শব্দগুলোর সাথে আমরা বহুলভাবে পরিচিত। কেউ কাউকে কাউকে অসৎ উপায়ে প্রতারণা করলে বা ঠকিয়ে নিলে আমরা এই শব্দগুলো ব্যবহার করি। কিন্তু আমরা কি জানি, এই শব্দগুলোর কীভাবে এই বাংলা শব্দের ভান্ডারে নিজেদের যুক্ত করে নিয়েছে?
তখন ব্রিটিশ শাসন চলছে। কিংবা তারও আগে থেকে এই বাংলার বুকে, পথে ঘাটে মানুষ হারিয়ে যেত। পুরোপুরি অস্তিত্বহীন যাকে বলে। যেন সেসব মানুষের কোনো অস্তিত্ব পৃথিবীতে কোনোদিন ছিল না। একদল খুনে ডাকাতের প্রতারণার স্বীকার হয়ে, বিশ্বাস ও ভরসায় নিজেদের সর্বস্ব যেমন হারিয়ে যেত। তেমনই প্রিয় প্রাণটাও খোয়াতে হতো। ইতিহাস তাদের চেনে ঠগী নামে। আর তাদের থেকেই ঠগ, ঠগবাজ শব্দের উৎপত্তি।
“ঠগী কাহিনী” মূলত একজন ঠগের জবানবন্দী। সেই ঠগের বয়ানে উঠে এসেছে তাদের কর্মপন্থা। ঠিক কী কারণে ধর্মান্তরিত হয়ে অন্য এক দেবীর প্রতি বিশ্বাস করে এই খুনে জীবনধারণ? কেন স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথে না গিয়ে খুনি হয়ে ওঠা! সবকিছুই উঠে এসেছে বইটিতে। ১৮৩৯ সালে এক ব্রিটিশ লেখক কর্তৃক রচিত “Confession of a Thugs” বইটিতে আমির আলী নামক এক মুসলিম ঠগের জবানি লিপিবদ্ধ হয়। তারই রূপান্তর “ঠগী কাহিনী” রচনা করেন প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়। সেবা প্রকাশনী থেকে একই বইয়ের অনুবাদ হিসেবে আছে “ঠগীর জবানবন্দী”।
আমির আলী একজন মুসলিম। তারপরও কেন ভবানী দেবীর নামে এই পূজা? নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া? তার কারণ আমার যা মনে হয়— মানুষ হিসেবে আমরা ধৈর্যশীল নই। খুব সহজ কোনো উপায়ে উপরে উঠতে চাই, অর্থ উপার্জন করতে চাই। মূলত এই চাওয়ায় সংক্ষিপ্ত পথ খুঁজতে গিয়ে মানুষ অপরাধ করে, অন্যায় করে। আর সেখানে যদি ধর্মের বাণী ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তো কথাই নেই। ধর্মের বিষয় সবসময়ই স্পর্শকাতর। সেখানে মানুষের মন ঘুরিয়ে দেওয়া সহজ। আধুনিক যুগেও যেখানে ধর্মের নামে অনুযোগ, প্রভাব বিস্তার চলে; সেখানে অতীতে যে আরও বেশি চলেছে তা অনুমেয়। হয়তো এ কারণেই ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের হলেও একই দেবীর ছত্রছায়ায় চলে আসা যায়। হিন্দুদের জন্য বিষয়টা সহজ হলেও, আল্লাহকে পরিত্যাগ করে এক দেবীর উপর বিশ্বাস স্থাপন অনেকটাই কঠিন।
একে অবশ্য ধর্মান্তরিত বলা যায় না। কেননা ভবানীর পূজা করলেও, সময়ে অসময়ে ঠিক নামাজ পালনের মতো ইবাদত করতে দেখা যেত। তাদের কাছে মানুষকে ঠকিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও খুনের মতো কাজ ছিল এক প্রকার ধর্ম। সেই ধর্মের কারণেই তারা মনে করত, তাদের এই অমানবিক কার্যকলাপ কখনোই অন্যায় হিসেবে গণ্য না। তারা একে দেবীর আশীর্বাদ মনে করত। দেবীর নামে মানুষ বলি দিলে কি আর অপরাধ হয়? তাই শত সহস্র প্রাণ হরণের পরও ওদের মাঝে কোনো অনুশোচনা দেখা যেত না। শেষ দিন পর্যন্ত তারা আত্মতুষ্টিতে ভুগত। যদি কোনো অপকর্ম শেষে ধরাও পড়তে হতো, দেবীর নিগ্রহ হিসেবে মেনেও নিত। ফলে কখনোই তাদের কাছে এই কৃতকর্ম অপরাধ বা দোষের, কখনোই মেনে নিত না।
