মাওলানা মওদূদীর বিপুল রাজনৈতিক সাহিত্য আমাদের সামনে উপস্থিত আছে। তাঁকে বোঝার জন্য তাঁর প্রতিটি রচনা গভীর অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার সাক্ষ্য হয়ে আছে। কিন্তু প্রশংসা ও নিন্দার বাইনারির বাইরে দাঁড়িয়ে সেসব নিয়ে নির্মোহ রাজনৈতিক পর্যালোচনা বাংলাদেশে বিরল। এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সাহিত্য ও মূলধারার বুদ্ধিজীবিতার এক দুর্বল দিক। অনেকে তাঁকে আলোচনা করেছেন গভীর ভক্তি ও সম্মতির সঙ্গে। অপর একদলের মূল্যায়নে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক কাজসমূহ অনুসন্ধানী মনোযোগ পায়নি। এর কোনোটাই মওদূদীর প্রতি আগ্রহী পাঠককে গঠনমূলকভাবে সাহায্য করে না। বিশেষ করে যে পাঠক ইসলামের দার্শনিক প্রতিশ্রুতির জায়গা থেকে মওদূদীর রাষ্ট্র ধারণার ব্যবহারিক সম্ভাবনা ও সংকটগুলো বুঝতে আগ্রহী। মওদূদীর এরকম পর্যালোচনা দরকার ব্যবহারিক রাজনীতির প্রয়োজনেও। বর্তমান লেখা মূলত সেই তাগিদ থেকেই। ন্যায়ভিত্তিক একটা সমাজ গঠনে ইসলামের অফুরান সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের পটভূমিতে ইসলামের রাজনৈতিক পাঠ সেই বিবেচনায় জরুরি।
আলতাফ পারভেজের জন্ম ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬। দর্শনশাস্ত্রে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন শেষ করেন। ছাত্রত্ব ও ছাত্র রাজনীতির পর সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু। পরে গবেষণা ও শিক্ষকতায় সংশ্লিষ্টতা। প্রকাশিত গ্রন্থ ছয়টি। যার মধ্যে আছে—‘কারাজীবন, কারাব্যবস্থা, কারা বিদ্রোহ : অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা’, ‘অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্নের তাহের ও জাসদ রাজনীতি’, ‘বাংলাদেশের নারীর ভূ-সম্পদের লড়াই’, 'মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ইতিহাসের পুনর্পাঠ'।
বেআইনি ঘোষিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা ও তাত্ত্বিক রাহবার মাওলানা মওদূদী। তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা আন্দোলনে শরিক হননি ; বরং করেছেন জোরালো বিরোধিতা। কারণ মাওলানা মওদূদীর চোখে পাকিস্তান আন্দোলন ছিল একটি 'আ্যন্টি-ইসলামিক' আন্দোলন। জাতীয়তাবাদকে তিনি আমৃত্যু এক ধরনের ঘেন্না ও অবহেলামাখা দৃষ্টিতে দেখেছেন। এখানেই রণেভঙ্গ দেননি মওদূদী। পাকিস্তানের কারিগর মুহাম্মদ আলী জিন্নাকে তিনি 'ফিরিঙ্গি' বলে ব্যঙ্গ করেছেন বলেও জানা যায়। উপরন্তু, জিন্নার মতো ইসলাম সম্পর্কে বেওয়াকিফ ইনসান কীভাবে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হতে পারে তা মওদূদী কস্মিনকালেও বুঝে উঠতে পারেননি। পাকিস্তান ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কারণে সৃষ্ট হলেও সেই জাতীয়তাবাদের ভিত্তি কেমন হবে, সেই রূপরেখা জিন্নার পহেলা গণপরিষদ ভাষণে মেলে। মওদূদীর চিন্তারাজ্যের ধর্ম ও গণতন্ত্রের মিশেলে রাষ্ট্রের কথা জিন্না বলেননি। তার বক্তৃতায় পশ্চিমাধাঁচের গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কথা জানা যায়। যা মওদূদীকে খুশি করেননি। অর্থাৎ , তিনি ঠিক জানতেন জিন্না পশ্চিমাদের নীতি অনুসরণ করবে। ধর্মরাজ্য সে গড়বে না। তাই সচেতনভাবেই মওদূদীকে আগে থেকেই পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতাকারীদের তালিকায় সামিল হয়ে দেখা যায়। যদিও তার চিন্তার সঙ্গে তখনকার বিশিষ্ট ধর্মগুরু ও রাজনীতিক মাওলানা হোসেইন আহমেদ মাদানির দর্শনে ও বিরোধিতার কারণে ছিল আসমান-জমিন ফারাক।
১৯৪১ সালে জামায়াত প্রতিষ্ঠাকারী মওদূদী পাকিস্তানের জন্মের বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও দেশভাগের সময় পাকিস্তানের লাহোরে ছিলেন। মানে এই দাঁড়াল, দিনশেষে পাকিস্তানেই তাকে আশ্রয় নিতে হয়। প্রথমে বিরোধিতা ও পরে সমর্থন - এই নীতি আজীবন মওদূদীকে অনুসরণ করেছেন। অনেক কিছুর তীব্র সমালোচনা করেছেন অথচ তার লেখায় সেগুলোর পক্ষেই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে দেখা গেছে তাকে ও তার দলকে। এই দ্বিমুখী নীতির একটি নজির নিয়ে বলি:
