বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের মাসুদ রানাকে পাঠানো হলো ফটোগ্রাফারের ছদ্মবেশে। কিন্তু কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে পড়লো মোলাসেস সেন্ট- অর্থাৎ চিটাগুড়ের গন্ধ।
ব্যাপার কি? এ যে বিষাক্ত কেউটের চেয়েও ভয়ঙ্কর! রানার মৃত্যুসংবাদ প্রচার করেও কি ধোঁকা দেয়া গেল ওদের?
কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
গল্পটা অনেকটা খণ্ড খণ্ড আকারে লেখা। থ্রিলার গল্পের ক্ষেত্রে এই স্টাইলটাকে আমার খুব একটা ভালো লাগে না, কারণ এক নিঃশ্বাসে পড়ে যাওয়ার মজা এই ধরণের লেখা থেকে পাওয়া সম্ভব না। তবুও এই দিকটা লেখক ভালোই সামলে নিয়েছিলেন। গল্পের পুরোটা জুড়ে টানটান উত্তেজনাটা বজায় না থাকলেও ফিনিশিংটা ভালোই দিয়েছেন।
মাসুদ রানা শুরু থেকে পুরো সিরিজপড়ার মিশনের অংশ হিসেবে পড়লাম ২য় বই ভারতনাট্যম। প্রথমবার পড়েছিলাম সেই ক্লাস সিক্সে থাকতে, তাও ১৪/১৫ বছর আগে। কাহিনি মোটামুটি সবটাই মনে থাকলেও খুঁটিনাটি অনেক কিছুই স্বাভাবিক ভাবেই মনে ছিল না।
প্রথম বই ধ্বংস পাহাড়ের তুলনায় ভারতনাট্যমের লেখনী আরেকটু আঁটসাট, স্মার্ট। সুলতার সাথে রানার সম্পর্ক পড়তে গিয়ে যেমন মেলোড্রামা মনে হচ্ছিল, এটায় তা অনেকটাই অনুপস্থিত। মিত্রাকেও ভালো লেগেছে বেশ, নিজ দেশ আর প্রেমের প্রতি দোদুল্যমানতাটা আরোপিত লাগে নি। জয়দ্রথ মৈত্র মশাইও নেগেটিভ চরিত্র হিসেবে ঠিকঠাক।
তবে জুয়ার আড্ডায় রানার টানা চার দান জিতে ফেলাটা নাটকীয়ই ছিল। যদিও এই ব্যাটার জুয়া ভাগ্য বরাবরই অবিশ্বাস্য।
ধ্বংস পাহাড়ের তুলনায় রানাও বেশ অনেকটা পরিণত এই বইয়ে। সাথে সোহেলের প্রথম এন্ট্রি।
রানা এই বইয়ে সিনিয়র সার্ভিস ছেড়ে 555 ধরলো।
ভাবি, সোহেলের হাত কাটা পড়ার মিশনটা নিয়ে যদি একটা বই হতো, মন্দ হতো না।
ভারতীয় সাংস্কৃতিক দল এসেছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠান করতে। মেজর জেনারেল রাহাত খান তাদের মাঝে ঘাপলা দেখতে পেলেন। নজর রাখতে গিয়ে পিসিআইয়ের (তৎকালীন) একজন এজেন্ট মারা পড়েছে। এবার পাঠানো হল রানাকে। রানা কি পারবে তাদের দুরভিসন্ধি জেনে আসতে? প্রথম বই ধ্বংস পাহাড়ের চাইতে এই বইটা আরও ভাল।
ভারত থেকে ছদ্মবেশে জয়দ্রথ মৈত্র আর তার দল এলো পাকিস্তানে। পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকা ঘেষে শো করে তারা, কিন্তু শো এর আড়ালে চলছে কোন ষড়যন্ত্র। ফলো করে মাসুদ রানা জানতে পারলো মোলাসেস চিটাগুড় এর গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে তারা পাকিস্তানের সীমান্ত ঘেষা এলাকা দিয়ে। ফরেনসিকের সাহায্য নিয়ে পিসিআই বুঝলো এই গন্ধকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ পঙ্গপাল পাকিস্তানে ছেড়ে দেওয়া হবে, যারা কয়েকদিনে কৃষিক্ষেত্র চাষাবাদের জমি সাফ করে ফেলবে, পাকিস্তান কে 'ভাতে মারার' প্ল্যান। ভারতীয় এজেন্ট মিত্রা সেনের সহায়তা নিয়ে ভারতে ঢুকলো মাসুদ রানা, জয়দ্রথ মৈত্রের এই প্ল্যান বানচাল করতে।
মাসুদ রানার শুরুর দিকের বইগুলো তেমন ভালো হয়নি। মাঝের দিকের দুই একটা পড়ার পর ভাবলাম শুরু থেকে পড়লে হয়তো ভালো হবে। কিন্তু শুরুর কয়েকটা অনেক কষ্টে খুঁজে বের করেও কোন লাভ হয়নি। পড়া যায়; কিন্তু অতো ভালো লাগলো না।
মাসুদ রানা সিরিজের বইগুলো যখন পড়া শুরু করেছিলাম তখন মনে হয়েছিল সবগুলো দিয়েই অ্যাকশন ধর্মী সিনেমা বানানো যায়। এবং এই বইটায় পড়ে মনে হল সুপার সিনেমা হবে। গাড়ি উড়িয়ে ফেলা, হেলিকপ্টার নিয়ে পালানো এরকম অনেক কিছু নিয়ে ফাটাফাটি একটা বই।
কিছু বই থাকে যেগুলা শেষ করার আগ পর্যন্ত মনে উশখুশ থেকে যায় আবার শেষ হয়ে গেলেও আফসোস হয় যে এত তারাতাড়ি কেন শেষ হলো। এইটা সেই ধরনের বইএর কাতারে রাখব আমি।
নাহ তেমন মজা পেলাম না। আহামরি কিছু লাগেনি কাহিনী। রানার শুরুর দিকের বই হিসেবে একদম ধুন্ধুমার মার্কা একশন আশা করেছিলাম সে অনুযায়ী কিছুটা সাদামাটাই লেগেছে আমার কাছে।
ষাটের দশক, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসেছে ভারত থেকে একটি সাংস্কৃতিক দল। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের হওয়ায় দলটির পেছনে গুপ্তচর হিসেবে লাগিয়ে দেওয়া হলো পাকিস্তান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের এজেন্ট মাসুদ রানাকে। বাইরে থেকে সাধারণ একটি সাংস্কৃতিক দল মনে হলেও, আদতে সেটার প্রধান জয়দ্রথ মৈত্র হলো বিশিষ্ট ভারতীয় এজেন্ট 'H'। এক্ষেত্রে এই সাংস্কৃতিক দলের আগমন কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ না তো?
