ভারতের পশ্চিমঘাটের পাহাড়ে জঙ্গলে জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছেন আলোকময় দত্ত। মূল পেশা ছিলো জীবজন্তু ধরে খাঁচায় ভরে ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন নামীদামী চিড়িয়াখানায় চালান দেয়া। সেই সূত্রে ঘুরেছেন জঙ্গলে জঙ্গলে, চিনেছেন নানা প্রাণী, উদ্ভিদ, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন তাদের বৈশিষ্ট্য, শিখেছেন গভীর বনে আহার সংগ্রহ ও বসবাসের নানা উপায়। জোসেফ, হীরাধর, মুরমু, নাগাপ্পা, হুরমু, পাঁড়েজীসহ একঝাঁক অভিজ্ঞ সঙ্গী নিয়ে সুপা ও কুটিঙ্গায় তাঁর বৈচিত্র্যময় জঙ্গল জীবনের আখ্যান এই বই।
সেই দুপুর থেকে আমার হাত শক্ত করে ধরেছিলো নাগা। আবিষ্কার করলাম ওর হাত আলগা হয়ে গেছে আমার হাত থেকে। আকাশে অসংখ্য তারা। নাগাপ্পা দূর কোনো নক্ষত্রলোকে যাত্রা করেছে, আমাদের পরিচিত পাহাড় জঙ্গল ছেড়ে।"
বইয়ের শেষদিকে এসে বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে এলো। শুরুটা যাদের দিয়ে হয়েছিলো, শেষে এসে তাদের একের পর এক হারিয়ে যাওয়া মনকে ভারাক্রান্ত করে দেয়। হীরাধর, জোসেফ, নাগাপ্পা - প্রতিটা মৃত্যুই মনের গহীনে ধাক্কা মারে।
আলোকময় দত্ত জীবনের বড় একটা সময় কাটিয়েছেন ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত পশ্চিমঘাট পার্বত্য অঞ্চলে। আবাস ছিলো কুটিঙ্গায়। নিবিড় বনভূমিতে বিচরণকারী বিভিন্ন মাংসশাসী ও তৃণভোজী প্রাণী ইউরোপ আমেরিকার বড় বড় চিড়িয়াখানায় চালান দেয়াই ছিলো তাঁর ব্যবসা। বাবার প্লাইউডের কারখানা ছিলো সুপায়। পশু ধরা ও পালনে সঙ্গী ছিলো বলিষ্ঠ শিকারী জোসেফ, হাতিপ্রেমিক হীরাধর, নাগাপ্পা, মুরমু, পাঁড়েজী, হুরমু টুকুম ও আরো অনেকে।
'পশ্চিমঘাটের পাহাড়ে জঙ্গলে' বইটি তাঁর সেসকল অভিজ্ঞতার আলোকেই লেখা।
এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতাই দুর্দান্ত এতে সন্দেহ নেই। তৎকালীন পশ্চিমঘাটের গহীন অরণ্যের প্রকৃত রূপই যেনো ফুটে উঠে। ঘনকালো বন, আকাশ ভাঙা বৃষ্টি, স্যাঁতস্যাঁতে জঙ্গল, শঙ্খচূড়ের আনাগোনা, বিশালাকায় নরখাদক বাঘের উপস্থিতি, অযুতে নিযুতে হরিণের পাল, গা ছমছমে সব অভিজ্ঞতা - কি নেই! হাতি সম্বর গওর ভালুক চিতল চিতাবাঘ ময়াল হায়না শেয়াল কিছুই বাদ নেই।
বইটি শুরু হয় সুপা গ্রামের এক নরখাদক বাঘের কাহিনী দিয়ে। এই লেখাতেই প্রথম আবির্ভাব ঘটে আদিবাসী হুরমু টুকুমের। সাপ ধরতে ওস্তাদ সে। তাও যে সে সাপ নয়, রাজসাপ শঙ্খচূড়! কিন্তু শেষে এসে দেখা যায় আরো এক কাজেও দক্ষ টুকুম। বর্শা দিয়ে বাঘ বেঁধা!