মওদূদী নারীকে ঘরের সৌন্দর্যবর্ধন, সন্তান লালনপালন ও গৃহস্থালি কাজকর্মের জন্য উপযুক্ত মনে করতেন। তিনি নারী নেতৃত্বের কট্টর বিরোধী ছিলেন। একাধিকবার তার বিভিন্ন লেখায় তিনি সেই মতবাদ গোপন করেননি। যদিও এই বিতর্কের সূচনা হজরত আলির আমলে এই বিতর্কিত হাদিসের মাধ্যমে। দীর্ঘকাল মওদূদীর দল জামায়াতে ইসলামী নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জং ঘোষণা করেছেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে দলটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আইয়ুব খানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ফাতিমা জিন্নাকে সমর্থন দেন এবং মোহাম্মদ আলি জিন্নার বোনের হয়ে প্রচার-প্রচারণা চালান।
মওদূদী প্রথম জীবনে সাংবাদিক ছিলেন। অত্যন্ত অল্পবয়স থেকেই পত্রিকায় লিখতেন। তিনি স্বচ্ছভাবে চিন্তা করতে পারতেন এবং তার স্বাক্ষর রাখতেন নিজের লেখায়। আলতাফ পারভেজ বইটিতে মওদূদীর সংবাদকর্মী জীবনের কথা সংক্ষেপে লিখেছেন।
ইসলাম নিয়ে মওদূদীর চাইতে জানাশোনা আছে, এমন ব্যক্তি কম ছিল না। কিন্তু তারা কেউই মওদূদীর মতো গুছিয়ে লিখতে পারতেন না। এই একটি গুণ তাকে সমকালীন যে কোনো তাত্ত্বিকের চাইতে যোজন যোজন এগিয়ে দেয়। আবার, এই গুণটির উপজাত হিসেবে তিনি কিছু কিছু দোষও আত্মস্থ করেন। যেমন: ধর্ম ও রাজনীতিকে তিনি সব সময় একই আতশকাঁচের নিচে রেখে মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন। তাই ধর্ম আর রাজনীতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া তিনি ধরতে পারেননি৷ হয়তোবা ইচ্ছে করেই বুঝতে চাননি তফাতটুকু। এজন্য তার বিপুল রচনাবলির পাতায় পাতায় এক আজব ইসলামি ধর্মরাজ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই রাজ্যে পশ্চিমাদের তাগুত গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করা হবে। থাকবে ধর্মীয় আইন ও নিজস্ব গণতন্ত্র! রাষ্ট্রের রূপরেখায় তিনি লিখেছেন, তার ধর্মরাজ্য হবে একটি টোটালিটারিয়ান স্টেট। মোদ্দাকথায়, জনগণের কানুন সেখানে অচল। কারণ ইনসানের আকলের ওপর মওদূদী সাহেবের ইয়াকিন নাই। আদমসন্তান হরহামেশাই আবেগতাড়িত হয়ে ফয়সালা করে। এসব ভ্রান্তিকে রুখতে তিনি ঐশী আইনের আদলে সর্বাত্মক এক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেন এবং অনেককে দেখিয়েছেন। লেনিন সর্বহারার সর্বাত্মক রাষ্ট্র কায়েম করেছিলেন। মওদূদী চাইতেন ধর্মের নামে সর্বাত্মক রাষ্ট্র। এই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রচিন্তার সর্বনাশা দিকগুলো চিহ্নিত করেছেন আলতাফ পারভেজ।
মওদূদীর ইসলাম নিয়ে বোঝাপড়া ছিল কাবিলে তারিফ। তিনি কুরআন তরজমা করেছেন। বিস্তারিত আকারে লিখেছেন তাফসির৷ আর , এখানেই ইউসুফ আলী, মওলানা মোহাম্মদ আলী, ওয়াহিদউদ্দিন খান প্রমুখ তাফসিরকারক ও তরজমাকারীদের সাথে মওদূদীর দৃষ্টিগত ও মতাদর্শগত বিভেদ চক্ষুগোচর হয়। কুরআনের বিভিন্ন সূরার আয়াতকে মওদুূূদী সচেতনভাবে রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে নিয়ে এসে ব্যাখা করেছেন, বিশ্লেষণ করেছেন। অথচ দুনিয়ার নামজাদা তাফসিরকারকদের কেউ-ই সেই পথে চিন্তা করেননি। যেমন: একটি সূরায় লোহা বলতে ধাতুকে বোঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে মোটামুটি সবাই নিশ্চিত। কিন্তু মওদূদী লোহাকে ধর্মরাজ্যের অনুঘটক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যা কুরআনের 'মিসরিডিং' নয়; বরং বুঝেশুনে ভিন্ন নিয়তে 'ইলরিডিং' করা। এমন কিছু ইলরিডিংয়ের খোঁজ দিয়েছেন আলতাফ পারভেজ।
স্ববিরোধিতা মওদূদী সাহেবের লেখার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই স্ববিরোধী চিন্তাগুলো খণ্ডন করতে চেষ্টা করেছেন আলতাফ পারভেজ।
পশ্চিমাদের ধনতন্ত্রের প্রতি মওদূদী বীতশ্রদ্ধ। কিন্তু তার চিন্তাকল্প ধর্মরাজ্যের অর্থব্যবস্থায় পুঁজিবাদের চাইতে ঢের বেশি ধনী লোককে সুবিধা দেবে। এক্ষেত্রে সাহাবি আবু যর গিফারির অর্থনীতি চিন্তাকে পাঠকের সামনে বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছেন আলতাফ পারভেজ। এই মহান সাহাবি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আরও বেশি জানতে চাইব তাঁর প্রাগ্রসর ভাবনা সম্পর্কে।
