রকিব হাসান বাংলাদেশের একজন গোয়েন্দা কাহিনী লেখক। তিনি সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তিন গোয়েন্দা নামক গোয়েন্দা কাহিনীর স্রষ্টা। তিনি মূলত মূল নামে লেখালেখি করলেও জাফর চৌধুরী ছদ্মনামেও সেবা প্রকাশনীর রোমহর্ষক সিরিজ লিখে থাকেন। থ্রিলার এবং গোয়েন্দা গল্প লেখার পূর্বে তিনি অন্যান্য কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি রহস্যপত্রিকার একজন সহকারী সম্পাদক ছিলেন।রকিব হাসান শুধুমাত্র তিন গোয়েন্দারই ১৬০টি বই লিখেছেন। এছাড়া কমপক্ষে ৩০টি বই অনুবাদ করেছেন। তিনি টারজান সিরিজ এবং পুরো আরব্য রজনী অনুবাদ করেছেন। তাঁর প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ ড্রাকুলা। রকিব হাসান লিখেছেন নাটকও। তিনি "হিমঘরে হানিমুন" নামে একটি নাটক রচনা করেন, যা টিভিতে সম্প্রচারিত হয়।
আমার পড়া প্রথম তিন গোয়েন্দার বই। সম্ভবত ক্লাস টু বা থ্রি'তে ছিলাম। স্লো রিডার। তাই দীর্ঘদিন ধরে পড়তে হয়েছে। সপ্তাখানেক তো হবেই। আর বলতে গেলে এটা দিয়েই ছোটবেলার নাছোড়বান্দা পড়া শুরু হয় আমার।
এইতো মনে হয় সেই দিনের কথা। নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ নিতাম প্রতিবার পড়া শুরুর সময়, মাঝে ও শেষে। পুরোটাই করতে হতো লুকিয়ে। অতিরিক্ত কমিক্স পড়তাম আগে। তাই পাঠ্যবইয়ের বাইরের সব বইয়ের প্রতি ছিলো বাসার কঠোর নিষেধাজ্ঞা!
তিন গোয়েন্দা সাথে জিনা ও তার কুকুর রাফিয়ান ছুটি কাটাতে যাবে ব্রাজিলে। কিন্তু প্লেনে উঠে বাধালো বিপত্তি, প্লেন পড়লো হাইজ্যাকারদের খপ্পরে। এতেই বিপত্তির শেষ নয়, মরার ওপর খাড়ার ঘাঁ হয়ে প্লেন ক্র্যাশ করলো গভীর জঙ্গলে। কিছুদিন প্লেনেই তারা আস্তানা গাড়লেও জঙ্গলে একে তো খাবারের অভাব তার ওপর হিংস্র জীবজন্তুর ভয় তো আছেই। তাই বাধ্য হয়ে বাইরে বেরোনোর পথ খুঁজতে লাগলো। এবারে আরও এক দফা বিপদের সম্মুখীন হলো তারা, ধরা পড়লো আদিবাসী জীবারোদের ফাঁদে। এবার? তিন গোয়েন্দা কি পারবে এই বিপদের ফাঁদ কেঁটে বের হতে?
এটা আমার পড়া তিন গোয়েন্দার প্রথম বই। ঠিক পড়া বলা যাবে না, অডিওবুক শুনেছি। কাহিনী মোটামুটি ভালোই লেগেছে, উপভোগ করেছি।
তিন গোয়েন্দা কোথাও যাচ্ছে আর কোনো গণ্ডগোল হবে না, এমন তো হতেই পারে না। সাথে আবার আছে জিনা ও রাফিয়ান। তাহলে অবশ্যই অ্যাডভেঞ্চারের ষোলো কলা পূর্ণ হবে।
এবার তারা ঘুরতে গিয়েছিল ব্রাজিল। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে নামার কথা ছিল তাদের নিয়ে উড়ে যাওয়া বিমানের। তাদের সাথে ছিল আরও কিছু বাচ্চাকাচ্চা। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই যারা বুঝতে পারে, এই প্লেন গন্তব্যে পৌঁছলেও বিষয়টা স্বাভাবিক নয়। কারণ তিনজন মিলে পুরো প্লেনকে হাইজ্যাক করে ফেলেছে।
তাদের দাবি বিশেষ কিছু না। এই প্লেনটা তাদের দরকার বিশেষ কাজে। কারো কোনো ক্ষতি করা হবে না। নিরাপদে সবাইকে নামিয়ে দিয়ে প্লেনটা নিয়ে তারা আমাজন জঙ্গলের উপর উড়ে যাবে। তবে….
