রূপক রাতে ঘুমায় না; মুখোশ পরে বাড়িজুড়ে ঘোরাফেরা করে। ভাবে। প্রচুর ভাবে। একসময় সে ভাবনাগুলো প্রকাশ পায় পৃষ্ঠাজুড়ে। রচিত হয় উপন্যাস। প্রকাশ হয় বিচিত্র এক ছদ্মনামে। সে নাম - মার্লবরো র. হাসান। যার শখ, ফাঁসির দড়ি সংগ্রহ করা। জেলখানায় পরিচিত লোক আছে তার। আসামীরা যে রশিতে ঝুলে ফেলে শেষ নিঃশ্বাস, সে রশিই হাত ঘুরে শোভা পায় ওর স্টাডিতে। মালবরো র. হাসান ওরফে রূপক বশির মুর্তজার জীবনে একটা অদ্ভুত ঘটনা আছে। কয়েক প্ৰস্থ মোটা শেকলে প্যাচানো এক প্রাচীন আলমারি থেকে সে একবার এক নগ্ন নারীকে বের হতে দেখেছিলো। যার পরিচয় কখনও জানা যায়নি। কারণ; সে নারীর মাথা ঢাকা ছিলো একটা লাল বালতি দিয়ে। তবে তাতে চলাফেরায় কোন সমস্যা হয়নি তার। বরং সে রূপককে বানিয়ে খাইয়েছিলো ওর জীবনের শ্রেষ্ঠ চা! এদিকে জহির আর কিসলুর জীবনে কোনো দিশা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হয়েছে। মুরুব্বিদের দোয়ায় জেলও খেটেছে কয়েক মাস। ডিগ্রি নেই, তবুও চাকরি আছে; প্রচণ্ড যত্ন নিয়ে বানানো জাল সার্টিফিকেটের কল্যাণে। তবে এককালে ওদের জীবন এমন ছিলো না। তখন বসন্তের পাগলা বাতাস ওদেরও চুল এলোমেলো করে দিয়ে যেতো মরণোত্তর ম্যাটেরিয়েলিস্টিক বাস্তবতার আশ্বাস। সে সময় গভীর এক রাতে ওরাও দেখেছিলো তাকে। তবে সে নারী নয়, পুরুষ। পিঠ ভর্তি পশম। রোগা-পটকা শরীর। প্রবল ঝড়ের মাঝে হামাগুড়ি দিচ্ছিলো ছাদে। আর মাথা ঢাকা ছিলো একটা বড় লাল বালতি দিয়ে।
সম্পূর্ণ আলাদা মেরু থেকে আসা কিছু মানুষ এ ঘটনার কল্যাণে বন্দী হয় একই বৃত্তে।
জন্মগত প্রতিভার ধারণাটা আমার একদম পছন্দ না। আমার মনে হয় শেখার ইচ্ছা আর কল্পনাশক্তি মিলে প্রতিভা সৃষ্টি হয়। কিন্তু জিহাদী (লেখক পরিচয়ে যার নাম নসিব পঞ্চম) আমার এই বিশ্বাসকে প্রায়ই নাড়িয়ে দেয়।
লেখার সময় লেখকের মাথায় অনেকটাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটনার বর্ণনা চলতে থাকে। গভীর অবচেতন থেকে অস্পষ্ট, বিমূর্ত চিন্তা উঠে আসে। মগজের সচেতন অংশে এসে চিন্তাগুলো ভাষার বেমানান পোশাক গায়ে দেয়। এটাকে মাথার ভেতর একধরনের ‘কণ্ঠ’ বললে হয়তো ভুল হবে না (যদিও এই ‘কণ্ঠ’ আসলে হাত আর চিন্তার সম্মিলিত প্রচেষ্টা)। জিহাদীর ক্ষেত্রে কণ্ঠটা ভীষণ শক্তিশালী। আর নেশা-ধরানো। ওর গল্পের যে জগৎ, সেটা লেখা থেকেই সহজভাবে জন্মায়। টোন হচ্ছে ওর লেখার সবথেকে বড়ো শক্তি। যতো অসম্ভব, হাস্যকর আর গা-শিউরানো ঘটনা ঘটুক, কখনোই মনে হয় না ছাড়া-ছাড়া ঘটনা পড়ছি। বরং একই স্রোতের বিভিন্ন ঢেউ মনে হয়, যদিও ঢেউগুলোর আকার আর আকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। যারা জিহাদীর লেখা পড়েননি তাদের জন্য এ কথাগুলো বলছি। ওর নিয়মিত পাঠকেরা এই ক্ষমতার সাথে আগে থেকে পরিচিত।
আর নিয়মিত পাঠকদের জন্য বলছি—এক চাপ কা খুব সম্ভবত জিহাদীর সব থেকে গোছানো লেখা। এই উপন্যাসের শুরু, মধ্যবর্তী অংশ, সমাপ্তি সবকিছুই ছন্দে আগায়। একটা সম্পূর্ণ গল্প বলে। যে ঘটনাগুলোর বীজ শুরুতে বপন করা হয়, সেগুলো শেষে পূর্ণ রূপ ধরে ফিরে আসে। এবং এই প্রথমবারের মতো বোধহয় জিহাদী একটা উপন্যাস লিখেছে যেটাকে একটা ঘরানায় ফেলা যায়। যদিও ঘরানাটা কী তা বললে পড়ার মজা খানিকটা নষ্ট হবে। তবে স্পয়লার ছাড়াই—বইয়ে দুর্দান্ত একটা রহস্য আছে। আর আছে দারুণ সব চরিত্র। এই চরিত্রেরা ঠিক বাস্তব নয়, মানুষ নয়। তাদের জন্ম বাংলাদেশের মাটিতে নয়, বাংলা সাহিত্যের পাতায়। তারপরেও সবার মধ্যেই পাঠকেরা পরিচিত কিছু পাবেন। যারা বর্তমানের তরুণ (যদিও ৩০-৪০ বছর বয়সী লেখকদের তরুণ বলা যাবে কিনা তা আরেক রহস্য) লেখকসমাজের খোঁজখবর রাখেন, তাদের জন্য মজার কিছু ইন-জোক আছে।
এক চাপ কা প্রকাশ পাবার আগে আমি লেখকের থেকে ডিজিটাল কপি পেয়েছিলাম। লেখককে ধন্যবাদ।
যা ভালো লাগেনি তার মধ্যে আছে এক-দুইজন চরিত্র, বইয়ের মাঝামাঝি তাদের আগমন হয়। এদের আরেকটু বিল্ড-আপ দরকার ছিলো, যেহেতু গল্পের জন্য তারা গুরুত্বপূর্ণ।
যারা গতিময় উপন্যাস পছন্দ করেন, বা মজার লেখা পছন্দ করেন, বা নতুন ধরনের গল্প পছন্দ করেন, তাদের সবারই এই বই ভালো লাগার কথা।
নসিব পঞ্চম জিহাদীর লেখা বরাবরই উপভোগ করি। তাই সুযোগ পাওয়া মাত্রই "এক চাপ কা" পড়ে ফেললাম। কাহিনি নিয়ে বিশেষ অভিযোগ নেই। প্লট গতিশীল, হা হা করে হেসে ওঠার মতো কিছু মুহূর্ত আছে, অদ্ভুত সব চরিত্রের সমাবেশ, টুইস্টগুলো ভালো কিন্তু ঠিক মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো নয়। তা-ও চলতো কিন্তু শেষ অংশটা ভাসা ভাসা, অনেককিছুই পাঠককে অনুমান করে নিতে হয়। অন্য জনরায় অল্পকথায় বেশি বোঝানোর কায়দা ভালো লাগতে পারে কিন্তু থ্রিলার জনরায় এ পদ্ধতি পীড়াদায়ক। সবই ঠিক, শুধু গল্প পড়ার মজাটাই পুরোপুরি পাওয়া গেলো না।
"নিজে চা খাও আর না খাও, আমাকে তো চাখাও" - শিবরাম চক্রবর্তীর কোন একটা গল্পে এমন একটা লাইন ছিল৷ নসিব পঞ্চম যখন আড়াই বছর ধরে "এক চাপ কা" লেখা নিয়ে গড়িমসি করছিল, তখন বহুবার ঠিক এভাবেই বলতে ইচ্ছা করত আমার। কারণ নসিবের আনকোরা নতুন একটা বই চেখে দেখার লোভ সামলানো সত্যিই কঠিন। শাহরুখ খানকে একটা সাক্ষাৎকারে বলতে শুনেছিলাম, "ঈদ/পুজো উপলক্ষে সিনেমা রিলিজ দিতে হয় না তাকে, বরং কিং খানের নতুন একটা সিনেমাই ঈদের আনন্দ নিয়ে আসে।" নসিবের একেকটা নতুন বইও আমার (এবং আমার বিশ্বাস, আরো অনেকের) কাছে তেমনই।
শিবরাম চক্রবর্তী নিজে ছিলেন বাংলা কমেডি জনরায় অসামান্য, অনবদ্য। "এক চাপ কা" বইয়ের লেখক কমেডি লেখেন না, মূলত সাসপেন্স-হরর-সাররিয়েলিজম এর ভেতর তার অবাধ বিচরণ। তবুও নসিবের লেখায় ঘুরেফিরে হিউমারের দেখা পাওয়া যায়; টানটান উত্তেজনায় ভরা ক্লাইমেক্সে, গল্পের প্রয়োজনে অথবা এমনিতেই। থ্রিলারের সাথে নসীবিয় কমেডির এই সিগনেচার ব্লেন্ডিং ভয়াবহ উপভোগ্য।
"এক চাপ কা" বইয়ের পাণ্ডুলিপি পড়েছি মাসখানেক আগে, বর্ষাস্নাত এক শুক্রবার সকালে। জনরা বললে স্পয়লার হয়ে যায় বলে বলা যাচ্ছে না। এক্সট্রা অর্ডিনারি জিনিস বলতে আছে মার্লবোরো র হাসানের একগুচ্ছ কবিতা (যারা কবিতা পড়েন না, তাদের কাছেও ভালো লাগার কথা) আর অন্তর্নিহিত দর্শন। আছে শখের বশে ফাঁসির দড়ি জমানো রূপক, প্রাচীন আলমারি থেকে বেরিয়ে আসা শেকল প্যাচানো নগ্ন নারী, প্রবল ঝড়ের মাঝে ছাদের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে এগোনো লাল বালতিতে মাথা-ঢাকা পুরুষ। আছে জহির, কিসলু এবং নেশার বিরুদ্ধে সোচ্চার বিশিষ্ট লেখক জাহিদ হোসাইন!