আলতাফ পারভেজের চিন্তার নিক্তি জাতীয়তাবাদীদের তরফে যায় না। বরং তার বামপন্থার প্রতি অধিক দরদ। সেই বিবেচনা মাথায় রেখে বলা যায়, ধর্মভিত্তিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর বিপরীত চিন্তামেরুতে তার অবস্থান। বাকি বামপন্থি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদীর মতো জামায়াত ইসলামী ও মাওলানা মওদূদী সাহেবকে তিনি নির্জলা গালাগাল দেননি। অন্তঃসারশূন্য কথার বোমা ছুঁড়ে মারেননি। প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। এরপর লিখতে বসেছেন মাওলানা মওদূদীকে নিয়ে। তার মেহনতের ছাপ বইটির প্রত্যেকটি পাতায় পেয়েছি। মওদূদীর প্রায় সব লেখা তাকে পড়তে হয়েছে। জেনেছেন আ্যন্টি-মওদূদী বয়ান৷
আলতাফ পারভেজ সমকালীন লেখকদের মধ্যে বিশেষ স্থান প্রাপ্তির দাবি রাখেন৷ তার সবগুলো লেখাতেই নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনার ছাপ পাই। দেখি যুক্তির আধিক্য। তবুও আলতাফ পারভেজ পিছিয়ে। তার গদ্য লেখার ধাঁচ একঘেয়ে। তিনি যত সুন্দরভাবে তথ্য সংগ্রহ করেন, ফুটনোট দেন, তত ভালোভাবে ও সহজভাবে লিখতে পারেন না। এই বইটিতেও একই গদ্যের পুনরাবৃত্তি পাই। নন-ফিকশনে পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা লেখকের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ। এই প্রতিকূলতা আলতাফ পারভেজ পার হতে পারছেন না। আরও সুন্দরভাবে গদ্য লিখতে পারলে বইটা অনায়াসে চার তারকা পেতো৷
দক্ষিণ এশিয়ায় সীমানা পেরিয়ে আফ্রিকা ও এশিয়ার আরও কিছু দেশে মাওলানা মওদূদীর চিন্তা নানাভাবে রাজনীতিতে ছাপ রেখেছে। হোক তা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক। জামায়তের প্রতি ন্যূনতম সমর্থন আমার নেই। তবু মনে করি, মাওলানা মওদূদী ও তার দলের চিন্তা জানা জরুরি। রাজনৈতিক সাহিত্য নিয়ে আগ্রহী ও ধৈর্যশীল পাঠক পড়তে পারেন 'মাওলানা মওদূদ��র রাষ্ট্রচিন্তা: একটি পর্যালোচনা'। মাত্র এক শ ছত্রিশ পাতার বইটির প্রকাশক ঐতিহ্য।
মওদূদী এক চিঠিতে আবুল হাসান আলি নদভিকে লিখেছেন "আমি কখনো নিজেকে সমালোচনার উর্ধ্বে ভাবিনি"।
ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা বুঝতে মওদুদীর রাষ্ট্রচিন্তা একেবারে খারিজ করে দেওয়া যাবে না। এখন মওদূদীর রাষ্ট্রব্যবস্থাই প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কিনা সে বিষয়ে আলেম-ওলামারা অথবা ইসলামের রাজনৈতিক জ্ঞান রাখেন তারা বলতে পারবেন।
আমি বুলেট পয়েন্ট আকারে কিছু তুলে ধরলামঃ
১. যে ব্যাক্তি ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের দাবি করে না সে মুসলিম না। যারা খোদার দুনিয়ায় থেকে খোদার শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধাচারণ করবে তাদের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার থাকা উচিৎ না।
(ইসলামি রাষ্ট্র ও সংবিধান-মওদূদী, পৃষ্ঠা ৪২)
২. মওদূদী আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান প্রস্তাব করেন। যে সংবিধান অপরিবর্তনীয় এবং স্থায়ী। তার ভাষায় এই সংবিধান 'আল্লাহ রচিত'। তাই এই সংবিধানে কোন পরিবর্তন করা যাবে না
(ইসলামি রাষ্ট্র ও সংবিধান-মওদূদী, পৃষ্ঠা ২১১)
৩. ইসলামী রাষ্ট্র ধর্মরাষ্ট্রও (থিওক্রেসি) হবে না, গনতান্ত্রিকও হবে না। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা কোন স্পেসিফিক ধর্মীয় গোষ্ঠীর হাতে সিমাবদ্ধ থাকবে না, সাধারণ সকল মুসলমানদের হাতে থাকবে। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা হবে ডেমোক্রেসি এবং থিওক্রেসির মাঝামাঝি মিশ্রণ। যাকে আমরা গনতান্ত্রিক-ধর্মরাষ্ট্র (থিও ডেমোক্রেসি) বলতে পারি
(ইসলামি রাষ্ট্র ও সংবিধান-মওদূদী, পৃষ্ঠা ৩১৯)
৪. আমরা জানি ইসলামে জাতিবাদের কোন ধারণা নেই। নবী (সঃ) -কে শুধু মুসলিম জাতির জন্য পাঠানো হয়নি। সমগ্র বিশ্বজগতের রহমত স্বরূপ হিসেবে পাঠানো হয়েছে (সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)
তার মানে ইসলামের রাজনীতি অন্তর্ভূক্তিমূলক। জোর করে মুসলিম বানানোও আল্লাহ নিষেধ করেছেন (সূরা ইউসুফ: ৯৯)
