পঁচিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক মৃত্যুর সামনা-সামনি আবার দাঁড়াতে চেয়েছিল প্রবুদ্ধ। সে ফিরে এসেছিল পঁচিশ বছর পর, আর দেখেছিল দত্তদের বাড়িটা তার অপেক্ষায় এখনও দাঁড়িয়ে, যেমন অপেক্ষায় আছে পদ্মিনী, আছে বাবলি, ডরোথি, ডেরেক, ঘেন্টু। ঝরে যাওয়া সময়কে ধরার অক্ষম চেষ্টায় সে বুঝেছিল অমীমাংসিত রহস্যদের খুঁড়ে বার করে আনতে গেলে তাকে আবার দাঁড়াতে হবে সেই বিভীষিকার সামনে, যা তাদের জীবন পালটে দিয়েছিল। কিন্তু প্রবুদ্ধর তখন আর ফেরার উপায় ছিল না।
"ma. you once told me that memory is a choice. but if you were god, you'd know its a flood." _ocean vuong, on earth we're briefly gorgeous
উপন্যাসে ভূত আছে। ওই পর্যন্তই। কোনো ভৌতিক আবহ নেই।"ভূত " এর শাব্দিক অর্থ অতীত। ডেরেকের ভূত এখানে গল্পের কুশীলবদের অতীতকে নির্দেশ করছে। ডেরেক খ্রিষ্টান ও ধার্মিক। ব্যক্তি ডেরেক শৈশব, সারল্য ও নিষ্পাপতার প্রতীক। মানুষ নিজের সারল্যকে খুন করে বড় হতে যেয়ে, কেননা সেটাই প্রকৃতির নিয়ম। ডেরেক আত্মহত্যা করে। "কেন" সেই প্রশ্নটি রহস্যাবৃত। তার মৃত্যুর সাথে সাথে তার বন্ধুবান্ধবদের শৈশবের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে। তীব্র অনুশোচনাবোধ সবার জীবনকে আবদ্ধ করে। ডেরেকের ভূতকে দেখা যেতে থাকে। শুধু তার বন্ধুরাই তাকে দেখতে পায়। "এখানে ডেরেক বসে আছে" অতীত নিয়ে পরিতাপ, শৈশবের অপাপবিদ্ধতা হারানো ও দায়মোচনের গল্প। আমাদের সবার জীবনেই ডেরেক বসে আছে (যাকে আমরা ছাড়া কেউ দেখতে পাই না), যা তীব্র অনুশোচনায় আমাদের বিদ্ধ করে আর জীবনকে থমকে দ্যায়। কিন্তু নিশ্চুপ অনড় ভূতকে বসে থাকতে দেওয়া আমাদের জীবনধর্ম নয়, হওয়া উচিত নয়। বাঁচতে হবে এবং ডেরেকের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে; বেঁচে থাকা মানুষজন আদৌ ডেরেক তথা নিজের অতীতের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারলো কি না সেটারই উত্তর আছে উপন্যাসে।
প্রতিটা দৃশ্যের মাঝে একটা গোপন শ্বাসচক্র লুকিয়ে থাকে। আর এই গোপন শ্বাসচক্র নিয়ন্ত্রণ করে ওই দৃশ্যের মাঝে থাকা সবকিছুর গতিবিধি। তাই সময়ের ব্যবধানে একই জায়গার দুটো ছবি যখন দেখা হয়,তখন ফারাকটা চোখে পড়ে। ধরা যাক, একটা গতানুগতিক মাঠ। তার একপাশ দিয়ে গা ঘেঁষে চলে গেছে আন্তর্জাতিক সড়ক। ঠিক যে জায়গাটায় সড়কটা সুঠাম যুবক থেকে কুঁজো বুড়োর মতো বেঁকে গেছে,সেখানে দু-চারটে বাড়ি। মাঠে অঘ্রাণের কাটা ধানের নাড়া ছড়িয়ে। এই বর্ণিত দৃশ্যটাই দিনের একেক সময় একেকরকম থাকে। সকালবেলা রাস্তা দিয়ে ঝুঁটিবাঁধা মেয়ে শিশুরা দলবেঁধে স্কুলে যায়। রোদ পোহানো বিকেলের ফুটবল খেলা শেষে ছেলেরা ঘরে ফিরলে কানীবকের ঝাঁক উড়ে যায় নিজ নিজ মঞ্জিলে। একটু রাতের দিকে মাঠের বুকে কুয়াশা নেমে আসে যখন,তখন সমগ্র বাংলাদেশ ৫ টন, সাধারণ পরিবহন, ১০০ হাত দূরে থাকুন, আমাকে ডিজেল দিন লেখাগুলো শরীরে ঝুলিয়ে দূরপাল্লার ট্রাকগুলো সশব্দে বেরিয়ে যায়। প্রতিদিনের দৃশ্যই একটু একটু করে পাল্টে যায় দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে। হয়তো সেই বাঁকের বসতিগুলো আরেকটু এগিয়ে আসে। একটা দোতলা বাড়ির বারান্দায় চা হাতে প্রবীণ দম্পতিকে বসে থাকতে দেখা যায়। বাড়ির সামনের বাগানে গন্ধরাজের ম ম গন্ধ মেখে খেলে এক চার বছরের শিশু। তারে শুকায় রঙবেরঙের শার্ট, সালোয়ার,কামিজ। ‘এখানে ডেরেক বসে আছে’ উপন্যাসে শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য এমন দুই সময়ের ব্যবধানে একটা মহল্লার গোপন শ্বাসচক্রকে ধরতে চেয়েছেন।
পঁচিশ বছর পর নিজের ছেলেবেলায় ফেলে আসা মহল্লায় ফিরেছিলো প্রবুদ্ধ। জোড়া ছাদের বাড়িটার পেছনে, যেদিকটায় প্রবুদ্ধদের ঘর ছিল, তার সামনে একফালি জায়গা ছিল, একটা টগর গাছ ছিল সেখানে। ঘুরে এসে গাছটাকে দেখতে পেল না। কিন্তু রাস্তার ওপারে, বাবলিদের বাড়ি পার হয়ে যেখানে একজন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকত, তাদের ঘরটার পেছনে মস্ত জংলা ডাঙা, রাজ্যের আবর্জনা, মোচার টুকরো, কলার খোসা, ফালতু কাগজ আর রক্তাক্ত ন্যাপকিন আর ছেঁড়া চুলেরা জড়ো হত যেখানে, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকত একটা পদ্মিনী প্রিমিয়ার। অখিল দত্তর শখের গাড়ি ছিল, কিন্তু তাদের ছোটোবেলাতেই তার কাজ ফুরিয়েছে, স্টার্ট নিতে চাইতো না। গাড়িটাকে ওখানে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার গায়ে লতাপাতা গজিয়ে উঠেছিল। আজ সে দেখল, একটা কঙ্কাল দাঁড়িয়ে, বুনোঝোপে ভরতি তার শরীর। মাটির ভেতর অর্ধেক বসে গেছে পদ্মিনী। আসল রং কবে হারিয়েছে আর দাঁত খিঁচিয়ে হাসছে মরচে ধরা লোহার সম্ভার। গাড়িটার ভেতর অন্ধকার, অবিরল বৃষ্টিতে আশপাশ ধোঁয়া লাগছিল। ভেতরে কেউ আছে মনে হল। প্রবুদ্ধকে দেখে ছায়াটা নড়ে উঠে একবার। ডেরেক আইয়ার গোমস ওখানে বসে থাকে, যে ডেরেক আইয়ার গোমস মরে গেছে পঁচিশ বছর আগে।
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য দুটো ভিন্ন সময়ের এই ছবিগুলো তুলেছেন সন্তর্পণে। দৃশ্যগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বিমূঢ়তার ভারে মূক হয়ে যেতে হয়। চোখের সামনে চুঁয়ে পড়া মরা আলোর সাথে পাক দিয়ে পুরোনো দিন নামে। সোডিয়াম বাতির টিমটিমে আলোয় ড্যাম্প ধরা দেয়ালে টিকটিকির সবজেটে চোখের খোলাবন্ধ হওয়ার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে যেতে হয়। অক্ষর দিয়ে এমন ছবি আঁকা সহজ নয়। পাঠককেও স্থির হয়ে অনুভব করতে হয় এই দৃশ্যের মাঝে লুকানো হৃৎস্পন্দন।
‘এখানে ডেরেক বসে আছে’ উপন্যাসটি তাই শুধু ছেলেবেলার ট্রমাকেন্দ্রিক নয়। প্রবুদ্ধ নামের এক ছেলের অতীত স্মৃতিতে ডেরেক আইয়ার গোমসের আত্মহত্যা উজ্জ্বল হয়ে আছে। ডেরেক ভূত হয়ে ফিরে আসে। এই ভূত আক্ষরিক অর্থে ভূত নয়,‘অতীত’। মানুষ প্রকৃতির নিয়মে বড় হতে হতে নিজের সারল্য খুইয়ে বসে। এই সারল্য খোয়ানোর গতানুগতিক নিয়মে টাল খেয়ে ডেরেক কেন যে নিজের প্রাণ নিয়েছিলো সেই গভীর অথচ অজ্ঞাত প্রশ্নটা খোঁজার চেষ্টা করেছেন শাক্যজিৎ।
এই উপন্যাসের অ্যাটমোস্ফিয়ার ভীষণ মরবিড। ভাষার অত্যন্ত ছুঁচালো ধারে নর্দমার পাশে দাঁড়িয়ে হড়হড় করে বমি করা,মলত্যাগ করার কথা অকপটে লেখায় সিঁধিয়ে দিয়েছেন লেখক। বিষয়বস্তু দূরে থাকুক,শুধু ভাষার বিবর্তন,বর্ণনাভঙ্গি খেয়াল করলেই বোঝা যায়‘কুরবানি অথবা কার্নিভাল’ নামের রাজনৈতিক উপন্যাসের লেখক শাক্যজিৎ আর ‘বীরেশ্বর সামন্তর হত্যা রহস্য’,‘এখানে ডেরেক বসে আছে’ বইয়ের শাক্যজিৎ দুজন একই মানুষ হলেও বইগুলো একটা আরেকটার কাজিন নয়। একদিকে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে আছে দারিদ্র্য,অন্যদিকে বড়লোকদের সন্তানদের সাথে নিত্য ওঠাবসায় নিজের অপারগতার, অভাবের কথা পলে অণুপলে শিশুমনকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে। বিমল করের ‘মানবপুত্র’ গল্প যারা পড়েছেন, তারা হয়তো এই বৈপরীত্যের খানিক আন্দাজ পেতে পারেন। ‘এখানে ডেরেক বসে আছে’ উপন্যাসটি সহজেই আর দশটা কমন ট্রোপের মেলানকোলিয়ায় চোবানো ছিঁচকাঁদুনে জনতুষ্টিবাদী হতে পারতো,হয় নি লেখকের নির্মোহ দৃষ্টিকোণের জন্য। ন্যারেটিভ স্টাইল এমনই মেলানো মেশানো যে সংলাপ-স্বগতোক্তি-পূর্বের ঘটনা-বর্তমানের ঘটনার মাঝে তফাত করতে কষ্ট হয়। চরিত্রগুলোর টানাপোড়েনের সাথে লেখক ইনভলভ হতে চান নি। বরং ওই ছোট ছোট ডিটেইলসে পাঠকের সামনে একটা করে দৃশ্য হাজির করেছেন,স্থির হয়ে নাড়ি টিপে যেন পাঠক টের পায় রক্তপ্রবাহের চোরাস্রোত। অতীত সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকে বুদবুদের মতো উঠে এসেছে। বিস্মরণপ্রবণ,গোল্ডফিশ মেমোরির মানবপুত্রের কাছে শাক্যজিৎ প্রশ্ন রেখেছেন, ভুলে যাওয়া কি এতো সহজ? তুমি কেন ক্লোজার চাও? আমরা সবাই কেন ক্লোজার চাই?