বই পড়তে পড়তে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায় গলা শুকিয়ে যাবার উপক্রম হবে বেশ কয়েকবার, এক কাপ চায়ে চুমুক দিতে দিতে উপলব্ধি হবে, "এক চাপ কা" শীর্ষক আবোল তাবোল টাইটেল কতটুকু অর্থবহ!
যেরকম গল্প আশা করেছিলাম, সেরকমই পেলাম লেখকের কাছ থেকে। তার প্লটগুলো সবসময়ই ভিন্নধর্মী হয়, এই বইটাও তার ব্যতিক্রম নয়। নসিব পঞ্চম জিহাদীর বইগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তার গল্পের দুনিয়ার হিসেব নিকেশ একটু ভিন্ন। কিছু কিছু হিউমর আরোপিত মনে হয়েছে, কিছু বেশ রিপিটেটিভ। সাটল ট্রিবিউটগুলো উপভোগ্য, তবে এগুলোর অতি ব্যবহার মূল প্লট থেকে আকর্ষণ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়; আমার ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। পুরো বইয়ে বেশ কয়েকবার হেসে উঠেছি আপনমনে(এটাও অনুমেয়ই ছিল।) প্লট অনুযায়ী, নট হিজ বেস্ট। কিন্তু এক্সিকিউশন আগের বইগুলোর তুলনায় বেশ ভালো। সাড়ে তিন তারা। আমার কাছে বইয়ের এন্টারটেইনমেন্ট ভ্যালু ম্যাটার করে, এক কাপ চা, থুক্কু এক চাপ কা আমার সেই তৃষ্ণা মিটিয়েছে ষোল আনা।
অ্যান্টাগনিস্ট চরিত্রটার বিল্ড আপ একদম হয় নাই। সবকিছু একদম ছ্যাড়াব্যাড়া অবস্থায় রেখে ইতি টেনেছেন লেখক। আরেকটু সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে এই কর্মটা সম্পাদন করলেই পারতেন। তাতে পাঠক হিসেবে আরেকটু বেশি তৃপ্তি পেতাম। হিউমার গুলোও জোর করে পাঠককে গেলাতে চেয়েছেন কয়েক যায়গায়। ব্যাপারটা বিরক্তিকর ছিল। তা বাদে পুরো গল্পটা বেশ রোমাঞ্চকর। সাচ্ছন্দ্যে পড়তে পারেন। আমি আবার পাঠক হিসেবে একটু বেয়াড়া তাই ২ এর বেশি তাঁরা দিতে পারলুম না।
বেশ আগ্রহ নিয়েই পড়া শুরু করেছিলাম এক চাপ কা। লেখকের লেখার ধরন ও লেখার ফাঁকে ঝোঁকে ব্যবহৃত হিউমারগুলো ভালো লাগে আমার। এই বইয়েও এসবের কমতি নেই। বেশ কয়েক জায়গায় ভালোমতোই হাসি পেয়েছে আবার লেখনশৈলীর জন্য কয়েক জায়গায় শিরশিরে অনুভূতিও হয়েছে। গল্পের প্লট শুরু থেকেই প্রতিশ্রুতিশীল ছিল। একেবারে শেষ পর্যায় পর্যন্ত আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছে গল্পটা। জহির, কিসলু আর তরুণ পাশার ইনভেস্টিগেটিভ ওয়ার্ক ভালো লেগেছে। তবে শেষে লেখক একটা মোচড় দেয়ার চেষ্টা করেছেন। চেষ্টাটা ভালো ছিল তবে কোথায় যেন একটু তালহীন মনে হল। অ্যান্টাগোনিস্টের ক্যারেক্টার আগে থেকে সেভাবে ডেভলপ না করায় কিছুটা আউট অফ ব্লু হয়ে গিয়েছে টুইস্টটা। আর কিছু জিনিস ক্লিয়ার করা হয়নি। তবে সবমিলিয়ে বইটা উপভোগ্য, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে ভালোই।
নসিব পঞ্চমী জিহাদী'র কাজ বরাবরের মতোই ব্যতিক্রমী হয়। নামের মতোই বইটি কৌতূহলোদ্দীপক। একশ্বাসে পড়ে ফেলা যায়। থ্রিল আর হরর দৃশ্য নির্মাণে জিহাদী বেশ দক্ষ। গল্পের শেষটা অত্যন্ত সন্তোষজনক লেগেছে আমার কাছে। আসছে ছুটির দিনটা কম্বল মুড়ি দিয়ে কুয়াশার আবছা অবয়ব দেখতে দেখতে 'এক চাপ কা' দিয়ে শুরু করলে মন্দ লাগবেনা বলে নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।
বেশ অনেকদিন যাবত থ্রিলার জনরাতে ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে বসে দেখলাম সে অনুযায়ী আমাকে পরিতৃপ্ত করতে পারছে না। সিনেমা কিংবা হোক সেটা বইপাড়ায়। এদিকে মৌলিক থ্রিলার গুলোকে মনে হয় প্রচন্ড মেকি, সাথে যাচ্ছে তাই মেলোড্রামাটিক ব্যাক স্টোরি, অপরাধের মোটিভ শুনলে হাসি পায় এবং বই শেষ করে ঘাবড়াতে থাকি-থ্রিলটা আসলে পেলাম কোথায়! এখানে আমার সিলেকশন ভুল নাকি এভারেস্ট সম আকাঙ্খা নিয়ে বসে আছি সেটাই দেখার বিষয়।
মলাটে এবং নামকরণের মোহে প'রে পড়ে ফেললাম "এক চাপ কা", অতি উৎসাহ নিয়ে। প্রমিজিং স্টার্ট, আস্তে আস্তে গল্পে আগানো এবং প্লটের এক্সিকিউশনে বেশ ভালোভাবেই সফল। প্রিয় ড্যামিয়ান রাইস আর আয়রন এন্ড ওয়াইনের পপ মিউজিক রেফারেন্স এ খুশি হয়ে গিয়েছি।
সবচেয়ে ভালো লাগার ব্যাপার হচ্ছে গল্পের খাতিরে চরিত্র ধরে এগোনোর রাস্তাটা খুব স্মুথ। যেমনঃ দু'জন চরিত্রের কথোপকথন হচ্ছে, পরের ধাপে উঠে আসছে আবার অন্য আরেকটা দৃশ্যকল্প।এখন এভাবে প্রতিটা অংশই শেষ হচ্ছে ভালো একটা সাসপেন্স রেখে। এবং এক দৃশ্যকল্প থেকে অন্য জায়গায় তারপর আবার আগের অংশে ফেরত আসছে তখন খুব স্মুথলিই ব্যাপারটা ধরা যাচ্ছে। তালগোল পাকিয়ে ফেলেনি। বেশ গোছানো লেখা। সবচেয়ে জরুরী ব্যাপার হচ্ছে, থ্রিলটা আসলে পেলাম ভালোই! তবে খুব আহামরি যে কিছু তাও না। সম্ভবত কনক্লুশন আরেকটু স্বচ্ছ হতে পারতো! প্লাস অপরাধ বিষয়ক মোটিভ একটু মেলোড্রামাটিক আর আনরিয়েলিস্টিক। একদম, "ক্যায়া সে ক্যায়া হো গায়া!"