এমনকি মুসলিমদেরও জোর করে অন্য মুসলিমদের ধর্মপালনে নিষেধাজ্ঞা আছে। (সূরা বাকারা: ২৫৬)
আল্লাহ নবী (সঃ)-কে উপদেশদাতা হিসেবে বলেছেন। শাসনকর্তা বা বলপ্রয়োগ করতে নিষেধ করেছেন (সূরা গাশিয়ায়: ২১-২২)
মওদূদীর রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অমুসলিমরা নেতৃত্ব কিংবা কোন রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন পাবে না। সেক্ষেত্রে মওদুদি রাষ্ট্র শুধু "মুসলমানদের রাষ্ট্রই" হয়ে দাঁড়ায়। এখানে আমরা জাতিবাদের ধারণা দেখতে পাই।
৫. মওদূদী গনতন্ত্রকে বলেছেন "মানবতার মহাবিপদ"। গনতন্ত্রে নির্বাচনে দাঁড়ানো হারাম এবং ভোট দেওয়াও হারাম।
৬. মাওলানা মওদূদীর ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের জান-মালের হেফাজত রাষ্ট্রের। দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনেও মুসলিম-অমুসলিমের কোন ভেদাভেদ থাকবে না। সরকার কোন অমুসলিম ব্যাক্তির সম্পত্তি দখল করতে পারবে না।
তবে অমুসলিমদের এসবের বিনিময়ে জিজিয়া কর দিতে হবে। অমুসলিমরা রাষ্ট্রের কাছে "সংরক্ষিত নাগরিক" হিসেবে বিবেচিত হবে, পূর্নাঙ্গ নাগরিক হিসেবে নয়। অমুসলিমরা শহর এলাকায় কোন ধর্মীয় কোন উপসনালয় তৈরী করতে পারবে না। রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী থেকে একজন সেনাপতি, বিচারপতি এধরণের কোন প্রসাশনিক পদে অমুসলিম কেউ থাকবে না।
মানে, সমাজে সকল নাগরিকের সমতা থাকবে না। তবে অমুসলিমরা ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলিম হলে সকল নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাবে কিন্তু মুসলিমদের ধর্ম পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে না। মুসলিমরা ধর্ম পরিবর্তন করলে শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড!
৭. অমুসলিমদের তাদের ধর্ম পালনের সম্পূর্ণ অধিকার থাকবে। কিন্তু ধর্ম প্রচারের কোন অধিকার থাকবে না। অমুসলিমরা রাজনীতিও করতে পারবে না।
৮. মওদূদীর ইসলামি রাষ্ট্রে শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে একটি। আলাদা আলাদা কোন শিক্ষাব্যবস্থা থাকবে না। অমুসলিমদেরও একই শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়ালেখা করতে হবে।
৯. মওদূদীর ইসলামী রাষ্ট্রে নারীরা কোন রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। প্রশানিক কোন কাজেও নারীরা থাকবে না। নারীর কর্মস্থল তার গৃহ।
(পর্দা ও ইসলাম, মওদূদী। পৃষ্ঠা ৫৫ )
মানে নারীর কাজ ঘরে থাকা আর সন্তান লালনপালন করা। তবে মওদূদী নারীশিক্ষার বিরুদ্ধে না। নারীদের শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে পারিবারিক জীবন মধুর করে গড়ে তোলার প্রয়োজনে। (আধুনিক নারী ও ইসলামি শরিয়ত, পৃষ্ঠা ২৯)
অন্যদিকে ইউসুফ কারজাভি বলেছেন, ধর্মীয় সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা ও দায়িত্ব বাদে নারী পুরুষের কোন ভেদাভেদ নেই। রশিদ ঘানুসিও নারীকে রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত সঠিক পন্থা নয় বলেছেন।
এখন এক্ষেত্রে মওদূদী রাষ্ট্র অনেকটা "মুসলমান পুরুষদের রাষ্ট্র" হিসেবে দাঁড়ায়। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা ইসলামী কিনা সেই বিষয়ে আলোচনার দাবী রাখে।
১০. মওদূদীর ইসলামী রাষ্ট্রে সম্পদের ব্যাক্তি মালিকানার অধিকার থাকবে। জকাত ফরজ হবে এবং সুদ হবে হারাম। এক শ্রেনীর ওপর অন্য শ্রেনীর আধিপত্য থাকবে না কোন। তবে মানুষের কোন কিছুই ব্যাক্তিগত থাকবে না বা ব্যাক্তিগত দাবী করতে পারবে না। "দুনিয়ার বুকে মানুষের কোন স্বাধীন মালিকানা নেই"।
একজন ব্যাক্তির জীবনের সকল ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে।
(খেলাফত ও রাজতন্ত্র-মওদূদি, পৃষ্ঠা ৩৪)
১১. মওদূদী বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিলুপ্তও চান না আবার শ্রেনী বৈষম্যও চান না। অথচ এর থেকে উত্তরনের কোন পথও তিনি বলে দিয়ে যান নাই। তিনি পুঁজিবাদের সমালোচনা করেছেন অথচ চুরান্ত বিচারে তিনি ব্যাক্তি মালিকানার পক্ষেই থেকেছেন।