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের সাথে পরিচয় ‘শেষ মৃত পাখি’ দিয়ে। এ বইয়ে দার্জিলিং এর গ্লুমি আবহাওয়ায় একটা রহস্যের সমাধান দেখিয়েছেন তিনি। তবে বইটা সাধারণ কোন রহস্যের জমজমাট থ্রিলার বই না, অন্তত আমার মতে। বইটা তার চেয়েও বেশি ��িছু। অপূর্ব লিখনশৈলীর এ লেখকের ফ্যান আমি ঐ এক বই পড়েই বনে যাই। তাই তার লেটেস্ট বই, ‘এখানে ডেরেক বসে আছে’ নিয়ে আমি ছিলাম খুবই এক্সাইটেড।
শাক্যজিৎ এর কাছে এক্সপেক্টেশন ছিলো শব্দের বুনন দেখার। সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় বইয়ের প্রথম লাইন ‘পঁচিশ বছর পরে যে টিপটিপে বৃষ্টির দুপুরবেলা পরিচিত বাড়িটির উঠোনে প্রবুদ্ধ চুপিচুপি ফিরে এল, সেদিন অখিল দত্ত মরে যাচ্ছিল,’ দিয়ে। আমি সাধারণত এত মনোযোগ দিয়ে বই লাইন বাই লাইন পড়ি না। কিন্তু এই বইটার ক্ষেত্রে পড়লাম। পড়তে গিয়ে মনে হলো, মারা যাচ্ছিলো, মৃতপ্রায় না লিখে মরে যাচ্ছিলো লিখলেন কেন? ভ্রুকুটি করে ভাবলাম, কলকাতার লেখক তার ওপর আবার কবিতার ফ্যান, লেখা তো একটু এরকম কাব্যিক হবেই। যাই হোক ইগনোর করে পড়তে শুরু করলাম। যতই এগোচ্ছিলাম ততই পিছলে যাচ্ছিলাম। দেয়ালের পুরনো শ্যাওলাতে পা দিলে যেমনটা হয়। লেখার ভাষা কিছুটা কঠিন, কিংবা বলা যায় এরকম লেখা পড়ার এক্সপেরিয়েন্স কম বলে বইয়ে দাঁত বসাতে পারছিলাম না। ১১২ পৃষ্ঠার বইতে এই লিখনশৈলীতে ধাতস্থ হতে ৫০ পৃষ্ঠারও বেশি চলে যাচ্ছিলো। কিন্তু যখন মন বসাতে পারলাম তখন মনে হলো, মার্ভেলাস! আর এখানেই বলে রাখা উচিত এই বইটা সবাই উপভোগ করতে পারবেন না সম্ভবত।
গল্পটা ৯০ দশকের (সম্ভবত) কলকাতার অস্বচ্ছল একটি বাড়িকে ঘিরে। বাড়ির বাড়িওয়ালা অখিল দত্ত। আর ভাড়াটে হিসেবে আছে প্রবুদ্ধ, ঘেন্টু, বাবলি, টুকাইদা, ডেরেক ও তাদের প্রত্যেকের ফ্যামিলি। শাখা প্রশাখা হিসেবে ছিলো অখিল দত্তের মেয়ে মোহরদি আর রতন কাকা-কাকী দম্পতি। ৯-১০ বছরের এই বাচ্চাগুলো আর তাদের ফ্যামিলিই এই বইয়ের কুশীলব। আর একটা পদ্মিনী প্রিমিয়ার গাড়ি। নিন্মমধ্যবিত্ত কিংবা আর্থিকভাবে আরো নিচের সারির এই একান্নবর্তী ফ্যামিলি টাইপ বাড়িটাতে যত রকম সমস্যা থাকা সম্ভব ছিলো। টয়লেটের সমস্যা, দেয়ালে নোনা ধরা, একে অপরের সাথে ঝগড়া ঝাটি ইত্যাদি ছিলো নিত্যদিনকার সমস্যা। এর মাঝে খানিকটা স্বচ্ছল বাবলির ফ্যামিলি, তারা থাকে অ্যাটাচড বাথরুমসহ দু রুমের একটা ফ্ল্যাটে। বাকিরা সবাই মোর অর লেস একই রকম। এর মাঝেই সবাই সবাই সাথে খেলাধুলা করে দিন কাটিয়ে দিচ্ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে একদিন আত্মহত্যা করে বসে ভালো মানুষ ডেরেক। আর তারপরই আস্তে আস্তে ভেঙ্গে যায় এ বাড়িটা। চলে যায় টুকাইদা, প্রবুদ্ধরা আর খানিক পরে ঘেন্টুরা। কী থেকে এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো শান্তশিষ্ট, পাড়ার ভালো ফুটবলার ডেরেক? দুর্ঘটনা তো ঘটতেই পারে কিন্তু তাতে করে বাবলির জীবনটা কেন থমকে যায়? কেনই বা প্রবুদ্ধ আজো বিয়ে করেনি? কেন এখান থেকে দূরে কোথাও পালিয়ে আছে টুকাইদা? ডেরেকের ঘটনাটা যে আত্মহত্যা ছিলো তাতে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু প্রভাবক হিসেবে কী ছিলো? সেটা জানতেই ২৫ বছর পর প্রবুদ্ধ ফেরত আসে সেই নোনা ধরা জঙ্গুলে বাড়িটাতে। কিছু কিছু জিনিস বদলে গেলেও বাড়িটা সেই আগের মতই ঠিক জায়গায় বসে আছে। আর বসে আছে, ডেরেক।
১১২ পৃষ্ঠার বইতে উঠে এসেছে অনেক কিছু। বয়ঃসন্ধিকালে শিশুদের মনস্তত্ত্ব, নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণের নিষ্পাপ রুপ, যে কোন ঘটনায় তাদের মনে সে ঘটনার ছাপ, সেটা তাদেরকে কীভাবে ট্রমাটাইজড করে রাখে সারাজীবনের জন্য ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই ১০ বছর বয়সে মারা গেলেও ডেরেক বসে থাকে শিশুদের মনে। আমাদের বেশিরভাগ মানুষের জীবনেই এরকম একটা ডেরেক বসে থাকে, মনের একদম ভেতরে। এই ডেরেকের কাছ থেকে কোথাও দূরে পালিয়ে যাওয়া যায়। ৩৫ বছর বয়সেও যখন পালাতে পারেনি প্রবুদ্ধ, তখন এসেছে তার মোকাবিলা করতে।
বইয়ের গল্পটা বলে গেছে দুজন। প্রথম পুরুষ হিসেবে একজন গল্পকথক আর উত্তম পুরুষ হিসেবে প্রবুদ্ধ বা পাপান। উত্তম পুরুষের ভাষাটা একদম কলকাতার বাচ্চাদের ভাষা। একটাকে ‘অ্যাগটা’, করছিলো কে ‘কচ্ছিলো’ এরকম আর কি। কলকাতার বাংলাভাষী না হওয়ায় শুরুতে ধরতে একটু বেগ পেতে হলেও পরে বেশ উপভোগ করছিলাম। আর প্রথম পুরুষের লেখাটা নরমাল। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে দুই পুরুষের POV যখন পরিবর্তন হয়েছে তখন অ্যাস্টেরিক্স বা কোন রকম সিন ব্রেক দেয়া হয়নি। ধাপ করে এক প্যারায় বর্তমানের কথা বলে চলেছে গল্পকথক, ঠিক তার পরের প্যারায় ২৫ বছর আগের সিন চলে এসেছে, ওখানে গল্প বলে যাচ্ছে ১০ বছরের প্রবুদ্ধ। মিথ্যা বলবো না, শুরুতে এটা প্রচন্ড বিরক্ত লাগছিলো কিন্তু আস্তে আস্তে পড়তে পড়তে ধারণা করলাম লেখক কেন এটা করেছেন। আমার ধারণা তিনি আসলে পাঠককে ধুপধাপ কল্পনায় যেতে বাধ্য করেছেন, মনোযোগ দিতে বাধ্য করেছেন। তাতে করে উপন্যাসটা (নাকি উপন্যাসিকা) খানিকটা হলেও চিত্রনাট্যের রুপ ধারণ করেছে। আমার ধারণা এখানে লেখক একটা জুয়া খেলেছেন। স্রেফ এটার জন্যই বইটাকে আপনি হয় ফেলে দেবেন নতুবা বইটাতে মনোযোগ দিয়ে নিজের কল্পনা শক্তিকে কাজে লাগাবেন। বিশ্বাস করুন, এই বইটাকে উপলব্ধি করতে চাইলে আপনাকে সুপার লেভেলের মনোযোগী হতে হবেই। সেই সাথে ভাষা তো রয়েছেই রেজিস্টর হিসেবে। ক্ষণে ক্ষণে আপনাকে অস্বস্তি বোধ করাবে, খুব একটা রিল্যাক্স রাইড হবেনা বইটা। সুতরাং বইটা আপনার জন্য কিনা সেটা নিয়ে আরো একবার ভাবতে পারেন।