ওবায়েদ হকের যেকোনো বই পড়তে আমার কন্টেন্ট লাগে না,নাম ই যথেষ্ট ! ঠিক তেমন আরেকজন পেলাম নসিব ভাই কে, যদিও তার জনরা ভিন্ন। সত্যি বলতে ১৮০ পেজের বইয়ের ১৭০ পেজ পরে আমার রেটিং ছিলো ৫/৫! শেষ ১০ পেজের জন্য রেটিং হলো ৪/৫! কিন্তু উনার লিখা প্রচুর এনগেজড রাখে পুরোটা সময়!এইটাই আসল!
মহামুনি হারুন ভাই একটা কথা বলেন, "থ্রিলারের টেস্ট একেকজনের একেক রকম।" আমার ভালো লাগছে থেখেই আরেকজনের ভালো লাগবে অমনটা কথা নাই। এইসব শুইনা মনে কইরেন না যে এই বইটা ভালো লাগে নাই। এক চাপ কা বইটা মজার। মাঝে মাঝে হাসতে হাসতে পেট ভরে যাবে। শেষমেষ প্লট টুইস্ট টা মজা। যদিও ধুম করে বলে দিছে। মোটকথা পড়ে ফেলেন এক চাপ কা। নসিব পঞ্চম জিহাদী ভালো লিখে।
চাকরির সন্ধানে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে জহির। এমনই একটা সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিসলুর সাজেশনে সে গিয়ে দেখা করে মুর্তজা অ্যান্ড সন্স-এর সত্ত্বাধিকারী রূপক বশির মুর্তজার সাথে। সেখানে তার চাকরি হয়েও যায়। জহিরের বস রূপক বেশ অদ্ভুত স্বভাবের মানুষ। বেশ কিছু বিচিত্র কাজকর্ম করে জহিরকে বেশ চমকে দেয় সে। যেমন, মাঝরাতে কবরস্থানে বসে কফি খাওয়া তার মধ্যে একটা। তার আরো একটা বিচিত্র শখ আছে৷ আর সেটা হলো ফাঁসির দড়ি সংগ্রহ করা। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীরা যে ফাঁসির দড়িতে ঝুলে মারা যায়, সেই দড়িই চড়া দামে কিনে নিজের সংগ্রহশালায় যোগ করে রূপক।
ঘটনাচক্রে রূপকের সাথেই তার বিশাল বাড়িতে থাকার সুযোগ আসে জহির আর কিসলুর। সেই বাড়িটাও যেন কেমন। রাতবিরাতে বাড়ির টিভিতে অদ্ভুত এক ভিডিও চালু হয়ে যায়, যা দেখলে কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে নিজের মানসিক স্থিতি ধরে রাখা কঠিন। এই বাড়িতেই রূপক জহির আর কিসলুকে জানায় দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত লেখক মার্লবরো র. হাসান আসলে তারই ছদ্মনাম। একইসাথে রূপক তাদেরকে নিজের একটা ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার গল্প শেয়ার করে। আশ্চর্যজনকভাবে অতীতে প্রায় একই ধরণের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন জহির আর কিসলুও হয়েছিলো।
বস রূপকের আন্ডারে কাজ করতে গিয়ে জহির আরো অনেক কিছুই জানতে পারে তার সম্পর্কে। কথিত আছে, এই মানুষটা একজন সাইকোপ্যাথ। নিজের একমাত্র ছেলে রায়ান আর স্ত্রী লাইশাকে খুন করার পেছনেও নাকি তারই হাত আছে। তীব্র অনুসন্ধিৎসার সাথে জহির এই রহস্যগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা শুরু করে। এই ঘাঁটাঘাঁটিতে জহিরের বন্ধু কিসলু তো বটেই, সেই সাথে তার সঙ্গী হয় জেন নামের এক তরুণী। ধীরে ধীরে দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটে সাবেক আমেরিকান গোয়েন্দা তরুণ পাশারও৷ এরা সবাই মিলে রূপকের লুকানো এক বা একাধিক সত্য খুঁজে বের করতে চায়।
বেশ কয়েক বছর আগে এক ঝড়ের রাতে ডা. ওয়াসি আহমেদের বাসার ছাদে একটা রোমশ মানব সদৃশ প্রাণীকে হামাগুড়ি দিতে দেখেছিলো জহির আর কিসলু। সেই অপার্থিব জীবের মাথায় ছিলো একটা লাল বালতি। আবার এক বর্ষণমুখর দিনে পুরোনো এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে রূপক দেখেছিলো এক ভয়াবহ দৃশ্য। বন্ধ আলমারির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিলো সম্পূর্ণ নগ্ন এক নারী, যার মাথা ঢাকা ছিলো একটা লাল বালতি দিয়ে। সেই ভয়ঙ্কর নারীই রূপককে খাইয়েছিলো তার জীবনের শ্রেষ্ঠ চা। জহির, কিসলু আর রূপক ভিন্ন ভিন্ন দুটো জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন দুটো সময়ে আসলে কি দেখেছিলো? এই বিভীষিকার জন্ম আসলে কোথায়? রূপকই বা গোটা দুনিয়ার কাছ থেকে কি লুকাতে চাইছে? এই সবকিছুর উত্তর খুঁজতে এক চাপ কা খাওয়া বড় প্রয়োজন। খাবেন নাকি এক চাপ কা?
