কুবের সাধারণ মানুষ। সংসারী। চাকুরে। যৌথ পরিবারের সদস্য। দেশভাগের প্রোডাক্ট। মাথায় তার স্বপ্নের বোঝা। কুবের দ্যা ড্রিম মারচেন্ট। এক ফালি জমি, নিজের একটি বাড়ি করতে গিয়ে কখন সে জমি কেনাবেচা করতে করতে নগর পত্তন করে ফেলে। আসে ফসলের নেশা। অর্থবান কুবের কখন যেন দ্বীপের মালিক, পরিত্যক্ত দুর্গের দখলদার। কুবের দ্য চকদার তখন। একটা কিছু গড়ে তোলার নেশা যে তার রক্তের গভীরে। কিন্তু উচ্চাশা আর নিঃসঙ্গতা, গড়ে তোলা আর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়াও কুবেরের রক্তের ভিতরে। সে জানে সব কিছুর পরও সর্বনাশ তার জন্য ওৎ পেতে বসে আছে। সে শুধুই একটা পুতুল। তার শুধু কাজ করে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই কোন রাস্তা নেই। বুঝতে পারে তার আকাঙ্খা, সাফল্য সবকিছুর শেষে অনিবার্য মানবজীবনের ব্যর্থতা।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম অবিভক্ত ভারতের খুলনাতে (অধুনা বাংলাদেশ)। খুলনা জিলা স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম জীবনে আনন্দবাজার পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন, ১৯৬১ সালে আনন্দবাজারে যোগ দেওয়ার পর তাঁর ছোটগল্প ‘হাজরা নস্করের যাত্রাসঙ্গী’, ‘ধানকেউটে’ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘বৃহন্নলা’, কিন্তু দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ‘কুবেরের বিষয় আশয়’ প্রকাশিত হওয়ার পরেই শ্যামলের লেখনী বাংলা পাঠকমহলে সমাদৃত হয়। ব্যক্তিজীবনে বোহেমিয়ান, সুরসিক ও আড্ডাবাজ ছিলেন তিনি। আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর অন্যতম কর্তা সন্তোষকুমার ঘোষের সাথে তাঁর মনোমালিন্য হওয়ায় যুগান্তরে যোগ দেন। যুগান্তরের সাহিত্য পত্রিকা অমৃত সম্পাদনা করতেন। ১৯৯০ সালে অবসরের পরে আজকাল পত্রিকা ও সাপ্তাহিক বর্তমানে নিয়মিত লিখেছেন। গ্রামীণ জীবন, চাষবাস, সম্পর্কের জটিলতা ইত্যাদি শ্যামলের রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
১৯৯৩ সালে শ্যামল সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন ‘শাহজাদা দারাশুকো’ উপন্যাসটির জন্যে। এছাড়া তাঁর লেখা দেশ বিদেশের নানা ভাষাতে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে।
নাম - কুবের সাধু খাঁ পিতা – দেবেন্দ্রলাল সাধু খাঁ জন্ম বৃত্তান্ত – অপ্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক অবস্থা – একটা বিশাল ন্যাড়া তাল গাছের মতো মানসিক অবস্থা – অর্ধমৃত শারীরিক অবস্থা – ( আপনার এটা না জানলেও চলবে ) কুবের পেশায় একজন ড্রিম মার্চেন্ট । খোয়াবের ব্যাপারী । প্রথম জীবনে সামান্য বেতনে একটা কারখানায় চাকুরী করে আস্তে আস্তে নানাভাবে প্রচুর অর্থ সম্পদের মালিক হয়ে যাওয়ার পর কুবেরের মন মানসিকতার আমূল পরিবর্তন হয়েছিলো কিনা তা কুবের নিজেই ভালো জানে ... তার স্বপ্ন যে খুব বড় তা