শ্রীপান্থের জন্ম ১৯৩২ সালে, ময়মনসিংহের গৌরীপুরে | লেখাপড়া ময়মনসিংহ এবং কলকাতায় | শ্রীপান্থ তরুণ বয়স থেকেই পেশায় সাংবাদিক | আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে যুক্ত | সাংবাদিকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণামূলক রচনাদি লিখে যাচ্ছেন তিনি | তাঁর চর্চার বিষয় সামাজিক ইতিহাস | বিশেষত কলকাতার সমাজ ও সংকৃতি | তিনি সতীদাহ,দেবদাসী,ঠগী,হারেম-ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনিই কলকাতার পটভূমিতে লিখেছেন একাধিক রচনা | তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: আজব নগরী, শ্রীপান্থেরকলকতা, যখন ছাপাখানা এল, এলোকেশী মোহন্ত সম্বাদ, কেয়াবাৎ মেয়ে, মেটিয়াবুরুজের নবাব, দায় ইত্যাদি | বটতলা তাঁর সর্বশেষ বই | কলকাতার শিল্পী সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর বেশি কিছু প্রবন্ধ ইংরেজিতেও প্রকাশিত হয়েছে | বাংলা মুলুকে প্রথম ধাতব হরফে ছাপা বই হালেদের 'আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গোয়েজ'-এর দীর্ঘ ভূমিকা তার মধ্যে অন্যতম | পঞ্চাশের মন্বন্তরের দিনগুলোতে বাংলার শিল্পী সাহিত্যিক কবিদের মধ্যে নব সৃষ্টির যে অভুতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটে তা নিয়ে লেখা তাঁর 'দায়'বইটির ইংরেজিতে অনুবাদ প্রকাশিত হতে চলেছে |
মনুষ্য প্রজাতি মাত্র দুইভাগে বিভক্ত - পুরুষ ও নারী (থার্ড জেন্ডার,নন-বাইনারী ইত্যাদি পরের ব্যাপার) অথচ এই দুই লিঙ্গের বিভক্তি এবং এক লিঙ্গের আরেক লিঙ্গের উপর অত্যাচারের দীর্ঘ ইতিহাস বেশ বিস্ময়কর। পাশাপাশি নারী-পুরুষের হেঁটে চলার মাধ্যমে আদিম মানবজাতি মহাকালের পথে যে যাত্রা, তা সভ্যতার বিকাশের নিয়মানুযায়ী সমতা রেখে চলতে পারেনি। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো থেকে ভেঙে পুরুষ যখন সমাজের ধর্তাকর্তা হলো তখন থেকেই পুরুষ সচেতন ভাবে নারী নিগৃহকারীতে পরিণত হলো। নারী'র অবস্থান সঙ্গিনী থেকে দ্রব্যবস্তুতে নেমে এলো। যুগে যুগে পুরুষ ধর্ম,সমাজ,রীতি,সংস্কৃতি ইত্যাদির দোহাই দিয়ে নারীকে কখনো বানিয়েছে দেবদাসী, কখনো ক্রীতদাসী, কখনো বিলাসিতার বস্তু এবং বর্তমানে ভোগ্যপণ্য।
শ্রীপান্থের নন-ফিকশন ফিকশনের থেকে বেশি আরাম। ভারী ভারী বিষয়ের উপর মনোরম গদ্যে হালকা মিষ্টি করে লেখবার জন্য শ্রীপান্থের কোন জুড়ি নেই। দেবদাসী' তিন প্রকার নারীদের নিয়ে লেখা অতি কৌতূহলোদ্দীপক বই। বইটি পড়ার পর পুরুষ জাতির উপর একটা ক্রোধ জন্মানো অস্বাভাবিক নয়।
সৃষ্টির শুরু থেকে এই পৃথিবীতে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য । সেটা হোক ভালো হোক খারাপ । এমনকি পৃথিবীর প্রথম যে অপরাধ খুন তাও হয়েছিল নারীকে কেন্দ্র করে । এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পরে গেল । গল্পটা হচ্ছে এই রকম একবার এক সাধু সৃষ্টিকর্তার আরাধনায় বসেছে । শয়তার অনেক চেষ্টা করেছে তার সেই ধ্যান ভাঙ্গতে । নানাভাবে প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করেছে । কিন্তু কিছুই সাধুকে বিপথে পরিচালিত করতে পারল না । সর্বশেষে শয়তান কোন উপায় না পেয়ে তার সর্বশেষ অস্ত্র নারীকে টোপ হিসেবে ব্যাবহার করল । অনেক চেষ্টা করেও সাধু শেষ পর্যন্ত নিজেকে বিপথ থেকে বাঁচাতে পারলেন না । সৃষ্টির শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নারীকে স্বার্থে ব্যাবহার করা হয়েছে,হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে । শ্রীপান্থ তার দেবদাসী বইতে নারীদের যতভাবে ভোগ্যপণ্য থেকে ব্যাবহারিক পন্য হিসেবে ব্যাবহার করা হচ্ছে তার থেকে তিনটি মাধ্যম নিয়ে আলোচনা করেছেন । যেগুলো যথাক্রমে -দেবদাসী ,সতী, বিষকন্যা । দেবদাসী – “দেবদাসী” সোজা কথায় যাকে বলে দেবতাদের দাসী । কারা এই দেবদাসী ? খাঁটি ভাষায় উত্তর দেবতাদের উদ্দেশ্য যাদের উৎসর্গ করা হয় তারাই দেবদাসী । শত শত বৎসর জুড়ে ভারতের মন্দিরে মন্দিরে নিযুক্ত ছিল হাজার হাজার দেবদাসী । যাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেবতাদের নেচে গেয়ে খুশি করা । কিন্ত স্বর্গের দেবতারা তরুণীর রুপ যৌবন অর্ঘ প্রয়োজন না থাকলেও ধরায় তার প্রতিনিধিরা তাঁদের হয়ে সে কাজটি সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করতে কার্পণ্য করতেন না । কারণ তারা তো দেবতাদেরই প্রতিনিধি । শুধু কি পুরহিত ? ধরার আরেক সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী রাজা মহারাজা ,সম্রাটদের মনরঞ্জন করতে হত ক্ষেত্র বিশেষে ? কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এই হাজার হাজার দেবদাসী নিয়োগ হত মন্দিরে ? কেন বাবা মা তাঁদের মেয়েকে দেবদাসী করতে পেরে ধন্য হয়ে যেত ? ধর্মীয় কোন বইতে তো লেখা নেই দেবদাসী করার কথা । তাহলে ? কি সেই কারণ ? ধর্মকে পুঁজি করে এক এক রঙ্গ খেলার কামনার নেশায় মেতে উঠেছিল ধর্ম ব্যাবসায়িরা । শুধু কি ভারত ? ব্যাবিলিনীয় সভ্যাতা থেকে গ্রীক কি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কি জেরুজালেম সবখানেই কমবেশি ছিল দেবদাসী । হয়তো ভিন্ন নামে । ভিন্ন পরিচয়ে । তারই বিবরণ দিয়েছেন শ্রীপান্থ দেবদাসী পার্টে । সেইসাথে কথা প্রসঙ্গে এসেছে মার্কো পোলো ,আল বিরুনি , জে জে ফ্রেজারের মত ঐতিহাসিক লোকদের কথা । তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন এর উৎপত্তি । বর্ণনা করেছেন তাঁদের দেখা ঘটনা । সতী - সতীদাহ প্রথা । কিছুদিন আগেও যা ছিল মূর্তিমান আতঙ্ক বিধবাদের জন্য । শত শত বছর ধরে শত শত নারীকে জীবন্ত পুড়ে ফেলা হত তার মৃত স্বামীর সাথে । উদ্দেশ্য স্বামী যাতে মরণের পরে একাকী না থাকে । সেইসাথে মর্তের এই পৃথিবীতে সেই সতীকে দেখা হবে পূর্ণবতী নারী হিসেবে । তার পরিবার পাবে সম্মান । স্বামীর মঙ্গলের কথা ভেবে হাঁসতে হাঁসতে প্রাণ দিত যুবতী তরুণী স্ত্রী । যে স্বামীকে জীবনে বিয়ের রাত ছাড়া কখনোই দেখেনি । মৃত্যুর পর তার জন্য জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দিতে একটুও কার্পণ্য করেনি সেই হতভাগী । কিসের জন্য ? কি এমন মন্ত্রণা শক্তি যা তেজদীপ্তে বলীয়ান করে তুলেছিল হাজার হাজার নারীকে । এই এক রক্তাত ইতিহাস । ইতিহাসের পাতায় পাতায় যার নাম লেখা হয়েছে রক্তের কালীতে । এক রাজার চিতার আগুনে জ্বলতে হয়েছিল হাজারের উপর নারীকে । কি তাদের অপরাধ ? আবারো লেখক ঘুরিয়ে এনেছেন হেনরি শ্লীম্যান, মার্কোপোলো, দুবোয়ো,আলরবিরুনি,মেন্ডেলসোল,পিটার মান্ডি, টমাস বাউরির দেখা ইন্ডিয়া থেকে । যারা প্রত্যক্ষ করেছেন এমন অনেক সতীদাহ । জানাতে চেয়েছেন তাঁদের ইতিহাস । বিষকন্যা - অধরের ছোঁয়াতে মেশানো বিষ । লালাস চরিতার্থ করতে গেলেই মৃত্যু নিশ্চিত । নাম যার বিষকন্যা । যাকে ছোটবেলা থেকে শিখিয়ে পড়িয়ে পরিণত করা হয়েছে বিষকন্যারূপে । উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে মোহে আবিষ্ট করে বিষ দিয়ে হত্যা । কিন্তু তা কি সম্ভব ? নাকি সবই মিথ ? চলুল ঘুরে আসি এরিস্টটল এর দেখা ইন্ডিয়া থেকে । পুরো বইটি নন ফিকশন টাইপ । দেবদাসী ,সতী, বিষকন্যা এদের নিয়ে নানার তথ্যে ভরপুর । চেষ্টা করে দেখা হয়েছে এদের উৎপত্তি ,বুৎপত্তি নিয়ে আলোচনা আর করার ।
ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে ঢুঁ মারবার জন্য এখন পর্যন্ত আমার কাছে সঙ্গী হিসেবে শ্রীপান্থই সবচেয়ে সরস। কারণ, তাঁর লেখায় তথ্যের যেমন অভাব থাকে না, তেমনি একইরকম সুখপাঠ্য। পড়তে বসে হাই উঠে না, বরং আগ্রহ জাগানিয়া লেখনশৈলীতে তরতর করে বয়ে চলে ইতিহাসের নাম না জানা কোন নদী। বইয়ের নাম দেবদাসী হলেও এতে আলোচিত হয়েছে প্রধানত উপমহাদেশীয় তিন ধরনের নারীর জীবনচিত্র। অনুসন্ধান করা হয়েছে তাদের মনস্তাত্ত্বিক ভাঙাগড়া। তারা সতী, দেবদাসী কিংবা বিষকন্যা নামেই সমাজে পরিচিত৷। সতীদাহ, এই গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি বাংলাদেশের ইতিহাসে বিলক্ষণ পরিচিত। রাজা রামমোহন রায়ের সহায়তায় লর্ড বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালে সতীদাহ আইন করে বন্ধ করে দেন, এমন তথ্য ইতিহাস বইগুলোতে পড়ে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচি, আর ভাবি যাক মেয়েগুলো বোধহয় বেঁচে শান্তি পেল। কিন্তু, ঘটনাটা আসলেই কী এমন ছিল? ১৮০০ সালের আগে পড়ে নানান সংবাদ কাটিং এ চোখ বুলালে দেখা যাবে চিতায় স্মিতমুখে উঠছেন কোন কোন তরুণী, কোন জোরজবরদস্তি ছাড়াই। তাদের কারো কারো হয়তো স্বামীকে বিয়ের দিনের পরে আর কাছেই পাওয়া হয়নি, কিন্তু সতী হতে তাদের আপত্তি নেই। বরং ইংরেজ আইনপ্রণেতা বা প্রশাসকেরা বহু অনুরোধ করেও ঠেকাতে পারেন নি তাদের। এর পেছনে কারণ কী বোঝা দুষ্কর। কোন