সেই সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা এত সহজ ছিল না। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে অনেক কাঠখড় পোড়ানো হতো। পথে অনেক বিপদ ওঁত পেতে থাকত। প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা বন্য কোনো জন্তু জানোয়ারের ভয়, দস্যু ডাকাতের দল ছিল সর্বক্ষেত্রে। সবচেয়ে ভয়ংকর হয়তো ছিল ঠগীর দল। তাদের পাল্লায় একবার পড়লে আর বেঁচে ফেরার উপায় নেই। তাদের কাছে এই কর্ম ছিল ধর্মের মতো। তারা মনে করত, তারা যা করছে সবই ভবানীর আশীর্বাদে। আর ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্যায়কেও যৌক্তিক প্রমাণ করার ঘটনা বর্তমানেও অহরহ। ‘ঠগীধর্ম’-এর মূল বিষয় মানব হত্যা! ভারতবর্ষের পথে প্রান্তরে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করলে যে সেই বিপদ নিজের উপরও পড়তে পারে সেটা কয়জন বোঝে? এত মানুষের চোখের পানির ফল হয়তো নিজেকেও বহন করতে হয়।
যেহেতু বইটি আমির আলী নামক একজন ঠগের জবানি, সেহেতু পরিণতি হয়তো আন্দাজ করা যায়। এখানে উঠে এসেছে আমির আলীর জীবন। সে-ও পরিস্থিতির স্বীকার। তার বয়ানে জানাজায় কীভাবে এই ঠগীদের দল পরিচালিত হয়, কীভাবে একজন সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে ঠগের মতো নির্মম। জানা যায়, তাদের এই ধর্মের মূল ভিত্তি। আমির আলী বর্ণনা করেছেন তার শৈশব থেকে শেষ দিন অবধি। কত প্রবঞ্চনা, ছলনা মিশে আছে এর সাথে! কীভাবে এ কার্য পরিচালনা হয়, সেটাও ব্যাখ্যা করেছেন। নিজ পরিবার, প্রিয় কন্যা বা সহধর্মিণীর গল্পও বলেছেন। অন্যের ক্ষতি করলে সেই ক্ষতি একসময় নিজেরও হয়, আমির আলী হয়তো শেষবেলায় বেশ ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের সাধু ভাষায় রচিত “ঠগী কাহিনী” বইটি পড়তে কিছুটা অসুবিধা ও সময় লাগলেও বেশি উপভোগ করেছি। এই বইটির মাধ্যমে জানা যায় ঠগীদের এক অদ্ভুত জীবনের কথা। কী ভয়ংকরতা ও বিভৎসতা লুকিয়ে আছে এর মধ্যে। লেখকের লেখায় যা খুব দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। সাধু ভাষায় রচিত যে কোন বইয়ে আমার সবচেয়ে যে বিষয়টি ভালো লাগে, তা শব্দচয়ন। মুগ্ধ হয়ে পড়েছি, অনুভব করেছি। সবচেয়ে দুর্দান্ত কাজ দেখিয়েছে উপকথা প্রকাশন। সম্পাদনা জনিত ত্রুটি এই বললেই চলে। দু-একটা ছাপার ভুল থাকলেও, তা আমলে না নেওয়া যায়। প্রোডাকশন কোয়ালিটি অসাধারণ। সব মিলিয়ে সেরা কাজ দেখিয়েছে প্রকাশনীটি।
পরিশেষে একটা তথ্য দিয়ে শেষ করি। এই ভারতবর্ষে ঠগীদের দৌরাত্ম্য কতটা ছিল, তার একটা পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। ১৮৩১ সাল থেকে ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত যাদের ঠগী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, সে সংখ্যা ৫০৬৬। তাদের মধ্যে পালিয়ে গিয়েছে ১৮০০ জন। এছাড়া কেউ রাজসাক্ষী হয়েছে, কেউ খালাস পেয়েছেন আবার যাবজ্জীবন, ফাঁসি, মৃত্যুর ঘটনায় সংখ্যাও কম নয়। যে আমির আলীর জবানবন্দী নেওয়া হলো, সে প্রায় ৭১৯ জনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। হয়তো অনুমান করা যায়, কত সংখ্যক মানুষ এই ভারতবর্ষের বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। কোথায়? কেউ জানে না!