বাংলাদেশের সমসাময়িক যে কয়জন লেখকের লেখা আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে পড়ি ও আমাকে প্রবলভাবে টানে তাদের মধ্যে নসিব পঞ্চম জিহাদী একজন। তাঁর লেখায় সম্পূর্ণ আলাদা একটা পরিবেশ সৃষ্টি করেন তিনি। যেখানে থাকে প্রবল আতঙ্কের নীরব উপস্থিতি। একইসাথে তাঁর লেখায় পাওয়া যায় চমৎকার হিউমার। ভয় আর হিউমারের এই দারুণ সন্নিবেশ নসিব পঞ্চম জিহাদীর লেখাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে যায়। 'এক চাপ কা' উপন্যাসটাও এর ব্যতিক্রম না। এই বইটা আমার পড়ার ইচ্ছা ছিলো অনেকদিন থেকেই। কারণ, তাঁর পূর্ববর্তী তিন বই 'মাঝরাতে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন', 'ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন' আর 'অরিত্রিকা ওইখানে যেওনাকো তুমি' আমার বেশ ভালো লেগেছিলো। একটু দেরিতে হলেও 'এক চাপ কা' পড়তে পারলাম। আর যথারীতি, নসিব পঞ্চম জিহাদী আবারও আমাকে মুগ্ধ করলেন।
জহিরের চাকরি খোঁজার মধ্য দিয়ে 'এক চাপ কা'-এর কাহিনির শুরু। তারপর ধীরে ধীরে এখানে উঠে এসেছে হয়েছে রূপকের রহস্যময় আচার-আচরণ, কিছু অমীমাংসা মৃত্যু রহস্য আর আপাতদৃষ্টিতে ব্যাখ্যার অতীত কিছু ভৌতিক ঘটনা। এই ব্যাপারগুলোর সাথে কাহিনির পরতে পরতে মিশে ছিলো লেখকের উদ্ভট সব হিউমার সমৃদ্ধ ঘটনা। সবকিছু মিলে 'এক চাপ কা' আমার কাছে খুবই উপভোগ্য একটা উপন্যাস হিসেবে ধরা দিয়েছে। এই বইটা আমি রাতেই বেশিরভাগ সময় পড়েছি। যে কারণে কাহিনির ভেতরে সৃষ্ট ভয়ের আবহটা দারুণভাবে টের পেয়েছি। ভয়ের অনুভূতিটা সরাসরি যেন আমার নার্ভের ওপর ইফেক্ট ফেলছিলো। আর যতোবার 'এক চাপ কা'-তে লেখক জাহিদ হোসেইনের ক্যারেক্টারটা এসেছে ততোবারই তাঁর উদ্ভট সব কর্মকাণ্ডে শব্দ করে হেসে উঠেছি। নসিব পঞ্চম জিহাদী তাঁর এই উপন্যাসে শুধু ভয় নিয়েই না, খেলা করেছেন তাঁর স্বভাবসুলভ চমৎকার হিউমার নিয়েও। ব্যাপারটা ভালো লেগেছে।
'এক চাপ কা'-তে সুকৌশলে আমাদের কৈশোরের তিন নায়ক তিন গোয়েন্দাকেও দারুণ এক ট্রিবিউট দিয়েছেন লেখক। বিশেষ করে তরুণ পাশা চরিত্রটার নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে কাটতে করা কর্মকাণ্ডগুলোতে বেশ মজা পেয়েছি আমি৷ বইয়ের শেষটাও আমাকে বেশ চমকে দিয়েছে। একটা পারফেক্ট এন্ডিং বলতে যা বোঝায়, 'এক চাপ কা'-তে তা ছিলো। ভালো লেগেছে মাঝেমাঝেই মার্লবরো র. হাসানের কবিতাগুলো। এগুলোর প্রত্যেকটাই আমি একাধিকবার পড়েছি। আর প্রত্যেকবারই আমার ভালো লেগেছে৷ নসিব পঞ্চম জিহাদীর মতে বইটা অসামাজিক ও মরণমুখী ঘরানার। নিজের সব বইয়ের ব্যাপারেই তিনি অবশ্য এই কথাটা বলেন। আসলে পাঠকের সাইকোলজি নিয়ে এতো চমৎকারভাবে তিনি খেলেন যে, এই ব্যাপারে দ্বিমত করার কোন কারণ আমি দেখি না৷ 'এক চাপ কা' একইসাথে হরর, মিস্ট্রি আর সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের একটা পারফেক্ট ব্লেন্ড আমার মতে।
কিছু বই আছে, শেষ হয়ে গেলে মনে হয় কেন শেষ হলো এতো তাড়াতাড়ি? 'এক চাপ কা' আমার কাছে তেমনই একটা বই। লেখক নসিব পঞ্চম জিহাদী নিজের লেখালেখির ক্ষেত্রে বেশ অলস। এই আলসেমি কাটিয়ে তিনি তাঁর পাঠকদের আরো চমৎকার কিছু লেখা উপহার দেবেন আশা করি। নিজের পটেনশিয়াল সম্পর্কে তাঁর সম্ভবত প্রোপার ধারণা নেই৷ মজার ব্যাপার হলো একই নামে লেখকের একটা ছোট গল্প পড়েছিলাম আদী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হরর-থ্রিলার গল্প সঙ্কলন 'নিশুতি ৩'-এ। এই উপন্যাসেও সেই গল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সেটা সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে চাই না। পড়লেই বুঝতে পারবেন।
'এক চাপ কা'-এর প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছে আমার। বইটা যারা পড়ে ফেলেছেন ইতিমধ্যে তারা তো জানেন এটা কি বস্তু। যারা পড়েননি তাদেরকে বলবো, পড়ে ফেলুন 'এক চাপ কা'। হাইলি রিকমেন্ডেড।
ফেসবুকে বিভিন্ন বইয়ের গ্রুপে এবং গুডরিডসে 'এক চাপ কা' এর উপর বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা এবং ক্ষেত্র বিশেষে ভুয়সী প্রশংসা দেখে চট্টগ্রাম বাতিঘরের আউটলেটে গিয়ে বইটি চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার স্বভাবসুলভ না এরকম একটা ভুল করে ফেলি বই অর্ডার করার সময়। সাদিয়া খান সুবাসিনীর 'এক কাপ চা' আমার জন্য নিয়ে আসা হয়।
প্রচ্ছদ এবং লেখক নামের মিল না পেয়ে গুডরিডসে চেক করতে গিয়ে স্মার্টফোনের স্ক্রীণে দেখলাম বইয়ের নাম 'এক চাপ কা'। নামের মতোই খানিকটা অদ্ভুত বই পরবর্তিতে বাতিঘরের কল্যানে আমার হাতে আসে।
নসিব পঞ্চম জিহাদী রচিত কোন বই এই প্রথম পড়া হলো। লেখক সম্পর্কে কিছু পাঠক এবং সমসাময়িক তরুণ লেখকদের প্রশংসাসূচক কথাবার্তা অনলাইন স্পিয়ারে দেখে আসছিলাম আরো আগ থেকেই।
বইটি পড়ার সময় এবং পড়ে শেষ করার পর মনে হয়েছে নসিম পঞ্চমের লেখনি আসলেই 'এক চাপ কা'ই। অর্থাৎ বেশ খানিকটা অদ্ভুতুড়ে, ক্ষীপ্র, স্ফতস্ফূর্ত লেখনির অধিকারি এই ভদ্রলোক।
রূপক বশির মুর্তজা। আজব এই লোকের যতোসব গজব কাজকারবারে ভর্তি এ গ্রন্থ। তার উপর তিনি আবার মার্লবরো র. হাসান ছদ্মনামে একজন লেখক এবং কবি। বিভিন্ন প্রাণীর চোখ, মানুষের মুখোশ সংগ্রহ করা এবং সম্ভবত মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারে ভুগা একজন।
রূপকের কাছে চাকরির ইনফর্মাল ইন্টারভিউয়ে যায় জহির। সাথে তাঁর জাল সার্টিফিকেট। বন্ধু কিসলুকে সঙ্গে নিয়ে অনিয়মিত জীবনযাপন আর কতো! অবশ্য অপরাধের জগত তাঁরা প্রায় ছেড়ে গেলেও তাদের ঐ জগত ছাড়েনি।
এই উপন্যাসে ক্যামিও দিয়ে গেছেন মনে হয় সমসাময়িক কয়েকজন তরুণ লেখক। মাথায় লাল বালতি নিয়ে দেখা নগ্ন দেহের ঐ ভয়ংকর জিনিসটা আসলে কী তা তদন্ত করতে হাজির হয়ে যান স্বয়ং তরুণ পাশা। যিনি একসময় কিশোর ছিলেন। তাছাড়া রূপককে ঘিরে শুধুমাত্র মিথ নয়, আছে বেশ কয়েকটা মার্ডারেরও অভিযোগ।
'এক চাপ কা' পড়তে গিয়ে তাঁর নিজস্ব স্টাইলে লিখা নসিব পঞ্চম জিহাদীর সাথে হুমায়ূন আহমেদের একটি গুণের কিছুটা সমিল লক্ষ্য করেছি। আপনি যদি রিডার্স ব্লক জাতীয় কিছুতে পড়েন তাহলে এই ধরণের বইয়ের ভাষার সাথে তড়তড়িয়ে এগিয়ে যেতে পারবেন। গল্প বলার জায়গাটা লেখকের বেশ উপভোগ্য। অর্থাৎ তিনি ভালো কিংবা বেশ ভালো লিখতে পারেন। গ্রন্থে মার্লবরো র. হাসানের কবিতাগুলো ভালো লেগেছে। কিছু জায়গায় ভালো কমিক রিলিফ আছে। আবার মূল প্লটের প্রয়োগে ফিরে যেতে লেখকের সময় লাগে না তেমন।