এই ‘তবে’ শব্দতেই জুড়ে গিয়েছে তিন গোয়েন্দা। যারা প্লেন ছিনতাই করে, তাদের ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। পুলিশ তক্কে তক্কে আছে। তাই তাদের একজন জিম্মি দরকার। আর হাইজ্যাকারদের নজর পড়ে জিনার উপর। আর জিনাকে তিন গোয়েন্দা একা ছাড়বে কেন? তারাও লুকিয়ে জিনার সঙ্গী হয়ে ওঠে। আর আছে রাফিয়ান।
তবে বাঁধ সাধে অন্য জায়গায়। অনভিজ্ঞ, কোনো মতে প্লেন চালানো ছিনতাইকারীদের একজন প্লেনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আমাজন জঙ্গলের এই দুর্গম অঞ্চলে একবার হারিয়ে গেলে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। একদিকে মৃত্যু ধেয়ে আসছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা। সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি প্রতিকূলে। যতই শক্ত মানসিকতার হোক না কেন, আদতে কিশোর বয়সীদের এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সক্ষমতা আছে?
সামনে কী হবে কেউ জানে না। আমাজন মতন গহীন জঙ্গলের প্রতিটি পদে পদে বিপদ ওঁৎ পেতে থাকে। আর এই বিপদে পড়া তিন গোয়েন্দাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্নটা হলো, বিপদ থেকে পরিত্রাণের উপা��়টা কী হবে?
“তিন গোয়েন্দা” সিরিজ নিয়ে বিশেষ কিছু বলাটা অনুচিত। শৈশবের আবেগের সাথে জড়িয়ে আছে তিন গোয়েন্দা। রকিব হাসানের হাত ধরে শুরুর দিকের প্রতিটি গল্প যেভাবে পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছিল, আস্থা অর্জন করেছিল; এই বিষয়টা বিশেষ কিছু ছিল। “ছিনতাই” গল্পটাও সেই ধারাবাহিকতায় বিশেষ এক নিবেদন রেখে গিয়েছে।
তিন গোয়েন্দা কোথাও গেলে বিপদ তাদের পিছুপিছু আসবে স্বাভাবিক। এই বইটিকে আরও বেশি প্রাণবন্ত করেছে জিনার উপস্থিতি। জিনার রগচটা ভাব, বন্ধুদের সাথে ঝগড়া করা; বইয়ের শোভা বর্ধনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এই বইতেও জিনা তার চিরাচরিত স্বভাব বজায় রেখেছিল। সেই সাথে তার বাইরের কঠিন আবরণের বাইরে যে কোমল একটা মন আছে, সেটা প্রতিনিয়ত সে প্রমাণ করে চলে।
এই সভ্য জগৎ প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে। বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত নিজেদের আবিষ্কারে বিস্ময়ের জন্য দিচ্ছে। ঠিক একই সময় মুদ্রার ওপর পিঠে সভ্য জগতের বাইরে এমন কিছু জগৎ থাকে, যেখানে সভ্যতার আলো পৌঁছায়নি। আমজনের মতো বিশাল জঙ্গলের অভ্যন্তরে এমন অসংখ্য জাতির বাস। তাদের জংলী বলা হয়। তাদের নিয়ে অসংখ্য গালগপ্পো প্রচলিত আছে। তারা সভ্য জগতের বাসিন্দাদের ধরে নিয়ে যায়। বলি দিতে দ্বিধা করে না। মানুষের মুন্ডু দিয়ে ট্রফি বানায়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
তার কতটা সত্য আর কতটা মিথ, সেটা কাছে না গেলে বোঝা যায় না। প্রবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন সেসব জাতি সেই আলোর দেখা পায়নি, যে আলোতে নিজেদের আলোকিত করা যায়। কেননা আমাজনের গহীন অরণ্যে ঠিকঠাক সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না, সেখানে একটি জাতিকে আলোকিত করা যায় কি করে?
