেরই সযত্নে অনুসন্ধান এই গ্রন্থে। হাজার বছর ধরে ভাঙাগড়া এক অজ্ঞাত ইতিহাস গল্পের মতো সরস ভঙ্গিতে শুনিয়েছেন চিত্রা দেব। সেইসঙ্গে রয়েছে বুদ্ধদেবের জীবনকথা ও বৌদ্ধধর্ম প্রচারের কাহিনি, ভারতের প্রধান প্রধান বৌদ্ধতীর্থগুলির নাম ও বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য ছবি। মুক্তি পাবার জন্যে বুদ্ধ চারটি মহান সত্য বা আর্য সত্যের কথা বলতেন। প্রথমত, এ পৃথিবী দুঃখময়। দ্বিতীয়ত, মানুষের আকাঙ্ক্ষা থেকে দুঃখ সৃষ্টি হয়। যেমন, মনের মতো জিনিস না পাওয়া। তৃতীয়ত, আকাঙ্ক্ষা বা পাবার ইচ্ছে না থাকলে দুঃখ থাকে না। চতুর্থত, চাওয়া-পাওয়ার ইচ্ছে থেকে মুক্তি পেতে হলে একটি মার্গ বা পথ অনুসরণ করতে হবে। এই পথকে বলা হয় অষ্টাঙ্গিক মার্গ। মার্গ মানে পথ এবং সেগুলি হল - সৎ বাক্য, সৎ কাজ, সৎ জীবিকা, সৎ চেষ্টা, সৎ চিন্তা, সৎ চেতনা, সৎ সংকল্প ও সৎ দৃষ্টি। বুদ্ধ চূড়ান্ত সুখ বা চূড়ান্ত কৃচ্ছ্রসাধনার পথে না গিয়ে মাঝামাঝি একটি পথ অবলম্বন করতে বললেন। জ্ঞানীরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করেই নির্বাণের দিকে এগিয়ে যাবেন।
বুদ্ধকে নিয়ে জানার শেষ নেই। যত জানা যায়, বিস্ময় বাড়ে বই কমে না। চিত্রা দেব অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় গৌতম বুদ্ধের কথা এবং তাঁকে অবলম্বন করে সমস্ত শিল্পকর্মের কথা বর্ণনা করেছেন এই বইটিতে। একটা অত্যন্ত মূল্যবান সংগ্রহ।
না স্বর্গের লোভ, না নরকের ভীতি, না ঈশ্বরের আশীর্বাদ কিংবা ক্ষমার প্রেরণা, বুদ্ধ দেখালেন না কোন নতুন পথ, বরং চিরকাল ধরে মানুষের ভেতরের অনাবিষ্কৃত পথটি দেখিয়ে দিলেন। তথাগত বুদ্ধ, যার হৃদয়টি বস্তুবাদের কিন্তু শরীরটি ভাববাদের। আর সেই ভাববাদকে কেন্দ্র করে বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় চারশ বছর পরে শ্রমণরা নির্মাণ করেছিলেন বুদ্ধের নির্বাণ মূর্তি। তবে এই নির্মাণে ছিল বিবর্তনধারা। যা বুদ্ধের মৃত্যুর চারশ বছর ধরে ধীরে ধীরে দানা বাঁধে।
কেমন ছিলেন তথাগত বুদ্ধ?
