সোনার রাজপুতানা! মরু বেষ্টিত দূর্গ-শহরের দেশ। অভিমানী, সাহসী, বদরাগী যুদ্ধবাজেদের চারণভূমি। এই উপন্যাসের পাতায় বহুল প্রচলিত এক কিংবদন্তির পুনঃকথমে মেতেছেন লেখক। মেবারের হতভাগ্য সূর্যবংশি রাজপুতেদের বিরুদ্ধে খিলজিদের ভুবনজয়ী 'পরচম'-এর জয়গাঁথা! যার মূলে অবস্থিত, মেবারের রাণী সুন্দরী পদ্মিনীর প্রতি আলাউদ্দিন খিলজির অনৈতিক আকর্ষণের চিরচেনা কাহিনী। উপন্যাস, সিনেমা, কবিতা...কালের দরিয়ায় এই গল্প আক্ষরিক অর্থেই অমর।
শ্রীপারাবত নামধারী এই মানুষটির কথা শুনেছি অনেক। সুখ্যাতি, কুখ্যাতি দুই। পড়া হয়নি এত অবধি। তাই বছর শুরুতে, এই প্রবীরকুমার গোস্বামীরই লেখা পড়ার সিদ্বান্ত নিলাম। ভাবলাম, ইতিহাসের খোঁজে যখন এতসব গলিতে ঘুরেই মরছি... একবার, নাহয় মেবার পথে ডিটুর নিয়েই এলাম? ক্ষতি কি? এবং, বলাই বাহুল্য, আশ্চর্য হলাম যারপরনাই।
আশ্চর্য হলাম, কারণ লেখকের লেখায় এক সহজাত বাঁধুনি বর্তমান। কোনোরূপ কাঠিন্যের ধার না ধেরে, সহজ সরল ভাষায় যেই গল্পটি উনি বলে ফেললেন, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি নড়বড়ে হলেও, রস আস্বাদনে এক ফোঁটাও ব্যাঘাত ঘটে না। পণ্ডিতেরা বলে থাকেন, পদ্মিনীর ঘটনাপ্রবাহে ইতিহাস কম, কিংবদন্তির প্রকোপ অনেক বেশি। লেখক নিজেও তাই মালিক মুহাম্মদ জয়সীর মহাকাব্যের পুঙ্খানুুঙ্খ অনুসরণ করেন না। বরং, তার লেখায় মেলে অবন ঠাকুরের সজীব ছোঁয়া। রতন সিংহ নামক কোনো চরিত্রের দেখা মেলে না বইতে। বরং, সিংহলের রাজকুমারী, রাণী পদ্মিনী এখানে মহারানার খুড়ো ভীম সিংহের পত্নী রূপেই বর্তমান।
যদিও, আমার ভালো লাগা কতকটা অন্য খাতে বয়। হ্যা, অবশ্যই বইতে চরিত্র হিসেবে বিদ্যমান দিল্লিশ্বর, পদ্মিনী বা রাজকীয় রাজপুত সমূহ। তবে আমার পাঠক-মন না চাইতেও পড়ে থাকে জগৎ সিংহের কাছে! বাংলা ঐতিহাসিকের শরদিন্দু বিরচিত স্বর্ণসরণি হেঁটে, লেখক উপস্থাপন করেন এক সাধারণ যোদ্ধাকে। যে আদতে ইতিহাসের পাতায় সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। এই গল্পের স্পন্দিত হৃদয়! তার দুঃখে আমরা দুঃখ পাই, তার আনন্দে, আনন্দ। তারই মুখ দিয়ে লেখক রাজপুতেদের মহানুভবতার সমালোচনা করতেও পিছপা হন না। ইতিহাস সাক্ষী, কূটনীতি বিসর্জন দিয়ে কেবল ফাঁপা সাহসে শেষ রক্ষা হয় না। সেবারেও হয়নি।
গোরা-বাদলের মতন কালজয়ী চরিত্রদের পাশে, জগৎ সিংহ, লীলাবাই, কলাবতী বা ইমতিয়াজদের উপস্থিতি উপন্যাসের শ্রী-বৃদ্ধি করে। এদের জন্যেই যা এসব পড়া। নইলে খাঁটি ইতিহাসের দেখা তো বইয়ের পাতায়ও মেলে। কেবল সবটাই সামান্য নাটকীয় ও দ্বিমাত্রিক এই যা। তবুও, সংযত প্রচেষ্টায় পক্ষপাত এড়ানো এই বইয়ের চোরা-শক্তি। লেখক, হিন্দু-মুসলমান বিভেদের ঐতিহাসিক আখ্যান লিখতে বসে সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নেন নি। মোটের ওপর, কেবল খল-চরিত্রদের একটু চড়া রঙে রাঙিয়েছেন। দিনশেষে যা স্বাভাবিক।
দুর্বলতার মধ্যে, চরিত্র হিসেবে আলাউদ্দিনের আরও কিছুটা বিকশিত হবার অবকাশ ছিল। লেখক মর্জিতে, স্পটলাইটটা ওনার ওপর কিঞ্চিৎ কমই পড়েছে। এছাড়াও, ভালো লাগেনি বইয়ের শেষ কয়েক পাতা। আক্ষেপ হয় যে, উপসংহারের তাড়াহুড়ো এমন চমৎকার একটি উপন্যাসকে পূর্ণতা পেতে দেয় না। এই তো। পুরোটাই আমার ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া। মানা না মানা, আপেক্ষিক। তবে সুযোগ পেলে পড়ে দেখতেই পারেন। জটিলতা এড়িয়ে, স্রেফ সহজ ভাষায় একটি সহজ গল্প হিসেবেই নাহয় পড়লেন। খুব খারাপ লাগবে না, কথা দিচ্ছি।
(৩.৫/৫)