Hasan Azizul Huq (Bengali: হাসান আজিজুল হক) is a Bangladeshi writer, reputed for his short stories. He was born on 2 February, 1939 in Jabgraam in Burdwan district of West Bengal, India. However, later his parents moved to Fultala, near the city of Khulna, Bangladesh. He was a professor in the department of philosophy in Rajshahi University.
Huq is well known for his experiments with the language and introducing modern idioms in his writings. His use of language and symbolism has earned him critical acclaim. His stories explore the psychological depths of human beings as well as portray the lives of the peasants of Bangladesh.
He has received most of the major literary awards of Bangladesh including the Bangla Academy Award in 1970.
এমন ছোট্ট একটা বই, কিন্তু কি আশ্চর্য তার ভার! রক্ত-পিচ্ছিল, হাহাকারময় এক সময় একাত্তরকে হাসান আজিজুল হক তার চোখ দিয়ে দেখছেন। এবং আত্মময় চৈতন্যের অনলে দগ্ধ হওয়ার সব ঘটনাই বর্ণনা করেছেন 'একাত্তরের করতলে ছিন্নমাথা' বইটিতে। সেখানে আবেগ আছে, আছে অনুভূতির সব আশ্চর্য রূপ। কিন্তু কোনো মেদ নেই। এখানেই বোধহয় হাসান আজিজুল হক পাঠকের সমস্ত অনুভূতিতে আঘাততে পর আঘাত করতে পেরেছেন। কী অকপটে দ্বিধা দ্বন্দ্বময় সেই সময়কে, ভাষা এবং অনুভূতির চমৎকারিত্বের মুনশিয়ানায় এক-একটি ঘটনার বর্ণনা করেছেন হাসান আজিজুল হক। সেখানে নেই কোনো তথ্যের আধিপত্য, নেই অসত্য কোনো ঘটনা।সমস্তটুকুই লেখকের সময় পরিক্রমায় নিঙ্গড়ানো স্মৃতি। যে স্মৃতি আমাদের করোটিকে আন্দোলিত করবে। দগ্ধ করবে সেই রফিদের ছিন্নমাথা ভুলে যাওয়ায়, যে মাথা কেঁটে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো আমাদের ইতিহাস গলায়। 'একাত্তরের করতলে ছিন্নমাথা' পড়তে পড়তে ডুকে পড়েছিলাম একাত্তরের শঙ্কা, উৎকন্ঠা, দ্বিধাময় সেই সময়ে। হাসান আজিজুল হকের লেখার মুনশিয়ানায় আমি আমি যেন তা সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটছিলাম। সে হাঁটায় কখনো ক্ষুব্ধ হয়েছি, কখনো আন্দোলিত হয়েছি,কখনো বেদনায় কুঁকড়ে গিয়েছি, কখনো রুদ্ধশ্বাসময়তায় মেতে উঠেছি।
" ১৯৭১ সালে সবচেয়ে শস্তা দাম ছিল মানুষের রক্তের। একটু ভুল হলো। মানুষের রক্তের কোনো দামই ছিল না। একবারে বিনা দামে রক্তের স্রোত বইছিল। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জ সেই রক্তস্রোতে ভেসে যাচ্ছিল৷ খাল-বিল-নদী-নালা কানায় কানায় ভরে উঠছিল। " - হাসান আজিজুল হক
মুক্তিযুদ্ধের ন'মাস খুলনার বিভিন্ন এলাকায় পালিয়ে ছিলে হাসান আজিজুল হক। নিজের জীবনস্মৃতি ছাড়াও পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার,রাজাকারদের আস্ফালনের বিষাদময় দিনগুলির কথা লিখেছেন মধুময় গদ্যে। শহিদ রাফি, যাঁর মাথা কেটে বাজারে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল কিংবা মুক্তিযুদ্ধে হারিয়া যাওয়া অদ্ভুত মানুষ খালেদ রশীদের জন্য পাঠকের মন আর্দ্র হয়ে উঠবে।
বিখ্যাত শিরোমণি ট্যাংক যুদ্ধের সময় সেই এলাকার কাছেপিঠেই ছিলেন লেখক। সেই সমরে পাকবাহিনীর পরাজয়ের পর গিয়েছিলেন শিরোমণিতে। সচক্ষে দেখেছেন এই ট্যাংক যুদ্ধের ধ্বংসলীলা। প্রত্যক্ষ করেছেন নরকের কীটসম শত্রুসেনার দেহ পথে-ঘাটে পড়ে আছে। ছিঁড়ে খাচ্ছে শেয়াল-কুকুর।