অবনত ধ্যানী চোখ, স্নিগ্ধ করুণামাখা মুখ, দীর্ঘায়িত কান, পদ্মাসনে অধিষ্ঠিত, কাধের প্রান্ত ছুঁয়ে জড়ানো চীবর, মাথায় শামুকের খোল সদৃশ্য জটা চুল, হাতে বিভিন্ন (বরদ, অভয়, সতর্ক কিংবা ধর্মচক্র) মুদ্রা। আজকের রেশম পথ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে যে বুদ্ধকে আমরা দেখতে পাই তিনি প্রকৃতই এমন ছিলেন? সেই প্রশ্নের অনুসন্ধান করেছে চিত্রা দেব ওনার 'বুদ্ধদেব কেমন দেখতে ছিলেন পুস্তকে।' যা অসামান্য শ্রমলব্ধ একটি গবেষণা।
গৌতম বুদ্ধ, একক ব্যক্তি হিসাবে যার চিহ্ন, চৈত্য, স্তুপ, মুদ্রা, মূর্তি, অস্থিমন্দরে যে পরিমাণে এশিয়াজুড়ে বিগত দুহাজার বছর নির্মাণ হয়েছে অন্য কোন ব্যক্তি কিংবা দেবতার হয়নি। অথচ বুদ্ধ তাঁর জীবনকালে শুধু বলতেন, 'এই নশ্বর দেহের ছবি এঁকে, মূর্তি গড়ে তাকে স্থায়ী রূপ দেবে কী করে? যা ধুলোয় মিশে যাবে তাকে ধুলো হয়ে যেতে দাও। আমায় প্রণাম না করে তোমরা যদি সদধর্ম পালন করে নিজেদের উন্নতি করো তা হলেই আমি সুখী হব।' কয়েক শতক পর্যন্ত শ্রমণ, ভিক্ষুরা বুদ্ধের ইচ্ছাকে সম্মান প্রদর্শন করলেও ব্রাহ্মণ্যধর্মের (বর্তমান হিন্দু ধর্ম) সাথে প্রতিযোগিতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে পারেননি।
সিদ্ধার্থ জন্মের পূর্বে মাতা মহারাণি মহামায়াদেবী স্বপ্ন দেখেছিলেন, একটি সাদা হাতি শুঁড়ে করে একটি সাদা পদ্মফুল ধরে তাঁর পাশে বসে আছে। জ্যোতিষীরা এই স্বপ্নটি অত্যন্ত শুভ বলে ইঙ্গিত করেছিলেন। বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ প্রাথমিক পর্যায়ে এই ঘটনাটি ঠাঁই করে নিলো শ্রমণদের নির্মিত চৈত্যের দেওয়ালে কিংবা গুহাচিত্রে (প্রচ্ছদের ছবিটি বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য)। অতঃপর একইভাবে খুদিত হলো বোধিবৃক্ষের চিত্র যেখানে চারিদিকে অর্হৎ , শিষ্যরা উপস্থিত কিন্তু বুদ্ধ অনুপস্থিত। এক ব্যাকুল প্রতীক্ষা সে চিত্রে ফুটে উঠেছে। বড় পরিসরে খোদিত বুদ্ধের চিহ্ন হলো তথাগতের জোড়াপদ, পদচিহ্ন। কম্বোডিয়া, মানয়মার, শ্রীংলকা, সিকিম, কিউজিং, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে এখনো এ ধারার ভাস্কর্য নির্মাণের রীতি দেখা যায়। এভাবে একটি একটি শতক তৈরি হচ্ছে শ্রমণ হৃদয় থেকে ছেনিতে বুদ্ধ মূর্তির পূর্ণাঙ্গতা তুলে দিতে।
বুদ্ধমূর্তির পুরাতত্ত্ব ও ইতিহাসের মাঝে সম্রাট অশোককে ন��য়ে দুটো কথা বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পরে অশোক যে কাজটি করেছিলেন সেটা ইতিহাসে গুরুত্বের বিচার কলিঙ্গ বিজয় থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। সম্রাট অশোক খ্রিস্টপূর্ব ২৪৯-এর কোনও এক সময়ে গেলেন লুম্বিনী গ্রামে এবং অনুসন্ধানের শেষে সিদ্ধার্থের জন্মস্থানে স্থাপন করলেন একটি অশোকস্তম্ভ। আর এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে গৌতম বুদ্ধ ঐতিহাসিক চরিত্র হিসাবে প্রমাণিত হয়ে গেলে। তিনি পুরাণ, স্মৃতিশাস্ত্রের কোন চরিত্রের মত আর রহস্য ও সংশয়ময় রইলেন না। তাঁর অস্তিত্ব প্লাবিত হলো ইতিহাসের আলোয়। উল্লেখ্য, ভারতের পতাকায় ব্যবহৃত অশোকস্তম্ভটি সম্রাট অশোক নিয়েছিলেন বুদ্ধের ধর্মচক্র থেকেই এবং ভারতীর জাতীয় প্রতীক সারনাথের সিংহ মূলত শাক্যসিংহ, যেটি গৌতম বুদ্ধের শাক্যবংশের তথা বুদ্ধেরই প্রতীক।
