নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ এর রাজনৈতিক জীবনকাহিনী। কোনটা তাঁর আসল পরিচয় ছিল, প্রশাসক নাকি মানুষ? তাঁর রাজনৈতিক উত্থান, ধর্মীয় ভাবনা, প্রশাসনের নিয়মনীতি, শাসক হিসেবে প্রজাদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা এবং সমালোচনা এসবের সাথে সাথে উপজীব্য হয়েছে বেগমের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, মেয়ে এবং নাতনির জীবনের ওঠাপড়া। এসেছে হিন্দু-মুসলিম এর মধ্যকার রাজনৈতিক সম্পর্ক। শ্রী পারাবত এর চমৎকার কলমে সুপাঠ্য ঐতিহাসিক উপন্যাস।
উপমহাদেশ যারা শাসন করেছিলেন তাদের জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তাদের একটা বড়ো অংশ ধনী পরিবারের ছিলেন না। বেশিরভাগ শাসক-প্রশাসক ছিলেন প্রাথমিক জীবনে দাস, কৃষক, শাসকের অধীনে সামান্য চাকুরীজীবি ইত্যাদি। তারা তাদের পরিশ্রম ও নিজ যোগ্যতাবলে শাসনক্ষমতার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। কুতুবউদ্দিন আইবক, বলবন, ইলতুৎমিশ ইত্যাদি মহান নামের মতো সেরকম একটি নাম মুর্শিদকুলী খাঁ। যিনি বাংলার প্রথম নবাব। তিনি নিজ যোগ্যতাবলে একদম নিচ থেকে উপরে উঠে এসেছিলেন।
প্রাথমিক জীবনে ছিলেন একজন ব্রাহ্মণের সন্তান। নাম ছিল সূর্য নারায়ণ মিশ্র। তার পরিবার তাকে অভাবের কারণে হাজি শাফি ইস্পাহানির কাছে বিক্রি করে দেন। হাজী ইস্পাহানি ছিলেন মোগল কর্মকর্তা। তিনি সূর্য নারায়ণকে দাস হিসেবে ক্রয় করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করিয়ে নাম দেন মোহাম্মদ হাদী। তিনি হাদীকে সুশিক্ষিত করে তুলেন। পরবর্তীতে হাদী মোগলদের অধীনে চাকুরী গ্রহণ করলে তার কাজের মাধ্যমে সম্রাট আওরঙ্গজেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এবং তাকে করতলব খাঁ উপাধি দিয়ে বাংলার দেওয়ান হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ। যখন দেওয়ান হয়ে আসেন তখন বাংলার সুবাদার ছিলেন আওরঙ্গজেবের নাতি আজিম-উশ-শান। আজিম ছিলেন দুর্নীতিপরায়ন। তিনি পূর্বে বাংলা থেকে প্রাপ্ত অর্থ তছরুপ করতেন এবং সঠিক অর্থ দিল্লিতে প্রেরণ করতেন না। কিন্তু করতলব খাঁ দেওয়ান হিসেবে আসলে আজিমের চুরির পথ বন্ধ হয়ে যায়। দেখা যায় করতলব খাঁ অকল্পনীয় অর্থ দিল্লিতে প্রেরণ করছেন এবং তা দেখে স্বয়ং আওরঙ্গজেব হতবাক হয়ে যায়। এতে করতলবের বিশ্বস্ততা দেখে আওরঙ্গজেব তার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন এবং মুর্শিদকুলী খাঁ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। সময়ের পরিবর্তনের সাথে দিল্লির শাসক পরিবর্তন হয়। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোঘল শাসনে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে। কিন্তু মুর্শিদখুলি খাঁ থাকে আগের মতো অনুগত। মসনদে যে বসেন তার কাছে নিয়মিত সঠিক রাজস্ব প্রদান করতেন। এতে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকা সকল মোগল শাসক মুর্শিদখুলির প্রতি চরম বিশ্বাস স্থাপন করেন। ফারুকশিয়রের মৃত্যুর পর মোগলদের শাসনব্যবস্থা একেবারেই নাজেহাল হয়ে গেছিল। তন্মধ্যে এক ফর্মানে মাধ্যমে মুর্শিদখুলি খাঁ-কে সমগ্র বাংলা-বিহার-ঊড়িষ্যার নবাব ঘোষণা করা হয়। তার কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। তাই তার উত্তরাধিকার হিসেবে কন্যার সন্তানকে নির্বাচন করেন। তার শাসনামলে বাংলার জনগণ অত্যন্ত সুখ ও সমৃদ্ধির সাথে বসবাস করেন। তার আমলে বাংলার ঐশ্বর্য ছিল অনন্য উচ্চে। তার বিচার ব্যাবস্থা ও প্রশাসন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কোরান নখল করতেন। তার কোনো ক্ষমতার প্রতি লোভ ছিল না। তিনি ছিলেন পরধর্মসহিষ্ণু। তার রাজকার্যের বড়বড় পদে হিন্দুদের উপস্থিতি দেখা যায়। তিনি হিন্দুদের জমিদারীর প্রচলনকে বেগবান করেন। আর ধর্মীয় জীবনে তিনি ছিলেন শিয়া মুসলিম। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ধর্মীয় আচার পালন করতেন। ব্যক্তিগত জীবন ও নবাবী জীবনে মুর্শিদখুলী খাঁ ছিলেন অসাধারণ একজন মানুষ। তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা কারোর ক্ষতি হচ্ছে কি-না সেদিকে লক্ষ্য রাখতেন। আর কারোর থেকে প্রতিশোধ নিতে গেলে হুট করে নিতেন না। অত্যন্ত কৌশলের সাথে ধীরেসুস্থে নিতেন। শাসকের প্রতি তার আনুগত্যের কথা ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। ❑ ব্যক্তিগত সমালোচনা— শ্রী পারাবত একজন ঐতিহাসিক লেখক। এটা মূলত জীবনভিত্তিক উপন্যাস। এই উপন্যাস রচনা করতে গিয়ে লেখক তেমন কোনো পক্ষপাত করেননি। মোটামুটি নিউট্রাল ছিলেন। তবে এই গ্রন্থ লিখতে গিয়ে তিনি হাতেগোনা কয়েকটি বইয়ের সোর্স নিয়েছেন তা মোটেও ভালো দেখায় না।