মাত্র ৯৫ পাতার বই। হাসান আজিজুল হকের জাদুমাখা গদ্যে অসাধারণ সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছিল।
'একাত্তর : করতলে ছিন্নমাথা' কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের একটি স্মৃতিচারণমূলক বই। পাকিস্তানি বাহিনির নরমেধযজ্ঞের কাহিনি(যশোর-খুলনা, বিশেষত খুলনা) ছাড়াও জাতিগতভাবে আমাদের অবস্থান, সাধারণ মানুষের জন্য মুক্তিযুদ্ধ, দক্ষিণাঞ্চলের অকল্পনীয় তাপ, অকহতব্য যন্ত্রণা, চূর্ণ-বিচূর্ণ ছড়ানো অস্থি, পোড়া রক্তমাংসের গন্ধে ভরা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের সচিত্র বর্ণনা বইটিতে উঠে এসেছে।
বইয়ের প্রথম লাইন, "আমার জানা ছিল না যে পানিতে ভাসিয়ে দিলে পুরুষের লাশ চিৎ হয়ে ভাসে আর নারীর লাশ ভাসে উপুড় হয়ে" থেকেই দারুণ এক ভ্রমণ শুরু হবে পাঠকের।
বইটি পড়তে আমি সময় নিয়েছি বইটি শেষ করার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সময়ের দ্বিগুণ। হাসান আজিজুল হকের উপমা প্রয়োগ, ভাষাশৈলীর দারুণ কারুকার্যখচিত কাজ আর কথার গভীরতা আমাকে নাড়িয়ে দিচ্ছিলো বারংবার। আমাকে ভাবাচ্ছিলো; চিন্তা করতে বাধ্য করছিল।
অবশ্য আমিও মেলে ধরেছিলাম নিজেকে; যথেচ্ছা ব্যবহার করেছি নিওকর্টেক্স আর থ্যালামাস-এর। তবে বইতে অনেক বানান ভুল বিরক্তির উদ্রেগ করেছে সময়ে-অসময়ে। এছাড়াও সময়ের কথা উল্লেখ করা নেই অনেক জায়গায়। স্পেসিফিক কোন সময়ের, কোন দিনের কথা লেখক বলছেন, এটা কিছু সময় উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু সময় হয়নি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের বর্ণনা বইটিতে বেশি এসেছে। তবে আমার কাছে প্রথমে সেজন্য কোনো বিরক্তি ঠেকেনি, কারণ আমি সময় পাইনি। পুরো জার্নিটা ভয়ানক স্মুথ ছিল।
পড়তে পড়তে আমি বইয়ের পাতা থেকে ঘুরে বেড়িয়েছি আমার বিশ্ববিদ্যালয়—বদ্ধভূমি(বর্তমানে)—গল্লামারী—ময়ূর নদী—রূপসা নদী—সেন্ট্রাল রোড—হাজী মুহসিন রোড—নতুন রাস্তা—দৌলতপুর—ব্রজলাল কলেজ—শিরোমণি—ফুলতলার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক অব্দি।
জীবনের পুরো সময়টা আমি এই রিজিওনে কাটানোর সুবাদে হাসান আজিজুল হকের যায়গায় নিজেকে বসাতে বেগ পেতে হয়নি একটুও। দারুণভাবে উপভোগ করতে পারছিলাম রাস্তাগুলোর সাথে কাহিনির মেলবন্ধন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর আমি অনেকের কাছেই গল্লামারির বদ্ধভূমির কথা জিজ্ঞেস করেছি। তাদের বেশিরভাগের বক্তব্য আর বইয়ের বর্ণনা হুবহু মিলে যাওয়াতে একটা শান্তি, পরমুহুর্তেই দুঃখ অনুভব করেছি দারুণভাবে।
'যমদূত গাড়ি'র সাথে ভৈরবের খাড়ি, ময়ূর নদী ও এর পাশের শ্বশানঘাট, বদ্ধভূমির ফিজিক্যাল এক্সিসটেন্স আমাকে ভৌগলিকভাবে কল্পনা করতে খুবই সাহায্য করেছে। পরবর্তীতে বই শেষ করার পর যখন চিন্তা করতে শুরু করেছি বইয়ের আদ্যোপান্ত নিয়ে, তখন অসুবিধার কথাগুলো মাথায় এসেছে। ভূমিকা পুনরায় পড়ার পর বিষয়টা পরিষ্কার হয়েছে। তবে খুলনাঞ্চলের বিহারীদের ওপর বাঙালিদের নির্মম পাশবিক নির্যাতনের কথা না আসায় খুবই আশাহত হয়েছি।