মাত্র এই কয়েকটা শব্দের উচ্চারণে প্রাচীন ভারতবর্ষ থেকে একেবারে বিলীন হয়ে গেছে কত লক্ষ প্রাণ তার সঠিক হিসেব নেই। শুরুর দিকে তো কেউ জানতোই না। অদৃশ্য থেকেই বলা যায় মাটির এই দুনিয়া থেকে কোনো রকম চিহ্ন না রেখেই বিলীন হয়ে যেত তাজা প্রাণ। কারা করতো এমন নিখুঁত কাজ?
ইতিহাসে আমরা তাদের ❛ঠগী❜ নামে চিনি। সমীক্ষা আর ইতিহাস বলে প্রাচীন ভারতে আনুমানিক ১৩ শতক থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত ভয়ানক খু নে দল ❛ঠগী❜ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। এরপর ব্রিটিশ অফিসার উইলিয়াম হেনরি স্লীম্যানের তৎপরতায় একে একে এই খু নে দলকে পাকড়াও করা হয় এবং ইতিহাসের সবথেকে ভয়াবহ এই দলকে নিঃশেষ করা হয়। জানা যায় ১৭৪০-১৮৪০ এমন সময়ের মধ্যে ঠগীরা প্রায় দশ লক্ষের মত মানুষকে মৃ ত্যু র দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে। সাথে লুণ্ঠন তো ছিলোই।
কিন্তু কেন তারা এই কাজ করে? অভাব, লোভ বা ক্ষমতার জন্য? নাহ্, তাদের কাছে হলুদ রুমালের মধ্যে রূপার কয়েন দিয়ে মা র ণ প্যাঁচ দেয়া একটা শিল্প, একটা ধর্ম। যে ধর্মের নাম ❛ঠগী ধর্ম❜। ভবানীর পৃষ্ঠপোষক এই দলে শুধু হিন্দু আছে এমন না। আছে মুসলিম। ধর্ম ত্যাগ না করেও তারা সবাই এক ঠগী ধর্মে দীক্ষিত। কিন্তু আপন আপন ধর্ম তথা মুসলিম তার নামাজ, রোজা ঠিকই করে! শুনলেই কেমন অদ্ভুত লাগে না? কিন্তু এটাই তাদের কাছে স্বাভাবিক। তারা মনে করে ভবানী তাদের মনুষ্য হ ত্যা য় নিয়োজিত করেছেন এবং তাদের সেসকল সম্পদ, অর্থ সহ বাকি দ্রব্যের প্রতি তাদের হক আছে।
এমনই এক ঠগ তথা ঠগী সরদার আমির আলি। যে ১৯ শতকের ত্রিশের অথবা বিশের দশকে কর্ণেল মেডোজ টেলরের কাছে ধরা পড়ে। এরপর স্বাক্ষী হয়ে বহু ঠগীকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করে। তার স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে কর্ণেল ❛Confessions of A Thug❜ বইটি রচনা করেন। আমির আলির জবানিতে এসেছে তার শৈশব থেকে বৃদ্ধকাল পর্যন্ত অনেক ঘটনা, ঠগী হবার এবং সে সময়ে কী করে প্রাণ হন্তরকের কাজগুলো করেছে তার বর্ণনা। এসেছে তার প্রণয় জীবনের ঘটনাও। উত্থান থেকে পতন সব ঘটনাই তার দীর্ঘ জবানিতে বর্ণিত হয়েছে। আমির আলি কি ভাগ্যের পরিহাসে একজন ঠগী হয়েছিল? যার নিজের মূল ইতিহাস সম্পর্কে সে জীবনের গুরুভাগ সময়েই অজ্ঞাত কিংবা বিস্মৃত ছিল। আমির আলি যে কি না শৈশবে নিজে এবং তার পরিবারই ছিল ঠগী দলের বী ভৎস তা র শিকার। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় সেই শৈশবে ঠগীদের থেকে জীবন পেয়ে তাদের সাথে থেকেই ক্রমে কী করে সেও একজন পাক্কা ঠগী সর্দার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে সে ঘটনা গুলো জানলে হতবাক হয়ে যেতে হবে।
অতীতের প্রযুক্তিবিহীন জমানায় যখন মাইলের পর মাইল পথ পদব্রজে, পালকি কিংবা ঘোড়ায় পাড়ি দিতে হতো তখন বন্ধুর মনোভাব নিয়ে একদল লোক বিপদসংকুল পথে সাহারা দেবার নাম করে একত্র হতো। একসময় ❛ঝিরণী❜ সংকেতের মাধ্যমে অমোঘ সেই রুমালাস্ত্র দিয়ে প্রাণনাশ করে পথিকের অর্থ, দ্রব্য নিজের করে নিতো তার ঘটনাগুলো আমির আলি নিজের ঠগী জীবনের কৃতকর্মের মাধ্যমে বলেছেন। যে একাই তার এই জীবনে ৭১৯ টি প্রাণ শেষ করে দিয়েছে এবং এ-ও বলেছে এই পেশায় থাকাকালীন একবার ১২ বছরের কারাবাস করতে না হলে সে সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেত! এত অন্যায়, খু ন, লুণ্ঠনের পরেও আমিরের মতো হাজার হাজার ঠগী অনুশোচনায় ভুগতো না। কারণ তাদের মতে তারা ভবানীর নির্দেশেই এমন কাজ করছে। তাইতো কয়েকবার ধরা পড়ে, বন্দী থেকে, একবার এক যুগ কারাবাস করে এরপর আবারও একই কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করতো। এমনকি এক সময় পিতা (যে কি না নিজেও একজন ঠগ সর্দার ছিল। আমিরের পালিত পিতা), স্ত্রীর নির্মম মৃ ত্যু তে ও শোকে মূর্হমান হয়ে পড়েছিল, আদরের কন্যার থেকে আলাদা হতে হয়েছিল তারপরেও আবার একই পেশায় ফিরে গিয়েছিল সে। কী বলা যায় একে? ❛কয়লা যায় না ধুইলে, খাইসলত বদলায় না ম র লে❜ এমনটা ই আখ্যা দেয়া যায় মনে হয়। যা কিছু হয়ে যাক রুমালের প্যাঁচে প্রাণ সংহার করাটাই তাদের নেশা, পেশা, ধর্ম। এমনকি হতেও পারে তার রুমালের দক্ষতাতেই তার অজানা পরিবারের কোনো সদস্যের প্রাণ গেছে। কিন্তু শৈশব সম্পর্কে বিস্মৃত আমিরের সে সম্পর্কে কোনো ধারনাই নেই!
