আমজাদ হোসেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ছিলেন। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত এ বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্তমান এক নায়িকার সঙ্গে অনেকাংশে মেলে।
গল্পটা এই দেশের সিনেমাপাড়ার। এক নায়িকার। মাধবী তার নাম। তবে সেটা স্টেজ নেম। আসল নাম আলতা বানু। গ্রামের সেই আলতা ঢাকায় এসে হয়েছিল মাধবী। 'চাহিদাসম্পন্ন নায়িকা'। তার ডেটের জন্য ধর্না দিয়ে বসে থাকে পরিচালকরা। মাধবী এক এক সময় এক এক প্রযোজকেন প্রসাদধন্য। সে অভিনয় জানে না কিন্তু তার সঙ্গে অভিনয়ের জন্য মুখিয়ে থাকে নায়ক। কেননা গ্রিনরুমে নায়িকার মেকআপ নষ্ট করার সুযোগ দেয় মাধবী। শুটিংয়ের সময়ও তার গাড়িতে থাকে হুইস্কি। মাধবীর বাড়ি ভর্তি হুইস্কির বোতল।
আমজাদ হোসেনের 'মাধবী সমগ্র'তে তিনটি উপন্যাসিকা আছে; মাধবী সংবাদ, মাধবীর মাধব, মাধবী ও হিমানি। তিনটিকে মিলিয়ে একটা উপন্যাস বলা যায়। শুরুটা হয় এফডিসির এর নামী পরিচালককে দিয়ে। প্রযোজকের পাল্লায় পড়ে তিনি মাধবীর সঙ্গে সিনেমা করার সিদ্ধান্ত নেন। তারপর ঝুলে যায় শুটিং। মাধবীর মাতলামি আর 'নষ্টামি'তে সিনেমা বন্ধ হবার যোগাড়। দ্বিতীয় উপন্যাসিকা বলে মাধবীর মাধবী হয়ে ওঠা। তার গ্রাম, সেখানে থাকে মাধবীকে সত্যিকার ভালোবাসা পুরুষ কিন্তু মাধবী যে জীবনে ঢুকেছে সেখান থেকে বোরনোর কোনো ইচ্ছা তার নেই। তৃতীয় অংশে আছে হিমানী নামে এক 'এক্সট্রা'র গল্প। পাথরের মতো এই এক্সট্রাকে সব সিনেমায় রাখা হয়। তার কোনো গুণ নেই কিন্তু আউটডোরে নায়কের কোলে বসানোর জন্য হিমানির মতো এক্সট্রা আর কেউ নেই। উপরন্তু সে সুন্দরী।
প্লট বা গল্প ক্লিশে মনে হলেও এ হলো সিনেমাপাড়ার নির্ভেজাল গল্প। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। বাংলা সিনেমার দশা তখন কী তা সবাই জানে। আমজাদ হোসেন সেই পড়তি দশাকেই ফুটিয়ে তুলেছেন মাধবীর মাধ্যমে। কিছু 'আদর্শবাদী' সেন্টিমেন্ট আছে (যা প্রকাশ পায় হিমানিকে নায়িকা হিসেবে গড়ে তোলার যাত্রায় মুক্তিযোদ্ধা মধু চরিত্রের মাধ্যমে) তবে তার পাশাপাশি আছে বাস্তব কথা। যেমন পরিচালকের স্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'ওদের তো শুনি ভালো যন্ত্রপাতিও নেই। ওরা পারলে তোমরা কেন পারো না?' সেই না পারার পেছনের কারণ আমজাদ হোসেন কিছুটা বা অনেকটাই এনেছেন। রুচি, সুযোগ আর ইচ্ছার অভাবটা স্পষ্ট। পাশাপাশি বোম্বের পাইরেটেড ক্যাসেট থেকে চুরি করে সিনেমা বানানো, সিনেমা না বানিয়ে 'হিট পণ্য' বানানোর প্রবণতা যে সিনেমাকে শেষ করছে, তাও বলেছেন তিনি।
শওকত আলীকে উৎসর্গ করা এ বইয়ের মূল অংশ শুরুর আগে ছাপা হয়েছে, 'বাংলাদেশে এই প্রথম লেখককে বয়কট করা হয়েছিল। তবু তার কলমকে থামাতে পারেনি। তার জ্বলন্ত প্রমাণ এই মাধবী সমগ্র।' বয়কট করারই কথা। কেননা মাধবীর বাড়িতে সাংবাদিকদের ডেকে আসর বসিয়ে আপ্যায়ন, মদ্যপান ও স্কুপ বানানোর যে বর্ণনা আমজাদ হোসেন দিয়েছেন তাতে বহুজনের গা জ্বলারই কথা।
#রহমান_সাহেবের_পড়াশোনা
#বইপত্র_২০২৩