তবে আমার দারুণ ভালো লেগেছে বইটা (বইটা যদি পড়েন আর পড়ার যদি ভাবেন, এই বই ভালো লাগে কীভাবে? হালায় আঁতেল নাকি? ভাবতেই পারেন এবং আমি মনে করি ভাবাটা অস্বাভাবিক না)। লেখক এখানে প্রচ্ছন্ন ভাবে কোন ম্যাসেজ না দিতে চাইলেই অনেকগুলা ম্যাসেজ এমনিতেই চলে এসেছে। আর সবচাইতে যেটা মুগ্ধ করেছে, সেটা হলো বাংলা সাহিত্যে ছোটদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে এইরকম রিচ লেখার প্রয়াসটা। আমার পড়ার গন্ডি অনেক ছোট, এরকম কিছু পড়া তো দূরে থাক আমি নামই শুনিনি কখনো। প্রচ্ছদ ট্রচ্ছদ নিয়ে কোনকালে মাথাব্যাথা ছিলো না, তবে এটার প্রচ্ছদটা বইয়ের ডার্ক গ্লুমি বৃষ্টিস্নাত ব্যাপারটা দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। সুতরাং প্রচ্ছদের একটু তারিফ তো করাই যায়। স্রেফ একটা প্রিমিয়ার পদ্মিনীর আবছা অবয়ব থাকলে একদম জমে যেত।
সবমিলিয়ে, ২০২৪ এর শুরুটা হয়েছে একটা দারুণ বই দিয়ে। আশা করি এই বছরটা বই পড়ার দিক দিয়ে ভালো যাবে। প্রিয় শাক্যজিৎ, আপনাকে ধন্যবাদ। শব্দের মেশিনগানের ব্যবহারে। টার্গেটে একদম বুলস আই। আর Shakil Sultan ভাই আপনাকে ধন্যবাদ, এত ভালো বইটা পড়তে দেয়ার জন্য।
"এখানে ডেরেক বসে আছে" একটা চাইল্ডহুড ট্রমাকে ঘিরে লালিত সাইকোলজিক্যাল ফিকশন। পঁচিশ বছর আগের এক অমীমাংসিত মৃত্যুর রহস্যকে সাথে নিয়ে পরিচিত মহল্লায় ফিরে আসে প্রবুদ্ধ। আবছায়া ও ডিজেলের দমচাপা গন্ধ লেগে থাকা যাত্রার শেষে টিপটিপে বৃষ্টির দুপুরবেলা পরিচিত বাড়িটির উঠোনে দাঁড়িয়ে যেন নিজেকেই অপরিচিত মনে হয় ওর। এতগুলো বছর পর পরিচিত মানুষদের সান্নিধ্যে জীবন ফিরে পায় হারিয়ে যাওয়া কিংবা জোর করে মুছে ফেলা সব স্মৃতিরা।
নস্টালজিয়ায় মোড়ানো, বিষণ্ণ এই উপাখ্যান স্বস্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অবসাদে ভোগায়।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে তেমন গভীরতা উপন্যাসে নেই, কারণ ভাল চরিত্রাঙ্কন বলতে সত্যিই কিছু নেই। প্লটের দিক থেকেও তেমন আহামরি কিছু নয়, কারণ উপন্যাসটার সবকিছু আন্দাজ করা যায় এক��ম প্রথম থেকেই।
শুধু লেখনীতে অনেকটা সৌন্দর্য আছে। যেমনটা আশা করা যায় শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের লেখা থেকে।
উচ্চাশা ছিল অনেকটা। কামিং-অফ-এজের গল্প আমার দারুণ লাগে। সং অফ ইনোসেন্স থেকে সং অফ এক্সপেরিয়েন্সে যাওয়ার যে ব্যাপারটা, অনেকটা মন খারাপ, অপরাধবোধ আর অবার্চীন অনুভূতির মধ্য দিয়ে যে পথটা -- এই নিয়ে সবরকমের লেখা একপ্রকার গিলে খাই আমি।
তবু এই উপন্যাস ভাল লাগল না। এখানে কোনোও রেজোলিউশন নেই, কোনও নতুনত্ব নেই। চরিত্রগুলো সবাই উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত একই রকম থেকে যায়, অপরিণত অবস্থায়, একটা অতীতের রাতে আটকে থেকে। এছাড়াও, চিরক্ষয়ের থিম বইয়ের পাতায় পাতায় রয়েছে, কিন্তু "একানড়ে" আর "নৈশ অপেরা" পড়ার পর সবকিছু কেমন একই ধারার লাগল, এমনকি উপমাগুলোও।
প্লটের দিক থেকে সবথেকে বড় অসংগতি হল ক্যাথলিক ধর্মীয় এক চরিত্রের আত্মহত্যা। অত্যন্ত গোঁড়া একজন ক্যাথলিক মানুষ জেনেবুঝে আত্মহননের পথ বেছে নেবে, যখন সে জানে আত্মহত্যার ফলে নরকে তার চিরন্তন অবস্থান হবে-- এটা আমি মানতে পারলাম না।
শেষমেশ উপন্যাসে সমাজের নিচুস্তরের লোকেদের নিয়ে অনেকটা সেনসেশলাইজেশন রয়েছে। এটা হয়ে থাকে যখন আমাদের মত প্রিভিলেজড মানুষ দারিদ্রতা নিয়ে লিখতে গিয়ে সেটার উপর বিশেষ কিছু ট্রোপ চাপিয়ে দিই। সেই ঝগড়াঝাটি, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, সেই ভাঙা বাংলায় কথা বলা, ড্রেন, নোনাধরা দেওয়াল, ছেড়া জামা, ইত্যাদি। এই ক'দিন আগেই হারবার্ট পড়ছিলাম। সেটার পর এই উপন্যাসে দারিদ্র্যের সমস্ত বর্ণনা পার্ফর্মেটিভ আর্টের মত লাগল, যেন দেখনদারিই আছে, কিন্তু নেই অকৃত্রিম সহানুভূতি।
ডেরেক যখন যেখানে বসে থাকে সেই স্থান-কাল পঁচিশ বছর আগের শহরতলির ঘিঞ্জি ভাড়াবাড়ি ও তার আনুষঙ্গিক — সেখানে রেডিও-মনোরঞ্জন,ভিসিআর-বিলাসিতা ও অন্তর্জাল-পূর্ব সীমিত অধিগম্য নিষিদ্ধতার রহস্যময় ঝলকদর্শন। রেলওয়ের মাঠে,অখিল দত্তর বাড়ির জোড়াছাদের ট্যাঙ্কির তলায়,ডরোথির আধোআলোকিত ঘরের ভিতর অদৃশ্য সীমারেখা শৈশব ও কৈশোরের। মাঠে খেলে বেড়ায় কাদা মাখে গপ্পো জমায় পাপান বাবলি ঘেন্টু টুকাইদাদা ডেরেক। ট্যাঙ্কির তলায় শুয়ে বাবলি পাপান। ডরোথির ঘরে লুকিয়ে উঁকি মারে ডেরেক পাপান টুকাইদাদা বাবলি। ওরা বয়ঃসন্ধির আশপাশে,কখনও কখনও অজানিতে ভীরু পদক্ষেপে ছুঁয়ে আসে সীমারেখা। যে রাতে ডেরেক গিয়ে বসে বরাবরের মতো যেখানে তার বসে থাকার কথা,সেদিনই ওদের অপাপবিদ্ধতা নিথর হয়ে যায় অপঘাতে,শাপগ্রস্ত অহল্যার মতো পড়ে থাকে সময়ের বন্দি হয়ে। পঁচিশবছর পর ফিরে আসে প্রবুদ্ধ,যে শৈশব ও কৈশোরের সীমারেখা অবধি পাপান,যার সঙ্গে সচল অতীত পাপান এখনও ছায়ার মতো লেপটে আছে। সে ফিরে আসে বাবলির কাছে,অখিল দত্তর প্রলম্বিত মৃত্যুর কাছে,ডরোথির বেলেল্লাপনার কাছে এবং সবচেয়ে বেশি ডেরেকের কাছে।