মওদূদীর ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মডেল হবে এরকম: - যাকাত হবে ফরজ। যারা যাকাত দেবে না তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরজ - সম্পদ পুঁজি করে রাখা যাবে না। যাকাত, ওয়াকফ, ইনফাক ইত্যাদির মাধ্যমে সম্পদ পুর্নবন্টন করা হবে - সুদের কোন ব্যবস্থা থাকবে না। এক্ষেত্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থা কি রকম হবে সেই নিয়েও আলোচনা মওদূদী করেনি - সম্পত্তির উত্তারাধিকার বন্টন হবে মিরাসি আইনের ভিত্তিতে
বাস্তবিক অর্থে শুধুমাত্র যাকাতের মাধ্যমে সমাজ থেকে শ্রেনী বৈষম্যের মুক্তি পাওয়া যাবে কিনা সেটা প্রশ্নের দাবী রাখে।
--- পরিশেষে মওদূদী ইসলামকে শাসকের/শাসনের পর্যায়ে দেখতে গিয়ে ধর্মের যে এম্প্যাথেটিক এবং ফিলোসফিক্যাল দিক আছে সেসব তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। এবং এই শাসনের ইসলামকেই তিনি প্রকৃত ইসলাম হিসেবে হাজির করেছেন।
যারা তার প্রণীত ইসলামের মতাদর্শে বিশ্বাস করবে না অথবা ভিন্ন মত থাকবে তাদেরকে তিনি সরাসরি অমুসলিম বলেছেন।
মওদূদী পশ্চিমের সংস্কৃতির প্রচুর সমালোচনা করেছেন অথচ এর থেকে বের হওয়ার কোন রকম পথ তিনি বাতলে যাননি বা কোন নির্দেশনাও লিখে যান নাই। আবার তার রাষ্ট্রব্যবস্থায় নিজেই পশ্চিমের অনেক কিছু ধার করেছেন। যেমন তিনি ইসলামি খেলাফত বর্ননা করেছেন গনতন্ত্রের মাধ্যমেই।
বাংলাদেশের কোন বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। একমাত্র গ্যাস ছাড়া কোন প্রাকৃতিক সম্পদও নেই। তার পরিমানও পর্যাপ্ত নয়। দেশের বেশিরভাগ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। সেখানে এত বিপুল পরিমান জনসংখ্যাকে ঘরে বসিয়ে রেখে কিভাবে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি মিলবে সেই উপায়ও আলোচনা করেননি।
বর্তমান রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে মওদূদীর রাষ্ট্র ব্যবস্থা কতটা বাস্তবসম্মত সেই প্রশ্ন থেকে যায়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে জামাতে ইসলামী। কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জামাতের স্টুডেন্ট উইং ছাত্রশিবিরের প্যানেল ভূমিধস বিজয় পেয়েছে; ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল রাজনীতির বোদ্ধা থেকে আমজনতা, সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। যে কথা বাংলাদেশের জনগণ আগে কখনও ভাবেনি, এখন সেটাই ভাবতে শুরু করেছে, অদূর ভবিষ্যতে জামাত হয়ত সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারে। তাই জামাতের রাজনৈতিক দর্শন জানতে আমরা অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠছি।
জামাতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা ও মতাদর্শিক গুরু আবুল আলা মওদূদীর রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ। মূলত এই গ্রন্থে মওদূদীর দর্শনের বিস্তর সমালোচনা করা হয়েছে।
বিভিন্ন মতাদর্শের ইসলামিক স্কলারদের সাথে মওদূদীর মতদ্বৈধতা আছে, তাঁর বিরুদ্ধে আছে কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা করার অভিযোগ; তারপরও বলতে হয় মওদূদী কঠোর ইসলামপন্থী। অপরদিকে লেখক আলতাফ পারভেজ সেকুলার, তিনি সেকুলার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে ইসলামকে দেখেছেন; সেই অবস্থান থেকেই মওদূদীর ক্রিটিক করেছেন, ইচ্ছামতো ক্রিটিক করেছেন ব্যাপারটা এমন নয়, তিনি কুরআনের আয়াত, ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার রেফারেন্স, এবং আরও বিভিন্ন রকম প্রাসঙ্গিক রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন।
মওদূদীর মতে, ইসলামী আদর্শ মেনে জীবনযাপন করার জন্য ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা মুসলিমদের অবশ্য কর্তব্য, প্রতিটি মুসলিমের ঈমানি দায়িত্ব। যদিও কুরআনে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে জীবনযাপন করার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয় নি, এমনকি হাদীসেও এ ব্যাপারে বলা হয় নি। পরবর্তীতে কিছু ইসলামী চিন্তাবিদ মুসলিমদের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এই মতাদর্শ মুসলিমদের জীবনে একটা অতিরিক্ত লড়াই যোগ করছে, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লড়াই। রাজনৈতিক লড়াই অনেক মুসলিমদের স্পিরিচুয়াল থেকে দুনিয়াবি বানিয়ে ফেলতে পারে। এর ফলে মুসলিমদের জীবন কঠিন থেকে কঠিনতর হবে।
