আমি ঐতিহাসিক উপন্যাস সবসময় দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করি । প্রথমত সাধারণ ঐতিহাসিক উপন্যাস , যেখানে ঐতিহাসিক শব্দ টা শুধু বিশেষণ মাত্র । আর দ্বিতীয়তঃ খাঁটি ঐতিহাসিক উপন্যাস যেখানে ঐতিহাসিক সত্যতা থাকবে পুরোদস্তুর, লেখকের আকাশকুসুম কল্পনা করার কোন অবকাশ থাকবে না। ইতিহাসে অনেক জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাত্রার বিবরণ থাকে, বিলাসী রাজার কথা থাকে, বিলাসিনী নবাবজাদির কথা থাকে - কাহিনী প্রিয় ও অপ্রাপ্তমনস্ক পাঠকের আগ্রহ তা নিশ্চয়ই আকর্ষণ করতে পারে কিন্তু আধুনিক পাঠক সর্বদায় সন্ধান করবেন মানবিক ও সত্য কাহিনী ,তা যেখান থেকেই আহরণ করা হোক না কেন। সম্ভবত এ কারণেই খাঁটি ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করা একটু দুরূহ । এখন এই উপন্যাসটি কে আমি কি খাঁটি ঐতিহাসিক উপন্যাস বলতে পারি ? আমার উত্তর হলো হ্যাঁ । কেননা এখানে ঐতিহাসিক সত্যতা যেমন রয়েছে তেমনি প্রত্যেকটি চরিত্রের মানবিক দিক গুলি ও ফুটে উঠেছে সমানভাবে।
গল্পের প্রধান দুই চরিত্র শশাঙ্ক এবং হর্ষবর্ধন। উপন্যাসের সময়কাল মোটামুটি ৬০০ থেকে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ। তখন মগধের অধীশ্বর ছিলেন গুপ্ত রাজ মহা সেনগুপ্ত । গুপ্ত রাজাদের অধীনে বড় কোন এলাকার শাসন কর্তাকে বলা হত ‘ মহাসামন্ত ‘। শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত রাজা মহাসেন গুপ্তর একজন মহাসামন্ত। শশাঙ্ক গৌড়ের রাজা হয়েছিলেন ৬০৬ খ্রিষ্টাব্দের কিছু আগে। তিনি প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোকে গৌড় নামে একত্রিত করেন। তার রাজধানী ছিল বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার কর্নসুবর্ণে। তখন মগধের আশেপাশে রাজ্যগুলি ছিল কান্যকুব্জ, থানেশ্বর,কামরূপ । কান্যকুব্জ শাসন করতো মৌখরি রাজবংশ এবং থানেশ্বর শাসন করতো পুষ্যভূতি রাজবংশ ।
এপ্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, শশাঙ্কের জন্মের অনেক আগে থেকেই গৌড়ের অধিকার নিয়ে প্রায়শ মগধ ও মৌখরিদের মধ্যে দীর্ঘদিন যুদ্ধ চলেছে। তাই মগধের গুপ্তরা নিজেদের শক্তিবর্ধনের জন্য থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশের রাজা প্রভাকর বর্ধনের সাথে তাদের কন্যার বিয়ে দেন এবং এই বিবাহ দানের ক্ষেত্রে মূল মস্তিষ্কটি ব্যবহার করেছিলেন মহাসেনগুপ্তের পিতা। তৎসত্ত্বেও মহা সেনগুপ্ত মৌখরি রাজবংশের রাজা অবন্তী বর্মন এর কাছে পরাজিত হলে সেখানের সিংহাসনে উপবিষ্ট হয় তার কনিষ্ঠ পুত্র শ্রীশুভ । শ্রী শুভর দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর কারণে সিংহাসন দখল করেন শশাঙ্ক। এদিকে আবার মৌখরিরাজ অবন্তী বর্মার পুত্র গ্রহবর্মার সঙ্গে থানেশ্বররাজ প্রভাকরবর্ধনের নিজ কন্যা রাজশ্রীর বিয়ে দেন। এতে থানেশ্বর -মৌখরিরা কেউ কাউকে আর আক্রমণ করে না,তারা নিজেদের মধ্যে আত্মীয়তা বজায় রাখে। এমন সময় দেবগুপ্ত মালবের রাজা হন এবং শশাঙ্ক তাঁর সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে।
