অন্যের উপর দায় চাপানোর একটা বড় সুবিধা আছে। "সব দোষ অন্যের, আমার নিজের কোনো ত্রুটি নেই তাই অন্যদেরই পাল্টাতে হবে, অন্যদেরই সবকিছুর দায়িত্ব নিতে হবে আর আমি মহান হয়ে অন্যদের সমালোচনা করতেই থাকবো, করতেই থাকবো। " এ এক সর্বনাশা ফাঁদ।সবাই অন্যের সমালোচনা করে, সবাই অন্যদের খারাপ বলে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলে। ফলে কিছুই বদলায় না। যতীন সরকার "সংস্কৃতি ভাবনা" বইতে স্রোতের বিপরীত দিকে এগিয়েছেন। বেছে নিয়েছেন আত্মসমালোচনার মতো দুরূহ একটি কাজ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক।তাঁর কিছু পর্যবেক্ষণ বেশ আগ্রহোদ্দীপক। যেমন - পাকিস্তান আমলে আমরা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম করেছি তা মূলত প্রতিরোধমূলক। এই সংগ্রাম ছিলো অনিবার্য। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিরোধের আর দরকার রইলো না।তখন দরকার ছিলো সংস্কৃতির পুনর্গঠন ও অনুশীলন। এই দিকটায় বুদ্ধিজীবী ও সচেতন মানুষেরা অসচেতনতার পরিচয় দেওয়ায় ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধের ফসল আমরা ঘরে তুলে নিতে পারিনি। তা নিয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি। এক্ষেত্রেও নিজেদের ব্যর্থতাই প্রকট। কারণ খেলতে নেমে বিরোধীপক্ষ কেন ভালো খেললো এ নিয়ে অভিযোগ করা যেমন হাস্যকর ও অর্থহীন, তেমনি স্বাধীনতার বিরোধী পক্ষ কেন জিতে যাচ্ছে সে ব্যাপারেও তাদের দোষ খোঁজা অনর্থক। খুঁজতে হবে নিজেদের ত্রুটি,খুঁজতে হবে নিজেদের সমস্যা, সামর্থ্য বাড়াতে হবে নিজেদের।
লেখকের ভাষায়,
"আত্মসমালোচনা করার ইচ্ছা ও সাহস-কোনোটাই আমাদের নেই। নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামে জিতে গিয়ে আমরা বড় বেশি আত্মপ্রসন্ন হয়ে উঠি। সেই আত্মপ্রসন্নতাই আমাদের অন্ধ করে ফেলে। তাই পরাজিত শত্রুরা যে আমাদের চোখের সামনেই দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে চলল, তা দেখতে পেলাম না। স্বাধীনতার দু'বছর অতিক্রান্ত না হতেই তারা প্রকাশ্যে 'মুসলিম বাংলা জিন্দাবাদ' স্লোগান তুলল, ধর্মনিরপেক্ষতাকে চ্যালেঞ্জ করল। আর আমরা প্রায় নির্বিকার রইলাম। আমাদের এই নির্বিকারত্বই তাদের সাহস অনেক বাড়িয়ে দিল। তারা প্রায় ফাঁকা মাঠ পেয়ে গেল। অনায়াসেই হারানো ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করল, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তথা সংস্কৃতির স্তম্ভগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তানবাদেরই পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটাল। আমরা যে ওই পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে ঠেকাতে পারলাম না, তার জন্য শত্রুদের গালাগাল করার আগে আত্মধিক্কারেই ধিকৃত হওয়া উচিত নয় কি আমাদের?"
বর্তমান রাজনীতির সাথে সংস্কৃতির সম্বন্ধহীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যতীন সরকার। তিনি বিশ্বাস করেন, "সংস্কৃতিই হচ্ছে মূল লক্ষ্য, রাজনীতি সেই লক্ষ্য সাধনের উপায় মাত্র।" তাই আমাদের হতে হবে সংস্কৃতিমুখী। কিন্তু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি নয়, আমাদের সংস্কৃতি হতে হবে স্বতঃস্ফূর্ত ও জনকল্যাণমুখী। লেখকের ভাষায়,
"সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে কোনো অবস্থাতেই কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর অন্ধ সমর্থক বা অনুসারী হওয়া চলবে না। বরং রাজনৈতিক দলগুলোই যদি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পৌছানোর উপায়মাত্র বলে গ্রহণ করে, তবেই দেশে সুস্থ রাজনীতির চাষবাস হবে এবং গণজীবনে সুস্থতা ও সমৃদ্ধি সঞ্চারিত হবে। অর্থাৎ সংস্কৃতিই হবে লক্ষ্য এবং রাজনীতি হবে সেই লক্ষ্যসাধনের অনেক উপায়ের অন্যতম উপায়মাত্র। এই নীতির প্রতি বিশ্বস্ত থেকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালিত হলেই সংস্কৃতিতে ও রাজনীতিতে শুদ্ধতা আসবে, ধর্মব্যবসায়ী মৌলবাদীদের ষড়যন্ত্র নির্মূল হবে, মধ্যযুগীয় বর্বরতার হাত থেকে সমাজ মুক্তি পাবে।"
কিছু জায়গায় লেখকের সঙ্গে একমত হওয়া আমার পক্ষে কঠিন। পশ্চিমা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সকল মতবাদকে তিনি ঢালাওভাবে নাকচ করেছেন। এসব মতবাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য নিয়ে মাথা ঘামাননি।
সব মিলিয়ে, কিছু সীমাবদ্ধতা ও পুনরাবৃত্তি নিয়েও, "সংস্কৃতি ভাবনা" একটি জরুরি কাজ।