হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের ‘ক্লিওপেট্রা’: এক প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা ও কর্তব্যের মহাকাব্য
স্যার হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের লেখা "ক্লিওপেট্রা" একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস। ১৮৮৯ সালে প্রথম প্রকাশিত এই বইটি প্রাচীন মিশরের পটভূমিতে রচিত, যেখানে ইতিহাসের সাথে কল্পনা মিশে এক অনবদ্য আখ্যান তৈরি হয়েছে। বইটি শুধুমাত্র মিশরের শেষ ফারাও ক্লিওপেট্রার জীবনী নয়, বরং এটি প্রেম, ঘৃণা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং কর্তব্যের এক করুণ উপাখ্যান।
পটভূমি ও আখ্যানভাগ
উপন্যাসটির মূল প্রেক্ষাপট টলেমীয় যুগের মিশর, যখন রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব ধীরে ধীরে গ্রাস করছিল মিশরকে। গল্পের কথক এবং প্রধান চরিত্র হারমাচিস, যিনি মিশরের প্রাচীন ফারাওদের রাজবংশের শেষ উত্তরসূরি। তাকে শৈশব থেকেই পুরোহিত এবং জাদুকরদের তত্ত্বাবধানে বড় করে তোলা হয় এক মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিশ্বাসঘাতক রানী ক্লিওপেট্রাকে সিংহাসনচ্যুত করে মিশরের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করা এবং নিজে ফারাওয়ের সিংহাসনে বসা।
গল্পের আখ্যান শুরু হয় অনেক পরে, যখন প্রত্নতাত্ত্বিকরা একটি প্রাচীন সমাধিতে হারমাচিসের নিজের হাতে লেখা প্যাপিরাসের স্ক্রোল খুঁজে পান। সেই স্ক্রোলের পাঠোদ্ধারের মাধ্যমেই হারমাচিসের জীবনের করুণ কাহিনী উন্মোচিত হয়।
হারমাচিস তার দীর্ঘ প্রস্তুতির পর অ্যালেক্সান্দ্রিয়ায় আসেন এবং রানীর চিকিৎসক ও জ্যোতিষী হিসেবে রাজসভায় স্থান করে নেন। তার মূল পরিকল্পনা ছিল সুযোগ বুঝে ক্লিওপেট্রাকে হত্যা করা। কিন্তু সৌন্দর্যের প্রতিমা, বুদ্ধিমতী ও রহস্যময়ী ক্লিওপেট্রার সান্নিধ্যে এসে হারমাচিসের সংকল্প টলে যায়। রানীর প্রতি তার তীব্র ঘৃণা ধীরে ধীরে গভীর প্রেমে রূপান্তরিত হয়। একদিকে দেশের প্রতি, তার পূর্বপুরুষদের প্রতি এবং দেবতাদের প্রতি তার কর্তব্য, অন্যদিকে ক্লিওপেট্রার প্রতি তার সর্বগ্রাসী প্রেম এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে হারমাচিস ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে।
এই প্রেমই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। ক্লিওপেট্রা হারমাচিসের দুর্বলতার স���যোগ নেন এবং তার মাধ্যমে ষড়যন্ত্রের সকল তথ্য জেনে নেন। উপন্যাসের শেষে হারমাচিসের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় এবং তার জীবনের করুণ পরিণতি ঘটে, তবে তার তৈরি করা বিষেই পরবর্তীতে ক্লিওপেট্রা আত্মহত্যা করেন বলে কাহিনীতে উল্লেখ করা হয়।
প্রধান চরিত্রসমূহ
হারমাচিস: উপন্যাসের নায়ক ও কথক। তিনি মিশরের প্রাচীন রাজবংশের ধারক এবং একজন শক্তিশালী জাদুকর। দেশের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিলেও ক্লিওপেট্রার প্রেমে পড়ে তার লক্ষ্যচ্যুত হন।
ক্লিওপেট্রা: মিশরের ঐতিহাসিক রানী। হ্যাগার্ড তাকে শুধু একজন রূপসী শাসক হিসেবেই দেখাননি, বরং দেখিয়েছেন একজন ধূর্ত, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং নিষ্ঠুর নারী হিসেবে, যিনি নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য যেকোনো পথ অবলম্বন করতে পারেন।
চার্মিয়ন: হারমাচিসের চাচাতো বোন এবং ক্লিওপেট্রার প্রধান সহচরী। সে ষড়যন্ত্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং হারমাচিসকে তার কর্তব্য বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। তার চরিত্রটিও বেশ জটিল এবং রহস্যময়।
মূলভাব ও লেখনীর ধরণ
হ্যাগার্ডের লেখনীতে প্রাচীন মিশরের এক জীবন্ত চিত্র ফুটে উঠেছে। তখনকার সামাজিক প্রথা, ধর্মীয় বিশ্বাস, জাদুবিদ্যা এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের নিখুঁত বর্ণনা পাঠকদের সেই সময়ে নিয়ে যায়। বইটির মূল উপজীব্য বিষয়গুলো হলো
কর্তব্য বনাম আবেগ,হারমাচিসের ভেতরের দ্বন্দ্বই এই উপন্যাসের মূল চালিকাশক্তি।প্রেম ও বিশ্বাসঘাতকতা , প্রেম কীভাবে একজন মানুষকে তার লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দিতে পারে এবং বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা এই উপন্যাসে দেখানো হয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতি, ক্লিওপেট্রার চরিত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার জন্য মানুষের নৈতিক অধঃপতনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা অ্যাডভেঞ্চার, প্রেম ও ট্র্যাজেডির মিশেলে "ক্লিওপেট্রা" একটি ক্লাসিক সাহিত্যকর্ম যা আজও পাঠকদের মুগ্ধ করে।