মোহে বা কোন প্রাপ্তির আশায় সতীরা স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিতেন মূল্যবান প্রাণ তা এক জমাটবাধা অন্ধকার। আবার কেউ কেউ সত্যিই চাইতেন না, কেউ কেউ প্রাণ দিতে বাধ্য হতেন রাজকীয় প্রথানুসারে৷ এই রাজকীয় প্রথার বিষয়টা বিশেষত প্রচলিত ছিল রাজপুতানায়। আশ্চর্যের বিষ��় হল, সতীদাহ একান্তই উপমহাদেশীয় কোন প্রথা ছিল না৷ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতেও প্রচলিত ছিল এই অমানবিক প্রথা। আরো এক আশ্চর্য রহস্যময় প্রথা ছিল মন্দিরে দেবদাসীরূপে কন্যাদান করে দেয়া। এই দেবদাসীরা ছিলেন শিক্ষিত, নৃত্যগানপটিয়সী এবং সাধারণ নারীদের চাইতে অনেকটাই স্বাধীন। মূলত এরা রূপোপজীবিনী, তবে এদের আবার সমাজে এক ধরনের সম্মান ছিল৷ সুতনুকা নামে এক বিখ্যাত দেবদাসীর প্রেমকাহিনী তো অমর হয়ে রয়েছে ইতিহাসে৷ দেবদাসী প্রথার প্রভাব এমনকি মুসলিম সমাজেও নাকি ছড়িয়ে পড়েছিল। এই সম্প্রদায়টির নাম ছিল তোয়াইফ৷ এরাও মোটামুটি আড়ম্বর করে মেয়েদের দেহোপজীবিনী হতে উৎসর্গ করত৷ এমন কত আজব কাহিনী যে আছে ছড়িয়ে ইতিহাসে, আমরা তার খোঁজ জানিনা। আরো চমকপ্রদ কাহিনী হচ্ছে বিষকন্যাদের। এই বিষকন্যারা আবার কারা? সত্যিই কেউ কেউ বিষ ধারণ করত নাকি? ইতিহাস বলে, করত৷ বিশেষ প্রক্রিয়ায় নাকি তারা বেড়ে উঠত, আলিঙ্গনাবদ্ধ করে হত্যা করত রাজন্যদের। এটার হয়তো নানা রকম ব্যাখ্যা হতে পারে৷ কেউ কেউ রাজাদের সাহচর্যে যাবার আগে বিশেষ কোন পোশাক, গয়না বা নিজ অঙ্গেই বহন করত বিষ। এই ধারাটি বিশেষত প্রচলিত ছিল প্রতিশোধের নিমিত্তে, রাজাবাদশাদের গোপন কামরায়। কেবল বিষকন্যাই না, বিষপুরুষ ও নাকি ছিল৷ সুলতান মামুদ শাহ আর নাদির শাহ, এই দুই পরিচিত নামকে বিষপুরুষ এর উদাহরণ হতে দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না। শ্রীপান্থের সুলেখনীর জোরে এসব বিষয়ের অনেক খুঁটিনাটি উঠে এসেছে গ্রন্থটিতে৷ অনুসন্ধান করা হয়েছে উৎস, ধারা এবং নির্মূল। কিছু কিছু পুনরাবৃত্তিও আছে অবশ্য৷ ভাগ্যিস, এসব প্রথা এখন আর নেই। তবে নারীদের অবস্থানে সেই যুগের মতো আজো যে সন্তুষ্ট হওয়ার পর্যায় এখনো আসেনি, বিভিন্ন ইতিহাস আর বর্তমান মিলিয়ে দেখলে সেই ছবিটাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। আফসোস এটুকুই।
ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পড়তে পছন্দ করেন বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে শ্রীপান্থ নামটি অপরিচিত হওয়ার কথা না। বিশেষ করে ঐতিহাসিক রচনার জন্য বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে চির ঋণী হয়ে থাকবে।
দেবদাসী বইটিতে তিনটি গল্প আছে। এগুলোকে এক অর্থে গল্প না বলে ইতিহাস বললেও খুব যে বাড়িয়ে বলা হবে তা মনে হয়না। লেখক তাঁর অন্যান্য ঐতিহাসিক বইয়ের মতো এখানেও নৈপুণ্যের সাথে তিনটি বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। এগুলো হলো সতী, দেবদাসী, বিষকন্যা। যা উপমহাদেশে একসময় খুব জোড়ালোভাবে সমাজিক প্রথা হিসেবে টিকে ছিল।
সতী গল্পটি মূলত সতীদাহ প্রথার আদ্যোপান্ত বলা যায়। সতী প্রথার আদী থেকে অন্ত পর্যন্ত লেখক নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করেছেন, খুঁজে ফিরেছেন এর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা থেকে শুরু করে এ প্রথা হাজার বছর ধরে টিকে থাকার পেছনের মূল কারণ। যা এই গল্পকে শুধুমাত্র উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে আবদ্ধ রাখেনি। একে নিয়ে গিয়েছে বর্তমান প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে আদীম পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। যার ফলে সতী প্রথা নিয়ে উপমহাদেশ ছাড়াও সারাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে এই লেখার গ্রহনযোগ্যতার ভিত্তি আরো জোরালো করেছে বলে মনে হয়।
দেবদাসী গল্পটিও সতী গল্পের মতোই ইতিহাসের পথে হেটেছে। দেবদাসী প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে খুব বেশি দিন না। ১৯৪৭ সালে এই বিলুপ্তি, যেকারণে এই গল্পের ঐতিহাসিক দিকগুলো অনেক বেশি স্পষ্ট। যদিও দেবদাসীরা ভিন্নরূপে ভিন্নভাবে আজও টিকে আছে। তবুও দেবদাসীদের ইতিহাস হিসেবে এই গল্পকে প্রথম সারিতে রাখা যেতেই পারে।