প্রথম বুদ্ধ ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে আছে অনেক প্রচলিত গল্প। হয়তো জাতকের ছবি আঁকতে আঁকতে এসব গল্পের সূত্রপাত। লেখিকা বইটির ৮৮ থেকে ৯২ পৃষ্ঠার মাঝে এমন ১০ টি গল্পের অবতারণা করেছেন। তাদের মাঝে অন্তত একটি উপস্থাপন করা যেতে পারে,
'আরাকানের গল্পে আছে, একটা মূর্তি তৈরি হয়েছিল বুদ্ধের জীবিতকালে। শিল্পী পিতলের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তৈরি করে যখন কিছুতেই জোড়া দিতে পারছেন না, ব্যাকুল হয়ে মনে মনে বুদ্ধকে ডাকতে লাগলেন। করুণাময় বুদ্ধ এলেন আরাকানের আকিয়াবে। মূর্তিটিকে দু' হাতে জড়িয়ে ধরে বুদ্ধ সাতবার আলিঙ্গন করলেন। মূর্তিটিও নিখুঁতভাবে জোড়া লাগল। কে আসল আর কে নকল বোঝা গেল না।'
কাগজে কলমে এখনও পর্যন্ত পাওয়া বুদ্ধ মূর্তির মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হল ৬ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত লোরিয়ান টঙ্গাইয়ে পাওয়া মূর্তিটি। যদিও এরও পূর্বের বৌদ্ধমূর্তি আবিষ্কার হতে পারে শুধু সময়ের ব্যাপার। তবে বৌদ্ধ পুরাতত্ত্ব একটি সময় বুদ্ধের সাধনার অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়ে। হাজার হাজার শ্রমণ, ভিক্ষুরা, মিরানে তীব্র মরুভূমি, হিন্দুকুশের খাড়া পাহাড়ে, রেশমপথের দুর্গম পথজুড়ে, তিব্বতের হিমঠান্ডায় কিংবা বরেন্দ্র অঞ্চলের জঙ্গলে নির্মাণ করেছে অসংখ্য স্তুপ, গোমপা, বিহার, মূর্তি, চিহ্ন। এশিয়ার দূর দূরান্ত, মনুষ্য চলার অনুপযোগী পথে এগিয়ে গেছেন বুদ্ধের বাণী পৌছে দিতে। আবার কোথাও মানব সমাজ থেকে হাজার মাইল দূরত্বে নির্জনে বুদ্ধের সাধণা করতে। যেখানে কাউকে দেখাবার কিছু নেই। আছে সামনে শুধু তথাগতের ধ্যান আর আকাঙ্ক্ষা বর্জনের অনুশীলন।
তবে বৌদ্ধ মূর্তি নির্মাণে সারা এশিয়াকে সবথেকে বেশি প্রভাবিত করেছেন গান্ধারের শিল্পীরা। আজও অধিকাংশ বৌদ্ধ মূর্তিতে আমরা সেই প্রভাব লক্ষ্য করতে পারি। তবে এছাড়াও মথুরাও ভারতবর্ষের বৌদ্ধ পুরাতত্ত্বে স্পষ্ট ছাপ রেখে গেছে। মূলত কনিষ্ক সম্রাজ্যের সময় বুদ্ধদেবের ভাস্কর্য নির্মাণ একটা পরিপূর্ণ আকার অর্জন করে। যা পরবর্তীতে ছড়িয়ে যায় লংকা, শ্যামদেশ, চীন, তিব্বত, মালয়, জাভাসহ বহু অঞ্চলে।
