বই: Kali: The Black Goddess of Dakshineswar
লেখক: Elizabeth U. Harding
প্রকাশক: Hays (Nicolas) Ltd ,U.S.;
প্রকাশকাল: জুলাই ৮, ২০০৪
ফরম্যাট: পেপারব্যাক
পৃষ্ঠা: ৩৫২
মূল্য: ১৫০৯/-
পাঁচ অধ্যায়ের ছোট্ট বই।
পাঁচটি অধ্যায়ের শিরোনাম এরকম :
সূচিমুখ : God, the Mother
প্রথম অধ্যায়: The Dakshineswar Kali Temple
দ্বিতীয় অধ্যায়: Kali, the Black Goddess of Dakshineswar
তৃতীয় অধ্যায়: Worship of Kali
চতুর্থ অধ্যায়: Temple History and Surroundings
পঞ্চম অধ্যায়: Ma Kali's God-Intoxicated Mystics
জাগতিক সত্য ব্রহ্ম সত্যের একটি অংশ মাত্র। ব্রহ্মসত্যের অনুধাবন পথ ও জগৎসত্যের অনুধাবন পথ স্বতন্ত্র।
ব্রহ্মসত্যের মজা এইটাই যে উপলব্ধির পর্বে পর্বে সাধক বলুন বা আমার মতো পতিত, দুর্জন, ভোগী, পাপিচোদনা পেয়ে যায় নতুন নতুন সত্য।
মা নতুন নতুন করেই ধরা দেন ভক্তের চিত্তে। আমার মা অসীম। তিনি সদা স্বতঃই হয়ে ছিলেন ব্যাপ্ত , বিস্তৃত , আবার ক্ষুদ্রতমের চেয়েও ক্ষুদ্র।
ত্বমু ত্বা বাজসাতমম। অঙ্গিরস্বৎ হবামহে। ..
আমার মা হন তিনি। আক্ষরিক অর্থে।
প্রচন্ড আতঙ্কে মা'কে জড়িয়ে ধরেছেন পাঠক ? মায়ের গায়ের গন্ধে পরমাশ্রয় লাভ করেছেন ?
মা আমার এক ও অদ্বিতীয়া, তাঁর মত কেউ নেই, তাঁর সামান্যও কেউ নেই।
" ন দ্বিতীয়ো ন তৃতীয়শ্চতুর্থো না পূচ্যতে
ন পঞ্চমো ন ষষ্ঠঃ সপ্তমো না পূচ্যতে
নাষ্টামো ন নবমো দশমো না পূচ্যতে
য এতং দেবমেক কৃতং বেদ।।(অথর্ববেদ ১৩/৪/২)
সনাতন ধর্মমতে আমার মা শক্তির দেবী।
'কাল' শব্দটির অর্থ সময় হতে পারে, আবার এটা রঙও বোঝাতে পারে। 'কাল' তথা 'কৃষ্ণবর্ণ' শব্দের অর্থ হতে পারে মৃত্যুবোধক। মায়ের নাম মহাকালীও বটে। কালীর নাম 'কাল' না হয়ে 'কালী' হলো কেন? শিবের অপর নাম যে কাল, যা অনন্ত সময়কাল বোধক। মাতৃরূপিণী কালী হচ্ছেন কাল-এর স্ত্রীলিঙ্গ বোধক।
মা কালী মা দুর্গা বা পার্বতী’র সংহারী রূপ। ঊনবিংশ শতাব্দীর সংস্কৃত ভাষার বিখ্যাত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম এ বলা হচ্ছে ‘কাল শিবহ্। তস্য পত্নতি কালী।’ অর্থাৎ শিবই কাল বা কালবোধক।
তাঁর পত্নী কালী।
কালী হচ্ছেন মা দুর্গার বা পার্বতীর অপর ভয়াল রূপ।
তিনি সময়ের, পরিবর্তনের, শক্তির, সংহারের দেবী। তিনি কৃষ্ণবর্ণা বা মেঘবর্ণা এবং ভয়ংকরী। আমরা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভয়ংকরেরও পূজা করি।
অশুভ শক্তির বিনাশ করেন মা আমার। তাঁর এই শক্তির পূজা সনাতন সমাজকে প্রভাবিত করেছে, বিশুদ্ধ শক্তি সঞ্চারিত করেছে, অন্তর শুদ্ধি দিয়েছে, দুর্দিনের দুর্বলতায় সাহস দিয়েছে।
লেখিকা বলছেন : Hindus also refer to Shiva and Shakti as Purusha (soul) and Prakriti (nature)—theprinciple behind the pair of opposites, the Yin and Yang. If we accept good,we equally must accept bad—hot/cold, love/hate, war/peace.