মাসুদ রানাকে ফটোগ্রাফার বানিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো সেই দলে। কিন্তু সেখানে ঘটতে থাকে অদ্ভুত, রহস্যময় সব কান্ড। বিশেষ করে দলের এক সুন্দরী নৃত্যশিল্পী মিত্রা সেনকে নিয়ে ঝামেলা হতে থাকে, যাতে জড়িয়ে পরতে হয় রানাকে। সাথে আবার জড়িয়ে যায় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাবসায়ীদের বখে যাওয়া ছেলেদের ভয়ংকর গ্রুপ 'ইয়ং টাইগার্স'। পরবর্তীতে জানা যায়, এই সাংস্কৃতিক দলের পূর্ব পাকিস্তান আগমন আদতে একটি ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের অংশ। ভারতের বর্ডারের কাছাকাছি অঞ্চল টিটগড়ে চালু হওয়া এক অতি গোপনীয় প্রকল্প যার সাথে সম্পৃক্ত, নাম 'অপরেশন গুডউইল'।
এই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য মাসুদ রানাকে গোপন পরিচয়ে পাঠানো হয় ভারতে। যেখানে পদে পদে তার জন্য অপেক্ষা করছে বিপদ। শত্রু দেশের স্পাই হিসেবে তাকে জব্দ করার জন্য উঠেপড়ে লাগে সেখানকার এজেন্টগণ, ধরা পড়লে আর রক্ষে নেই। এমন অবস্থায় মাসুদ রানা কি পারবে সেই ভয়ংকর ষড়যন্ত্র কি তা বের করে আটকাতে? নিজ দেশকে রক্ষা করতে? জানতে হলে পড়তে হবে কাজী আনোয়ার হোসেনের জনপ্রিয় মাসুদ রানা সিরিজের ২য় বই 'ভারতনাট্যম'।
মাসুদ রানা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আর জনপ্রিয় থ্রিলার সিরিজ বলা যায়। 'ভারতনাট্যম' এই সিরিজের ২য় ও অন্যতম মৌলিক বই। 'ধ্বংস পাহাড়' পড়ার পর এই বইটাও পড়ার ইচ্ছা ছিল। এবং এই বইটাও একই রকম ভালো লাগলো। আসলে সেই সময় বাংলা ভাষায় এই মানের স্পাই থ্রিলার লেখা হয়েছিল, এটা আসলেই একটা গর্বের বিষয়। গল্পটা ভালো, আর এর কন্সপিরেসি থিওরি, বর্ণময় অ্যাকশন দৃশ্য, বিভিন্ন টেকনিক্যাল ব্যাপারের হালকা পাতলা অ্যানালাইসিস, সবই প্রকাশকাল বিবেচনায় প্রশংসার দাবীদার।
বেশ গতিশীল গল্প, মাঝের কিছু অংশ ছাড়া পুরোটা সময় কাহিনী ছিল টানটান উত্তেজনাময়। বাংলাদেশ, ভারত, ব্যাংকক জুড়ে ছুটে চলে কাহিনী। সেইসাথে দারুণ উপভোগ্য সব অ্যাকশন দৃশ্য তো আছেই। কাজীদার লেখনী সাবলীল, সেইসাথে সুন্দর শব্দচয়ন, হিউমারসমৃদ্ধ দারুণ বর্ণনাভঙ্গিকে আমি মনে করি বাংলা ভাষায় অ্যাকশনধর্মী কাহিনীর জন্য আদর্শ। সেইসাথে গল্প হিসেবে স্টিরিওটাইপ চরিত্রগুলো ভালোই ছিল।
তারপরও যে কিছু ব্যাপার খারাপ লাগে নি, তা নয়। তবুও সেগুলো আসলে সময়ের পরিবর্তনের জন্য। প্রকাশকাল বিবেচনায় সেগুলোকে বাদ দেওয়া যায়। আর সেইসাথে সদ্য পড়া কাজীদার 'কুয়াশা' সিরিজের প্রথম ভলিউমের তুলনায় মাসুদ রানার এই বই বহুত এগিয়ে থাকবে। সবমিলিয়ে বেশ লাগলো। এই সিরিজের আরও বেশী করে মৌলিক লেখা বের হলে ভালো হতো।