বিষকন্যা অনেকটা কল্পকাহিনীর মতো মনে হলেও লেখক তাঁর অনুসন্ধানের জোরে ইতিহাসের বিলুপ্তির শিখরে গিয়ে সত্যকে তুলে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। যদিও সে চেষ্টা সত্যকে প্রতিষ্ঠায় যে খুব জোরালো ভূমিকা পালন করেছে তা বলা যাবেনা। আবার বিষকন্যার আখ্যানকে নিছক কল্পকাহিনী বলে উড়িয়েও দেয়া যাবেনা।
দেবদাসী।দক্ষিণ ভারতে সুপরিচিত "দেবারতিয়াল" নামে। ভারতের ভেঙ্কটেশ্বরা,তিরুপতি,কামাক্ষ্যা,কোনার্ক সূর্য্য মন্দির।এছাড়াও বিভিন্ন মন্দিরের গায়ে লাস্যময়ী,আবেদনীয়,কামোদ্দীপক বেশে ভারতনাট্যম নাচের মুদ্রার ভঙ্গিতে অপূর্ব সুন্দর নারী শরীরের শতবর্ষ প্রাচীন শিলালিপি দেখা যায়।এরাই দেবদাসী বা দেবতার দাসী বা মন্দির কন্যা। সুদর্শনা,সুলক্ষণা,নাচ,গান,চোখে আবেদনীয় ভাষা,শাস্ত্র,সহবত,সর্ববিদ্যায় পারদর্শিনী ছিলেন এই দেবারতিয়াল-গণ।স্বর্গলোকের নর্তকী ঊর্বশী,মেনকা,রম্ভার মতই তাদের কাজ ছিলো মর্ত্যলোকে পাথরের বিগ্রহের সেবা করা।এসব কামিনী,সুন্দরী,কচি ফুলের মত মেয়েরা মন্দিরে না নাচলে দেবতা নাকি ভোগ নিতেন না,ভক্তকূলের আরতি গ্রহণ করতেন না।তাই বিগ্রহের জন্য প্রাচীন সমাজের মানুষ শত শত সুলক্ষণা কন্যা মন্দিরে দেবতাদের উৎসর্গ করতেন।৩০০০বছর ধরে পালা করে বিরামহীন নাচ চলতো মন্দিরের প্রেক্ষাগৃহে। ৬বছর বয়স থেকে শুরু হতো তাদের শিক্ষা।১৬-২০বছর পর্যন্ত তারা দেবতার সেবায় নিয়োজিত থাকতো।এর বেশি বয়সের নারী দেবতাদের আকাঙ্ক্ষিত নয়।তখন তারা ঢলিত যৌবনা,তাদের হাতে সেবা দেবতা নিতে পারেন না। এই দেবদাসী কি শুধু দেবতার ভোগ্যা??? না,দেবদাসী মন্দির পুরোহিত,রাজন্যবর্গ এবং সর্বভোগ্যা(যাদের মান,যশ,প্রতিপত্তি আছে)। ইতিহাস বলে এরা বারাঙ্গনা,পতিতা,রুপোপজীবী,দেহ পসারিণী। মন্দিরের দেয়া সামান্য ভাতায় এই ঊর্বশীদের জীবন চলে না।সমাজে এরা ভোগ্যপণ্য ছাড়া কোনো মূল্য ছিলো না।যৌবন শেষ তো তারা অচল।ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে নামা ছাড়া উপায় নেই।একদিন যারা নগরের প্রভাবশালী ব্যাক্তির শয্যাশায়িনী ছিলো,দেবতার প্রিয় নর্তকী ছিলো তারা হয়ে যায় অচ্ছুৎ!!! ভারত ছাড়াও প্রাচীন মিশর এবং ব্যাবলনীয় সভ্যতায় বিভিন্ন নামে দেবদাসী-দের পরিচয় পাওয়া যায়।শুধুমাত্র ধর্মকে পুঁজি করে এমন ঘৃণ্য কাজে নারীর ব্যবহার বহু পুরোনো রীতি।ভারতে ১৯৪৭সালে দেবদাসী প্রথা উচ্ছেদ হয়। শ্রীপান্থ রচিত বইটিতে দেবদাসী ছাড়াও "সতী" এবং "বিষকন্যা" নামক নারীপ্রথা নিয়ে বিশদ বাস্তব পরিসংখ্যান রয়েছে।
দেবদাসী, তিনটা গল্প আছে এই বইতে। সতী,দেবদাসী,বিষকন্যা। তবু এর নাম দেবদাসী। কারণ,এই বইয়ে এমন একটা কালের কথা উল্লেখ আছে,সেকালে নারীরা দাসী-ই ছিল। না হলে দেবতার মনোরঞ্জনের কেউ কন্যা দান করে দিত না। কিছু কিছু নারীরা নিজেরা ও চাইত,নিজেকে ছোট করে রাখতে, তা না হলে নারী সেচ্ছায় সতী হতে চাইতো না। নারী সেচ্ছায় দাসী হয়েছেন,এমন ঘটনা হাতে গোনা,তাদের দাসী করে রাখার চেষ্টাই সেকালে বেশি হতো। আজও নারী কতটুকু এর থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে,আমি জানি না। তবে এতটুকু উপলব্ধি করতে পারি,অন্ধকার কাল থেকে নারীরা বেড়িয়ে এসেছেন। তাদের ভবিষ্যৎ পথ আলোকোজ্জ্বল।
শ্রদ্ধেয় লেখক শ্রীপান্থ মহ��শয়ের তিন টা বই পড়েছি,দেবদাসী তৃতীয় নম্বর। লেখকের লেখায় একটা মাধুর্য আছে। এই লেখাগুলো অনেক পরিশ্রম করে লেখা সেটা পড়লেই বোঝা যায়। আমার বিশেষ আগ্রহ লেখকের "কলকাতা " বইটা নিয়ে,সেটা পড়লে ষোল কলা পূর্ণ হবে।
শ্রীপান্থ মশাইয়ের লেখা যারাই আগে পড়েছেন তারা জানেন, তিনি সম্পূর্ণ কাঠখোট্টা ভাবে লিখে থাকেন। অসম্ভব সব তথ্যের মজুদ হলো শ্রীপান্থের লেখা।
"দেবদাসী" বইটিয়ো তাই। এখানে বলা আছে বিভিন্ন সময়কার নারীদের কথা। কালে কালে নারী রূপের বিভিন্ন পরিচয় পাওয়া যায়। কখনো সে আত্মাহুতি দিচ্ছে কোনো পুরুষের জন্য আবার কখনো কেড়ে নিচ্ছে পুরুষের জীবন। সবই চক্র। কালে কালে চলে এসেছে এসব চক্র। নারীদের অস্ত্র বানিয়ে বিভিন্ন ভাবে ব্যাবহার করে এসেছে এ সমাজ। আবার নারীদের মাথা ধমিয়ে রাখতে বিভিন্ন সময় চালু হয়েছে বিভিন্ন নিয়ম। "সতী", "দেবদাসী" এবং "বিষকন্যা" ইতিহাসের এই তিন জাতীয় নারীকূলের কথা বর্ণনা করে গেছেন শ্রীপান্থ। কি ভয়ংকর সেসব ঘটনা। কেনো এই বইয়ের নাম দেবদাসী রাখা হলো পুরো বই পরলে তা বোঝার বাকি থাকে না। প্রতিটা বিষয় নিয়ে আলাদা করে বলার মত কিছু নেই। সব মিলিয়ে এই শ্রীপান্থের দেবদাসী। কালে কালে নারীরা কিভাবে পুরুষের কাছে দাসী হয়ে এসেছে তারই বর্ণনা এই "দেবদাসী"।