'রামানদূর্গ এর বাঘ' আমার পড়া অন্যতম লোমহর্ষক কাহিনীগুলোর একটি হয়ে থাকবে। চিড়িয়াখানার ফরমাশ মতো একটা কালো চিতাবাঘ ধরার জন্য শিমিলী কোটরা নামের এক দুর্গম গ্রামে রওনা দেন লেখক ও সঙ্গী হীরাধর। গিয়েই অভিজ্ঞতা লাভ করে রামানদূর্গের ভয়ংকর নরখাদক বাঘের। পুরো কাহিনী জুড়ে ছোট ছোট অনেক গা ছমছমে ও নতুন নতুন অভিজ্ঞতা আছে। যেমন গরুর গাড়িতে বসে সামনাসামনি বাঘের মোকাবেলা। রাতে গোয়ালে শুয়ে দরজায় উঁকি দেয়া বাঘের মুখ বরাবর কড়াইভর্তি রান্না ছুঁড়ে মারা! আদিবাসীদের দড়ির ফাঁদ দিয়ে বাঘ চিতাবাঘ ধরা। প্রকৃতির দয়ায় হরিণশিশুর গন্ধহীন শরীর। রাতের জঙ্গলে ভরা বর্ষণের মাঝে প্রকান্ড শঙ্খচূড় দর্শন। পাহাড়ের চাতালে রাতে পাহারায় বসে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে বাঘের উপস্থিতি অনুভব। ঘুমন্ত হনুমানের গায়ে জামা পড়িয়ে হনুমান তাড়ানো। এবং সর্বশেষ গোয়ালার ভেক ধরে বুদ্ধি খাটিয়ে নরখাদক নিধন!
'বৃহস্পতিবারের বার বেলা' র মূল নায়ক জোসেফ। পশ্চিমঘাটের পার্বত্য বনাঞ্চল যে কতটা দূর্গম ও উঁচুনিচু লেখাটা পড়লেই বুঝা যায়। বৃহস্পতিবার মাতাজীর নিষেধ না শুনে কুক্ষণে বেরিয়ে ঝামেলায় পড়ে জোসেফ। পথিমধ্যে বাঘের মুখ থেকে ছুটে যাওয়া টুরুলু নামের এক আদিবাসী নারীকে উদ্ধার করে। সেখান থেকে কাহিনীর সূত্রপাত। জোসেফ ও সহচর বেণ্ডার আপ্রাণ চেষ্টায় টুরুলুকে বাঁচানো যায়। কাহিনীতে টুইস্ট আসে যখন জানা যায় বাঘটি স্বাভাবিক কোনো বাঘ নয় বরং কোনো এক চোরাশিকারীর গুলিতে তার মুখমন্ডল ভয়াবহ বিকৃত। ফলে প্রায়শই বাঁদুড় আর সুযোগ পেলে মানুষ ধরা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই।
কাহিনীর শেষটা হয় বাঘের নিখোঁজ হওয়ার মধ্য দিয়ে। মানুষের কৃতকর্মের ফসল এই হতভাগ্য বাঘের আর কোনো খুনখারাপির খবর না আসায় তাকে মৃত ধরে নিয়ে ইতি টানেন লেখক।
লেখক আলোকময় দত্তের অন্যতম সহচর হীরাধরের মর্মান্তিক পরিণতি নিয়ে লেখা 'হীরাধর হাতি ভালোবাসতো'। পুরো লেখাজুড়ে হাতি। বিশেষ করে হাতিরা মানুষকে না জানিয়ে নিজেদের মাঝে যোগাযোগ করার জন্য যে শব্দেতর তরঙ্গ সৃষ্টি করে তার পুরো ব্যাখা দিয়েছেন লেখক। এছাড়া হাতির চলতে চলতে শুঁড় আঁছড়িয়ে পথ পরীক্ষা করা, মৃতের কঙ্কালকে জলে ভাসিয়ে দেয়া, রোগ হাতির বৈশিষ্ট্য এসব নিয়েই ভালো ইনসাইট দিয়েছেন তিনি। কাহিনীর শেষে হাতিপ্রেমী হীরাধরের মৃত্যু কিছুটা এক্সপেক্টেড হলেও বেদনাদায়ক ছিলো।
