দিলুর বোকামামা দুধঘাট উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার। স্কুলের প্যাডে ওনার নাম হরিসাধন ঘোষের পর লেখা আছে এম. এ. বি. টি। তিনটি বিষয়ে ক্লাস নেন—ভূগোল, ইতিহাস ও অঙ্ক। বিশ্ব সম্পর্কে মোটামুটি একটা জ্ঞান তার থাকার কথা এবং তার ধারণা সেটা তার আছে।
পাঁচ বছর বয়সে খুলনা জেলার স্বল্পবাহিরদিয়া গ্রাম থেকে বাবা ও জ্যাঠার এবং লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু পরিবারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছিলেন। বোকামামার বাবা পঞ্চাননের এক বন্ধু থাকতেন বারাসাতে। তিনিই ব্যবস্থা করে দুধঘাটে ফলের বাগান সমেত পাঁচবিঘে জমি, পুকুরসহ ছোট একটা বাড়ি কিনিয়ে দেন পঞ্চাননকে। সেই বাড়িতে পঞ্চানন দাদা দাশরথিকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন উনিশশো আটচল্লিশ সাল থেকে।
পঞ্চাননের একটি ছেলে হরিসাধন, দাশরথির একটি মেয়ে মল্লিকা, ডাকনাম মলু। মলু যখন দশ বছরের তখন বাবাকে হারায় এবং পরের বছর চলে যায় মা । পিতৃ—মাতৃহারা মলুকে নিজের মেয়ের মতো বড় করে তোলেন পঞ্চানন, তাকে বিএ পাশ করিয়ে প্রচুর খরচ করে বিয়েও দেন কোলকাতার এক উঠতি উকিলের সঙ্গে। হরিসাধনের সংসারে দুই মেয়ে এবং দু’জনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। বড়টি থাকে দুর্গাপুরে, ছোট মেয়ে কটকে। হরিসাধনের বাবা পঞ্চানন পঁচাশি বছর বয়সে এখনও বাগানের পরিচর্যা করেন, বাজারে যান, ছেলেকে ধমকান।
হরিসাধন মাঝে মাঝে কোলকাতায় যান। হাতে সময় থাকলে বোন মলুর সঙ্গে দেখা করে আসেন। মৌলালির কাছে মলুর স্বামী তরুণ কর বিরাট একটা পুরনো বাড়ি কিনে সংস্কার করিয়ে বউবাজারে পৈতৃক বাড়ি থেকে ভিন্ন হয়ে এসে বসবাস করছেন। মলুর চার ছেলে, ছোট ছেলে দিলু। কোলকাতায় প্রধান শিক্ষক সমিতির সভায় যোগ দিতে এসে হরিসাধন বোনের বাড়ি এসেছিলেন। মলুর সঙ্গে কথায় কথায় জানতে পারেন দিলু ষান্মাসিক ক্লাস পরীক্ষায় কয়েক সাবজেক্টে কম নম্বর পাওয়ায় স্কুল থেকে গার্জেনকে হুঁশিয়ার করে চিঠি দেওয়া হয়েছে অ্যানুয়াল পরীক্ষায় যদি একটি বিষয়েও ফেল করে তা হলে ক্লাস নাইনে ওকে প্রোমোশন দেওয়া হবে না।
হরিসাধন সব শুনে বললেন, ”কিছু করতে হবে না তোকে। তোর জ্যাঠার হাতে ওকে ছেড়ে দে। বাবা ঠিক ওকে তৈরি করে দেবে।” মল্লিকা দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বললেন, ”এই বয়সে জেঠু ওকে সামলাবেন কী করে?” হরিসাধন হেসে ফেললেন, ”বাবাকে তুই অনেকদিন দেখিসনি তাই বললি। হাঁটুর বাতে ইদানীং একটু কাহিল, তবু বহুদিন তেল কই খান নি বলে গতবছর নিজে হাতে জাল ফেললেন পুকুরে। বাবা পঁচাশি হলে কী হবে পাঁচ বছর আগেও কোদাল দিয়ে বাগানে মাটি কোপাতেন। তুই বাবার কাছে এক বছর ওকে রাখ। আমার স্কুলে ওকে ভর্তি করিয়ে নেবো। পরীক্ষাটা দিয়েই দুধঘাটে চলে আসুক।”
দিলুর অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হওয়ার দশদিন পর হরিসাধন কোলকাতায় আসেন নিজের কাজে। দুপুরে বোনের কাছে এলেন ছোট ভাগ্নের খবর নিতে। ”কী ঠিক করলি?” হরিসাধন প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দিলেন, ”দুটো প্যান্ট আর শার্ট একটা ব্যাগে ভরে দে। ওকে আজ নিয়েই যাব। দিন সাতেক থেকে দেখুক। যদি মন বসে যায় তা হলে আমাদের কাছেই থাকুক। তোর বা তরুণের তাতে আপত্তি আছে?”
