Suchona Hasnat আপুর রিভিউ পড়ে বইটা পড়ার লোভ সামলাতে পারিনি। একটা বই কীভাবে এত মায়াময় হতে পারে? চার মাস আগে বইটা পড়ে শেষ করেছিলাম, এতদিনেও এর একটা রিভিউ গুছিয়ে লিখতে পারিনি। লিখতে গেলেই মনে হয় এই বই নিয়ে কিছু বলার মতন শব্দ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
হাজারি ঠাকুরের আদর্শ হিন্দু হোটেলের কথা মনে আছে? সেটা পড়তে যেয়ে যেমন জিভে পানি চলে এসেছিল, ইন্দুবালার ভাতের হোটেলের কয়েক পদের নাম শুনেই আপনার মুখে পানি চলে আসবে।
দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, পোড়াকপাল, স্মৃতি, নকশাল, ইতিহাস, ভালোবাসা, পরিবার হারানোর গল্প, সন্তানদের সাথে দূরত্ব, নিজের শেকড় আঁকড়ে রাখার চেষ্টা, জীবন বিসর্জন দিয়ে হলেও নিজের হোটেলটাকে বাঁচানোর চেষ্টা- কী নেই এই বইয়ে? আর শেষটুকু? পড়তে যেয়ে হয়তো কান্নার স্রোতে ঢোকটা গিলতেও বেশ কষ্ট হবে৷
কে এই ইন্দুবালা? আমার দিক থেকে হিসেব করলে ইন্দুবালা এপার বাংলারই মেয়ে, খুলনার কলাপোতা গ্রামে যার জন্ম।
জাত-কূল রক্ষার জন্য তার পুরোনো প্রেমিককে ভুলিয়ে দিয়ে এবং নিজের এলাকা থেকে দূরে রাখতে ইন্দুবালাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় ওপার বাংলার এক দোজবরে, মাতাল ও জুয়ারি লোকের সাথে। অবশ্য বেশিদিন সেই মাতাল বরকে সহ্য করতে হয় না তাঁর, তিনটা সন্তান জন্মের পর অচিরেই মারা যায় তাঁর বর।
তারপর থেকেই সাদা থান শাড়ি পরে নতুন এক জীবন শুরু হয় ইন্দুবালার। বরের রেখে যাওয়া দোতলা এক বাড়িকে সম্বল করেই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে সে। রঙ যেন তার জীবনে একটু একটু করে আসি-আসি করছে। লছমীর পরামর্শে তার রান্নার কৌশলকে কাজে লাগিয়ে খুলে ফেলে একটা ভাতের হোটেল। সেই থেকেই ছেনু মিত্তির লেনে রান্নার মাধ্যমে উঠে এসেছিল খুলনার কলাপোতা গ্রাম।
বইটার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর খাবারের বর্ণনা এবং প্রতিটা পদ ঘিরে স্মৃতির ঝাঁপি খোলা। কুমড়ো ফুলের বড়া, বিউলির ডাল, ছ্যাঁচড়া, আম তেল, চন্দ্রপুলি, মালপোয়া, চিংড়ির হলুদ গালা ঝোল আর কচু বাটা, রান্নাঘরের মশলা, আনাজ, শাক-সব্জিতেই খুঁজে পান ফেলে আসা কলাপোতাকে। গ্রামীণ রান্নার পদগুলোকে লেখক যেভাবে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। একেকটা আইটেমের যেন ইন্দুবালার অতীত এবং বর্তমানের যোগসূত্র বজায় রেখেছেন। খাবারগুলোর বর্ণনা এত রসালো যে জিভে পানি আসবেই!