শাক্যজিৎ অতীত লিখেছেন আঞ্চলিক কথ্যভাষায়,সেখানে নাগরিক সাহিত্যের আবরণ নেই,যেমনটা রূঢ় বাস্তবের আঁচড়েকামড়ে বিপর্যস্ত শ্রীহীন নিম্নবিত্তদের থাকে না। বর্তমান লিখেছেন অভিজ্ঞ দাবাড়ুর মতো,চতুরঙ্গে যুযুধান গদ্য ও কবিতা। গোটা উপন্যাসের কথনধারায় গদ্য জিতে এসেছে,কবিতাকে কচিৎকল্পে কয়েকদান জিততে দিয়েছে,কিন্তু যেহেতু সেইটুকু অবসরও গদ্যের ছেড়ে দেওয়া জায়গা,তাই কবিতা এসেছে গদ্য-হৃদয় নিয়ে। বাক্যের গঠন সহজ নয়। পড়তে পড়তে মনে হয়,ক্রিয়া বিশেষ্য বিশেষণ ইত্যাদি টলমল পায়ে ছুটোছুটি করে মিউজিক্যাল চেয়ার খেলছে,ফলে এবড়োখেবড়ো অসমান লেখা তৈরি হয়,অথচ দুটো আলাদা আলাদা সময় অনায়াসে রেলগাড়ির গঠনশৃঙ্খলায় আনুপূর্বিক চলতে থাকে।
প্রবুদ্ধ বর্ষার দিনে অখিল দত্তর বাড়ি যায়,বাবলির সঙ্গে দেখা করে,ডরোথির ঘরে মদ খায়,পরিত্যক্ত ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে একা বসে থাকে এবং এই সবে খুঁজে বেড়ায় ডেরেক কেন মরে গিয়েছিল। প্রতি অধ্যায়ে পাঠককে মনে করিয়ে দেওয়া হয় — তখনও বর্ষা। যেন মনে করিয়ে না দিলে পাঠক ভুলে যাবে,এবড়োখেবড়ো অসমান গদ্যরীতিতে চলতে চলতে উপন্যাসের আসল মনোভূপ্রকৃতি ধরে ফেলবে। 'এখানে ডেরেক বসে আছে' আসলে বর্ষার নয়,নরম পলি-কাদা,স্যাঁতস্যাঁতে ফেঁপে ওঠা ঘরদোর পলেস্তারার নয়। প্রবুদ্ধ ও অন্যান্যদের হঠাৎ একদিন মরে যাওয়া প্রথম কৈশোর,ও তার পরবর্তী পঁচিশ বছর ধরে সেই মৃত্যুর ভার আদতে রুক্ষ শুষ্ক অসবুজ পাহাড়ের ওপর দিয়ে চলা,যেখানে বর্ষা স্বাভাবিক নয়। স্বাভাবিক নয় বলেই সুপরিকল্পিত আবরণ।
কিন্তু এই আবরণের প্রয়োজন কী? এখানেই আলোচ্য হয়ে ওঠে উপন্যাসের বিষয়বস্তু। প্রাককৈশোর-আত্মহত্যার মতো প্রায় অনালোচিত একটা বিষয়কে নিয়ে যখন গল্প লেখার থাকে,তখন খেয়াল রাখতেই হয় বিষয়টাই যেন ইস্যু না হয়ে ওঠে। 'নতুবা বাংলা সাহিত্যে প্রথমবার অমুক তমুক' ইত্যাদি অধুনা সহজলভ্য 'গবেষণাঋদ্ধ' না-গল্পে পর্যবসিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এড়ানোর সম্ভাবনা কমে যায়। লেখক গল্প লিখতে চেয়েছেন,গল্পই লিখেছেন এবং গর্ভিণী মেঘের কালোয়,দৃষ্টিক্লান্তকারী জলধারায়,একঘেয়ে বিষাদের আড়ালে রেখে দিয়েছেন কিছু গা-ছমছমে প্রশ্ন।
এগারো বছরের ডেরেক যখন বাবলি-পাপান-টুকাইদাদাদের অবাক করে দিয়ে ঘোষণা করে 'কার্নাল প্লেজার ইজ সিন',তখন পাঠক হিসেবে আমি অবাক হই না,কারণ এই ঘোষণার আগে প্রায় অর্ধেক উপন্যাস যাবৎ জেনে এসেছি — ডেরেকের পরিবার ধর্মনিষ্ঠ খ্রিস্টান,ডেরেকের বাড়িতে সুগন্ধি পবিত্রতা,বাড়ির দেওয়ালে প্রার্থনালিপি। ডেরেক চার্চ থেকে শিখেছে,মুখস্থ করেছে মানবজাতির করণীয় পুণ্য ও বর্জনীয় পাপাচারণ। অবাক হই না এই ঘোষণার আগের মুহূর্তেও,যখন পঁচিশবছর আগের এগারোবছর বয়সী এক প্রাককিশোর হস্তমৈথুনকে সঠিকভাবে 'কার্নাল প্লেজার' বলে চিনতে পারে। ডরোথিকে যৌনতায় লিপ্ত দেখে চিনতে পারে ওটা সিন। অবাক হই না কারণ এর আগে অর্ধেক উপন্যাস জুড়ে পড়ে এসেছি — পাপ-পুণ্য ডেরেক চার্চ থেকে শিখেছে,মুখস্থ করেছে,প্রার্থনা করেছে … পড়তে পড়তে অভ্যেসের স্বাভাবিকতায় এই সূক্ষ্ম অথচ তীব্র অস্বাভাবিকতাগুলো চোখের পলকে নজর এড়িয়ে যায়। কিন্তু পরে ভাবলে ভুরু কুঁচকে ওঠে,প্রশ্ন জাগে — ডেরেক কতটা জানে কিংবা ব্যস্তানুপাতে কতখানি অপাপবিদ্ধ। আরও তলিয়ে ভাবলে — জানলেও কীভাবে জানে — শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা লাগে। ডেরেক মরে গেলে প্রশ্ন আরও প্রাথমিকতায় পৌঁছয়। না-জানাই কি অপাপবিদ্ধতার পরাকাষ্ঠা? যে সমাজে জেনে গেলেই সে 'পেকে ঝুনো,ওর সঙ্গে মিশো না,খারাপ করে দেবে' ইত্যাদি চোখরাঙানি বিধিনিষেধের বিষয় হয়ে ওঠে,যে সমাজ শৈশবের সংজ্ঞায় জেনে যাওয়া ও পবিত্রতাকে একে অপরের বিপরীত বলে দাগিয়ে এসেছে,প্রতি প্রজন্মে সেই সমাজ কতটুকু চেনে তার শিশুদের,কতটুকু জানে তাদের মনোজগতকে? জানে না যে,এটা কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে দেশ জুড়ে শিশু-কিশোরদের ক্রমবর্দ্ধমান আত্মহত্যার সংখ্যা প্রমাণ করে দেয়। আত্মহত্যা সহজ কাজ নয়,একবারের চেষ্টায় সফল আত্মহত্যা আরোই সহজ নয়। এই কঠিন কাজটা বেঁচে থাকার চাইতে যাদের কাছে বেশি সহজ লাগে,তারা অনেকেই দশ-এগারো-বারো! এই ভাবনাটাই ভয়ের।
শাক্যজিৎ প্রয়োজনীয়ভাবে পাঠককে ভয় পাওয়াতে সফল হন। ডেরেক পাপান বাবলি-রা একা বসে থাকে — কারণ বৈপরীত্যের সহাবস্থান সহজে মান্যতা পায় না,ভুল বিশ্বাস ও অসময়ে ভুল অভিজ্ঞতার অভিঘাত একলা করে দেয়।
This entire review has been hidden because of spoilers.