যেহেতু স্মৃতিচারণমূলক বই, সেহেতু ক্যারেক্টার বিল্ডাপের থেকে ক্যারেক্টার পোর্ট্রেট এর ব্যাপারটা বেশি মাথায় রেখেছেন লেখক। শহীদ খালেদ রশিদের দুর্দমনীয় ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগানোর প্রয়াস, সহজ-সরল-অভাবী দিনানিপাত আমাকে বেশ টেনেছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে তুচ্ছজ্ঞান করে যে যোদ্ধারা দেশের মুক্তির জন্য ডেস্পারেট হয়েছিলেন, খালেদ রশিদ তাদের একজন। তাছাড়া অসহনীয় নারকীয় দৃশ্য অবতারণার মধ্য দিয়ে অকুতোভয় শহীদ রফি হত্যা—অমানুষিক বর্বরতার মধ্য দিয়ে শান্তি হত্যায়—অশ্রুসিক্ত হয়েছে চোখ। সতর্ক, কণ্টকিত, স্নায়ু-পীড়নে জর্জরিত মানুষদের সঙ্গে যাতায়াত করতে করতে পথে পথে জনশূন্য কুঁড়েগুলো পুড়তে দেখছিলাম আমিও।
পছন্দের কিছু অংশ:
উকিলবাবু দোতলায় আকাশের দিকে চেয়ে আছেন, নিচে পিচঢালা রাস্তায় গুলিবিদ্ধ তার তিন সন্তান।
রাস্তার ভিড় থেকে চোখ ফিরিয়ে দেখতে পাই বাড়ির সামনের ন্যাড়া উঠোনটায় শুকিয়ে-ওঠা শিউলি গাছটার কঙ্কালে একটি দোয়েল শিস দিচ্ছে।
রক্ত একমাত্র রক্ত দিয়েই শুধতে হয়। রক্তের স্থলে রক্তের বিনিময় চলতে পারে।
ইতিহাস কখনো কখনো ভয়াবহ পীড়াদায়ক নিরবতা অবলম্বন করে।
কঠিন দুঃসময়ে আমাদের বিশ্বাসের ক্ষমতা কমে আসে—মানুষ হিসেবে আমরা নিচে নামি, অন্যদেরও নামাই।
"আমার জানা ছিল না যে পানিতে ভাসিয়ে দিলে পুরুষের লাশ চিৎ হয়ে ভাসে আর নারীর লাশ ভাসে উপুড় হয়ে। মৃত্যুর পরে এদের মধ্যে এইটুকু তফাৎ। এই জ্ঞান আমি পাই '৭১ সালের মার্চ মাসের একেবারে শেষে- ত্রিশ বা ঊনত্রিশ তারিখে।"
হাসান আজিজুল হক একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ছিলেন খুলনা অঞ্চলে। তারিখ বা ক্রমের কিছু বিভ্রাট আছে তা লেখক নিজেই উল্লেখ করেছেন কারণ তিনি নিয়মিত ডায়েরি রাখেননি। তবুও খুরধার লেখনীতে, বর্ণনায়, হৃদয়ের বেদনায় সেই জনযুদ্ধের বিভৎসতা তিনি তুলে ধরেছেন তার স্বভাবসিদ্ধ পারঙ্গমতায়।
বইটা ছোট ছোট অংশে বিভক্ত, অনেকটা ছোটগল্পের সংকলনের মতন।
তবে এখানে উল্লেখ্য যে, খুলনা অঞ্চলে বাঙালিদের দ্বারা বিভিন্ন মিল-কারখানায় কর্মরত বিহারিদের উপর যে অমানুষিক হত্যাযজ্ঞ চালান হয় তা লেখক উহ্য রেখেছেন। হয়তো সে সম্বন্ধ্যে তার তেমন জানা ছিল না, অথবা তিনি তা ইচ্ছাকৃতভাবেই এড়িয়ে গেছেন। সময়টা বড়ই অনিশ্চয়তায় ভরা ছিল, প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর হাতছানি ছিল, প্রিয়জনদের হারানোর ব্যথা ছিল সার্বক্ষণিক সাথী, আত্মরক্ষার স্নায়বিক চাপও আমাদের মনে রাখতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে লেখকের বাস ছিল খুলনা অঞ্চলে। ফলে চোখে দেখা বেশকিছু ঘটনা উঠে এসেছে তাঁর কলমে। লেখনীর প্রশংসা করতেই হয়, তাছাড়া আমি নিজে খুলনার ছেলে হওয়ায় সবকিছু যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। গণহত্যা এবং অত্যাচারের বিবরণ পড়ে বারবার শিউরে উঠেছি। জানতে পেরেছি এই অঞ্চলের অনেক না জানা কথাও।
একটা ব্যাপার শুধু বলতে হয়, লেখকের বিবরণে কিছু তারিখ বিভ্রাট আছে বলে মনে হল। যেমন ব্যাটেল অফ শিরোমনির কথা আমরা যতদূর জানি এটা হয়েছিল রেসকোর্সে মূল পাকিস্তানি বাহিনির আত্মসমর্পণের পর, অর্থাৎ ১৭ই ডিসেম্বর। লেখক উল্লেখ করেছেন ১২/১৩ ডিসেম্বরের কথা। আবার ব্যাটেল অফ শিরোমনির আগে যখন সব ট্যাংক পিছু হটছিল, তখন যদি লেখক দৌলতপুরে থেকে থাকেন তাহলে তাঁর ট্যাঙ্কের পিছু হটা দেখতে পাওয়ার কথা না, কারণ ট্যাংকের বহর ঘাঁটি গেড়েছিল দৌলতপুরের বহু আগে, শিরোমনিতে।
যাহোক, এগুলো সত্যি মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ এখন সামান্যই। কিন্তু বইটা পড়ে অনেক খুঁটিনাটি জানতে পেরেছি সেই শ্বাসরুদ্ধকর দিনগুলোর।