নিঃসন্দেহে নসিব পঞ্চম জিহাদীকে একজন প্রতিভাধর লেখক বলা যায়। তবে উপন্যাসে কিছু কিছু জায়গায় হিউমার খানিকটা আরোপিত লেগেছে। রহস্যোন্মচনের সময় এন্টাগনিস্টের উপর আরো কাজ করা যেতো মনে হয়। উক্ত নভেল আরেকটু দীর্ঘায়িত করা গেলে আরো চমৎকার কিছু আমরা পেতাম। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে কখনো-কখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে একটি ওপেন এন্ডেড এন্ডিং রাখা হয়। এই বইয়ে এরকম কিছু আছে কি না বলবোনা তবে এন্টাগনিস্টের মোটিভ, শেষের দিকের টুইস্টটা ঠিক মোচড় দিতে পারলো না। কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাঠককেই কল্পনা করে নিতে হবে।
অবশ্য লেখকের লেখনি থেকে যেরকম প্রতিভা এবং সংকল্পের দেখা পাওয়া গেছে তাতে টুইস্টনির্ভর উপন্যাস কিংবা সমসাময়িক কিছু লেখকের এন্ট্রি ছাড়াও নসিম পঞ্চম জিহাদী অনেক অনেক ভালো কাজ করতে পারবেন এরকম মনে হয়েছে।
লেখকের প্রতি অনেক শুভেচ্ছা রইলো।
বই রিভিউ
নাম : এক চাপ কা লেখক : নসিব পঞ্চম জিহাদী প্রথম প্রকাশ : অক্টোবর ২০২৩ প্রকাশক : বুক স্ট্রিট প্রচ্ছদ : রাফুল আহাম্মেদ জনরা : থ্রিলার রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
❛আমি অনতিবিলম্বে অনুধাবন করলম পোস্ট নিউক্লিয়ার এই জমানায় কোনকিছুই অবিকৃত নাই। অবিকৃত আছে শুধু আমার মতো পাগলাচো দার স্মৃতিবিষয়ক ভ্রান্তি।❜
আরে না না গালাগালি করছি না। কথাটা আমার না। উক্তিটা ছদ্মনামী লেখক মার্লবরো র. হাসানের। নামের আড়ালে এই আসল মানুষটি কে আমরা জানবো শীঘ্রই।
জহির আর কিসলু দুই বন্ধু। ভালো ফলাফল নিয়ে জহির ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও সঙ্গদোষে যেমন লোহা বসে তেমনি সেও ফা তরা গ্যাংয়ের পাল্লায় পড়ে চৌদ্দশিকের ভাত গিলেছে। জীবন থেকে ১২ মাস চলে গেছে গরাদের পিছে আর লেগেছে কালি। বিতাড়িত হতে হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও। কোনোমতে বাসায় মিথ্যা বলে চালিয়ে নিচ্ছে জীবন। হাতে পয়সার জন্য বিক্রি করছে পাউডার (!)।
কিসলু একদিন চাকরির এক খোঁজ দিলো জহিরকে। তাদের কথিত বড়ো ভাই রূপক মুর্তজা বশিরের কোম্পানিতে। ভাগ্রক্রমে হোক আর যাই হোক চাকরি জুটে গেল তার। এবার পকেটটা একটু হলেও সুখ পাবে।
এই রূপক আবার তেলেসমাতি এক চরিত্র। অনেকটা পাগ ল বলা যায়। একাও সে। তার অদ্ভুত শখ আছে। ফাঁ সির দড়ি সংগ্রহ করা কিংবা মাঝরাতে কবরস্থানে বসে কফি পান — এমন শখকে স্বাভাবিক কেই বা বলে? জীবনে বড্ড একা সে। নিজের পুত্রকে হারিয়েছে অকালে, স্ত্রীও আত্মহ ত্যা করেছে। আর এসব ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহভাজনের তালিকায় একদম প্রথমেই ছিল সে। এমন যার জীবন সে স্বাভাবিক হলেই বরং ব্যাপারটা অস্বাভাবিক।
লোকমুখে শোনা যায় পাঠককে কাপিয়ে দেয়া যেসব লেখা মার্লবরো র. হাসান লিখেন সে আসল ব্যক্তিটাই নাকি এই রূপক। এর পিছে বেশ শক্ত প্রমাণও আছে। কিন্তু কেনই বা এই ছদ্মনামের আশ্রয়?
❛এই যে আমাদের মাথার উপর নেই অন্তহীন আকাশ, ছাদ, মেঘ-মেঘালয় এবং সুদূর অতীত,অথচ দেখো বসে আছি তবুও!❜
জেন উঠতি তরুণী। নেশার কাছে বিলিয়ে দিয়েছে নিজেকে। বইটই পড়ে। সেও আগ্রহী রূপক নামক ব্যক্তিকে নিয়ে।
জহির একদিন রূপককে তাদের অতীতের এক ভয় পাওয়ার গল্প শোনায়। আর গল্পটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। রূপকের কাছে অবিশ্বাস করার কোনো কারণই ছিল না। কারণ অনেকটা একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে তার সাথেও। সেই ঘটনার বর্ণনাই পড়তে দিয়েছিল সে জহিরকে।
জহির রূপকের অতীত নিয়ে এবং চলমান নানা ঘটনা আর মতামত নিয়ে বেশ কৌতূহলী হয়ে যায়। খুঁজতে থাকে নানা বিষয়। এরই রেশ ধরে দৃশ্যপটে হাজির হয় তরুণ পাশা। তিনিও তার পুরোনো চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ঘটনায় বেশ ভালোভাবেই জড়িয়ে যান।
লাল বালতির রহস্যই বা কী? কেন কেউ কল বালতি মাথায় করে আলমারী থেকে বেরিয়ে চা বানিয়ে খাওয়াবে? এসব কি উর্বর মনের কল্পনা নাকি এর সাথে মিশে আছে ভৌতিক কোনো আবহ?
ঊষা নামের মনোবিদ শেষে এসে রূপকের নামে যা বললেন সেটাই বা বিশ্বাস করার কোনো যৌক্তিক কারণ আছে নাকি জহির, কিসলু কিংবা পাশা জানেন না। অনেকগুলো রহস্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এর কিনার করতে হলে জানতে হবে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর। আপাতত ঊষা কফি শপে এক চাপ ফিক খেয়ে ফেলি! আর অন্যরা না হয় এক চাপ কা- তেই সন্তুষ্ট থাকুক!
❛কফি খাওয়া হয়ে গেছে বলে অমানবিক অন্ধকারে শুয়ে যেতে হলো। কারণ তোমার তকদিরের ডিএনএতে মিথ্যের অসুখ।❜
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝এক চাপ কা❞ নসিব পঞ্চম জিহাদীর অদ্ভুত এক উপন্যাস।
লেখকের মতে অসামাজিক ম র ণমুখী। আমার মতে অ্যাবসার্ড ধরনের উপন্যাস। লেখকের আগের বইগুলো পড়েছি। লেখক তার লেখায় আশপাশে অস্বাভাবিক একটা পরিবেশের সৃষ্টি করেন। আর বলা বাহুল্য অস্বাভাবিক সেই পরিবেশ পড়তে গেলে বেশ উপভোগ্য লাগে।
এই উপন্যাসেও কাহিনি শুরু হয় জহিরের চাকরি খোঁজা থেকে চাকরি পাওয়া এবং বস রূপকের জীবনের সাথে নিজেদের জড়িয়ে ফেলার ঘটনা দিয়ে।
আমার মনে হয়েছে পুরো উপন্যাস এগিয়েছে শুধুমাত্র একটা কৌতূহল থেকে। সত্যি মিথ্যা যাচাই আর একটা লেখা পড়ে তার বিশ্বাস তৈরি করে তার পিছে কৌতূহলী হয়ে ছোটার যে চমকপ্রদ ঘটনা লেখক এনেছেন সত্যিই দারুণ।
রহস্য, সাইকোলজি আর ভৌতিক আবহের সৃষ্টি করেছেন লেখক নিজস্ব দক্ষতায়। ভৌতিক আবহের পাশাপাশি তিনি তার স্বভাবসুলভ হিউমার আনতে একেবারেই ভোলেননি। গল্পের কিছু জায়গায় হিউকার বেশ দারুণ ছিল, হেসেছি। তবে আমার কাছে ব্যক্তিগত ভাবে লেখায় বাস্তব ক্যামিও খুব একটা পছন্দ না। অপছন্দও না। তবে এটার ব্যবহার সীমিত হলে ঠিক আছে।
এখানে লেখকের ক্যামিও গুলো আমার কাছে একটু বাড়তি লেগেছে। ক্যামিওগুলো গল্পের স্বাভাবিক প্রবাহকে কয়েকবার থামিয়ে দিয়েছে। চাইলে কমানো যেত এতে করে মূল গল্পে বিশেষ হেরফের হতো বলে মনে হয় না।
তবে মার্লবরো র. হাসানের নামে লেখা উক্তিগুলো এই উপন্যাসে আমার সবথেকে পছন্দের জিনিস। এত দারুণ ভাবে শব্দের মিশেলে বাক্য তৈরি করেছেন যে প্রতিবার সেই লাইনগুলো আমি একাধিকবার পড়েছি।
চরম রহস্য, টুইস্ট আর ভৌতিক আবহের সৃষ্টি করে লেখক শেষের দিকে সবকিছু যথার্থ এবং যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন যেগুলো মনে আসা প্রশ্নের উত্তর আপনাই দিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ❛সত্য ঘটনা অবলম্বনে❜ এই ব্যাপারটার ব্যাখ্যা তিনি যারপরনাই দারুণ ভাবে দিয়েছেন। এমনটা আসলেই হয় বিশেষ জানাশোনা ছিল না আমার। তবে টাকা ওয়ালা মাইনষের টাকা কামানোর বিভিন্ন শখের তো কমতি নাই!