"How shall we comfort ourselves, the murderers of all murderers? What was the holiest and mightiest of all that the world has yet owned has bled to death under our knives: who will wipe this blood of us?" - Friedrich Nietzsche
শৈশব বা ছোটবেলা এমন একটা সময় যা তৈরী করে দিতে পারে ভবিষ্যতের পুরো জীবনটা অথবা ধ্বংস করে দিতে পারে আগামীর প্রত্যেকটা সেকেন্ড। ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা সেখানে ঘন কুয়াশায় উনুন জ্বালিয়ে ঘর ধোঁয়ামুক্ত করার মতই ব্যর্থ প্রচেষ্টা। ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা বা দুর্ঘটনার রেশ নিয়ে সারা জীবন কেটে যায় কত মানুষের, তারপর সেগুলোই চেপে বসতে থাকে পরের প্রজন্মের ঘাড়ে অথবা শ্মশানের চুল্লিতে বিলীন হয়ে যায় তাদের সাথেই, শেষ অস্থিতেও বলে যায় "আমরা ভালো ছিলাম না, তোমরা আমায় ভালো থাকতে দাও নি।" তারপরেও আমরা আশে পাশের বাচ্চাগুলোর বিষাক্ত শৈশবের দিকে তাকিয়ে বলব "আমাদের সময় আরো কঠিন ছিল" এবং সেই বাচ্চাটাই বড় হলে যখন নুইয়ে পড়বে, তখন নখ দাঁত উঁচিয়ে খুঁড়ে বেড়াব এ মানসিক অবসাদে ভুগছে কেন? এত মানসিক সমস্যার ন্যাকামো করার কি আছে?
না, এই বইতে লেখক খুঁজতে যান নি, লেখক খুঁড়তেও যাননি। কেবল আবরণহীন অবস্থায় তুলে ধরেছেন সেই শিশুগুলোর মনস্তত্বকে। একেবারে ন্যাংটো করে। যাতে আমরা তথাকথিত বয়সের দিক থেকে বড় মানুষেরা বুঝতে পারি আমাদের একটা ভুল কার্যকলাপ, একটা বিষাক্ত উক্তি, একটা রক্তাত্ব স্বভাব কিভাবে উজাড় করে দিতে পারে একটা বাচ্চার পুরো জীবনটা। অপরাধবোধে হয়তো আমরাও মানসিক অস্বস্তিতে ভুগব কিন্তু আমাদের জীবন শেষ হয়ে এসেছে, সেই বাচ্চাটার সবে শুরু হয়েছিল কিন্তু তার আগেই পিষে শেষ করলাম আমরা।
একটা কথা এখানে উল্লেখ না করে পারছি না, একটি সিনেমা আছে কোরিয়ান ভাষায় নাম Hope যেটা একটি সত্যিকারের ঘটনা থেকে নির্মিত। একটি স্কুল ফেরত বাচ্চা মেয়েকে ধর্ষণ ও অত্যাচার করেন এক মাতাল মধ্য বয়স্ক অমানুষ। সেই বাচ্চাটি প্রাণে বেঁচে যায়, কিন্তু তার নিজের বাবা তার ঘরে গেলে সে কেঁপে ওঠে, তার নিজের বাবার কাছে যেতেও সে ভয় পায়। শেষে তার বাবাকে একটি কস্টিউম পড়ে দিনের পর দিন অনেক অনেক চেষ্টা করে তার ভয় কাটাতে হয়। মেয়েটি কোনোদিন এই দুর্ঘটনা থেকে বেরোতেই পারে না, ভবিষ্যতেও পারবে না। তার শরীরে একাধিক অপারেশন হয়, থেকে যায় অত্যাচারের চিহ্ন যা তাকে বাঁচতে দেবে না, মরতেও না। অথচ সেই ধর্ষক কিন্তু মুক্ত হয়ে যায়। প্রশ্ন হল, শাস্তিটা আসলে কার পাওয়া উচিৎ ছিল? কে পেল? কেন পেল?
তাই বইয়ের শেষের দিকে বাবলি যখন জিজ্ঞেস করে "তুমি কী চাও প্রবুদ্ধদা? আবার সবাই অতীত খুঁড়বে, আমাদের মতো? আমাদের মতো সবাই কেন হবে? তাদের নিজেদের জীবন নেই?" প্রবুদ্ধ উত্তর দেয়, "আমাদের ছিল না?" তখন বুঝতে ইচ্ছা করে সত্যি এই বাচ্চাগুলোর কি দোষ ছিল? ওরা তো শুধু ফুলের কুঁড়ির মতোই নিজেদের মত করে প্রস্ফুটিত হতে চেয়েছিল। আমরা তাদের সে সুযোগ না দিয়েই ছিঁড়ে উপড়ে ফেললাম তাদেরকে বৃন্ত থেকে। এবার বেঁচে থাকলেও সে আর কোনোদিন তার বৃন্তে ফিরতে পারবে না। "এখানে ডেরেক বসে আছে" এরকমই বৃন্তহারা কিছু বাচ্চাদের কথা বলে, যাদের জীবনটা এভাবেই উজাড় করে দেয় একটি দুর্ঘটনা আর তার ভার বহন করে বেড়ায় তারা সারা জীবন। ১১২টা পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অবরণহীন, নোংরা, অন্ধকার, কালো ভীষণ কালো সেই মনস্তত্ব, যা হয়তো কালো হওয়ার কথা ছিল না। শুধু শেষ লাইনে নয় এই বইতে থমকে যেতে হয় অনেক জায়গায়। বিশেষ করে আমরা যারা সুস্থ একটা শৈশব পাইনি বিভিন্ন কারণে, এখনও ভার বহন করে বেড়াচ্ছি সেগুলির, তারা কোথাও যেন ভীষণ আত্মস্থ করতে পারি, প্রবুদ্ধ ২৫বছর পর কেন এখনও ডেরেককে বসে থাকতে দেখতে পায়। চোখের কোণে জল জমতে বাধ্য শেষ লাইনে। এই বইয়ের ঘোর কাটা সহজ নয়, তাই চেষ্টাও করবেন না। তবে হ্যাঁ এই বই সবার জন্য নয়।
লেখকের "শেষ মৃত পাখি" বইটি আগেই পড়েছি, কিন্তু লেখনীতে এই বইটিকে এগিয়ে রাখব। এত অসাধারণ ভাষার প্রয়োগ, এত অনবদ্য মেটাফরের বর্ষণ ছত্রে ছত্রে, দুর্ধর্ষ শব্দপ্রয়োগ। কিছু কিছু জায়গা আমি বারবার পড়েছি। এত ভালো লেগেছে। এরকম বই আরো আসুক যেখানে মনস্তত্বকে তুলে ধরা হয় একদম সত্যভাবে। শৈশবটা যাদের সুখকর হয়নি তাদের কথাটা তুলে ধরার জন্য লেখককে একরাশ ধন্যবাদ।
নতুন বছরে আর কিছু পড়ুন বা না পড়ুন এই বইটি অবশ্যই।
এক টিপটিপে বৃষ্টির দুপুরবেলা পরিচিত বাড়িটির উঠোনে প্রবুদ্ধ ফিরে এল। পঁচিশ বছর আগে ভাড়াটে হিসেবে সে এখানেই থাকত। ছোটবেলায় এই বাড়ির ওপর জোড়াছাদে ও, বাবলি, ডেরেক, ঘেন্টু, টুকাইদা সবাই মিলে সারাদিন একসাথে খেলত। বাবলি বাদে ওরা সবাই ছিল অখিল দত্তের ভাড়াটে। সবকিছুই ঠিক ছিল ( আদৌ ছিল কি?).. তড়তড়িয়ে এগিয়ে চলছিল তারা তাদের মতো করে (সত্যি?).. কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন ডেরেক আত্মহননের পথ বেছে নেয়। তারপরই তছনছ হয়ে যায় তাদের শৈশব। একে একে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তারা বাড়িটিকে ছেড়ে চলে যায়। ছেড়ে চলে যায় তাদের শৈশবকে। তারপর গত পরশু এই বাড়ির পুরানো ভাড়াটে বিমলেন্দুদা তাকে ফোন করে জানায় যে 'অখিল দত্ত মরে যাচ্ছে' , পারলে সে যেন একবার ঘুরে যায়। বহুদিনের সম্পর্কের আলগা সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার আগে কেউ মনে করতেই পারে যে সে দেখতে আসবে। কিন্তু তাকে যে আসতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতাও তো তার ছিল না। তাহলে সে কেন এল? কোনো উত্তর খোঁজার জন্য? ডেরেক কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? তার আত্মহত্যার জন্য কে বা কারা দায়ী? এরকম বহু প্রশ্ন আপনার সামনে ভেসে উঠবে গল্পটি শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই.. .. তার উত্তর খুঁজতে আমার মতো আপনাকেও হাঁটতে হবে প্রবুদ্ধের সঙ্গে .. যেতে হবে পঁচিশ বছর আগে ও পরের টাইমলাইনে বারংবার... যাই হোক, আমার কেমন লাগল সেই দিকে একটু আলোকপাত করা যাক,
~ অসমান গদ্যরীতি এই বইটি পড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। ফলে অনেকেই কিছুটা পড়ে হাল ছেড়ে দিচ্ছেন। আমি তাদের উদ্দেশ্যেই বলব, একটু ধৈর্য ধরে পড়তে পারলে বুঝতে পারবেন লেখকের এই সুপরিকল্পিত পদ্ধতিটি আসলে এক বালক ও একজন প্রাপ্তবয়স্কের মনের মধ্যে বয়ে চলা অতীত ও বর্তমানের দ্বন্দ্ব.. যাকে চাইলেও সহজে ঝেড়ে ফেলা যায় না। জীবনানন্দ তো বলেই গেছেন, "উপেক্ষা করিতে চাই তারে; মড়ার খুলির মতো ধ’রে আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে তবু সে মাথার চারিপাশে, তবু সে চোখের চারিপাশে, তবু সে বুকের চারিপাশে; আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে।" লেখক চেয়েছেন আপনিও পূর্ণ মনোযোগ সহকারে সেই দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে যান। তাদেরকে চিনুন, বুঝুন।
~ মানুষকে চালিত করে মন। মনের গতিপ্রকৃতি বিচিত্র, যা উপলদ্ধি করাও বেশ বিচক্ষণতার কাজ। কিন্তু আমরা প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিই এখনও ঠিকঠাক সচেতন হয়ে উঠতে পারিনি সেখানে শিশু মনস্তত্ত্ব যে অযত্নে পড়ে থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। সত্যি বলতে এই সময়ে শিশু মন এমন অনেক কিছুর মুখোমুখি হয় যা সে শিখতে, বুঝতে বা মেনে নিতে পারে না। তার জন্য যে সাপোর্টের দরকার সেটা থেকেও তারা বঞ্চিত হয়। কেউ কেউ তারমধ্যে বেড়ে ওঠে আবার কেউ কেউ শিউলির মতো ঝরে যায়। এই গল্পে এধরণের বিষয়গুলোকেই অত্যন্ত নির্মোহভাবে লেখক তুলে ধরেছেন।
~ গল্পে উল্লিখিত চরিত্রগুলো আমার আপনার খুবই চেনা। চরিত্রের যে দিকগুলোকে আমরা সচরাচর সামনে আনতে চাইনা লেখক সেসব দিকগুলোই তুলে ধরেছেন। এবং তাতে তিনি ��ুরোমাত্রায় সফল হয়েছেন।
~ পিনাকী দে-র করা প্রচ্ছদটি যথাযথ হয়েছে।
শেষে এটাই বলব, উপন্যাসটি অবশ্যই পড়ুন। কিন্তু সময় নিয়ে এবং অবশ্যই মাথায় রাখবেন, This is not intended for casual reading or meant to be enjoyed. This is a harsh and difficult truth that needs to be faced. If you feel prepared for it, then proceed.
