ইতিহাসের কাহিনী পেলে সর্বদা লুটে নেওয়ার চেষ্টা করি। সেই তাড়নাতেই এটি কয়েক ঘন্টা একটানা পড়ে শেষ করেছি। এক মহিষী রাজপুত নারীর আত্মত্যাগের কাহিনী বর্ণিত অসাধারণ একটি উপন্যাস এটি।
মাড়োয়ার অধিপতি প্রবল প্রতাপশালী বীর মহারাজা যশোবন্ত সিংহকে পৃথিবী থেকে সরানোর উদ্দেশ্যে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে যুদ্ধে পাঠান এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র পৃথ্বীসিংহকে দিল্লীতে আহ্বান করিয়ে বিষ মাখানো পোশাক পড়িয়ে হত্যা করেন। পুত্রের মৃত্যু সংবাদে যশোবন্ত সিংহ প্রবল আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং যুদ্ধক্ষেত্রেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।
মহারাজার মৃত্যুর পর রানি চন্দ্রাবতী চিতায় গিয়ে ওঠেন। অগ্নি প্রজ্বলিত হয়। সতীরা সব আত্মাহুতি দেন। কিন্তু একজন মহিষীই জীবিত থাকেন। কারণ তাঁর গর্ভে রয়েছে মহারাজা যশোবন্ত সিংহের একমাত্র বংশধর। তাই তাকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে।
অন্যদিকে আওরঙ্গজেব, মহারাজা যশোবন্ত সিংহের মৃত্যুর পর মাড়োয়ার দখল করেন এবং আদেশ পাঠান মহারাজার জীবিত রানি সহ পরিবারের সকলকে দিল্লীতে নিয়ে আসার। দিল্লীর পথে যাত্রাকালীন অবস্থায় রানি সন্তানের জন্ম দেন, যিনি হন ভবিষ্যতে রাজা অজিত সিংহ।
রানি ও যশোবন্ত সিংহের একমাত্র বংশধরকে বাঁচিয়ে রাখতে মাড়োয়ার বীর সেনাপতি দূর্গাদাস আত্মবলিদান চাইলেন রানির অত্যন্ত কাছের পরিচারিকা রত্নার কাছে। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী রাজপুত নন্দিনী রত্না, রানি ও রাজপুত্রকে সুরক্ষিত রাখার জন্য নিজের সমস্ত স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিলেন। পরিণত হলেন নকল রানিতে। নকল রানি এবং নকল রাজপুত্রকে নিয়ে সকলে রওনা দিলেন দিল্লীর উদ্দেশ্যে। দিল্লী পৌঁছালে আওরঙ্গজেব ফের আদেশ দিলেন রানি ও রাজপুত্রকে বন্দী করার। শেষ পর্যন্ত কী দূর্গাদাস পেরেছিলেন যশোবন্ত সিংহের রানি ও তাঁর বংশধরকে আওরঙ্গজেবের হাত থেকে বাঁচিয়ে তাদের সুরক্ষিত রাখতে?
ইতিহাস থেকে অনেক কিছু জানা গেলেও, জানা যায় না রত্নার মতো এরকম আত্মত্যাগী নারীদের কথা। শ্রীপারাবত - এর এই উপন্যাস এই আত্মত্যাগী রাজপুত নন্দিনীর কাহিনীই বর্ণনা করেছেন। যে মাতৃভূমির প্রতি কর্তব্য পালনের জন্য নিজের সকল স্বপ্নকে ত্যাগ করেছিলেন।
"দূর্গাদাস রত্নার দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করে। রত্নার চোখে-মুখে কর্তব্যবোধের দৃঢ়তা। নিজেকে উৎসর্গ করে একটা গোটা জাতিকে রক্ষা করবার প্রেরণায় সে উদ্বুদ্ধ।" "দূর্গাদাসের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির জবাবে রত্না বলে, — আমার কর্তব্য জীবন দিয়েও যথাযথ পালন করব কাকাবাবু।"
ঐতিহাসিক উপন্যাস বা ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাস যাঁরা লিখতেন তাদের মধ্যে শ্রীপারাবত অর্থাৎ প্রবীর কুমার গোস্বামী একটি বিশেষ স্থান দখল করে রয়েছেন। পুজোর মধ্যে বাড়িতে থাকলে সাধারণত বই পড়েই সময় কাটানোর চেষ্টা করি। এবারে যে ক'টি পড়তে পারলাম তার মধ্যে একটি হল তাঁর লেখা 'রাজপুত নন্দিনী'।
মহারাজা যশোবন্ত সিং, তস্য পুত্র অজিত সিং এবং বাদশা ঔরঙ্গজেব এর ব্যাপারে সকলেই জানেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই রচিত হলেও 'রাজপুত নন্দিনী'র কাহিনী আবর্তিত হয় রাঠোর মহিষীর সামান্য পরিচারিকা রত্না এবং জনৈক রাজপুত সৈনিক বীরসিংহকে ঘিরে। দুর্গাদাস এর পরিকল্পনামত বাদশাহ এর হাত থেকে অজিত সিং কে বাঁচানোর দায়িত্ব কীভাবে পালন করে রত্না? বীরসিংহ ও রত্নার ভাগ্য কোনদিকে মোড় নেয়? তাদের মিলন কি আদৌ সম্ভব হয়ে ওঠে?
শ্রীপারাবত এর লেখা নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই । 'আমি সিরাজের বেগম' পড়ার সময়ই পরিচয় পেয়েছিলাম কতটা সুচারুভাবে ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতকে পেছনে রেখে কোনো অনামী চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে পারেন তিনি। তবে উপন্যাসের পরিসর এক্ষেত্রে ছোট বলেই কিনা জানিনা, রত্না চরিত্রটি লুৎফার মত গভীরভাবে চিত্রিত হয়নি বলেই আমার ধারণা। কিন্তু লেখকের লেখার গুণে এবং কাহিনীর টানটান বাঁধুনির ফলে স্বল্প কলেবরের এই বইটি পড়তে ক্লান্তি আসেনা।
শ্রী পারাবতের লেখা এই নিয়ে দ্বিতীয় বার পড়ছি , আমি সিরাজের বেগম দিয়ে পরিচয় ঘটে ওনার লেখার. ইতিহাসের এতো নীচে জমা পরে থাকা অতি সূক্ষাতিসূক্ষ তথ্যও তিনি যে সুন্দর কৌশলে বাস্তবে পরিণত করে পাঠকের সামনে তুলে ধরেন, তা যথেষ্ট প্রশংসনীয়. ইতিহাস হাতে গোনা কয়েকজনকেই মনে রেখে দেয় ..কিন্তু সেই কয়েকজনের পিছনে যে হাজার হাজার অতি সাধারণ মানুষের অবদান হারিয়ে গেলো , কেউ ভুলেও তা মনে আনেনা . রত্না এরমি একজন, সব হারিয়েও যে তার কর্তব্য থেকে এক পাও সরে দাঁড়ায়নি . ভয় পেয়ে , দুর্বল হয়ে পিছু হটেনি.