আমরা সাধারণত সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা মানেই পুরো ঘটনাকে সত্য ধরে নিই। লেখক সেই ধারণাটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
শেষের দিকে লেখক এমন একটা বিষয়কে তুলে ধরেছেন যা আপাতদৃষ্টিতে আমরা গুরুত্ব দেই না। কাউকে মজা করে কিছু বলে ফেললে সে ব্যাপারটা তার জন্য কেমন প্রভাব ফেলে আমরা অনেকেই সেটা ভেবে দেখি না। এজন্য যে জীবনে কত ঝড় বইতে পারে সে খেয়াল আমাদের আছে কি?
শেষের টুইস্ট লেখক বেশ ভালোভাবে দিয়েছেন। তবুও শেষের কিছু বিষয় আরো একটু বর্ণনার দাবি রাখে। যদিও সেটাকে নিজে কল্পনা করে নিতে হবে। তবে চাইলে দিতে বাধা ছিল না।
আর হ্যাঁ, কেউ আপনাকে এক কাপ চা খেতে বললে অবশ্যই খাবেন। নচেৎ জীবন এক চাপ কা - এ রূপান্তর হতে সময় নিবে না!
চরিত্র:
উপন্যাসে খুব বেশি চরিত্র ছিল না। যারা ছিল তাদের সঠিক ভাবেই ব্যবহার করেছেন।
শুরুতেই রূপকের কথা না বলে আমি বলব অনেক পরে আসা তরুণ পাশার কথা। লেখক এই চরিত্রটাকে বেশ ভালোভাবে সাজিয়েছেন। সেই সাথে তিন গোয়েন্দার হালকা ট্রিবিউট ছিল।
জহির চরিত্রের কৌতূহল আর তার ব্যক্তিত্ব আমার বেশ লেগেছে।
কিসলু প্রাণবন্ত একটা চরিত্র। তার উলাপ্তলা ভাষার ধরন তার চরিত্রের একদম খাঁটি দিকটাই তুলে ধরেছে।
জেনের উপস্থিতি খুব বেশি না হলেও তার চারপাশের ভাঙাচোরা জীবনযাপন চরিত্রটাকে মনে রাখার মতো করেছে।
রূপক চরিত্র এই উপন্যাসের সবথেকে রহস্যময় চরিত্র। এই চরিত্রের রহস্য, আবহ দিবি লেখক চমৎকার দক্ষতায় প্রকাশ করেছেন।
ঊষা চরিত্রটাও বেশ। নারী চরিত্র রহস্য আর কাঠিন্যের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেলে সেটা বেশ লাগে।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
বইটার নাম যেমন আগ্রহ জাগানিয়া তেমনি প্রচ্ছদও। বইয়ের প্রোডাকশন দারুণ। সম্পাদনার ঘাটতি নজরে আসেনি।
❛Now, I'm sitting in the same old house where it all started. Thinking about every possible way to ki ll myself knowing clearly, that I can never end it once and for all.❜
এই বছরে আমার পড়া অন্যতম সেরা মৌলিক বই "এক চাপ কা"। দুর্দান্ত লেখনশৈলী, সেই সাথে পুরো বই জুড়ে সাসপেন্স ভাবটা বজায় ছিলো। অনেকদিন পরে কোনো বই পড়ে খুব উপভোগ করলাম।
শুধুমাত্র লেখার জোরেই পড়া যায়, এমন লেখক হচ্ছেন নসীব পঞ্চম জেহাদী। এমনিতে এবারের প্লটটাও আমার ভালো লেগেছে। আগের বইগুলোর মত এন্ডিংও অতটা হতাশ করেনি। সব মিলিয়ে মাস্ট রিড তো বলা যাবেই না, তবে আমি বেশ উপভোগ করেছি।
বইয়ের নাম ভুল, নাকি বলব বইয়ের ভুম নাল। ওয়াসি আহমেদের আখতারুজ্জামান চা খেতে চান পড়ার পরে সমসাময়িক লেখক নসিব পঞ্চম জিহাদীর এক চাপ কা পড়া শুরু করেছিলাম। ভাবলাম আগের কাপ শেষ হয়েছে তাইলে এইটা বাকী থাকে কেন। বইয়ের নামে গ্যাঞ্জাম আছে। দুইবার পড়া লাগে। শক্তি খরচা হয় বেশী। কিন্তু বইটা পড়তে বেশী শক্তি খরচা হয় নাই। এককথায় চমৎকার বই। গল্পের শুরতেই আমরা দেখতে পাই দুই ফাত্রা বন্ধু কিসলু আর জহিরের আলাপ। একজন চাকরি করে আরেকজন বেকার। তবে কিছু নেশাজাতীয় দ্রব্য ডেলিভারি দিয়ে জহির জীবন চালাচ্ছে। সুতরাং জহিরের চাকরির দায়িত্ব কিসলু নিয়ে তাকে রূপক ভাইয়ের কাছে পাঠায়। রূপক ভাইয়ের জহিরকে পছন্দ হয় এবং চাকরিতে বহাল করে। এদ্দুর পড়লে তোহ মনে হয় খুব স্বাভাবিক একটা গল্প। কিন্তু ঘটনা প্যাচ খাইতে খাইতে সাইকোলজিকাল ক্যাচাল, সিরিয়াল কিলার, ভৌতিক ঘটনা থেকে শুরু করে সবকিছুই ঘটতে থাকে একে একে। শেষের দিকটা পুরাই চমকিত। কোথা থেকে গল্প শুরু করে কোথায় এসে যে শেষ হল, ভাবতেই ভাল লাগে। খুব স্মুথ একটা লেখা পড়লাম। একবারে পারফেক্ট একটা থ্রিলার বই। অবশ্য রেকমেন্ডেড একটা বই। পরিশেষে একটা মজার ব্যাপার শেয়ার করি। বইয়ের শেষ কয় লাইন ওয়াসি আহমেদের লিখা।
পড়া শেষ করে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বললাম ''সুন্দরী মেধাবী নারীদের কখনো উত্যক্ত করা উচিৎ না,শুধু সুন্দরী কেন যে কোন নারীদের ই খোঁচা দেওয়া অস্বাস্থ্যকর একটা কাজ'' প্রতিশোধের আগুনের সামনে আমরা সবাই নিয়ন্ত্রণহীন কিন্তু নারীরা...ওরা মনে হয় সাইকো হয়ে যায়। গল্পটা প্রতিশোধ নিয়েই বলা যায় এক রকম। প্রথম দিকে খাপছাড়া খাপছাড়া লাগলেও শেষের দিকে লেখক একটু খাপ লাগাইতে পারছেন। গল্পের নায়ক রুপক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন মানুষ, সন্তান স্ত্রী হারায়ে এখন সে ছদ্মনামে(Marlboro Red Hasan) উপন্যাস লেখে বেড়ায় আর গভীর রাতে ঘরের মধ্যে মুখোশ পরে বসে থাকে।গোটা জীবন টা তার এলোমেলো হয়ে গেছে। সর্বশান্ত একজন মানুষের সর্বশান্ত হওয়ার পেছনে একটাই অপরাধ - সে এমন একজন নারীকে অপমান করেছিলো যেই নারী তাকে ভালোবাসতো। আমি জানতাম প্রেমে পড়লে নারীরা একটু অদূরদর্শীহীনা আর বেতালা হয়ে যায় কিন্তু এখন দেখলাম না...ব্যাপারটা আংশিক সত্য।প্রেমে পড়লে কিছু নারী সাইকোও হয়। সুতরাং প্রেম করার আগে বা প্রেমে পড়ার আগে সাব্জেক্ট কে ভালো মতো যাচাই বাছাই করে করুন বা পড়ুন। সমাজে অনেক সুস্থ(!) এবং সুশীলা নারী আছে।তাদের পেছনে ঘুরুন। পাত্তা দিলে দিলো না দিলে কয়েকদিন ঘুরায়া ছেড়ে দিবে; এটলিস্ট পিতৃপ্রদত্ত জান টা তো থাকবে, কিন্তু সাইকোদের থেকে সাবধান। পাগল ছাগল ক্ষেপায়া লাভ নাই। আপনারে শিকে ভরে গ্রিল বানিয়ে বিনা সসে,বিনা মেয়োনিজে চাবায়ে খেয়ে ফেলবে...ইভেন নানরুটিও লাগবে না।
ঈদের ছুটিতে প্রথমে বিভূতি-বাবুর "দৃষ্টিপ্রদীপ" পড়ে নসীব পঞ্চম জিহাদীর "এক চাপ কা" পড়া হলো। দুটো সম্পূর্ন দুই মেরুর বই। কোথায় বিভূতি বাবুর আধ্যাত্মিক লেভেলের ট্র্যাজেডি আর কোথায় পঞ্চম সাহেবের রক্তারক্তি, সাইকেলজিকাল হরর!