বই ~ এখানে ডেরেক বসে আছে লেখক ~ শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য প্রকাশনা ~ বৈভাষিক প্রকাশনী প্রচ্ছদ ~ পিনাকী দে মুদ্রিত মূল্য ~ ২২৫ টাকা
"চুঁয়ে পড়া মরা আলোর সঙ্গে পাক দিয়ে নামছে পুরোনো দিন।"
পঁচিশ বছর পর ফিরে এসেছে প্রবুদ্ধ তার প্রথম বাসস্থানে; সেখানে তখন ভেঙে পড়ছে তার ছোটবেলার খেলার জায়গা - জোড়াছাদ, দেয়াল থেকে ঝড়ে পড়ছে চুনবালি, চারদিকে জমেছে শ্যাওলা, বাতাসে এক দম বন্ধ করা বিষণ্ণতা, হিমশীতল অন্ধকার। তখন অখিল দত্ত মরে যাচ্ছে। খেলার সঙ্গীরাও নেই। তবে কেন ফিরে এল প্রবুদ্ধ? অখিল দত্তের জন্য? নাকি স্মৃতির মণিকোঠায় একবার শেষবারের মতো হানা দিতে? নাকি গত পঁচিশ বছর ধরে তাকে কুড়ে কুড়ে খাওয়া এক পরিত্যক্ত রহস্যের মীমাংসা করতে?
উপন্যাস অতীত ও বর্তমানের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে একসময় মিলেমিশে যায়। আসলেই কি পঁচিশ বছরে কিছু পাল্টেছে? নাকি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে পাপাই, বাবলি, টুকাই, ঘেঁটু; পদ্মিনী গাড়িটার সামনে? আর ডেরেক? পড়তে পড়তে বুক কেঁপে ওঠে।
শিশুমন এবং তার থেকে বেড়ে ওঠা এক প্রাপ্তবয়স্কের মনস্তত্ত্বকে ঘিরে এই উপন্যাস। শৈশবের ট্রমা এর অনেক বড়ো অংশ জুড়ে। এটি শিশুর মনে কী পরিমাণ ভয় ও ঘৃণা সৃষ্টি করে এবং যে কঠিন প্রশ্নের উত্তর মেলেনা, নিষ্পাপ শিশুমনের উপর সেই চাপের প্রভাব কী কী হতে পারে এবং তার পরিসর কতদূর হতে পারে তা ফুটে উঠেছে এখানে।
রয়েছে অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মান্ধতা এবং তাদের সুদূরপ্রসারী প্রভাব। কীভাবে মানুষ ধর্মান্ধ হয়ে জীবনের সবথেকে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো হারিয়ে ফেলে এবং পাপবোধ, অনুশোচনা ইত্যাদিতে নিজেকে জড়িয়ে একদম আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে তা দেখিয়েছেন লেখক।
এই উপন্যাসের সর্বাধিক ভাগ জুড়ে রয়েছে ছোটবেলার স্মৃতি মন্থন। ভাড়াবাড়ি, খেলার জোড়াছাদ, বন্ধুত্ব, অন্ধকারের ভয়। সব স্মৃতি ভালো না হলেও যেন এগুলো একটু হলেও আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমাদের ছোটবেলায়।
কখনও এক শিশুর ছোটবেলার তিক্ত স্মৃতিতে হৃদয় বিদারিত হয়েছে, কখনও অখিল দত্তের ভাড়াবাড়ির অসহ্যকর পরিবেশে হাঁফিয়ে উঠেছি, আবার কখনও স্তব্ধ হয়েছি যেন এক বন্ধু হারানোর অসহায়তায়। বারবার থামতে হয়েছে নিজের অনুভূতি নিজের কাছে বিশ্লেষণ করার জন্য; কিন্তু পড়া বন্ধ করতে পারিনি।
সম্পূর্ণ মনোযোগ প্রয়োজন উপন্যাসটির গহনে প্রবেশ করতে। এই উপন্যাস কোনো ভালো লাগার অনুভূতি তৈরী করেনা; বরং জীবনের উপেক্ষিত এবং অবহেলিত সত্যগুলোর সামনে এনে দাঁড় করায়। প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই লেখক যেভাবে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ গড়ে তুলতে তুলতে শেষ পৃষ্ঠায় এসে এক শব্দহীনতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় তাতে লেখকের শক্তিশালী লেখনী অনস্বীকার্য।
পিনাকী দে স্যারের বানানো প্রচ্ছদ এই অন্ধকারে পরিপূর্ণ উপন্যাসটির জন্য যথাযথ।
পাঠ প্রতিক্রিয়াটি লিখলাম আজ টিপটিপে বৃষ্টির দিনে ঠিক যেমন যেদিন গল্প শুরু হয়েছিল। এ যেন কোনো গল্প না; চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকা বাস্তব!
ছোটবেলা থেকে বড়োবেলা অনেকটা ওই আমাদের প্রিয় উৎসবের মতো, সারাবছর অপেক্ষা করা তারপর বিজয়া দশমীর পর সবার ঘরে ফেরার পালা কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মানুষ বরাবরই অসম্পূর্ন, তাই ঘরে ফেরা সহজ হয়না, তবুও কিছুজন ঘরে ফেরার জন্য বসে থাকে, সুযোগ খোঁজে, কিছু উত্তর খুঁজে পেতে হবে যে, যেমন-
"পঁচিশ বছর পরে যে টিপটিপে বৃষ্টির দুপুরবেলা পরিচিত বাড়িটির উঠোনে প্রবুদ্ধ চুপিচুপি ফিরে এল, সেদিন অখিল দত্ত মরে যাচ্ছিল।"
২৫ বছর পর প্রবুদ্ধ তার পুরনো পাড়ায় যখন ফিরেছিলো, সেই সময় তার সেই ছোটবেলার পুরনো বাড়ির মালিক অখিল দত্ত মারা যাচ্ছেন। ধীরে ধীরে উঠে আসে পঁচিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনা, যার প্রভাব পড়েছিল প্রবুদ্ধ এবং তার বয়সী বন্ধু - বান্ধবীদের ওপর কিন্তু সেই ঘটনার কিছু প্রশ্ন আজও প্রবুদ্ধকে তাড়া করে বেড়ায়, কিছু স্মৃতি আজও মনের মধ্যে অন্ধকারকে জাগিয়ে রেখেছে। ২৫ বছর অনেকটা লম্বা সময়, অনেককিছুই বদলে গেছে, অনেক কিছুই জীবন থেকে মুছে গেছে । শুধু, তার সেই ছোটবেলার ঠিকানা, দত্তদের বাড়ী, পুরনো সিমেন্ট বালি খসে পড়া বাড়ী ঘর, সেই স্যাঁতস্যাতে পরিবেশ, শুন্য পাখির খাঁচা, বাবলি, পদ্মিনী এবং তার মধ্যে এখনো বসে থাকা ডেরেক সাথে কিছু স্মৃতি এগুলো এখনো একরকম রয়ে গেছে। সেই ছোটবেলার ঘটনা কি ছিলো ? যার স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে ? প্রবুদ্ধর মতো আরো কি কেউ আছে যারা এখনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে যাচ্ছে, আদতেই কি সেই ঘটনার কথা সবাই ভুলে গেছে ? প্রবুদ্ধ কেন পঁচিশ বছর পর ফিরে এলো ? শুধুই কি উত্তর খোঁজা ? নাকি আরো কোনো উদ্দেশ্য আছে ?