বইয়ের শেষ কাহিনী 'নাগাপ্পা'। যার কিছুটা শুরুতেই বলেছি। এই কাহিনীর নায়ক নাগাপ্পা। শেষটাও তাকে দিয়েই। জোসেফের অপঘাতে মৃত্যুর কথাও আছে কাহিনীর শুরুতে। সুপায় কাজকর্ম গুটিয়ে চলে গেছেন লেখকের মা বাবা। লেখকেরও উঠি উঠি মন৷ এতদিনের পরিচিত জঙ্গলও যেনো হঠাৎ করেই শত্রু হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে এই লেখাটা যেনো পুরো পশ্চিমঘাট আখ্যানের এক করুণ সমাপ্তি।
এবারও কাহিনীর ভিলেন এক নরখাদক। তবে এটি চিতাবাঘ। মহিলা চিতাবাঘ। শিকার করা নরদেহ খেতে এসে লেখকের গুলিতে আহত হয় সে। আর তার ক্ষোভ ঝাড়ে অসতর্ক নাগাপ্পার ওপর। শেষদিকে এসে চিতাবাঘ শিকারের রোমাঞ্চের চাইতেও বড় হয়ে উঠে নাগাপ্পার চিরতরে চলে যাওয়ার বেদনা।
সেই সাথে ইতি ঘটে পশ্চিমঘাটে আলোকময় দত্তের রোমাঞ্চকর জীবনের।
আর বেশি দীর্ঘ না করি রিভিউ। তবে শেষে আরেকটা কথা না বললেই নয়। বইয়ের পাতায় পাতায় লেখক যেভাবে রান্নাবান্নার বিবরণ দিয়েছেন তা পড়লে খিদা লাগতে বাধ্য। যেমন ৯০ নং পৃষ্ঠায় -
"...আমি আর জোসেফ প্রাতঃরাশ খেতে বসলাম। সেগুনের বড় পাতায় পরিবেশন করছে জোসেফ। গরম ফ্যানভাত, আলু আর বনমুরগির ডিম সেদ্ধ। আর ভয়শাঁ ঘি। এছাড়া রাত্রির বাসি কষা মাংস আর সদ্য ডুমো ডুমো করে কাটা, নুন হলুদ শুকনো লঙ্কা আর আদার কুচি দিয়ে, পাতার পুঁটলিতে পোড়ানো হরিণের রাং। এরপর আধ মগ ঠান্ডা ঝর্নার জল।"
খুব বেশি আহামরি বিশেষণ নেই। কিন্তু পড়লে চোখের সামনে যেনো ভেসে ওঠে সবকিছু। এতেই লেখকের কারিশমা।
ব্যক্তিগত রেটিং ৫/৫। চিরায়ত সুন্দরবন, আসামের জঙ্গল কিংবা আফ্রিকার বনভূমি, সাভানার বাইরে ভিন্ন স্বাদ দিবে পশ্চিমঘাটের বৃষ্টিস্নাত অরণ্য৷ সেই সাথে গা ছমছমে অভিজ্ঞতাগুলো তো আছেই।
শেষটায় চোখে জল চলে এলনা। বুকের ভিতরটা কি রকম যেন খাঁ খাঁ করছে। ভাবতে পারছিনা রঘু,জোসেফ,নাগাপ্পা,হুরমু এদের কথা আর পড়তে পারবনা। তবে পাতায় পাতায় ফিরে আসায় অপেক্ষায় রইলাম। এই জীবন কাহিনী সহজে ভোলার নয়।