শেষে "বিষকন্যা" পড়তে গিয়ে একটু বিশ্বাস-অবিশ্বাস খেলা করেছে এও সত্য। কোথাও একটা মনে হয়েছে এ সম্ভব না। মানুষ কন্যাকে সাপের পালন করার বিষয়টা আরো বেশি খটকা ধরিয়ে দেয়
সতী, দেবদাসী ও বিষকন্যাদের কথা ৩ পার্টে বলা হলেও বইয়ের নাম দেবদাসী দিয়েছেন লেখক। বিস্তর তথ্যনির্ভর বই হলেও বেশিরভাগ সময়ই লেখাগুলো অগোছালো লেগেছে তাই ছোট এই বইখানা পড়তে বেশ কয়েকবার ব্রেক নিতে হয়েছে।
ইতিহাস ভিত্তিক লেখনীর ক্ষেত্রে শ্রীপান্থ, শ্রীপারাবত খুব পরিচিত নাম। দুজনের লেখনীর সাথেই আমার পরিচয় আছে আর খুব ভালোও লাগে। গত দুদিন ধরে ধীরে ধীরে পড়ে শেষ করলাম শ্রীপান্থের লেখা এই 'দেবদাসী' বইটি।
বইটির নাম যদিও দেবদাসী, তবে এই বইটিতে আলোচিত হয়েছে সতী, দেবদাসী, বিষকন্যা, এই তিনটি বিশেষ ধারার নারীদের কাহিনী। কারণ এরা সকলেই যে দেবতাদের দাসী। সে দেবতা কখনও স্বর্গের, কখনও মর্তের, এই যা।
সতী~ স্বামীর মৃত্যুর পর তার জীবিত স্ত্রীকে মৃত স্বামীর সঙ্গে জলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দেওয়ার প্রথা আমাদের সর্বভারতে প্রচলিত ছিল। ১৮২৯ সালে রাজা রামমোহন রায়ের সহায়তায় লর্ড বেন্টিঙ্ক সতীদাহ প্রথা রদ করেন, এটি পড়ার বইতে অনেকবার পড়েছি। আর সত্যি বলতে পড়ার সময় মনে হতো যাক মেয়েগুলো বাঁচলো তাহলে। কেউ তাদের আর জোড়পূর্বক আগুনে বিসর্জন দিতে পারবে না। কিন্তু বিষয়টি কি আদতেই তাই ছিল? তাদের কি সর্বদাই জোড়পূর্বক বিসর্জন দেওয়া হতো?
১৮০০ সালের আগে-পরে অনেক সংবাদপত্রে চোখ বুলালেই দেখা যাবে, সেই সময় অনেক নারীরাই তাদের স্বামীর জলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিয়েছে হাসি মুখে কোনোরকম জোড়-জবরদস্তি ছাড়াই। এদের মধ্যে এমন অনেক নারী আছে যারা তাদের স্বামীকে কেবল বিয়ের রাতেই দেখেছে একবার, ভবিষ্যতে আর নয়। কোলকাতার কুলীন ঘরের মেয়ের সাথে বিয়ে হয় কোন্নগরের কুলীন ব্রাহ্মণ কমলাকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের। এই কমলাকান্ত অর্থাৎ তার স্বামীকে সে কেবল বিয়ের রাতেই দেখেছে। অথচ ইনিই যখন মারা যান, তখন তার চিতায় স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দেয় এই কুলীন ঘরের মেয়েটি। এইভাবে স্বেচ্ছায় নারীদের আত্মাহুতি দেওয়ার প্রকৃতই কী কোনো কারণ ছিল? এই 'সতী' প্রথা বাংলায় কেন রাজস্থানেও চোখে পড়েছে। অবশ্য শুধু ভারতে নয়, এই প্রথা চোখে পড়েছে বহির্দেশেও। "গ্রীক উপকথায় ইভাডেনও একজন 'সতী'। থিবেস-এর বিরুদ্ধে অভিযান করেছিল যারা সে সেই সপ্তবীরের অন্যতম কাপানিউস-এর স্ত্রী। শহরের প্রাচীর বেয়ে উঠবার সময় জিউস-এর বজ্রের আঘাতে তার মৃত্যু হলো। তাকে যখন পোড়ানো হচ্ছিল তখন ইভাডেন এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই আগুনে। আর এক গ্রীকবীর প্যারিস-এর স্ত্রীও সহমরণে গিয়েছিল।"
দেবদাসী~ মন্দিরে দেবতাদের সেবার জন্য নারী বা শিশুকন্যাকে উৎসর্গ করা বা দান করার প্রথাই দেবদাসী। এই দেবদাসীরা হতো শিক্ষিত, রূপসী ও নৃত্যগীতপটিয়সী। সমাজে ছিল এদের আলাদা সম্মান। তবে শুধু মন্দিরেই নয়, রাজকীয়, ধর্মীয় সব অনুষ্ঠানেই তারা থাকত। "পুরোহিতের মত নর্তকীও যেন তখন যাবতীয় শুভ অনুষ্ঠানে অপরিহার্য।" পাঁচ বছর বয়স থেকে তাদের নৃত্যগীতের চর্চা শুরু হত। কুড়ি-বাইশ বছর পর্যন্তই মেয়েরা দেবতাদের সেবায় নিমজ্জিত থাকতে পারতো। বলা হতো এইসকল দেবদাসীরা দেবতার বিগ্রহের সামনে নৃত্য পরিবেশন না করলে নাকি দেবতা ভোগ গ্রহণ করতেন না। তবে এই দেবদাসীরা কি শুধু দেবতাদেরই ভোগ্যা? ভারতের সাথে বহির্দেশেও এই প্রথার প্রচলন ছিল। "পৃথিবীর নানা কেন্দ্রে মন্দিরে মন্দিরে আঙুর বাগিচার মত নিয়মিতভাবে উৎসর্গ করা হতো রূপবতী তরুণী মেয়েদের।"
বিষকন্যা~ অপরূপ সুন্দরী কন্যা অঙ্গে বিষ লেপন করে আলিঙ্গনবদ্ধ হয়ে রাজাকে হত্যা করতো, এরাই হলো বিষকন্যা। তবে এই বিষকন্যারা কি সত্যিই ছিল? কোনো মানুষের পক্ষে কি সম্ভব অঙ্গে বিষ ধারণ করা? শত শত বছর ধরে পৃথিবীতে অন্তহীন রহস্য রয়েছে এদেরকে । এদের শুধু অঙ্গে নয়, নিশ্বাসেও বিষ ছিল। তবে ইতিহাসে শুধু বিষকন্যা নয়, বিষপুরুষের কথাও বলা হয়েছে।