ইংরেজ বাহিনী কর্তৃক ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত আমির এক পেশায় বলবত ছিল এবং কখনো কখনো মনে একটু দয়ার সঞ্চার হলেও ঠগ ধর্মের কাছে সব ফেলনা ছিল। তবে জীবনের ক্রান্তিকালে বা সায়াহ্নে পৌঁছে কিসের তাড়নায় সে স্বাক্ষী হয়ে আপন ধর্মীয় লোকেদের ধরিয়ে দিতে সাহায্য করেছে তার কারণ জানা নেই। হয়তো ব্রিটিশ বাহিনীর তৎপরতা বা জীবনের মায়া!
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
কর্ণেল মেডোজ টেলরের লেখা বই ❛Confessions of A Thug❜ একজন ঠগী আমির আলির জবানির উপর ভিত্তি করে লেখা। বইটি ১৮৩৯ সালে প্রকাশিত হয়। এই বইটির অবলম্বনে বাঙালির প্রথম গোয়েন্দা কাহিনী লেখক দারোগা প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় দুই খন্ডের ❝ঠগী কাহিনী❞ বইটি রচনা করেন। সরাসরি অনুবাদ বলা যায় না। দারোগা সাহেব মূল জবানিকেই তার নিজস্ব ভাষায় লিখেছেন।
বইটি সাধু ভাষায় রচিত। তাই পড়তে অবশ্যই কষ্ট হয়েছে। তবে সাধু ভাষা মাত্রেই সুন্দর। কঠিন হলেও তাতে যে ভাব, মাধুর্য আছে তা অবর্ণনীয়। ইতিহাসের ভয়ানক খু নে দলের একজন সর্দারের জবানী সাধু ভাষা পড়তে যে ভাবের উদয় হয়েছে সেটা দারুণ। ঠগী নিয়ে আগে একটা নন ফিকশন এবং দুইটা বা তিনটা ফিকশন পড়েছি তাই তাদের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে বেশ ভালো ধারনাই ছিল। তবুও এই বইটা পড়া থেকে নিজেকে থামাতে পারিনি। ঠগীদের কাহিনি ঢালাওভাবে পড়া, জানার অভিজ্ঞতা ছিল একরকম। আর একজন ঠগীর জবানিতে তার পুরো জীবনের ঘটনা এবং এই পেশার সম্পর্কে জানা, তার নিজস্ব আবেগ-অনুভূতি, সংসার জীবন, প্রণয় সব মিলিয়ে পড়তে অনেক ভালো লেগেছে। যদিও টানা সাধু ভাষায় পড়তে একটু কষ্ট হয়েছে তবুও অভিজ্ঞতা ভালো।
ঠগী সম্পর্কে মোটামুটি সকলের ধারনা আছে। তাদের নিয়ে বিভিন্ন ইতিহাস, সত্য-মিথ্যা, ইতিহাসের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অনেকেই অবগত। এই বইটি পড়লে নতুন তথ্য না জানলেও একই বিষয়কে একজন নির্দিষ্ট ব্যাক্তির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জানা যাবে। আমার মনে হয়েছে আমির আলি প্রথম দিকে যেমন মুসলিম ধর্ম নিয়ে দ্বিধায় ছিল, ঠগ ধর্মে দীক্ষিত হয়েও সে ধর্মের প্রতি কখনো বা কোনো মুহূর্তে সন্দেহপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলো। তার চরিত্রের মধ্যে কমপ্লেক্সিটি ছিল মনে হয়েছে। বিশেষ করে প্রণয়ের ব্যাপারগুলোতে। জুরা কিংবা সফিরনের ব্যাপার আমার কাছে বেশ অদ্ভুত ঠেকেছে।
লেখক বইটিকে মূল বই থেকে কিছুটা সংক্ষেপিত আকারে লিখেছেন তবে তাতে আমার মনে হয়নি তথ্য, ঘটনা জানায় কোনো খামতি হয়েছে। দুই খন্ডের বইটিতে তিনি দারুণভাবেই ভয়ানক সে ঘটনার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেছেন। কিছু তালিকাও দিয়েছেন। আমার কাছে সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ইংরেজ কর্ণেলের লেখা বইটির অনুবাদও আছে। আশা করি একসময় সেটাও পড়ে ফেলবো। বইটি আপনি নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন। সময় ভালো যাবে, না হতবাক হয়ে যাবে সেটা আপনার উপর নির্ভর করছে!
