ঘটনার স্রোতে ভেসে যাওয়া? দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা আর নিশ্চয়তার মুহূর্ত? তারুণ্যের অনুসন্ধিৎসা ভুলে কর্মজীবনের পথে এগিয়ে যাওয়া? শিক্ষা, বিবাহ, সন্তান, দাম্পত্য পালন ও অবসরের ছন্দবদ্ধ সমীকরণ? না সাংসারিক আসক্তিতে আবদ্ধ হয়ে প্রতিনিয়ত ভবিতব্যের জন্যে অপেক্ষা করা?
চিরাচরিত বিশ্বাসের গণ্ডির ঊর্ধ্বে করা জীবনযাপনকে সমাজ চিরকালই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে এসেছে। সোশ্যাল কন্ডিশানিং আমাদের পায়ে শিকল বেঁধে রেখেছে বরাবর। চব্বিশে চাকরি না পেলে প্রতিবেশীর ভুরু কুঁচকে যায়, তিরিশে বিয়ে না হলে বেপাড়ার কাকু-জেঠুরাও আওয়াজ দেয়। সাফল্যের অর্থ কেবলই অর্থোপার্জন এবং ফ্ল্যাট-বাড়ি-গাড়ি কিনে থিতু হওয়া! নিরাপত্তাহীন জীবন! চোখ ফুটতে না ফুটতেই সন্তানকে শাসন করার অছিলায় বুঝিয়ে দেওয়া, সুখী জীবন হবে রিস্ক ফ্রি। কোনও ঝুঁকি থাকবে না, থাকবে না কোনও বিপদ। বয়সের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু দায়িত্বও নির্ধারিত করা আছে, বেপথে গিয়েছ কি মরেছ! মুহূর্তের মধ্যে আপনি বাঘা বাঘা বিশেষণে ভূষিত হবেন। দায়িত্বজ্ঞানহীন, বাউন্ডুলে, ইমম্যাচিয়োর, উরণচণ্ডী, নষ্ট, কুলাঙ্গার কিংবা পাগল। ‘দ্য রোড লেস ট্রাভেলড’ কথাটা বাস্তব জীবনে পরীক্ষা করতে হলে যাত্রা শুরুর আগেই বাধা আসতে শুরু করে। একসময় আমরা হাল ছেড়ে দিই, অজানার আকর্ষণ হারিয়ে যায়, বিপদকে ভয় পেতে শুরু করি। প্রাণপণে আঁকড়ে ধরি কমফর্ট জোনের বাঁধাধরা জীবনযাত্রাকে। স্বপ্ন থাকে স্বপ্নের জায়গায়, আমরা থাকি আমার মতো। ইঁদুর দৌড়ের এই জাঁতাকল থেকে আমাদের নিস্তার নেই।
কিন্তু তা সত্ত্বেও যুগে যুগে এমন কিছু ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে, যারা নিয়ম ভেঙেছে। পরিচিত জীবনের পূর্বসংস্কারকে দুমড়ে মুচড়ে এগিয়ে গিয়েছে অজানার পথে। স্বেচ্ছায় আলিঙ্গনবদ্ধ হয়েছে বিপদের সঙ্গে, অনিশ্চিয়তার সঙ্গে। প্রেম, দাম্পত্য, ধর্ম, অর্থ, পরিচিতি অথবা নিরাপত্তার গন্ডি তাঁদের অবরুদ্ধ করতে পারেনি। মৃত্যুর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করতে তাদের বুক কাঁপেনি। তারা প্রমাণ করেছে, বেঁচে থাকার অর্থ শুধু যাপন নয়! কয়েকজন মানুষ, যারা গতানুগতিক জীবনের বেড়াজালকে ছিঁড়ে খোলা আকাশের নীচে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। প্রকৃতির প্রসারতাকে অনুভব করতে এগিয়ে গিয়েছে বিপদের তোয়াক্কা না করে। চলিত ভাষায় এই অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমিক পরিচয় দেওয়া হয় ‘এক্সট্রিম অ্যাথেলিট’ নাম। এক্সট্রিম অ্যাথেলিটদের বিচরণের স্থান আকাশের উচ্চতা থেকে জলের গভীরতা পর্যন্ত। তাঁরা কখনও হিমালয়ের উচ্চতায় অভিযান করে, কখনও ঝাঁপিয়ে পড়ে উত্তাল সমুদ্রে। ভূগর্ভস্থ নদীর গোলকধাঁধা অথবা দুর্গম মেরুপ্রদেশ, খাড়াই পাথরের শিলা কিংবা সক্রিয় আগ্নেয়গিরির তপ্ত আবহাওয়া, প্রকৃতির সঙ্গে এই বোঝাপড়া অবিরত থেকেছে। এক্সট্রিম অ্যাথেলিট, অভিযাত্রী আর ভূপর্যটকদের জীবন দর্শনের মধ্যে একটা সাদৃশ্য অবশ্য আছে। এরা কেউই চেনা পথে হাঁটেননি, বরং সমাজবহির্ভূত হয়ে নিজেদের জীবনের পথ তৈরি করেছেন আস্তে আস্তে। এরা সকলেই সেই অর্থে ‘ট্রেলব্লেজার্স’।