নয় , ইচ্ছা আছে কয়েক কাঠা জমির উপর একটি বাড়ি বানিয়ে ভাই বোন , ছেলেমেয়ে , বাবা মা সহ খুব শান্তিপূর্ণ একটা জীবন কাটিয়ে দিবে । তা ঐ জমি কিনতে গিয়েই শুরু হলো নেশা । চারিদিকে এতো জমি এতো সম্পত্তি সব ই যদি নিজের হতো ! ব্যস একসময় কুবের ধরেই নিলো তাকে পৃথিবীতে পাঠানোই হয়েছে দুই হাতে পয়সা কামানোর জন্য । এখানে ওখানে করতে করতে পরিবার , বন্ধু বান্ধব , আত্মীয় স্বজন সব ঐ বিষয় আর আশয়ের উপর চাপা পড়ে গেলো । আরো চাই আরো চাই মন মানসিকতা একজন মানুষের যে শুধুমাত্র লোভের পরিচয় নয় বরং এটা এক প্রকার বিকার ও বটে সেটা কুবেরের বউ , ছেলেমেয়ে , বাবা মা, ভাই বোন বুঝতে পারলেও কুবের কোনদিন বিশ্বাস করে নি । চাহিদার শেষ নাই এ কথা যেমন সত্য তেমন সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষ কে জন্ম দেওয়ার সময় তার প্রাপ্তির ঝুলির ধারণক্ষমতা যে পর্যাপ্ত দিয়া দেন তাও সত্য - সেটা কুবের জানে না কিংবা জানলেও মানতে চায় না। আশেপাশে কতো হিতাকাঙ্ক্ষী ; তাও কুবেরের মনে হয় বিরাট এক দ্বীপের উপর সে যেন একা একা হেঁটে যাচ্ছে । হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত শ্রান্ত অবস্থায় প্রচুর অর্থ সম্পদের মধ্যে কুবের সাধু খাঁ সুখ আর স্বস্তি খুঁজে ; কখনো সেগুলোর নাগাল পায় আবার কখনো সব আঙুল গলে বেড়িয়ে যায় । শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কে আমি বলি ‘’ঘরোয়া লেখক’’ । আমরা ঘরোয়া আলোচনা যেভাবে করি উনি ঠিক সেভাবে লেখেন । লেখার ভুল শুদ্ধের চাইতে মনের ভাব খোলামেলাভাবে প্রকাশ পাচ্ছে কিনা তার দিকে ভদ্রলোকের নজর বেশি থাকে । খাপছাড়া হলেও পড়তে আরাম আছে । এই কুবের চরিত্রটাকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কম হেনস্থা করেন নাই । আপন বউয়ের আপন বোন রে নিয়ে দ্বীপে ভেগে যাওয়ার সিদ্ধান্ত খুব উদার মানসিকতার পরিচয় দিলেও সুবিবেচকের পরিচয় যে একদম দেয় নি তা অস্বীকার করা প্রায় অসম্ভব । একটা অন্যপ্রকার অশ্রদ্ধা আপনাই চলে আসে । ঐ কুবেরের সাথে এই কুবেরের বিস্তর তফাৎ । পাঠক দয়া করে মানিক কোম্পানির কুবেরের সাথে শ্যামল কোম্পানির কুবেরকে বিচার করবেন না ।
কাহিনীর দৃশ্যপট হুটহাট বদলে যাওয়ার কারনে মাঝে মাঝে খাপছাড়া লেগেছে। এছাড়া কুবেরের নিজের মধ্যে বার বার নিজেকে খুঁজে ফিরে বেড়ানো সহ অন্যান্য সবকিছু উপভোগ করেছি।
উপন্যাস পড়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার পাশাপাশি উপন্যাসের অনেক বিশেষ যে পাঠককে অনেক ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সেটার একটা বড় দৃষ্টান্ত এই উপন্যাসে খুঁজে পাওয়া যায়। বইটা পড়ে যে শুধুমাত্র একটি উপন্যাসই পড়া হবে, এমনটা না। এটা থেকে অনেকটা শেখার আছে, উপলব্ধি করার আছে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে, "তুই নিজের কথা লিখে যা ।" অন্ততপক্ষে 'কুবেরের বিষয় আশয়' এ লেখক