শ্রী পারাবতের এই নিয়ে দুটি উপন্যাস পড়লাম। এই লেখকের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ওনার লেখা ‘ আমি সিরাজের বেগম ’ উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে। ওই উপন্যাসটি আমার খুব একটা ভালো লাগেনি।
‘নাদির শাহ’ পড়া শেষ করলাম। দুর্দান্ত একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস । শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার গতি কোথাও তার গতিবেগ হারাবে না। লেখকের লেখনী ও শব্দচয়ন খুবই সুন্দর।
উপন্যাসের শুরু নাদির শাহের খাইবার পাসের মধ্যে দিয়ে কালবৈশাখীর মতো আগমন দিয়ে। ভারতে প্রবেশের পর তার ভয়াবহতার নমুনা হিসেবে নৃশংস অত্যাচার, খুন , লুট ইত্যাদি। লাহোর দখল এবং শেষ পর্যন্ত কারনালের যুদ্ধে মুঘল বাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয়। যুদ্ধে খান-ই-দউরান ( মীর বক্সী) এর মৃত্যু। সাদাত খাঁ ও মুহাম্মদ শাহ রঙ্গীলাকে বন্দী করে দিল্লি আক্রমণ এবং ভয়াবহ হত্যালীলা। শেষ পর্যন্ত ময়ূর সিংহাসন ও নানান ধনরত্ন লুঠ ।
উল্লেখিত উপন্যাসে কোথাও কোহিনুরের কথা বলা হয়নি এবং আমার মনে হয় কারণালের যুদ্ধের বিবরণ আর একটু বিস্তারিত ভাবে করা দরকার ছিল।
এই উপন্যাসের শেষ দিকের কয়েকটা কথা যেমন ---
---‘ সেইজন্যই বোধহয় বারবার বিদেশীরা এসে আছড়ে পড়ে অল্প আয়াসে লুটেপুটে নিয়ে যায় ’
এবং --
‘‘ আমাকে রেখে কিংবা সরিয়ে দিয়ে অথবা নিজামকে বাঁচিয়ে রেখে বা মেরে ফেলে আপনি হিন্দুস্থানের ইতিহাসের ছিটেফোঁটা পরিবর্তনও আনতে পারবেন না। যেভাবে চলছে সেইভাবেই গড়িয়ে গড়িয়ে চলবে। আমাকে সরিয়ে কাকে বসাবেন? মোগল বংশে তেমন করিৎকর্মা এখন কেউ নেই। আমি জানি আপনি কোন আফগান বা কোন হিন্দুকে ডেকে আনবেন না। সুতরাং আমিই থাকব। লোকে আমাকে চেনে, জানে, আমি লোকটা অত্যাচারী নই। 'জিজিয়া' তুলে দিয়েছি বলে আপনি দোষারোপ করেছেন বহুবার। ওতেই আমি জনপ্রিয়। কারণ যাদের আপনি অবিশ্বাসী বলে গণ্য করেন, তাদের সংখ্যা এদেশে অনেক বেশি। তাছাড়া তাদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপাব কেন? অন্য ধর্মের বলে? ওসব আপনার দেশে চলতে পারে, এখানে চলবে না। তাই আলমগীরের মত ব্যক্তির সাম্রাজ্যও টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আর নিজামের বিশ্বাসঘাতকতার কথা বলছেন? কে বিশ্বাসঘাতক নয়? তবু সব কিছু নিয়ে এই বিশাল দেশ গড়িয়ে গড়িয়ে চলছে। আপনাদের মত কেউ কেউ মাঝে মাঝে এসে সজোরে ধাক্কা দেয়। খুব কষ্ট হয়। তারপর আবার সব ঠিক হয়ে যায়। যে দেশ অবিরল সম্পদ সৃষ্টি করে চলেছে, সেই দেশের কত সম্পদ আপনারা অপহরণ করবেন? কয়েকবছর খুব অসুবিধা হবে। আবার গড়িয়ে গড়িয়ে চলবে। নিয়মিতভাবে এদেশ থেকে যদি সম্পদ চলে না যায় তাহলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে বেশিদিন সময় লাগে না। এদেশকে গরিব করে দেওয়ার সাধ্য আপনাদের কারও নেই। অস্ত্রের বড়াই যতই করুন।’’
তবে নিজাম-উল-মূলক্ ও নানান আমির উজির নাদির শাহের আগমণকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি বটে তবে ইতিহাসে নিজাম মোঘলদের সাথে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন বলে পড়িনি। বরং ইতিহাসে এ উল্লিখিত আছে যে মুহাম্মদ শাহ তার কোনো সভাসদকেই বিশ্বাস করতেন না এবং এই বিশ্বাস হীনতায় কুপিত হয়ে মোঘলদের ত্যাগ করেন এবং মুবারিজ খাঁ কে হারিয়ে ও হত্যা করে স্বাধীনভাবে হায়দ্রাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন ।
নিজামের দিল্লি ত্যাগকে ‘Flight of loyalty and virtue from the empire.' বলে উল্লেখ আছে
নাদির শাহের দিল্লি আক্রমণ মুঘলদের অপদার্থতার অন্যতম প্রতীক।।