Prakriti is Maya, Brahman's veiling power. This world, as we perceive it, isMaya—an illusion—and because most of us cannot behold Brahman, Maya is real tous. But, just like fog that lifts when the sun comes out, Maya disappears whenthe knowledge of Brahman dawns. One then transcends the pair of opposites, andonly the One remains. Only Brahman is.
Prakriti consists of three gunas (qualities) known as sattva (calmness), rajas(activity), and tamas (inertia). Due to the vicinity of Purusha, Prakriti beginsto vibrate and the three gunas lose their balance. And then, when the gunasstart to vibrate, creation begins. The first manifestation of Prakriti is CosmicIntelligence, called the buddhi tattva or mahat tattva (Great Principle), andfrom it arises the individual consciousness, the ego.
আমার বুড়োবাবা রামকৃষ্ণ কালীময়। তাঁর শক্তির আধার বিবেকানন্দ।
মা সারদার কথা বলেছেন লেখিকা।
সরদার কাছে কালী আর রামকৃষ্ণ অভিন্ন। কালী কালী অজপার মধ্য দিয়ে রামকৃষ্ণ কালী হয়ে উঠলেন।
ইষ্ট আর ভক্ত এক। সন্তানের বশীভূত জননী।
মায়ের সঙ্গে কখনো মান-অভিমানের পালা, কখনো বা নিঃশেষ আত্ম-সমর্পণের শান্ত মূহুর্ত, কখনো রাগ, কখনো রফা, কখনো কান্না, কখনো জবরদস্তি, কখনো দীনতা, কখনো অহঙ্কার, কখনো দাস্য, কখনো প্রভুত্ব। ভক্তির কাছে জননীর বশ্যতা স্বীকার। সন্তানকে চোখে-চোখে রাখা, ঘিরে থাকা।
ভক্তের আবদার রাখতে গিয়ে অঘটনপটীয়সীর নানা খেলা।
বিবেকানন্দের সাধনার ভিতর দিয়ে ভবতারিণী বাংলার অসংখ্য বীর বিপ্লবী তরুণের মনে প্রলয়ঙ্করী মহাকালী রূপে আবির্ভূতা হলেন। বিবেকানন্দের বাণীতে তাঁরা উদ্দীপ্ত“মাকে বুকের রক্ত দিয়ে পুজো করতে হয়, তবে যদি তিনি প্রসন্না হন। মার ছেলে বীর হবে, মহাবীর হবে।
নিরানন্দে দুঃখে মহালয়ে মায়ের ছেলে নির্ভীক হয়ে থাকবে।
শাক্ত সৃষ্টিতত্ত্ব মতে এবং শাক্ত-তান্ত্রিক বিশ্বাস মতে তিনিই পরম ব্রহ্ম। কালীকে এই সংহারী রূপের পরেও আমরা মাতা সম্বোধন করি।
তিনি সন্তানের কল্যাণ চান, তিনি মঙ্গলময়ী, তিনি কল্যাণী--- এটাই তাঁর প্রতি সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল আস্থা ও নির্যাস। একটা ধারণা আমাদের মধ্যে বর্তমান আছে যে, শিব পার্বতীর স্বামী এবং মা কালীর ভাসুর।
