#পাঠ_প্রতিক্রিয়া
"হে বীর, তোমার বিহ্বলতা
হটিয়ে দাও
মায়ের চোখের অশ্রুধারা
মুছিয়ে দাও,
রাজপুত জাতি মরিবে না কভু
বুঝিয়ে দাও।
ভুলো নাকো তুমি অতীতের কথা
ভুলিয়া যেওনা সেইসব গাথা—
যে সব গাথায় অমর রয়েছে
বীরের আত্মদান
সে আত্মদান অহেতুক নয়
রবে চির অম্লান।
আরাবল্লীর পাষাণ-কায়ায়
বৃক্ষলতার প্রতিটি পাতায়
মরু-বালুকার কণায় কণায়
আছে শোণিতের দান।
হে বীর, তোমার স্বপ্ন আবেশ
কাটিয়ে দাও
রোদ-ঝলসানো অসি হাতে তুমি
এগিয়ে যাও।"
রানী পদ্মিনীকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য আলাউদ্দীন চিতোরগড় আক্রমণ করে। একে একে সমস্ত বীরেরা আত্মবিসর্জন দিচ্ছে। সেই সময় একদিন রাতে মহারাণা লক্ষ্মণ সিং-এর সামনে চিতোরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী উপস্থিত হয়ে বলেন – "ম্যায় ভুখা হু"। একজন নয়, দুজন নয়, বারোজন রাণার রক্ত পেলেই দেবীর এই ক্ষুধা নিবারণ হবে। লক্ষ্মণ সিং-এর বারোজন সন্তান ছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন প্রতিদিন একজন করে সন্তানকে রাণার পদে অভিষিক্ত করে যুদ্ধে পাঠানো হবে। এভাবে এগারো জন সন্তানকে পাঠানো হলো, কিন্তু বারোতম দিনে তিনি তাঁর দ্বিতীয় সন্তান অজয় সিং-কে যুদ্ধে না পাঠিয়ে নিজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আর অজয় সিং-কে পাঠিয়ে দিলেন আলাউদ্দীনের কবল থেকে অনেক দূরে। বারোজন রাণার রক্ত পেয়ে দেবী সন্তুষ্ট তো হলেন, কিন্তু চিতোরগড় চলে যায় অন্যের অধীনে।
মহারাণা লক্ষ্মণ সিং তাঁর পুত্র অজয় সিং-কে ভবিষ্যতে চিতোরগড় পুনরুদ্ধারের জন্য আপাতত দূরে পাঠালেন, তবে আদেশ দিয়েছিলেন যে, চিতোরগড় পুনরুদ্ধারের পর অজয় সিং-এর কোনো পুত্র রাণা হতে পারবে না। রাণা হতে পারবে লক্ষ্মণ সিং-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র অরি সিং-এর একমাত্র পুত্র।
মহারাণা লক্ষ্মণ সিং-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র অরি সিং-এর একমাত্র পুত্র হলো বীর হাম্বীর। সে তাঁর মায়ের সাথে মহারাণা অজয় সিং-এর কৈলওয়ারার প্রাসাদে থাকে। অল্প বয়স থেকেই সে প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন। চিতোরগড় পুনরুদ্ধারের জন্য সে নিজেকে অল্প বয়স থেকেই প্রস্তুত করছে। সে তাঁর কর্তব্যে অটল।
"অজয় সিং প্রশ্ন করেন, — হাম্বীর। তুমি আমার কে?
প্রশ্নটি বিচিত্র এবং আকস্মিক। তবু হাম্বীর একমুহূর্ত বিলম্ব না করে বলে, — পুত্র, মহারাণা।
— ঠিক। পুত্র। ভ্রাতুষ্পুত্র আর পুত্রের মধ্যে বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই। তোমার প্রতি আমার স্নেহ এই দুজনার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। বরং কর্তব্যবোধ এবং তোমার চরিত্রের বলিষ্ঠতা সেই স্নেহকে আরও প্রগাঢ় করে তুলেছে।"
"— বলতে পার হাম্বীর, আমার পুত্র হিসেবে তোমার কি কর্তব্য?
— মেবারের প্রজা হিসাবে, রাজপুত হিসাবে আমার কর্তব্য হল, যে আপনার গায়ে হাত দিতে সাহসী হয়েছে তার ছিন্ন মস্তক এনে আপনার পায়ে উপহার দেওয়া। মেবারের রাণার সম্মানে এতটুকু আঁচড় লাগতে দেওয়া রাজপুত হিসাবে কি করে সহ্য করব?"
রাণা "বলেন, —রাজপুত? শুধু রাজপুত হিসাবে?
— আর পুত্র? পুত্র হিসাবে?
— পুত্র হিসাবে আমার কর্তব্য শত্রুকে হত্যা করতে না পারলে আর ফিরে না আসা।"
এই কাহিনীর আরেক অন্যতম চরিত্র হলো ভবানী। সে হাম্বীরের মায়ের গ্রামের মেয়ে। এই মেয়েটিকে তাঁর মা প্রাসাদে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। তবে সে কোনো সাধারণ মেয়ে নয়। তার শক্তি ইশ্বরের শক্তিকে স্পর্শ করে।
" ভবানী হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়। তারপর হাম্বীরের কাছে এসে বলে, — জান হাম্বীর আমি চিতোরগড় দেখতে পাই।"
রাতের অন্ধকারে ভবানী দূর কৈলওয়ারায় প্রাসাদের শীর্ষ থেকে দেখতে পায় চিতোরগড়। শুধু চিতোরগড়ই নয়, সে দেখতে পায় রানী পদ্মিনীকে, দেখতে পায় জহরব্রতের আগুন জ্বলে ওঠা, গোরা-বাদলের যুদ্ধ, যুদ্ধরত হাম্বীরের পিতা অরি সিং-কে এবং তাদের শত্রু অর্থাৎ চিতোরগড় দখলকারী মালদেওকে। ভবানী হাম্বীরকে স্বপ্ন দেখায়। অবশ্য সে শুধু তাঁকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়নি, সব সময় চিতোরগড়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ভবিষ্যতের কল্পনাকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে।
ঐতিহাসিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে শ্রীপারাবত আমার বেশ পছন্দের নাম। ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখা অত সহজ কাজ নয়। ইতিহাসকে কোনোভাবেই বিকৃত না করে কল্পনায় ঘোড়া ছোটানো যথেষ্ঠ কঠিন। আর এখানেই শ্রীপারাবতের দক্ষতা প্রসংশনীয়। শ্রীপারাবতের লেখার ভক্ত "আমি সিরাজের বেগম" বই পড়ার পর থেকে। ওঁর অসাধারণ লেখনীর দক্ষতায়, মনে হয় যেন আমিও ঐ স্থানেই রয়েছি। নিজের চোখে সব দেখছি। তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মতো "চিতোরগড়"ও এক অনন্য উপন্যাস।
তবে এই বইটি পড়ার আগে আমি শ্রীপারাবতের লেখা "মেবার বহ্নি পদ্মিনী" বইটি পড়েছিলাম তাই কিছু বিষয় বুঝতে সুবিধা হয়েছে। অবশ্য এই বইটি না পড়লেও খুব একটা অসুবিধা হবে না, তবে একবার পড়ে নিলে কিছু বিষয় বুঝতে সুবিধা হবে। শেষে এটাই বলবো, আমার বইটি বেশ ভালো লেগেছে। পাঠকগণ চাইলে একবার পড়ে দেখতে পারেন। আশা করি ভালো লাগবে।