এক জায়গায় মওদূদী লিখেছেন তাঁর কল্পিত ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিকদের আইন প্রণয়নের কোন অধিকার থাকবে না, কারণ আইন প্রণয়নের প্রজ্ঞা আল্লাহ মানুষকে দেন নি। অন্য আরেক স্থানে মওদূদী লিখেছেন রাষ্ট্রে আইনসভা থাকা জরুরি।
কেমন হবে মওদূদীর রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অবস্থান? অমুসলিমরা জিজিয়া কর দেবে, তাদের জানমালের হেফাজত করা হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কোন পদে তাদেরকে নিয়োগ করা হবে না। বিপরীতে লেখক দেখিয়েছেন, উমাইয়া, আব্বাসীয় খিলাফতের সময় ইহুদি ও খ্রিস্টানদের নীতিনির্ধারণী পদে নিয়োগ করা হয়েছিল।
অমুসলিমদের নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালনের অধিকার থাকবে, তবে ধর্ম প্রচারের অধিকার থাকবে না। শহর এলাকায় নতুন উপাসনালয় বানানোর অধিকার থাকবে না, পুরাতন উপসনালয় থাকবে। অমুসলিমরা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে পারবে কিন্তু মুসলিমরা ধর্মান্তরিত হবার অধিকার পাবে না। অন্য এক জায়গায় মওদূদী বলেছেন, "যারা খোদাদ্রোহী এবং খোদার প্রাকৃতিক ও শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত, তাদের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকারও থাকা উচিত নয়।" ধর্ম ত্যাগ করতে চাওয়া মুসলিমদের ক্ষেত্রেও মওদূদীর এই বাক্য প্রযোজ্য বলে মনে হয়।
মওদূদীর রাষ্ট্র তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কঠোরভাবে বল প্রয়োগ করবে। লেখক আলতাফ পারভেজ এই কঠোরতাকে ইসলাম-সম্মত নয় মনে করছেন। তিনি কুরআনের কয়েকটি আয়াত উদ্ধৃত করেন, "ধর্মের বিষয়ে কোন জোর জবরদস্তি নেই" (সূরা বাকারা:২৫৬), "আপনি তো শুধু একজন উপদেশদাতা, কারো শাসক নন" (সূরা গাশিয়া: ২১-২২)। এখানে সূরা গাশিয়ার আয়াতটি মুহাম্মদ (স)-কে উদ্দেশ্যে করে বলা। তবে সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছিল রাসূলের (স) মক্কার জীবনকালে; তখন তিনি শাসক ছিলেন না, কিন্তু মদীনায় তিনি শাসক ছিলেন।
মওদূদী যেমন নিজের সুবিধামত ইসলামকে কঠিন করে ব্যাখ্যা করেছেন, আলতাফ পারভেজও ইসলামকে শিথিল দেখানোর চেষ্টা করেছেন। যেমন নারীর ভূমিকা নিয়ে মওদূদী বলেছেন, নারীর কর্মক্ষেত্র গৃহ, রাজনীতি ও দেশ শাসন নারীর কর্মসীমা বহির্ভূত, তবে মওদূদী নারী শিক্ষার পক্ষে। আলতাফ পারভেজ লিখছেন, "কুরআন নারীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বকে হারাম বা অগ্রহণযোগ্য বলেছে এমন কোন সুস্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায় না।" কুরআনে না পাওয়া গেলেও সহীহ হাদিসে পাওয়া যায়। একটা হাদিস এখানে প্রাসঙ্গিক, মুহাম্মদ (স)-এর কাছে যখন খবর পৌঁছাল যে পারস্যবাসীরা কিসরার কন্যাকে তাদের শাসক (রানী) নিযুক্ত করেছে, তখন তিনি বললেন: 'যে জাতি তাদের কর্তৃত্ব একজন নারীর হাতে অর্পণ করে, তারা কখনও সফল হবে না।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৭০৯৯) হাদিসটি ইসলামে নারী নেতৃত্বের পক্ষে-বিপক্ষের বিতর্কে বহুলভাবে উদ্ধৃত হয়। সেই বিতর্কের আলাপে যাচ্ছি না। কিন্তু একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, নবী মুহাম্মদ (স) এর শাসনকালে, এবং পরবর্তী চার খলিফার শাসনকালে কোন নারীকে বিচারক বা প্রশাসকের পদে অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল না। পরামর্শক হিসেবে রাসূলের স্ত্রীদের ভূমিকা উল্লিখিত আছে, কিন্তু তাঁরা কোন প্রশাসনিক পদে ছিলেন না। লেখক যাই বলুন না কেন, নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ইসলাম একেবারেই উদার নয়।
উল্লেখযোগ্য, ১৯৬৫ সালের পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভোটে আইয়ুব খানের বিপরীতে দাঁড়ানো ফাতিমা জিন্নাহকে সমর্থন দেন মওদূদী। এর অবশ্য কারণ ছিল, আইয়ুব খানের সময় মওদূদীকে জেল খাটতে হয়েছিল, এবং তাঁর দল জামাতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কৌশলগত কারণেই তিনি ফাতিমা জিন্নাহকে সমর্থন দিয়েছেন। কৌশলগত বিভিন্ন পদক্ষেপ বাংলাদেশ জামাতে ইসলামীও নেয় এবং সেসব পদক্ষেপ নিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্কের অবকাশ থাকে।