তাদেরকে যতটা হিংস্র বলে প্রচার করা হয়, তারা তেমনটা নয়। বরং সহজ-সরল হিসেবেই তারা জীবনযাপন করে। তাদেরকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কাজ হাসিল করা সহজ। দেবতাদের গল্প বলে তাদেরকে ম্যানুপুলেট করা যায় ভীষণভাবে। ব্যতিক্রম কিছু দেখলেই ওরা ঈশ্বর প্রদত্ত মনে করে। তা তাদের সহজ-সরল জীবনযাপনেরই বহিঃপ্রকাশ। তবে একবার রেগে গেলে, কিংবা তাদের শত্রু মনে করলে তাদের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন। তাই তিন হাইজ্যাকার সম্ভবত বলি দিয়েই নিজেদের বিসর্জন দেবে।
তিন গোয়েন্দার প্রতিটি গল্পের মতো এখানেও কিশোরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিশোরের বুদ্ধিমত্তা বেশ উপভোগ্য ছিল। এত এত বছর আগের ধাঁধা, যে ধাঁধা কেউ মেলাতে পারেনি; কিশোর এক ভ্রমণেই তার সমাধান করে ফেলেছে, বিষয়টা অতিরঞ্জিত লাগতেই পারে। অবশ্যই কিশোরের মতো করে কেউ ভাবেনি বলেই হয়তো বছরের পর বছর ধাঁধার সমাধান অমীমাংসিত থেকে গিয়েছে।
বইটিতে কিশোরের ভূমিকা যতটা আছে, রবিন আর মুসার ভূমিকে তেমন ছিল না। রবিনের উষ্টা খেয়ে ব্যথা পাওয়া ছাড়া তেমন ভূমিকা লেখক দেননি। বইয়ের পোকা রবিন জ্ঞানের দিক দিয়েও এখানে একটু পিছিয়ে। যেখানে বন্য প্রাণীদের সম্পর্কে মুসার জ্ঞানকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া মুসাও ঠিক মুসাসুলভ ছিল না বইটিতে।
মুসার ‘খাইছে’ বলাটা এখানে মিস করেছি। শুরুতে একবার বোধহয় ছিল। এরপর এত ঘটনায় মুসার বিখ্যাত উক্তির দেখা পাওয়া গেল না। তাছাড়া অমাজনের মতন ঘন জঙ্গল, রাতেও তাদের ভ্রমণ থেমে নেই, নিস্তব্ধ এক মন্দির আছে এখানে, দেখলে কত প্রাচীন মনে হয়; এত কিছুতে মুসার ভয় পেয়ে কেঁপে ওঠার কথা। কিন্তু মুসার এই দিকটা এখানে অনুপস্থিত ছিল। মুসাকে আমরা যেভাবে চিনি, ঠিক সেভাবে উপস্থাপন করা যায়নি।
বইটিতে বলা বিশেষ এক অধিবাসীদের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সেটা ভালো লেগেছে। তাদের বৈশিষ্ট্য কিংবা জীবনযাপন যতটুকু উপস্থাপন করা হয়েছে, কিশোর উপন্যাসের জন্য যথাযথ। আমাজন জঙ্গলের কঠিন পরিস্থিতি, প্রতি মু���ূর্তে বিপদের আশঙ্কা, অ্যানাকোন্ডা-জাগুয়ারদের বেশ ভালোভাবেই স্থান দেওয়া হয়েছে। শিউরে উঠতে হয়।