ইতিহাস অনেক গভীর। যার পাতায় পাতায় রয়েছে এরকমই অজস্র লোমহর্ষক কাহিনী। লেখক তাঁর লেখনীর মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন সেইসকল কাহিনীরই কিছু অংশ। এই বইটি যেমন সুখপাঠ্য, তেমনি বইটি তথ্যসমৃদ্ধও অবশ্যই। পাঠকগণ পড়ে দেখতে পারেন বইটি। আশা করি ভালো লাগবে।
বইয়ের নাম যদিও দেবদাসী কিন্তু এখানে একাধারে সতী,দেবদাসী ও বিষকন্যাদের জীবন কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। এই তিন কন্যার জীবনের ধরন-ধারণের ইতিহাস রচিত হয়েছে বইটিতে।
কত অজানা কথা, কত বিস্ময়, অজ্ঞতা আর পাপ! একে একে এই এই দুঃখিনীদের কথা বলা যাক।
সতী : প্রাচীন ভারতে প্রচলিত নিয়ম ছিল, স্বামী যখন মারা যাবেন সাথে তার স্ত্রী ও সহমৃতা হবেন অর্থাৎ স্বামীর শিবদেহের জন্য প্রজ্জ্বলিত চিতায় স্ত্রীও সঙ্গিনী হয়ে ঝাপ দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নেবে।এই সহমৃতা স্ত্রী গণ এই সতী নামে পরিচিত। আমরা সকলেই সতীর সাথে পরিচিত ভারতীয় উপমহাদেশে তৎকালীন হিন্দু সম্প্রদায়ের এই নিকৃষ্ট ও নারকীয় প্রথা পালন করার মাধ্যমে। কিন্তু আদতে শুধু সনাতন কুলেই নয়, প্রাচীন মিশর,গ্রীস,চীন,হেরুলিদ,ব্যবিলনীয়দের মধ্যেও এই প্রথা চলিত ছিল। সেই যুগের স্বামীরা ছিলেন স্ত্রী সংখ্যার প্রতিযোগী। সেই সুবাদেই যখন কোন স্বামীর মৃত্যু হতো তার সাথে প্রাণ দিত একের অধিক স্ত্রী অর্থাৎ যার যতটি অর্ধাঙ্গিনী আছে। ��েই সংখ্যা যে হাজার কে স্পর্শ করেছে এটা শুনে অবাক লাগতেই পারে। কিছু নারী সহমরণে যেতেন স্বেচ্ছায়।কিন্তু সেটা হবে একশো জনে মাত্র দুই ভাগ।বাকিরা??বাকিদের জোর করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হতো।এর কারণও বিচিত্র। বিধবা এই নারীকে আত্নীয় কুল ভরণপোষণ দিতে নারাজ, বিধবা বিবাহের কঠোর বিরোধিতা, সম্পত্তির অধিকার, পরিবারের সুনাম ইত্যাদি।স্বামী মরে যাওয়ার পর নারীর কিই বা রইল আর জীবনে।তাই স্বামীকে মৃত্যুর পরেও পরলোকে সঙ্গ দিতে এই ব্যবস্থা। কারণের শেষ নেই। আর যারা সেই অভিশপ্ত কুপ্রথা থেকে নিজেদের কোনমতে বাচাতে পেরেছিল তারা 'অসতী' উপাধি লাভ করলেন।
দেবদাসী: দেবের সেবায় নিয়োজিত সকল দাসী।এই দেবতা মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত। দেবদাসীগণ নৃত্য,সংগীত, নাট্যকলা, শিক্ষায় সমান ভাবে পারদর্শী। তাদের কাজ মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত দেবতার সম্মুখে নৃত্য গীত পরিবেশন করা, দেবতার সেবায় নিজেকে সমর্পণ করে, কিছু জায়গায় দেবতাকে বিবাহ করে তাকে স্বামী রূপে গ্রহণ করেই তারা সেবাদাসী। কিন্তু তারা পণ্যা। এই দেবদাসূ বা সেবাদাসীরা বহুভোগ্যা হওয়ার হাত থেকে নিস্তার পায়নি। ধর্মের বিকৃতি পুরোহিত শ্রেণির মানুষদের যে পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল সেখানে অনেক গুলো ঘৃণ্য প্রথার মধ্যে অন্যতম ছিল এই দেবদাসী। কোন এক কালে কেউ একজন খুশি হয়ে এক দেবদাসীকে জমু উপহার দিয়েছিল, সেই সুবাদে তার বাকি প্রজন্মকেও দেবদাসীই হতে হবে।অনেকটা নানকারদের মত।মন্দিরের সেবায় নিয়োজিত থেকে যে মাসোহারা পাওয়া যেত তা পেট ভরানোর জন্য যথেষ্ট না হওয়া এই বহু ভোগ্য পণ্যায় পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ।হায়্রে কুসংস্কার! কত মেয়ে বিয়ের পূর্বে নিজের কুমারিত্ব অর্পণ করতে এসেছে নিচ পুরোহিত সম্প্রদায়ের কাছে। শুধু মেয়েরাই নয়,ছেলেরাও এই পদে নিযুক্ত ছিল। তারা নৃত্য গীতের সময় বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজে নিয়োজিত ছিলো । এই প্রথা শুধু ভারতেই নয়, প্রচলিত ছিল আরো অনেক স্থানেই, সেই সতী প্রথার মতই।প্রাচীন মহেঞ্জোদারো, প্যারিস, ইউরোপ,ফেরুসালেমেও তাদের আবির্ভাব ছিল।
বিষকন্যা: বিষকন্যা অর্ধেক মানবী,অর্ধেক কল্পনা। বিষকন্যাদের জন্মের পর থেকেই বিষের ছোয়ায় লালন পালন করা হয়।তাদের নিঃশ্বাসে বিষ,নজরে বিষ,আলিঙ্গনে বিষ।যেখানে মানুষ অস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধ করতে বা প্রাণ নাশ করতে সেখাবে বিষকন্যারা নিজেরাই একেক্টি ধারালো অস্ত্র।তারাই তাদের শত্রুর একমাত্র কাল। আলেকজান্ডারকে খুন করার জন্য একাকাধিবার প্রেরণ করা হয়েছিল বিষকন্যাদের।গুরু সক্রেটিস এর বিচক্ষণতায় সে একাধিকবার এই রেহাই পান।তৎকালে নারী লোলুপ রাজ রাজারাজড়াদের জীবন অবসান করতে এই বিষকন্যাদের অব্যর্থ প্রয়োগ ছিল খুবই জনপ্রিয়। তাদের এই বিষকন্যা হয়ে ওঠার পদ্ধতিও বিচিত্র যা অনেকটাই কল্পকাহিনীর মতো।