মওদূদীর কুরআনের তাফসিরের সাথে লব্ধপ্রতিষ্ঠ বিভিন্ন তাফসিরকারকদের ব্যাখ্যার অমিল পাওয়া যায়। তিনি কুরআনের অরাজনৈতিক আয়াতকে রাজনৈতিক পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর তাফসির সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমালোচনা করে মওদূদী বলেন, সেখানে চিন্তা ও কাজের স্বাধীনতা নেই। কিন্তু তাঁর প্রস্তাবিত ইসলামী রাষ্ট্রেও যে চিন্তা ও কাজের স্বাধীনতা নেই! এবং সেই রাষ্ট্রের প্রধানও ক্ষমতাবলে সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধানের মত একনায়ক হয়ে উঠবেন; কারণ তিনি আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ একাই নিয়ন্ত্রণ করবেন। আলতাফ পারভেজ মওদূদীর কল্পিত রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার সাদৃশ্য কল্পনা করেছেন। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা দেশের প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান নিজে নিয়োগ করেন। ইরানে যে প্রেসিডেন্ট ইলেকশন হয়, সেই ইলেকশনের বৈধতা প্রদান করেন সর্বোচ্চ নেতা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সাধারণ আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকেন।
এবার মওদূদীর রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শনের দিকে আলোকপাত করা যাক। মাওলানা মওদূদী বলছেন, ইসলামী রাষ্ট্রে কোন শ্রেণিবৈষম্য থাকবে না। যদিও তিনি শিল্প ও ব্যবসার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ সমর্থন করেন না, তাঁর মতে শিল্প ও ব্যবসা হবে অবাধ ও উন্মুক্ত, অর্থাৎ প্রতিযোগিতামূলক। অর্থাৎ মওদূদী পুঁজিবাদের কথাই বলছেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ যেহেতু থাকবে না, ব্যবসায়ীরা সর্বোচ্চ মুনাফা করবেই; এবং শ্রেণিবৈষম্য অবশ্যই তৈরি হবে। গুটিকতক মানুষ বিপুল সম্পদের মালিক হবে। শুধুমাত্র যাকাত বিতরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য দূরীকরণের চিন্তা ব্যক্ত করেছেন মওদূদী। এবং যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে গড়িমসি দেখা গেলে রাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করবে।
ভূমিসংস্কারেরও বিরোধী ছিলেন মাওলানা মওদূদী। তিনি "যত ইচ্ছা ভূমি" মালিকানা ও সেটা "ভাড়া" দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। তাঁর এই চিন্তা জমিদারদের পক্ষে যায়, আর দরিদ্র কৃষকদের বিপক্ষে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকালে বলা হয়েছিল জোতদারদের জমির সিলিং কমিয়ে তাদের কিছু জমি ভূমিহীনদের মাঝে বিতরণ করা হবে। প্রথমে আইয়ুব খান, পরবর্তীতে জুলফিকার আলি ভুট্টোর সরকার ভূমি সংস্কারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ১৯৭৭ সালে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল জিয়াউল হক, মওদূদী তাঁকে সমর্থন জানান। জিয়াউল হকের সময় ভূমি সংস্কার ঠেকাতে শরিয়া কোর্ট গঠন হয়, খ্যাতিমান মুফতি তাকি উসমানি এই কোর্টের একজন গুরুত্বপূর্ণ বিচারক ছিলেন। ১৯৮৯ সালে শরিয়া কোর্ট ভূমি সংস্কারকে অনৈসলামিক ঘোষণা করে। এই রায়ে ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জমিদার, জোতদাররা লাভবান হয়।
আলতাফ পারভেজ মনে করেন, ইসলামে সম্পদের মালিকানার চেয়ে সামাজিক ন্যায়বিচার অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সূরা হাশরের ৭ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করেছেন যেখানে বলা হয়েছে সম্পদ যেন ধনীদের কুক্ষিগত না হয়ে পড়ে। তিনি আবু জর গিফারি (র)-এর উদাহরণ উল্লেখ করেন, যিনি সম্পদ অল্প কিছু মানুষের কুক্ষিগত হয়ে যাবার কুফল নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। যিনি মনে করতেন, বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া মুসলিমদের জন্য মঙ্গলজনক না।