সেই কাজটিই করেছেন। কুবেরের ইস্পাতের কারখানায় কাজের মাধ্যমে চাকরিজীবনের সূচনা, জমির নেশায় বুঁদ হয়ে পড়া, ধানচাষের প্রেমে পড়া, মদনমল্লর দুর্গ...... এসব লেখকের নিজের জীবনের আদলে তৈরি। আর একারণেই হয়ত এই লেখা এতটা নিখুঁত আবার দরদী। ভাষার বাহুল্য নেই। নেই অহেতুক নাটকীয়তা। আছে জীবনকে গল্পের মত সহজ করে বলার চেষ্টা। প্রতিটি চরিত্রই স্বকীয়তার গুণে দাগ কাটে। আমি আগে কখনো এরকম লেখা পড়িনি। আর এই নতুন স্বাদের লোভেই এই উপন্যাস পড়া যেতে পারে, বারবার।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম জীবনে আনন্দবাজার পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন, ১৯৬১ সালে আনন্দবাজারে যোগ দেওয়ার পর তাঁর ছোটগল্প হাজরা নস্করের যাত্রাসঙ্গী, ধানকেউটে ইত্যাদি প্রকাশিত হয়।
তাঁর প্রথম উপন্যাস "বৃহন্নলা", কিন্তু দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে " কুবেরের বিষয় আশয় "প্রকাশিত হওয়ার পরেই লেখকের লেখনী বাংলা পাঠকমহলে সমাদৃত হয়।
ব্যক্তিজীবনে বোহেমিয়ান, সুরসিক ও আড্ডাবাজ ছিলেন তিনি। আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর অন্যতম কর্তা সন্তোষকুমার ঘোষের সাথে তার মনোমালিন্য হওয়ায় তিনি যুগান্তরে যোগ দেন। তাঁরছদ্মনাম- বৈকুন্ঠ পাঠক।
কদমপুরের দেবেন্দ্রনাথ সাধুখাঁর ছেলে কুবের সাধুখাঁ যৌথ পরিবারের সাধারণ সংসারী চাকুরে মানুষ। তার মাথায় শুধু স্বপ্নের আনাগোনা।
সময়টা দেশ ভাগের পরের। এক টুকরো জমি, একটি বাড়ীর স্বপ্ন চোখে নিয়ে নানা জায়গায় ঘুরে খুজে ফেরে পছন্দের জায়গা।
নিজের বাড়ী করার জায়গা খুজতে খুজতে জমি কেনা বেচা করতে করতে একসময় কুবের নিজের একটা নগর প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন। তৈরি করে ফেলেন নিজেরই নামে রাস্তা, স্টেডিয়াম।
সম্পদ গড়ে তোলার নেশা পেয়ে বসে তার রক্তে। একটা সময় এসে কুবের দেখতে পায় সম্পদের পাহাড় গড়ে তুললেও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন সময় আর প্রিয়জন দের। সম্পদের পেছনে ছুটতে গিয়েই কি তিনি হারিয়ে ফেললেন সুখ?
শ্রীকান্ত যেমন শরৎচন্দ্রের, অপু নামের সাথে বিভূতিভূষণ, শশী ডাক্তার মানিকের, দেবু পন্ডিত বললেই তারাশঙ্কর, তেমনিই কুবের নামটির সঙ্গে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়।
বাংলা সাহিত্যে এই সব অবিস্মরণীয় চরিত্রের নামের সাথে পাঠকের কাছে সুপরিচিত হয়ে আছেন লেখক নিজে।
কুবের চরিত্র টি সভ্যতার শুরু থেকে সব মানুষ, আমি ও আপনি। সম্পদ গড়ে তোলার সাথে সাথে অনেক কিছুই চলে আসে হাতের মুঠোতে। যা না যায় ফেলে দেওয়া তবে বিবেক হয়ে যায় বিবষ ।
কুবের দ্য ভ্যাগাবন্ড থেকে ড্রিম মার্চেন্ট কুবের এবং ত���রপর চকদার কুবের হওয়ার জার্নি টা ব্যাপক। প্রায় ২৫০ পৃষ্ঠার এই বই পড়তে আমার ১৫ দিনের মত লাগছে। তার মধ্যে প্রথম ৫০/৬০ পৃষ্ঠা পড়তে সময় লাগসে ৭/৮ দিন।
কেন?