শেষটা বেশ দারুণ। শেষের জন্য বইটাকে পুরোপুরি লেটারমার্ক দেওয়া যায়। কিশোরের বুদ্ধিমত্তা ও মানবিকতার এক অনন্য নিদর্শন হয়ে থাকল বইটি। শেষের রি-ইউনিয়ন, সবার সাথে দেখা হওয়ার চিত্রটি আবেগের পূর্ণরূপ বলা যেতে পারে। এক কথায় দারুণ
পরিশেষে, মাঝে মাঝেই তিন গোয়েন্দার সাথে যেকোনো অ্যাডভেঞ্চারে হারিয়ে যেতে কোনো কারণ লাগে না। বয়স তো কেবলই এক সংখ্যা, সেখানে কিশোর হয়ে যেতে বাঁধা কোথায়? আর গল্পে যদি জিনা ও রাফিয়ান থাকে, তাহলে তো কথাই নেই।
তিন গোয়েন্দার এই গল্পটা খুব বেশি ভালো লাগলো। অনেক সুন্দর।
মূসা, রবিন ও গোয়েন্দাপ্রধান কিশোর এবং তাদের সাথে তাদের বন্ধু জিনা ও জিনার কুকুর রাফিয়ান। সবাই মিলে ছুটি কাটাতে যাচ্ছিলো ব্রাজিলে। কিন্তু তাদের প্লেন ছিনতাই হয়ে গেলো। যে তিনজন লোক প্লেন ছিনতাই করলো, তারা জিনা কে জিম্মি রেখে দিলো যাতে করে পুলিশ তাদের ধরতে না পারে। এবং প্লেন ল্যান্ড করে অন্য যাত্রীদের কে যেতে দিলো। যেতে দিলো কিশোর, মূসা ও রবিনকেও। কিন্তু ওরা তো ওদের বন্ধুকে ছেড়ে যাবে না। তাছাড়া প্লেনে রাফিয়ান ও রয়েছে। তাই বুদ্ধি করে তিন গোয়েন্দা প্লেনের সিটের নিচে লুকিয়ে পড়লো৷ ছিনতাইকারীরা যখন প্লেন নিয়ে তাদের গন্ত্যবে যাত্রা শুরু করলো, তখনই তারা প্লেনে কিশোর, মূসা, আর রবিনকে আবিষ্কার করলো। আরো দেখলো রাফিয়ান। তারা জানতো না যে রাফিয়ান ওদের কুকুর। আর তিন গোয়েন্দাকে এভাবে প্লেনে থেকে যেতে দেখেও বেশ অবাক হলো। কিন্তু কথা বাড়ালো না। একজন জিম্মির জায়গায় এখন পাঁচজন হয়ে গেলো। এতে একটু ঝামেলা বাড়লেও সুবিধেও তো ছিলো। কিন্তু ঝামেলা বাধলো তখন, যখন ওদের পাইলট সুবিধেমত প্লেন চালাতে পারছিলো না এবং অবশেষে প্লেন একটা গভীর জঙ্গলে দূর্ঘটনার কবলে পড়লো। ভাগ্যের জোড়ে বেঁচে গেলো সবাই। কিন্তু এসে পড়লো এক গভীর জঙ্গলে যেখানে নাই কোনো সভ্যতার হদিস। এখন কি করে ওরা সবাই বের হবে এখান থেকে? এইতো, এভাবেই গল্প এগোতে শুরু করলো।
ব্রাজিল। কঠিন এ্যাডভেঞ্চারের শিশুতোষ ঘটনা প্রবাহ। বইটি বর্ণবাদী ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী উপকরণে ভরপুর। যদিও আআদের চরিত্ররা বহুবর্ণের কিন্তু মূল কাহিনীতে তারা সবাই শ্বেতাঙ্গ ছিল, তাদের আধিপত্যবাদী মানসিকতা এখানে পরিবাহিত হয়েছে অনিচ্ছাকৃতভাবে।