মাওলানা মওদূদীকে নিয়ে বিতর্ক যেমন আছে, তেমনি তাঁর গুণমুগ্ধ অনুসারীও আছে অনেক। সেই অনুসারীদের দৃষ্টিকোণ থেকেও মাওলানা মওদূদীকে জানার প্রয়োজন আছে। বর্তমান জামাতে ইসলামীর সদস্যরা কতটা মওদূদীর দর্শনের চর্চা করছে, কতটা মওদূদীর দর্শনের বাইরে চর্চা করছে সেটাও পর্যালোচনার বিষয়।
★"যদিও মানুষকে জ্ঞান ও বিবেক দান করা হয়েছে তথাপি সাধারণ জনগণ নিজের ভালো মন্দ বুঝতে পারে না"। ★"ইসলামিক রাষ্ট্র রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে সমতাবাদী বা বহুত্ববাদী হবে না"। ★"ধর্ম হিসাবে ইসলাম এবং রাষ্ট্র হিসেবে ইসলাম পৃথক বিষয়,এ দুটোর বিধান ও বিধিতে ফারাক আছে" ★"রাষ্ট্র বলপ্রয়োগের সংস্থা"। ★"ইসলামি ব্যাবস্থায় সুদ হারাম তাই যাকাতকে অর্থনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে"।
এরকম অসংখ্য তত্ত্ব মাওলানা মওদুদী দিয়ে গেছেন তার বিভিন্ন বইয়ে।
আবুল আ'লা মওদুদী,ভারতীয় উপমহাদেশ বা দক্ষিন এশিয়ার রাজনীতি ও ইসলামে একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি তার "ইসলামিক রাষ্ট্রের" প্রস্তাবনার জন্য জনপ্রিয়, এ লক্ষে ১৯৪১ সালের ২৬ আগষ্ট লাহোরে "জামায়ত ই ইসলামী" প্রতিষ্ঠা করেন। মাওলানা তার রাষ্ট্র প্রস্তাবনা নিয়ে অসংখ্য বই লিখেছেন,দিয়েছেন অনেক তত্ত্ব,প্রয়োগের উপায়। সেই প্রস্তাবনা গুলোর সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করা হয়েছে বইটিতে।। আলতাফ পারভেজ সুন্দরভাবে মওদুদীর মৌলিক চিন্তাগুলো তুলে ধরেছেন সাথে বিতর্ক বা সীমাবদ্ধতা নিয়েও কথা বলেছেন,প্রশ্নও তুলেছেন।মাওলানা সাহেব বেচে থাকলে হয়তো সেগুলো ক্লিয়ার করতে পাততেন।আমি যেহেতু সেরকম অর্থে মওদুদীকে পড়ি নাই তাই তিনি উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর জবাব কতটুকু দিয়েছে জানিনা।বেশ কিছু ব্যাপারে তার মতাদর্শের ব্যাপারে নিজেও নমনীয় হয়েছেন বলে ঘটনার প্রমান পাওয়া যা।তার ইসলামিক রাষ্ট্রে প্রস্তাবনার বেশ কিছু জায়গায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক আলেমগন দ্বিমত করেছেন,যেমন: নারীদের ব্যাপারে তার ধারনা,আরেক প্রখ্যাত আলেম "ইউসুফ কারজাভী" দ্বিমত করেছেন যা তার পর্যালোচনা থেকে দেখা যায়। আমি নিশ্চিত এ বইটি পড়ার পর মাওলানা মওদুদীকে জানার আগ্রহ আরো বেড়ে যাবে।। তার সম্পর্কে পড়তে গেলে বোঝা যায় "বাংলাদেশ জামায়াত ই ইসলামি " কতটুকু আদর্শিক ভাবে মওদুদীকে এখন অনুসরণ করছে।বর্তমান প্রেক্ষাপটে মাওলানা মওদুদীকে নিয়ে আলোচনা ও তার প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনাও জরুরী।।
মওদূদী ইসলামকে কেবল শাসনব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করতে গিয়ে ধর্মের আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক দিকগুলিকে গুরুত্ব দেননি, বরং সেগুলো অনেকটাই উপেক্ষিত হয়েছে। তিনি যে ইসলামী শাসনব্যবস্থার কথা বলেছেন, সেটিকেই একমাত্র প্রকৃত ইসলাম হিসেবে তুলে ধরেছেন।
যারা তার বর্ণিত ইসলামী মতবাদ গ্রহণ করে না বা ভিন্নমত পোষণ করে, তাদের তিনি সরাসরি অমুসলিম আখ্যা দিয়েছেন।
মওদূদী পাশ্চাত্য সংস্কৃতির নানা দিকের তীব্র সমালোচনা করেছেন, কিন্তু সে সংকট থেকে উত্তরণের কোনো কার্যকর দিকনির্দেশনা দেননি। বরং তার প্রস্তাবিত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে গণতন্ত্রসহ বহু পশ্চিমা ধারণা গ্রহণ করেছেন।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে অর্ধেকেরও বেশি জনগণ নারী, এবং গ্যাস ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। দেশের একটি বড় অংশ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। এই বিপুল জনসংখ্যাকে ঘরে বসিয়ে রেখে অর্থনৈতিক মুক্তির কী উপায় হতে পারে, সে বিষয়ে মওদূদী কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
ফলে বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তার প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা প্রযোজ্য বা বাস্তবসম্মত—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আলতাফ পারভেজের দুর্দান্ত একটি কাজ এটি। অত্যন্ত তথ্যবহুল, মাত্র ১৩৩ পৃষ্ঠার বইয়ে ২৫৬টি সাইটেসন।