প্রোডাকশন:
উপকথা প্রকাশনী ক্লাসিক বই বের করার নির্ভরযোগ্য একটি প্রকাশনী। ❛দামে কম মানে সেই❜ ধরনের বই প্রকাশ করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে তাদের জুড়ি নেই। এই বইটিও তাদের অসাধারণ প্রোডাকশনের একটি উদাহরণ। বইটির বাঁধাই থেকে শুরু করে সম্পাদনা, প্রচ্ছদ সবকিছু প্রশংসা করার যোগ্য।
পথে প্রান্তরে অর্থ-সম্পদ নিয়ে চলার পথে কেউ যদি যেচে আপনার উপকার করতে চায় তবে সেই অতীতকালের সময়ে থাকলে আপনার হৃদয় কি একটুও সন্দেহ করবে? প্রাণের ভয় জাগরিত হবে? না হাসিমুখে সে সাহায্য গ্রহণ করে রুমালের প্যাঁচে ভবলীলা সাঙ্গ করে মাটির নিচে চাপা পড়বেন? ভাবলেই শিউরে ওঠা অনুভূতি হয় না?!
'ঠগ বাছতে গা উজাড়।' পুরো ভারতবর্ষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এই দুর্ধর্ষ ঠগীরা। খাতাপত্রের হিসেবে মোঘল সম্রাট আকবরের সময়কাল হতে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত অগণিত মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ঠগীরা। ব্রিটিশ সরকার ঠগীদের দমন করতে উদ্যোগ নেয় এবং সফলতা পায়। কর্ণেল মেডোজ টেলোরের হাতে আমির আলী নামক একজন ঠগী ধরা পড়ে এবং তার জবানবন্দী থেকে 'Confession Of A Thug' নামে একটি বই লিখেন। ঠগী কাহিনী ঠিক সেই বইটির অনুবাদ না, তবে সেই বই অবলম্বনেই প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় দুই খণ্ডের বইতে আমির আলী ও ঠগীদের কর্মকাণ্ডকে হাজির করেছেন।
ঠগীদের উৎপত্তি কীভাবে? পেছনে তাকালে দেখা যায়, ধর্মীয় বিশ্বাসের পরম্পরায় তারা ঠগী জীবন বেছে নিয়েছিল। তারপর খুব সহজেই অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে ঠগী জীবনেই নিজেদের এবং উত্তর পুরুষদের স্থায়ী করে নেয়। ঠগীদের ধর্ম বিশ্বাস অনেকটা জোড়াতালি দেওয়া। তারা যেমন নিজেদের হিন্দু দেব-দেবীর পূজারী হিসেবে পূজা দেয়; আবার মুসলিম হিসেবে নামাজও পড়ে। নির্দিষ্ট করে বললে তারা প্রচলিত কোনো ধর্মের অনুসারী না। তাদের একটাই ধর্ম, তারা ঠগী।
আমির আলী ধরা পড়ার পর একজন মানুষ থেকে একজন ঠগী হয়ে উঠার গল্প বর্ননা করে। সেই সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। পায়ে হাঁটা কিংবা গরুর গাড়িতেই চলাফেরা করতে হতো। আপনি হয়তো একজন ব্যবসায়ী কিংবা পরিবার নিয়ে তীর্থে যাচ্ছেন; সঙ্গে ধন-সম্পদ কম বেশি আছে তাই রাস্তাঘাটে খুব সাবধানেই চলাচল করেন। পথিমধ্যে দেখলেন আরো একটি দলও আপনাদের