কথাটি আদৌ সত্য নয়।
অসুররক্ত স্নাত কোপান্বিতা এই দেবীর সংহারী মূর্তিতে কিছুটা নিবৃত্ত ও প্রশমিত করতে শিব তাঁর চলার পথে শুয়ে থাকলেন। দেবী পথ চলতে গিয়ে তাঁর স্বামী শিবকে পায়ে মাড়ালেন।
এই পাদস্পৃষ্ঠতার লজ্জায় ও তার অনুশোচনায় মায়ের জিহ্বায় কামড় পড়লো। তাঁর কোপভাব স্থিমিত হলো, ছেদ পড়লো।
বাংলার রক্তক্ষরা বিপ্লব ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হয়ে উঠলেন আমার মা।
তাঁর সমগ্র ভাগবতী প্রকৃতি ঝঞ্ঝারুদ্র কর্মের প্রভায় প্রস্ফুরিত, তিনি রয়েছেন ক্ষিপ্রতার জন্য আশফুলদায়ী প্রক্রিয়ার জন্য, সাক্ষাৎ সঘন আঘাতে সব পরাভূত করে সম্মুখ আক্রমণের জন্য।
অভয়ের ভগবতী মূর্তি রূপে মহাকালী বাংলার যুবসমাজের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেন মা আমার। কালী অনুধ্যান কালানলের মত জ্বলে উঠল।
বাংলার কালীসাধনার নতুন মহিমা প্রকাশ পেল। আদ্যাশক্তি মহামায়া বীর সন্তানের কাছেও ধরা দিলেন।
এই বইয়ের লেখক অনুসন্ধান মারফত পাঠককে অবগত করেছেন, ঠিক কেমনভাবে নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সময় থেকে বাংলায় শাক্তধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল।
সেই প্রভাবেই নদিয়া এবং সংলগ্ন এলাকায় বৃদ্ধি পেতে থাকে কালীপুজো। শ্রীরামপুর খ্রিস্টীয় মিশনের পাদ্রি ওয়ার্ড সাহেবের তথ্য অনুসারে জানা যায়, সে সময় নদিয়ায় প্রতি বছর কার্তিকী অমাবস্যায় দশ হাজার কালীপুজো হত।
প্রাচীন নবদ্বীপের গঙ্গার প্রায় উলটো দিকে বেলপুকুরে কৃষ্ণানন্দ-প্রবর্তিত এই কালীপুজোর ধারা ছড়িয়ে পড়েছিল ঘরে ঘরে।
সে সময় শাক্ত এবং বৈষ্ণবের ঘোরতর বিরোধ ছিল। শান্তিপুরের অদ্বৈতাচার্যের উত্তরপুরুষ মথুরেশ গোস্বামী সেই বিরোধ মেটাতে কৃষ্ণানন্দের প্রপৌত্র সার্বভৌম আগমবাগীশের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন।
তবে বৈষ্ণব কন্যাকে বিয়ে করায় নবদ্বীপের তৎকালীন শাক্ত সমাজ সার্বভৌমকে একঘরে করেছিল।
এমনই এক অবস্থায় মথুরেশ তাঁর মেয়ে-জামাইকে শান্তিপুরে নিয়ে আসেন। এর পর বড়গ��স্বামীবাড়ির অদূরে পঞ্চমুণ্ডির আসন প্রতিষ্ঠা করে সার্বভৌম সেখানে কালীপুজোর প্রচলন করেন।
লেখক দেখিয়েছেন যে মায়ের কোন চিরস্থায়ী গুণ বা প্রকৃতি নেই, যার মানে দাঁড়ায় বিশ্ব-প্রকৃতি ধ্বংসের পরেও তিনি বর্তমান থাকবেন।