প্রতিক্রিয়া - এই বই সবার পছন্দ হবে না। যারা ইনটেন্স লেখা পছন্দ করেন, তাদের এই গল্প অতোটা ভালো লাগবে না। অতিরিক্ত বর্ণনা এবং বিবরণ, যার হয়তো গল্পের খাতিরে দরকার নেই তবুও দেওয়া বা কোনো একটা জায়গায় গিয়ে হয়তো থামতে হয়, বেশি আবেগ ও ইমোশন দেখাতে গিয়ে কেমন যেনো মূল কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরে গেছে ধীরে ধীরে। খুবই ধীর গতির গল্প, একনাগাড়ে পড়ে শেষ করার মতো গল্প নয়। ব্যক্তিগত ভাবে, আমার গল্পটি পছন্দ হয়নি কারণ পড়তে পড়তে একটা বিরক্তি বা একঘেয়েমি ভাব চলে এসেছিলো। খুব যে অন্যরকম প্লট তা নয় বা খুব আলাদা কিছু নেই। হ্যাঁ, তবে ফার্স্ট পার্সন এবং থার্ড পার্সন এর ব্যবহার এর মাধ্যমে অতীত এবং বর্তমানের সময়ের মধ্যে ফারাকটা ভালো ভাবে দেখিয়েছেন। কিছু কিছু লাইন আছে যেগুলো সত্যিই সুন্দর এবং মনে রাখার মতো।
◻️ “... যা সজল, প্রবুদ্ধ তাকে বোঝে। সে স্পর্শের উষ্ণতা চায়। চায় ফিরে যেতে, পঁচিশ বছর আগে। সে হাত বাড়ালে তার নাম দেওয়া যাবে অনিঃশেষ, যেহেতু নদী শুকিয়ে গেলেও গিরিখাত থাকে। গাছ কাটা হলে থেকে যায় ছায়া। কিন্তু প্রবুদ্ধ তো তার কাছে ফিরতে পারবে না! তার বারান্দায় পাশাপাশি বসে অনন্ত অন্ধকারে জমে যাওয়া প্রবুদ্ধর পক্ষে আর সম্ভব নয়।...”
◻️পাপ, অন্ধকার এবং জীবনের শ্যাওলা জমা পিচ্ছিল গলি......নিছক একটি উপন্যাস নয়, স্মৃতি, অপরাধবোধ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মানসিক অন্ধকারের এক জটিল টানাপথ। মাত্র ১১২ পৃষ্ঠার এই উপন্যাস শেষ হয়ে গেলেও, তার গভীরতা এবং অস্বস্তিকর আবহ বহুদিন পাঠকের মনে গেঁথে থাকবে।
◻️ গল্পের শুরু হয় প্রবুদ্ধর ফেরা দিয়ে - পঁচিশ বছর পর পুরোনো পাড়ায়, অখিল দত্তের মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু এ ফেরা শুধুই পুরোনো স্মৃতির টানে নয়। এটি একটি অন্বেষণ, যার কেন্দ্রে আছে ডেরেক - একটা ভাঙাচোরা পদ্মিনী গাড়ির ভেতরে বসে থাকা স্থির কিশোর, যে গত পঁচিশ বছরেও একটুও বড় হয়নি। শৈশবের সরলতা, কৈশোরের অস্থিরতা এবং জীবনের প্রতি নিষ্ঠুর বাস্তবতা গল্পে মিশে গেছে। পাপান, বাবলি, টুকাই, ডেরেক, ঘেন্টু - নিজের অজান্তে এক অন্ধকার চক্রে বন্দি হয়ে পড়ে। দত্তদের বাড়ি, ভাঙাচোরা গলি, শ্যাওলা জমা উঠোন, এবং মুখখিস্তিময় দিনযাপন গল্পের আবহে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি করে।
◻️উপন্যাসটি অতীত এবং বর্তমানের টাইমলাইনের মধ্য দিয়ে এগোয়। লেখনী ধীর এবং ভারী, যা পাঠকের মনোযোগ দাবি করে। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা অস্বস্তি তৈরি করতে করতে, অবশেষে পাঠককে এক দুঃসহ নীরবতায় আটকে দেয়। তুলে ধরে জীবনের চিরন্তন অসামঞ্জস্য, অপরাধবোধ এবং অপ্রাপ্তির চিত্র।
◻️এই উপন্যাসে আলো নেই, কেবল অন্ধকার। কিন্তু সেই অন্ধকারে পাঠকের মনে প্রশ্ন রেখে যায় - যে পাপান পালিয়ে গিয়েছিল, সে প্রবুদ্ধ হয়ে ফিরে এলেও কি সত্যিই মুক্তি পায়? আমরা কি সত্যিই ফিরতে পারি? নাকি ফিরেও আমরা হারিয়ে যাই নতুন এক পরিচয়ে?
এখানে ডেরেক বসে আছে শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য বৈভাষিক ২২৫ টাকা
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের লেখার সাথে আলাপ হয়েছে একানড়ে বইটির মাধ্যমে। এই নিয়ে আমি ওনার লেখা তিনটি বই পড়লাম। তিনটি লেখাই আমার পছন্দ হয়েছে, খুবই রিলেটেবল লেগেছে, আর সবচাইতে পছন্দ হয়েছে উনি বইতে বড়দের সাথে বাচ্চাদের চিন্তাভাবনার ধরণ সম্পর্কেও সমানভাবে অবগত করেছেন।
ডেরেক বইটি যখন পড়তে শুরু করি বেশ অন্যরকম লাগছিল। কল্পনাও করতে পারিনি শেষ অবধি কী অপেক্ষায় রয়েছে। তবে মিথ্যে বলবনা, আমি বেশ উপভোগ করছিলাম পড়ার সময়ে, কারণ ছোটবেলাতে আমার ভাবনাচিন্তার মোড় যেভাবে ঘুরত, এই গল্পের বাচ্চাদেরও সেরকমই হচ্ছিল।
গল্পে, প্রবুদ্ধ এসেছে তার ছেলেবেলায় ফেলে যাওয়া পাড়াতে, যেখানে সে বেশ কয়েক বছর কাটিয়ে ছিল একটি ভাড়াবাড়িতে। যেখানে রয়েছে হাজারো স্মৃতি, কয়েকজন খুব কাছের এবং পরিচিত মানুষ, একসময় যাদের ছাড়া একমুহূর্ত কাটত না এবং একটি দুর্ঘটনা, যেটা সে আজ অবধি ভুলেও ভুলতে পারেনি।
গল্প বাবলি, ডেরেক, প্রবুদ্ধ, ঘেন্টু ও টুকাইদা এই পাঁচজনকে নিয়েই এগিয়ে চলে। পাঁচজন অন্তরঙ্গ বন্ধু না হলেও কিছুটা দিনযাপন একসাথেই হতো। শৈশব থেকে কৈশোর আর কৈশোর থেকে যৌবনে উত্তীর্ণ হবার সময়গুলো আসলে বড়ই অদ্ভুত হয়, মন আর মাথা একসাথে চলে না, মন ডানদিকে যেতে বললে মাথা বলে ডানদিকে গেলে কিন্তু ঘোর বিপদ। ফলে বিপদে পড়তে হয় অনেক সময়েই এই কৈশোর, যৌবন বয়ে নিয়ে চলা মানুষগুলোকেই। শৈশবের শেখা ঠিক-ভুলের পাঠ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় অনেকেরই, এবং এটা যে খুব বড়ো অন্যায়ের কিছু না তা অনেকেই বুঝতে পারে না, ফলে ঘটে যায় অঘটন।
এরকমই এক অঘটনের কুলকিনারা করতে আজ পঁচিশ বছর পর প্রবুদ্ধ ছুটে এসেছে তার পুরোনো পাড়ায়, সেই ঘটনা যা সে ভুলেও আদৌ কখনও ভুলতে পারেনি। ডরোথি, মোহরদি, অখিল দত্ত, বাবলি সবার সাথে এক এক করে দেখা করতে করতে অনেক কিছু নতুন করে জানতে ও বুঝতে পারে।
শেষ অবধি কী হল জানতে বইটি পড়তে হবে অবশ্যই, তবে শেষ যেমনই হোক না কেন এই বই আপনার মনে এক দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীর ছাপ ফেলবেই ফেলবে, যা আপনিও হয়তো প্রবুদ্ধর মতোই ভুলেও ভুলতে পারবেন না।
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের ‘এখানে ডেরেক বসে আছে’ বইটি পড়ে মনে হলো, এটি শুধু একটি গল্প নয়, বরং গভীরভাবে অনুধাবনযোগ্য একটি মনস্তাত্ত্বিক চিত্র। বইটি পড়ার পর বেশ কিছু বিষয় ভাবতে বাধ্য করে, বিশেষ করে শৈশবের ট্রমা এবং তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে লেখকের উপস্থাপনা। ট্রমা বড় হয়ে যে কি বৃহৎ আকার ধারন করতে পারে তার একটা শ্রেষ্ঠ নিদর্শন লেখক এখানে তুলে ধরেছেন। ছোটবেলার কিছু চাপা ক্ষত কীভাবে সময়ের সাথে বড় হয়ে জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তার এক অনন্য চিত্র ফুটে উঠেছে গল্পে।
এছাড়াও, বইটিতে ধর্মীয় উগ্রতা এবং তার পরিণতি নিয়েও শক্তিশালী বার্তা রয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে অন্ধ বিশ্বাস মানুষকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলো থেকে বঞ্চিত করতে পারে। ধর্মান্ধতা কেবল ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষতি করে না, বরং সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কে গভীর প্রভাব ফেলে। কিভাবে ধর্মে অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষ গুলো একদিন তাদের ধর্মান্ধতার জন্যই জীবনের সবকিছু খুইয়ে বসে। এছাড়াও টুকিটাকি অনেক থিম বই টায় আদ্যোপান্ত ছড়িয়ে আছে।