কারণ শুরু অন্য সব উপন্যাস থেকে একটু অন্য রকম। গতানুগতিক গল্পের শুরু থেকে অনেক ভিন্ন। ফলে গল্পে ঢুকতে একটু ধীরে,দেখে, শুনে, বুঝে ঢুকতে হয়েছে। গল্পের দ্বার একবার যখন খুলেছি,সাথে সাথে বাকি দ্বায়িত্ব কুবের সাধুখাঁ'র ঘাড়ে। আমি শুধু নির্বাক দর্শক হয়ে দেখে গেছি,লালসার পরিণতি কিংবা কুবের সাধু খাঁ'র ফুলে ফেঁপে উঠেও, রাখতে না পারার পরিণাম!
ঠাসবুনোট একটা লেখা, পড়া শেষ করে অনেক্ষন স্পেলবাউন্ড হয়ে থাকতে হয়,দু চোখে ঘোর লাগে। কুবের সাধুখাঁর সাধারণ স্টিল কোম্পানির হাড়ভাঙ্গা খাটুনির জীবন থেকে অঢেল জমির মালিক সাধুখাঁ সাহেব হয়ে ওঠার গল্প, শালকের ঘুপচি ঘর থেকে কদমপুরের অট্টালিকার গাঁথনির প্রতিটি ইট জানে সেই গল্প। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা যেন ছবি হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নির্জন দ্বীপের মাঝে কতকাল আগের তৈরী এক দুর্গে কোটিপতি হয়ে গিয়ে ভিখারি হয়ে ফেরৎ আসার এই গল্প,প্রতিটি শব্দ স্বপ্নের জন্ম দেয় আবার হতাশারও। অদ্ভুত এই উপন্যাস আর তার ট্র্যাজিক নায়ক কুবের সাধুখাঁ, অন্যান্য চরিত্রের সংলাপগুলিও এক অন্যরকম ভালোলাগার সৃষ্টি করে। একে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ক্লাসিক উপন্যাস কেন বলা হয় না পড়লে বুঝতেই পারতাম না।
life as we wish is not the life we get to build for ourselves... and yet the risks that we take, the joy in the choices we make it bitter sweet. without the bitterness, the sweetest triumphs would seem so pale and our reflections bland.
কুবেরের জমি দেখার জন্য কদমপুরে দৌড়াদৌড়ি থেকে উপন্যাসের কাহিনী শুরু। লোহার কারখানায় চাকরি করা কুবের জমি কিনে বেচতে বেচতে একসময় হয়ে ওঠে কদমপুরের ড্রিম মার্চেন্ট কুবের সাধুখা। তার নামে হয় কুবের রোড, স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজ চলমান। হয় তার নিজের বিশাল বাড়ি, বাঁধানো পুকুরঘাট, স্বপ্ন তার মা বাবা ভাই বোন নিয়ে একসাথে থাকা। কিন্তু গ্রৃহপ্রবেশের কদিন পরেই তার মা মারা যায়, ভাইরা তাদের শিকড় ছেড়ে কুবেরের বাড়িতে আসতে অস্বীকৃতি জানায়। তখনই কুবেরের মনে হতে থাকে কি হবে এসব বিষয় আশয় দিয়ে? ড্রিম মার্চেন্ট থেকে কুবের এবার চকদার হতে নামে। চকদার অর্থ বড় চাষী। "ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আর তারপরেই ভদ্রেশ্বর"। এই ভদ্রেশ্বরের কথায় মেদনমল্লার দ্বীপে ধানের চাষ শুরু করে কুবের।শুরু হয় আরেক অধ্যায়।
উপন্যাসের নাম যেমন তেমনি মূলভাব। তবে আরো একটা দিক ফুটে উঠেছে মূল বিষয়ের আড়ালে। বুলু কুবেরের বউ তবে উপন্যাসে বা কুবেরের জীবনে তার তেমন অবদান চোখে পড়ে না। মেদন্মল্লার দ্বীপে যখন সে আভার সাথে থাকতে শুরু করে স্বামী স্ত্রীর মত তখন তার মনে হয় বুলুর সাথে কোন পার্থক্য নেই। দীর্ঘ সময়ে বুলু বা তার স্ত্রী তার মনে কোন টান তৈরি করতে পারেনা। এমনকি পরকীয়ার সম্পর্ক তার মনে কোন অপরাধবোধ ও তৈরি করেনা। তার মন পরে থাকে তার মরা মা,আর ছেড়ে যাওয়া ভাইদের দিকে। অথচ তার বউ দু ছেলে মেয়ে নিয়ে নিজের গড়া পরিবারের প্রতি দায়িত্ব বা বাৎসল্য কোনোটাই ফুটে ওঠে না। কি নিদারুণ নিরাসক্ত ভাব!