হিন্দু শাস্ত্রে পূজিতা দেবীদের মধ্যে কালীর রূপ ও চরিত্র সর্বাধিক রোমাঞ্চকর ও বিস্ময় উদ্রেককারী।
ঘোর অমাবস্যার গভীর রাতে তাঁর পূজা সম্পন্ন হয়।
আমার মা ভীষণ দর্শনা, ক্রোধান্বিতা, লজ্জাহীনা। তিনি ভয়ঙ্কর যোদ্ধা, রক্তপিয়াসী। তিনি চির ব্যতিক্রমী।
ঐশী সংযোগ সত্ত্বেও এক দীর্ঘকালীন উপেক্ষার আখ্যান। তবে দুর্বল, দ্বিধান্বিত মন যখনই শক্তি প্রার্থনা করেছে, বল ভিক্ষা করেছে, আমার করাল বদনা মহাতেজা মায়ের শরনাপন্ন হয়েছে।
ঘোর আমানিশায় জনমানবহীন মধ্যরাতের নিভৃত পূজাতেই ছিল তাঁর অধিকার। কোনো ক্ষেত্রে সূর্যের আলো স্পর্শ ও ছিল নিষিদ্ধ। হাজার বছরের বিমুখতা অতিক্রম করে আজকের দীপাবলী উৎসবে যথেষ্ট ধূমধাম সহযোগে তাঁর উপাসনা হয়ে থাকে।
বাংলার বীরভাবের সাধনার রূপটি বিবেকানন্দের কথায় ফুটে উঠেছে— “যাঁরা প্রকৃত মায়ের ভক্ত, তাঁরা পাথরের মত শক্ত, সিংহের মত নির্ভীক। মাকে তোমার কথা শুনতে বাধ্য কর। তাঁর কাছে খোসামোদ কি? জবরদস্তি। তিনি সব করতে পারেন।” বীরসাধনার অন্য পরিচয় দেখি বিবেকানন্দের কবিতায়
আমার মাতৃরূপিণী, স্তন্যদায়িনী মায়ের সাথে আগমবাগীশের মিলনমুহূর্ত মনে করুন পাঠক। কৃষ্ণানন্দ যে মুহূর্তে তাঁর আরাধ্য দেবী কালীর অদেখা রূপটি দেখতে পেলেন, সেই মুহূর্তটি।
ঘোর কৃষ্ণবর্ণা, আলুলায়িত কেশ, দিগম্বরী... বাঁ হাঁতে খড়্গ আর ডান হাতে বরাভয়। তাঁর মনে পড়ে গেল তন্ত্রে বর্ণিত দেবীর ধ্যানমন্ত্র: করালবদনাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাম, কালিকাং দক্ষিণাং দিব্যাং মুণ্ডমালাবিভূষিতাং...
ঠিক যে রূপের বর্ণনা করছেন বীরেশ্বর :
রে উন্মাদ, আপনা ভুলাও, ফিরে নাহি
চাও, পাছে দেখ ভয়ঙ্করা।
দুখ চাও, সুখ হবে বলে, ভক্তিপূজাছলে
স্বার্থ-সিদ্ধি মনে ভরা।
ছাগকণ্ঠ রুধিরের ধার, ভয়ের সঞ্চার
দেখে তোর হিয়া কাঁপে
কাপুরুষ! দয়ার আধার! ধন্য ব্যবহার
মর্মকথা বলি কাকে?
ধ্যানমন্ত্র অনুসারে যাঁর গলায় শোভা পায় মুণ্ডমালা, দুই কানে দু’টি শব, যিনি মহাকালের সঙ্গে বিপরীত রতাতুরা, কৃষ্ণানন্দের প্রভাবে সেই শ্মশানবাসিনী মা কালী আমার হয়ে উঠলেন বাঙালির আদরিণী শ্যামা।
যে কালীপুজো এক সময়ে গৃহে ছিল নিষিদ্ধ, কৃষ্ণানন্দের হাত ধরেই সেই দেবী প্রবেশ করলেন বাংলার ঘরে ঘরে।
সেই সুমহান ধারার সন্ধান দিয়েছেন এই বইয়ের লেখক।
পড়তে পারেন। মন্দ লাগবে না।