এই তিন কন্যার মধ্যে বিষকন্যা অর্ধেক কল্পনা হলেও বাকি দুইজন 'সতী' ও 'দেবদাসী' সম্পূর্ণভাবে বাস্তব।আর স্বস্তির বিষয় এই যে এই দুই প্রথা নির্মূলে ভারতবর্ষ অগ্রমুখী হয়ে তা প্রতিরোধ করতে চেয়েছে এবং এই দুই কুপ্রথার অস্তিত্ব অবসানে, উচ্ছেদে সফল হয়েছে।সতীদাহ প্রথা বিনাশে রাজা রামমোহন রায় এবং দেবদাসী প্রথা বিলুপ্ত করণে মুথুলক্ষ্মী রেড্ডীর অবদান চির অম্লান হয়ে আছে।
আমি শরৎচন্দ্রের দেবদাস বই পড়ে যেমন অভিভূত হয়েছিলাম, সেই জায়গা হতে দেবদাসী বইটি সংগ্রহ করেছিলাম।আমার ধারণা ছিলো এখানেও খুব করুণ ট্রাজেডিময় ঘটনার বর্ণনা থাকবে। কিন্তু, শ্রীপান্থের এই বইয়ে আছে তিন কন্যার কাহিনী: সতী,দেবদাসী,বিষকন্যা। তবুও নাম দেয়া হল 'দেবদাসী'। কেননা তিনকন্যাই মূলত তা-ই, দেবতাদের দাসী। সে দেবতা কখনো স্বর্গের,কখনো মর্তের।এই গ্রন্থের প্রথমেই শ্রীপান্থ 'সতী'দের নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন।
'সতী' অংশের মূল বিষয়বস্তু 'সতীদাহ' প্রথাকে কেন্দ্র করে। শতশত বছর ধরে চলে আসা মৃত পতির সাথে নিজেকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার নাম সতী। মাত্র বিয়ের রাতটুকু পতির সাথে কাটিয়ে সেই নারীও পরদিন উঠেছে চিতায়।কারণ, মৃত্যুর পর পতিকে যেনো একা না থাকতে হয়, সেজন্য পতির সাথে জীবন্ত পুড়ে মৃত্যুবরণ করে হতে হয়েছে সতী। ভারতবর্ষের এক লোমহর্ষক ইতিহাস এটি। শ্রীপান্থ সুনিপুণ ভাবে এই ঐতিহাসিক বিষয়গুলো আলোচনা করেছেন।শ্রীপান্থ যে হিসাব তুলে ধরেছেন,সে মতে- ১৮১৫ সালে ৩৭৮ জন ১৮১৬ সালে ৪৪২ জন ১৮১৭ সালে ৭০৭ জন ১৮১৮ সালে ৮৩৯ জন ........... এবং এই সতী নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলো ১৪-২০ বছর বয়সী নারীদের সংখ্যা।যারা চাইলেই এই প্রথা থেকে বেরিয়ে এসে আবার নতুন জীবনের শুরু করতে পারতো। কিন্তু, অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন রীতিতে শতশত বছর ধরে লক্ষ লক্ষ নারীরা এভাবে সতী হয়ে গেছেন। অবশেষে, আলবুকার্ক,সম্রাট জাহাঙ্গীর,রাজা রামমোহন,ব্রুক,জর্জ বার্লো,উইলিয়াম বেন্টিক এছাড়াও আরো অনেকের অক্লান্ত পরিশ্রমে এ সতীদাহ প্রথা রোধ হয়।এছাড়াও সতীদাহ প্রথার ঐতিহাসিক ঘটনার স্বাক্ষর পাওয়া যায়।
'দেবদাসী' - মূলত দেবতাদের উদ্দেশ্যে যাদের উৎসর্গ করা হয় তাদেরকে দেবদাসী বলা হয়ে থাকে।ভারতবর্ষে শত বছরের ইতিহাস এটি।মূলত, দেবদাসীদের মূল কাজ হলো- সেজেগুজে নেচে-গেয়ে দেবতাদের খুশি করা। আসলে মূর্তিমান দেবতারা কি তাদের এ শারীরিক অঙ্গভঙ্গি আর শরীর দানকে গ্রহণ করতো? না হলে এই শত বছরের লক্ষ লক্ষ দেবদাসী কি কারণে মন্দিরে এসে পরে থাকতো? এমন কি, পরিবারে কোনো কন্যা সন্তান হলে তাকে অল্প বয়সে মন্দিরের দাসী হওয়া বাধ্যতামূলক ছিলো এবং কোনো যুবতী যদি রূপ-যৌবনে পরিপূর্ণা হতো,তাহলে তাকেও নানা ভাবে মন্দিরের দাসী বানানো হতো। এই দেবদাসীদের আসলে মন্দিরে কাজ কি ছিলো? আর কিজন্যই তারা পরে থাকতো এ মন্দিরে?
মাদ্রাজ বিধানপরিষদের সভা চলছিলো। সেখানে হাত উচু করে দাঁড়ালেন- একমাত্র মহিলা সদস্য ডাঃ মিসেস মুথুলক্ষ্মী রেড্ডি।তিনি বলে উঠলেন- Sir, I beg to move understanding order 34. তিনিই শুরু করেন এই দেবদাসী প্রথা বন্ধের আন্দোলন। কিন্তু,কেনো? দীর্ঘদিন সংগ্রাম করে তিনি এই প্রথার শিকল ভাঙ্গতে সক্ষম হয়েছেন।শত বছরের এই গণিকা বা দাসী বিষয়ক আলোচনা করেছেন শ্রীপান্থ এই অংশে।
"বিষকন্যা"-একদম ভিন্ন আঙ্গিকে তৈরী এ কন্যা।যার দেহে,ঠোঁট পুরো শরীরে জমে থাকে বিষ।কেউ লালসা পূরণ করতে তার কাছে গেলে,স্পর্শ করলে,চুম্বন করলে নির্ঘাত মৃত্যু।এরিস্টটল বার বার মৃত্যুর ফাঁদ থেকে রক্ষা করেছেন আলেকজান্ডারকে।ছোটকাল হতে নির্ধারিত একজন রমনীকে বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে বিষাক্ত করে তোলা হয়,যার মাধ্যমে নিধন করা হয় শত্রুপক্ষকে। আর তাই এই গল্প হয়ে উঠে বিষকন্যা।
বারবার অল্প কথায় গুছিয়ে লিখার চেষ্টা করলেও তা অল্প কথায় লিখা যাচ্ছিলো না। এখানে তিনিটি গল্পের মাধ্যমে একদম ভিন্ন আঙ্গিকে বইটি শেষ করা হয়েছে।এই বইটিকে নন-ফিকশন বইও বলা যেতে পারে। যারা অন্তত এই বইটি পড়বেন তারাই বুঝতে পারবেন এখানে ইতিহাস-ঐতিহ্য কতদূর ব্যপ্ত।
This entire review has been hidden because of spoilers.