কুবেরের সাথে পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের কুবেরের মিল না চাইতেও চোখে ধরা পড়ে।
উপন্যাসের গাঁথুনি, লেখনী আর কাহিনী বিন্যাস অসামান্য। খুব দ্রুত এক গাছ থেকে অন্য গাছে কাহিনী বিস্তার করে গিয়েছেন লেখক। প্রথম দিকে কাহিনী ধীর হলেও শেষ দিকে বেশ বেগবান হয়। কয়েকটা জায়গায় গল্পের বাঁক বেশ সহজেই অনুমান করা যায়। এমনকি গল্পের পরিণতি ও আঁচ করা যায়।
অনেক কাল আগে কুবের ছিল "কুবের দ্যা ভ্যাগাবন্ড"। সময়ের সাথে অবস্থা বদলে গেল।মাথা গোঁজার ঠাঁই জোগাতে একসময় জমি কেনাবেচা শুরু করে, হয়ে যায় "ড্রিম মার্চেন্ট কুবের সাধুখাঁ"।এক টুকরো জমি চেয়েছিল মা তার কাছ থেকে, মাকে সে একটা বাড়ি বানিয়ে দেয়। নতুন বাড়িতে আসার আগে মা মারা যায়। ভাইয়েরা নতুন বাড়িতে আসতে রাজি নয়।এ দুঃখ কুবেরের আজীবনের।যৌথ পরিবারের স্বপ্ন সে দেখেছিল। কিন্তু এত অর্থ-ঐশ্বর্যের মধ্যেও সে নিঃসঙ্গ। এছাড়া কুবেরের একটি গোপন দুঃখ আছে,কারো কাছে সে এই দুঃখ ভাগ করে নিতে পারে না।অথচ ধীরে ধীরে দুঃখের শ্যাওলা কুবেরকে গ্রাস করছে।একসময় কুবের ধানের নেশায় পড়ে যায়। স্ত্রী-সন্তান রেখে চলে যায় মেদনমল্লের দ্বীপে চাষাবাদের উদ্দেশ্যে। এখানে তার সঙ্গী হয় আভা বৌদি। কুবের হয়ে যায় "কুবের দ্যা চকদার"।একসময় দ্বীপের সংসার মূলতবী রেখে এক অপরাধী হিসেবে ফিরে যায় পরিবারের কাছে। এখানে এসে আরো বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে যায় কুবের এবং গোপন দুঃখে নিজের কাছে হারিয়ে যায়।
ঈশ্বরীতলার রূপোকথা আগে পড়েছিলাম তাই হয়তো কুবেরের বিষয় আশয়কে তিন তারা দিতে হচ্ছে। "একটা স্যাড ঘটনায়—এক্সপিরিয়েন্স বলতে পার" এই বাক্যটি বারবার ফিরে এসেছে এই উপন্যাসে। আমার ক্ষেত্রেও তাই বলতে হয় এই বই পড়ার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে হলে। দৃশ্যের হঠাৎ পরিবর্তন, ধরতেই পারা যায় না কোথায় ছিলাম আর কোথায় বা যাচ্ছি। কাহিনী স্লো। কুবের লোহার ফ্যাক্টরিতে কাজ করতো এবং অনেক কষ্ট করে জমি কিনে নেয়, পরে এইভাবে জমি কিনতে কিনতে অনেক জমির মালিক হয়, নিজের নামে রাস্তা, স্টেডিয়াম বানায়। পরস্ত্রীর সাথে পরকীয়া করে সন্তান সম্ভবা করে ফেললে তাকে মেরে ফেলে আকন্দ গাছের জায়গায় সমাধিস্থ করে দেয়। ওদিকে কুবের নিজেও কিন্তু সুখী নয়, স্কিন ডিজিজে পুরো শরীর কালো দাগ হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে, সে ভাবতো কৈশোরে promiscuous coitus এর consequence. তাছাড়া তার বিরাট ধানক্ষেতে পোকা লেগেছে, সস্ত্রী সাহেবের সাথে পরকীয়ায় মত্ত,সব ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা, পরকীয়া করার সময় সর্বদা নিজ পরিবারের কথা মনে পড়ে। শেষে নিজে গোখরো সাপের ছোবলে মারা যায় ক্ষেত পরিদর্শনকালীন।