ইতিমধ্যে মৌখরিদের সাথে গুপ্তদের শত্রুতা তীব্র পর্যায়ে। শশাঙ্ক তার সুযোগ তুলতে যেন তৈরিই ছিলেন। গৌড়কে অধিকারের চেষ্টায় রত মৌখরি কথা মনে পড়তেই শশাঙ্কের মন তীব্র বিষানলে ভরে উঠত তাই তিনি দেবগুপ্তের সাথে মিলিত হয়ে যৌথ বাহিনী পাঠান মৌখরিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে। ঠিক এইসময়েই প্রভাকর বর্ধনের মৃত্যু হয় এবং এই মৃত্যুর সুযোগে শশাঙ্ক মৌখরিদের রাজধানী কান্যকুব্জ পৌঁছানোর আগেই দেবগুপ্ত গ্রহবর্মাকে পরাজিত ও হত্যা করেন, তার সাথে রাজশ্রীকে বন্দী করেন। এরপরেই দেবগুপ্ত পুষ্যভূতিদের রাজধানী থানেশ্বরের দিকে অগ্রসর হন কিন্তু সেখানে তাঁর সামনে রুখে দাঁড়ান প্রভাকরবর্ধনের পুত্র রাজ্যবর্ধন। রাজ্যবর্ধনের সাথে দেবগুপ্তের বিশাল যুদ্ধতে দেবগুপ্ত নিহন হন এবং পরে শশাঙ্ক কনৌজের দিকে অগ্রসর হলে রাজ্যবর্ধনের সাথে সাক্ষাৎ হয় ও শশাঙ্ক তাঁকে হত্যা করে।
তারপর আর শশাঙ্ক এগিয়ে যাননি। পুষ্যভূতিদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা হর্ষবর্ধন ও কামরূরাজ ভাস্কর বর্মা তাঁর রাজধানী আক্রমণ করতে পারে, এই শঙ্কায় তিনি সত্বর গৌড়ে ফিরে আসেন। পথে ভাস্করবর্মার দূত হংসবেগের সাথে সাক্ষাৎ ও ভাস্করবর্মার সাথে মৈত্রী স্থাপিত হলেও এই মৈত্রী বেশিদিন স্থায়ী হয়নি কারণ ভাস্করবর্মার মনে জ্বলছে তখন গৌড়রাজ শশাঙ্কের বিরুদ্ধে রোষানল এবং তাতে ঘি ঢেলে দিয়ে হর্ষবর্ধন এগিয়ে আসেন বন্ধুত্বের প্রস্তাব নিয়ে, পরে তাঁরা যৌথভাবে শশাঙ্কের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ডাক দেন। এসময় হর্ষবর্ধন প্রতিজ্ঞা করেন যে তিনি শশাঙ্ককে হত্যা করে দাদা রাজ্যবর্ধনের হত্যার প্রতিশোধ নেবেন কিন্তু হত্যা তো দূরের কথা হর্ষবর্ধন ও ভাস্করবর্মার মিলিত বাহিনীতেও গৌড়ের বিরুদ্ধে তেমন প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেননি।
যাইহোক এই ইতিহাস সংক্ষেপে লিখতে গেলে সারাদিনেও শেষ হবে কিনা সন্দেহ । সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি শশাঙ্ককে বাংলার প্রথম স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাজা বলা যায়।এতে কোন সন্দেহ নেই। এই সময়ে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে ঐতিহাসিকরা দ্বিমত রয়েছেন। তবে লেখক গ্রহণ করেছেন সেই গুলো যেগুলো অধিকাংশ ঐতিহাসিক দ্বারাই প্রমাণিত। শশাঙ্কের প্রতি হিউ এন সাং এর বিরূপ মনোভাব এছাড়া হর্ষবর্ধনের প্রতি উদার মনোভাবের কারণও সুস্পষ্টভাবেই লেখক তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন হর্ষবর্ধন মহা সেনগুপ্ত এবং শশাঙ্কের উদার মানবিক দিক গুলো ও । তাই আমি বলবো খাঁটি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়তে চাইলে এটি স্ট্রং রিকমেন্ডেড সবার জন্য।