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের লেখা আগেও পড়েছি। লেখকের লেখা পড়ে তাঁর লেখার অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে পেতে পাঠককে গভীর মনোযোগ দিতে হয়, পুরো মনকে একাগ্রতায় সম্পৃক্ত করে বসতে হয়, এই বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়। শুরুর দিকে দুইটি ভিন্ন টাইমলাইন একত্রে বোঝার ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগলেও, একবার বইটির প্রবাহে ঢুকে পড়লে তা ছেড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও এটি আমার সবচেয়ে প্রিয় বই নয়, তবুও গল্পের গভীরতা এবং উপস্থাপনার কারণে এটি মনে দাগ কেটেছে। যারা মনস্তাত্ত্বিক গল্প, সমাজের অন্তর্নিহিত অসঙ্গতি এবং শক্তিশালী থিম নিয়ে লেখা উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য।
গল্পের অক্ষরে অক্ষরে জমে থাকা শ্যাওলা। পিচ্ছিল, সন্তর্পণে হাঁটতে হয় পাঠককে। গদ্য ব্যতিক্রমী, তার ধার ও ভার পেরিয়ে আসতে হয় এক একটি অধ্যায়ে, সাবধানে, সময় নিয়ে। পেরিয়ে এসেছি, পঁচিশটা বছর, প্রবুদ্ধর হাত ধরে। ডেরেকের খোঁজে। না মেলা কিছু সমীকরণ মেলাতে। ছোটবেলার পাপান, বাবলি, টুকাই চরিত্ররা পাঠকের মনোযোগ দাবি করে। ঘটনা, সম্পর্কের চোরাস্রোত, অতীত এবং বর্তমানের পাপ এবং পাপের বোধ, এবং সেই পাপের বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে আসা প্রবুদ্ধ, ছোটবেলার অতীত হয়ে যাওয়া ঘেন্টু, ডেরেক, রাক্ষস পাঠককে ভাবায়, কিচ্ছুটি ভুলতে দেয় না। পাঠশেষে অস্বস্তি হয়। অস্বস্তিতে ফেলে আমাকে। ঘ্যানঘ্যানে, অকারণ বৃষ্টি, শ্যাওলা জমে থাকা পিচ্ছিল গলি, সঙ্গে চারদিকে হাইড্রেনের গন্ধ। জোড়াছাদ, জলের ট্যাঙ্কের নিচ। ভাড়াটে, মুখখিস্তি, দেশলাইয়ের খোপ, ছোটোলোকের বাচ্চা, দেওয়ালে কান পাতা — এই সব নিয়েই দত্তদের বাড়ির ধূসর কালো জীবন। অস্বস্তি, নীরবতা, নিকষ অন্ধকার এবং কিছু সম্পর্কের, কিছু ঘটনার ক্লোজার পেতে চাওয়া।
Shakyajit's unique and unconventional narrative and storytelling is definitely not for all and rare in recent times. It radiates discomfort, silence through the time travel back to 25 years. Bleak emptiness creeps in through this read. And there lies the success of this novel. A dark psychological thriller, revolves around one truth, one ultimate closure.
Ekhane Derek Bose Ache by Sakyajit Bhattacharya is a tense fictional drama exploring the depths of human nature. I read the book as a part of a buddy read and believe this was one of the most difficult books that I have ever read. The author, with his metaphorical language, narrates a story that leaves us thinking about the good and bad aspects of our society. With multiple POVs, the story takes steep turns that leave the readers in awe. The characters are a bit complex to understand, and the real truth unfolds at the very end.
And the best part was how some people are so emotional and vulnerable and how this thing changed the whole flow of the story.
But after I finished reading, I got more confused with what happened. It puts a lot of questions in a reader's mind. This book is going to stay for a long time in my mind. The book deserves 5 stars.
কী বলা চলে একে? ডার্ক সাইকোলজি? না, না! জীবনের নির্নিমেষ ডার্ক কমেডি। তবে নিশ্চিত ভাবে ডার্ক - অতি অন্ধকারে গুমরে মরা ডেরেক'দের মৃত্যুকে একটু একটু করে আলোকসজ্জায় সাজিয়ে তোলে অন্ধকারকে নিকষ করে তোলার একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে ওঠে প্রবুদ্ধ, বাবলি, ঘেন্টুরা, অজান্তেই। ডরোথির এঁকে দেওয়া চরাচরশূন্য, আবেগহীন, সন্তর্পণ পরিণতিকে বহন করে শৈশব। কালে কালে শৈশব থেকে কৈশোর হয়ে জবাবের হিমশীতল ধারা ব্যারেজ ভেঙে অবাধে বয়ে চলে যৌবনের ঘূর্ণিপাকে, পঁচিশ বছর ধরে। ‘পদ্মিনী’ সাক্ষ্য রাখে, অখিল দত্ত মরে যাচ্ছে, ডেরেক মরে গেছে।
Shows how children ( soon to be teenagers ) deal with sexuality . This book is not a very easy read . The words and the type of writing are pretty complex . But it's an interesting and short book . So , it's worth a try . Also shows different psychological issues , the dark side of religion ( more like religious people ) , and the life of middle , lower class families in Kolkata .
বইটি শেষ হচ্ছিল না বলে এতক্ষণ ঘুমাতে যেতে পারছিলাম না, আর এখন বইটা শেষ করে ঘুমাতেও পারছি না। এমন একটা অনুভূতি হচ্ছে, যেটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ঠিক কীভাবে ভালো লাগলো, সেটা বলার মতো শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছি—আগামী এক-দুই দিন আর নতুন কোনো বই পড়ার মতো মানসিক অবস্থায় থাকব না।
অবষাদে ঘেরা প্রতিটা শব্দে তলিয়ে যাচ্ছিলাম অন্ধকারে, খেই হারিয়ে ফেলার একটা ভয় ছিলো। বাচ্চাকালের স্মৃতিমাখা শব্দ এরকম অবষাদে ভারী হতে পারে, ভাবনার বাইরে ছিলো।
মনে হল উচ্চমানের একটা আন্তর্জাতিক লাতিন আমেরিকান বা ইউরোপীয় নভেলা পড়লাম। একটা মাস মার্কেট বেস্টসেলার লেখার পর এরকম লেখার সাহস দেখানোর জন্য লেখককে কুর্নিশ।
"How shall we comfort ourselves, the murderers of all murderers? What was the holiest and mightiest of all that the world has yet owned has bled to death under our knives: who will wipe this blood off us?" - Friedrich Nietzsche প্রবুদ্ধ তার শৈশবের ভাড়াটে বাড়ির মালিকের অসুস্থতার কথা জানতে পেরে দেখা করতে আসে। আর শ্যাওলা পড়া উঠনের প্রতিটি ফাঁকে খুঁজে পায় তার হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলার গল্প, নস্টালজিয়ার রেশ যা মুহূর্তে ধসে যায় এক দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। বাকি সেই দুর্ঘটনা, তার রেশ, এবং সেই নিয়ে জড়িত প্রতিটি চরিত্রের চরম নিয়তির গল্প নিয়ে এই নাতিদীর্ঘ উপন্যাস। শাক্যজিতের "শেষ মৃত পাখি" আমাকে খুব টেনেছিল। যদিও সেই উপন্যাস ধারে ও ভারে অনেক বৃহৎ ছিল, কিন্তু ক্লাইম্যাক্সের ট্যুইস্টটা পুরোপুরি অনুপ্রাণিত ছিল বিখ্যাত এক জাপানি লেখকের উপন্যাস থেকে। সেই তুলনায় এই বইটি অনেক এগিয়ে দুরন্ত কিছু মেটাফর আর লেখনীর দিক থেকে।
You stare at a festering wound on your body long enough that you start scratching it until it bleeds, until the skin gives way and there's just tissues and bone, and you still keep scratching hoping to reach a place of vacuum and silence and love. I don't think there's a word to describe that feeling, that's why there's this marvel of a novel.