অনেককাল আগে শ্যামল গাঙ্গুলির একখানা মহাকাব্যিক উপন্যাস পড়েছিলাম, "শাহাজাদা দারাশুকো"৷তারপর এই দ্বিতীয় মোলাকাত লেখকের সাথে৷গল্পের আখ্যানের জন্য ততটা নয় যতটা ভাষার বুনোটে আশ্চর্য হয়েছি,সেইজন্য পাঁচে পাঁচ দেওয়া গেল৷
প্রথম জীবনে ভুল করে, ভুল করে ফেলায় সেই যে ভালো মানুষের মুখোশ পরে ফেললো কুবের তারপর তার বাকিজীবন কেটে গেল নিজের চেহারা খুঁজে বেড়াতেই। ছোট ছা-পোষা চাকুরে থেকে একটুখানি মাটির আশায়, নিজের ঘরবাড়ির আশায় জমি খুঁজতে গিয়ে কখন যে কুবের হয়ে যায় ‘ড্রিম মার্চেন্ট’-স্বপ্নের ফেরিওয়ালা; সে নিজেও বুঝতে পারেনা। জমির নেশা, বিষয়ের নেশায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থেকেও কুবের নিজের ভেতরে ডুব দিয়ে কূল পায়না, ডুবতেই থাকে, ডুবতেই থাকে……
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা দুটো উপন্যাস পড়েছি এ পর্যন্ত- ঈশ্বরীতলার রূপোকথা ও কুবেরের বিষয় আশয়। দুটোতেই শ্যামলবাবুর নিজের জীবনের প্রভাব প্রচন্ড। কুবের, অনাথবন্ধু, শ্যামল এরা আলাদা কোন স্বত্বা নয়; কুবেরের মধ্যে, অনাথবন্ধুর মধ্যে বারবার নিজেরই চাষাবাদ করেছেন শ্যামলবাবু। তার লেখায় জাদুবাস্তবতা যত সহজে জীবনের সাথে মিশে গিয়ে ভ্রম সৃষ্টি করে তেমন আর কারো লেখায় পাইনি এখনো।জীবনঘনিষ্ঠ হয়েও ‘লার্জার দ্যান লাইফ’, চরম বাস্তবতার মধ্যেও প্রচন্ডরকমের জাদুবাস্তব, প্রচন্ডরকম প্যাট্রিয়ার্কিয়াল হবার পরেও এতটুকু কর্কশ নয়; অনাথবন্ধু বসু বা কুবেরকে একবার চিনে ফেললে আর ঘাড় থেকে নামানো যায় না, তারা কাঁধে সিন্দাবাদের ভুতের মতো সওয়ার হয়ে থাকে সবসময়। সম্ভবত শ্যামলবাবুর বৈচিত্র্যময় জীবনই এমন স্পনটেনিয়াসলি লেখায় জাদুবাস্তবতা নিয়ে আসতে পারে
এই বইয়ে শ্যামলের ভাষা অত্যন্ত চমৎকার। জাদুবাস্তবতা নির্ভর লেখা হওয়ায়, প্রথম দিকে বারবার গল্পের ধারাবাহিকতা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বইয়ের বিষয় হল কুবের সাধুখা একবারে শূন্য থেকে কটিপতি হয়ে যায়। প্রথমে বহু কষ্টে জমি কেনা শেখে। তারপর ধীরে ধীরে সেই রিয়েল স্টেটের মালিক বনে যায়।