চিত্রা দেব এই গ্রন্থে সারা এশিয়ার সব গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বুদ্ধ মূর্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। চিন্তা করে দেখুন কতটা কঠিন একটি প্রয়াস। লেখিকার লেখনীর গতিধারা স্পষ্ট। এই বিরাট কর্মযজ্ঞে কোথাও খেই হারাননি। তবে নন-ফিকশন পড়ার নিয়মিত অভ্যাস আর বুদ্ধকে নিয়ে আগ্রহ না থাকলে বইটি ৮০ পৃষ্ঠার পরে এগিয়ে যাওয়া একটু কষ্টসাধ্য হতে পারে। তবে নিজের পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দিতে পারি, গুগল খোলা রেখে পড়ে গেলে আর বর্ণিত বুদ্ধমূর্তি দেখে নিলে ব্যাপারটায় আগ্রহ বেশ ধরে রাখা যায়।
অনেক কথা বলা হলেও কিছুই বলা হলো না। যারা বইটি পড়েছেন বা পড়বেন বুঝতে পারবেন। পরিশেষে শেষ করি, কবিগুরুর চোখে বুদ্ধ কেমন ছিলেন সেকথা জানিয়ে। বসেছেন পদ্মাসনে প্রসন্ন প্রশান্ত মনে, নিরঞ্জন আনন্দমূরতি । দৃষ্টি হতে শান্তি ঝরে, স্ফুরিছে অধর - ' পরে করুণার সুধাহাস্যজ্যোতি । (মূল্যপ্রাপ্তি)
"বইয়ের ভূমিকায় লেখিকা স্বয়ং বলেছেন, বুদ্ধদেব কেমন দেখতে ছিলেন কেউ জানে না অথচ বিশ্বের সকলেই তাঁকে চেনে। "
এই বইটিতে লেখিকা বুদ্ধদেব এবং বৌদ্ধধর্ম নিয়ে খুব বেশি একটা আলোচনায় যাননি। এর কারণ হয়ত একই বিষয় নিয়ে আগে এতো লেখা হয়েছে যে আরও একটি বই লেখার হয়তো প্রয়োজন ছিলনা। বরং লেখিকা বিভিন্ন বুদ্ধের মূর্তি চিত্রকলা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর ফাঁকে ফাঁকে গল্পের ছলে শুনিয়ে গেছেন বুদ্ধ, মৈত্রেয় ও বোধিসত্ত্বের বিভিন্ন রূপ যা দেশ কালের সীমানার সাথে সাথে বদলে গেছে শিল্পীর কল্পনায় মিশ্রণে। বুদ্ধদেব নিজেই মূর্তিপূজা ও মন্দির স্থাপনের বিরোধী ছিলেন। অথচ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরই শিষ্যরা হাজারে হাজারে মূর্তি ও মন্দির তৈরি করে গেছেন। কখনো সেইসব মন্দিরে স্থান পেয়েছে অমিতাভ বুদ্ধ, কখনো বোধিসত্ত্ব কখনো বা মৈত্রেয় বুদ্ধ। কল্পনা ও কিংবদন্তি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। জাতকের কাহিনীর চিত্রকল্প মন্দিরের গুহার দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা হয়েছে। গান্ধার যা বর্তমানে কাবুল কান্দাহার তা থেকে ভারতবর্ষের মগধ সাম্রাজ্য ছাড়িয়ে নেপাল, তিব্বত, চীন, থাইল্যান্ড জাভা, সুমাত্রা, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ইত্যাদি হয়ে জাপান, কোরিয়া ও শ্রীলঙ্কা অব্দি ছড়িয়ে গেছে বৌদ্ধধর্ম। তার সাথে সাথে পৌঁছে গেছে চিত্রকলা ও শিল্প। একসময় ইউরোপের রেনেসাঁ যেমন খ্রিষ্টধর্মের গল্পগুলির চিত্রকল্প ও ভাস্কর্যের রূপদানে এক চরম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল, বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবেও তেমনি শিল্পীরা হাজির হয়েছেন বামিয়ানে। শিখেছেন কিভাবে পাহাড়ের গুহার দেয়ালের আঁকতে হয় রঙিন চিত্রকলা। সুদূর ইতালি থেকে কুষাণ যুগে শিল্পীরা পাড়ি দিতেন কান্দাহারে, যেখানে শেখানো হতো চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও ধাতু গলিয়ে কিভাবে মূর্তি তৈরি করা হয়। একটা ধর্ম যখন তার চরম সাফল্যের শিখরে পৌঁছায়, তা কেবল মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনে প্রভাব বিস্তার করে না, বরং সামগ্রিকভাবে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক আলোড়ন তৈরি করে। এর সাথে সাথেই প্রস্ফুটিত হয় চিত্রকলা ভাস্কর্য ও অন্যান্য নান্দনিক শিল্পের। বৌদ্ধ ধর্ম বারবার বিধর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে ক্ষতি করা হয়েছে স্তুপ ও গুম্ফার। ভারতবর্ষে বহু বৌদ্ধ স্তুপের উপর গড়ে উঠেছে হিন্দু মন্দির। শঙ্করাচার্যের প্রভাবে ভারতবর্ষ থেকেই একসময় বুদ্ধধর্ম প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে তিব্বতি দলাই লামার ভারত আগমনে কিছু কিছু জায়গায় বৌদ্ধ ধর্ম এখনো সক্রিয়। বাংলাদেশের কিছু বৌদ্ধ স্তুপ শেষ অস্তিত্বের লড়াই লড়ছে। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা সাধারণত শান্তিপ্রিয়। ধর্মীয় আচার আচরণ ও ধর্মগ্রন্থ পাঠ তাদের জীবনের মূল লক্ষ্য। তাই আমরা দেখেছি অনেক বৌদ্ধস্তুপ কোলাহলের থেকে বহুদূরে নির্জন গোপনস্থানে তৈরি করা হয়েছে। ভুটানের টাইগার নেস্ট এমনই একটি স্থান। যেখানে আজকের দিনেও সহজে পৌঁছানো যায় না। সমাজতান্ত্রিক চিনে সাম্প্রতিককালে এমন সব জায়গায় বৌদ্ধধর্মের উপস্থিতি আবিষ্কার করা হয়েছে যা কল্পনার বাইরে। এইভাবেই বহু বছর ধরে বহু ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করে বৌদ্ধ ধর্ম মানব কল্যাণের জন্য শান্তির বাণী প্রচারের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দু'হাজার বছর হল বুদ্ধদেব গত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বদলে গেছে এই ধর্ম ও তার আচার-আচরণ। তারই সঙ্গে কল্পনা করা হয়েছে কেমন দেখতে ছিলেন শাক্যসিংহ সিদ্ধা���্থ। এই বইটিতে বারবার তাই ফিরে ফিরে এসেছে কাশ্মীর, নেপাল, ভুটান, চীন, তিব্বত, শ্রীলংকা, মায়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, কোরিয়া, জাপান ইত্যাদি দেশের বুদ্ধ মূর্তির রূপ ও বৈচিত্র্য।
বুদ্ধ ও তাঁর পরবর্তী সময়কালকে একটা পরিসরের মধ্যে ধরতে গেলে এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।
অনেক অনেক বছর আগে, পৃথিবীর এক প্রান্তে এক যুবক শিল্পী হঠাৎ জানতে চাইল—গৌতম বুদ্ধ আসলে দেখতে কেমন ছিলেন? সে তো দেখেছে মূর্তির পর মূর্তি, কখনো চীনে চশমা পরা বুদ্ধ, কখনো থাইল্যান্ডে স্বর্ণজ্যোতির মুখ, কখনো গান্ধারে একদম গ্রিক রাজপুত্রের মতো চেহারা। কিন্তু সত্যি কি তিনি এমনই ছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চিত্রা দেব লিখলেন এক আশ্চর্য বই—‘বুদ্ধদেব কেমন দেখতে ছিলেন’
শুরু হল তাঁর পথচলা। দেখা গেল, বুদ্ধ নিজেই বলেছিলেন, "এই দেহ নশ্বর, আমার ছবি এঁকে কী করবে?" তাই প্রথমে তাঁর কোনো মূর্তিই গড়া হয়নি। শুধু তাঁর পদচিহ্ন, বোধিবৃক্ষ, খালি সিংহাসন এইসব চিহ্নে ধরা পড়ল উপস্থিতি।