কিছু উপন্যাস থাকেই মন ভিজিয়ে দেয়া মায়া-আবেগ-ভালবাসার চাদরে মোড়ানো। 'ইন্দুবালা ভাতের হোটেল' এর উজ্জ্বল উদাহরণ। লেখক দারুণ একটা কাজ করেছেন। এমন মনকাড়া প্লট, চমৎকার বর্ণনাভঙ্গি, লেখনশৈলীর সন্নিবেশ সচরাচর পাওয়া যায় না। লেখক কল্লোল লাহিড়ী তার আপন মায়ার শব্দজালে বুনেছেন উপন্যাসের প্রতিটি কাহিনীবিন্যাস। সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে বর্তমানকে সাথে নিয়ে ইন্দুবালার অতীতের ফ্ল্যাশব্যাক। এত সুনিপুণতার সাথে লেখক এ কাজটি করেছেন যে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে যেতে হয়েছে পুরো উপন্যাসটি।
আর লেখক বেশ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন খাবারগুলোর বর্ণনায়। কুমড়ো ফুলের মিঠে বড়া পোস্ত ছড়িয়ে, রান্নায় ঝালের জন্য চুইঝালের ব্যবহার, কালো জিরের ফোঁড়নে পার্শে মাছের ঝোল, ইলিশের মাথা ও পুঁইশাকের ছ্যাঁচড়া, সর ভাজা, কাসুন্দি দিয়ে কলমিশাক, চিংড়ির হলুদ গালা ঝোল, মালপোয়ার মত খাবারের বর্ণনা এত সহজ সাবলীল শব্দচয়নে এত মায়া, আদর আর অনন্যতায় মিশে ছিলো , মনে হচ্ছিল ইন্দুবালা দেবী আমার সামনে বসেই রান্না করছেন, আর তাঁর অসাধারণ সেসব রান্নার ঘ্রাণ যেন আমি এখানে বসেও পাচ্ছি।
বুকভরা অব্যক্ত মায়ায় মোড়ানো বইটির প্রতিটা পৃষ্ঠা। ইন্দু আর লছমীর বন্ধুত্ব তো আরও মায়াময়। বিপদ মোকাবেলা করতে, নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে আমাদের যে প্রতিবারই লছমীর মতো বন্ধুর দরকার হয় সেটাই যেন লেখক এই বই দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। তবুও জীবনের অনেকটুকু পথ একাই পাড়ি দিতে হয়। তাইতো আজ সত্তর বছর বয়সেও ইন্দুকে একাকীত্বকে সঙ্গী করে ঠেলতে হয��� উনুনের কয়লা আর অকাতরে বিলিয়ে গিয়েছেন নিজের হাতের আদরমাখা রান্না।
ইন্দুবালার রান্নার পদগুলোতে কিন্তু তেমন নতুনত্ব ছিল না, এসব খাবার আমরা প্রতিদিনই খাই। কিন্তু রান্না ছিল তাঁর কাছে শিল্প। কোনদিন কুমড়ো ফুলের বড়া, কোনদিন সর্ষে দিয়ে কচুবাটা, কোনদিন আমতেলের কই, কোনদিন আমড়ার চাটনি দিয়ে বিউলির ডাল, কোনদিন আবার শেষ পাতে দুধে ডোবানো চন্দ্রপুলি অথবা রসে ডোবানো মালপোয়া। বইটা পড়া শেষে মনে হচ্ছিল, "ইশ, একটু যদি আমতেলের কুমড়ো ফুলের বড়া আর কচুবাটা দিয়ে ভাত খেতে পারতাম..."
কল্লোল লাহিড়ির লেখাতে এমনই মায়া জড়ানো। সহজ একটা খাবারের রান্নার কথাটাই এমন সুন্দর করে লিখেছেন যেন চোখের সামনে দেখছি। সামান্য বিউলির ডাল রান্নার বর্ননা এমনভাবে দিয়েছেন যেন মনে হচ্ছিল এক প্লেট গরম ভাত নিয়ে ইন্দুবালার সামনে বসে পড়ি।
'ইন্দুবালা ভাতের হোটেল' শুধু গল্প নয়, হয়ে ওঠে জীবন্ত ইতিহাসের দলিল। সাবলীল লেখার টানে আর লোভনীয় সব পদের আকর্ষণে এক বসায় শেষ করে ফেলার মতো দুর্দান্ত একটা বই। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম একটা বই উপহার দেওয়ার জন্য।