যাই হোক, পঞ্চম সাহেবের বই প্রথমবার পড়া হলো। বেশ দুর্ধর্ষ, স্বতস্ফুর্ত লেখা তার। পড়ে কখন আনমনেই হোহো করে উঠেছি খেয়াল করিনি। আবার তেমনি তার সাসপেন্স ধরে রাখার ক্ষমতাও দুর্দান্ত। পাঠককে রশীর ডগায় মুলো ঝুলিয়ে ব্যস্ত রাখতে ভালোই পারেন।
বইয়ে তার স্বতস্ফুর্ত চাঁচাছোলা হিউমার আর পপ কালচারের রেফারেন্স বারবার জাহিদ হোসেনের লেখার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। তাই ভয়ে ছিলাম শেষটা না আবার গেঁজে যায়। তবে পঞ্চম সাহেব এন্ডিংটা সামলেছেন ভালোই। যদিও হুট করে যেমন করে রহস্যফাঁস বা টুইস্ট-টা এসেছে তা ঠিক মনঃপূত হয়নি। পঞ্চম সাহেবের লেখায় মেদ কম। তবে কিছু জায়গায় সময় নিয়ে মেদযুক্ত লেখা মন্দ লাগে না। ক্লাইম্যাক্সে আরেকটু নাটুকেপনা হলে ৫/৫ পেত বইটা।
পঞ্চম সাহেবের লেখার ভক্ত হয়ে গেলাম। তার বাকী বইগুলো কেনার আর পড়ার আগ্রহ বেড়ে গেছে।
আব্বা বলেন তার গ্রামে একজন কামেল লোক ছিলেন, যিনি কথাবার্তা বলতে গেলে একটু ওলোটপালোট করে ফেলতেন। যেমন, ফুটবল কে বলে ফেলতেন বুফটল। মেম্বার কে বলতেন লেম্বর। চা চাইতে গিয়ে বলতেন, এক চাপ কা দেইনসে...ছোটবেলায় বাবার মুখে অসংখ্যবার এক চাপ কা চাওয়া শুনে আমরা হেসে কুটি কুটি হতাম। এতগুলো বছর পর 'এক চাপ কা' কথাটি প্রতিষ্ঠিত হলো একটি বই প্রকাশের মাধ্যমে। বইয়ের লেখক নসিব পঞ্চম জিহাদী। যিনি পাঠককে কিভাবে কাগজের পৃষ্ঠায় আটকে রাখতে হয়, সে ব্যাপারে পিএইচডি করেছেন। আমি বরাবরই লেখকের বই কালেক্ট করি। কারণ লেখকের লেখা উইটি, ফানি এবং একই সাথে ব্যতিক্রমী প্লটের। শহর কেন্দ্রীক সকল প্লট হলেও, পরিচিত এই শহরটাকেই উনি অপরিচিত করে ফেলেন। গল্পগুলোকে একবার মনেহয় অলৌকিক, একবার মনে হয় একদম লৌকিক!
বইটার প্লটটা একটা লং গেইম। এবং বেশ ভালো গেম! জাপানি থ্রিলার গুলোতে আমরা আগে দেখেছি এমন। বিশ চল্লিশ বছর ধরে সিস্টেম করে একটা প্রতিশোধ বা প্ল্যানের বাস্তবায়ন তারা ঘটায়। সে হিসেবে চিন্তা করলে এ বইটার প্লটও সেই গোত্রের। আরেকটু হলেই একটা ফাটাফাটি গল্প পেতাম আমরা। তবে গল্প সফল হতে বাঁধ সেধেছে গল্প নিজেই। বেশ এলোমেলো লেগেছে এবার গল্প।
এক লেখক যিনি মার্লবরো র. হাসান ছদ্মনামে লেখেন। প্রচুর জনপ্রিয় এই লেখক হিসেবে সন্দেহ করা হয় একজন ব্যবসায়ি রূপক-কে। সেই ব্যবসায়ী 'ভদ্রলোক' আবার তার স্ত্রী পুত্র হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। শুধু এটুকু হলেও হতো, ওই ভদ্রলোকের আবার অদ্ভুত কিছু বাতিক আছে। তিনি ফাঁসির দড়ি, গরুর চোখ, অদ্ভুত সব মুখোশ ইত্যাদি অদ্ভুত সব জিনিশ সংগ্রহ করেন। ঘটনাক্রমে তার সাথে জড়িয়ে পড়ে দুই বেদিশা ছেলে জহির আর কিসলু। এই দুইজনের জীবনে একটা অলৌকিক ঘটনা আছে, তারা একবার মধ্যরাতে ছাদে একজন রোগা লোককে দেখে। যার মাথাটা ঢাকা ছিল একটা লাল বালতি দিয়ে। হামাগুড়ি দিয়ে তাদের তাড়া করে সেই লোকটা। এই একই ঘটনা রূপকের জীবনেও ঘটেছিল। ঘটনাক্রমে তারা একত্র হয়। জহির আর কিসলু খুঁজে বেড়ায় আসল ঘটনা, মার্লবরো র. হাসান এর আসল পরিচয়।
নিঃসন্দেহে উইয়ার্ড প্লট। এলোমেলো লেগেছে কারণ চরিত্রগুলো প্রচন্ড খাপছাড়া। এই একবার কিসলুকে নিয়ে আছি, আবার জহির এর সাথে জেনের কাহিনি। আবার তারা নিজেরা মিলে লেখকের পরিচয় বের করছে, হঠাৎ দৃশ্যে থার্ড পার্সন ডিটেকটিভ হিসেবে আসে তরুণ পাশা! লেখক নসিব পঞ্চম তার প্রতিটি বইতেই পরিচিত লেখকবন্ধুদের ট্রিবিউট দেন বিভিন্ন চরিত্র বানিয়ে। এবারও করেছেন। মজাও পেয়েছি। তবে লেবুর ব্যবহার অধিক হয়ে যাচ্ছে বোধহয়। কথ্য ভাষায় আমরা ঠিক এভাবে গালিগালাজ করে কথা বলি কিনা সেটাও দেখবার বিষয়, কারণ যথেষ্ঠ আরোপিত লাগছিল।
গল্প নন লিনিয়ার না হলেও সমস্যা নেই। যে প্লটটা লেখক ভেবেছেন, সেটা আমার ধারণা আমি ধরতে পেরেছি। আফসোস হলো এক্সিকিউশনটা ভালো হলোনা। একটু ভালো হলে বলতে পারতাম, একদাম কাড়াক এক চাপ কা!