গন্তব্যেই যাচ্ছে। এক কথায় দুই কথায় তারা আপনাকে তাদের সাথে চলার আমন্ত্রণ জানালো এবং আপনি সরল বিশ্বাসে তাদের সাথে যেতে সম্মতি দিলেন। সন্ধ্যা হওয়ায় পথেই কোথাও তাবু খাটালেন রাত কাটানোর জন্য। কিন্তু পরদিন ভোরের সূর্য আর দেখতে হলোনা । এভাবেই ভারতবর্ষ থেকে অগণিত মানুষ কালের গহ্ববরে হারিয়ে গিয়েছে। তাদের পরিবার লাশের সন্ধানটুকুও পায়নি।
আমির আলী নিজে ছিল পালিত সন্তান। বড় হয়ে উঠলে তার আসল পিতা-মাতা সম্পর্কে জানতে পারে। তার পিতা-মাতাও ছিল ঠগীদেরই শিকার। অথচ আমির আলী নিজেই একজন ঠগী হয়ে উঠেছিল। নিজ হাতে ৭১৯ জন মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল সে। এ থেকেই বোঝা যায় ঠগীরা সারাদেশে কী পরিমাণ মানুষকে গায়েব করে দিয়েছিল। তাদের আচার ব্যবহার দেখে কেউই সন্দেহ করতে পারতোনা। খুব সহজেই মানুষের সাথে মিশে যেত তারা। সুযোগ বুঝে পুরো দলটাকেই মৃত্যুমুখে ঠেলে দিত । ঠগীদেরও ছিল নিজস্ব সংস্কৃতি। তারা পালা করে উৎসব করতো, বিয়ের অনুষ্ঠান করতো এবং তাদের নিজস্ব ভাষা ছিল।
দুই খণ্ডে লিখিত ঠগী কাহিনীর ভাষা সাধু প্রকৃতির। তাই কিছুটা ধীরগতির লাগতে পারে। তবে রোমহষর্ক বর্ননা থ্রিলারের মতোই অনুভূতি দিবে। কত নিয়ম নীতির মাধ্যমে একটি খুনে দলের সৃষ্টি হয়েছিল ভাবতেই অবাক লাগে। ঠগীদের নিয়ে শ্রীপান্থ ও রবিন জামান খানের বইতে পড়েছিলাম। তবে এই বইটি একজন ঠগীর বর্ননাতেই লেখা বলে ব্যতিক্রম ছিল। ঠগীদের নিয়ে আগ্রহ থাকলে এই বইটি আপনাদের ভালো লাগবে। হ্যাপি রিডিং।
“ঠগ” শব্দ শুনলেই আমাদের মনে এক প্রতারকের ছবি ভেসে উঠে। যে হাসিমুখে খোশগল্প করেই নিরীহ মানুষের সর্বস্ব লুট করে নেয়। কিন্তু ভারতের ইতিহাসে যাঁরা আসল “ঠগ” নামে পরিচিত ছিলো, তারা কিন্তু শুধুমাত্র লুট করেই শান্ত হতোনা। একেবারে কুড়ি তিরিশ পথচারী বা ব্যবসায়ীর দলকে হ*ত্যা করে কবর দিয়ে দিতো। তাঁদের হ*ত্যা*র পদ্ধতি এতটাই নিপুণ ছিলো যে একফোঁটা রক্ত বের হতোনা মৃ*তব্যক্তির শরীর থেকে। এদের মত নিষ্ঠুর আর নিপুণ খু*নী*র দল শুধু ভারতে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। আঠারো-উনিশ সাল পর্যন্ত এই একশোবছরে তারা প্রায় কুড়ি লক্ষ মানুষকে হ*ত্যা করেছে এবং তাঁদের লুট করেছে তাও এমন ভাবে যে তার খোঁজ কাকপক্ষীতেও টের পায়নি। কিন্তু কারা ছিলো এই ঠগী? কি ছিলো তাঁদের পরিচয়? আর তা নিয়েই প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখা “ ঠগী কাহিনী”।