বইটির তিনটি অংশে আমাদের বিগত সমাজ ব্যবস্থার তিনটি গ্রে এরিয়া নিয়ে আলোচনা করেছে। সতী, দেবদাসী আর বিষকন্যা। সতী অংশটি সতীদাহ প্রথা নিয়ে। ধর্মীয়ভাবে এর ইম্প্লিকে��ন বা জনপ্রিয়তা থেকে শুরু করে পারিবারিক বা রাজনৈতিক কারণে জোরপূর্বক ভস্ম করবার বিষয়গুলি চলে এসেছে, এবং এটা রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে দরিদ্রতম পরিবার গুলোতেও সমান তালে চলত। দেবদাসী বা দেবতার দাসী। মন্দিরে দেবতার সেবার জন্য উৎসর্গিত কুমারী মেয়েদের গল্প। এদের অনেক কষ্টের কথা উঠে এলেও, এটা জেনে আশ্চর্য হয়েছি যে ভরতনাট্যম নাচ এদেরই অবদান। বিষকন্যা। প্রাগৈতিহাসিক হানি ট্র্যাপ। যদিও ভেবেছিলাম ডাইনী অপবাদ নিয়ে কথা হবে, কিন্তু কিছুটা মিথ কিছুটা কল্পিত কাহিনী নিয়ে মোটামুটি একটা কাহিনী দার করানো হয়েছে। বাকি দুটি অংশ রিসোর্সফুল হলেও এই অংশটি খাপছাড়া মনে হয়েছে।
শ্রীপান্থের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণধর্মী লেখাগুলি ননফিকশন জনরার মাঝেও সুন্দর গদ্য ভঙ্গিতে লেখার কারণে মুখরোচক হয়। বরাবরের মতো এখানেও একই ছাপ ছিল।
ইতিহাসের যত গভীরে যাওয়া যায়, অসম্ভব সব তথ্যের সমাহার লেখক শ্রীপান্থার লেখায়।
"দেবদাসী" বইটিতে তেমনই রয়েছে উপমহাদেশী নারীদের তিন ধরনের জীবন ধারার চিত্র। সতী, দেবদাসী, বিষকন্যা এই তিন জাতীয় নারীদের ইতিহাসেই তুলে ধরেছেন লেখক শ্রীপান্থ।
কয়েক যুগ আগে,সনাতন ধর্মে দেখা যেত স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী কেও সেই একই চিতায় আত্মাহুতি দিতে হতো। ১৮০০ সনের আগে অনেক সংবাদ পত্রিকায় দেখা যায় বড় হেডিং " সুটী অ্যাট... "। সুটী যার অর্থ "সতী"। অর্থাৎ সতীদাহ বা সহমরণ । নারীকে তার সতীত্ব প্রমাণ করার জন্য স্বামীর মৃত্যুর পর চিতার সম্মুখি হতে হয়েছে। কোন রকম জবরদস্তী ছাড়াই এরা সেচ্ছায় নিজের আত্মাহুতির পথ বেছে নেয়। কখনো কখনো দেখা যায় এরা বিয়ের পর আর কখনোই স্বামীর মুখদর্শন করে নি, এদের অনেকের বয়স ১৬ কি ১৭ ও পার হয়নি। তবুও সতীত্ব প্রমাণে তার পিছ পা হয়নি। বইয়ের তথশ অনুসারে "১৬১১সনে এক সঙ্গে চারশ' নারী আত্মাহুতি দিয়েছিলো, এক স্বামীর চিতায়"। ইংরেজরা তাদের আইন, প্রশাসন দিয়ে এই সতীূাহ অনেক বার আটকাবার চেষ্টা করেছেন, তাতে কাজ হয়নি। কিন্তু কেনো?? কি কারণে তারা সেচ্ছায় এই অন্ধকার জগৎ বেছে নিয়েছিলো?? তা আজো জানা যায়নি। কিছু কালে পরের, যে -সতী চিতার আগুন থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলো তাকে বলা হয়েছে "অসতী" অথচ সতীদাহ উপমহাদেশীয় কোন প্রথা ছিলো না।
মন্দিরে দেবতার সেবায় কন্যাসন্তান কে দান করে দেয়া। দেবতার উদ্দেশ্যে নারীকে উৎসর্গ করা। এই নারীদের পরিচয় "দেবদাসী"। এরা যেমন রুপে রুপজীবিনী, শিক্ষিত, নৃত্যপটীয়সী। সমাজে এদের এক বিশেষ সম্মান দেয়া হতো। দেবদাসীদের বেশবসা, সাজসজ্জা, বাচনভঙ্গী চমৎকার। দেবতার সঙ্গে মন্দিরে বাস করতে হতো তাদের। জীবনের একটা নিদিষ্ট সময় তারা মন্দিরেই কাটাতো। তখন তারা বহুভোগ্য। তবু তারা কখনো ঘৃণার পাত্র নয়। আবার কখনো এরা হৃয়কারি প্রেমিকা ও হতো। কখনো বা বিচ্ছেদ কখনো বা সম্মানিত হতো পত্নী রুপে। এরা কখনো ঈশ্বরের, ঈশ্বরের পরিবর্তে পুরোহিতের ক্রমে সর্ব সাধারণের মূলতএরা দেহোপজীবিনী হতেই উৎসর্গীত।
ইতহাসের মোড়ে মোড়ে যত লোমহর্ষ কর কাহিনী। এই বই না পড়লে জানাই হতো না। তেমনই এক কাহিনী " বিষকন্যাদের " নিয়ে। কারা এই বিষকন্যা? মানুষের দেহেও বিষ ধারণ করা যায়? এও সম্ভব? কিন্তু ইতিহাস তো তাই বলে। বিশেষ এক প্রক্রিয়ায় এরা বেড়ে উঠত, আলিঙ্গনাবদ্ধ করে হত্যা করত রাজ্যনদের। তাদের নিশ্বাসে, চুম্মুনে রয়েছে বিষ। রাজ্যের রাজনৈতিক ঘটনা গুলোয় প্রতিপক্ষের উপর প্রতিশোধ নেয় এই এক অভিনব পদ্ধতি। শুধু বিষকন্যা নয় বিষপুরুষ ও নাকি ছিলো।
লেখকের লিখনীতে এমনি তিন নারী কূলের প্রথা, উৎসের সকল তথ্যই জানা যায়। এবং জানা যায় এসব প্রথার উচ্ছেদের কারণ।