মল্লিকা বললেন, ”আপত্তি কী গো! আমরা তো বেঁচে যাই। আগের দিন তুমি যা বললে দিলুর বাবাকে সে সবই বলেছি। উনি তো শুনে আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। বললেন, অতবড় নামী স্কুলে পড়ার এমন সুযোগ, হেডমাস্টার মামা, দিলুর তো মহাভাগ্যি।”
কিন্তু মামাবাড়ি যাবার পথে ট্রেন বাইগাছি স্টেশনে দাঁড়ানো মাত্র দরজার লোকেরা হুড়হুড় করে নামতে শুরু করল। পেছন থেকে ঠেলা খেয়ে দিলু হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে ওঠার সময় কে তার পা মাড়িয়ে দিল। দিলুর ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা থেঁতলে গেছে। ডান পায়ের চটির চামড়ার ফিতেটা ছিঁড়ে পা থেকে খুলে ট্রেনের কামরাতেই রয়ে যাওয়ায় সে ফ্যালফ্যাল চোখে ছেড়ে দেওয়া ট্রেনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
পরে অবশ্য হরিসাধন তাড়াতাড়ি দিলুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে পায়ে ব্যান্ডেজ ওষুধ নিয়ে এক জুতোর দোকানে গিয়ে দিলুর অস্বস্তিবোধ এবং জোরাজুরিতে শেষমেশ কমদামী একটা হাওয়াই চটি কিনে দিলেন। তিরিশ টাকার হাওয়াই চটি পায়ে দিয়ে দিলু মামার সঙ্গে দোকান থেকে বেরিয়ে এল। সামনেই যশোহর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে দিলুকে মামা ছানার জিলিপি খাওয়ালেন।
কথায় বলে "মামার বাড়ি ভারী মজা, কি*ল চ*ড় নাই " মামার বাড়ি গিয়ে দিলুর সাথে যা যা ঘটবে সেটা কোলকাতার মতো ব্যস্ত শহরে দিলু কখনোই আবিষ্কার করতে পারেনি। দিলুর অলৌকিক প্রতিভা হয়তো চাপা পড়ে থাকতো শুধু পুঁথিগত বিদ্যার নিচে। কিন্তু সবাই কী পড়াশোনায় ভালো হয়? এই প্রশ্নের উত্তর আসলে দিলু খুঁজে পাবে এই মামার বাড়িতেই। কীভাবে? পড়ে দেখুন না!
🥨পাঠ প্রতিক্রিয়া:
মতি নন্দীর কিশোর উপন্যাস "অলৌকিক দিলু" শেষ করার পর মনে হলো শুরুতেই একটা কথা আহা সবাই যদি দিলুর মতো হতো! একটা মানুষ পড়াশোনায় ভালো নয় কিন্তু তাই বলে সে অক্ষম নয়, তারমধ্যেও মেধা আছে, প্রতিভা আছে। কিন্তু সেই প্রতিভা আসলে বাবা মায়েরা খুঁজে দেখে না। তাদের কাছে শুধু দরকার পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে বড় হয়ে চাকুরী করা।
কিন্তু পৃথিবীতে সকল পেশার ক্ষেত্রেই কিন্তু যদি মেধা থাকে, প্রতিভা থাকে তাহলে সফল হওয়া সম্ভব। টাকা উপার্জন করা সম্ভব। এবং দিলুর ক্ষেত্রেও ওর বাবা মা ওর প্রতিভা খুঁজে না পেলেও মামার বাড়িতে দাদু, মামা এনারা কিন্তু ফুল সাপোর্ট দিয়েছেন। তাদের উৎসাহে দিলু কিন্তু সাধারণ দিলু থেকে প্রতিভার জোরে অনেকের কাছেই অলৌকিক দিলু হয়ে উঠেছে।
নাহ আমি বলছি না যে শুধু অন্যান্য প্রতিভার দরকার পড়াশোনা দরকার নেই। পড়াশোনা অবশ্যই দরকার। শিক্ষিত হলে তবেই তো আরো জানা যাবে সবকিছু। তবে কেউ কেউ জন্ম থেকে বোধহয় কিছু প্রতিভা নিয়ে জন্মায়। সেগুলোকেও বাবা মায়ের উচিত সমানভাবে সাপোর্ট করা। "অলৌকিক দিলু" আমার কাছে তো ভালো লেগেছে বেশ।
মতি নন্দীর কিশোর উপন্যাসগুলো আমার ভালো লাগে এবং "অলৌকিক দিলু" পড়া শেষ করেও এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়নি। সাবলীল ভাবে গল্প এগিয়েছে এবং পড়তে আড়ষ্টতা কিংবা বিরক্তিবোধ হয়নি। আর মতি নন্দীর কিশোর উপন্যাসগুলো বেশিরভাগ কোনো না কোনো খেলাধুলা বিষয়ক। এই বইয়ে কোন খেলার উল্লেখ আছে বলছি না তবে খেলায় দিলুর যা পজিশন সেটা কিন্তু আসলেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
বেশ মোটিভেশনাল ফিল দিলো। সব বইয়েই আসলে কিছু না কিছু শেখার আছে। একজন দিলু থেকে অলৌকিক দিলু হয়ে ওঠার গল্প আশা করছি আপনাদের ভালো লাগবে।
🥨বইয়ের নাম: "অলৌকিক দিলু"
🥨লেখক: মতি নন্দী