তবে মানুষ তো চায় দেখতে,ভাবতে, ছুঁতে, প্রণাম করতে। তাই শতাব্দী পেরোতে না পেরোতেই শুরু হলো বুদ্ধমূর্তির নির্মাণ। আর সেই শিল্পকর্মে হাত লাগালেন গান্ধারের শিল্পীরা, এনে দিলেন বুদ্ধের মুখে গ্রিক সৌন্দর্য। পরে মথুরা শিল্পে ফুটে উঠল এক দেশজ, শান্ত ও সহজ বুদ্ধ। এই দুই ধারায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠল আমরা যাঁকে এখন চিনি—চোখে ধ্যান, মুখে করুণা, হাতে ধর্মচক্রের মুদ্রা।
বইটিতে এক গল্প আছে,আরাকানে এক শিল্পী যখন বুদ্ধের মূর্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন, তখন স্বয়ং বুদ্ধ এসে মূর্তিটিকে সাতবার জড়িয়ে ধরেন। মূর্তি হয়ে যায় নিখুঁত। কে বুদ্ধ, কে মূর্তি, বুঝে ওঠা যায় না।
কিন্তু এই মূর্তি শুধু তৈরি হয়েছে তাই নয়, ধ্বংসও হয়েছে বহুবার। আফগানিস্তানের বামিয়ানে তালিবানরা উড়িয়ে দিয়েছে হাজার বছরের পুরনো বুদ্ধমূর্তি। আবার অনেক মূর্তি বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, চিরতরে হারিয়ে গেছে উপাসনার ঘর থেকে।
চিত্রা দেবের বইটি তাই শুধু মূর্তির নয়, এক যাত্রার গল্প—যেখানে ইতিহাস, শিল্প, ধর্ম আর মানুষের চিরন্তন প্রশ্ন একসূত্রে গাঁথা। পাঠ শেষে মনে হয়, বুদ্ধের মুখ যতটা পাথরে খোঁজা যায়, তার চেয়েও বেশি খুঁজতে হয় নিজের হৃদয়ে।
বুদ্ধের জীবনী , বুদ্ধের দর্শন নিয়ে তো প্রচুর বই আছে ; এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনাও হয়। তুলনায় এর কথা কম শুনি।
এই বইয়ের প্রথমেও খুব ছোট্ট করে বুদ্ধের জীবনী আছে অবশ্য , কিছুটা ওই ভুরিভোজ শুরুর আগে পাতে লেবু-লঙ্কা দেওয়ার মতো। তারপর লেখা বয়ে গেছে অন্য খাতে।
বুদ্ধ নাকি নিজের মূর্তি গড়ানো পছন্দ করতেন না। তাই সব বুদ্ধমূর্তিই তৈরি হয়েছে তাঁর মহাপরিনির্বাণের অনেক কাল পরে৷ অথচ কিছু কিছু ক্ষেত্রে তথ্য অন্য কথা বলছে। মনে হচ্ছে সেসব মূর্তি তৈরি হয়েছে বুদ্ধের জীবদ্দশাতেই। তাহলে কোনটি সঠিক ?
এইসব নিয়ে এই বইতে আছে বিশদ আলোচনা। আছে বামিয়ান এবং লেসাঙের দৈত্যাকার বুদ্ধমূর্তির প্রসঙ্গ , শ্রীলঙ্কার ডাম্বুলা গুহা সম্পর্কে আলোচনা।
পুরো বিষয়টাই লেখিকা শুনিয়েছেন বৈঠকি ঢঙে। অযথা শক্ত শব্দ বা গুরুগম্ভীরতা নেই। তথ্য আছে , কিন্তু সেসবের ভারে বইটি ভারাক্রান্ত হওয়ার বদলে সমৃদ্ধ হয়েছে। উপরি পাওনা আনন্দের অপূর্ব ছাপাইতে বেশ কিছু সাদা-কালো এবং রঙিন ছবি।
হয়ত এই বিষয় আরও বিশদ আলোচনা , আরও বিস্তৃত পরিসর দাবি করে। তবুও প্রাথমিক স্তরে কিছু জানতে গেলে এই নাতিস্থূল-নাতিক্ষীণ বইটা পড়ে দেখাই যায়।
A brilliant collection of lucid-yet-informative articles on Gautama Buddha, Buddhism and various historical facts associated with Buddha. I had read a slimmer version of this book long back, and it had truly inspired me to read history as something more than dates & names. This bigger & newer version, although ostensibly meant for the younger readers, is a delight for all. Highly Recommended.