আমার কাছে বইটা অনেক ভালো লেগেছে। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। প্লট এবং লেখকের গল্প বলার ধরন দারুণ। একটানা পড়ে গিয়েছি যতক্ষণ পড়েছি বইটা। প্লটটা যেমন ইন্টারেস্টিং ছিলো তেমন লেখকের লেখাও বেশ ইন্টারেস্টিং হওয়ার কারনে পড়তে বেশ ভালো লেগেছে। অল্প কিছু হিউমার ছিলো যেগুলো বেশ হাসিয়েছে আবার কিছু যায়গায় ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা ছিলো হয়তো। ছোট-বড় কিছু টুইস্ট ছিলো বইটিতে। কিন্তু পুরো বইটা যেভাবে এগিয়েছে এন্ডিংটা মনে হল ধুপ করেই শেষ। যাইহোক, বইটা নিয়ে যেমন আলোচনা দেখেছি সেই হিসেবে এক্সপেকটেশন যা ছিলো পুরোটাই পেয়েছি। দিনশেষে ভালো একটা বই পড়লে শান্তি লাগে, এই বইটা পড়ার পর অনুভূতি তেমন।
খুবই কনফিউজিং একটা বই পড়লাম! লেখক মনে হয় নিজেই বুঝতে পারছিলেন না যে তিনি থ্রিলার লিখবেন, নাকি হরর, নাকি তিন গোয়েন্দার প্যারোডি! বইয়ের শুরুর পাতাগুলো বেশ ভালোই লাগছিলো। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় গালিগালাজ, জোর করে হাসানোর উপাদান, গল্পকে বেশ দুর্বল করে ফেললো। আর সবচেয়ে বিরক্ত লাগলো তরুণ পাশা নামক ভদ্রলোকের উপস্থিতি। তিন গোয়েন্দা পড়ে বইয়ের রাজ্যে প্রবেশ করা একজন পাঠক হিসেবে পছন্দের চরিত্রগুলোর অনেকটা ব্যাঙ্গাত্মক উপস্থাপনা আমার একদমই ভালো লাগে নি। দুই তারা দিতাম হয়তো যদি এইসব অপ্রয়োজনীয় হাস্যরস না থাকতো। লেখকের “মাঝরাতে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন” বইটা খুবই ভালো লেগেছিল। কাহিনীর চমৎকার বিল্ড-আপ ছিল, অনেক আকর্ষণী উপাদান ছিল। এই বইটা যেন ঠিক তার উলটো!
প্রতিটা সকালই আমার শুরু হয় হাজারটা ব্যস্ততা নিয়ে।কিন্তু আজকে ঘুম ভেঙেই সবকিছু রীতিমতো উল্টো করতে শুরু করেছি। বৃষ্টিস্নাত এই শীতের সকালে রুমের জানালার ধারে বসে একমনে বৃষ্টি উপভোগ করছিলাম। হঠাৎই মনে হলো এক কাপ গরম চায়ের সাথে একটা বইয়ের অন্তরাত্মাকে শুষে নিঃশেষ করে দিলে মন্দ হয়না কিন্তু। বইয়ের স্তুপের সামনে গিয়ে পাঁচটা মিনিট ভাবলাম কোনটা নেওয়া যায়। স্তুপের নিচে চোখ পড়তেই দেখি "এমা! এক চাপ কা" বইটা থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে।নিজেকে আর সামলে রাখাটা কার সাধ্য ভাই।বসতেই যতোটা দেরি। মাঝে আরো দুটো চা খাওয়া লেগেছে।কারন পড়ার সময় আমার এক্সাইটমেন্ট এতোটা শ্বাসরুদ্ধকর এবং মারাত্মক রকমের ছিল যে তাতে আর দুটো কাপের প্রয়োজনীয়তা খুব বেশি অতিরঞ্জিত বিষয় বলে মনে হয়নি। এক বসাতেই কপোকাত। নিজের সেন্স অফ হিউমারের একটা পরীক্ষা নেওয়ার জন্যে হলেও বইটা আমার জন্যে মাস্ট রিড ছিল।চরিত্রগুলোকে লেখক বাস্তবিক করে তোলার তাগিদে যেভাবে থ্রিলারের সাথে কমেডির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন আর তাতে গল্পের প্লট, কাহিনী বিল্ড-আপ,শব্দবুনন,বর্ণনা কৌশল একটা পাঠকের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম। আর ব্যক্তিগতভাবে বইটার লেখার ফন্টটা আমার ভীষণ পছন্দের।
ভাল লাগছিলো পড়তে, সুন্দর করেই আগাচ্ছিলো। হুট করে একটা হোচট খেলাম, আর তারপরই বই শেষ। এক্সিকিউশনের বেশ ঘাটতি আছে, চোখে পড়ার মত। বইটা আরও বড় হলে হয়ত এই সমস্যা টা হতো না!! এত তাড়াহুড়া করে শেষ কেন করতে হলো কে জানে...
আহ! (তৃপ্তির ঢেকুর) লেখনি নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই৷ আর হিউমার? বরাবরের মত সেরা! সাথে ক্যামিও গুলো। নেয়ার পার্ফেক্ট একটা এন্ডিং, প্লট এক্সিকিউশন ও দারুন! এক চাপ কা নিয়ে আমার যে এক্সপেকটেশন ছিল তা ফুল ফিল করতে পেরেছেন লেখক৷
২০০ পৃষ্টারও কম একটা বইয়ে হাসি, তামাশা, গল্প, কবিতা, রহস্য, ভয় - এমন কিছু নেই যা 'এক চাপ কা'তে নেই। খুবই ইউনিক প্লট। গল্পার বলার ঢং-ও বেশ আমেজে ভরা। গল্পের শুরু ও গল্পে ঢোকাও হয়েছে চমৎকারভাবে। শেষের দিকে শুরু আমেজটা কিছুটা কম পেয়েছি। যবনিকা পতন এবং উপসংহারে ৩-৪ পৃষ্টা বেশি হলে হয়ত আমার জন্য ভালো হতো। তবে রোলার কোস্টার গতিতে আগানো গল্প, ঐ একই গতিতে শেষ হয়ে যেতে যারা পছন্দ করেন। তারা আমার মতো আরও কিছু পৃষ্টার প্রয়োজনীয় অনুভব করবেন বলে মনে হয় না।
নসিব পঞ্চম জিদাহীর খুবই ম্যাচিউর একটা বই। তবে 'ফুল লাগলে চেয়ে নেবেন' এখনও আমার কাছে তার সেরা কাজ বলে মনে হয়।
বরাবরের মতোই লেখকের আরেকটা সুস্বাদু বই। হয়তো কথাটা ফ্যানগার্লের মতো শোনাবে, কিন্তু নসিব পঞ্চম জিহাদীর বই পড়তে ভালোবাসি দুইটা কারনে। প্রথমত, উনি একজন বর্ণ স্টোরিটেলার। বাংলাদেশের তরুণ দুই লেখককে আমি এই কারনে পছন্দ করি, জিহাদী এবং এই বইয়েরই একজন ক্যামিও জাহিদ হোসেইন। দ্বিতীয় কারন হলো, জিহাদী সাহেবের বইয়ের জনরা কী এটা ফ্ল্যাপ পড়ে তো দূরের কথা, বইয়ের মাঝ বরাবর পড়েও বোঝা যায় না। এরকম আনপ্রেডিক্টেবল লেখা আমার খুবই পছন্দ এবং এই বইয়েও সেই ভাবটা পুরোপুরি বিদ্যমান। এক তারা কম দেওয়ার কারন,
১. স্ল্যাঙ। যে জিনিসটা আমি একদমই পছন্দ করি না।
২. জাহিদ হোসেনকে নিয়ে প্র্যাংক করাটাকেও ঠিক রুচিসম্মত মনে হয়নি।
৩. এটা শুনলে অনেকে হাসবে, কিন্তু কিশোর পাশা জিনাকে বিয়ে করেছে এটা এমনকি প্যারালাল ইউনিভার্সেও আমি কল্পনা করতে পারি না। রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলে গেছে ভাবতেই।
লেখকের প্রতি দুইটা অনুরোধ,
১. এবার একটা মোটা, হৃষ্টপুষ্ট সাইজের বই লেখেন প্লীজ।